📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফয়সালা

📄 ফয়সালা


এ দুটি তাফসিরে কিছু কথা থেকে যায়। প্রথম ব্যাখ্যা, যেটিকে ইমাম রাযি. রহ. গ্রহণ করেছেন, সেটি সম্পূর্ণ অনুমান-নির্ভর ব্যাখ্যা। সেখানে আয়াতগুলোর এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে, যা অনেক দূরবর্তী ব্যাখ্যা ছাড়া কিছু নয়। এতটুকু না হয় মানার মতো যে, আল্লাহর দরবারের নৈকট্যশীলদের জন্য কখনো কখনো অসুস্থতাও পরীক্ষা হয়ে থাকে। কিন্তু 'হযরত সুলাইমানের সিংহাসনের ওপর দেহ নিক্ষেপ' দ্বারা প্রচণ্ড দুর্বলতার সঙ্গে তাঁর সিংহাসনে আরোহণ উদ্দেশ্য নেওয়া সহজ বোধগম্যতার পরিপন্থী। আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝে আসে যে, তাঁর সিংহাসনের ওপর কোনো কিছু ফেলা হয়েছিলো; হযরত সুলাইমানের পরীক্ষার সঙ্গে সেটির সংশ্লিষ্টতাও ছিলো। দ্বিতীয়ত ابواب শব্দ দ্বারা পবিত্র কুরআন বিভিন্ন স্থানে 'মাগফিরাত কামনা ও নিজের দাসত্ব প্রকাশের জন্য আল্লাহমুখী হওয়া' উদ্দেশ্য নিয়েছে। কাজেই এখানে 'সুস্থতা লাভ' অর্থ নেওয়া পছন্দনীয় নয়।
তদ্রূপ মুহাদ্দিসিনে কেরামের কেউ কেউ যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যে পথে আবুস সাউদ ও সাইয়িদ মাহমুদ আলুসি রহ. হেঁটেছেন, সেটিও আলোচ্য আয়াতসমূহের তাফসির নয়। কারণ হলো, বুখারি শরিফসহ অন্যান্য হাদিসের কিতাবের যেখানেই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, তার কোনো একটি সনদে এমন কোনো কথা নবীজি থেকে বা হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত নেই যে, উল্লিখিত ঘটনাটি আমাদের আলোচিত আয়াসমূহের তাফসির। এমনকি এদিকে ইশারা পর্যন্ত নেই। বরং এ হাদিসটি হযরত সুলাইমান আ.-এর একটি স্বতন্ত্র ঘটনা উল্লেখ করেছে। যেভাবে হযরত বুখারি রহ. উল্লিখিত অধ্যায়ে তাঁর আরো অনেক ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। যেমন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছন, হযরত সুলাইমান আ.-এর যুগে দুই মহিলা একসঙ্গে সফর করছিলো। দু-জনের সঙ্গেই ছিলো দুগ্ধপোষ্য শিশু। পথিমধ্যে একজনের শিশুকে চিতাবাঘ উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো। এখন যে শিশুটি রয়ে গেছে, তাকে নিয়ে দুই নারীই ঝগড়া বাঁধিয়ে দিলো। তারা দু-জনই দাবি করলো যে, এটি তার নিজের শিশু। চিতাবাঘ অন্যজনের শিশু নিয়ে গেছে। হযরত দাউদ আ.-এর কাছে মামলাটি উত্থাপন হলে তিনি 'বিবাদ নিরসনের নীতিমালা' অনুযায়ী উভয় পক্ষের বৃত্তান্ত শুনে বড়জনের পক্ষে রায় দিয়ে দিলেন। কেননা, বড়জনের দখলেই শিশুটি ছিলো। আর ছোটজন তার দখলের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য পেশ করতে পারছিলো না। যখন এই দুই মহিলা ফেরার পথে হযরত সুলাইমান আ.-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি তাদের মামলার বৃত্তান্ত শোনলেন। এরপর নির্দেশ দিলেন, একটি ছুরি নিয়ে এসো। এই শিশুকে দুখণ্ড করে তাদের দু-জনকে একটি করে খণ্ড দিয়ে দাও। রায় শুনে বড়জন নিশ্চুপ ছিলো কিন্তু ছোটজন হাউ-মাউ করে কেঁদে-কেটে একাকার করে ফেললো। বললো, আল্লাহর ওয়াস্তে এ বাচ্চাকে দু-টুকরো করবেন না। আমি এটিকে বড়জনের কাছে দিয়ে আমার অধিকার প্রত্যাহার করছি। তখন সকলেরই বিশ্বাস হলো, এ শিশুটি ছোটজনের। বড়জন একজন মিথ্যাবাদী। কাজেই তখন ছোটজনের হাতে শিশুটিকে সোপর্দ করা হলো।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সুলাইমান আ.-এর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গভীর মেধা প্রসঙ্গে উল্লিখিত ঘটনাটি বলেছিলেন। এভাবে হযরত সুলাইমান আ. ও তাঁর স্ত্রীদের ঘটনা এজন্য শুনিয়েছিলেন যে, উম্মত যেনো এর থেকে শিক্ষা অর্জন করে। তারা যদি তাদের কাজকর্মে কল্যাণ ও বরকত কামনা করে তাহলে যেনো সে কাজটি করার সংকল্প ব্যক্ত করার সময় 'ইনশাআল্লাহ' অবশ্যই বলে নেয়। সম্ভবত এটাও উদ্দেশ্য হতে পারে যে, ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ যখন ওই ঘটনাটি শুনাতেন, হযরত সুলাইমান আ.-এর পুণ্যবতী স্ত্রী ও বাঁদির সংখ্যা এক হাজার বলতেন। এ কারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘটনার মূল বাস্তবতা প্রকাশ করে দিয়ে বলেন, তাদের সংখ্যা ষাট জন। তবে কিছু কিছু বর্ণনায় এসেছে, একশো জন। যার মধ্য হতে কয়েকজন ছিলেন স্ত্রী। আর অন্যরা হচ্ছেন তার বাঁদি।¹ মোটকথা, আলোচিত বর্ণনাটি উপদেশ ও শিক্ষামূলক আলোচনা প্রসঙ্গে বিবৃত হয়েছে। উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই আমাদের আলোচনার সারাংশ হলো, ইমাম রাযিসহ কতিপয় মুহাদ্দিসিন যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা হযরত সুলাইমান আ.-এর পরীক্ষা ও তাঁর সিংহাসনের ওপর একটি দেহ নিক্ষেপের ঘটনার সমাধান দিতে সক্ষম নয়। যদিও আয়াতসমূহে উল্লেখিত দুটি বিষয় সংক্ষেপে বলা হয়েছে, কিন্তু এর থেকে কী শিক্ষা ও উপদেশ অর্জিত হয়, তা কিন্তু বেশ স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আর পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা পেশ করার পেছনে এটাই উদ্দেশ্য। কাজেই আমাদের কর্তব্য হলো, সেই উপদেশকে ধারণ করে তার থেকে অর্জিত শিক্ষা গ্রহণ করা এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত রূপের ওপর বিশ্বাস রাখা। হ্যাঁ, যদি কোনো ব্যক্তির হৃদয় সেই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় তৃপ্তি লাভ না করে, তাহলে তার জন্য ইমাম রাযি রহ.- এর পেশ করা ব্যাখ্যা গ্রহণ করাই অধিক সঙ্গত।
উল্লিখিত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা হিসেবে উল্লিখিত তাফসির ছাড়াও এমন অনেক বর্ণনা তাফসিরের কিতাবসমূহে পাওয়া যায়, যার সঙ্গে ইসলামি বর্ণনার কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই। নিঃসন্দেহে সেগুলোর সবক'টি ইহুদিদের তৈরি বানোয়াট গাল-গল্প, ইসরাইলি রেওয়ায়াত। সেগুলোকে রেওয়ায়েত বললেও রেওয়ায়েত শব্দের অপমান হয়।
সেই অলীক বর্ণনাগুলোর সারকথা হলো, কিছু সময়ের জন্য আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান আ.-এর সিংহাসনের ওপর শয়তানকে দখলদার বানিয়ে দেন। এর নেপথ্যে অনেকগুলো কারণের কথা বলা হয়। যার একটি কারণ হলো, হযরত সুলাইমানের এক স্ত্রী ছিলো মূর্তিপূজারী। তার নাম ছিলো আমিনা। সে তার পিতার মূর্তি বানিয়ে পূজা করতো। এ কারণে আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান আ.-কে এ শাস্তি দেন যে, যতটা সময় আমিনা তার গৃহে মূর্তিপূজা করতো, ততটা সময় তিনি সিংহাসন থেকে বঞ্চিত থাকতেন। হযরত সুলাইমানের একটি আংটির ওপর ইসমে আযম লেখা ছিলো। আংটিটি তাঁর বাঁদি জারাদাহ-এর মাধ্যমে শয়তানের হাতে চলে যায়। তখন শয়তান হযরত সুলাইমানের আকৃতি ধারণ করে সিংহাসনের ওপর বসে রাজত্ব করতে থাকে। মূর্তিপূজার নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়ার পর আংটিটি শয়তানের হাত থেকে সমুদ্রে পড়ে যায়। একটি মাছ এসে সেটি গিলে ফেলে। হযরত সুলাইমান আ. ওই মাছটি শিকার করে তার পেট ফেড়ে আংটি বের করেন। এভাবে তিনি তার রাজত্ব ফিরে পান।

টিকাঃ
১. নাজ্জার এ স্থানের তাফসিরে তৃতীয় একটি পথ অবলম্বন করেছেন। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, সেটি অন্ধের তীর ছোঁড়া বৈ অন্য কিছু নয়। বাস্তবতার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। এর জন্য কাসাসুল আম্বিয়া: ৩৯২ অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00