📄 সাবার সম্রাজ্ঞীর ঘটনা
পবিত্র কুরআন সুরা নামলে হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার সম্রাজ্ঞীর ঘটনা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। ঘটনার প্রবাহ ও আনুষঙ্গিক বৃত্তান্ত খুবই হৃদয়গ্রাহী। পরিণতি, শিক্ষা ও উপদেশের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ঘটনার বিবরণ নিম্নরূপ-
হযরত সুলাইমান আ.-এর সুবিশাল অদ্বিতীয় রাজদরবারে মানবসম্প্রদায় ছাড়াও জিন ও অন্যান্য প্রাণিকুল শাহি সেবা দান করার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে উপস্থিত থাকতো। তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার শৈথিল্য প্রদর্শন করতো না। একদিনের ঘটনা। হযরত সুলাইমানের শাহি দরবার পূর্ণ রাজকীয় প্রতাপের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হযরত সুলাইমান আ. গোটা দরবার নিরীক্ষণ করার পর লক্ষ্য করলেন, হুদহুদ তার আসনে অনুপস্থিত। বললেন, আমি হুদহুদকে উপস্থিত দেখতে পাচ্ছি না। বাস্তবেই যদি সে অনুপস্থিত থেকে থাকে তবে তার এই বিনাকারণ অনুপস্থিতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। আমি তাকে হয়তো কঠিন দণ্ড দেবো অথবা প্রাণে মেরে ফেলবো। নয়তো তাকে তার এই অনুপস্থিতির যৌক্তিক কারণ বলতে হবে। কিছুক্ষণ পরই হুদহুদ এসে উপস্থিত হলো। হযরত সুলাইমান তাকে অনুপস্থিতির কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বললো, আমি এমন একটি নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি যা আপনি ইতোপূর্বে পান নি। তা হলো, ইয়ামান অঞ্চলে সাবা রাজ্যে এক সম্রাজ্ঞী রয়েছেন। আল্লাহ তাকে সবকিছু দান করেছেন। তাঁর রাজসিংহাসনটি সৌন্দর্যাবলির অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। সম্রাজ্ঞী ও তার জাতি সূর্যপূজারী। শয়তান তাদেরকে বিভ্রান্ত করে রেখেছে। ফলে তারা বিশ্বনিখিলের প্রতিপালক এক আল্লাহর ইবাদত করে না।
হযরত সুলাইমান বললেন, আচ্ছা, তোমার কথা সত্য-মিথ্যার পরীক্ষা এখনই হয়ে যাক। যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে আমার এ পত্র নিয়ে যাও এবং তার কাছে পৌঁছে দাও। আর অপেক্ষা করে শোনো তারা এ ব্যাপারে কী আলোচনা করছে।
হুদহুদ পত্র নিয়ে রানির কোলের ওপর নিক্ষেপ করলো। তিনি পত্র পাঠ করে পারিষদবর্গকে ডেকে বললেন, এইমাত্র আমার কাছে একটি সিলমোহরযুক্ত চিঠি এসেছে। তাতে লেখা আছে, 'এই পত্র সুলাইমানের পক্ষ থেকে : আমি করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করিছ, আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন করো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে (মুসলমান হয়ে) আমার কাছে উপস্থিত হও।'
সম্রাজ্ঞী চিঠি পড়ে শোনানোর পর বললেন, হে আমার পারিষদবর্গ, তোমরা ভালো করেই জানো যে, আমি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তোমাদের পরামর্শ ছাড়া পদক্ষেপ নিই না। এখন পরামর্শ দাও আমার কী করা উচিত।
পারিষদবর্গ বললেন, ভীত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, আমরা খুবই শক্তিশালী ও যুদ্ধবাজ জাতি। তবে পরামর্শের ক্ষেত্রে আমাদের কথা হলো, ফয়সালা আপনার হাতে। আপনি যা সঙ্গত মনে করেন, তা-ই আদেশ করুন।
সম্রাজ্ঞী বললেন, নিশ্চয়ই আমরা শক্তিশালী ও যুদ্ধবাজ জাতি। কিন্তু সুলাইমানের ব্যাপারে আমাদের তাড়াহুড়া করা উচিত হবে না। প্রথমে আমাদেরকে তার শক্তি ও ক্ষমতার ব্যাপারে সম্যক ধারণা পেতে হবে। কেননা, যে বিস্ময়কর পদ্ধতিতে সে আমার কাছে এ চিঠিটি পাঠিয়েছে, তা আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, সুলাইমানের ব্যাপারে ভেবে-চিন্তে কদম ফেলতে হবে। কাজেই আমি চাচ্ছি, প্রথমে আমরা কয়েকজন প্রতিনিধি প্রেরণ করবো। তারা সুলাইমানের জন্য উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান উপঢৌকন নিয়ে যাবে। আর এই সুযোগে তারা তার শক্তিমত্তা ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে আসবে। এ বিষয়টিও জেনে নেয়া যাবে যে, সে আমাদের থেকে কী চায়? বাস্তবেই যদি সে ভীষণ শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান সম্রাজ্যের অধিকারী হয়ে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে আমাদের লড়তে যাওয়া হবে নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। কেননা, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান সম্রাটদের নীতি হলো, তারা কোনো জনপদে বিজয়ীসুলভ প্রতাপ নিয়ে প্রবেশ করলে সেই জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে এবং তার সম্মানিত নাগরিকদেরকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করে। তাই বিনা কারণে ধ্বংস ডেকে আনার প্রয়োজন নেই।
সাবার সম্রাজ্ঞীর প্রতিনিধিদল উপঢৌকন নিযে হযরত সুলাইমান আ.-এর খেদমতে হাজির হলে তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা ও তোমাদের সম্রাজ্ঞী আমার চিঠির উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করেছে। তোমরা কি চাচ্ছো যে, এসব উপঢৌকনের মাধ্যমে যেগুলোকে তোমরা খুবই মূল্যবান মনে করে খুশি বোধ করছো আমাকে ফুসলাবে? অথচ তোমরা দেখতে পাচ্ছো যে, মহান আল্লাহ আমাকে যা দান করেছেন, সেগুলোর মোকাবিলায় তোমাদের এই অতিমূল্যবান উপঢৌকন নিঃসন্দেহে তুচ্ছ। কাজেই তোমরা তোমাদের উপঢৌকন ফেরত নিয়ে যাও। আর তোমাদের রানিকে গিয়ে বলো, যদি তিনি আমার নির্দেশ পালন না করেন তাহলে আমি এমন এক বিশাল সৈন্যবহর নিয়ে সাবার এলাকায় পৌঁছবো যাদের মোকাবিলা করতে তোমরা অক্ষম। আর এরপর আমি তোমাদেরকে লাঞ্ছিত করে শহর থেকে বিতাড়িত করবো। প্রতিনিধিদল ফিরে এসে সম্রাজ্ঞীর কাছে গোটা বৃত্তান্ত উল্লেখ করলো। তারা হযরত সুলাইমানের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির যে দৃশ্য দেখেছে অক্ষরে অক্ষরে তার বিবরণ তুলে ধরলো এবং বললো, তাঁর শাসনকর্তৃত্ব শুধু মানবজাতির ওপর নয়, বিশাল দেহের জিনজাতি ও প্রাণিকুলও তাঁর কর্তৃত্বের অনুগত। সাবার সম্রাজ্ঞীর তাদের বক্তব্য শোনার পর সিদ্ধান্ত নিলেন, যে, হযরত সুলাইমানের সঙ্গে লড়াই করার অর্থ হলো, নিজের ধ্বংস ডেকে আনা। কাজেই তার আহ্বানে সাড়া দেয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
হযরত সুলাইমান আ. তাঁর পত্রে লিখেছিলেন, وَأَتُوْنِي مُسْلِمِينَ সাবার সম্রাজ্ঞী যেহেতু হযরত সুলাইমানের ধর্ম ও রীতি-নীতি সম্পর্কে জানতেন না, এ কারণে তিনি ওই চিঠির মুসলিম শব্দের আভিধানিক অর্থ ধরে নিয়ে মনে করেছিলেন, প্রতাপশালী বাদশাহদের মতো সুলাইমানেরও ইচ্ছে হলো, আমি যেনো তার শাসনকর্তৃত্ব ও রাজশক্তির বশ্যতা স্বীকার করে অধীনতা মেনে নিই। সাবার সম্রাজ্ঞীর তা মেনে নিয়ে যাত্রার প্রস্তুতি নিলেন এবং সুলাইমানের খেদমতে হাজির হওয়ার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন।
হযরত সুলাইমান আ. ওহির মাধ্যমে জেনে ফেললেন যে, সাবার সম্রাজ্ঞীর খেদমতে হাজির হচ্ছেন। তখন তিনি তাঁর পারিষদবর্গকে ডেকে বললেন, আমি চাচ্ছি, সম্রাজ্ঞী সাবা এখানে উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই তাঁর সিংহাসন উঠিয়ে এখানে নিয়ে আসা হোক। তোমাদের মধ্যে কে আছো যে এ কাজ করতে সক্ষম। এ কথা শুনে এক বিশাল দৈত্যাকৃতির জিন বললো, আপনার আজকের দরবার শেষ হওয়ার পূর্বেই আমি তা এখানে এনে হাজির করতে পারবো। আমি সেই শক্তি রাখি। দ্বিতীয়ত, আমি সেই মূল্যবান বস্তুর আমানতের হিফাযত করতে সক্ষম। কখনো এতে খিয়ানত করবো না।
দৈত্যাকৃতির জিনের কথা শেষ হলে হযরত সুলাইমান আ.-এর এক মন্ত্রী বললেন, আমি চোখের পলকেই সেই সিংহাসন আপনার খেদমতে হাজির করতে সক্ষম। হযরত সুলাইমান আ. তার দিকে চেহারা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলেন যে, সাবার সম্রাজ্ঞীর সিংহাসন হাজির। তখন বললেন, এটি আমার প্রতিপালকের দয়া ও অনুগ্রহ। এর মাধ্যমে তিনি আমার পরীক্ষা গ্রহণ করেন যে, আমি এতে শুকরিয়া আদায় করি না-কি অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিই। আর বাস্তবতা হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, প্রকৃতপক্ষে সে নিজেরই উপকার করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করে, আল্লাহ তার অবাধ্যতার কোনো পরোয়া করেন না। তিনি এর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। অবাধ্য ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের পর হযরত সুলাইমান আ. হুকুম করলেন, তার রাজসিংহাসনের অবয়বে পরিবর্তন আনো। আমি দেখতে চাই, সিংহাসনটি দেখার পর সম্রাজ্ঞী তা চিনতে সক্ষম হন না-কি ব্যর্থ হন।
কিছুক্ষণ পর সাবার সম্রাজ্ঞীর হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। দরবারে হাজির হতেই হযরত সুলাইমান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সিংহাসনটি কি এমনই? বুদ্ধিমতী সাবা উত্তর দিলেন, 'মনে হচ্ছে, এটি সেটিই'। অর্থাৎ সিংহাসনটির কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হচ্ছে, এটি আমারই সিংহাসন। তবে আকৃতির পরিবর্তন সেই দৃঢ়তায় সংশয় সৃষ্টি করছে। সুতরাং আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারছি না যে, এটি আমারই সিংহাসন।
সাবার সম্রাজ্ঞীর এ কথাও বললেন, আপনার অদ্বিতীয় রাজশক্তি ও দোর্দণ্ড ক্ষমতার কথা আমি পূর্ব থেকেই জানি। এ কারণে আমি আপনার বশ্যতা স্বীকার করে খেদমতে হাজির হয়েছি। সিংহাসনের এই বিস্ময়কর ঘটনা আমার সামনে আপনার দোর্দণ্ড প্রতাপের জীবন্ত দৃষ্টান্ত পেশ করেছে। যা আমার আনুগত্য ও বশ্যতাকে আরো পোক্ত করেছে। এ কারণে আমি আরেকবার আপনার খেদমতে আপনার প্রতি আমার আনুগত্য ও বিশ্বস্তা স্বীকার করছি।
সম্রাজ্ঞী বিশ্বাস করেছিলেন যে, وَكُنَّا مُسْلِمِينَ (আমরা আজ্ঞাবহ হয়ে গেছি) বলার মাধ্যমে আমি সুলাইমানের নির্দেশ পালন করেছি, তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ করেছি। অথচ তা নয়, বরং সাবার সম্রাজ্ঞীর এতদিনের শিরকাশ্রিত জীবনের চোখ থেকে পর্দা না সরায়, তিনি হযরত সুলাইমানের বার্তার সত্য বুঝতে পারেন নি। সূর্যপূজার পর্দার কারণে তিনি হেদায়েতের মর্ম অনুধাবন করতে পারেন নি। এ কারণে হযরত সুলাইমান আ. তাঁর উদ্দেশ্য বুঝানোর জন্য দ্বিতীয় সূক্ষ্ম পথ অবলম্বন করতে চাইলেন। এ পথেও তিনি তাঁর প্রচণ্ড বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের স্বাক্ষর রাখলেন। এভাবে যে, তিনি প্রথমে জিনজাতির সহায়তায় একটি আলিশান শীষমহল তৈরি করলেন। উজ্জ্বল ঝকঝকে কাঁচের চাকচিক্য, প্রাসাদের বিশালতা ও বিস্ময়কর নির্মাণশিল্পের প্রয়োগের ফলে আলীশান শীষমহলটি ছিলো অতুলনীয় সৌন্দর্যের আধার। শীষমহলের সামনে ছিলো বিশাল বড় একটি আঙ্গিনা। হযরত সুলাইমান আ. সেখানে একটি বিশাল হাউয তৈরি করে জল দিয়ে ভরলেন। তার ওপর অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্বচ্ছ কাঁচের টুকরো দিয়ে এমন চমৎকার মেঝে নির্মাণ করলেন যে, যে কোনো পর্যটকের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটতো। মনে করতো, এই আঙ্গিনায় পরিষ্কার পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
সাবার সম্রাজ্ঞীকে বলা হলো, আপনি এই রাজপ্রাসাদে আরাম করুন। সম্রাজ্ঞী যখন রাজপ্রাসাদের সামনে পৌছুলেন, তখন তিনি মনে করলেন, এখানে তো পরিষ্কার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তাই তিনি পানিতে অবতরণের জন্য পায়ের গোড়ালি থেকে কাপড় উপরের দিকে টেনে তুললেন। তখন হযরত সুলাইমান আ. বললেন, এর কোনো প্রয়োজন নেই। এটি পানি নয়। গোটা রাজপ্রাসাদ ও তার সামনের এই ঝকঝকে আঙ্গিনাটি আদ্যোপান্ত কাঁচের তৈরি।
ঘটনাটি সম্রাজ্ঞীর মেধা ও বুদ্ধিমত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেললো। এবার তাঁর চিন্তাশক্তি জাগ্রত হলো যে, আমাকে এখন অবশ্যই বাস্তবতার গভীরে যেতে হবে। তিনি তখন বুঝতে সক্ষম হলেন যে, এতক্ষণ ধরে যা কিছু হচ্ছে এটি প্রতাপশালী মহাসম্রাটের শক্তির প্রদর্শনী নয়, বরং তিনি এগুলোর মাধ্যমে আমাকে বুঝাতে চাইছেন যে, সুলাইমানের এই অদ্বিতীয় রাজশক্তি ও মুজেযাসুলভ শক্তিমত্তা এমন কোনো সত্তার দান, যিনি শুধু জমিনের-ই মালিক নন, বরং চন্দ্র-সূর্যের ওপরও তার প্রভুত্ব। কাজেই এ সব ঘটনার মাধ্যমে সুলাইমান আমাকে শুধু তাঁর নিজের আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকারের দিকে আহ্বান করছেন না, বরং সেই 'একক সত্তা'-এর অধীনতা ও আনুগত্য স্বীকার করতে আহ্বান করছেন। এটাই তাঁর উদ্দেশ্য।
সম্রাজ্ঞীর মনে এই ভাবনা উদিত হতেই তিনি হযরত সুলাইমান আ.-এর সামনে দাঁড়িয়ে একজন অনুতপ্ত ও অনুশোচনা পীড়িত মানুষের মতো মহান আল্লাহর উদ্দেশে হাত তুলে বললেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আজ পর্যন্ত আমি গায়রুল্লাহর উপাসনা করার মাধ্যমে আমার নিজের ওপর বড় জুলুম করেছি। কিন্তু এখন আমি সুলাইমানের সঙ্গী হয়ে একক আল্লাহর ওপর ঈমান আনছি। যিনি গোটা বিশ্বজগতের প্রতিপালক।' এভাবে ইয়ামানের সাবার সম্রাজ্ঞীর হযরত সুলাইমান আ.-এর বার্তা وَأَتُوْنِي مُسْلِمِينَ )মুসলমান হয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও)-এর উদ্দেশ্য উপলবদ্ধি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
কুরআনুর কারিম সাবার সম্রাজ্ঞীর ঘটনা অলৌকিক সংক্ষেপে উপস্থাপন করেছে যে, ঘটনা বর্ণনা করার পেছনে মূল লক্ষ্য যে 'নসিহত প্রদান করা', সেটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘটনারগুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোও উল্লেখ করা হয়েছে। উপরন্তু এটাও জানা গেছে যে, এর আগের আয়াতসমূহে হযরত সুলাইমান আ.-কে পাখির ভাষা বোঝার যে ক্ষমতা দান করার কথা বলা হয়েছিলো তা প্রমাণের জন্য এটি দ্বিতীয় ঘটনা যা হুদহুদের সঙ্গে হযরত সুলাইমান আ.-এর আলাপচারিতার দ্বারা শুরু হয়েছে-
وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَا لِيَ لَا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ () لَأُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا شَدِيدًا أَوْ لأَذْبَحَنَّهُ أَوْ لَيَأْتِيَنِي بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ () فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطْتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَإٍ بِنَبَإٍ يَقِينٍ () إِنِّي وَجَدْتُ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشُ عَظِيمٌ () وَجَدْتُهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ () أَلَّا يَسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُونَ وَمَا تُعْلِنُونَ () اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
() قَالَ سَنَنْظُرُ أَصَدَقْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَاذِبِينَ () اِذْهَبْ بِكِتَابِي هَذَا فَأَلْقِهِ إِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّ عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَاذَا يَرْجِعُونَ () قَالَتْ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ إِنِّي أُلْقِيَ إِلَيَّ كِتَابٌ كَرِيمٌ ( إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ () أَلَّا تَعْلُوا عَلَيَّ وَأْتُونِي مُسْلِمِينَ () قَالَتْ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي أَمْرِي مَا كُنْتُ قَاطِعَةً أَمْرًا حَتَّى تَشْهَدُونِ () قَالُوا نَحْنُ أُولُو قُوَّةٍ وَأُولُو بَأْسٍ شَدِيدٍ وَالْأَمْرُ إِلَيْكِ فَانْظُرِي مَاذَا تَأْمُرِينَ () قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةٌ وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ () وَإِنِّي مُرْسِلَةٌ إِلَيْهِمْ بِهَدِيَّةٍ فَنَاظِرَةٌ بِمَ يَرْجِعُ الْمُرْسَلُونَ () فَلَمَّا جَاءَ سُلَيْمَانَ قَالَ أَتُمِدُّونَنِ بِمَالٍ فَمَا آتَانِيَ اللَّهُ خَيْرٌ مِمَّا آتَاكُمْ بَلْ أَنتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُونَ () اِرْجِعْ إِلَيْهِمْ فَلَنَأْتِيَنَّهُمْ بِجُنُودٍ لَا قِبَلَ لَهُمْ بِهَا وَلَنُخْرِ جَنَّهُمْ مِنْهَا أَذِلَّةٌ وَهُمْ صَاغِرُونَ () قَالَ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ ()
قَالَ عِفْرِيتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ () قَالَ الَّذِي عِنْدَهُ عِلْمٌ مِنَ الْكِتَابِ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهُ قَالَ هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ وَمَنْ شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ () قَالَ نَكِّرُوا لَهَا عَرْشَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِي أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ () فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ وَأُوتِينَا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهَا وَكُنَّا مُسْلِمِينَ () وَصَدَّهَا مَا كَانَتْ تَعْبُدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِينَ () قِيلَ لَهَا
اُدْخُلِي الصَّرْحَ فَلَمَّا رَأَتُهُ حَسِبَتُهُ لُجَّةٌ وَكَشَفَتْ عَنْ سَاقَيْهَا قَالَ إِنَّهُ صَرْحٌ مُمَرَّدٌ مِنْ قَوَارِيرَ قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ()
'সুলাইমান পক্ষীদের খোঁজ-খবর নিলেন, অতঃপর বললেন, কি হলো, হুদহুদকে দেখছি না কেন? না-কি সে অনুপস্থিত? আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেবো কিংবা হত্যা করবো অথবা সে উপস্থিত করবে উপযুক্ত কারণ। কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ এসে বললো, 'আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার কাছে 'সাবা' থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি। আমি এক নারীকে সাবাবাসীদের ওপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার নিকট একটি বিরাট সিংহাসন রয়েছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলি সুশোভিত করে দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। অতএব তারা সৎপথ পায় না। তারা আল্লাহকে সেজদা করে না কেন, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের গোপন বস্তু প্রকাশ করেন এবং জানেন যা তোমরা গোপন করো ও যা প্রকাশ করো। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; তিনি মহা-আরশের মালিক। সুলাইমান বললো, 'এখন আমি দেখবো তুমি সত্য বলছো, না তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি আমার এ পত্র নিয়ে যাও এবং এটা তাদের কাছে অর্পণ করো। অতঃপর তাদের কাছ থেকে সরে পড়ো এবং দেখো, তারা কী জওয়াব দেয়? বিলকিস বললো, হে পারিষদবর্গ, আমাকে একটি সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে। সেই পত্র সুলাইমানের পক্ষ থেকে এবং তা এই, অসীম দাতা, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু; আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন করো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও।'
বিলকিস বললো, হে পারিষদবর্গ, আমাকে আমার কাছে পরামর্শ দাও। তোমাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোনো কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। তারা বললো, আমরা শক্তিশালী এবং কঠোর যোদ্ধা। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই। অতএব আপনি ভেবে দেখুন, আমাদেরকে কি আদেশ করবেন। সে বললো, রাজা-বাদশাহরা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে, তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকে অপদস্থ করে। তারাও এরূপই করবে। আমি তাঁর কাছে কিছু উপঢৌকন পাঠাচ্ছি; দেখি, প্রেরিত লোকেরা কী জওয়াব আনে। অতঃপর যখন দূত সুলাইমানের কাছে আগমন করলো, তখন সুলাইমান বললেন, তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাকো। ফিরে যাও তাদের কাছে। এখন অবশ্যই আমি তাদের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসবো, যার মোকাবিলা করার শক্তি তাদের নেই। আমি অবশ্যই তাদেরকে অপদস্থ করে সেখান থেকে বহিষ্কৃত করবো এবং তারা হবে লাঞ্ছিত। সুলাইমান বললেন, হে পারিষদবর্গ, 'তারা আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকিসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে? জনৈক দৈত্য-জিন বললো, 'আপনি আপনার স্থান থেকে ওঠার পূর্বে আমি তা এনে দেবো এবং আমি এ কাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত। কিতাবের জ্ঞান যার ছিলো, সে বললো, আপনার দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেবো। অতঃপর সুলাইমান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখলেন, তখন বললেন, এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল। সুলাইমান বললেন, বিলকিসের সামনে তার সিংহাসনের আকার-আকৃতি বদলে দাও, দেখবো সে সঠিক বুঝতে পারে, না সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের দিশা নেই? অতঃপর যখন বিলকিস এসে গেলো, তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বললো, মনে হয় এটা সেটাই। আমরা পূর্বেই সমস্ত অবগত হয়েছি এবং আমরা আজ্ঞাবহও হয়ে গেছি। আল্লাহর পরিবর্তে সে যার উপাসনা করতো, সেই তাকে ঈমান থেকে নিবৃত্ত করেছিলো। নিশ্চয়ই সে কাফের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তাকে বলা হলো, এ প্রাসাদে প্রবেশ করো। যখন সে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলো সে ধারণা করলো যে, এটা স্বচ্ছ গভীর জলাশয়। সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেললো। সুলাইমান বললো, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ। বিলকিস বললো, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলাইমানের সঙ্গে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম।' [সুরা আন-নামল: ২০-৪৪]
📄 কয়েকটি গবেষকণালব্ধ বিষয়
হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার সম্রাজ্ঞীর উল্লিখিত ঘটনার কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণযোগ্য। বিষয়গুলোর সমাধান হওয়াও জরুরি। নিম্নে আমরা ধারাবাহিকতার সঙ্গে বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি-
📄 সাবার সম্রাজ্ঞী কে?
**সাবা কোথায় অবস্থিত?**
সাবার সম্রাজ্ঞীর সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ 'সাইলুল আরিম'-এর আলোচনায় আসবে। এখানে শুধু এতটুকু জেনে রাখাই যথেষ্ট যে, সাবা হলো কাহতানি বংশধারার একটি প্রসিদ্ধ শাখা। তিনি ছিলেন এই গোত্রের ঊর্ধ্বপুরুষ। তার নাম ছিলো উমর বা আবদে শামস। সাবা হচ্ছে উপাধি। আরব গবেষক ও আধুনিক ঐতিহাসিকদের এটাই অভিমত। তবে তাওরাতের বক্তব্য হলো, সাবা ছিলো তার নাম। তিনি ছিলেন খুবই সাহসী ও বীরপুরুষ। চতুর্দিকে তিনি তার বিজয়ঝাণ্ডা উড্ডীনের মাধ্যমে সাবা সম্রাজ্য গড়ে তোলেন। সাবার উত্থানের সময়কাল গবেষকদের মতে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ সাল বলা হয়ে থাকে। কারণ, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালে তার শাসনক্ষমতা ও শক্তিমত্তার উত্থানের কথা দাউদ আ.-এর যাবুরে পাওয়া যায়।¹ তিনি বলেন—
**সাবার সম্রাজ্ঞীর নাম**
পবিত্র কুরআন হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার সম্রাজ্ঞীর ঘটনা আলোচনাকালে সম্রাজ্ঞীর নাম উল্লেখ করে নি। এ বিষয়টিও স্পষ্ট করে নি যে, তিনি সাবার শাসনসীমার তিনটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল ইয়ামান, হাবশা ও উত্তর আরবের মধ্য হতে কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন। কেননা, কুরআনের মূল উদ্দেশ্যের জন্য এ বিষয়গুলো নিষ্প্রয়োজন। তবে আরব ইহুদিদের ইসরাইলি ইতিহাসে তার নাম বলা হয়েছে, বিলকিস। আহলে হাবশা - যারা দাবি করে থাকে যে, তারা সাবার সম্রাজ্ঞীর ও হযরত সুলাইমানের বংশধর - তারা নিজেদের ভাষায় সম্রাজ্ঞীর নাম 'মাকিদাহ' বলে থাকে।
তারগুমে এসেছে, তার রাজত্ব ছিলো ফিলিস্তিনের পূর্বদিকে। আর ইঞ্জিলে এসেছে, ফিলিস্তিনের দক্ষিণে।² ইউসিফুস-এর ইতিহাসে রয়েছে যে, তিনি ছিলেন মিসর ও হাবশার সম্রাজ্ঞী। হাবশার অধিবাসীরা তাকে হাবশি বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে থাকে। হাবশার রাজারা এখনো গর্ব করে বলে থাকে যে, তারা সাবা রানির সন্তান।³
টিকাঃ
১. জিউস ইনসাইক্লোপিডিয়া, 'সাবা'
২. মাত্তা, অধ্যায়: ১২, আয়াত: ৪২। লুকা, অধ্যায় ১১, আয়াত: ৩১
৩. আরদুল কুরআন। ইউসুফিসের ইতিহাস হতে সংগৃহীত। খণ্ড: ১। সুলাইমান আলাইহিস সালাম সংক্রান্ত আলোচনা।
📄 সাবার সম্রাজ্ঞীর রাজসিংহাসন
আমরা হুদহুদ পাখির বয়ানে সাবার সম্রাজ্ঞীর সিংহাসনের বিবরণ জেনেছি।¹ এবং এক্ষেত্রে হযরত সুলাইমান আ.-এর মুজেযার কথাও কুরআনে বর্ণিত রয়েছে যে, তাঁর নির্দেশে চোখের পলকে সিংহাসনটি সাবার দেশ থেকে হযরত সুলাইমানের দরবারে নিয়ে আসা হয়। সিংহাসনটি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি বক্তব্য সামনে রাখতে হবে।
১। সাবার সম্রাজ্ঞীর তার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যে উপঢৌকন পাঠিয়ে ছিলো, হযরত সুলাইমান তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন— أَتُمِدُّونَنِ بِمَالٍ فَمَا آتَانِيَ اللَّهُ خَيْرٌ مِمَّا آتَاكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بِهَدِيَّتِكُمْ تَفْرَحُونَ () ارْجِعْ إِلَيْهِمْ
'তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাকো। ফিরে যাও তাদের কাছে।' [সুরা নামল]
২। যখন হযরত সুলাইমান আ. জানতে পারেন যে, সাবার সম্রাজ্ঞীর (তাঁর কাছে আসতে) রওয়ানা হয়েছে তখন তিনি তার পারিষদবর্গকে বলেছিলেন— يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ
'হে পারিষদবর্গ, 'তারা আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকিসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?'
৩। তখন সর্বপ্রথম এক দৈত্য-জিন বলেছিলেন, আমি আপনার আজকের দরবার শেষ হওয়ার পূর্বেই তা এখানে এনে হাজির করতে পারবো। আমি আমার দাবি প্রমাণিত করতে সক্ষম। কারণ আমি ভীষণ শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত, আমি মূল্যবান বস্তুর আমানতের হিফাযত করতে সক্ষম। কখনো এতে খিয়ানত করবো না। ইরশাদ হয়েছে— قَالَ عِفْرِيتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ
'জনৈক দৈত্য-জিন বললো, 'আপনি আপনার স্থান থেকে ওঠার পূর্বে আমি তা এনে দেবো এবং আমি এ কাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত।'
৪। হযরত সুলাইমান আ.-এর জনৈক মন্ত্রী তখন বলেন, আমি আপনার চোখের পলক পড়তেই তা আপনার সম্মুখে এনে হাজির করতে পারবো। ইরশাদ হয়েছে— أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ
'আপনার দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেবো।'
৫। সুলাইমান আ. চোখের পলক ফেলতেই দেখতে পেলেন, সিংহাসনটি হাজির। এ দৃশ্য দেখতেই তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, মহান আল্লাহর এত বিশাল অনুগ্রহ প্রকৃতপক্ষে আমার জন্য এ পরীক্ষা যে, আমি কি তার শোকরগুজার বান্দা হচ্ছি না-কি অকৃতজ্ঞ হচ্ছি। ইরশাদ হয়েছে—
فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهُ قَالَ هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ
'অতঃপর সুলাইমান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখলেন, তখন বললেন, এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।'
৬। হযরত সুলাইমান আ. তখন নির্দেশ দিলেন, এই রাজসিংহাসনের অবয়বে পরিবর্তন করো। ইরশাদ হয়েছে—
قَالَ نَكِرُ وا لَهَا عَرْ شَهَا نَنْظُرْ أَتَهْتَدِي أَمْ تَكُونُ مِنَ الَّذِينَ لَا يَهْتَدُونَ
'সুলাইমান বললেন, বিলকিসের সামনে তার সিংহাসনের আকার-আকৃতি বদলে দাও, দেখবো সে সঠিক বুঝতে পারে, না সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের দিশা নেই?'
সাবার সম্রাজ্ঞীর তার সফর শেষে হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে উপস্থিত হলে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? তিনি বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দিয়ে বলেছিলেন, মনে হয়, এটা সেটাই। ইরশাদ হয়েছে—
فَلَمَّا جَاءَتْ قِيلَ أَهَكَذَا عَرْشُكِ قَالَتْ كَأَنَّهُ هُوَ
'অতঃপর সে এলে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বললো, মনে হয় এটা সেটাই।'
সিংহাসন সম্পর্কে এই বিবরণ এবং আলোচনার ধারাবাহিকতার প্রতি দৃষ্টি রাখলে পরিষ্কার বুঝে আসবে যে, এখানে কুরআন এমন একটি সিংহাসনের কথা বলেছে, রানির প্রতি পয়গাম প্রেরণের আগেই হুদহুদ তার সংবাদ দিয়েছিলো। এটি সুলাইমান আ.-এর জন্য নির্মিত ছিলো না। কারণ হলো, প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে যে অমূল্য উপঢৌকনসমূহ প্রেরণ করা হয়েছিলো, তার তালিকায় সিংহাসনের নাম নেই। আর সেই উপঢৌকনসমূহ ফেরত পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু সম্রাজ্ঞীর আসার সংবাদ শোনার পর হযরত সুলাইমান আ. তাঁর রাজদরবারে উপনীত হওয়ার পূর্বেই সিংহাসনটি এখানে উপস্থিত করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন। আর সেটিকে হাজির করার সময় এমন বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটেছিলো যে, জিনজাতির মধ্য হতে দৈত্যাকৃতির বিশাল একটি জিন এ অঙ্গীকার করেছিলো যে, আপনার আজকের এই রাজদরবার ভাঙার পূর্বেই আমি তা উঠিয়ে আনতে সক্ষম। কিন্তু হযরত সুলাইমানের জনৈক আস্থাভাজন ব্যক্তি বললেন, আমি চোখের পলকেই সেটিকে হাজির করছি। এবং সে সেটিকে তৎক্ষণাৎ হাজির করতে সক্ষমও হয়। হযরত সুলাইমান আ. তখন মহান আল্লাহর এই বিশাল বিস্ময়কর ক্ষমতা অবলোকন করে প্রথমে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এটিকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকার করেন এবং এরপর তিনি সিংহাসনের কাঠামোয় পরিবর্তন করার নির্দেশ প্রদান করেন। এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর যখন সাবার সম্রাজ্ঞীর হযরত সুলাইমান আ.-এর রাজদরবারে উপস্থিত হন এবং সিংহাসন সম্পর্কে তাদের পরস্পরে প্রশ্নোত্তর হয়, ঘটনার এ পর্যায়েও কিন্তু পবিত্র কুরআন সাবার সম্রাজ্ঞীর কোনো উপঢৌকনের কথা উল্লেখ করে নি।
উল্লিখিত বিবরণের কোথাও আমি আমার পক্ষ থেকে কোনো রূপ ব্যাখ্যার আশ্রয় নিই নি। কোথাও আলোচনাকে আমার ইচ্ছের মোতাবেক করার অভিপ্রায়ে ভাঙ্গতে বা গড়তে যাই নি। কাজেই সিংহাসন কেন্দ্রিক ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অনেক বড় মুজেযা এবং এটি হযরত সুলাইমান আ.-এর নবুয়ত ও রিসালাতের অনেক বড় নিদর্শন। এর বাইরে যদি কেউ অন্যকোনো অর্থ বা ব্যাখ্যা প্রদান করে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাতিল। কারণ হলো, সেটিকে তখন পবিত্র কুরআনের পরিষ্কার ও সরল অংশগুলো এড়িয়ে দাঁড় করাতে হবে, যেমনটি মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি সাহেব করেছেন অথবা সেটির কয়েকটি শব্দ থেকে ভুল ফায়েদা লুটে গোটা ঘটনার মর্মকে বিকৃত করা হবে।
টিকাঃ
১. কতিপয় মুফাসসির বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, হুদহুদ (পাখিটি) ছিলো হযরত সুলাইমান আ.-এর পক্ষ থেকে পানি খোঁজার গোয়েন্দা। কোথাও যদি মাটির নিচে পানি থাকতো আর সৈন্যবাহিনীর পানির প্রয়োজন পড়তো, তখন হুদহুদ এসে জানিয়ে দিতো যে, এখানে এতটুকু গভীরে পানি রয়েছে। তখন হযরত সুলাইমান জিনদেরকে দিয়ে সেখানে খনন করে পানি উত্তোলন করাতেন। তারিখে ইবনে কাসির: ২/২১