📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ২য় তাফসির

📄 ২য় তাফসির


হযরত হাসান বসরি রহ.-এর সূত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, মূল ঘটনাটি ছিলো, জিহাদের অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে হযরত সুলাইমান আ. ঘোড়াগুলোকে হাজির করার নির্দেশ প্রদান করেন। যথারীতি হাজির করা হয়। এরপর প্রথম তাফসির অনুযায়ী যা ঘটার ঘটে যায়, তখন হযরত সুলাইমান আ. সেগুলোকে ফিরিয়ে এনে সেগুলোর পা ও গর্দানের ওপর মৃদু প্রহার করে বললেন, আগত সময়ে তোমরা যেনো আমার আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হওয়ার কারণ না হও।
এই তাফসির অনুযায়ী আয়াতে উল্লিখিত مسح শব্দের অর্থ, মৃদু প্রহার করা। কাজেই তখন উদ্দেশ্য হবে, যদিও জিহাদের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকাটাই গাফলতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা সত্ত্বেও হযরত সুলাইমান আ. বাহ্যিক কারণ হিসেবে ঘোড়াগুলোকেই চিহ্নিত করে সেগুলোর সঙ্গে এই আচরণ করেছেন। যে আচরণ থেকে সার্বিকভাবে দুঃখের প্রকাশ ঘটে। এটাও বুঝে আসে যে, তিনি সেগুলোকে মূক প্রাণী মনে করে সেগুলোকে নিজের ক্রোধ ঝারার পাত্র বানাতে চান নি, বরং তিনি শুধু দুঃখই প্রকাশ করতে চেয়েছেন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ৩য় তাফসির

📄 ৩য় তাফসির


আলি ইবনে আবি তালহার সূত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে তৃতীয় যে তাফসিরটি বর্ণিত রয়েছে তা প্রথম দুটি তাফসির থেকে আলাদা। সেখানে নামায কাযা হওয়া, সূর্যাস্ত যাওয়া, ঘোড়াগুলোকে যবেহ করা, এর কোনোটাই নেই। বরং ঘটনার বিবরণে প্রকাশ যে, জিহাদের একটি অভিযানে একদিন সন্ধ্যার সময় হযরত সুলাইমান আ. জিহাদের ঘোড়াগুলোকে আস্তাবলে নিয়ে আসার আদেশ করলেন। তিনি ঘোড়ার বংশ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, সবকটি-ই দ্রুতগামী ও দৃষ্টিনন্দন। সংখ্যায়ও প্রচুর। এ কারণে তিনি খুব খুশি হন এবং বলেন, এই ঘোড়াগুলোর জন্য আমার এ ভালোবাসা এমন বস্তুজাগতিক ভালোবাসা, যা আমার পালনকর্তার স্মরণেরই একটি অংশ। হযরত সুলাইমান আ. এমন চিন্ত করছিলেন। এর মধ্যেই ঘোড়াগুলো আস্তাবলের উদ্দেশে রওয়ানা হলো। তিনি সেগুলোর দিকে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি উঠালেন, ততক্ষণে সেগুলো দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। তিনি সেগুলোকে ফিরিয়ে আনতে বললেন। সেগুলো ফিরিয়ে আনার পর তিনি ভালোবাসা ও যুদ্ধের বাহনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনার্থে সেগুলোর পাদদেশ ও গলদেশে হাত বুলিয়ে দিলেন। স্নেহ করলেন ও মমতা দিলেন।
উল্লিখিত তাফসির অনুযায়ী إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبَّ الْخَيْرِ عَنْ ذِكْرِ رَبِّي-এর অর্থ হবে, 'নিঃসন্দেহে আমার বস্তুর প্রতি ভালোবাসা (যুদ্ধের ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসা) আল্লাহর স্মরণেরই অংশ। আর تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ -এ تَوَارَتْ -এর সর্বনামটি ফিরবে صافنات الجياد এর দিকে। অর্থাৎ যখন ঘোড়াগুলো দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো। তখন شمس-কে উহ্য মানার প্রয়োজন পড়বে না। আর فَطَفِقَ مَسْحًا بِالسُّوْقِ وَالْأَعْنَاقِ -এ মস-এর অর্থ হবে 'স্পর্শ করা ও হাত ফিরিয়ে দেওয়া'। যা তার সাধারণ অর্থ। অভিধানে এ অর্থটিই প্রসিদ্ধ।¹

টিকাঃ
১. ফাতহুল বারি: ৬/২৫৬

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফয়সালা

📄 ফয়সালা


বিভিন্ন রেওয়ায়েত ও মুফাসসিরদের অভিমতসমূহ জানার পর আমাদের কাছে ইবনে জারির ও ইমাম রাযি-এর রায়কেই প্রণিধানযোগ্য ও সত্যের নিকটবর্তী মনে হয়েছে। কারণ হলো, প্রথমত এখানে কোনো কিছু উহ্য মানার প্রয়োজন পড়ছে না। দ্বিতীয়ত, হযরত সুলাইমান আ.-এর দিকে এমন কোনো কাজকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন হচ্ছে না, যা যুক্তির বিচারে অসম্ভব মনে হয়। এক্ষেত্রে ইবনে কাসির রহ. ইবনে জরিরের আপত্তির যে উত্তর দিয়েছেন, সেটিকেও অনেক দূরবর্তী ব্যাখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত কিছু মনে হচ্ছে না। কেননা, একজন উচ্চশ্রেণির নবীর ঘটনায় কোনো শক্তিশালী কারণ পাওয়া যাচ্ছে না, যার প্রেক্ষিতে দশ অথবা বিশ হাজার ঘোড়াকে এভাবে যবেহ করে ফেলা হবে।³ যদি এ উত্তর দেয়া হয় যে, সম্ভবত তাদের সমাজে এ ধরনের কাজ প্রচলিত ও পছন্দনীয় ছিলো, তবে এটি একটি প্রমাণহীন উত্তর ছাড়া কিছু নয়। ইবনে কাসির রহ.-এর এই বক্তব্য 'যখন হযরত সুলাইমান আ. আল্লাহর স্মরণের ভালোবাসায় উদ্বেলিত হয়ে তাঁর শ্রেষ্ঠ অশ্বগুলোকে যবেহ করে ফেলেন, তখন মহান আল্লাহ তাঁর ওপর এই বিশাল নেয়ামত বর্ষণ করেন যে, বাতাসকে তার জন্য বশীভূত করে দেন।' এটি একটি চমৎকার কথা; কিন্তু পবিত্র কুরআনের আলোচনার সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায় না। কেননা, আলোচিত ঘটনাটি একটি পৃথক ঘটনা। যাতে পবিত্র কুরআন কোথাও সামান্যতম এমন ইঙ্গিতও করে নি, যার দ্বারা এই ঘটনার সঙ্গে বাতাসকে বশীভূত করার সম্পৃক্ততার আভাস মেলে। অথচ পবিত্র কুরআনের আলোচনার ধরন অনুযায়ী আলোচিত আয়াতে এ কথা আসা দরকার ছিলো যে, সুলাইমান আমাকে খুশি করার জন্য এমনটি করেছে, তার বিনিময়ে আমি তাকে এ পুরস্কার দান করলাম যে, খোদ বাতাসকেই তার বশীভূত করে দিলাম। অথচ এর বিপরীতে বাতাসকে বশীভূত করার বিষয়টিকে পৃথক একটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে পেশ করা হয়েছে। তা ছিলো হযরত সুলাইমান আ.-এর পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট।⁴ হযরত সুলাইমান যখন আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ, আমাকে এমন ক্ষমতা দান করুন, যা আমি ছাড়া আর কেউ পায় নি। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন যে, জিন, প্রাণিজগৎ ও বাতাসকে তার অনুগত করে দিলেন।
মোটকথা, صافنات الجياد এর ঘটনার পর এমনটি পাওয়া যায় নি যে, হযরত সুলাইমান আ. ঘোড়ায় চড়া ছেড়ে দিয়েছেন বা যুদ্ধের ময়দানে ঘোড়ার ব্যবহার ত্যাগ করেছেন। জিন ও বাতাসকে অনুগত করার সঙ্গে ঘটনারটির সম্পৃক্ততার কোনো সূত্রও কোথার থেকে পাওয়া যায় নি। আয়াতের কোথাও তথা সূর্যের উল্লেখ নেই। আর একসঙ্গে এত প্রচুর সংখ্যক উৎকৃষ্ট ঘোড়া যবেহ করা একটি পছন্দনীয় কাজ; এ কথাও কোনো সনদে প্রমাণিত নেই। উল্লিখিত কারণসমূহের প্রেক্ষিতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর অভিমতটিই প্রণিধানযোগ্য ও সত্যের নিকটবর্তী।⁵

টিকাঃ
১. ইবনে জারির তাবারি ও ইমাম রাযি রহ. এ তাফসিরটিকেই প্রণিধানযোগ্য ও সত্যের নিকটবর্তী অভিহিত করেছেন। তারা বলেন, ঘোড়ার সংখ্যা হাজারেরও অধিক ছিলো এবং সেগুলোকে জিহাদের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো। উপরন্তু এটিও একটি যৌক্তিক কথা যে, যদি তাঁর নামায কাযা হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে প্রাণীদের কোনো দোষ নেই যে, তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। এই বিষয়গুলো সামনে রেখে চিন্তা করা হলে স্পষ্টতই বুঝে আসে যে, হযরত আলি রা.-এর প্রতি যে ব্যাখ্যাটিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তা সঠিক হতে পারে না। فَاحَتٌ এর অর্থ হলো, أردت الحجّة । দেখুন, আল বাহরুল মুহিত: ৭/৩৯৬
২. ফাতহুল বারি: ৬/৩৫৬, তারিখে ইবনে কাসির: ২/২৫
৩. ইবনে কাসির আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার মাঝে দশ হাজার ও বিশ হাজার; উভয় রেওয়ায়েতই পেশ করেছেন।
৪. সুরা সাদ
৫. হামদানির বক্তব্য অনুযায়ী যদি এর অর্থ হলো, أردت الحبة নেয়া হয়, তাহলে ع শব্দটি এর অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00