📄 হযরত সুলাইমানের পরলোকগমন
পবিত্র কুরআন সুরা সাবায় হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকালের যে ঘটনা বর্ণনা করেছে, তার সারসংক্ষেপ হলো, হযরত সুলাইমানের নির্দেশে জিনদের বেশ বড় একটি দল বিশাল একটি ভবনের নির্মাণ কাজে ব্যস্ত ছিলো। ইতোমধ্যে হযরত সুলাইমানের কাছে মৃত্যুর বার্তা চলে আসে। কিন্তু তাঁর পরলোকগমনের বিষয়টি জিনরা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি। তারা তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত ছিলো। অনেক দিন পর যখন উইপোকা তার লাঠি খেয়ে ফেলে তখন তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। অথচ এত দিন দূর থেকে মনে হতো, হযরত সুলাইমান আ. সেই লাঠির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন। তখন জিনজাতি বুঝতে পারে যে, হযরত সুলাইমান আ. অনেক দিন পূর্বেই গত হয়েছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, আমরা তা জানতে পারি নি। হায়, আমরা যদি অদৃশ্যের জ্ঞান জানতাম, তাহলে এত দীর্ঘ দিন আমাদেরকে কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করতে হতো না। অথচ সুলাইমানের ভয়ে আমরা এত দিন কষ্ট সহ্য করে আসছি। পবিত্র কুরআনের ভাষায়— فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنُّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ
'যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন ঘুণপোকাই জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবগত করলো। তারা সুলাইমানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিলো। যখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলো, তখন জিনরা বুঝতে পারলো যে, অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান থাকলে তারা এই লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতো না।' [সুরা সাবা: আয়াত ১৪]
কথিত আছে, উল্লিখিত রহস্য যতক্ষণে জিনদের সামনে উন্মোচিত হয়, ততক্ষণে নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেছে। যার কারণে জিনরা প্রচণ্ড আক্ষেপ করছিলো যে, হায়, তারা যদি গায়ব জানতো, তাহলে অনেক আগেই মুক্তি পেয়ে যেতো।
এই স্থানে পবিত্র কুরআনের উদ্দেশ্য দুটি : ১. হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকালের বিবরণ জানানো। ২. বনি ইসরাইলকে তাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য সতর্ক করা। কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, জিনজাতি গায়বের খবর জানে। উল্লিখিত আয়াতে বুঝানো হয়েছে যে, জিনরা যদি প্রকৃতই গায়বের খবর জানতো, তাহলে তারা এই দীর্ঘ সময় হযরত সুলাইমানের ভয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ অথবা অন্যকোনো নগরীর নির্মাণ কাজে ব্যস্ত থাকার মতো হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের শিকার হতো না। তারা যেভাবে হযরত সুলাইমানের ইন্তিকালের বিষয়টি জানতে পেরেছে, তার প্রেক্ষিতে খোদ তাদেরকেও স্বীকার করতে হয়েছে যে, আমাদের ব্যাপারে গায়বের খবর জানার বিশ্বাস রাখা সম্পূর্ণ অমূলক।
হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকাল সম্পর্কে পবিত্র কুরআন এতটুকুই জানিয়েছে। এর অতিরিক্ত বিবরণ দেয় নি। দীন প্রচারের যে উদ্দেশ্যে কুরআনের অবতরণ; তার সঙ্গে অতিরিক্ত বিবরণের কোনো সম্পর্কও নেই। কাজেই এই বিশদ বিবরণের সঙ্গে আমাদেরও কোনো সম্পর্ক নেই যে, হযরত সুলাইমান আ. কতদিন লাঠির সাহায্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কীভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হযরতের ইন্তিকালের সংবাদ শুধু বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে সামান্য দূরত্বে নির্মাণকাজে নিমগ্ন জিনরাই জানতো না না-কি জিন ও মানুষ উভয় জাতিই জানতো না, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে ইসরাইলি ভাণ্ডার হতে সংগৃহীত একটি রেওয়ায়েতে আছে যে, হযরত সুলাইমান আ.-এর খেদমতে মালাকুল মাউত উপস্থিত হয়ে জানালেন যে, আপনার মৃত্যুর আর কয়েকটি মুহূর্ত বাকি আছে। তখন তিনি ভাবলেন, জিনরা যেনো নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে না যায়। ভাবনামতো তিনি সঙ্গে সঙ্গেই স্ফটিকের একটি কামরা তৈরি করলেন। তাতে কোনো দরজা রাখলেন না। নিজেকে কামরার ভেতর আবদ্ধ করে লাঠির সাহায্যে দাঁড়িয়ে ইবাদতে মশগুল হয়ে গেলেন। এ অবস্থাতেই মালাকুল মাউত এসে তার কাজ পূর্ণ করলো। আনুমানিক এক বছর পর্যন্ত হযরত সুলাইমান আ. এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলেন আর জিনজাতিও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো। যখন নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়, তখন আল্লাহর নির্দেশে হযরত সুলাইমানের লাঠিতে উইপোকার সৃষ্টি হয়। সেগুলো লাঠি কেটে নড়বড়ে বানিয়ে ফেলে। ফলে লাঠিটি হযরত সুলাইমান আ.-এর দেহের ভার বইতে না পেরে ভেঙ্গে যায়। হযরত সুলাইমানের নিষ্প্রাণ দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন জিনরা বুঝতে পারে যে, অনেক দিন আগেই সম্রাট গত হয়েছেন। ফলে তারা তাদের নির্বুদ্ধিতার ওপর প্রচণ্ড হতাশা ব্যক্ত করে।¹ মোটকথা, এ জাতীয় অনেকগুলো রেওয়ায়েত ইসরাইলি সাহিত্য থেকে আহরিত হয়ে তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো নকল করার মুহাককিকগণ জানিয়ে দিয়েছেন, এগুলোর বাস্তবতা কী?
তাওরাতে হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকালের ঘটনা এভাবে এসেছে—
'মোদ্দাকথা, জেরুজালেমে গোটা ইসরাইলিদের ওপর হযরত সুলাইমানের মোট রাজত্বকাল হচ্ছে ৪০ বছর। সুলাইমান তাঁর বাবা-দাদাদের সঙ্গে শায়িত হন। তাঁকে তার পিতৃপুরুষদের শহর 'সায়হুন'-এ সমাহিত করা হয়। তাঁর ছেলে 'রাজআম' তাঁর স্থলে বাদশাহ হন।'²
কাযি বায়যাবি নকল করেছেন যে, হযরত দাউদ আ.-এর ইন্তিকালের পর হযরত সুলাইমান আ. মাত্র তেরো বছর জীবিত ছিলেন। এ সময় তিনি রাজসিংহাসন অলঙ্কৃত করেন। অতঃপর মাত্র তিপ্পান্ন বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।³
বায়যাবির বক্তব্য সম্ভবত তাওরাত থেকেই সংগৃহীত।
টিকাঃ
১. তাফসিরে ইবনে কাসির: ৩/৫২৯-৫৩০
২. সালাতিন: ১. অধ্যায় ১১, আয়াত: ৪২-৪৩
৩. সুরা সাবার তাফসির
পবিত্র কুরআন সুরা সাবায় হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকালের যে ঘটনা বর্ণনা করেছে, তার সারসংক্ষেপ হলো, হযরত সুলাইমানের নির্দেশে জিনদের বেশ বড় একটি দল বিশাল একটি ভবনের নির্মাণ কাজে ব্যস্ত ছিলো। ইতোমধ্যে হযরত সুলাইমানের কাছে মৃত্যুর বার্তা চলে আসে। কিন্তু তাঁর পরলোকগমনের বিষয়টি জিনরা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি। তারা তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত ছিলো। অনেক দিন পর যখন উইপোকা তার লাঠি খেয়ে ফেলে তখন তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। অথচ এত দিন দূর থেকে মনে হতো, হযরত সুলাইমান আ. সেই লাঠির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন। তখন জিনজাতি বুঝতে পারে যে, হযরত সুলাইমান আ. অনেক দিন পূর্বেই গত হয়েছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, আমরা তা জানতে পারি নি। হায়, আমরা যদি অদৃশ্যের জ্ঞান জানতাম, তাহলে এত দীর্ঘ দিন আমাদেরকে কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করতে হতো না। অথচ সুলাইমানের ভয়ে আমরা এত দিন কষ্ট সহ্য করে আসছি। পবিত্র কুরআনের ভাষায়— فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنُّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ
'যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন ঘুণপোকাই জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবগত করলো। তারা সুলাইমানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিলো। যখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলো, তখন জিনরা বুঝতে পারলো যে, অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান থাকলে তারা এই লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতো না।' [সুরা সাবা: আয়াত ১৪]
কথিত আছে, উল্লিখিত রহস্য যতক্ষণে জিনদের সামনে উন্মোচিত হয়, ততক্ষণে নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেছে। যার কারণে জিনরা প্রচণ্ড আক্ষেপ করছিলো যে, হায়, তারা যদি গায়ব জানতো, তাহলে অনেক আগেই মুক্তি পেয়ে যেতো।
এই স্থানে পবিত্র কুরআনের উদ্দেশ্য দুটি : ১. হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকালের বিবরণ জানানো। ২. বনি ইসরাইলকে তাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য সতর্ক করা। কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, জিনজাতি গায়বের খবর জানে। উল্লিখিত আয়াতে বুঝানো হয়েছে যে, জিনরা যদি প্রকৃতই গায়বের খবর জানতো, তাহলে তারা এই দীর্ঘ সময় হযরত সুলাইমানের ভয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ অথবা অন্যকোনো নগরীর নির্মাণ কাজে ব্যস্ত থাকার মতো হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের শিকার হতো না। তারা যেভাবে হযরত সুলাইমানের ইন্তিকালের বিষয়টি জানতে পেরেছে, তার প্রেক্ষিতে খোদ তাদেরকেও স্বীকার করতে হয়েছে যে, আমাদের ব্যাপারে গায়বের খবর জানার বিশ্বাস রাখা সম্পূর্ণ অমূলক।
হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকাল সম্পর্কে পবিত্র কুরআন এতটুকুই জানিয়েছে। এর অতিরিক্ত বিবরণ দেয় নি। দীন প্রচারের যে উদ্দেশ্যে কুরআনের অবতরণ; তার সঙ্গে অতিরিক্ত বিবরণের কোনো সম্পর্কও নেই। কাজেই এই বিশদ বিবরণের সঙ্গে আমাদেরও কোনো সম্পর্ক নেই যে, হযরত সুলাইমান আ. কতদিন লাঠির সাহায্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কীভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হযরতের ইন্তিকালের সংবাদ শুধু বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে সামান্য দূরত্বে নির্মাণকাজে নিমগ্ন জিনরাই জানতো না না-কি জিন ও মানুষ উভয় জাতিই জানতো না, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে ইসরাইলি ভাণ্ডার হতে সংগৃহীত একটি রেওয়ায়েতে আছে যে, হযরত সুলাইমান আ.-এর খেদমতে মালাকুল মাউত উপস্থিত হয়ে জানালেন যে, আপনার মৃত্যুর আর কয়েকটি মুহূর্ত বাকি আছে। তখন তিনি ভাবলেন, জিনরা যেনো নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে না যায়। ভাবনামতো তিনি সঙ্গে সঙ্গেই স্ফটিকের একটি কামরা তৈরি করলেন। তাতে কোনো দরজা রাখলেন না। নিজেকে কামরার ভেতর আবদ্ধ করে লাঠির সাহায্যে দাঁড়িয়ে ইবাদতে মশগুল হয়ে গেলেন। এ অবস্থাতেই মালাকুল মাউত এসে তার কাজ পূর্ণ করলো। আনুমানিক এক বছর পর্যন্ত হযরত সুলাইমান আ. এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলেন আর জিনজাতিও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো। যখন নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়, তখন আল্লাহর নির্দেশে হযরত সুলাইমানের লাঠিতে উইপোকার সৃষ্টি হয়। সেগুলো লাঠি কেটে নড়বড়ে বানিয়ে ফেলে। ফলে লাঠিটি হযরত সুলাইমান আ.-এর দেহের ভার বইতে না পেরে ভেঙ্গে যায়। হযরত সুলাইমানের নিষ্প্রাণ দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন জিনরা বুঝতে পারে যে, অনেক দিন আগেই সম্রাট গত হয়েছেন। ফলে তারা তাদের নির্বুদ্ধিতার ওপর প্রচণ্ড হতাশা ব্যক্ত করে।¹ মোটকথা, এ জাতীয় অনেকগুলো রেওয়ায়েত ইসরাইলি সাহিত্য থেকে আহরিত হয়ে তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো নকল করার মুহাককিকগণ জানিয়ে দিয়েছেন, এগুলোর বাস্তবতা কী?
তাওরাতে হযরত সুলাইমান আ.-এর ইন্তিকালের ঘটনা এভাবে এসেছে—
'মোদ্দাকথা, জেরুজালেমে গোটা ইসরাইলিদের ওপর হযরত সুলাইমানের মোট রাজত্বকাল হচ্ছে ৪০ বছর। সুলাইমান তাঁর বাবা-দাদাদের সঙ্গে শায়িত হন। তাঁকে তার পিতৃপুরুষদের শহর 'সায়হুন'-এ সমাহিত করা হয়। তাঁর ছেলে 'রাজআম' তাঁর স্থলে বাদশাহ হন।'²
কাযি বায়যাবি নকল করেছেন যে, হযরত দাউদ আ.-এর ইন্তিকালের পর হযরত সুলাইমান আ. মাত্র তেরো বছর জীবিত ছিলেন। এ সময় তিনি রাজসিংহাসন অলঙ্কৃত করেন। অতঃপর মাত্র তিপ্পান্ন বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।³
বায়যাবির বক্তব্য সম্ভবত তাওরাত থেকেই সংগৃহীত।
টিকাঃ
১. তাফসিরে ইবনে কাসির: ৩/৫২৯-৫৩০
২. সালাতিন: ১. অধ্যায় ১১, আয়াত: ৪২-৪৩
৩. সুরা সাবার তাফসির
📄 শিক্ষা ও উপদেশ
হযরত সুলাইমান আ.-এর ঘটনাবলি পবিত্র কুরআনে যেভাবে বিশ্লেষিত ও বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে চক্ষুষ্মানদের জন্য রয়েছে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ। উল্লিখিত ঘটনাবলি চক্ষুর সামনে উন্মোচিত করে দেয় অসংখ্য সত্য। তা থেকে নির্বাচিত কয়েকটি শিক্ষা ও উপদেশ তুলে ধরা হলো:
১. আমাদের পূর্ববর্তী বিভিন্ন উম্মত আল্লাহর সত্য ধর্মে নিজেদের কুপ্রবৃত্তির অনুগমন করে যে বিকৃতিগুলো সাধন করেছে, তার মধ্য হতে একটি লজ্জাজনক বিকৃতি তারা ঘটিয়েছে আল্লাহর মহান নবী-রাসুলদের ওপর মিথ্যাচারের মাধ্যমে। তারা উচ্চ মর্যাদাশীল মহামানবদের পবিত্র জীবনীর ওপর নানাভাবে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে কয়েক কদম আগে রয়েছে বনি ইসরাইল। তারা একদিকে আল্লাহর এক নির্বাচিত বান্দাকে নবী ও রাসুল বলে স্বীকারও করে, অপরদিকে অবলীলায় তাদের চরিত্রের ওপর কালেমা লেপনের অপচেষ্টা চালায়। যেমনটি আমরা ঘটতে দেখেছি হযরত লুত আ. ও তাঁর কন্যাদের ক্ষেত্রে। কখনো কখনো বনি ইসরাইল আল্লাহর নির্বাচিত নবী-রাসুলদের নবুয়ত ও রেসালাতকে অস্বীকার করে বসে। শুধু তাই নয়, বরং তাঁদের দিকে মিথ্যা অপবাদ ও অসত্য কথা জুড়ে দিতে তারা একটুও ভীত হয় না। এটিকে তারা গর্বের কাজ মনে করে। যেমনটি আমরা ঘটতে দেখেছি হযরত দাউদ আ. ও হযরত সুলাইমান আ.-এর ক্ষেত্রে।
কুরআনুল কারিম যেভাবে কোন ধর্ম সত্য ও কোন ধর্ম মিথ্যা? তা ঘোষণা করেছে এবং সত্য ধর্ম ইসলামের ওপর জ্বলজ্বলে আলো ফেলেছে, ঠিক মানবজাতির ওপর অপরিসীম অনুগ্রহ করে অতীতের সেই মহান নবী ও রাসুলদের ওপর থেকে মিথ্যাচারের ওই জঞ্জালও সরিয়ে দিয়েছে, যা শত বছরের চেষ্টায় বনি ইসরাইলিরা তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস করেছিলো। কুরআন তাঁদের পূতঃপবিত্র জীবনীর ওপর থেকে তাবৎ কালিমা দূর করে দিয়েছে। শত বছরের ধুলোর আস্তরণের নিচে চাপা পড়া সত্যকে উদ্ঘাটন করে সত্যের স্বচ্ছ জলে বিধৌত করে উম্মাহর সামনে উপস্থাপন করেছে।
২। ইতিহাসের অনেক বড় শিক্ষা হলো, বনি ইসরাইল যে গুমরাহিকে গ্রহণ করেছিলো এবং পবিত্র কুরআন উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে যাকে প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছিলো; আফসোসের বিষয় হলো, সেই গুমরাহি থেকে আমাদের আঁচলও বাঁচতে পারে নি। কালের পরিক্রমায় পবিত্র কুরআনের পরিষ্কার ও আলোকিত পথ ছেড়ে আমরাও বনি ইসরাইলের সেই বিকৃত মিথ্যাচারপূর্ণ রেওয়ায়েতগুলোকে আমাদের ইসলামি রেওয়ায়েতে স্থান দিতে শুরু করেছি।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি হাদিসে পরিষ্কার ইরশাদ করেছেন, 'আহলে কিতাবের সেসব বর্ণনা কুরআন ও ইসলামি শিক্ষার বিরুদ্ধে যাবে না, সেগুলোকে নকল করা জায়েয আছে।' কিন্তু আমরা সেই হাদিসের বুনিয়াদি শর্ত 'কুরআন ও ইসলামি শিক্ষার বিরুদ্ধে যাবে না'-কে বেমালুম ভুলে গিয়ে যেকোনো ধরনের ইসরাইলি রেওয়ায়েতকে শুধু নকল-ই করি নি, বরং কুরআনুল কারিমের তাফসির ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সেগুলোকে দলিল পর্যন্ত বানিয়েছি এবং বিভিন্ন স্থানে কুরআনের তাফসির হিসেবে সেগুলোকে উপস্থাপন করতে শুরু করেছি। যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে যে, একদিকে অমুসলিমরা এগুলোকে ইসলামি রেওয়ায়েত হিসেবে প্রকাশ করেছে এবং সেগুলোর ওপর রং চড়িয়ে ইসলামের নিষ্কলুষ পবিত্র শিক্ষার ওপর আক্রমণ শুরু করেছে। তারা তাদের নাপাক ইচ্ছে পূরণের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে খোদ মুসলমানদের মধ্যে যারা দীনদ্রোহিতার পতাকাবাহক, তারা এ জাতীয় রেওয়ায়েতগুলোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে প্রমাণিত, ওহির মতো বিশ্বস্ত জ্ঞানের সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধর্মীয় বুনিয়াদি বিষয় যেমন, মুজেযা, হাশর ও পুনরুত্থানের ঘটনাবলি, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণকে অস্বীকার করার পথ বানিয়ে নিয়েছে। এ জাতীয় স্থান এলেই তারা বিনা-সূত্রে বলতে শুরু করে যে, এটিতো আমাদের মুফাসসিরদের অভ্যাস অনুযায়ী ইসরাইলি রেওয়ায়েত হতে সংগৃহীত। অথচ এগুলোর ক্ষেত্রে খোদ পবিত্র কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের অকাট্য ঘোষণা (নসসে কতয়ি) বিদ্যমান।
স্যার সৈয়দ আহমদ, মৌলবি মুহাম্মদ হাসান আমরোহি, মৌলবি চেরাগ আলি, গোলাম আহমদ কাদিয়ানি ও মুহাম্মদ আলি লাহোরি প্রমুখের প্রদত্ত কুরআনের তাফসির এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বুনিয়াদ ধর্মদ্রোহিতার ওপরই প্রতিষ্ঠিত।
মোটকথা, উল্লিখিত দুটি পথই ভুল। ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী ইসরাইলি রেওয়ায়েতগুলোকে ইসলামি রেওয়ায়েতের ভুবনে বিশেষ করে পবিত্র কুরআনের তাফসিরে স্থান দেওয়া যেমন ভুল ও চরম বিপদজনক পদক্ষেপ -চাই এটি যত নেক নিয়তে-ই করা হোক না কেনো- তদ্রূপ ধর্মদ্রোহিতাকে আহ্বান জানানোর জন্য এ জাতীয় রেওয়ায়েতের নকল করাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কুরআন ও হাদিসের পরিষ্কার নসকে অস্বীকার করা অথবা তাফসিরের নামে অর্থগত বিকৃতির পদক্ষেপ গ্রহণ করার অর্থ হলো, ইসলামি শিক্ষাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা করা এবং তার চেহারা-সুরতকে বদলে ফেলার হীন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠা।
সঠিক ও সরল পথ সেটাই, যা মুহাককিক উলামায়ে কেরাম গ্রহণ করেছেন। তা হলো, একদিকে কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট ভাষ্যের ওপর ঈমান রাখা এবং এক্ষেত্রে ধর্মবিরোধী ব্যাখ্যা করাকে দীনের বিকৃতি মনে করা। অন্যদিকে কুরআন ও হাদিসের আঁচলকে ইসরাইলি সাহিত্য থেকে পবিত্র প্রমাণিত করে সত্যের আলোকে সবার সামনে তুলে ধরা।
৩. রাজত্বের অধিকারী নবী-রাসুল আর দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের জীবনে সবসময় স্পষ্ট পার্থক্য থাকে এবং থেকেছে। নবীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ও প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর ভয়, তাঁর শাস্তির আশঙ্কা, ন্যায় ও সুবিচার, দীনের প্রতি দাওয়াত ও নসিহত এবং মানবসেবার উজ্জ্বলতায় ভাস্বর। তাঁরা যদিও বৈধ স্থানে শাসকসুলভ প্রতিপত্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন, কিন্তু সেখানে কোনো ধরনের অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতা ফুটে ওঠে নি; বরং এর স্থলে بغض في الله তথা আল্লাহর দিকে তাকিয়ে বৈরিতার প্রকাশ ঘটতো। অর্থাৎ তারা নিজেদের জন্য রাগ করতেন না, নিজের ব্যক্তিস্বার্থে ক্রোধ প্রকাশ করতেন না; বরং মহান আল্লাহর বিধান প্রয়োগের স্বার্থে হতো তাদের যাবতীয় পদক্ষেপ। তাইতো হযরত ইউসুফ, হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আলাইহিমুস সালামদের পূতঃপবিত্র জীবনচরিত উল্লিখিত নীতিকথার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
পক্ষান্তরে দ্বিতীয়োক্ত তথা দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের জীবন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাদের জীবনের পরতে পরতে ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি, জাতিগত বিভেদ, শ্রেণিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শনী, অধীনদের ওপর অত্যাচার ইত্যাদি মৌলিক বিষয় হিসেবে সবসময় প্রকাশ পেয়ে এসেছে।
উদাহরণ স্বরূপ, প্রথমে ফেরাউনের এই ঘোষণার প্রতি লক্ষ্য করুন, أنا ربكم الأعلى (আমি-ই তোমাদের সবচেয়ে বড় প্রভু) আর এরপর হযরত সুলাইমান আ.-এর এই আহ্বানের প্রতি লক্ষ্য করুন, إِلَّا تَعْلُوا عَلَيَّ وَأْتُونِي مُسْلِمِينَ (আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন করো না এবং মুসলমান হয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও)। উভয়ের কথায় শাসকসুলভ কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ফেরাউনের ঘোষণায় আল্লাহর সঙ্গে অবাধ্যতা, আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অত্যাচারমূলক চাপপ্রয়োগ, সর্বোপরি খোদায়িত্ব দাবিকারী অমমিকা ও ঔদ্ধত্য ইত্যাকার বিষয়গুলোর পরিষ্কার প্রকাশ ঘটেছে। পক্ষান্তরে হযরত সুলাইমানের সম্বোধনে সম্বোধিত শ্রোতৃমণ্ডলীর তুলনায় যে বড়ত্বের প্রকাশ ঘটেছে, সেটি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিপত্বি ও নিজস্ব শ্রেষ্টত্ব প্রকাশের জন্য ঘটে নি। বরং এক আল্লাহর ঘোষণা ও তার প্রচার, আল্লাহর পতাকাকে সমুন্নত রাখা, শিরকি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে একনিষ্ঠ তাওহিদের দিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। এটাই সেই পার্থক্য, যা হযরত আম্বিয়া আ.-এর উত্তরাধিকার হিসেবে সর্বদা সত্যপন্থী খলিফা ও দুনিয়াবি শাসকদের মাঝখানে পরিষ্কার পার্থক্য হিসেবে পরিদৃষ্ট হয়।
৪. যে ব্যক্তির জীবন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত হয়, আল্লাহ তাআলাও গোটা জগৎকে তার অনুগত ও বশীভূত করে দেন। তার প্রকাশ ঘটে এভাবে যে, তার কোনো পদক্ষেপ আল্লাহর সন্তুষ্টির বাইরে যায় না।
এখন যদি সে ধরনের ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করে দেখায়, যা সাধারণ পার্থিব উপকরণ ও কার্যকারণের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে তা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা ও বুঝার দুঃসাহস দেখানো যাবে না। কেননা, যে ব্যক্তির হাতে সেই কাজগুলো প্রকাশ পেয়েছে, তিনি তো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। আত্মোৎসর্গ করে ফেলেছেন। যার কারণে তার মাথার ওপর আল্লাহর স্বাধীন কুদরতি হাত এসে পড়েছে।
কাজেই তাঁদের কর্মকাণ্ড (মুজেযা)-কে সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের দাড়িপাল্লায় মেপে সেটিকে অস্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ হওয়া নিঃসন্দেহে ভুল ও পথচ্যুতি। এক্ষেত্রে সহজ ও সরল সিরাতে মুস্তাকিম কোনটি? তা সর্বযুগে ইসলামি চিন্তাবিদগণ কুরআন ও হাদিসের আলোকে বয়ান করে গেছেন। যেমন, 'প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের বিপরীত কাজ সবসময় ঘটে থাকে। কাজেই সেগুলোকে অস্বীকার করার অর্থ হলো, জাজ্বল্যমান জিনিসকে অস্বীকার করা। কেননা, যিনি প্রকৃতির এই সাধারণ নিয়ম ও স্বাভাবিক রীতি-নীতিকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি অবশ্যই এ অধিকার রাখেন যে, তিনি নিজ স্বাধীন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক শৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলবেন। বরং এমনটিই বুঝে আসছে যে, সম্ভবত মুজেযা জাতীয় বিষয়াবলির জন্য তার কাছে সৃষ্টির সূচনা থেকেই এমন বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়ম ও কুদরতি রীতি-নীতি রয়েছে, যা সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম থেকে আলাদা। যেহেতু দুনিয়াবি বিদ্যাসমূহ সেই বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়ম পর্যন্ত পৌছানোর ক্ষমতা রাখে না, সেগুলোর সত্য উন্মোচন করতে সে যেহেতু অক্ষম, যার কারণে আমরা আমাদের স্বল্প বুদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ কথা বুঝে নিই যে, এখানে অস্বাভাবিক কাণ্ড ঘটেছে এবং সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের লঙ্ঘন ঘটেছে। অথচ আদতে তা নয়। বরং এ জাতীয় কাজগুলোও সেই প্রাকৃতিক নিয়মের আদলে ঘটেছে। তবে পার্থক্য হলো, সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে ঘটে নি, বরং বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী ঘটেছে। কাজেই এটিকে সাধারণ নিয়মের লঙ্ঘন বলা যাবে না। আল্লাহর প্রাকৃতিক নিয়মের এই দু-ভাগের বণ্টনের বিষয়টি কেবল আল্লাহর সেসকল পবিত্র বান্দা-ই প্রত্যক্ষ করে থাকেন, যাদের মাধ্যমে ওই বিশেষ কর্মগুলো প্রকাশিত হয়, যাদের হাত ধরে প্রাকৃতিক বিশেষ আইনের বাস্তবায়ন ঘটে। (যেমন, মুজেযা ও কারামাত)
৫। অন্যতম শয়তানি কুমন্ত্রণা ও প্রভাব হলো, স্বামী-স্ত্রীর সুখময় সম্পর্কে ঘৃণা ও বৈরিতার এমন বিষ মিলিয়ে দেওয়া, যা পরবর্তীকালে তাদের মাঝে চিরবিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি হলো সবচেয়ে খারাপ কাজ। কেননা, বরাবরই এর পরিণাম হিসেবে মিথ্যা ও অপবাদ, খারাপ কথা, মন্দ আচরণ ও অশ্লীলতা; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে হত্যার মতো জঘন্য কাণ্ডও ঘটতে দেখা যায়। যার কারণে এ কাজটি শয়তানের কাছে খুবই প্রিয় কাজ। বিশুদ্ধ হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিদিন সকালবেলা ইবলিস পানির ওপর সিংহাসন বিছায়। এরপর সে মানবজাতিকে পথহারা করার জন্য পৃথিবীর চারপাশে তার দল-বলকে ছড়িয়ে দেয়। তাদের মধ্য হতে যে যত বেশি ফেতনা ছড়াতে পারে, সে শয়তানের কাছে তত বেশি ঘনিষ্ঠ হয়। ফিরে এসে প্রত্যেক শয়তান নিজ নিজ কাজের বিবরণ পেশ করে। যেমন, কেউ বলে, আমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গে এমনভাবে লেগে থেকেছি যে, শেষ পর্যন্ত তার মুখ দিয়ে অবান্তর কথা বের করেছি। এ জাতীয় কাজের ফিরিস্তি শুনে শয়তান খুব বেশি খুশি হয় না। কাউকে বাহ্বাও দেয় না। বরং এগুলোকে সে সাধারণ ফেতনা হিসেবে অভিহিত করে। ইতোমধ্যে সেখানে এক শয়তান উপস্থিত হয়ে বলে, আমি আজ এক সংসারে বিচ্ছেদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছি। তাদের সুখময় দাম্পত্য সম্পর্ককে তিক্ত বানিয়েছি। ইবলিস তার কথা শুনে খুব খুশি হয়। তাকে গলায় জড়িয়ে নেয়। বাহবা জানিয়ে বলে, নিঃসন্দেহে আজ তুমি অনেক বড় কৃতিত্ব দেখিয়েছো।¹
জিনরূপী শয়তান ও মানবরূপী শয়তান তাদের সেই যাদুকে সাধারণত এভাবে কার্যকর করে যে, তাদের মধ্যে প্রথমত ভুল বুঝাবুঝি, কুধারণা, মন্দ বাক্যালাপ ও অকৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে সেই অবস্থাটি ঘৃণা, বৈরিতা ও চূড়ান্ত পরিণতিতে স্বামী-স্ত্রীর চিরবিচ্ছেদ হিসেবে পরিণতি লাভ করে। মহান আল্লাহ এর থেকে আমাদের সবসময় রক্ষা করুন।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম
হযরত সুলাইমান আ.-এর ঘটনাবলি পবিত্র কুরআনে যেভাবে বিশ্লেষিত ও বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে চক্ষুষ্মানদের জন্য রয়েছে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ। উল্লিখিত ঘটনাবলি চক্ষুর সামনে উন্মোচিত করে দেয় অসংখ্য সত্য। তা থেকে নির্বাচিত কয়েকটি শিক্ষা ও উপদেশ তুলে ধরা হলো:
১. আমাদের পূর্ববর্তী বিভিন্ন উম্মত আল্লাহর সত্য ধর্মে নিজেদের কুপ্রবৃত্তির অনুগমন করে যে বিকৃতিগুলো সাধন করেছে, তার মধ্য হতে একটি লজ্জাজনক বিকৃতি তারা ঘটিয়েছে আল্লাহর মহান নবী-রাসুলদের ওপর মিথ্যাচারের মাধ্যমে। তারা উচ্চ মর্যাদাশীল মহামানবদের পবিত্র জীবনীর ওপর নানাভাবে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে কয়েক কদম আগে রয়েছে বনি ইসরাইল। তারা একদিকে আল্লাহর এক নির্বাচিত বান্দাকে নবী ও রাসুল বলে স্বীকারও করে, অপরদিকে অবলীলায় তাদের চরিত্রের ওপর কালেমা লেপনের অপচেষ্টা চালায়। যেমনটি আমরা ঘটতে দেখেছি হযরত লুত আ. ও তাঁর কন্যাদের ক্ষেত্রে। কখনো কখনো বনি ইসরাইল আল্লাহর নির্বাচিত নবী-রাসুলদের নবুয়ত ও রেসালাতকে অস্বীকার করে বসে। শুধু তাই নয়, বরং তাঁদের দিকে মিথ্যা অপবাদ ও অসত্য কথা জুড়ে দিতে তারা একটুও ভীত হয় না। এটিকে তারা গর্বের কাজ মনে করে। যেমনটি আমরা ঘটতে দেখেছি হযরত দাউদ আ. ও হযরত সুলাইমান আ.-এর ক্ষেত্রে।
কুরআনুল কারিম যেভাবে কোন ধর্ম সত্য ও কোন ধর্ম মিথ্যা? তা ঘোষণা করেছে এবং সত্য ধর্ম ইসলামের ওপর জ্বলজ্বলে আলো ফেলেছে, ঠিক মানবজাতির ওপর অপরিসীম অনুগ্রহ করে অতীতের সেই মহান নবী ও রাসুলদের ওপর থেকে মিথ্যাচারের ওই জঞ্জালও সরিয়ে দিয়েছে, যা শত বছরের চেষ্টায় বনি ইসরাইলিরা তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস করেছিলো। কুরআন তাঁদের পূতঃপবিত্র জীবনীর ওপর থেকে তাবৎ কালিমা দূর করে দিয়েছে। শত বছরের ধুলোর আস্তরণের নিচে চাপা পড়া সত্যকে উদ্ঘাটন করে সত্যের স্বচ্ছ জলে বিধৌত করে উম্মাহর সামনে উপস্থাপন করেছে।
২। ইতিহাসের অনেক বড় শিক্ষা হলো, বনি ইসরাইল যে গুমরাহিকে গ্রহণ করেছিলো এবং পবিত্র কুরআন উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে যাকে প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছিলো; আফসোসের বিষয় হলো, সেই গুমরাহি থেকে আমাদের আঁচলও বাঁচতে পারে নি। কালের পরিক্রমায় পবিত্র কুরআনের পরিষ্কার ও আলোকিত পথ ছেড়ে আমরাও বনি ইসরাইলের সেই বিকৃত মিথ্যাচারপূর্ণ রেওয়ায়েতগুলোকে আমাদের ইসলামি রেওয়ায়েতে স্থান দিতে শুরু করেছি।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি হাদিসে পরিষ্কার ইরশাদ করেছেন, 'আহলে কিতাবের সেসব বর্ণনা কুরআন ও ইসলামি শিক্ষার বিরুদ্ধে যাবে না, সেগুলোকে নকল করা জায়েয আছে।' কিন্তু আমরা সেই হাদিসের বুনিয়াদি শর্ত 'কুরআন ও ইসলামি শিক্ষার বিরুদ্ধে যাবে না'-কে বেমালুম ভুলে গিয়ে যেকোনো ধরনের ইসরাইলি রেওয়ায়েতকে শুধু নকল-ই করি নি, বরং কুরআনুল কারিমের তাফসির ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সেগুলোকে দলিল পর্যন্ত বানিয়েছি এবং বিভিন্ন স্থানে কুরআনের তাফসির হিসেবে সেগুলোকে উপস্থাপন করতে শুরু করেছি। যার পরিণতি দাঁড়িয়েছে যে, একদিকে অমুসলিমরা এগুলোকে ইসলামি রেওয়ায়েত হিসেবে প্রকাশ করেছে এবং সেগুলোর ওপর রং চড়িয়ে ইসলামের নিষ্কলুষ পবিত্র শিক্ষার ওপর আক্রমণ শুরু করেছে। তারা তাদের নাপাক ইচ্ছে পূরণের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে খোদ মুসলমানদের মধ্যে যারা দীনদ্রোহিতার পতাকাবাহক, তারা এ জাতীয় রেওয়ায়েতগুলোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে প্রমাণিত, ওহির মতো বিশ্বস্ত জ্ঞানের সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধর্মীয় বুনিয়াদি বিষয় যেমন, মুজেযা, হাশর ও পুনরুত্থানের ঘটনাবলি, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণকে অস্বীকার করার পথ বানিয়ে নিয়েছে। এ জাতীয় স্থান এলেই তারা বিনা-সূত্রে বলতে শুরু করে যে, এটিতো আমাদের মুফাসসিরদের অভ্যাস অনুযায়ী ইসরাইলি রেওয়ায়েত হতে সংগৃহীত। অথচ এগুলোর ক্ষেত্রে খোদ পবিত্র কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের অকাট্য ঘোষণা (নসসে কতয়ি) বিদ্যমান।
স্যার সৈয়দ আহমদ, মৌলবি মুহাম্মদ হাসান আমরোহি, মৌলবি চেরাগ আলি, গোলাম আহমদ কাদিয়ানি ও মুহাম্মদ আলি লাহোরি প্রমুখের প্রদত্ত কুরআনের তাফসির এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বুনিয়াদ ধর্মদ্রোহিতার ওপরই প্রতিষ্ঠিত।
মোটকথা, উল্লিখিত দুটি পথই ভুল। ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী ইসরাইলি রেওয়ায়েতগুলোকে ইসলামি রেওয়ায়েতের ভুবনে বিশেষ করে পবিত্র কুরআনের তাফসিরে স্থান দেওয়া যেমন ভুল ও চরম বিপদজনক পদক্ষেপ -চাই এটি যত নেক নিয়তে-ই করা হোক না কেনো- তদ্রূপ ধর্মদ্রোহিতাকে আহ্বান জানানোর জন্য এ জাতীয় রেওয়ায়েতের নকল করাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কুরআন ও হাদিসের পরিষ্কার নসকে অস্বীকার করা অথবা তাফসিরের নামে অর্থগত বিকৃতির পদক্ষেপ গ্রহণ করার অর্থ হলো, ইসলামি শিক্ষাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা করা এবং তার চেহারা-সুরতকে বদলে ফেলার হীন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠা।
সঠিক ও সরল পথ সেটাই, যা মুহাককিক উলামায়ে কেরাম গ্রহণ করেছেন। তা হলো, একদিকে কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট ভাষ্যের ওপর ঈমান রাখা এবং এক্ষেত্রে ধর্মবিরোধী ব্যাখ্যা করাকে দীনের বিকৃতি মনে করা। অন্যদিকে কুরআন ও হাদিসের আঁচলকে ইসরাইলি সাহিত্য থেকে পবিত্র প্রমাণিত করে সত্যের আলোকে সবার সামনে তুলে ধরা।
৩. রাজত্বের অধিকারী নবী-রাসুল আর দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের জীবনে সবসময় স্পষ্ট পার্থক্য থাকে এবং থেকেছে। নবীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ও প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর ভয়, তাঁর শাস্তির আশঙ্কা, ন্যায় ও সুবিচার, দীনের প্রতি দাওয়াত ও নসিহত এবং মানবসেবার উজ্জ্বলতায় ভাস্বর। তাঁরা যদিও বৈধ স্থানে শাসকসুলভ প্রতিপত্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন, কিন্তু সেখানে কোনো ধরনের অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতা ফুটে ওঠে নি; বরং এর স্থলে بغض في الله তথা আল্লাহর দিকে তাকিয়ে বৈরিতার প্রকাশ ঘটতো। অর্থাৎ তারা নিজেদের জন্য রাগ করতেন না, নিজের ব্যক্তিস্বার্থে ক্রোধ প্রকাশ করতেন না; বরং মহান আল্লাহর বিধান প্রয়োগের স্বার্থে হতো তাদের যাবতীয় পদক্ষেপ। তাইতো হযরত ইউসুফ, হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আলাইহিমুস সালামদের পূতঃপবিত্র জীবনচরিত উল্লিখিত নীতিকথার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
পক্ষান্তরে দ্বিতীয়োক্ত তথা দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের জীবন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাদের জীবনের পরতে পরতে ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি, জাতিগত বিভেদ, শ্রেণিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শনী, অধীনদের ওপর অত্যাচার ইত্যাদি মৌলিক বিষয় হিসেবে সবসময় প্রকাশ পেয়ে এসেছে।
উদাহরণ স্বরূপ, প্রথমে ফেরাউনের এই ঘোষণার প্রতি লক্ষ্য করুন, أنا ربكم الأعلى (আমি-ই তোমাদের সবচেয়ে বড় প্রভু) আর এরপর হযরত সুলাইমান আ.-এর এই আহ্বানের প্রতি লক্ষ্য করুন, إِلَّا تَعْلُوا عَلَيَّ وَأْتُونِي مُسْلِمِينَ (আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন করো না এবং মুসলমান হয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও)। উভয়ের কথায় শাসকসুলভ কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ফেরাউনের ঘোষণায় আল্লাহর সঙ্গে অবাধ্যতা, আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অত্যাচারমূলক চাপপ্রয়োগ, সর্বোপরি খোদায়িত্ব দাবিকারী অমমিকা ও ঔদ্ধত্য ইত্যাকার বিষয়গুলোর পরিষ্কার প্রকাশ ঘটেছে। পক্ষান্তরে হযরত সুলাইমানের সম্বোধনে সম্বোধিত শ্রোতৃমণ্ডলীর তুলনায় যে বড়ত্বের প্রকাশ ঘটেছে, সেটি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিপত্বি ও নিজস্ব শ্রেষ্টত্ব প্রকাশের জন্য ঘটে নি। বরং এক আল্লাহর ঘোষণা ও তার প্রচার, আল্লাহর পতাকাকে সমুন্নত রাখা, শিরকি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে একনিষ্ঠ তাওহিদের দিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। এটাই সেই পার্থক্য, যা হযরত আম্বিয়া আ.-এর উত্তরাধিকার হিসেবে সর্বদা সত্যপন্থী খলিফা ও দুনিয়াবি শাসকদের মাঝখানে পরিষ্কার পার্থক্য হিসেবে পরিদৃষ্ট হয়।
৪. যে ব্যক্তির জীবন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত হয়, আল্লাহ তাআলাও গোটা জগৎকে তার অনুগত ও বশীভূত করে দেন। তার প্রকাশ ঘটে এভাবে যে, তার কোনো পদক্ষেপ আল্লাহর সন্তুষ্টির বাইরে যায় না।
এখন যদি সে ধরনের ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করে দেখায়, যা সাধারণ পার্থিব উপকরণ ও কার্যকারণের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে তা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা ও বুঝার দুঃসাহস দেখানো যাবে না। কেননা, যে ব্যক্তির হাতে সেই কাজগুলো প্রকাশ পেয়েছে, তিনি তো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। আত্মোৎসর্গ করে ফেলেছেন। যার কারণে তার মাথার ওপর আল্লাহর স্বাধীন কুদরতি হাত এসে পড়েছে।
কাজেই তাঁদের কর্মকাণ্ড (মুজেযা)-কে সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের দাড়িপাল্লায় মেপে সেটিকে অস্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ হওয়া নিঃসন্দেহে ভুল ও পথচ্যুতি। এক্ষেত্রে সহজ ও সরল সিরাতে মুস্তাকিম কোনটি? তা সর্বযুগে ইসলামি চিন্তাবিদগণ কুরআন ও হাদিসের আলোকে বয়ান করে গেছেন। যেমন, 'প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের বিপরীত কাজ সবসময় ঘটে থাকে। কাজেই সেগুলোকে অস্বীকার করার অর্থ হলো, জাজ্বল্যমান জিনিসকে অস্বীকার করা। কেননা, যিনি প্রকৃতির এই সাধারণ নিয়ম ও স্বাভাবিক রীতি-নীতিকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি অবশ্যই এ অধিকার রাখেন যে, তিনি নিজ স্বাধীন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক শৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলবেন। বরং এমনটিই বুঝে আসছে যে, সম্ভবত মুজেযা জাতীয় বিষয়াবলির জন্য তার কাছে সৃষ্টির সূচনা থেকেই এমন বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়ম ও কুদরতি রীতি-নীতি রয়েছে, যা সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম থেকে আলাদা। যেহেতু দুনিয়াবি বিদ্যাসমূহ সেই বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়ম পর্যন্ত পৌছানোর ক্ষমতা রাখে না, সেগুলোর সত্য উন্মোচন করতে সে যেহেতু অক্ষম, যার কারণে আমরা আমাদের স্বল্প বুদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ কথা বুঝে নিই যে, এখানে অস্বাভাবিক কাণ্ড ঘটেছে এবং সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের লঙ্ঘন ঘটেছে। অথচ আদতে তা নয়। বরং এ জাতীয় কাজগুলোও সেই প্রাকৃতিক নিয়মের আদলে ঘটেছে। তবে পার্থক্য হলো, সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে ঘটে নি, বরং বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী ঘটেছে। কাজেই এটিকে সাধারণ নিয়মের লঙ্ঘন বলা যাবে না। আল্লাহর প্রাকৃতিক নিয়মের এই দু-ভাগের বণ্টনের বিষয়টি কেবল আল্লাহর সেসকল পবিত্র বান্দা-ই প্রত্যক্ষ করে থাকেন, যাদের মাধ্যমে ওই বিশেষ কর্মগুলো প্রকাশিত হয়, যাদের হাত ধরে প্রাকৃতিক বিশেষ আইনের বাস্তবায়ন ঘটে। (যেমন, মুজেযা ও কারামাত)
৫। অন্যতম শয়তানি কুমন্ত্রণা ও প্রভাব হলো, স্বামী-স্ত্রীর সুখময় সম্পর্কে ঘৃণা ও বৈরিতার এমন বিষ মিলিয়ে দেওয়া, যা পরবর্তীকালে তাদের মাঝে চিরবিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি হলো সবচেয়ে খারাপ কাজ। কেননা, বরাবরই এর পরিণাম হিসেবে মিথ্যা ও অপবাদ, খারাপ কথা, মন্দ আচরণ ও অশ্লীলতা; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে হত্যার মতো জঘন্য কাণ্ডও ঘটতে দেখা যায়। যার কারণে এ কাজটি শয়তানের কাছে খুবই প্রিয় কাজ। বিশুদ্ধ হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিদিন সকালবেলা ইবলিস পানির ওপর সিংহাসন বিছায়। এরপর সে মানবজাতিকে পথহারা করার জন্য পৃথিবীর চারপাশে তার দল-বলকে ছড়িয়ে দেয়। তাদের মধ্য হতে যে যত বেশি ফেতনা ছড়াতে পারে, সে শয়তানের কাছে তত বেশি ঘনিষ্ঠ হয়। ফিরে এসে প্রত্যেক শয়তান নিজ নিজ কাজের বিবরণ পেশ করে। যেমন, কেউ বলে, আমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গে এমনভাবে লেগে থেকেছি যে, শেষ পর্যন্ত তার মুখ দিয়ে অবান্তর কথা বের করেছি। এ জাতীয় কাজের ফিরিস্তি শুনে শয়তান খুব বেশি খুশি হয় না। কাউকে বাহ্বাও দেয় না। বরং এগুলোকে সে সাধারণ ফেতনা হিসেবে অভিহিত করে। ইতোমধ্যে সেখানে এক শয়তান উপস্থিত হয়ে বলে, আমি আজ এক সংসারে বিচ্ছেদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছি। তাদের সুখময় দাম্পত্য সম্পর্ককে তিক্ত বানিয়েছি। ইবলিস তার কথা শুনে খুব খুশি হয়। তাকে গলায় জড়িয়ে নেয়। বাহবা জানিয়ে বলে, নিঃসন্দেহে আজ তুমি অনেক বড় কৃতিত্ব দেখিয়েছো।¹
জিনরূপী শয়তান ও মানবরূপী শয়তান তাদের সেই যাদুকে সাধারণত এভাবে কার্যকর করে যে, তাদের মধ্যে প্রথমত ভুল বুঝাবুঝি, কুধারণা, মন্দ বাক্যালাপ ও অকৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে সেই অবস্থাটি ঘৃণা, বৈরিতা ও চূড়ান্ত পরিণতিতে স্বামী-স্ত্রীর চিরবিচ্ছেদ হিসেবে পরিণতি লাভ করে। মহান আল্লাহ এর থেকে আমাদের সবসময় রক্ষা করুন।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম