📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হুদহুদ

📄 হুদহুদ


পবিত্র কুরআন পরিষ্কার ও স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, হযরত সুলাইমান আ.-এর পত্রবাহক হুদহুদ ছিলো একটি পাখি। কিন্তু প্রকৃতিবাদ বা ন্যাচারলিজমের দোহাই দিয়ে বর্তমান সময়ের কতিপয় বুদ্ধিজীবী এ ধরনের মুজেযাধর্মী ঘটনার সামনে এসে কপাল কুঁচকে ফেলে। এগুলোকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে কুরআনের আয়াত পর্যন্ত অস্বীকার করতে উদ্যত হয়। আর যদি ধর্মের ওপর তাদের করুণা জাগে তাহলে এ জাতীয় আয়াতগুলোকে সরাসরি অস্বীকার করে না, তবে অর্থের ক্ষেত্রে বিকৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে। এ সময় তারা কুরআনের উদ্দেশ্যের বিপরীতে গিয়ে মনগড়া অপব্যাখ্যা পেশ করে। এখানেও তাই ঘটেছে। প্রথমত, তারা পাখির সঙ্গে কথাবার্তা বলাকে অযৌক্তিক প্রতিপন্ন করেছে। এরপর আলোচিত ঘটনা সম্বলিত আয়াতের অর্থ এভাবে দিয়েছে যে, প্রাচীন যুগে মুশরিকদের সমাজে পূজনীয় দেব-দেবীর নামে নিজ সন্তানদের নাম রাখার প্রচলন ছিলো। যেখানে প্রাণীদের নামও থাকতো। সেই ধারাবাহিকতায় উল্লিখিত আয়াতে হুদহুদ বলতে কোনো পাখি উদ্দেশ্য নয়। বরং এখানে হযরত সুলাইমান আ.-এর পত্রবাহক জনৈক মানুষ উদ্দেশ্য। যার নাম ছিলো সম্ভবত হুদহুদ। কিন্তু যখন তাকে এ প্রশ্ন করা হয় যে, পবিত্র কুরআন পরিষ্কার শব্দে এ কথা বলেছে, (وَتَفَقَّدَ الطَّيز )সুলাইমান পক্ষীদের খোঁজ-খবর নিলেন) তাহলে হুদহুদকে মানুষ বলা কিভাবে সঠিক হয়? মৌলবি চেরাগ আলি তার এই উত্তর দিয়েছেন যে, এভাবে الطير শব্দের অর্থ হলো, 'সৈন্য'। অর্থাৎ যখন হযরত সুলাইমান সৈন্যবাহিনীর খোঁজ-খবর নিলেন। হায় আফসোস, তার বলা এই অর্থের কোনো সনদ নেই। আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী এটি প্রত্যাখ্যাত। আর এ কথা সর্বস্বীকৃত যে, ভাষার ক্ষেত্রে ইজতিহাদের কোনো সুযোগ নেই। বরং মূল ভাষাভাষীদের ব্যবহারের অনুগমন করতে হয়। আহলে আরবগণ হাকিকি ও মাজাযি কোনোভাবেই طیر শব্দকে সৈন্য অর্থে ব্যবহার করেন না। বরং الطیر ও طیر শব্দটি যখন কোনো اضافت বা متعلقات এর সঙ্গে যুক্ত না হয়ে ব্যবহৃত হয়, তখন সেটি একমাত্র 'পাখি' অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে একটি জীবন্ত ভাষায়। আরবি ভাষা। যার ক্ষেত্রে ইরশাদ হয়েছে, لسان عربي مبين (এটি স্পষ্টকারী আরবি ভাষা)। এটি কোনো মৃত ভাষা নয় যে, যে কেউ এসে তার ইচ্ছেমাফিক অর্থ করবে। এখন যদি কোনো ব্যক্তি এসে 'আসহাবে ফিল বা হস্তিবাহিনী'-এর ঘটনা অস্বীকার করে আর বলে طيرا ابابیل -এ طیر শব্দের অর্থ হলো, কুলক্ষণ। আরেক ব্যক্তি এসে যদি সুলাইমানের হুদহুদ-এর পাখি হওয়াকে অস্বীকার করে আর বলে, وَ تَفَقَّدَ الطَّيْرَ -এ طیر শব্দের অর্থ হলো, সৈন্য। আর তাদের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা আপন আপন স্থানে আরবি ভাষার ব্যাকরণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, আরবি পরিভাষা অনুযায়ী সম্পূর্ণ ভুল হয়, তাহলে আমরা কেনো তাদের অপব্যাখ্যাকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবো না?
ভীষণ আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি এখানে মৌলবি চেরাগ আলির অপব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও বিষয়টির একটি যুক্তিগ্রাহ্য রূপ দেয়ার অভিপ্রায়ে বলেছেন- 'যদি পাখিদের কথা বলার বিষয়টি তোমাকে দ্বিধান্বিত করে, তাহলে ধরে নাও, পত্রবাহী কবুতরের মতো সেই যুগে পত্রবাহী হুদহুদও প্রশিক্ষিত হতো। বাকি থাকলো, তার কথা বলার বিষয়টি, বুঝে নাও, সে বিষয়বস্তু-সম্বলিত পত্র বহন করতো। যেমন, এখানেই কুরআন মাজিদে এসেছে যে, হযরত সুলাইমান আ. হুদহুুদের মারফত সাবার রানির কাছে পত্র পাঠিয়েছিলেন। এভাবে সে হয়তো পূর্বেও পত্র বহন করেছিলো।'¹
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন পবিত্র কুরআন منطق الطیر (পাখির সঙ্গে আলাপচারিতার জ্ঞান), نملة (পিপীলিকা) ও هدهد (হুদহুদ পাখি)-এর ঘটনা ইত্যাদিকে হযরত সুলাইমান আ.-এর ওপর আল্লাহর বিশাল অনুগ্রহ ও সীমাহীন অনুকম্পা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং পবিত্র কুরআন এসব ঘটনার পূর্বাপরের মাধ্যমে এমন ভাবে উপস্থাপন করেছে যে, যার দ্বারা হুদহুদের পাখি হয়ে হযরত সুলাইমান আ.-এর সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার প্রমাণিত হয়, তখন কতিপয় প্রকৃতিবাদী বুদ্ধিজীবীর প্রমাণহীন অস্বীকারের ডামাঢোলে প্রভাবিত হয়ে এবং ওই শ্রেণির লোকদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিষ্ঠিত সত্যকে নিজেদের ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে পর্দাবৃত করার অপচেষ্টাকে মেনে নিয়ে সাইয়িদ সুলাইমান সাহেব কেনো এমন ব্যাখ্যার আশ্রয় নিলেন, যা পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের পরিপন্থী? উপরন্তু কোনো ঘটনা যদি তাওরাত বা ইসরাইলি রেওয়ায়েতে পাওয়া যায়, তাহলে সেখানে ওই ঘটনার পাওয়া যাওয়াটা তার ভুল বা বানোয়াট হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। বরং যদি পবিত্র কুরআন বা বিশুদ্ধ হাদিস দলিল সহকারে সেটিকে বানোয়াট প্রতিপন্ন করে অথবা কুরআন ও হাদিসের আলোকিত মূলনীতি ও স্বীকৃত ঘোষণার বিপরীতে তাওরাত বা ইসরাইলি রেওয়ায়েত কোনো ঘটনা বর্ণনা করে অথবা এমন কোনো বিবরণ নকল করে যা কুরআন-হাদিসে নেই এবং যুক্তি ও প্রজ্ঞার নিরিখে সেটিকে অবান্তর ও বানোয়াট মনে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে এ জাতীয় সমস্ত ইসরাইলি রেওয়ায়াত প্রত্যাখ্যাত হবে। কিন্তু একটি ঘটনা পবিত্র কুরআন বা হাদিসে রাসুলে স্পষ্ট বিদ্যমান থাকে আর তাওরাত বা ইসরাইলি সাহিত্যও অনুরূপ ঘটনা উল্লেখ করেছে, তাহলে ঘটনাটি ইসরাইলি সাহিত্যে বিদ্যমান থাকার অজুহাতে বিভ্রান্তিকর অভিহিত করে পবিত্র কুরআনের পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যায় বিকৃতি ও দুর্বল ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া কোনোভাবে জায়েয হতে পারে না। বরং এক্ষেত্রে ইসরাইলি সাহিত্যে বর্ণিত ঘটনাকে কুরআন ও হাদিসে বিবৃত ঘটনার সমর্থনে পেশ করার পূর্ণ অনুমতি রয়েছে।

টিকাঃ
১. আরদুল কুরআন: ১/২৬৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00