📄 ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা
সুরা কাহাফের তাফসিরি ফায়দাসমূহ লেখার সময় মাওলানা আযাদ এক স্থানে সুরা বাকারার উল্লিখিত ঘটনাকে হযরত হিযকিল আ.-এর কাশফ অভিহিত করেছেন। যা হিযকিল নবীর পুস্তিকার সঙ্গে প্রায় মিলে যায়।¹³ তার কথাগুলো চরম বিস্ময় সৃষ্টি করছে। হয়রান না হয়ে পারা যায় না। যখন পবিত্র কুরআন উল্লিখিত ঘটনাটিকে পরিষ্কার ও স্পষ্ট ভাষায় জনৈক ব্যক্তির ঘটনা বলে উল্লেখ করে বলেছে যে, মহান আল্লাহ তাকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মৃত্যুর কোলে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন, এরপর তাকে পুনর্জীবন দান করে সেই মৃত্যুর মেয়াদকাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, আর তিনি তার সঠিক উত্তর দিতে সমর্থ হলেন না, তখন নিজেই তার সঠিক উত্তর জানিয়ে দিলেন এবং তৎসংশ্লিষ্ট সকল সাক্ষ্য প্রত্যক্ষ করিয়ে দিলেন। তাহলে কিভাবে মাওলানা আযাদ হযরত হিযকিল আ.-এর কাশফকে এই ঘটনার তাফসির বা ব্যাখ্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন?
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَانْظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهُ وَانْظُرْ إِلَى حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِرُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লক্ষ করুন, একজন সম্মানিত ব্যক্তি এমন এক ধ্বংসস্তূপ ও অনাবাদ জনবসতি পার হচ্ছেন যা একসময় জীবনচাঞ্চল্যে উদ্দীপ্ত জনপদ ছিলো।
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا তিনি জনবসতির চিত্র দেখলেন আর মনে মনে ভাবলেন কিংবা মুখে বলে ফেললেন, কীকরে এই মৃত জনবসতি পুনর্জীবন পাবে? قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا
করলেন এবং একশো বছর পর্যন্ত ওই অবস্থায় রেখে দিয়ে দ্বিতীয়বার জীবিত করলেন। فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ জীবন দান করার পর সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো, তুমি এখানে কত দিন পড়ে ছিলে? সম্মানিত লোকটি উত্তর করলেন, এক দিন বা দিনের কিয়দাংশ। قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ যেহেতু উত্তরটি ভুল ছিলো, এ কারণে আল্লাহ তাআলা সংশোধন করে অবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে বলেন, না, বরং তুমি একশো বছর পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে ছিলে। قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ এরপর তিনি তাঁর শক্তিময় কুদরতের চিত্র প্রত্যক্ষ করিয়ে দিলেন যে, একদিকে এই দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যসামগ্রীর সব কিছু টাটকা ও সতেজ রয়েছে। মৌসুমের পালাবদল তাতে কোনো আঁচড় ফেলতে পারে নি। অন্যদিকে তার বাহন গাদাটির গোটা দেহ পচে-গলে নিঃশেষ হয়ে গুটিকয়েক হাড্ডির একটি কাঠামো পড়ে আছে। فَانْظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهُ এরপর বললেন, আমি এতসব কাজ করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে আমি পৃথিবীর মানুষদের কাছে আমার কুদরতে কামেলার একটি 'নিদর্শন' বানাতে চাই। وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ উল্লিখিত আলাপনের পর সেই সম্মানিত ব্যক্তিকে দেখিয়ে দেন যে, কীভাবে হাড্ডিগুলো পরস্পরে সংযুক্ত হলো, কী করে তার ওপর গোশতের প্রলেপ পড়লো, কীভাবে তা চামড়ার আবরণে ঢাকা পড়লো। এরপর গাধাটি জীবিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا এগুলো দেখে স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করার পর যখন সেই মহান সম্মানিত ব্যক্তি ইলমুল ইয়াকিন [দৃঢ়বিশ্বাসমূলক জ্ঞান] থেকে আইনুল ইয়াকিন [দিব্যজ্ঞান]-এ উন্নীত হলেন, তখন তিনি অকপটে স্বীকার করলেন, নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর কুদরতে কামেলার জন্য এসব জীবনোপকরণ ও কার্যকারণের প্রয়োজন নেই। তিনি যেভাবে ইচ্ছে কোনো বিঘ্ন ছাড়াই করে ফেলার ক্ষমতা রাখেন। তাঁর কাজে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে-
فَلَمَّا تَبَيَّnَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 'যখন তা তার নিকট স্পষ্ট হলো তখন সে বলে উঠলো, আমি জানি যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।'
এই পরিষ্কার ও স্বচ্ছ অর্থবিশিষ্ট আয়াতসমূহের ওপর দ্বিতীয়বার লক্ষ্য করুন আর ভাবুন, পবিত্র কুরআন উল্লিখিত ঘটনাকে একটি বাস্তব ঘটনার আকার দিয়ে বর্ণনা করেছে না-কি রূপক অর্থে একটি 'কাশফ' আকারে পেশ করেছে? তাহলে বলুন, হযরত হিযকিল আ.-এর কাশফ আর উল্লিখিত আয়াতসমূহে উল্লিখিত ঘটনার মাঝখানে সাযুজ্য থাকার কারণে দুটিকে এক ও অভিন্ন বলা কীকরে সহিহ হতে পারে? না, কখনই তা সহিহ হতে পারে না। নিঃসন্দেহে মাওলানা আযাদের উল্লিখিত ব্যাখ্যা বাতিল।
তবে এ কথা বলা সহিহ হতে পারে যে, যদি হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর জীবনে উল্লিখিত ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে তার কাছাকাছি একটি ঘটনা হযরত হিযকিল আ.-এরও কাশফ হতে পারে। যেটি তাওরাতের হিযকিল নবীর পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। যে কাশফে তিনি বনি ইসরাইলের শুকিয়ে যাওয়া হাড্ডিকে দ্বিতীয়বার জীবিত হতে দেখেছিলেন। মহান আল্লাহ তখন তাকে জানান, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বনি ইসরাইলিরা এখন নিরাশ হয়ে আছে যে, ওই ধ্বংসযজ্ঞের পর আমরা কখনো জেরুজালেমে দ্বিতীয়বার আবাদ হতে পারবো না। আমি তোমার মাধ্যমে ওদেরকে খবরদার করতে চাইছি যে, আল্লাহর ফয়সালা হলো, অবশ্যই তা ঘটবে। ¹⁴
টিকাঃ
১২. তাফসিরে ইবনে কাসির: ১/৩১৪
১৩. তাফসিরে তরজমানুল কুরআন, খণ্ড: ২
১৪. হিযকিল, অধ্যায়: ৩৭, আয়াত: ১-১৪
📄 আল্লাহর পুত্র বিশ্বাস করা
ইতোপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, যখন বুখতেনাস্সার বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করে ফেলে এবং বনি ইসরাইলের পুরুষ, মহিলা ও শিশুদেরকে ভেড়ার পালের মতো হাকিয়ে নিয়ে চলে যায়, তখন সে তাওরাতের সবগুলো অনুলিপিকেও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলো। এ সময় বনি ইসরাইলিদের কাছে যেভাবে তাওরাতের কোনো অনুলিপি ছিলো না, তেমনি আদ্যোপান্ত তাওরাত মুখস্থকারী কোনো হাফেযও ছিলো না। যার কারণে তারা যখন বাবেলে বন্দি ছিলো, তখন তারা তাওরাত থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিলো। দীর্ঘদিন পর যখন তারা বন্দিদশা থেকে মুক্তি পায় এবং বাইতুল মুকাদ্দাসে এসে দ্বিতীয়বার থিতু হয় তখন তাদেরকে এ চিন্তা পেয়ে বসে যে, এখন তাওরাত কীভাবে পাওয়া যাবে? তখন হযরত উযায়ের আ. সকল ইসরাইলিকে একত্র করে তাদের সামনে আদ্যোপান্ত তাওরাত পাঠ করেন এবং লিখিয়ে দেন।
কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় পাওয়া যায়, যেসময় তিনি ইসরাইলিদের একত্র করেন তখন সবার উপস্থিতিতে আকাশ থেকে দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নেমে আসে এবং হযরত উযায়ের আ.-এর বুকের ভেতর প্রবিষ্ট হয়। তখন হযরত উযায়ের বনি ইসরাইলকে নতুন করে আদ্যোপান্ত তাওরাত সংকলন করে প্রদান করেন। যখন তিনি এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করেন তখন ইসরাইলিরা প্রচণ্ড উল্লাস প্রকাশ করেছিলো। তাদের মনে তখন হযরত উযায়ের আ.-এর সম্মান ও মর্যাদা পূর্বাপেক্ষা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ১০ তাদের সেই ভালোবাসা ধীরে ধীরে এতটাই গোমরাহির আকার ধারণ করে যে, খ্রিস্টানরা যেভাবে হযরত ঈসা আ.-কে আল্লাহর ছেলে স্বীকার করে থাকে, অনুরূপ তারাও হযরত উযায়ের আ.-কে আল্লাহর ছেলে দাবি করতে শুরু করে। বনি ইসরাইলের একটি গোষ্ঠী তাদের সেই বিশ্বাসের পেছনে এ দলিল দিয়েছে যে, মুসা আ. যখন আমাদেরকে তাওরাত এনে দেন তখন সেটি একটি কাষ্ঠফলকে লেখা ছিলো। কিন্তু উযায়ের আ. কোনো ধরনের কাষ্ঠফলক বা তক্তা বা লিখিত কাগজ ছাড়াই প্রতিটি অক্ষর তার বক্ষের ভেতরের কাঠফলক থেকে আমাদের সামনে নকল করে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর বৎস ছিলেন; বলেই এটি করতে পেরেছেন। নাউযুবিল্লাহ। মহান আল্লাহ এর থেকে পবিত্র। এটি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
টিকাঃ
১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৪৫
১০. প্রাগুক্ত: ২/৪৬
📄 একটি সংশয়ের উত্তর
ইহুদিরা হযরত উযায়েরকে আল্লাহর বৎস দাবি করে, পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত ঘোষণার ওপর বর্তমান সময়ের কতিপয় ইহুদি আলেম আপত্তি পেশ করে। তারা বলে, আমরা তো উযায়েরকে আল্লাহর বৎস মানি না। কাজেই কুরআনের এই ঘোষণা ভুল। আসল কথা হলো, সত্যকে গোপন করা ও মিথ্যার চাদরে নিজেকে আবৃত করে উপস্থাপন করা ইহুদিদের চিরকালীন অভ্যাস। বর্তমানের ইহুদি পণ্ডিতরাও এর ব্যত্যয় ঘটায় নি। তাদের উল্লিখিত আপত্তিও সেই সত্যকে গোপন করার ভিত্তিমূলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেসব লোক পৃথিবীর প্রচলিত ধর্মসমূহের ওপর গবেষণা করেছেন, যারা বিভিন্ন ইসলামি দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং যাদের পড়াশুনা রয়েছে; তাদের প্রত্যেকেই জানেন যে, আজও ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদিদের সেই উপদলের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে, যারা হযরত উযায়েরকে আল্লাহর ছেলে বিশ্বাস করে থাকে। তারা রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের মতো তার মূর্তি বানিয়ে তাকে ঈশ্বরের মতো পূজা দিয়ে থাকে।