📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সিফরে আইয়ুব

📄 সিফরে আইয়ুব


আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, হযরত আইয়ুব আ.-এর পবিত্র জীবন সম্পর্কে বর্তমানে সবচেয়ে প্রাচীন যে গ্রন্থ পাওয়া যায়, তা হলো সিফরে আইয়ুব। সেখানে তাঁর ওপর নেমে আসা বিপদাপদ, অসুস্থতা ও কষ্টের বিশদ বিবরণ রয়েছে। তার সারসংক্ষেপ হলো-
আউদ অঞ্চলে আইয়ুব নামে একজন সৎ লোক ছিলেন। তিনি আল্লাহকে ভয় করতেন আর মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতেন। তাঁর সাত ছেলে ও তিন মেয়ে ছিলো। তাঁর সাত হাজার ভেড়া-বকরি, তিন হাজার উট, পাঁচশো জোড়া বলদ ও পাঁচশো গাধা ছিলো। তাঁর অনেক দাস-দাসীও ছিলো। পূর্ব দেশের লোকদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় মানুষ। তাঁর ছেলেমেয়েরা পালাক্রমে নিজ নিজ গৃহে ভোজের আয়োজন করতো। সেখানে তারা তাদের তিন বোনকেও দাওয়াত করতো। যখন ভোজ শেষ হতো, তখন আইয়ুব তাদেরকে ডেকে পবিত্র করতেন। সকালে উঠে তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা কুরবানি করতেন। কারণ হলো, আইয়ুব মনে করতেন, হয়তো আমার ছেলেমেয়েরা কোনো ভুল করে ফেলেছে এবং মনে মনে খোদাকে গালি দিয়ে ফেলেছে। আইয়ুব সবসময় এমনটি করতেন।
একদিন খোদার পুত্ররা খোদার সামনে উপস্থিত হলো। তাদের সঙ্গে শয়তানও এলো। খোদা শয়তানকে বললেন, তুই কোত্থেকে এলি? শয়তান খোদার কাছে আরজ করলো, আমি জমিনে ঘুরে ঘুরে আর টহল দিয়ে এলাম। খোদা শয়তানকে বললেন, তুই কি আমার বান্দা আইয়ুবের ওপর দৃষ্টি দিয়েছিস? কেননা, পৃথিবীতে তার মতো কামেল ও সৎ লোক আর কেউ নেই। সে খোদাকে ভয় করে আর মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকে। শয়তান উত্তরে বললো, আইয়ুব কি খোদাকে এমনিতেই ভয় করে? আপনি কি তার, তার ঘরের ও তার সবকিছুর চারদিকে বেড়া দেন নি? আপনি তার হাতের কাজে বরকত দিয়েছেন। তার পশু-পাখি জমিনে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আপনি যদি আপনার হাত বাড়িয়ে তার সবকিছুকে স্পর্শ করেন, তাহলে সে আপনার মুখের ওপর আপনাকে গালি দেবে। তখন খোদা শয়তানকে বললেন, দেখ, তার যা কিছু আছে, সবকিছুই তোর হাতে। কিন্তু তার ওপর হাত বাড়াবি না। তখন শয়তান খোদার কাছ থেকে চলে গেলো।
এরপর শয়তান একে একে তাঁর সব সন্তান-সন্ততি ও সহায়-সম্পদ ধ্বংস করে দিলো। কিন্তু আইয়ুব ধৈর্য হারালেন না। তিনি বললেন, আমি আমার মায়ের পেট থেকে উলঙ্গ এসেছি আর উলঙ্গই ফিরে যাবো। খোদাওয়ান্দ দিয়েছেন আর খোদাওয়ান্দই নিয়েছেন। খোদাওয়ান্দের নাম মুবারক হোক। আইয়ুব কোনো গুনাহ করলেন না। খোদার ওপর কোনো অভিযোগও করলেন না।
এরপর শয়তান তাঁর দেহে এমন রোগ সৃষ্টি করলো যে, তাঁর গোটা দেহ চুলকাতে চুলকাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেলো। কিন্তু তিনি তখনও ধৈর্য হারালেন না। তখন তাঁর স্ত্রী বললেন, আপনি কি এখনও আপনার সততার ওপর অটল থাকবেন? খোদাকে গালি দিন আর মরে যান। তিনি তাকে বললেন, তুই একজন নির্বোধের মতো কথা বলছিস। আমরা কি খোদার কাছ থেকে শুধু সুখই গ্রহণ করবো, দুঃখ গ্রহণ করবো না? আইয়ুব এ অবস্থাতেও কোনো গুনাহ করলেন না।
অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সুস্থতা দান করলেন। তাঁর যা কিছু ধ্বংস হয়েছিলো, তার দ্বিগুণ দান করলেন। তাঁর সাত ছেলে ও তিন মেয়ে হলো। তাদের মতো সুন্দরী নারী গোটা দেশে আর কেউ ছিলো না। এরপর আইয়ুব একশো চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁর সন্তানদের ও তাদের সন্তানদের দেখতে পেয়েছিলেন। আইয়ুব বৃদ্ধ হয়ে ও দীর্ঘ জীবন লাভ করে ইন্তিকাল করেন।
উল্লিখিত বিবরণের কোনো কোনো অংশে এমন কথা রয়েছে, যা একজন নবীর মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যেমন, খোদার পুত্র, শয়তানের সঙ্গে খোদার কথোপকথন, হযরত আইয়ুবের স্ত্রীর পক্ষ থেকে খোদাকে গালি দেয়ার পরামর্শ ইত্যাদি। এ কারণে আমরা সেই অংশগুলো সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, সিফরে আইয়ুবের মূল ঘটনা সামনে নিয়ে আসা। যাতে পবিত্র কুরআন ও তার মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইন্তিকাল

📄 ইন্তিকাল


সিফরে আইয়ুবে হযরত আইয়ুব আ.-এর ইন্তিকাল সম্পর্কে এই তথ্য পাওয়া যায় যে, তিনি একশো চল্লিশ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। এ বর্ণনার ভিত্তিতে তাঁর পূর্ণ জীবনকাল হয় দুইশো দশ বছর। কারণ হলো, অসুস্থ হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিলো সত্তর বছর। আর সুস্থ হওয়ার পর তিনি একশো চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন। ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, তিনি তিরানব্বই বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। ইবনে জারির রহ. বলেন, তিনি সত্তর বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।
তাঁর কবর সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি যেখানে ইন্তিকাল করেছিলেন, সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। নাজ্জার বলেন, বর্তমানে শামের 'নাওয়া' নামক স্থানে একটি কবর রয়েছে, যাকে হযরত আইয়ুব আ.-এর কবর বলা হয়। এটি 'জাবালুল জাওলান'-এর সন্নিকটে অবস্থিত। আল্লাহই ভালো জানেন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও উপদেশ

📄 শিক্ষা ও উপদেশ


হযরত আইয়ুব আ.-এর ঘটনা ও তাঁর ধৈর্য ধারণ সম্পর্কে মহান আল্লাহ যে প্রশংসা করেছেন, এর থেকে আমরা নিম্নোক্ত শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করতে পারি :
১. আল্লাহর প্রিয় ও নৈকট্যশীল বান্দাদের ওপর যখন কোনো বিপদাপদ নেমে আসে, তখন তার দুটি কারণ থাকতে পারে। একটি হলো, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান। যেমনটি ঘটেছিলো হযরত আইয়ুব আ.-এর ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়টি হলো, আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে তাঁর বান্দাকে সতর্ক করতে চান। যাতে সে বুঝতে পারে যে, তার থেকে এমন কোনো বিচ্যুতি ঘটে গেছে, যা আল্লাহর পছন্দ হয় নি। এই সতর্কবাণীর পর সেই বান্দা অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। ফলে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা পূর্বের চেয়েও বাড়িয়ে দেন।
২. সবর বা ধৈর্য ধারণ করা হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে উত্তম প্রতিদান দান করেন। যেমনটি হযরত আইয়ুব আ.-এর ক্ষেত্রে ঘটেছে।
৩. আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় আদব রক্ষা করা উচিত। যেমনটি হযরত আইয়ুব আ. করেছেন। তিনি সরাসরি বলেন নি যে, হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থতা দান করুন। বরং তিনি বলেছেন, أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ [আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান]। এর মাধ্যমে তিনি নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন এবং আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করেছেন।
৪. আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখা উচিত। যেমনটি হযরত আইয়ুব আ. রেখেছেন। তিনি জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে পরীক্ষা করছেন এবং তিনি অবশ্যই তাঁকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন।
৫. আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা উচিত। যখন আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুব আ.-কে সুস্থতা দান করলেন এবং তাঁর যা কিছু ধ্বংস হয়েছিলো, তার দ্বিগুণ দান করলেন, তখন তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নেয়ামত বৃদ্ধি পায়। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
'আর স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রভু আপনাকে সতর্ক করলেন যে, আপনি যদি শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন, তাহলে আমি আপনার জন্য (আমার নেয়ামত) বাড়িয়ে দেবো।'
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ () الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ () أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ ()
'আর আপনি সুসংবাদ জানিয়ে দিন ধৈর্যশীলদের, যাদের ওপর কোনো বিপদ নেমে এলে তারা বলে, আমরা তো আল্লাহ্-ই জন্য এবং তাঁর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তারা ওইসব লোক, যাদের ওপর তাদের প্রতিপালকের দয়া ও রহমত রয়েছে এবং তারা-ই সরল পথপ্রাপ্ত।' [সুরা বাকারা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00