📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বাতাসের আনুগত্য স্বীকার

📄 বাতাসের আনুগত্য স্বীকার


হযরত সুলাইমান আ.-এর নবুওতের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, মহান আল্লাহ তার জন্য বাতাসকে এমনভাবে বশীভূত করে দিয়েছিলেন যে, তিনি যখন চাইতেন, এক সকালেই এক মাসের পথ পেরিয়ে যেতে পারতেন এবং এক সন্ধ্যায় আরো এক মাসের পথ অতিক্রম করতে পারতেন।
হযরত সুলাইমান আ.-এর উল্লিখিত মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন তিনটি কথা বলেছে। একটি হলো, বাতাসকে হযরত সুলাইমানের জন্য বশীভূত করে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, বাতাসকে তার হুকুমের এমন অনুগত করে দেয়া হয়েছে যে, প্রবল ও ঝঞ্ঝাপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তার নির্দেশে সেটি মৃদু ও মন্থর হয়ে আরামদায়ক হয়ে যেতো। তৃতীয় কথা হলো, সেটি এমন আরামদায়ক হওয়া সত্ত্বেও এতটাই দ্রুতগামী ছিলো যে, একজন অশ্বারোহী অনবরত একমাস ঘোড়া ছুটিয়ে যেখানে পৌঁছতো, হযরত সুলাইমান আ. মাত্র এক সকাল সফর করেই সেখানে পৌছে যেতেন। যেনো হযরত সুলাইমান আ.-এর সিংহাসন ইঞ্জিন ও মেশিনের মতো বাহিক্য উপকরণের ঊর্ধ্বে ছিলো এবং মহান আল্লাহর নির্দেশে তা একটি দ্রুতগামী উড়োজাহাজের চেয়েও কয়েকগুণ দ্রুততার সঙ্গে বাতাসের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে পারতো।
একজন প্রকৃতিপূজারী মানুষের দৃষ্টিতে এটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এটি বুঝতে অক্ষম। কারণ হলো, মানবচিন্তার কাছে এটি একটি স্বীকৃত সত্য যে, মানুষের চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তি সমান নয়। তদ্রূপ সবার চিন্তাশক্তিও এক নয়। একজন মানুষ যে জিনিসটিকে তার বুদ্ধি দিয়ে করে এবং সেটা করাকে সহজও মনে করে, অন্য ব্যক্তির বুদ্ধি সেটাকে অসম্ভব মনে করে থাকে। এই নীতির আলোকে তাহলে আমাদের স্বীকার করতে অসুবিধা কোথায় যে, আল্লাহ তাআলা যেভাবে সাধারণ কুদরতি নীতি অনুযায়ী বিশ্বচরাচরের বস্তুরাশিকে উপকরণের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, তদ্রূপ কুদরতি নীতির কিছু কিছু বিষয়কে উপকরণের ঊর্ধ্বেও রেখেছেন। পৃথিবীর সাধারণ জ্ঞানীরা কারণের সঙ্গে কারণ জুড়ে ফলাফল বের করে থাকেন। এর বাইরে যেতে পারেন না। কিন্তু মহান নবীগণ এমন ছিলেন না। তারা এর বাইরে থেকেও নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করতে পারতেন। বর্তমান পৃথিবীর জ্ঞান সেই জ্ঞান পর্যন্ত পৌছুবে না। কাজেই এ জাতীয় বিষয়গুলোর সংবাদ যেহেতু ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত, কাজেই মানবধারণা, মানববুদ্ধি ও আকলের সীমাবদ্ধতা দিয়ে সেগুলোর অকাট্য সত্যকে অস্বীকার করা ঠিক হবে না। যদি কোনো বস্তুর জ্ঞান আমাদের কাছে না থাকে, তাহলে কি এ দাবি করা ঠিক হবে যে, বস্তুটি আসলে নেই?
কাজেই সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো, বাতাসকে বশীভূত করার ঘটনা ও দ্রুতগামিতাকে কোনো ধরনের ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে সত্য বলে স্বীকার করতে হবে। এখানে আরেকটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, হযরত সুলাইমান আ.-এর তখতের আকৃতি ও তাঁর সকাল-সন্ধ্যার সফর সম্পর্কে যেসব কাহিনি সিরাত ও তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে পাওয়া যায়, তার সবটাই ইসরাইলি রেওয়ায়েত। তার আলোচনা নিরর্থক। তাজ্জবের বিষয় হলো, ইবনে কাসির রহ.-এর মতো একজন গবেষকও এ প্রসঙ্গে সেই রেওয়ায়েতগুলো এমনভাবে উল্লেখ করেছেন যে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তার মতে এগুলোও স্বীকৃত সত্য। অথচ আদতে তা নয়। কেননা, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোর ওপর অনেক উত্তরহীন সংশয় আরোপিত হয়। পবিত্র কুরআন তো এ সম্পর্কে শুধু এতটুকুই বলেছে-
وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ عَاصِفَةٌ تَجْرِي بِأَمْرِهِ إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْءٍ عَالِمِينَ 'আর সুলাইমানের অধীন করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে; তা তাঁর আদেশে প্রবাহিত হতো ওই দেশের দিকে, যেখানে আমি কল্যাণ দান করেছি। আমি সব বিষয়েই সম্যক অবগত রয়েছি।' [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৮১]
وَلِسُلَيْمَنَ الرِّيحَ غُدُوهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ 'আর আমি সুলাইমানের জন্য বশীভূত করে দিয়েছি বাতাসকে যে, সে সকালে একমাসের দূরত্ব (অতিক্রম করে) এবং সন্ধ্যায় এক মাসের দূরত্ব।' [সুরা সাবা]
فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيحَ تَجْرِي بِأَمْرِهِ رُخَاءٌ حَيْثُ أَصَابَ 'তখন আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হতো, যেখানে সে পৌছাতে চাইতো।' [সুরা সাদ: আয়াত ৩৬]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00