📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইউবার ও আইয়ুব

📄 ইউবার ও আইয়ুব


হযরত আইয়ুব আ.-এর সহিফার তথ্য দুটির ওপর আলোচনা শুরু করার পূর্বে আমাদেরকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় একটি বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। সেটি হলো, তাওরাতসহ ইতিহাসের বিভিন্ন কিতাবে 'ইউবাব' নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষকদের ধারণা, আইয়ুব ও ইউবাব একই ব্যক্তির ভিন্ন দুটি নাম। মূলত ইবরানি ভাষায় 'ইউবাব'-কে আউব বলা হয়। সেটিই আরবিতে এসে 'আইয়ুব' হয়ে গেছে। যদি গবেষণার মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, আইয়ুব, ইউবাব ও আউব; একই ব্যক্তির তিন ভাষার ভিন্ন উচ্চারণ-সম্বলিত নাম, তাহলে হযরত আইয়ুব আ.-এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, যার সমাধান না করলে নয়। তাওরাতের বিবরণ অনুযায়ী ইউবাব নামে ইতিহাসে দু-জন আলাদা ব্যক্তি রয়েছে। একজন হলেন বনি ইয়াকতানের সদস্য। আর অপরজন বনি আদওয়ামের লোক। যে ইউবাব বনি ইয়াকতানের বংশধর ছিলেন, তিনি হযরত ইবরাহিম আ.-এরও অনেক আগের লোক। কেননা, তার বংশপরম্পরা মাত্র পাঁচটি স্তর অতিক্রম করে হযরত নুহ আ. পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এভাবে, ইউবাব বিন ইয়াকতান বিন ঈর বিন সুলাহ বিন আরফাকসাদ বিন সাম বিন নুহ আ.।* পক্ষান্তরে যে দ্বিতীয় ইউবাব ছিলেন বনি আদওয়াম বংশের সন্তান, তিনি যদিও হযরত মুসা আ.-এরও আগের লোক, কিন্তু প্রথম ইউবাবের তুলনায় তিনি ছিলেন আরো অনেক পরের লোক। এ কারণে হযরত ইসহাক আ.-এর আলোচনা এ কথা এসেছে যে, আদওয়াম হলো হযরত ইসহাক আ.-এর ছেলে ইসুর উপাধি। তিনি হযরত ইয়াকুব আ.-এর বড় ছিলেন। কিনআন থেকে হিজরত করে আপন চাচা হযরত ইসমাইল আ.-এর কাছে হিজাযে চলে আসেন। তাঁরই কন্যা মাহাল্লাত অথবা বাশামাহকে বিয়ে করে আরবের সেই অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করেন, যেটি শাম ও ফিলিস্তিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে আরবের শেষ সীমান্ত। যেখান থেকে সায়ির পর্বতমালা শুরু হয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে চলে গেছে। স্থানটির বিবরণ এভাবেও দেয়া যেতে পারে, যে স্থানটি আম্মান থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত বিস্তৃত।**
সেই ইসু (আদওয়াম)-এর বংশধরদের হাতে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত রাজত্ব ও শাসনক্ষমতা ছিলো। ঐতিহাসিকদের মতে, তাদের শাসনকালের সূচনা আনুমানিক ১৭০০ খ্রিস্টপূর্ব সন থেকে ঘটেছে। হযরত মুসা আ.-এর যুগে যখন বনি ইসরাইল মিসর থেকে ফিরে আসছিলো, তখনও সায়ির অঞ্চলে বনি আদওয়ামের শাসন বলবৎ ছিলো। তাওরাতে এসেছে-
'তখন মুসা কাদেস হতে বনি আদওয়ামের রাজাকে দূতের মাধ্যমে বলে পাঠালেন যে, তোমার ভাই ইসরাইল বলেছে, যেসমস্ত দুঃখ-কষ্ট আমাদের ওপর নিপতিত হয়েছে, তা তুমি জানো। আর বনি ইসরাইলের গোটা সম্প্রদায় কাদেস হতে যাত্রা করে হুর পাহাড়ের ওপর চলে এলো।¹
খোদাওয়ান্দ হুর পাহাড়ের ওপর — যা বনি আদওয়ামের রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন ছিল্ডেমুসা ও হারুনকে বললেন...।
বনি আদওয়ামের সেই শাসকদের তালিকা তাওরাতে বিবৃত রয়েছে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, বনি ইসরাইলের ওপর সাউল (তালুত)-এর বিস্তৃত রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১০০০ সনে। যা বনি আদওয়ামের অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। সেই সাউলের পূর্বে মোট আটজন শাসক রাজসিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। যাঁদের মধ্যে দ্বিতীয়জনের নাম হলো, ইউবাব বিন যারেহ ( ইওবাব বিন্ যারাহ্ )²
এখানে এসে একটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয় যে, যদি হযরত আইয়ুব আ. ও ইউবাব একই ব্যক্তির দুটি ভিন্ন নাম হয়ে থাকে, তাহলে উল্লিখিত দুই ইউবাবের মধ্য হতে কোনজন সম্পর্কে বলা হবে যে, তিনিই হলেন হযরত আইয়ুব আ.? উল্লিখিত প্রশ্নের উত্তরে ঐতিহাসিকদের দুটি অভিমত পাওয়া যায়। মাওলানা আযাদ বলেন, যিনি বনি ইয়াকতানের বংশধর, তিনিই হযরত আইয়ুব আ.। যিনি আরবে আরিবার বংশধর। এ কারণে হযরত আইয়ুব আ. হয় হযরত ইবরাহিম আ.-এর সমসাময়িক ছিলেন অথবা তিনি ন্যূনতম হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়াকুব আলাইহিমাস সালামের সমবয়সী ছিলেন। তিনি লিখেছেন— 'প্রথমত তাওরাতের সিংহভাগ গবেষকের অভিমত হলো, হযরত আইয়ুব আ. ছিলেন খাঁটি আরব। তিনি আরবে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। সিফরে আইয়ুব মূলত প্রাচীন আরবি ভাষায় লেখা হয়েছিলো। হযরত মুসা আ. সেটিকে প্রাচীন আরবি ভাষা থেকে ইবরানি ভাষায় রূপান্তর করেন। সিফরে আইয়ুবে এ কথা রয়েছে যে, তিনি 'আউদ' এলাকায় বসবাস করতেন। কিয়দ্দূর পরে সেখানে এ তথ্যও রয়েছে যে, তাঁর পালিত পশুদের ওপর সাবার লোকেরা আক্রমণ করেছিলো। এই দুটি উদ্ধৃতি উপরিউক্ত অভিমতকে সত্যায়ন করে। কেননা, কিতাবে পয়দায়েশ ও তাওয়ারিখে আওয়াল-এ আউদকে আরাম বিন সাম বিন নুহ-এর সন্তান বলা হয়েছে। আর আরামি সর্বসম্মতিক্রমে খাঁটি আরবদের সূচনাকালীন সম্প্রদায়ের একটি।'³
আরব ঐতিহাসিকদের মধ্য হতে ইবনে আসাকিরও একই অভিমত পোষণ করেন যে, হযরত আইয়ুব আ. হযরত ইবরাহিম আ.-এর কাছাকাছি সময়ের ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী তিনি হযরত লুত আ.-এর সমবয়সী ও দীনে ইবরাহিমির অনুসারী ছিলেন।¹
নাজ্জার মিসরি আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে এ দাবি করেছেন যে, হযরত আইয়ুব আ.-এর যুগ হযরত ইবরাহিম আ.-এর সময়কাল থেকে আরো একশো বছর আগে ছিলো।²
তাঁদের দু-জনের বিপরীতে মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান বলেন, হযরত আইয়ুব আ. ছিলেন বনি আদওয়াম গোত্রের বংশধর। তাঁর সময়কাল ছিলো খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৭০০ সনের মাঝামাঝি। তিনি 'আরদুল কুরআনে' লিখেছেন-
'হযরত আইয়ুব আ. আদওয়ামি বংশের ছিলেন, এ বিষয়টি খোদ সিফরে আইয়ুব থেকে প্রমাণিত। সেখানে রয়েছে যে, 'আউদ এলাকায় একজন সৎ লোক বসবাস করতেন। যিনি ছিলেন সত্যপন্থী। আল্লাহকে ভয় পেতেন আর মন্দ কাজ এড়িয়ে চলতেন। (১০১)
তাওরাতে আউদ নামে দুই ব্যক্তি পাওয়া যায়। একজন তো খুবই প্রাচীন। আউদ বিন আরাম বিন সাম বিন নুহ। (তাকউয়িন ২৯-২৬) সিফরে আইয়ুবে উল্লেখিত আউদ বলতে দ্বিতীয় আউদ উদ্দেশ্য; এর ওপর আহলে কিতাবগণ একমত। তিনি যে বনু আদওয়ামি আরব ছিলেন, তার ওপর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, সিফরে আইয়ুবে হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গীদের যে আবাসস্থলের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো, তায়মান, নি'মাতান ও শাওহান। (২-১১) প্রথম নগরী সম্পর্কে এ কথা সবাই ভালোভাবেই জানে যে, এটি হলো আদওয়াম সম্প্রদায়ের একটি প্রসিদ্ধ এলাকা। (তাকউয়িন: ৩৫-৩৬)'
তাঁর সময়কাল সম্পর্কেও সহজেই এ ফয়সালা করে ফেলা যায় যে, 'কুলদান' (আইয়ুব: ১-১৭) এবং সাবা (আইয়ুব ১০-১৫)-কে হযরত আইয়ুব আ.-এর সমসাময়িক বলা হয়েছে। সাবার উত্থানকাল হলো খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সন। কাজেই উল্লিখিত দুটি যুগের মাঝামাঝি কোনো একটি সময়কে হযরত আইয়ুব আ.-এর যুগ স্বীকার করা উচিত।³
এটি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হচ্ছে যে, সময়কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা দু-জনই সাবা ও কালদানি (বাবেলি)-এর সময়কালের সনদ পেশ করেছেন। কিন্তু পরিণতি বের করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা পরস্পর ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
সাইয়িদ সুলাইমান সাহেবের কথার সমর্থন পাওয়া যায় প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইয়াকুবির মন্তব্য থেকে। তিনি লিখেছেন يوباب هو أيوب بن زارح الصديق 'ইউবাব হলেন সত্যবাদী নবী আইয়ুব; যিনি ছিলেন যারেহ-এর সন্তান।' উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমাদের অভিমত হলো, ইউবাব-ই হযরত আইয়ুব আ.; এটাই সঠিক কথা। আর আমাদের কাছে এ অভিমত-ই প্রণিধান পাচ্ছে যে, তিনি ইয়াকতান গোত্রের লোক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বনি আদওয়ামের সন্তান।

টিকাঃ
১. অধ্যায়: ১, আয়াত: ১
* পয়দাইশ, অধ্যায় ১০, আয়াত: ২২-২৪
** يوح البوقان من عمر بن سلح بن اردكسد بن سام بن نوح عليه السلام . তাওরাত, পয়দাইশ, অধ্যায় ২৮, আয়াত: ৯
*** দায়েরেতুল মা'আরিফ লিল বুসতানি, খণ্ড: ২
১. গিনতি, অধ্যায়: ২, আয়াত: ২২-২৩
২. পয়দায়েশ, অধ্যায় ৩৬, আয়াত: ৩২-৩৯
৩. তরজমানুল কুরআন: ২/৪৮৬
১. ফাতহুল বারি: ২/৩৬২
২. কাসাসুল আম্বিয়া: ৪১৫
৩. আরদুল কুরআন: ২/২৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00