📄 কয়েকটি গবেষকণালব্ধ বিষয়
হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার সম্রাজ্ঞীর উল্লিখিত ঘটনার কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণযোগ্য। বিষয়গুলোর সমাধান হওয়াও জরুরি। নিম্নে আমরা ধারাবাহিকতার সঙ্গে বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি-
📄 সাবার সম্রাজ্ঞী কে?
**সাবা কোথায় অবস্থিত?**
সাবার সম্রাজ্ঞীর সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ 'সাইলুল আরিম'-এর আলোচনায় আসবে। এখানে শুধু এতটুকু জেনে রাখাই যথেষ্ট যে, সাবা হলো কাহতানি বংশধারার একটি প্রসিদ্ধ শাখা। তিনি ছিলেন এই গোত্রের ঊর্ধ্বপুরুষ। তার নাম ছিলো উমর বা আবদে শামস। সাবা হচ্ছে উপাধি। আরব গবেষক ও আধুনিক ঐতিহাসিকদের এটাই অভিমত। তবে তাওরাতের বক্তব্য হলো, সাবা ছিলো তার নাম। তিনি ছিলেন খুবই সাহসী ও বীরপুরুষ। চতুর্দিকে তিনি তার বিজয়ঝাণ্ডা উড্ডীনের মাধ্যমে সাবা সম্রাজ্য গড়ে তোলেন। সাবার উত্থানের সময়কাল গবেষকদের মতে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ সাল বলা হয়ে থাকে। কারণ, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালে তার শাসনক্ষমতা ও শক্তিমত্তার উত্থানের কথা দাউদ আ.-এর যাবুরে পাওয়া যায়।¹ তিনি বলেন—
**সাবার সম্রাজ্ঞীর নাম**
পবিত্র কুরআন হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার সম্রাজ্ঞীর ঘটনা আলোচনাকালে সম্রাজ্ঞীর নাম উল্লেখ করে নি। এ বিষয়টিও স্পষ্ট করে নি যে, তিনি সাবার শাসনসীমার তিনটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল ইয়ামান, হাবশা ও উত্তর আরবের মধ্য হতে কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন। কেননা, কুরআনের মূল উদ্দেশ্যের জন্য এ বিষয়গুলো নিষ্প্রয়োজন। তবে আরব ইহুদিদের ইসরাইলি ইতিহাসে তার নাম বলা হয়েছে, বিলকিস। আহলে হাবশা - যারা দাবি করে থাকে যে, তারা সাবার সম্রাজ্ঞীর ও হযরত সুলাইমানের বংশধর - তারা নিজেদের ভাষায় সম্রাজ্ঞীর নাম 'মাকিদাহ' বলে থাকে।
তারগুমে এসেছে, তার রাজত্ব ছিলো ফিলিস্তিনের পূর্বদিকে। আর ইঞ্জিলে এসেছে, ফিলিস্তিনের দক্ষিণে।² ইউসিফুস-এর ইতিহাসে রয়েছে যে, তিনি ছিলেন মিসর ও হাবশার সম্রাজ্ঞী। হাবশার অধিবাসীরা তাকে হাবশি বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে থাকে। হাবশার রাজারা এখনো গর্ব করে বলে থাকে যে, তারা সাবা রানির সন্তান।³
টিকাঃ
১. জিউস ইনসাইক্লোপিডিয়া, 'সাবা'
২. মাত্তা, অধ্যায়: ১২, আয়াত: ৪২। লুকা, অধ্যায় ১১, আয়াত: ৩১
৩. আরদুল কুরআন। ইউসুফিসের ইতিহাস হতে সংগৃহীত। খণ্ড: ১। সুলাইমান আলাইহিস সালাম সংক্রান্ত আলোচনা।
📄 সাবার সম্রাজ্ঞীর রাজসিংহাসন
আমরা হুদহুদ পাখির বয়ানে সাবার সম্রাজ্ঞীর সিংহাসনের বিবরণ জেনেছি।¹ এবং এক্ষেত্রে হযরত সুলাইমান আ.-এর মুজেযার কথাও কুরআনে বর্ণিত রয়েছে যে, তাঁর নির্দেশে চোখের পলকে সিংহাসনটি সাবার দেশ থেকে হযরত সুলাইমানের দরবারে নিয়ে আসা হয়। সিংহাসনটি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি বক্তব্য সামনে রাখতে হবে।
১। সাবার সম্রাজ্ঞীর তার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যে উপঢৌকন পাঠিয়ে ছিলো, হযরত সুলাইমান তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন— أَتُمِدُّونَنِ بِمَالٍ فَمَا آتَانِيَ اللَّهُ خَيْرٌ مِمَّا آتَاكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُونَ () ارْجِعْ إِلَيْهِمْ
'তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাকো। ফিরে যাও তাদের কাছে।' [সুরা নামল]
২। যখন হযরত সুলাইমান আ. জানতে পারেন যে, সাবার সম্রাজ্ঞীর (তাঁর কাছে আসতে) রওয়ানা হয়েছে তখন তিনি তার পারিষদবর্গকে বলেছিলেন— يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ
'হে পারিষদবর্গ, 'তারা আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকিসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?'
৩। তখন সর্বপ্রথম এক দৈত্য-জিন বলেছিলেন, আমি আপনার আজকের দরবার শেষ হওয়ার পূর্বেই তা এখানে এনে হাজির করতে পারবো। আমি আমার দাবি প্রমাণিত করতে সক্ষম। কারণ আমি ভীষণ শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত, আমি মূল্যবান বস্তুর আমানতের হিফাযত করতে সক্ষম। কখনো এতে খিয়ানত করবো না। ইরশাদ হয়েছে— قَالَ عِفْرِيتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ
'জনৈক দৈত্য-জিন বললো, 'আপনি আপনার স্থান থেকে ওঠার পূর্বে আমি তা এনে দেবো এবং আমি এ কাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত।'
৪। হযরত সুলাইমান আ.-এর জনৈক মন্ত্রী তখন বলেন, আমি আপনার চোখের পলক পড়তেই তা আপনার সম্মুখে এনে হাজির করতে পারবো। ইরশাদ হয়েছে— أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ
'আপনার দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেবো।'
৫। সুলাইমান আ. চোখের পলক ফেলতেই দেখতে পেলেন, সিংহাসনটি হাজির। এ দৃশ্য দেখতেই তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, মহান আল্লাহর এত বিশাল অনুগ্রহ প্রকৃতপক্ষে আমার জন্য এ পরীক্ষা যে, আমি কি তার শোকরগুজার বান্দা হচ্ছি না-কি অকৃতজ্ঞ হচ্ছি। ইরশাদ হয়েছে—
فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهُ قَالَ هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ
'অতঃপর সুলাইমান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখলেন, তখন বললেন, এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।'
৬। হযরত সুলাইমান আ. তখন নির্দেশ দিলেন, এই রাজসিংহাসনের অবয়বে পরিবর্তন করো। ইরশাদ হয়েছে—
قَالَ نَكِرُ وا لَهَا عَرْ شَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِي أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ
'সুলাইমান বললেন, বিলকিসের সামনে তার সিংহাসনের আকার-আকৃতি বদলে দাও, দেখবো সে সঠিক বুঝতে পারে, না সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের দিশা নেই?'
সাবার সম্রাজ্ঞীর তার সফর শেষে হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে উপস্থিত হলে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? তিনি বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দিয়ে বলেছিলেন, মনে হয়, এটা সেটাই। ইরশাদ হয়েছে—
فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ
'অতঃপর সে এলে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বললো, মনে হয় এটা সেটাই।'
সিংহাসন সম্পর্কে এই বিবরণ এবং আলোচনার ধারাবাহিকতার প্রতি দৃষ্টি রাখলে পরিষ্কার বুঝে আসবে যে, এখানে কুরআন এমন একটি সিংহাসনের কথা বলেছে, রানির প্রতি পয়গাম প্রেরণের আগেই হুদহুদ তার সংবাদ দিয়েছিলো। এটি সুলাইমান আ.-এর জন্য নির্মিত ছিলো না। কারণ হলো, প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে যে অমূল্য উপঢৌকনসমূহ প্রেরণ করা হয়েছিলো, তার তালিকায় সিংহাসনের নাম নেই। আর সেই উপঢৌকনসমূহ ফেরত পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু সম্রাজ্ঞীর আসার সংবাদ শোনার পর হযরত সুলাইমান আ. তাঁর রাজদরবারে উপনীত হওয়ার পূর্বেই সিংহাসনটি এখানে উপস্থিত করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন। আর সেটিকে হাজির করার সময় এমন বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটেছিলো যে, জিনজাতির মধ্য হতে দৈত্যাকৃতির বিশাল একটি জিন এ অঙ্গীকার করেছিলো যে, আপনার আজকের এই রাজদরবার ভাঙার পূর্বেই আমি তা উঠিয়ে আনতে সক্ষম। কিন্তু হযরত সুলাইমানের জনৈক আস্থাভাজন ব্যক্তি বললেন, আমি চোখের পলকেই সেটিকে হাজির করছি। এবং সে সেটিকে তৎক্ষণাৎ হাজির করতে সক্ষমও হয়। হযরত সুলাইমান আ. তখন মহান আল্লাহর এই বিশাল বিস্ময়কর ক্ষমতা অবলোকন করে প্রথমে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এটিকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকার করেন এবং এরপর তিনি সিংহাসনের কাঠামোয় পরিবর্তন করার নির্দেশ প্রদান করেন। এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর যখন সাবার সম্রাজ্ঞীর হযরত সুলাইমান আ.-এর রাজদরবারে উপস্থিত হন এবং সিংহাসন সম্পর্কে তাদের পরস্পরে প্রশ্নোত্তর হয়, ঘটনার এ পর্যায়েও কিন্তু পবিত্র কুরআন সাবার সম্রাজ্ঞীর কোনো উপঢৌকনের কথা উল্লেখ করে নি।
উল্লিখিত বিবরণের কোথাও আমি আমার পক্ষ থেকে কোনো রূপ ব্যাখ্যার আশ্রয় নিই নি। কোথাও আলোচনাকে আমার ইচ্ছের মোতাবেক করার অভিপ্রায়ে ভাঙ্গতে বা গড়তে যাই নি। কাজেই সিংহাসন কেন্দ্রিক ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অনেক বড় মুজেযা এবং এটি হযরত সুলাইমান আ.-এর নবুয়ত ও রিসালাতের অনেক বড় নিদর্শন। এর বাইরে যদি কেউ অন্যকোনো অর্থ বা ব্যাখ্যা প্রদান করে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাতিল। কারণ হলো, সেটিকে তখন পবিত্র কুরআনের পরিষ্কার ও সরল অংশগুলো এড়িয়ে দাঁড় করাতে হবে, যেমনটি মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি সাহেব করেছেন অথবা সেটির কয়েকটি শব্দ থেকে ভুল ফায়েদা লুটে গোটা ঘটনার মর্মকে বিকৃত করা হবে।
টিকাঃ
১. কতিপয় মুফাসসির বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, হুদহুদ (পাখিটি) ছিলো হযরত সুলাইমান আ.-এর পক্ষ থেকে পানি খোঁজার গোয়েন্দা। কোথাও যদি মাটির নিচে পানি থাকতো আর সৈন্যবাহিনীর পানির প্রয়োজন পড়তো, তখন হুদহুদ এসে জানিয়ে দিতো যে, এখানে এতটুকু গভীরে পানি রয়েছে। তখন হযরত সুলাইমান জিনদেরকে দিয়ে সেখানে খনন করে পানি উত্তোলন করাতেন। তারিখে ইবনে কাসির: ২/২১