📄 নবীদের মর্যাদা ও ফযিলত
আলোচনার এ পর্যায়ে একটি বিষয়ের সমাধান পেশ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। তা হলো, দ্বিতীয় হাদিসে হযরত মুসা আ.-এর ফযিলত সম্পর্কে নবীজি যে বিবরণ দিয়েছেন এবং لا تفضلوا بين الأنبياء বলে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের মাঝখানে প্রাধান্য দানের ব্যাপারটিকে যেভাবে নাকচ করেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন ওঠে যে, তাহলে বিষয়টির সমাধান কী?
আমাদের আলোচনা এভাবেও বুঝতে পারেন যে, একদিকে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ । যেখানে মহান আল্লাহ নিজেই নবী-রাসুলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিন্যাস থাকার কথা বলেছেন। তিনি নিজেই তাদের কতককে কতকের ওপর ফযিলত দিয়েছেন। এর সঙ্গে সঙ্গে একটি হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন , أنا سيد ولد آدم ولا فخر অর্থাৎ কোনো ধরনের গর্ব ও বড়াই ছাড়াই বলছি, আমি সকল আদমসন্তানের সর্দার। অন্যদিকে তিনি এই হাদিসে বলেছেন, لا تفضلوا بين الأنبياء [তোমরা নবীদের মধ্যে কে উত্তম ও কার চেয়ে উত্তম সেই স্তরবিন্যাস করতে যেয়ো না]। আরো বলছেন, لا يقولن أحدكم أنا خير من يونس بن متى [তোমাদের কেউ কখনও যেনো না বলে যে, আমি (নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইউনুস বিন মাত্তা থেকে উত্তম]। পবিত্র কুরআনের আয়াত ও বর্ণিত হাদিসসমূহের মধ্যে কীভাবে সামাঞ্জস্য দেয়া হবে?
এই বিষয়ের সমাধানে মুহাদ্দিসিনে কেরাম ও হাদিসের ব্যাখ্যাকারকদের থেকে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। যেমন, উভয় বিষয়বস্তুর মধ্যে এভাবে সামাঞ্জস্য বিধান করা হয়েছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হাদিসে নবীদের পরস্পরে কিংবা খোদ তাঁকে অন্যকোনো নবীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করেছেন, এটি তাঁর সেই সময়কার ঘোষণা যখন সুরা বাকারার উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় নি। সেসময় হয়তো তিনি সমস্ত নবীর ফযিলত, বিশেষকরে সমগ্র নবীর ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে অবহিত ছিলেন না।
এ উত্তর নিতান্তই দুর্বল। বরং প্রত্যাখ্যাত। কারণ হলো, ইহুদির সেই ঘটনা বা হযরত ইউনুস আ.-এর ফযিলত সম্পর্কিত সেই রেওয়ায়েতসমূহ মাদানী জীবনের শেষ বছরের ঘোষণা। ইতোপূর্বে নবীদের পারস্পরিক ফযিলত দানের অনেকগুলো খোদ নবীজি থেকেই বর্ণিত রয়েছে।
দ্বিতীয় সমাধান হলো, যদিও উল্লিখিত রেওয়ায়েতসমূহের কয়েকটি সনদে নবীদের পারস্পরিক ফযিলত দান সম্পর্কে সাধারণ বাক্য বর্ণিত রয়েছে যে, لا تفضلوا بين الأنبياء [নবীদের একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ো না]। কিন্তু প্রকৃত বিচারে উল্লিখিত হাদিসের মূল লক্ষ্য হলো, খোদ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই। যেমনটি ইহুদি লোকটির ঘটনা ও হযরত ইউনুস আ. সম্পর্কিত রেওয়ায়েত থেকে স্পষ্ট হয়। কাজেই সারকথা হলো, যদিও নবীজি জানেন যে, মহান আল্লাহ তাঁকে সমস্ত আদম-সন্তানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি নিষেধ করেছেন।
এই উত্তরটিও শক্তিশালী নয়। কারণ হলো, যখন নবীজি উল্লিখিত বাক্যে বিষয়টিকে সমস্ত নবীর ক্ষেত্রে সামগ্রিক আকারে উল্লেখ করেছেন তখন সেটিকে কোনো প্রকার দলিল ছাড়া ব্যক্তি নবীর সঙ্গে বিশেষায়িত করার কোনো অর্থ হয় না।
তৃতীয় সমাধান হলো, যেসকল রেওয়ায়েতে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা নাকচ করা হয়েছে সেখানে মূলত খোদ নবুওতের শ্রেষ্ঠত্ব উদ্দেশ্য। নয়তো বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির বিচারে কারো ওপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হওয়াকে অস্বীকার করা হয় নি। যেমনটি সুরা বাকারায় বলা হয়েছে যে, মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলাে لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُسُلِهِ [আমরা কোনো নবী-রাসুলের মধ্যে বিভেদ করি না]। আমরা এমন করি না যে, আল্লাহর সত্যবাদী নবীদের মধ্য হতে একজনকে মানি আর অন্যদের মানি না।
এই সমাধান হৃদয়গ্রাহী হতো, যদি নবীজির উল্লিখিত ইরশাদ এমন কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে হতো, যেখানে কোনো সত্য নবিকে মানা-না-মানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ইহুদির সেই ঘটনাটির মাঝে খোদ নবুয়ত নিয়ে বিতর্ক ওঠে নি, বরং তাদের মাঝে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত মুসা আ.-এর মাঝে কে কার চেয়ে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে তর্ক হয়েছে।
কাজেই উল্লিখিত বিষয়টির সর্বোত্তম সমাধান হলো, নিঃসন্দেহে নবী-রাসুলদের মাঝে ফযিলতের স্তরগত তারতম্য রয়েছে। তাদের মাঝে একজনের অপরজন হতে এগিয়ে থাকাটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত নবী-রাসুলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কাজেই যে রেওয়ায়েতের মাঝে নবীজি আম্বিয়ায়ে কেরামের পরস্পরে শ্রেষ্ঠত্বের ধারাক্রম টানতে নিষেধ করেছেন, তার ব্যাখ্যা হলো, কোনো নবীর ওপর অন্য নবীকে এমনভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া, যার ফলে সেই অন্য নবীকে খাটো করা হয়, এটা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কোনো নবীর প্রতি ভালোবাসার আতিশয্যে অপরাপর আম্বিয়াদের তুলনায় তাঁর এমন প্রশংসা করা উচিত হবে না, যার পরিণতিতে অন্য নবীর উচ্চ মর্যাদাকে খাটো করা হয়ে যায়। উপরন্তু ব্যাপারটি যদি তর্ক-বিতর্কের দিকে মোড় নেয় তাহলে এ জাতীয় স্থানে ফযিলত নিয়ে আলোচনা করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। কেননা, এ সময় যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও বক্তা অপরাগ হয়ে অন্য নবী সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলে ফেলতে পারে, যা সেই নবীর মর্যাদায় হানিকর হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যার পরিণতিতে ঈমানের স্থলে কুফরি আবশ্যক হয়ে যাবে। যে ঘটনায় নবীজি আম্বিয়ায়ে কেরামের পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তুলনা করতে নিষেধ করেছেন, সেখানে ওই জাতীয় একটি বিতর্ক ঘটেছিলো। কাজেই একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, মহান আল্লাহ নবীগণের মাঝে বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে স্তরগত তারতম্য সৃষ্টি করেছেন। যার সম্পর্কে তিনি নিজেই ইরশাদ করেছেন, تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ | এটি কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়।
উল্লিখিত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে হাফেয ইবনে হাজার রহ. যে আলোচনা পেশ করেছেন, তা খুবই সুখপাঠ্য। তিনি লিখেছেন-
قال العلماء في نهيه صلى الله عليه وسلم عن التفضيل بين الأنبياء إنما نهى عن ذلك من يقوله برأيه لا من يقوله بدليل أو من يقوله بحيث يؤدي إلى تنقيص المفضول أو يؤدي إلى الخصومة والتنازع أو المراد لا تفضلوا بجميع أنواع الفضائل بحيث لا يترك للمفضول فضيلة فالإمام مثلا إذا قلنا إنه أفضل من المؤذن لا يستلزم نقص فضيلة المؤذن بالنسبة إلى الأذان وقيل النهي عن التفضيل إنما هو في حق النبوة نفسها كقوله تعالى { لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ } ولم ينه عن تفضيل بعض الذوات على بعض لقوله { تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ }
وقال الحليمي الأخبار الواردة في النهي عن التخيير إنما هي في مجادلة أهل الكتاب وتفضيل بعض الأنبياء على بعض بالمخايرة لأن المخايرة إذا وقعت بين أهل دينين لا يؤمن أن يخرج أحدهما إلى الإزدراء بالآخر فيفضي إلى الكفر فأما إذا كان التخيير مستندا إلى مقابلة الفضائل لتحصيل الرجحان فلا يدخل في النهي - فتح الباري : ٦/٦
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত দান করতে নিষেধ করেছেন। যার প্রেক্ষিতে উলামায়ে কেরাম এ সম্পর্কে বলেন, নিজস্ব অভিমত আবিষ্কার করে তার ভিত্তিতে ফযিলত প্রদান নিষিদ্ধ। এমন ফযিলত নিষিদ্ধ নয়, যা শরয়ি দলিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অথবা এমনভাবে ফযিলত দেওয়া নিষিদ্ধ, যা ব্যক্ত করার কারণে যে নবীর ওপর ফযিলত দেয়া হচ্ছে, তার মর্যাদা খাটো করা হয়। অথবা কোনো বিতর্ক ও বিবাদ উস্কে দেওয়া হয়। অথবা সেই ফযিলত নিষিদ্ধ, যার কারণে কোনো এক নবীর ক্ষেত্রে এমনভাবে সমুদয় ফযিলত একত্র করা হয়, ফলে এ কথা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, অন্য নবীর কোনো ফযিলত-ই নেই। পক্ষান্তরে এমনভাবে ফযিলত দেওয়া - যেমন কেউ বললো, মুয়াযযিনের চেয়ে ইমাম শ্রেষ্ঠ। এর দ্বারা মুয়াযযিনের মর্যাদা খাটো করা হয়নি- এভাবে ফযিলত দেওয়া জায়েয।
একটি দুর্বল অভিমতে পাওয়া যায় যে, উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞার অর্থ হলো, খোদ নবুওতের ক্ষেত্রে একজনকে অপরের ওপর প্রাধান্য দিয়ো না। যেমনটি পবিত্র কুরআন ইরশাদ করেছে- لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ এর বিপরীতে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোনো সম্মানিত নবীকে অন্য কারো ওপর প্রাধান্য দেওয়া নিষিদ্ধ নয়; যেমনটি নিম্নের আয়াতে মহান আল্লাহ নিজেই ইরশাদ করেছেন- تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ
হালিমি বলেন, যেসব হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত দেয়াকে নিষেধ করেছেন, তার সম্পর্ক বিশেষ ক্ষেত্রের সঙ্গে। তা হলো, যেখানে আহলে কিতাবদের সঙ্গে নবীদের ফযিলত দেয়া নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে অথবা, যেমন, মুসলমান ও খ্রিস্টান নিজের নবীকে অন্যের নবীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিচ্ছে। কেননা, এ জাতীয় অবস্থায় যখন দুই ধর্মের মাঝখানে বিতর্ক উঠে পড়ে তখন এমন কথার লাগাম টেনে ধরা মুশকিল হয়ে যায়, যে কথাটি অন্য ধর্মের নবীর মর্যাদায় অবমাননাকর হয়। এমনকি সেটি কুফরিকে পর্যন্ত আবশ্যক করে তোলে। [কারণ, সব ধর্মের সকল সত্য নবীকে নিজের নবী মনে করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয]। এর বিপরীতে যদি এটাই উদ্দেশ্য হয় যে, নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত আলোচনা করার কারণে একজনের ওপর অন্যজনের প্রকৃত প্রাধান্য প্রমাণিত করা হবে, তাহলে এটি নিষিদ্ধ নয়।'¹
টিকাঃ
১. বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া
১. ফাতহুল বারি ৬/৬
আলোচনার এ পর্যায়ে একটি বিষয়ের সমাধান পেশ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। তা হলো, দ্বিতীয় হাদিসে হযরত মুসা আ.-এর ফযিলত সম্পর্কে নবীজি যে বিবরণ দিয়েছেন এবং لا تفضلوا بين الأنبياء বলে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের মাঝখানে প্রাধান্য দানের ব্যাপারটিকে যেভাবে নাকচ করেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন ওঠে যে, তাহলে বিষয়টির সমাধান কী?
আমাদের আলোচনা এভাবেও বুঝতে পারেন যে, একদিকে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ । যেখানে মহান আল্লাহ নিজেই নবী-রাসুলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিন্যাস থাকার কথা বলেছেন। তিনি নিজেই তাদের কতককে কতকের ওপর ফযিলত দিয়েছেন। এর সঙ্গে সঙ্গে একটি হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন , أنا سيد ولد آدم ولا فخر অর্থাৎ কোনো ধরনের গর্ব ও বড়াই ছাড়াই বলছি, আমি সকল আদমসন্তানের সর্দার। অন্যদিকে তিনি এই হাদিসে বলেছেন, لا تفضلوا بين الأنبياء [তোমরা নবীদের মধ্যে কে উত্তম ও কার চেয়ে উত্তম সেই স্তরবিন্যাস করতে যেয়ো না]। আরো বলছেন, لا يقولن أحدكم أنا خير من يونس بن متى [তোমাদের কেউ কখনও যেনো না বলে যে, আমি (নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইউনুস বিন মাত্তা থেকে উত্তম]। পবিত্র কুরআনের আয়াত ও বর্ণিত হাদিসসমূহের মধ্যে কীভাবে সামাঞ্জস্য দেয়া হবে?
এই বিষয়ের সমাধানে মুহাদ্দিসিনে কেরাম ও হাদিসের ব্যাখ্যাকারকদের থেকে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। যেমন, উভয় বিষয়বস্তুর মধ্যে এভাবে সামাঞ্জস্য বিধান করা হয়েছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হাদিসে নবীদের পরস্পরে কিংবা খোদ তাঁকে অন্যকোনো নবীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করেছেন, এটি তাঁর সেই সময়কার ঘোষণা যখন সুরা বাকারার উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় নি। সেসময় হয়তো তিনি সমস্ত নবীর ফযিলত, বিশেষকরে সমগ্র নবীর ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে অবহিত ছিলেন না।
এ উত্তর নিতান্তই দুর্বল। বরং প্রত্যাখ্যাত। কারণ হলো, ইহুদির সেই ঘটনা বা হযরত ইউনুস আ.-এর ফযিলত সম্পর্কিত সেই রেওয়ায়েতসমূহ মাদানী জীবনের শেষ বছরের ঘোষণা। ইতোপূর্বে নবীদের পারস্পরিক ফযিলত দানের অনেকগুলো খোদ নবীজি থেকেই বর্ণিত রয়েছে।
দ্বিতীয় সমাধান হলো, যদিও উল্লিখিত রেওয়ায়েতসমূহের কয়েকটি সনদে নবীদের পারস্পরিক ফযিলত দান সম্পর্কে সাধারণ বাক্য বর্ণিত রয়েছে যে, لا تفضلوا بين الأنبياء [নবীদের একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ো না]। কিন্তু প্রকৃত বিচারে উল্লিখিত হাদিসের মূল লক্ষ্য হলো, খোদ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই। যেমনটি ইহুদি লোকটির ঘটনা ও হযরত ইউনুস আ. সম্পর্কিত রেওয়ায়েত থেকে স্পষ্ট হয়। কাজেই সারকথা হলো, যদিও নবীজি জানেন যে, মহান আল্লাহ তাঁকে সমস্ত আদম-সন্তানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি নিষেধ করেছেন।
এই উত্তরটিও শক্তিশালী নয়। কারণ হলো, যখন নবীজি উল্লিখিত বাক্যে বিষয়টিকে সমস্ত নবীর ক্ষেত্রে সামগ্রিক আকারে উল্লেখ করেছেন তখন সেটিকে কোনো প্রকার দলিল ছাড়া ব্যক্তি নবীর সঙ্গে বিশেষায়িত করার কোনো অর্থ হয় না।
তৃতীয় সমাধান হলো, যেসকল রেওয়ায়েতে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা নাকচ করা হয়েছে সেখানে মূলত খোদ নবুওতের শ্রেষ্ঠত্ব উদ্দেশ্য। নয়তো বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির বিচারে কারো ওপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হওয়াকে অস্বীকার করা হয় নি। যেমনটি সুরা বাকারায় বলা হয়েছে যে, মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলাে لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُسُلِهِ [আমরা কোনো নবী-রাসুলের মধ্যে বিভেদ করি না]। আমরা এমন করি না যে, আল্লাহর সত্যবাদী নবীদের মধ্য হতে একজনকে মানি আর অন্যদের মানি না।
এই সমাধান হৃদয়গ্রাহী হতো, যদি নবীজির উল্লিখিত ইরশাদ এমন কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে হতো, যেখানে কোনো সত্য নবিকে মানা-না-মানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ইহুদির সেই ঘটনাটির মাঝে খোদ নবুয়ত নিয়ে বিতর্ক ওঠে নি, বরং তাদের মাঝে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত মুসা আ.-এর মাঝে কে কার চেয়ে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে তর্ক হয়েছে।
কাজেই উল্লিখিত বিষয়টির সর্বোত্তম সমাধান হলো, নিঃসন্দেহে নবী-রাসুলদের মাঝে ফযিলতের স্তরগত তারতম্য রয়েছে। তাদের মাঝে একজনের অপরজন হতে এগিয়ে থাকাটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত নবী-রাসুলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কাজেই যে রেওয়ায়েতের মাঝে নবীজি আম্বিয়ায়ে কেরামের পরস্পরে শ্রেষ্ঠত্বের ধারাক্রম টানতে নিষেধ করেছেন, তার ব্যাখ্যা হলো, কোনো নবীর ওপর অন্য নবীকে এমনভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া, যার ফলে সেই অন্য নবীকে খাটো করা হয়, এটা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কোনো নবীর প্রতি ভালোবাসার আতিশয্যে অপরাপর আম্বিয়াদের তুলনায় তাঁর এমন প্রশংসা করা উচিত হবে না, যার পরিণতিতে অন্য নবীর উচ্চ মর্যাদাকে খাটো করা হয়ে যায়। উপরন্তু ব্যাপারটি যদি তর্ক-বিতর্কের দিকে মোড় নেয় তাহলে এ জাতীয় স্থানে ফযিলত নিয়ে আলোচনা করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। কেননা, এ সময় যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও বক্তা অপরাগ হয়ে অন্য নবী সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলে ফেলতে পারে, যা সেই নবীর মর্যাদায় হানিকর হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যার পরিণতিতে ঈমানের স্থলে কুফরি আবশ্যক হয়ে যাবে। যে ঘটনায় নবীজি আম্বিয়ায়ে কেরামের পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তুলনা করতে নিষেধ করেছেন, সেখানে ওই জাতীয় একটি বিতর্ক ঘটেছিলো। কাজেই একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, মহান আল্লাহ নবীগণের মাঝে বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে স্তরগত তারতম্য সৃষ্টি করেছেন। যার সম্পর্কে তিনি নিজেই ইরশাদ করেছেন, تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ | এটি কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়।
উল্লিখিত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে হাফেয ইবনে হাজার রহ. যে আলোচনা পেশ করেছেন, তা খুবই সুখপাঠ্য। তিনি লিখেছেন-
قال العلماء في نهيه صلى الله عليه وسلم عن التفضيل بين الأنبياء إنما نهى عن ذلك من يقوله برأيه لا من يقوله بدليل أو من يقوله بحيث يؤدي إلى تنقيص المفضول أو يؤدي إلى الخصومة والتنازع أو المراد لا تفضلوا بجميع أنواع الفضائل بحيث لا يترك للمفضول فضيلة فالإمام مثلا إذا قلنا إنه أفضل من المؤذن لا يستلزم نقص فضيلة المؤذن بالنسبة إلى الأذان وقيل النهي عن التفضيل إنما هو في حق النبوة نفسها كقوله تعالى { لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ } ولم ينه عن تفضيل بعض الذوات على بعض لقوله { تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ }
وقال الحليمي الأخبار الواردة في النهي عن التخيير إنما هي في مجادلة أهل الكتاب وتفضيل بعض الأنبياء على بعض بالمخايرة لأن المخايرة إذا وقعت بين أهل دينين لا يؤمن أن يخرج أحدهما إلى الإزدراء بالآخر فيفضي إلى الكفر فأما إذا كان التخيير مستندا إلى مقابلة الفضائل لتحصيل الرجحان فلا يدخل في النهي - فتح الباري : ٦/٦
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত দান করতে নিষেধ করেছেন। যার প্রেক্ষিতে উলামায়ে কেরাম এ সম্পর্কে বলেন, নিজস্ব অভিমত আবিষ্কার করে তার ভিত্তিতে ফযিলত প্রদান নিষিদ্ধ। এমন ফযিলত নিষিদ্ধ নয়, যা শরয়ি দলিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অথবা এমনভাবে ফযিলত দেওয়া নিষিদ্ধ, যা ব্যক্ত করার কারণে যে নবীর ওপর ফযিলত দেয়া হচ্ছে, তার মর্যাদা খাটো করা হয়। অথবা কোনো বিতর্ক ও বিবাদ উস্কে দেওয়া হয়। অথবা সেই ফযিলত নিষিদ্ধ, যার কারণে কোনো এক নবীর ক্ষেত্রে এমনভাবে সমুদয় ফযিলত একত্র করা হয়, ফলে এ কথা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, অন্য নবীর কোনো ফযিলত-ই নেই। পক্ষান্তরে এমনভাবে ফযিলত দেওয়া - যেমন কেউ বললো, মুয়াযযিনের চেয়ে ইমাম শ্রেষ্ঠ। এর দ্বারা মুয়াযযিনের মর্যাদা খাটো করা হয়নি- এভাবে ফযিলত দেওয়া জায়েয।
একটি দুর্বল অভিমতে পাওয়া যায় যে, উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞার অর্থ হলো, খোদ নবুওতের ক্ষেত্রে একজনকে অপরের ওপর প্রাধান্য দিয়ো না। যেমনটি পবিত্র কুরআন ইরশাদ করেছে- لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ এর বিপরীতে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোনো সম্মানিত নবীকে অন্য কারো ওপর প্রাধান্য দেওয়া নিষিদ্ধ নয়; যেমনটি নিম্নের আয়াতে মহান আল্লাহ নিজেই ইরশাদ করেছেন- تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ
হালিমি বলেন, যেসব হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত দেয়াকে নিষেধ করেছেন, তার সম্পর্ক বিশেষ ক্ষেত্রের সঙ্গে। তা হলো, যেখানে আহলে কিতাবদের সঙ্গে নবীদের ফযিলত দেয়া নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে অথবা, যেমন, মুসলমান ও খ্রিস্টান নিজের নবীকে অন্যের নবীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিচ্ছে। কেননা, এ জাতীয় অবস্থায় যখন দুই ধর্মের মাঝখানে বিতর্ক উঠে পড়ে তখন এমন কথার লাগাম টেনে ধরা মুশকিল হয়ে যায়, যে কথাটি অন্য ধর্মের নবীর মর্যাদায় অবমাননাকর হয়। এমনকি সেটি কুফরিকে পর্যন্ত আবশ্যক করে তোলে। [কারণ, সব ধর্মের সকল সত্য নবীকে নিজের নবী মনে করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয]। এর বিপরীতে যদি এটাই উদ্দেশ্য হয় যে, নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত আলোচনা করার কারণে একজনের ওপর অন্যজনের প্রকৃত প্রাধান্য প্রমাণিত করা হবে, তাহলে এটি নিষিদ্ধ নয়।'¹
টিকাঃ
১. বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া
১. ফাতহুল বারি ৬/৬
আলোচনার এ পর্যায়ে একটি বিষয়ের সমাধান পেশ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। তা হলো, দ্বিতীয় হাদিসে হযরত মুসা আ.-এর ফযিলত সম্পর্কে নবীজি যে বিবরণ দিয়েছেন এবং لا تفضلوا بين الأنبياء বলে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের মাঝখানে প্রাধান্য দানের ব্যাপারটিকে যেভাবে নাকচ করেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন ওঠে যে, তাহলে বিষয়টির সমাধান কী?
আমাদের আলোচনা এভাবেও বুঝতে পারেন যে, একদিকে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ । যেখানে মহান আল্লাহ নিজেই নবী-রাসুলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিন্যাস থাকার কথা বলেছেন। তিনি নিজেই তাদের কতককে কতকের ওপর ফযিলত দিয়েছেন। এর সঙ্গে সঙ্গে একটি হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন , أنا سيد ولد آدم ولا فخر অর্থাৎ কোনো ধরনের গর্ব ও বড়াই ছাড়াই বলছি, আমি সকল আদমসন্তানের সর্দার। অন্যদিকে তিনি এই হাদিসে বলেছেন, لا تفضلوا بين الأنبياء [তোমরা নবীদের মধ্যে কে উত্তম ও কার চেয়ে উত্তম সেই স্তরবিন্যাস করতে যেয়ো না]। আরো বলছেন, لا يقولن أحدكم أنا خير من يونس بن متى [তোমাদের কেউ কখনও যেনো না বলে যে, আমি (নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইউনুস বিন মাত্তা থেকে উত্তম]। পবিত্র কুরআনের আয়াত ও বর্ণিত হাদিসসমূহের মধ্যে কীভাবে সামাঞ্জস্য দেয়া হবে?
এই বিষয়ের সমাধানে মুহাদ্দিসিনে কেরাম ও হাদিসের ব্যাখ্যাকারকদের থেকে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। যেমন, উভয় বিষয়বস্তুর মধ্যে এভাবে সামাঞ্জস্য বিধান করা হয়েছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে হাদিসে নবীদের পরস্পরে কিংবা খোদ তাঁকে অন্যকোনো নবীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ করেছেন, এটি তাঁর সেই সময়কার ঘোষণা যখন সুরা বাকারার উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় নি। সেসময় হয়তো তিনি সমস্ত নবীর ফযিলত, বিশেষকরে সমগ্র নবীর ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে অবহিত ছিলেন না।
এ উত্তর নিতান্তই দুর্বল। বরং প্রত্যাখ্যাত। কারণ হলো, ইহুদির সেই ঘটনা বা হযরত ইউনুস আ.-এর ফযিলত সম্পর্কিত সেই রেওয়ায়েতসমূহ মাদানী জীবনের শেষ বছরের ঘোষণা। ইতোপূর্বে নবীদের পারস্পরিক ফযিলত দানের অনেকগুলো খোদ নবীজি থেকেই বর্ণিত রয়েছে।
দ্বিতীয় সমাধান হলো, যদিও উল্লিখিত রেওয়ায়েতসমূহের কয়েকটি সনদে নবীদের পারস্পরিক ফযিলত দান সম্পর্কে সাধারণ বাক্য বর্ণিত রয়েছে যে, لا تفضلوا بين الأنبياء [নবীদের একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ো না]। কিন্তু প্রকৃত বিচারে উল্লিখিত হাদিসের মূল লক্ষ্য হলো, খোদ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই। যেমনটি ইহুদি লোকটির ঘটনা ও হযরত ইউনুস আ. সম্পর্কিত রেওয়ায়েত থেকে স্পষ্ট হয়। কাজেই সারকথা হলো, যদিও নবীজি জানেন যে, মহান আল্লাহ তাঁকে সমস্ত আদম-সন্তানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি নিষেধ করেছেন।
এই উত্তরটিও শক্তিশালী নয়। কারণ হলো, যখন নবীজি উল্লিখিত বাক্যে বিষয়টিকে সমস্ত নবীর ক্ষেত্রে সামগ্রিক আকারে উল্লেখ করেছেন তখন সেটিকে কোনো প্রকার দলিল ছাড়া ব্যক্তি নবীর সঙ্গে বিশেষায়িত করার কোনো অর্থ হয় না।
তৃতীয় সমাধান হলো, যেসকল রেওয়ায়েতে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা নাকচ করা হয়েছে সেখানে মূলত খোদ নবুওতের শ্রেষ্ঠত্ব উদ্দেশ্য। নয়তো বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির বিচারে কারো ওপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হওয়াকে অস্বীকার করা হয় নি। যেমনটি সুরা বাকারায় বলা হয়েছে যে, মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলাে لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُسُلِهِ [আমরা কোনো নবী-রাসুলের মধ্যে বিভেদ করি না]। আমরা এমন করি না যে, আল্লাহর সত্যবাদী নবীদের মধ্য হতে একজনকে মানি আর অন্যদের মানি না।
এই সমাধান হৃদয়গ্রাহী হতো, যদি নবীজির উল্লিখিত ইরশাদ এমন কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে হতো, যেখানে কোনো সত্য নবিকে মানা-না-মানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ইহুদির সেই ঘটনাটির মাঝে খোদ নবুয়ত নিয়ে বিতর্ক ওঠে নি, বরং তাদের মাঝে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত মুসা আ.-এর মাঝে কে কার চেয়ে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে তর্ক হয়েছে।
কাজেই উল্লিখিত বিষয়টির সর্বোত্তম সমাধান হলো, নিঃসন্দেহে নবী-রাসুলদের মাঝে ফযিলতের স্তরগত তারতম্য রয়েছে। তাদের মাঝে একজনের অপরজন হতে এগিয়ে থাকাটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত নবী-রাসুলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কাজেই যে রেওয়ায়েতের মাঝে নবীজি আম্বিয়ায়ে কেরামের পরস্পরে শ্রেষ্ঠত্বের ধারাক্রম টানতে নিষেধ করেছেন, তার ব্যাখ্যা হলো, কোনো নবীর ওপর অন্য নবীকে এমনভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া, যার ফলে সেই অন্য নবীকে খাটো করা হয়, এটা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কোনো নবীর প্রতি ভালোবাসার আতিশয্যে অপরাপর আম্বিয়াদের তুলনায় তাঁর এমন প্রশংসা করা উচিত হবে না, যার পরিণতিতে অন্য নবীর উচ্চ মর্যাদাকে খাটো করা হয়ে যায়। উপরন্তু ব্যাপারটি যদি তর্ক-বিতর্কের দিকে মোড় নেয় তাহলে এ জাতীয় স্থানে ফযিলত নিয়ে আলোচনা করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। কেননা, এ সময় যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও বক্তা অপরাগ হয়ে অন্য নবী সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলে ফেলতে পারে, যা সেই নবীর মর্যাদায় হানিকর হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যার পরিণতিতে ঈমানের স্থলে কুফরি আবশ্যক হয়ে যাবে। যে ঘটনায় নবীজি আম্বিয়ায়ে কেরামের পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তুলনা করতে নিষেধ করেছেন, সেখানে ওই জাতীয় একটি বিতর্ক ঘটেছিলো। কাজেই একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, মহান আল্লাহ নবীগণের মাঝে বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে স্তরগত তারতম্য সৃষ্টি করেছেন। যার সম্পর্কে তিনি নিজেই ইরশাদ করেছেন, تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ | এটি কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়।
উল্লিখিত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে হাফেয ইবনে হাজার রহ. যে আলোচনা পেশ করেছেন, তা খুবই সুখপাঠ্য। তিনি লিখেছেন-
قال العلماء في نهيه صلى الله عليه وسلم عن التفضيل بين الأنبياء إنما نهى عن ذلك من يقوله برأيه لا من يقوله بدليل أو من يقوله بحيث يؤدي إلى تنقيص المفضول أو يؤدي إلى الخصومة والتنازع أو المراد لا تفضلوا بجميع أنواع الفضائل بحيث لا يترك للمفضول فضيلة فالإمام مثلا إذا قلنا إنه أفضل من المؤذن لا يستلزم نقص فضيلة المؤذن بالنسبة إلى الأذان وقيل النهي عن التفضيل إنما هو في حق النبوة نفسها كقوله تعالى { لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ } ولم ينه عن تفضيل بعض الذوات على بعض لقوله { تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ }
وقال الحليمي الأخبار الواردة في النهي عن التخيير إنما هي في مجادلة أهل الكتاب وتفضيل بعض الأنبياء على بعض بالمخايرة لأن المخايرة إذا وقعت بين أهل دينين لا يؤمن أن يخرج أحدهما إلى الإزدراء بالآخر فيفضي إلى الكفر فأما إذا كان التخيير مستندا إلى مقابلة الفضائل لتحصيل الرجحان فلا يدخل في النهي - فتح الباري : ٦/٦
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত দান করতে নিষেধ করেছেন। যার প্রেক্ষিতে উলামায়ে কেরাম এ সম্পর্কে বলেন, নিজস্ব অভিমত আবিষ্কার করে তার ভিত্তিতে ফযিলত প্রদান নিষিদ্ধ। এমন ফযিলত নিষিদ্ধ নয়, যা শরয়ি দলিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অথবা এমনভাবে ফযিলত দেওয়া নিষিদ্ধ, যা ব্যক্ত করার কারণে যে নবীর ওপর ফযিলত দেয়া হচ্ছে, তার মর্যাদা খাটো করা হয়। অথবা কোনো বিতর্ক ও বিবাদ উস্কে দেওয়া হয়। অথবা সেই ফযিলত নিষিদ্ধ, যার কারণে কোনো এক নবীর ক্ষেত্রে এমনভাবে সমুদয় ফযিলত একত্র করা হয়, ফলে এ কথা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, অন্য নবীর কোনো ফযিলত-ই নেই। পক্ষান্তরে এমনভাবে ফযিলত দেওয়া - যেমন কেউ বললো, মুয়াযযিনের চেয়ে ইমাম শ্রেষ্ঠ। এর দ্বারা মুয়াযযিনের মর্যাদা খাটো করা হয়নি- এভাবে ফযিলত দেওয়া জায়েয।
একটি দুর্বল অভিমতে পাওয়া যায় যে, উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞার অর্থ হলো, খোদ নবুওতের ক্ষেত্রে একজনকে অপরের ওপর প্রাধান্য দিয়ো না। যেমনটি পবিত্র কুরআন ইরশাদ করেছে- لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ এর বিপরীতে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোনো সম্মানিত নবীকে অন্য কারো ওপর প্রাধান্য দেওয়া নিষিদ্ধ নয়; যেমনটি নিম্নের আয়াতে মহান আল্লাহ নিজেই ইরশাদ করেছেন- تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ
হালিমি বলেন, যেসব হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত দেয়াকে নিষেধ করেছেন, তার সম্পর্ক বিশেষ ক্ষেত্রের সঙ্গে। তা হলো, যেখানে আহলে কিতাবদের সঙ্গে নবীদের ফযিলত দেয়া নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে অথবা, যেমন, মুসলমান ও খ্রিস্টান নিজের নবীকে অন্যের নবীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিচ্ছে। কেননা, এ জাতীয় অবস্থায় যখন দুই ধর্মের মাঝখানে বিতর্ক উঠে পড়ে তখন এমন কথার লাগাম টেনে ধরা মুশকিল হয়ে যায়, যে কথাটি অন্য ধর্মের নবীর মর্যাদায় অবমাননাকর হয়। এমনকি সেটি কুফরিকে পর্যন্ত আবশ্যক করে তোলে। [কারণ, সব ধর্মের সকল সত্য নবীকে নিজের নবী মনে করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয]। এর বিপরীতে যদি এটাই উদ্দেশ্য হয় যে, নবীগণের পারস্পরিক ফযিলত আলোচনা করার কারণে একজনের ওপর অন্যজনের প্রকৃত প্রাধান্য প্রমাণিত করা হবে, তাহলে এটি নিষিদ্ধ নয়।'¹
টিকাঃ
১. বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া
১. ফাতহুল বারি ৬/৬
📄 শিক্ষা ও উপদেশ
যদি শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে হযরত ইউনুস আ.-এর জীবনী অধ্যয়ন করা হলে নিম্নের বাস্তবতাগুলো দৃষ্টির সম্মুখে ফুটে উঠবে—
১। মানবসম্প্রদায়ের হেদায়েতের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর 'চিরন্তন নীতি' হলো, যখন কোনো জাতি তাদের নবীর দাওয়াত থেকে অব্যাহতভাবে মুখ ফিরিয়ে রাখে; অত্যাচার, অনাচার ও অবিচারকে নিজেদের প্রতীক বানিয়ে ফেলে আর আল্লাহর নবী তাদের ওপর আযাব নেমে আসার সংবাদ প্রদান করেন, তখন সেই জাতির সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো তারা আযাব আসার পূর্বেই ঈমান নিয়ে আসে, ফলে আযাব থেকে বেঁচে যায়, আর না হয় ঈমান না আনার কারণে আযাবে নিপতিত হয়। যদি নবীর আযাবের সংবাদ দেয়ার পর আযাব নেমে আসার পূর্বে তারা ঈমান না আনে, তাহলে সেই আযাব থেকে তাদের রক্ষা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। হযরত নুহ, সালেহ, লুত আলাইহিমুস সালামের জাতিসহ আদ, সামুদ প্রভৃতি পূর্ববর্তী জাতি-গোষ্ঠীর বিশাল সভ্যতা, অতি উন্নত কৃষ্টি, অত্যাচারী শক্তি ও প্রতাপের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার আযাবে মুহূর্তেই পৃথিবীর বুক থেকে তাদের ধ্বংস এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
২। বিগত দিনে যত উম্মত অতিবাহিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে হযরত ইউনুস আ.-এর জাতি ভিন্ন একটি উদাহরণ দাঁড় করিয়েছে। তারা আযাব নেমে আসার পূর্বেই ঈমান এনেছে এবং তারা আল্লাহর সত্য অনুসারী ও অনুগত হওয়ার মাধ্যমে আযাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। কতই না ভালো হতো, যদি তাদের পরবর্তীকালে আগমনকারী বিভিন্ন জাতি ও প্রজন্ম হযরত ইউনুসের জাতির পদাঙ্ক অনুসরণ করে এভাবে আল্লাহর আযাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সমর্থ হতো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, তেমনটি ঘটে নি।
৩। পৃথিবীর অন্য সকল বিশেষ মানুষসহ সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মহান আল্লাহ যে আচরণ করে থাকেন, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সঙ্গে তাঁর আচরণ হয় এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এবং সেটাই হওয়া উচিত। কারণ হলো, তারা সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা ও কথা শোনার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই আল্লাহর বিধান পালন করার যে দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে তা অন্য কারো ওপর ন্যস্ত নয়। যার কারণে তাঁদের কর্তব্য হলো, তাঁরা যে কাজ-ই করবেন তা অবশ্যই আল্লাহর ওহির আলোকে হতে হবে। বিশেষ করে, দীনের প্রচার ও হকের পয়গাম সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ে আসমানি ওহির ইলমে ইয়াকিনের সঙ্গেই তাঁদের বন্ধন থাকতে হবে। যার কারণে যখন তারা কোনো কাজে দ্রুততার আশ্রয় নিয়ে ফেলেন অথবা ওহির অপেক্ষা না করে কোনো কথা বা কাজের পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন, তখন - বিষয়টি যত ক্ষুদ্রই হোক না কেনো- তাঁদেরকে মহান আল্লাহ কঠিনভাবে পাকড়াও করে থাকেন। এসময় অবস্থাচিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য আল্লাহ তাআলা এমন অভিব্যক্তি ব্যবহার করেন যে, শ্রবণকারী মনে করবে, বাস্তবেই তারা বুঝি বিশাল কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন। তবে যাই ঘটুক, সবসময়ের মতো এমন নিদারুণ মুহূর্তেও মহান আল্লাহর সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত থাকে।
আর তারাও তৎক্ষণাৎ সতর্ক হয়ে নিজের অনুতাপ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দু-হাত তুলে ধরেন। তওবা ও ইসতিগফারের আশ্রয়ে নিজেকে সমর্পণ করেন। ফলে অতি দ্রুত তারা মহান আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে যান। যা তাঁদের সম্মান ও মর্যাদাকে পূর্বাপেক্ষা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
পবিত্র কুরআনের বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপনাশৈলীর ক্ষেত্রে উল্লিখিত মৌলিক তথ্যটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না। যদি কেউ উল্লিখিত বিষয়টি না জানে তাহলে সে এ জাতীয় স্থানে মারাত্মক সংশয়ে পড়ে যাবে। সে দেখবে, একদিকে মহান আল্লাহ একজনকে নবী ও রাসুল বলে প্রশংসার অঞ্জলি ঢেলে দিচ্ছেন আর অন্যদিকে কথাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিনি বুঝি চরম কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন। যার কারণে প্রথমে সে অবশ্যই হয়রান ও কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যাবে। এরপর হয়তো সে বক্রপথে নেমে পড়বে অথবা ওয়াসওয়াসার অন্ধকার প্রান্তরে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবে। কাজেই আবশ্যক হলো, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কিত ঘটনাবলি ও সংবাদের ক্ষেত্রে উল্লিখিত মৌলিক তথ্যটি সবসময় দৃষ্টির সম্মুখে রাখতে হবে, যেনো সিরাতুল মুসতাকিম থেকে পা ফসকে না যায়।
৪. ইসলামের শিক্ষা হলো, আল্লাহর সকল সত্য নবী -তিনি যে ধর্মের-ই হোন না কেনো- তাঁর ওপর তেমনই ঈমান রাখতে হবে, যেভাবে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান রাখতে হয়। আমাদের নবী সকল নবী-রাসুলের সর্দার এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, এই বিশ্বাস রাখা সত্ত্বেও তাঁর এমনভাবে প্রশংসা করা যাবে না যার দ্বারা অন্য নবীকে হেয় ও নীচ করতে হয়। এটা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ।
যদি শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে হযরত ইউনুস আ.-এর জীবনী অধ্যয়ন করা হলে নিম্নের বাস্তবতাগুলো দৃষ্টির সম্মুখে ফুটে উঠবে—
১। মানবসম্প্রদায়ের হেদায়েতের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর 'চিরন্তন নীতি' হলো, যখন কোনো জাতি তাদের নবীর দাওয়াত থেকে অব্যাহতভাবে মুখ ফিরিয়ে রাখে; অত্যাচার, অনাচার ও অবিচারকে নিজেদের প্রতীক বানিয়ে ফেলে আর আল্লাহর নবী তাদের ওপর আযাব নেমে আসার সংবাদ প্রদান করেন, তখন সেই জাতির সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো তারা আযাব আসার পূর্বেই ঈমান নিয়ে আসে, ফলে আযাব থেকে বেঁচে যায়, আর না হয় ঈমান না আনার কারণে আযাবে নিপতিত হয়। যদি নবীর আযাবের সংবাদ দেয়ার পর আযাব নেমে আসার পূর্বে তারা ঈমান না আনে, তাহলে সেই আযাব থেকে তাদের রক্ষা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। হযরত নুহ, সালেহ, লুত আলাইহিমুস সালামের জাতিসহ আদ, সামুদ প্রভৃতি পূর্ববর্তী জাতি-গোষ্ঠীর বিশাল সভ্যতা, অতি উন্নত কৃষ্টি, অত্যাচারী শক্তি ও প্রতাপের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার আযাবে মুহূর্তেই পৃথিবীর বুক থেকে তাদের ধ্বংস এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
২। বিগত দিনে যত উম্মত অতিবাহিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে হযরত ইউনুস আ.-এর জাতি ভিন্ন একটি উদাহরণ দাঁড় করিয়েছে। তারা আযাব নেমে আসার পূর্বেই ঈমান এনেছে এবং তারা আল্লাহর সত্য অনুসারী ও অনুগত হওয়ার মাধ্যমে আযাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। কতই না ভালো হতো, যদি তাদের পরবর্তীকালে আগমনকারী বিভিন্ন জাতি ও প্রজন্ম হযরত ইউনুসের জাতির পদাঙ্ক অনুসরণ করে এভাবে আল্লাহর আযাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সমর্থ হতো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, তেমনটি ঘটে নি।
৩। পৃথিবীর অন্য সকল বিশেষ মানুষসহ সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মহান আল্লাহ যে আচরণ করে থাকেন, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সঙ্গে তাঁর আচরণ হয় এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এবং সেটাই হওয়া উচিত। কারণ হলো, তারা সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা ও কথা শোনার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই আল্লাহর বিধান পালন করার যে দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে তা অন্য কারো ওপর ন্যস্ত নয়। যার কারণে তাঁদের কর্তব্য হলো, তাঁরা যে কাজ-ই করবেন তা অবশ্যই আল্লাহর ওহির আলোকে হতে হবে। বিশেষ করে, দীনের প্রচার ও হকের পয়গাম সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ে আসমানি ওহির ইলমে ইয়াকিনের সঙ্গেই তাঁদের বন্ধন থাকতে হবে। যার কারণে যখন তারা কোনো কাজে দ্রুততার আশ্রয় নিয়ে ফেলেন অথবা ওহির অপেক্ষা না করে কোনো কথা বা কাজের পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন, তখন - বিষয়টি যত ক্ষুদ্রই হোক না কেনো- তাঁদেরকে মহান আল্লাহ কঠিনভাবে পাকড়াও করে থাকেন। এসময় অবস্থাচিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য আল্লাহ তাআলা এমন অভিব্যক্তি ব্যবহার করেন যে, শ্রবণকারী মনে করবে, বাস্তবেই তারা বুঝি বিশাল কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন। তবে যাই ঘটুক, সবসময়ের মতো এমন নিদারুণ মুহূর্তেও মহান আল্লাহর সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত থাকে।
আর তারাও তৎক্ষণাৎ সতর্ক হয়ে নিজের অনুতাপ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দু-হাত তুলে ধরেন। তওবা ও ইসতিগফারের আশ্রয়ে নিজেকে সমর্পণ করেন। ফলে অতি দ্রুত তারা মহান আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে যান। যা তাঁদের সম্মান ও মর্যাদাকে পূর্বাপেক্ষা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
পবিত্র কুরআনের বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপনাশৈলীর ক্ষেত্রে উল্লিখিত মৌলিক তথ্যটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না। যদি কেউ উল্লিখিত বিষয়টি না জানে তাহলে সে এ জাতীয় স্থানে মারাত্মক সংশয়ে পড়ে যাবে। সে দেখবে, একদিকে মহান আল্লাহ একজনকে নবী ও রাসুল বলে প্রশংসার অঞ্জলি ঢেলে দিচ্ছেন আর অন্যদিকে কথাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিনি বুঝি চরম কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন। যার কারণে প্রথমে সে অবশ্যই হয়রান ও কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যাবে। এরপর হয়তো সে বক্রপথে নেমে পড়বে অথবা ওয়াসওয়াসার অন্ধকার প্রান্তরে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবে। কাজেই আবশ্যক হলো, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কিত ঘটনাবলি ও সংবাদের ক্ষেত্রে উল্লিখিত মৌলিক তথ্যটি সবসময় দৃষ্টির সম্মুখে রাখতে হবে, যেনো সিরাতুল মুসতাকিম থেকে পা ফসকে না যায়।
৪. ইসলামের শিক্ষা হলো, আল্লাহর সকল সত্য নবী -তিনি যে ধর্মের-ই হোন না কেনো- তাঁর ওপর তেমনই ঈমান রাখতে হবে, যেভাবে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান রাখতে হয়। আমাদের নবী সকল নবী-রাসুলের সর্দার এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, এই বিশ্বাস রাখা সত্ত্বেও তাঁর এমনভাবে প্রশংসা করা যাবে না যার দ্বারা অন্য নবীকে হেয় ও নীচ করতে হয়। এটা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ।
যদি শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে হযরত ইউনুস আ.-এর জীবনী অধ্যয়ন করা হলে নিম্নের বাস্তবতাগুলো দৃষ্টির সম্মুখে ফুটে উঠবে—
১। মানবসম্প্রদায়ের হেদায়েতের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর 'চিরন্তন নীতি' হলো, যখন কোনো জাতি তাদের নবীর দাওয়াত থেকে অব্যাহতভাবে মুখ ফিরিয়ে রাখে; অত্যাচার, অনাচার ও অবিচারকে নিজেদের প্রতীক বানিয়ে ফেলে আর আল্লাহর নবী তাদের ওপর আযাব নেমে আসার সংবাদ প্রদান করেন, তখন সেই জাতির সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো তারা আযাব আসার পূর্বেই ঈমান নিয়ে আসে, ফলে আযাব থেকে বেঁচে যায়, আর না হয় ঈমান না আনার কারণে আযাবে নিপতিত হয়। যদি নবীর আযাবের সংবাদ দেয়ার পর আযাব নেমে আসার পূর্বে তারা ঈমান না আনে, তাহলে সেই আযাব থেকে তাদের রক্ষা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। হযরত নুহ, সালেহ, লুত আলাইহিমুস সালামের জাতিসহ আদ, সামুদ প্রভৃতি পূর্ববর্তী জাতি-গোষ্ঠীর বিশাল সভ্যতা, অতি উন্নত কৃষ্টি, অত্যাচারী শক্তি ও প্রতাপের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার আযাবে মুহূর্তেই পৃথিবীর বুক থেকে তাদের ধ্বংস এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
২। বিগত দিনে যত উম্মত অতিবাহিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে হযরত ইউনুস আ.-এর জাতি ভিন্ন একটি উদাহরণ দাঁড় করিয়েছে। তারা আযাব নেমে আসার পূর্বেই ঈমান এনেছে এবং তারা আল্লাহর সত্য অনুসারী ও অনুগত হওয়ার মাধ্যমে আযাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। কতই না ভালো হতো, যদি তাদের পরবর্তীকালে আগমনকারী বিভিন্ন জাতি ও প্রজন্ম হযরত ইউনুসের জাতির পদাঙ্ক অনুসরণ করে এভাবে আল্লাহর আযাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সমর্থ হতো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, তেমনটি ঘটে নি।
৩। পৃথিবীর অন্য সকল বিশেষ মানুষসহ সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মহান আল্লাহ যে আচরণ করে থাকেন, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সঙ্গে তাঁর আচরণ হয় এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এবং সেটাই হওয়া উচিত। কারণ হলো, তারা সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা ও কথা শোনার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই আল্লাহর বিধান পালন করার যে দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত রয়েছে তা অন্য কারো ওপর ন্যস্ত নয়। যার কারণে তাঁদের কর্তব্য হলো, তাঁরা যে কাজ-ই করবেন তা অবশ্যই আল্লাহর ওহির আলোকে হতে হবে। বিশেষ করে, দীনের প্রচার ও হকের পয়গাম সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ে আসমানি ওহির ইলমে ইয়াকিনের সঙ্গেই তাঁদের বন্ধন থাকতে হবে। যার কারণে যখন তারা কোনো কাজে দ্রুততার আশ্রয় নিয়ে ফেলেন অথবা ওহির অপেক্ষা না করে কোনো কথা বা কাজের পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন, তখন - বিষয়টি যত ক্ষুদ্রই হোক না কেনো- তাঁদেরকে মহান আল্লাহ কঠিনভাবে পাকড়াও করে থাকেন। এসময় অবস্থাচিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য আল্লাহ তাআলা এমন অভিব্যক্তি ব্যবহার করেন যে, শ্রবণকারী মনে করবে, বাস্তবেই তারা বুঝি বিশাল কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন। তবে যাই ঘটুক, সবসময়ের মতো এমন নিদারুণ মুহূর্তেও মহান আল্লাহর সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত থাকে।
আর তারাও তৎক্ষণাৎ সতর্ক হয়ে নিজের অনুতাপ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দু-হাত তুলে ধরেন। তওবা ও ইসতিগফারের আশ্রয়ে নিজেকে সমর্পণ করেন। ফলে অতি দ্রুত তারা মহান আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে যান। যা তাঁদের সম্মান ও মর্যাদাকে পূর্বাপেক্ষা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
পবিত্র কুরআনের বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপনাশৈলীর ক্ষেত্রে উল্লিখিত মৌলিক তথ্যটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না। যদি কেউ উল্লিখিত বিষয়টি না জানে তাহলে সে এ জাতীয় স্থানে মারাত্মক সংশয়ে পড়ে যাবে। সে দেখবে, একদিকে মহান আল্লাহ একজনকে নবী ও রাসুল বলে প্রশংসার অঞ্জলি ঢেলে দিচ্ছেন আর অন্যদিকে কথাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিনি বুঝি চরম কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন। যার কারণে প্রথমে সে অবশ্যই হয়রান ও কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যাবে। এরপর হয়তো সে বক্রপথে নেমে পড়বে অথবা ওয়াসওয়াসার অন্ধকার প্রান্তরে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবে। কাজেই আবশ্যক হলো, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কিত ঘটনাবলি ও সংবাদের ক্ষেত্রে উল্লিখিত মৌলিক তথ্যটি সবসময় দৃষ্টির সম্মুখে রাখতে হবে, যেনো সিরাতুল মুসতাকিম থেকে পা ফসকে না যায়।
৪. ইসলামের শিক্ষা হলো, আল্লাহর সকল সত্য নবী -তিনি যে ধর্মের-ই হোন না কেনো- তাঁর ওপর তেমনই ঈমান রাখতে হবে, যেভাবে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান রাখতে হয়। আমাদের নবী সকল নবী-রাসুলের সর্দার এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, এই বিশ্বাস রাখা সত্ত্বেও তাঁর এমনভাবে প্রশংসা করা যাবে না যার দ্বারা অন্য নবীকে হেয় ও নীচ করতে হয়। এটা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ।