📄 ইতিহাস কী বলে?
কারণ হলো, যখন পবিত্র কুরআন সেই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেনি এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিসও বর্ণিত নেই, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈন থেকে যেসব বাণী বর্ণিত রয়েছে, সেগুলোর উৎসও হলো ওই সকল রেওয়ায়েত, যা ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ, কা'ব আহবার ও হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম রা. প্রমুখ থেকে প্রাপ্ত; যেগুলো তাঁরা নকল করেছেন ইসরাইলি সাহিত্য থেকে তখন উল্লিখিত ঘটনা সম্পর্কিত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার একটাই পথ বাকি থেকে যায়। তা হলো, আমাদেরকে তাওরাতসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক উৎসের আলোকে এর সমাধান বের করতে হবে। উল্লিখিত বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে যখন আমরা তাওরাতের সবগুলো সহিফা ও ঐতিহাসিক বিবরণসমূহের ওপর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তখন নিম্নের বৃত্তান্ত আমাদের সামনে এসে পড়ে:
বনি ইসরাইলের অবাধ্যতা ও অনৈতিকতা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, অত্যাচার ও পাপাচারের হাট জমে ওঠে তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওই সময়ের নবী হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর ওপর ওহি আসে যে, আপনি বনি ইসরাইলে ঘোষণা করে দিন, তোমরা তোমাদের এই বদকাজ ছেড়ে দাও, নয়তো বিগত জাতিসমূহের মতো তোমাদেরকেও ধ্বংস করা হবে। হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. যখন আল্লাহর ওই বার্তা বনি ইসরাইলের কাছে পেশ করেন, তখন তারা এতে কর্ণপাতই করলো না। তাদের পাপাচারের মাত্রা যেনো পূর্বাপেক্ষা আরো বৃদ্ধি পেলো। তারা আল্লাহর এই মহান নবীর সঙ্গে কৌতুক শুরু করে দিলো এবং এক পর্যায়ে তাঁকে কারাগারে বন্দি করলো। এমতবস্থায়ও হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. তাদের জানালেন, তোমরা বাবেলের রাজার হাতে ধ্বংস হবে। সে তোমাদের গলায় বেড়ি পড়িয়ে তোমাদেরকে বাবেলে নিয়ে যাবে। সে জেরুজালেমকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে।⁷
তখন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় চলছে। বাবেলে বনু কাদানযার (বুখতেনাস্সার) আত্মপ্রকাশ করেছে। সে তার প্রবল রাজপ্রতাপ ও শক্তি ব্যবহার করে ইতোমধ্যে আশপাশের সবগুলো রাজত্বকে ধূলিসাৎ করে ফেলেছিলো। এর অল্প কয়েক দিনের মধ্যে সে ফিলিস্তিনের ওপর উপর্যুপরি তিনবার আক্রমণ করে বনি ইসরাইলকে পরাজিত করে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের সমস্ত এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফেলে। সমস্ত বনি ইসরাইলিকে বন্দি করে পশুপালের মতো হাঁকিয়ে বাবেলে নিয়ে যায়। তাওরাতের সবগুলো কপিকে ধ্বংস করে ফেলে। এ সময় বনি ইসরাইলির কাছে একটি কপিও অবশিষ্ট ছিলো না। যখন বুখতেনাস্সার ইসরাইলিদেরকে গোলাম বানাচ্ছিলো তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বললো, এদের কারাগারে ইয়ারমিয়াহ নামের জনৈক বন্দি রয়েছে। সে আপনার আক্রমণের পূর্বে এসব কিছু ঘটবে বলে বনি ইসরাইলকে অনেক আগেই ভীতি প্রদর্শন করেছিলো। কিন্তু তার জাতি তার কথায় কান না দিয়ে তাকে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। বুখতেনাস্সার এ কথা শোনার পর হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-কে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে এলো এবং তাঁর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বললো। সে তখন তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আলাপন শুনে অনুরোধ করলো, আপনি আমাদের সঙ্গে বাবেল চলুন, আমরা সেখানে আপনাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে রাখবো। হযরত ইয়ারমিয়াহ বললেন, আমার স্বজাতি যখন এতটা অপমানের সঙ্গে বাবেল যাচ্ছে, তাদের বিপরীতে আমি এই শ্রদ্ধার জীবন গ্রহণ করতে পারি না। আমাকে আমার বর্তমান অবস্থার ওপর ছেড়ে দিন। তখন তিনি জেরুজালেম থেকে অনেক দূরের একটি নির্জন জঙ্গলের একাকিত্বের জীবন বরণ করে নেন। ইয়ারমিয়াহ নবীর পুস্তিকায় রয়েছে, সেখানে বসেই তিনি বাবেলের ইসরাইলিদের কাছে এই ভবিষ্যদ্বাণী লিখিত আকারে প্রেরণ করেন যে, এই লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার সঙ্গে বনি ইসরাইলি বাবেল নগরীতে ৭০ বছর দাসত্ব করবে। এরপর তারা পুনরায় নিজের মাতৃভূমিতে এসে বাস করবে।⁸
বুখতেনাস্সার মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার অনেক দিন পর যখন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সনে পারস্যের সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট [কায়খসরু/খোরাস] বাবেলের রাজা বেলশাযার-কে পরাজিত করে পারস্যকে তার বর্ণনাতীত অত্যাচার থেকে মুক্তি দান করেন। সেসময় তিনি ইসরাইলিদেরকেও আযাদ করে দেন। তাদেরকে নতুন করে জেরুজালেম ও উপসনাগৃহ নির্মাণ করার অনুমতি প্রদান করেন।
সাইরাস বাবেল জয় করার পর প্রায় দশ বছর জীবিত থাকেন। এ সময় বনি ইসরাইলিরা আযাদ হয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যেমনটি আযরার পুস্তিকা থেকে জানা যায়, সাইরাসের জীবদ্দশায় সেই নির্মাণ কাজ তারা শেষ করতে পারে নি। এসময় কতিপয় কর্মকর্তা তাদের ওপর এমন নিপীড়ন করে যে, যার কারণে দুই বার ইসরাইলিদেরকে তার নির্মাণকাজ কিছু দিনের জন্য স্থগিত রাখতে হয়েছিলো। সাইরাসের পর দারা, দারার পর ইরদুশিরের যুগে তারা সেই নির্মাণকাজ পূর্ণ করতে সমর্থ হয়। ফলে জেরুজালেম তথা বাইতুল মুকাদ্দাস তার হারানো সৌন্দর্য পূর্বের চেয়ে কয়েক গুণ বর্ধিত আকারে ফিরে পায়।
উল্লিখিত আলোচনার সারাংশ হলো, বুখতেনাস্সার কর্তৃক জেরুজালেম ধ্বংস করা এবং সাইরাস থেকে শুরু করে ইরদুশিরের যুগ পর্যন্ত দ্বিতীয়বার সেটির পূর্ণরূপে আবাদ হওয়ার মাঝখানে যে দীর্ঘ মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়েছে এটাই সেই বিরতি যাতে ইয়ারমিয়াহ আ.-এর সঙ্গে সেই ঘটনা ঘটেছিলো। যার বিবরণ সুরা বাকারায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আলামত ও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যখন ইয়ারমিয়াহ আ. বুখতেনাস্সারের সঙ্গে বাবেল যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ঘাবড়ে গিয়ে দূরবর্তী জঙ্গলের নির্জন জীবন বরণ করেছিলেন তখন মহান আল্লাহ তাঁকে ওহির মাধ্যমে নির্দেশ করলেন, আপনি সেই ধ্বংসস্তূপে ফিরে গিয়ে বাস করতে শুরু করুন। আজ যদিও সেটি বনি ইসরাইলিদের অপকর্মের কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে; কিন্তু সর্বযুগেই এটি নবীদের পদভারে মুখরিত ছিলো। এটিকে আমি দ্বিতীয়বার আবাদ করবো। হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. যখন আল্লাহর নির্দেশে সেখানে পৌঁছন এবং দৃষ্টির সম্মুখে সেখানকার ধ্বংসস্তূপের প্রাণহীন চিত্র ভেসে ওঠে তখন প্রচণ্ড আফসোস, বিস্ময়, আশ্চর্য ও ভাবনা সহকারে তাঁর মনের ভেতর অথবা মুখের ওপর এ কথা চলে আসে যে, এখন এমন কী জীবনস্পন্দন সৃষ্টি হবে, যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ এই মৃত জনবসতিকে দ্বিতীয়বার জীবন দান করবেন? তখন সেই ঘটনাগুলো একে একে ঘটতে থাকে, যার বিবরণ কুরআনে এসেছে। এখানে এ কথা বলা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না যে, উল্লিখিত ঘটনায় মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা ও কর্মনিপুণতা কাজ করেছে। তা হলো, যেহেতু মহান আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, সহসা জেরুজালেম আবাদ হবে না। সেখানে জীবনের চাঞ্চল্য ফিরে আসতে প্রচুর সময় লাগবে। এখন যদি হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. তাঁর স্বজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই বিরানভূমিতে নিঃসঙ্গ পড়ে থাকেন, তাহলে তা হবে তার জন্য অসহনীয় কষ্ট। যে কারণে মহান আল্লাহর রহমত তাঁর সেই বিস্ময়সূচক প্রশ্নকে বাহানা বানিয়ে সেই দীর্ঘ সময়ের জন্য তাঁকে মৃত্যুর কোলে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এরপর তাকে ঠিক তখন জাগিয়ে দেয়, যখন জেরুজালেম পূর্বের মতো প্রাণচাঞ্চল্যে উচ্ছল কর্মমুখর জীবন ফিরে পায়।
হযরত ইয়ারমিয়াহ আ. সম্ভবত দেড়শো বছর হায়াত পেয়েছিলেন। তাতে ঘটনাবহুল অনেক সময়ও রয়েছে। সেই যুগের স্বাভাবিক বয়সের বিচারে এই দীর্ঘ জীবন আশ্চর্যের কিছু নয়।
উল্লিখিত অভিমতের সমর্থন পাওয়া যায় হযরত য়াসইয়াহ আ.-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী থেকে, যা তিনি দেড়শো বছর পূর্বে বনি ইসরাইলিদের মুক্তিদাতা সাইরাস সম্পর্কে ব্যক্ত করেছিলেন।¹¹ কারণ হলো, য়াসইয়াহ নবীর ইন্তিকালের অব্যবহিত পরে হযরত ইয়ারমিয়াহ নবী আবির্ভূত হন। কাজেই বনি ইসরাইলিদের মুক্তির মধ্যবর্তী সময়ের ব্যাপারটি তার সঙ্গেই ঘটার সম্ভাবনা রাখে। এর বিপরীতে হযরত উযায়ের আ.-এর পবিত্র জীবন সম্পর্কে যে বিবরণ তাওরাতসহ অন্যান্য ইসরাইলি বর্ণনায় পাওয়া যায় সেগুলো থেকে জানা যায় যে, বাবেলের বন্দিত্বের সময় তিনি ছোট ছিলেন। এ সময় তিনি ইসরাইলিদের সঙ্গে বাবেলেই থেকেছেন। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি 'ফকিহ' স্বীকৃতি পেয়ে যান। সেখানেই তিনি নবুয়ত লাভ করেন। যারা জেরুজালেমের পুনর্নির্মাণকাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিলো, তাদের বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বেই বনি ইসরাইলের প্রতিনিধিদল দারা ও ইরদুশিরের রাজদরবারে চেষ্টা চালিয়েছিলো। তাওরাত ধ্বংস হওয়ার পর জেরুজালেমে তাওরাতের যে নতুন সংস্করণ রচিত হয়েছিলো, তা ছিলো সেই হযরত উযায়ের আ.- এর নবুওতের ফসল।
মোটকথা, বনি ইসরাইলিদের বাবেলের বন্দিদশা থেকে শুরু করে মুক্তিলাভ এবং বাইতুল মুকাদ্দাস পুনর্নির্মাণ ও জেরুজালেম আবাদকরণ পর্যন্ত এই বিশাল সময়কালে হযরত উযায়ের আ.-কে বনি ইসরাইলিদের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
এগুলোই হচ্ছে সেই সাক্ষ্য ও আলামত, যার ওপর ভিত্তি করে মুফাসসিরগণের প্রবল মতকে আমরা দুর্বল এবং তাদের দুর্বল মন্তব্য করা মতটিকে প্রবল ও প্রণিধানযোগ্য বলার সাহস পাচ্ছি। তবে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মহান আল্লাহই ভালো জানেন।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে কে উদ্দেশ্য, সে সম্পর্কে আমরা দুটি অভিমত উল্লেখ করলাম। এগুলোর বাইরে আরো কিছু অভিমত রয়েছে। যেমন, হযরত হিযকিল আ. অথবা বনি ইসরাইলের কোনো এক অজ্ঞাত ব্যক্তি।¹²
টিকাঃ
৭. ইয়ারমিয়াহ নবির পুস্তিকা
৮. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ : ৩৮-৩৯: তারিখে ইবনে খলদুন, ইনসাইক্লোপিডিয়া
*. তাফসিরে ইবনে কাসির ১/৩১ ও তারিখে ইবনে কাসির: ২/৪৪
*. তারিখে ইবনে কাসির: ২/৪২-৪৬
*. ইয়ারমিয়াহ পুস্তিকা, অধ্যায় ৯, আয়াত: ১০
১০. আযরা, অধ্যায়: ৭, আয়াত: ১১
১১. অধ্যায়: ৪, আয়াত: ২৮
📄 ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা
সুরা কাহাফের তাফসিরি ফায়দাসমূহ লেখার সময় মাওলানা আযাদ এক স্থানে সুরা বাকারার উল্লিখিত ঘটনাকে হযরত হিযকিল আ.-এর কাশফ অভিহিত করেছেন। যা হিযকিল নবীর পুস্তিকার সঙ্গে প্রায় মিলে যায়।¹³ তার কথাগুলো চরম বিস্ময় সৃষ্টি করছে। হয়রান না হয়ে পারা যায় না। যখন পবিত্র কুরআন উল্লিখিত ঘটনাটিকে পরিষ্কার ও স্পষ্ট ভাষায় জনৈক ব্যক্তির ঘটনা বলে উল্লেখ করে বলেছে যে, মহান আল্লাহ তাকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মৃত্যুর কোলে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন, এরপর তাকে পুনর্জীবন দান করে সেই মৃত্যুর মেয়াদকাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, আর তিনি তার সঠিক উত্তর দিতে সমর্থ হলেন না, তখন নিজেই তার সঠিক উত্তর জানিয়ে দিলেন এবং তৎসংশ্লিষ্ট সকল সাক্ষ্য প্রত্যক্ষ করিয়ে দিলেন। তাহলে কিভাবে মাওলানা আযাদ হযরত হিযকিল আ.-এর কাশফকে এই ঘটনার তাফসির বা ব্যাখ্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন?
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَانْظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهُ وَانْظُرْ إِلَى حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِرُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লক্ষ করুন, একজন সম্মানিত ব্যক্তি এমন এক ধ্বংসস্তূপ ও অনাবাদ জনবসতি পার হচ্ছেন যা একসময় জীবনচাঞ্চল্যে উদ্দীপ্ত জনপদ ছিলো।
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا তিনি জনবসতির চিত্র দেখলেন আর মনে মনে ভাবলেন কিংবা মুখে বলে ফেললেন, কীকরে এই মৃত জনবসতি পুনর্জীবন পাবে? قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا
করলেন এবং একশো বছর পর্যন্ত ওই অবস্থায় রেখে দিয়ে দ্বিতীয়বার জীবিত করলেন। فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ জীবন দান করার পর সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো, তুমি এখানে কত দিন পড়ে ছিলে? সম্মানিত লোকটি উত্তর করলেন, এক দিন বা দিনের কিয়দাংশ। قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ যেহেতু উত্তরটি ভুল ছিলো, এ কারণে আল্লাহ তাআলা সংশোধন করে অবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে বলেন, না, বরং তুমি একশো বছর পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে ছিলে। قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ এরপর তিনি তাঁর শক্তিময় কুদরতের চিত্র প্রত্যক্ষ করিয়ে দিলেন যে, একদিকে এই দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যসামগ্রীর সব কিছু টাটকা ও সতেজ রয়েছে। মৌসুমের পালাবদল তাতে কোনো আঁচড় ফেলতে পারে নি। অন্যদিকে তার বাহন গাদাটির গোটা দেহ পচে-গলে নিঃশেষ হয়ে গুটিকয়েক হাড্ডির একটি কাঠামো পড়ে আছে। فَانْظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهُ এরপর বললেন, আমি এতসব কাজ করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে আমি পৃথিবীর মানুষদের কাছে আমার কুদরতে কামেলার একটি 'নিদর্শন' বানাতে চাই। وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ উল্লিখিত আলাপনের পর সেই সম্মানিত ব্যক্তিকে দেখিয়ে দেন যে, কীভাবে হাড্ডিগুলো পরস্পরে সংযুক্ত হলো, কী করে তার ওপর গোশতের প্রলেপ পড়লো, কীভাবে তা চামড়ার আবরণে ঢাকা পড়লো। এরপর গাধাটি জীবিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا এগুলো দেখে স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করার পর যখন সেই মহান সম্মানিত ব্যক্তি ইলমুল ইয়াকিন [দৃঢ়বিশ্বাসমূলক জ্ঞান] থেকে আইনুল ইয়াকিন [দিব্যজ্ঞান]-এ উন্নীত হলেন, তখন তিনি অকপটে স্বীকার করলেন, নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর কুদরতে কামেলার জন্য এসব জীবনোপকরণ ও কার্যকারণের প্রয়োজন নেই। তিনি যেভাবে ইচ্ছে কোনো বিঘ্ন ছাড়াই করে ফেলার ক্ষমতা রাখেন। তাঁর কাজে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে-
فَلَمَّا تَبَيَّnَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 'যখন তা তার নিকট স্পষ্ট হলো তখন সে বলে উঠলো, আমি জানি যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।'
এই পরিষ্কার ও স্বচ্ছ অর্থবিশিষ্ট আয়াতসমূহের ওপর দ্বিতীয়বার লক্ষ্য করুন আর ভাবুন, পবিত্র কুরআন উল্লিখিত ঘটনাকে একটি বাস্তব ঘটনার আকার দিয়ে বর্ণনা করেছে না-কি রূপক অর্থে একটি 'কাশফ' আকারে পেশ করেছে? তাহলে বলুন, হযরত হিযকিল আ.-এর কাশফ আর উল্লিখিত আয়াতসমূহে উল্লিখিত ঘটনার মাঝখানে সাযুজ্য থাকার কারণে দুটিকে এক ও অভিন্ন বলা কীকরে সহিহ হতে পারে? না, কখনই তা সহিহ হতে পারে না। নিঃসন্দেহে মাওলানা আযাদের উল্লিখিত ব্যাখ্যা বাতিল।
তবে এ কথা বলা সহিহ হতে পারে যে, যদি হযরত ইয়ারমিয়াহ আ.-এর জীবনে উল্লিখিত ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে তার কাছাকাছি একটি ঘটনা হযরত হিযকিল আ.-এরও কাশফ হতে পারে। যেটি তাওরাতের হিযকিল নবীর পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। যে কাশফে তিনি বনি ইসরাইলের শুকিয়ে যাওয়া হাড্ডিকে দ্বিতীয়বার জীবিত হতে দেখেছিলেন। মহান আল্লাহ তখন তাকে জানান, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বনি ইসরাইলিরা এখন নিরাশ হয়ে আছে যে, ওই ধ্বংসযজ্ঞের পর আমরা কখনো জেরুজালেমে দ্বিতীয়বার আবাদ হতে পারবো না। আমি তোমার মাধ্যমে ওদেরকে খবরদার করতে চাইছি যে, আল্লাহর ফয়সালা হলো, অবশ্যই তা ঘটবে। ¹⁴
টিকাঃ
১২. তাফসিরে ইবনে কাসির: ১/৩১৪
১৩. তাফসিরে তরজমানুল কুরআন, খণ্ড: ২
১৪. হিযকিল, অধ্যায়: ৩৭, আয়াত: ১-১৪
📄 আল্লাহর পুত্র বিশ্বাস করা
ইতোপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, যখন বুখতেনাস্সার বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করে ফেলে এবং বনি ইসরাইলের পুরুষ, মহিলা ও শিশুদেরকে ভেড়ার পালের মতো হাকিয়ে নিয়ে চলে যায়, তখন সে তাওরাতের সবগুলো অনুলিপিকেও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলো। এ সময় বনি ইসরাইলিদের কাছে যেভাবে তাওরাতের কোনো অনুলিপি ছিলো না, তেমনি আদ্যোপান্ত তাওরাত মুখস্থকারী কোনো হাফেযও ছিলো না। যার কারণে তারা যখন বাবেলে বন্দি ছিলো, তখন তারা তাওরাত থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিলো। দীর্ঘদিন পর যখন তারা বন্দিদশা থেকে মুক্তি পায় এবং বাইতুল মুকাদ্দাসে এসে দ্বিতীয়বার থিতু হয় তখন তাদেরকে এ চিন্তা পেয়ে বসে যে, এখন তাওরাত কীভাবে পাওয়া যাবে? তখন হযরত উযায়ের আ. সকল ইসরাইলিকে একত্র করে তাদের সামনে আদ্যোপান্ত তাওরাত পাঠ করেন এবং লিখিয়ে দেন।
কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় পাওয়া যায়, যেসময় তিনি ইসরাইলিদের একত্র করেন তখন সবার উপস্থিতিতে আকাশ থেকে দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নেমে আসে এবং হযরত উযায়ের আ.-এর বুকের ভেতর প্রবিষ্ট হয়। তখন হযরত উযায়ের বনি ইসরাইলকে নতুন করে আদ্যোপান্ত তাওরাত সংকলন করে প্রদান করেন। যখন তিনি এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করেন তখন ইসরাইলিরা প্রচণ্ড উল্লাস প্রকাশ করেছিলো। তাদের মনে তখন হযরত উযায়ের আ.-এর সম্মান ও মর্যাদা পূর্বাপেক্ষা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ১০ তাদের সেই ভালোবাসা ধীরে ধীরে এতটাই গোমরাহির আকার ধারণ করে যে, খ্রিস্টানরা যেভাবে হযরত ঈসা আ.-কে আল্লাহর ছেলে স্বীকার করে থাকে, অনুরূপ তারাও হযরত উযায়ের আ.-কে আল্লাহর ছেলে দাবি করতে শুরু করে। বনি ইসরাইলের একটি গোষ্ঠী তাদের সেই বিশ্বাসের পেছনে এ দলিল দিয়েছে যে, মুসা আ. যখন আমাদেরকে তাওরাত এনে দেন তখন সেটি একটি কাষ্ঠফলকে লেখা ছিলো। কিন্তু উযায়ের আ. কোনো ধরনের কাষ্ঠফলক বা তক্তা বা লিখিত কাগজ ছাড়াই প্রতিটি অক্ষর তার বক্ষের ভেতরের কাঠফলক থেকে আমাদের সামনে নকল করে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর বৎস ছিলেন; বলেই এটি করতে পেরেছেন। নাউযুবিল্লাহ। মহান আল্লাহ এর থেকে পবিত্র। এটি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
টিকাঃ
১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৪৫
১০. প্রাগুক্ত: ২/৪৬
📄 একটি সংশয়ের উত্তর
ইহুদিরা হযরত উযায়েরকে আল্লাহর বৎস দাবি করে, পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত ঘোষণার ওপর বর্তমান সময়ের কতিপয় ইহুদি আলেম আপত্তি পেশ করে। তারা বলে, আমরা তো উযায়েরকে আল্লাহর বৎস মানি না। কাজেই কুরআনের এই ঘোষণা ভুল। আসল কথা হলো, সত্যকে গোপন করা ও মিথ্যার চাদরে নিজেকে আবৃত করে উপস্থাপন করা ইহুদিদের চিরকালীন অভ্যাস। বর্তমানের ইহুদি পণ্ডিতরাও এর ব্যত্যয় ঘটায় নি। তাদের উল্লিখিত আপত্তিও সেই সত্যকে গোপন করার ভিত্তিমূলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেসব লোক পৃথিবীর প্রচলিত ধর্মসমূহের ওপর গবেষণা করেছেন, যারা বিভিন্ন ইসলামি দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং যাদের পড়াশুনা রয়েছে; তাদের প্রত্যেকেই জানেন যে, আজও ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদিদের সেই উপদলের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে, যারা হযরত উযায়েরকে আল্লাহর ছেলে বিশ্বাস করে থাকে। তারা রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের মতো তার মূর্তি বানিয়ে তাকে ঈশ্বরের মতো পূজা দিয়ে থাকে।