📄 বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ
আল্লাহ তাআলা জিনজাতিকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, কঠিন থেকে কঠিনতর কাজও তারা করে ফেলতে পারে। এ কারণে হযরত সুলাইমান আ. ইচ্ছে করলেন, মসজিদের পুনর্নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে তার চারদিকে একটি জনপদ আবাদ করবেন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিলো, তিনি মসজিদ ও জনপদটিকে মূল্যবান পাথর দিয়ে নির্মাণ করবেন। এ জন্য দূর-দূরান্ত থেকে সুন্দর বড় বড় পাথর নিয়ে আসেন। আর জানা কথা যে, সেই প্রাচীন যুগে যাতায়াতের উন্নত ব্যবস্থা ছিলো না। উপকরণ ছিলো নিতান্তই সীমিত। তা হযরত সুলাইমান আ.-এর আকাঙ্ক্ষা পূরণে যথেষ্ট ছিলো না। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুধু জিনদের পক্ষেই সম্পন্ন করা সম্ভব ছিলো। এ কারণে তিনি এ কাজে জিনদের ব্যবহার করেন। তাদেরকে দিয়ে দূর থেকে বড় বড় সুদৃশ্য পাথর একত্র করতেন। এভাবেই বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মিত হয়।
সাধারণভাবে একটি প্রসিদ্ধ কথা হলো, মসজিদে আকসা ও বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণ হযরত সুলাইমান আ.-এর যুগে হয়েছিলো। কথাটি সঠিক নয়। কারণ হলো, বুখারি ও মুসলিমের বিশুদ্ধ মারফু হাদীসে বর্ণিত রয়েছে যে, একবার হযরত আবু যর গিফারি রা. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল, পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি? নবীজি বলেন, মসজিদে হারাম। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেন, এর পর কোন মসজিদটি অস্তিত্ব লাভ করে? নবীজি বলেন, মসজিদে আকসা। আবু যর রা. পুনরায় জানতে চান, এ দুটির মধ্যবর্তী মেয়াদ কত দিন? নবীজি বলেন, এ দুটোর তৈরির মধ্যবর্তী মেয়াদ চল্লিশ বছর। অথচ মসজিদে হারাম নির্মাতা হযরত ইবরাহিম আ.-এর সঙ্গে হযরত সুলাইমান আ.-এর মাঝখানে হাজার বছরেরও বেশি ব্যবধান। এ কারণে হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, যেভাবে হযরত ইবরাহim আ. মসজিদে হারাম নির্মাণ করেন, যাকে কেন্দ্র করে মক্কা নগরীর গোড়াপত্তন ঘটে, তদ্রূপ হযরত ইয়াকুব (ইসরাইল) আ. মসজিদে বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ করেন, যাকে কেন্দ্র করে আশপাশেই জনপদ গড়ে উঠেছিলো। যার অনেক দিন পর হযরত সুলাইমান আ.-এর তত্ত্বাবধানে মসজিদ ও নগরীটির পুনর্নির্মাণ হয়েছিলো।² তবে এ কাজে জিনজাতিকে ব্যবহার করার কারণে অতুলনীয় ও দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ সম্পন্ন হয়। তা বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগেও বিশ্ববাসীর বিস্ময়। তারা এ কথা ভেবে হয়রান যে, এত প্রকাণ্ড পাথরগুলো কোথেকে আনা হয়েছে, কীভাবে আনা হয়েছে এবং কোন প্রযুক্তির মেশিনের সাহায্যে সেগুলোকে এত উঁচুতে তুলে পরস্পর সংযুক্ত করা হয়েছে?
ওই জিনজাতি শুধু বাইতুল মুকাদ্দাস-ই নয়, হযরত সুলাইমান আ.-এর নির্দেশে আরো অনেক বৃহদাকারের নির্মাণ কাজ করে দিয়েছে। এমন এমন জিনিস তৈরি করে দিয়েছে, যা ছিলো সেই যুগের প্রেক্ষাপটে বিস্ময়কর। পবিত্র কুরআনে এসেছে—
وَمِنَ الشَّيَاطِينِ مَنْ يَغُوصُونَ لَهُ وَيَعْمَلُونَ عَمَلًا دُونَ ذَلِكَ وَكُنَّا لَهُمْ حَافِظِينَ
'এবং অধীন করেছি শয়তানদের কতককে, যারা তাঁর জন্য ডুবুরীর কাজ করতো এবং এ ছাড়া আরও অনেক কাজ করতো। আমি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতাম।' [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৮২]
وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ السَّعِيرِ () يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَاسِيَاتٍ اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ ()
'কতক জিন তার সামনে কাজ করতো পালনকর্তার নির্দেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, আমি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি আস্বাদন করাবো। তারা সুলাইমানের ইচ্ছে অনুযায়ী দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউয সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির ওপর স্থাপিত বিশাল ডেগ নির্মাণ করতো। হে দাউদ পরিবার, কৃতজ্ঞতা সহকারে কাজ করে যাও। আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ।' [সুরা সাবা: আয়াত ১২-১৩]
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَنَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ
সুলাইমানের সামনে তার সেনাবাহিনীকে সমবেত করা হলো। জ্বিন, মানুষ ও পক্ষিকুলকে, অতঃপর তাদেরকে বিভিন্ন ব্যূহে বিভক্ত করা হলো। [সুরা আন নামল: ১৭)
وَالشَّيَاطِينَ كُلَّ بَنَّاءٍ وَغَوَّاصٍ () وَآخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ )) هَذَا عَطَاؤُنَا فَامْنُنْ أَوْ أَمْسِكَ بِغَيْرِ حِسَابٍ ))
'আর সকল শয়তানকে তার অনুগত করে দিলাম, অর্থাৎ যারা ছিলো প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী। এবং অন্য আরও অনেককে অধীন করে দিলাম, যারা আবদ্ধ থাকতো শৃঙ্খলে। এগুলো আমার অনুগ্রহ, অতএব এগুলো কাউকে দাও অথবা নিজে রেখে দাও- এর কোনো হিসেব দিতে হবে না।' [সুরা সাদ: আয়াত ৩৭-৩৯]
হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. বলেন, মহান আল্লাহ হযরত সুলাইমান আ.-কে বিশাল বিশাল নেয়ামত দান করেছেন এবং বলেছেন, এই বিশাল সম্পদের প্রাচুর্য চাইলে ব্যয় করো, দান করো, ধরে রাখো; তোমার ইচ্ছে, এর কোনো হিসেব কাউকে দিতে হবে না। এমন অনুমতি পাওয়া সত্ত্বেও হযরত সুলাইমান আ. এই বিশাল প্রাচুর্য ও ক্ষমতাকে আল্লাহর সৃষ্টির সেবার জন্য 'আল্লাহর আমানত' জ্ঞান করে একটি দানাও নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করেন নি। বরং তিনি টুকরি তৈরি করে নিজের জীবিকা উপার্জন করতেন।
ইমাম বাইযাবি রহ. এ স্থানে একটি ইসরাইলি বর্ণনা নকল করেছেন যে, জিন জাতি হযরত সুলাইমানের সিংহাসনকে এমন শিল্পিত কারুকার্যখচিত করে তৈরি করেছিলো যে, সিংহাসনের নিচে দুটি বিশালাকার রক্তখেকো সিংহ দাঁড়িয়ে ছিলো। আর দুটি শকুন উপর থেকে ঝুলছিলো। যখন হযরত সুলাইমান আ. সিংহাসনে আরোহণের জন্য সামনে অগ্রসর হয়ে সিংহাসনের কাছাকাছি চলে আসতেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশালকার সিংহ দুটি সামনের দিকে থাবা ছড়িয়ে বসে পড়তো আর সিংহাসনটি নিচু হয়ে যেতো। তিনি সিংহাসনে সমাসীন হতেই সিংহদুটি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়তো। আর ভয়ালদর্শন শকুন তার ডানা ছড়িয়ে দিয়ে মাথার ওপর ছায়া দিতো। এভাবে তিনি তাদেরকে দিয়ে পাথরের বিশালাকারের ডেগ বানিয়েছিলেন। বিরাট বিরাট চুলার ওপর সেগুলো রাখা হতো। কিন্তু ডেগগুলো এতটাই ভারী ছিলো যে, সেগুলোকে কোনোভাবে নড়ানো যেতো না। পাথর খোদাই করে অনেক বড় বড় হাউয তৈরি করা হয়েছিলো। বাইতুল মুকাদ্দাস নগরী, মসজিদুল আকসা ও এ সব স্থাপনা নির্মাণ ও কারুকায করতে মাত্র সাত বছর লেগেছিলো।¹
তাওরাতের বিভিন্ন অংশে এই নির্মাণকাজের বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে-
'আর এ কারণেই রাজা সুলাইমান লোকদেরকে বেগার খাটিয়েছিলেন। যে আল্লাহ তাআলার ঘর, (মসজিদে আকসা ও জেরুজালেম নগরী), নিজের রাজপ্রসাদ (সুলাইমানী অট্টালিকা) মুলু নগরী, ও জেরুজালেমের সীমানাপ্রাচীর এবং হাসুর, মাজদু ও জাযের নামক নগরীগুলোও নির্মাণ করেছিলেন।... কাজেই সুলাইমান জাযের ও বাইতে হাওরানের নিম্নাঞ্চল পুনর্নির্মাণ করেন। আর বা'লাত ও দাশতে তাদাম্মুরকে রাজ্যের মধ্যস্থলে... এবং সুলাইমানের শাসনাধীন সমস্ত ধন-ভাণ্ডারের নগরগুলোও নির্মাণ করেছিলেন। আর তার গাড়ির শহর এবং তার সর্দারদের শহর তৈরি করেছিলেন। এছাড়া সুলাইমানের যত বাসনা ছিলো, সবকিছুই জেরুজালেম, লেবাননসহ শাসনাধীন স্থানগুলোতে নির্মাণ করিয়েছিলেন।¹
এভাবে তাওরাতে বিশালাকারের হাউয, বড় ও ভারি ডেগ, ভাস্কর্য এবং সেগুলোর নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মূল্যবান পাথরসমূহ সম্পর্কে বিশাল তালিকা দেয়া রয়েছে।²
টিকাঃ
২. বুখারি, কিতাবুল আম্বিয়া
১. বাইযাবি, সুরা সাবা
১. সালাতিন: ১, অধ্যায় ৯, আয়াত: ১৫-২০
২. সালাতিন: ১, অধ্যায়: ৭-৮
📄 তামার ঝরনা
হযরত সুলাইমানের শখ ছিলো বিশালাকারের প্রাসাদ এবং ইস্পাতদৃঢ় মজবুত কেল্লা তৈরি করা। নির্মিতব্য স্থাপনা যেনো মজবুত হয়, তার প্রতি তিনি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। এ জন্য আবশ্যক ছিলো, চুনামাটির মিশ্রণ ব্যবহার না করে ধাতুর মিশ্রণ ব্যবহার করা। কিন্তু এত প্রচুর মিশ্রণ কোথায় পাওয়া যাবে? হযরত সুলাইমান আ. সমস্যাটি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান আ.-এর এ সমস্যার সমাধান করে দেন এভাবে যে, তাকে গলিত তামার ঝরনা দান করেন।
মুফাসসিরদের মধ্য হতে কারো কারো অভিমত হলো, আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান আ.-কে তামা গলানোর শক্তি দান করেছিলেন। এটিও তাঁর একটি মুজেযা ছিলো। এর পূর্বে অন্য কেউ তামা গলাতে জানতো না।
নাজ্জার বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান আ.-কে এ নেয়ামত দান করেছিলেন যে, পৃথিবীর যেখানে যেখানে দাহ্য পদার্থের কারণে তামার খনি পানির মতো প্রবাহিত হতো সেই ঝরনাগুলোর খোঁজ হযরত সুলাইমান আ.-কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। মাটির বুক চিরে এভাবে খনিজ পদার্থের উৎস আবিষ্কার করার কাজটি ইতোপূর্বে আর কেউ করে নি।¹
হযরত কাতাদাহ রহ.-এর উদ্ধৃতিতে ইবনে কাসির রহ. নকল করেছেন যে, গলিত তামার এ ঝরনাগুলো ছিলো ইয়ামানে। যেগুলোকে মহান আল্লাহ হযরত সুলাইমান আ.-এর জন্য উদ্ঘাটিত করে দিয়েছিলেন।²
পবিত্র কুরআন উল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনো বিস্তারিত বিবরণ দেয় নি। কাজেই উল্লিখিত দুটি ব্যাখ্যারই ওই আয়াতগুলোর প্রতিপাদ্য হওয়ার সমান সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পাঠকবর্গ যে কোনো একটির দিকে নিজস্ব অভিরুচির ভিত্তিতে প্রণিধান দিতে পারেন।
তাওরাতে হযরত সুলাইমান আ.-এর এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় নি।
টিকাঃ
১. কাসাসুল আম্বিয়া, আরবি : ৩৯৩
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/২৮