📄 পাখির সঙ্গে বাক্যালাপ
আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ আ.-এর মতো হযরত সুলাইমান আ.-কেও এ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন যে, তিনি জীব-জন্তু ও পশু-পাখিদের ভাষা বুঝতেন। তাঁদের উভয়ের কাছে পাখিদের বুলি বাকশীল মানুষের কথাবার্তার মতো ছিলো। পবিত্র কুরআনে হযরত সুলাইমান আ.-এর সেই মর্যাদা এভাবে বর্ণিত হয়েছে—
وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ عِلْمًا وَقَالَا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي فَضَّلَنَا عَلَى كَثِيرٍ مِنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ () وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُودَ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ ()
'আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলাইমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম। তারা বলেছিলো, 'আল্লাহর প্রশংসা, যিনি আমাদেরকে তাঁর অনেক মুমিন বান্দার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। বলেছিলেন, হে লোকসকল, আমাকে উড়ন্ত পাখিকুলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাকে সবকিছু দেয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব।' [সুরা নামল: আয়াত ১৫-১৬]
এখানে 'উড়ন্ত পক্ষিকুলের ভাষা' যে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ কথার উদ্দেশ্য নয় যে, তিনি তার কল্পনা ও অনুমান শক্তির মাধ্যমে পাখিদের ভিন্ন ভিন্ন আওয়াজ দ্বারা শুধু সেগুলোর উদ্দেশ্য বুঝতে পারতেন। এর বেশি কিছু নয়।' কেননা, কল্পনা ও অনুমান শক্তি প্রয়োগের এই যোগ্যতা অনেক লোকেরই আছে। তাঁরা পালিত জীব-জন্তুর ক্ষুধা-তৃষ্ণার সময়ের আওয়াজ, খুশি ও আনন্দের আওয়াজ, প্রভুকে কাছে দেখে খুশি প্রকাশ ও আনুগত্যের আওয়াজ, শত্রুকে দেখে বিশেষ শব্দে ডাকার আওয়াজের মধ্যে ভালোভাবেই পার্থক্য করতে পারতেন। সেগুলো কী চায় তা বুঝতে পারতেন। উল্লিখিত আয়াতে কল্পনা ও অনুমান শক্তির মাধ্যমে পাখিদের উদ্দেশ্য বুঝা উদ্দেশ্য নয়।
তা ছাড়া পাখির বুলি দ্বারা ওই জ্ঞানও উদ্দেশ্য নয় যা জ্ঞানের আধুনিক যুগে ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে কতিপয় জন্তুর কথা বলার ক্ষেত্রে আবিষ্কৃত হয়েছে, যাকে জুওলজি (ZOOLOGY) বা প্রাণিবিজ্ঞানের একটি শাখা গণ্য করা হয়। কেননা, এগুলোও অনুমাননির্ভর। উপরিউক্ত অভিজ্ঞতা লাভের পর জ্ঞানের ধনুক থেকে তা বের হয়েছে। এগুলোকে সন্দেহমুক্ত বিশ্বাসযোগ্য জ্ঞান বলে খোদ প্রাণিবিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে, এটি একটি অভিজ্ঞতালব্ধ শাস্ত্র, যা যে কোনো ব্যক্তি চেষ্টা করলে অর্জন করতে পারে। আর বাস্তবতা হলো, হযরত দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালামের যদি এমন জ্ঞানই থাকতো, তাহলে পবিত্র কুরআন এতটা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করতো না।
কুরআনুল কারিম যেভাবে তা উল্লেখ করেছে এবং এর ওপর হযরত সুলাইমান আ.-এর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকে যেভাবে বর্ণনা করেছে, তার দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, হযরত দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালামের জন্য এটি ছিলো একটি মহান নেয়ামত। যাকে মুজেযা (নিদর্শান) বলতে হয়। তারা মানুষের মুখের ভাষা যেভাবে বুঝতেন, ঠিক তার মতো করে পক্ষিকুলের ভাষাও বুঝতেন। নিঃসন্দেহে তাদের সেই জ্ঞান ছিলো পার্থিব উপকরণের ঊর্ধ্বে কুদরতের বিশেষ দানের বহিঃপ্রকাশ।
মানববুদ্ধির আলোকে শুধু এতটুকুই বলা যায় যে, এটি অসম্ভব কিছু নয়। কেননা, ভাষা ও মানববুদ্ধি উভয়টির বিবেচনায় কথা বলার জন্য শব্দ হওয়াই যথেষ্ট। তার জন্য মানুষের মতো বাচনিক ক্ষমতার প্রয়োজন নেই। জীব-জন্তু ও পশু-পাখিদের ডাকের মধ্যে শব্দ ও শব্দের তরঙ্গ বিদ্যমান। কাজেই পাখির ভাষা বুঝাটা আল্লাহর বিশেষ দান এবং একটি নিদর্শন। যা বিশেষ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ পেতে পারে না। হযরত দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালাম যেভাবে নিশ্চিতভাবে পাখির ভাষা বুঝতেন, তা বর্তমান পৃথিবীর অধুনা আবিষ্কৃত শাস্ত্রের মতো ছিলো না। এর ওপর সকল মুফাসসিরিন একমত। তবে তার বিশদ বিবরণ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম বায়যাবি রহ.-এর মতে, তাঁরা প্রাণীদের ডাক বিভিন্ন অবস্থার আকারে অনুমান শক্তির সাহায্যে বুঝতেন। তবে তাঁরা সেগুলোর অর্থ সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন, নিজের যোগ্যতাবলে নয়; বরং আল্লাহর বিশেষ দানের মাধ্যমে। এটাই হযরত দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালামের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
পক্ষান্তরে আমাদের অভিমত হলো, আল্লাহর এ দু-জন মহান নবী যেভাবে মানুষের ভাষা বুঝতেন, ঠিক তেমনি প্রাণীদের ভাষাও অবলীলায় বুঝতেন। কেননা, এটি ছিলো একটি মুজেযা, যা তাদের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণত পাখিদের কলকাকলি তাদের শব্দের তারতম্যের বিভিন্নতার আলোকে বুঝা হয়ে থাকে।¹ এখন হতে পারে, বাস্তবেই তাদের আওয়াজগুলো ভাষার একটি স্তর, যার দ্বারা তারা পরস্পরের ভাব-বিনিময় করে। তবে তা অবশ্যই মানবভাষা থেকে অনেক নিম্নস্তরের। হযরত সুলাইমান আ. ও হুদহুদের পারস্পরিক কথপোকথনকে পবিত্র কুরআন যেভাবে উপস্থাপন করেছে, তা আমাদের উল্লিখিত অভিমতকে সমর্থন করে।
টিকাঃ
১. প্রাণীবিদগণ বলেন, টেলিগ্রাফের শব্দতরঙ্গের মতো প্রাণীদের পারস্পরিক আলাপচারিতা ভাব-বিনিময়ের সময়েও তাদের আওয়াজের মাঝেও এক ধরনের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, প্রাণীদের আওয়াজের সেই শব্দতরঙ্গ থেকেই টেলিগ্রাফ আবিষ্কৃত হয়েছে।
📄 বাতাসের আনুগত্য স্বীকার
হযরত সুলাইমান আ.-এর নবুওতের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, মহান আল্লাহ তার জন্য বাতাসকে এমনভাবে বশীভূত করে দিয়েছিলেন যে, তিনি যখন চাইতেন, এক সকালেই এক মাসের পথ পেরিয়ে যেতে পারতেন এবং এক সন্ধ্যায় আরো এক মাসের পথ অতিক্রম করতে পারতেন।
হযরত সুলাইমান আ.-এর উল্লিখিত মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন তিনটি কথা বলেছে। একটি হলো, বাতাসকে হযরত সুলাইমানের জন্য বশীভূত করে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, বাতাসকে তার হুকুমের এমন অনুগত করে দেয়া হয়েছে যে, প্রবল ও ঝঞ্ঝাপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তার নির্দেশে সেটি মৃদু ও মন্থর হয়ে আরামদায়ক হয়ে যেতো। তৃতীয় কথা হলো, সেটি এমন আরামদায়ক হওয়া সত্ত্বেও এতটাই দ্রুতগামী ছিলো যে, একজন অশ্বারোহী অনবরত একমাস ঘোড়া ছুটিয়ে যেখানে পৌঁছতো, হযরত সুলাইমান আ. মাত্র এক সকাল সফর করেই সেখানে পৌছে যেতেন। যেনো হযরত সুলাইমান আ.-এর সিংহাসন ইঞ্জিন ও মেশিনের মতো বাহিক্য উপকরণের ঊর্ধ্বে ছিলো এবং মহান আল্লাহর নির্দেশে তা একটি দ্রুতগামী উড়োজাহাজের চেয়েও কয়েকগুণ দ্রুততার সঙ্গে বাতাসের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে পারতো।
একজন প্রকৃতিপূজারী মানুষের দৃষ্টিতে এটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এটি বুঝতে অক্ষম। কারণ হলো, মানবচিন্তার কাছে এটি একটি স্বীকৃত সত্য যে, মানুষের চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তি সমান নয়। তদ্রূপ সবার চিন্তাশক্তিও এক নয়। একজন মানুষ যে জিনিসটিকে তার বুদ্ধি দিয়ে করে এবং সেটা করাকে সহজও মনে করে, অন্য ব্যক্তির বুদ্ধি সেটাকে অসম্ভব মনে করে থাকে। এই নীতির আলোকে তাহলে আমাদের স্বীকার করতে অসুবিধা কোথায় যে, আল্লাহ তাআলা যেভাবে সাধারণ কুদরতি নীতি অনুযায়ী বিশ্বচরাচরের বস্তুরাশিকে উপকরণের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন, তদ্রূপ কুদরতি নীতির কিছু কিছু বিষয়কে উপকরণের ঊর্ধ্বেও রেখেছেন। পৃথিবীর সাধারণ জ্ঞানীরা কারণের সঙ্গে কারণ জুড়ে ফলাফল বের করে থাকেন। এর বাইরে যেতে পারেন না। কিন্তু মহান নবীগণ এমন ছিলেন না। তারা এর বাইরে থেকেও নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করতে পারতেন। বর্তমান পৃথিবীর জ্ঞান সেই জ্ঞান পর্যন্ত পৌছুবে না। কাজেই এ জাতীয় বিষয়গুলোর সংবাদ যেহেতু ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত, কাজেই মানবধারণা, মানববুদ্ধি ও আকলের সীমাবদ্ধতা দিয়ে সেগুলোর অকাট্য সত্যকে অস্বীকার করা ঠিক হবে না। যদি কোনো বস্তুর জ্ঞান আমাদের কাছে না থাকে, তাহলে কি এ দাবি করা ঠিক হবে যে, বস্তুটি আসলে নেই?
কাজেই সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো, বাতাসকে বশীভূত করার ঘটনা ও দ্রুতগামিতাকে কোনো ধরনের ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে সত্য বলে স্বীকার করতে হবে। এখানে আরেকটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, হযরত সুলাইমান আ.-এর তখতের আকৃতি ও তাঁর সকাল-সন্ধ্যার সফর সম্পর্কে যেসব কাহিনি সিরাত ও তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে পাওয়া যায়, তার সবটাই ইসরাইলি রেওয়ায়েত। তার আলোচনা নিরর্থক। তাজ্জবের বিষয় হলো, ইবনে কাসির রহ.-এর মতো একজন গবেষকও এ প্রসঙ্গে সেই রেওয়ায়েতগুলো এমনভাবে উল্লেখ করেছেন যে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তার মতে এগুলোও স্বীকৃত সত্য। অথচ আদতে তা নয়। কেননা, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোর ওপর অনেক উত্তরহীন সংশয় আরোপিত হয়। পবিত্র কুরআন তো এ সম্পর্কে শুধু এতটুকুই বলেছে-
وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ عَاصِفَةٌ تَجْرِي بِأَمْرِهِ إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْءٍ عَالِمِينَ 'আর সুলাইমানের অধীন করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে; তা তাঁর আদেশে প্রবাহিত হতো ওই দেশের দিকে, যেখানে আমি কল্যাণ দান করেছি। আমি সব বিষয়েই সম্যক অবগত রয়েছি।' [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৮১]
وَلِسُلَيْمَنَ الرِّيحَ غُدُوهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ 'আর আমি সুলাইমানের জন্য বশীভূত করে দিয়েছি বাতাসকে যে, সে সকালে একমাসের দূরত্ব (অতিক্রম করে) এবং সন্ধ্যায় এক মাসের দূরত্ব।' [সুরা সাবা]
فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيحَ تَجْرِي بِأَمْرِهِ رُخَاءٌ حَيْثُ أَصَابَ 'তখন আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হতো, যেখানে সে পৌছাতে চাইতো।' [সুরা সাদ: আয়াত ৩৬]