📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সমালোচনা ও নিরীক্ষণ

📄 সমালোচনা ও নিরীক্ষণ


মুজাহিদ রহ.-এর এই রেওয়ায়েত সনদের বিচারে আপত্তিকর এবং প্রমাণ হিসেবেও গ্রহণযোগ্য নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আবু মুসা আশআরি রা. হতে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেটিও মুনকাতে এবং সনদের বিচারে আপত্তিকর। কাজেই এগুলোকে আমরা একটি গল্পের অতিরিক্ত আর কিছু বলতে পারবো না। কারণ, পবিত্র কুরআন হযরত যুলকিফল আ.-এর পূর্ণ বৃত্তান্ত ও বিবরণ না দিলেও তাঁকে ইতিহাসের মহান নবী-রাসুলদের তালিকায় গণ্য করেছে। কাজেই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও হযরত আবু মুসা আশআরি রা.-এর মতো উঁচু মাপের সাহাবি এবং হযরত মুজাহিদ রহ.-এর মতো একজন শীর্ষস্থানীয় তাবেঈ থেকে এটা আশা করা যায় না যে, তাঁরা তার সম্পর্কে এ কথা বলবেন যে, তিনি নবী ছিলেন না। বরং একজন নেককার লোক ছিলেন। যেমনটি এই তিন বুযুর্গ থেকে ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন।
হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. বলেন, হযরত যুলকিফল আ. ছিলেন হযরত আইয়ুব আ.-এর পুত্র। তিনি আল্লাহর ওয়াস্তে জনৈক ব্যক্তির হয়ে জামানত নিয়েছিলেন। যার দণ্ড হিসেবে তাঁকে কয়েক বছর কয়েদি থাকার কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিলো। তিনি লিখেছেন, জনশ্রুতি রয়েছে, হযরত যুলকিফল ছিলেন আইয়ুব আ.-এর ছেলে। জনৈক ব্যক্তির জামিন হওয়ার কারণে তাকে কয়েক বছর বন্দি থাকতে হয়েছিলো। শুধু আল্লাহর দিকে তাকিয়ে তিনি এই ত্যাগটুকু স্বীকার করেছিলেন।³
আমাদের সমকালীন কয়েকজন মুফাসসিরের অভিমত হলো, যুলকিফল হযরত হিযকিল আ.-এর উপাধি। সমকালীন আরেক বুদ্ধিজীবী এক ধাপ এগিয়ে বিস্ময়কর মন্তব্য করে বলেছেন, যুলকিফল গৌতম বুদ্ধের উপাধি। কেননা, তার রাজধানীর নাম হচ্ছে, ক্যাপল। আরবিতে যার উচ্চারণ দাঁড়ায়, ক্লিফল। আর ৩১ শব্দের অর্থ হলো, মালিক। যেভাবে সম্পদশালীর জন্য ذو المال এবং কোনো নগরীর জমিদারের জন্য ذو بلد শব্দের ব্যবহার প্রচুর। এখানেও ক্যাপল নগরীর অধিপতি ও জমিদারকে 'যুলকিফল' বলা হয়েছে। সমকালীন এই বুদ্ধিজীবী এ দাবিও করেছেন যে, গৌতম বুদ্ধের আসল শিক্ষা ছিলো এক আল্লাহর তাওহিদ ও বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষা। অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে সংমিশ্রণের ফলে তার ধর্ম আসল রূপ হারিয়ে বিকৃত হয়ে বর্তমানের কাঠামোতে নেমে এসেছে।
তাঁর এই অভিমত অনুমানভিত্তিক; ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর কোনো তাৎপর্য নেই।
আমাদের মধ্যে কোনো ধরনের হঠকারিতা নেই। বাস্তবেই যদি বিশুদ্ধ ইতিহাসের আলোকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, পবিত্র কুরআন যেসকল নবীর শুধু নাম উল্লেখ করেছে, তার প্রতিপাদ্য হলো অমুক অমুক ব্যক্তি। তাহলে 'ইতোপূর্বে কোনো ব্যক্তি কেনো এ কথা বলে নি, কাজেই তা মানবো না'; এ কথা বলে আমরা সেই ইতিহাসের আলোকে প্রমাণিত কথা প্রত্যাখ্যান করবো না। নিঃসন্দেহে আমরা এ বাস্তবতাকে স্বীকার করি যে, ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধানের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় নি। প্রত্যেহ নিত্যনতুন তথ্য উদ্‌ঘাটিত হয়ে সম্মুখে আসছে। নতুন নতুন অনেক তথ্য-উপাত্ত আবিষ্কৃত হচ্ছে। বরং এর মাধ্যমে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে রাসুলে যেসব ঘটনার বর্ণনা এসেছে, নতুন আবিস্কারের মাধ্যমে আজ তার সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে। অথচ এতদিন নাস্তিকরা এই অজুহাতে সেগুলো অস্বীকার করে যাচ্ছিলো যে, 'প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহাসিক দর্শনে সেগুলোর উল্লেখ নেই'। কাজেই পবিত্র কুরআনে আলোচিত কোনো ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যদি আধুনিক আবিস্কারের মাধ্যমে অতিরিক্ত কোনো তথ্য উদ্‌ঘাটিত হয় তাহলে আমরা তা কিছুতেই অস্বীকার করবো না। বরং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এটিকে সংযোজিত দলিল হিসেবে পেশ করবো। কিন্তু উল্লিখিত বাস্তবতাকে স্বীকার করার অর্থ এ নয় যে, কোনো ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নিজের কল্পিত ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে বিনা প্রমাণে একটি দাবি করে বসবে, আর আমাদেরকে তা মেনে নিতে হবে। হযরত যুলকিফলকে গৌতম বুদ্ধ মন্তব্য করা এখন পর্যন্ত ওই অবস্থান থেকে অধিক কোনো তাৎপর্য রাখে না।
দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মহান আল্লাহ যেসকল নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, তাদের ওপর ঈমান আনার জন্য পবিত্র কুরআনের এই তিনটি দফাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। যে তিন দফা হলো সত্য ধর্ম ইসলামের স্বকীয় প্রতীক।
১. وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ : এমন কোনো জাতি অতিবাহিত হয় নি, যাদের মধ্যে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ভীতি প্রদর্শনকারী আগমন করে নি।
২. مِنْهُمْ مَنْ قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُمْ مَنْ لَمْ نَقْصُصْ عَلَيْكَ : নবীদের মধ্য হতে আমি তোমাকে কারো (নাম নিয়ে) আলোচনা শুনিয়েছি। আর কারো ঘটনা তোমাকে শোনাই নি।
৩. لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ : ( কাজেই একজন মুমিনের বিশ্বাস হতে হবে) আমরা আল্লাহর নবীদের মধ্য হতে কোনো নবীর ক্ষেত্রে ফারাক করি না। অর্থাৎ তাদের সবার ওপর ঈমান রাখি।
এই পরিষ্কার ও স্বচ্ছ আকিদার পর যদি আমাদের সামনে কোনো দেশ ও কোনো অঞ্চলের নবী-রাসুলদের ঘটনা নাও আসে, তাহলে তার কারণ যাই হোক না কেনো, উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত তথ্যই তাদের ওপর আমাদের ঈমান আনার জন্য যথেষ্ট। আমাদের মূল লক্ষ্য অর্থাৎ হেদায়েতের জন্য, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য, নেক কাজ করার জন্য তাঁদের পূর্ণ বিবরণ জানাটা আবশ্যক নয়। বিশেষ করে, যখন মহান আল্লাহ আমাদের সামনে এই সত্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘খতামুন নাবিয়্যিন’ তথা সর্বশেষ নবী। আমরা সকল সত্য ধর্মের বিশুদ্ধ ও প্রকৃত শিক্ষাকে স্বীকার করি। সেই শিক্ষা উন্নতি করে ইসলাম নামক পূর্ণতার স্তরে আরোহণ করেছে। কুরআনের ভাষায়-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।’ [সুরা মায়েদা: আয়াত ৩]
মোটকথা, আমরা স্বীকার করি, ভারতবর্ষেও আল্লাহর সত্য নবী ও মহান পয়গম্বর প্রেরিত হয়েছেন। এমনকি সিরাতের বর্ণনার ভাষ্য অনুযায়ী আদিপিতা হযরত আদম আ. ভূস্বর্গীয় এই ভারতের কোনো এক প্রান্তে অবতরণ করেছিলেন। কিন্তু যতক্ষণ কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট ঘোষণা অথবা ইতিহাসের কোনো বিশুদ্ধ দলিল-উপাত্তের আলোকে এ কথা প্রমাণিত না হবে যে, যুলকিফল হলো গৌতমবুদ্ধের উপাধি, ততক্ষণ নিরেট ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে সেটাকে আমরা স্বীকার করতে পারি না। কেননা, একজন নবীকে নবী বলে স্বীকার না করা যেভাবে কুফরি একজন অ-নবীকে নবী বলে স্বীকার করাও অনুরূপ কুফরি।

টিকাঃ
৩. তাফসিরে মূদেহুল কুরআন, সুরা আম্বিয়া

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 একটি ভুল সংশোধন

📄 একটি ভুল সংশোধন


ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. তাঁর মুসনাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে একটি রেওয়ায়েত নকল করেছেন। তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার ইরশাদ করেছেন, বনি ইসরাইলে কিফল নামে এক ব্যক্তি ছিলো। লোকটি ছিলো চরম ফাসেক ও পাপাচারী। এক বার তার কাছে একজন সুন্দরী মহিলা এলো। কিফল তাকে ষাট স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে যিনা করতে রাজি করিয়ে ফেললো। কিন্তু লোকটি সেই সুন্দরী নারীর সঙ্গে পাপকাজ করতে উদ্যত হতেই নারীর গোটা দেহে কম্পন শুরু হয়ে গেলো। দু-চোখের জল ফেলে সে কাঁদতে লাগলো। কিফল তাকে জিজ্ঞেস করলো, কেনো তুমি কাঁদছো? তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো? নারী উত্তর করলো, তা নয়। আসল কথা হলো, আমি আমার গোটা জীবনে কখনো এই বদকাজ করি নি। কিন্তু আজ প্রয়োজন ও পেটের ক্ষুধায় বাধ্য হয়ে নিজের সতীত্ব জলাঞ্জলি দিচ্ছি। সেই বেদনাদায়ক চিন্তা আমাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। যার কারণে আমি কাঁদতে বাধ্য হয়েছি। কিফল কথাটি শুনতেই তৎক্ষণাৎ তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো এবং বললো, যে বদকাজ তুমি কখনো করো নি, আজ শুধু পেটের দায়ে করতে বাধ্য হয়েছো, সেই কাজ তোমাকে করতে হবে না। যাও পূর্ণ সতীত্ব ও পবিত্রতাসহ ঘরে ফিরে যাও। এই স্বর্ণমুদ্রারও তুমি মালিক। নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করো। কিফল আরো বললো, আল্লাহর কসম, আজ এ মুহূর্ত থেকে কিফল আর আল্লাহর নাফরমানি করবে না। ঘটনাচক্রে সে রাতেই কিফলের মৃত্যু হলো। সকালে লোকেরা দেখতে পেলো যে, তার ঘরের দুয়ারে একটি অদৃশ্য হাত এ সুসংবাদ লিখে দিয়েছে, 'কিফলকে নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন'।
উল্লিখিত বর্ণনায় শুধু কিফল এসেছে। যুলকিফল আসে নি। তিনি হযরত যুলকিফল নন; অন্যকোনো ব্যক্তি হবেন। কাজেই এই ভুল বুঝার সুযোগ নেই যে, এটি বোধ হয় হযরত যুলকিফলের ঘটনা।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও উপদেশ

📄 শিক্ষা ও উপদেশ


১। ইসলামই এমন একটি ধর্ম যেখানে তার সত্য আহ্বানের বুনিয়াদ হলো, দেশ, জাতীয়তা, বংশীয় আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে উঠে এ স্বীকারোক্তি দিতে হবে যে, সত্যের আহ্বান তার বুনিয়াদের ক্ষেত্রে কোনো সীমারেখা ও সাম্প্রদায়িকার মুখাপেক্ষী নয়। এক্ষেত্রে সে কোনো গোষ্ঠীর ইজারাদারি মেনে নেয় না। কারণ হলো, মহান আল্লাহর সত্তা যেমন একক ও অদ্বিতীয়, তেমনি সন্দেহাতীতভাবে তার সত্যের পয়গামও একটাই হতে হবে। এবং প্রকৃতপক্ষেও সেটা এক। তার সত্য বার্তা অনাদিকাল থেকে আজ অবধি সাদা-কালো, আরব-অনারব, এশিয়ান-ইউরোপিয়ান-আমেরিকান-আফ্রিকান অর্থাৎ সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে, যে-কোনো বৈষম্য ও অন্যায্যতার শৃঙ্খল ডিঙিয়ে সবার জন্য সমান প্রযোজ্য।
তবে প্রতিটি যুগের অবস্থা ও পরিবেশ, সময়ের চাহিদা ও কালের আবেদন, উপরন্তু বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর বিকাশ ও উন্নতি এবং তাদের চৈন্তিক ও ব্যবহারিক যোগ্যতার প্রেক্ষাপটে তাতে এই বৈচিত্র অবশ্যই রয়েছে -এবং তা থাকাও উচিত যে, তার মৌলিক বুনিয়াদ ও ভিত্তিমূলে কোনো আঁচড় না ফেলে সেই সত্য বার্তার শাখা-প্রশাখা ও আনুষঙ্গিক বিষয়াবলি ভিন্ন হবে। উদ্দেশ্য হলো, যেনো তার অনুসারীর আত্মিক বিকাশ উন্নতির শিখর স্পর্শ করে। এভাবে মানবিক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপলব্ধি শীর্ষদেশে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
কাজেই দীনি ও রুহানি পরিভাষায় সত্যের পয়গামের সেই অপরিবর্তনশীল সত্যকেই 'দীন' বলা হয়। মহান আল্লাহ যার শিরোনাম দিয়েছেন, ইসলাম। ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ 'নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন।' [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৯]
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ 'আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য দীন গ্রহণ করতে চাইবে, তার সে চাওয়া কখনই কবুল করা হবে না।' [সুরা আলে ইমরান: ৮৬]
هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ 'তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন 'মুসলিম'।' [সুরা হজ: ৭৮]
উল্লিখিত সত্য বার্তার সেই পরিবর্তনশীল অবস্থা এবং সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অবতারিত তার শাখা-প্রশাখা ও আনুষঙ্গিক বিষয়াবলির নামই হলো, শরিয়ত। যার সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শরিয়ত ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি। [সুরা মায়েদা: ৪৮]
আর রূহানি ও দীনি উন্নতি ও ক্রমবিকাশ এবং প্রচার ও প্রসারের পূর্ণতাকে 'দীনের পূর্ণাঙ্গতা' ও 'অনুগ্রহের সম্পূর্ণতা' নামকরণ করা হয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করছেন-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا 'আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।' (সুরা মায়েদা: আয়াত ৩]
কাজেই আলোচনার সারাংশ হলো, হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ পর্যন্ত সকল নবী-রাসুলের দীন তথা খোদার দেয়া বার্তা সর্বযুগে সর্বসময়ে এক ও অভিন্ন ছিলো। যার নাম, ইসলাম। অবশ্য নবী-রাসুলগণের জন্য তাঁদের আপন আপন সময়ে আল্লাহরই পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন আহকাম দেয়া হয়েছিলো। যাকে 'শরিয়ত' ও 'মানহাজ' বলা হয়ে থাকে। যখন আধ্যাত্মিকতার পূর্ণ উন্নতি ঘটে এবং দীনি চিন্তা ও চেতনা পূর্ণতার শীর্ষশিখরে উন্নীত হয় তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে সেসকল শরিয়তগুলোকে মুহাম্মদি শরিয়তের ভেতর একীভূত করে ফেলা হয়। এই মুহাম্মদি শরিয়তকে স্থান, কাল ও পাত্রের সীমাবদ্ধতার উপরে তুলে গোটা জগৎও সৃষ্টিজীবের ওপর প্রবর্তন করা হয়। ইরশাদ হয়েছে— وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ 'আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।' [সুরা সাবা: আয়াত ২৮]
এ কারণে ইসলামি শিক্ষার অন্যতম উজ্জ্বলতম দিক হলো, তার ওই ঘোষণা যে, দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি জাতির কাছে আল্লাহর সত্য সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী সত্যের বার্তা নিয়ে আগমন করেছেন। কাজেই প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের কর্তব্য হলো, সে এ আকিদা পোষণ করবে যে, আমরা আল্লাহর নবীদের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলতে ইচ্ছুক নই। একে জায়েযও মনে করি না। যেভাবে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর ঈমান রাখি, অনুরূপ আল্লাহর অন্য সকল নবীর ওপরও ঈমান রাখি। তাঁদের নাম, ঠিকানা, অবস্থান ও বিবরণ জানা বা না-জানা কোনোরূপ তফাত ফেলে না।
২। মনে হচ্ছে, হযরত যুলকিফল আ. বনি ইসরাইলি নবী ছিলেন। পবিত্র কুরআনে বনি ইসরাইলিদের ইতিহাস ও ঘটনাবলি এজন্যই উল্লেখ করা হয়েছে, যেনো আমরা সেখান থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করি। হয়তো হযরত যুলকিফলের সময়ে দীনের তাবলিগ ও হেদায়েত সংশ্লিষ্ট অথবা শিক্ষা ও উপদেশমূলক বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটে নি। যার কারণে পবিত্র কুরআন তার শুধু নাম তুলে ধরাকেই যথেষ্ট মনে করেছে, অতিরিক্ত কোনো বিবরণ বা বৃত্তান্ত জানানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করে নি। আমরা আমাদের বক্ষ্যমাণ গ্রন্থ কাসাসুল কুরআনের একাধিক স্থানে এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছি যে, পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের ঘটনাবলি ও বিবরণ বয়ান করার দ্বারা পবিত্র কুরআনের উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হলো, এর মাধ্যমে হেদায়েত গ্রহণের ধারাবাহিকতায় শিক্ষা ও নসিহত গ্রহণের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করা। নয়তো ‘ইতিহাস’ কুরআনের আলোচ্য বিষয় বা লক্ষ্য; কোনোটিই নয়। এ কারণে কুরআন ইরশাদ করেছে—
كَذَلِكَ نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ مَا قَدْ سَبَقَ وَقَدْ آتَيْنَاكَ مِنْ لَدُنَا ذِكْرًا
‘পূর্বে যা ঘটেছে তার সংবাদ আমি এভাবে তোমার নিকট বিবৃত করি এবং আমি আমার নিকট হতে তোমাকে দান করেছি উপদেশ।’ [সুরা ত্ব-হা : আয়াত ৯৯]
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
‘তাদের বৃত্তান্তে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা।’ [সুরা ইউসুফ : আয়াত ১১১]
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَدَارُ الْآخِرَةِ خَيْرٌ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا أَفَلَا تَعْقِلُونَ
‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে নি এবং তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিলো তা কি দেখেনি? যারা মুত্তাকি তাদের জন্য পরলোকই শ্রেয়; তোমরা কি বুঝো না? [সুরা ইউসুফ : আয়াত ১০৯]
وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ وَجَاءَكَ فِي هَذِهِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَذِكْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ
রাসুলদের ওই সকল বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বর্ণনা করেছি, যদ্দ্বারা আমি তোমার চিত্তকে দৃঢ় করি, এর মাধ্যমে তোমার নিকট এসেছে সত্য এবং মুমিনদের জন্য এসেছে উপদেশ ও সাবধানবাণী। [সুরা হুদ : আয়াত ১২০]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00