📄 শিক্ষা ও হিতোপদেশ
হযরত দাউদ আ.-এর পবিত্র জীবনের ঘটনাবলি ও বৃত্তান্ত আমাদের জন্য যেসব শিক্ষা ও উপদেশ পেশ করে, যা যদিও অতি ব্যাপক, তবু কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অমূল্য ফলাফল বিশেষভাবে মনোযোগের দাবি রাখে।
১. যখন মহান আল্লাহ কোনো ব্যক্তিত্বকে সুদৃঢ় ঈমানি চেতনাসম্পন্ন বানান এবং সেই ব্যক্তিকে বিশেষ ফযিলতে ভূষিত করেন, তখন তাঁর প্রাকৃতিক দীপ্তিকে শুরু থেকেই জ্বলজ্বলে বানিয়ে দেন। তাঁর ভাগ্যের দ্যুতি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াতে থাকে। হযরত দাউদ আ.-কে যখন আল্লাহ তাআলা সুদৃঢ় ঈমানি চেতনাসম্পন্ন নবী করেন তখন তার জীবনের প্রাথমিক যুগেই জালুতের মতো জালিম ও অত্যাচারী সম্রাটকে তাঁর হাতে হত্যা করিয়ে তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা এবং তাঁর ঈমানি চেতনার সুদৃঢ়তা ও অবিচলতার দ্যুতি এমনভাবে প্রকাশিত করে দেন যে, সমস্ত বনি ইসরাইল একবাক্যে তাঁকে প্রিয় নেতা ও জনপ্রিয় পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নেন।
২. অনেক সময় আমরা একটি জিনিসকে মামুলি মনে করি কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের পর স্পষ্ট হয় যে, সেটি অনেক মূল্যবান বস্তু। তাইতো দেখতে পাই যে, হযরত দাউদ আ.-এর শৈশবে আর তার মুজাহিদসুলভ সত্যপন্থী চেতনা ও আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরার মানসিকতার সঙ্গে সঙ্গে হকের প্রতি দাওয়াত ও নবুওতের পদকে ভূষিত হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। যা উল্লিখিত শিক্ষাকে আরো একবার প্রমাণিত করলো।
৩। সবসময় 'আল্লাহর খলিফা' আর 'তাগুতি সম্রাট'-এর মধ্যে এ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় যে, প্রথমোক্তজন সর্বপ্রকার ক্ষমতা ও প্রতাপের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বিনয় ও বিনম্রতা এবং আল্লাহর সৃষ্টির সেবায় সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত হন। পক্ষান্তরে দ্বিতীয়োক্তজন অহঙ্কার, আত্মমুগ্ধতা, বলপ্রয়োগ ও নিপীড়নের মূর্তপ্রতীক হয়ে থাকে। সে মনে করে, আল্লাহর সৃষ্টিজীব হলো তার সেবা ও বিলাসিতার যন্ত্র।
৪। আল্লাহর বিধান হলো, কোনো ব্যক্তি ইয্যত ও সম্মানের শিখড়ে উন্নীত হওয়ার পর যে পরিমাণ আল্লাহর শুকরিয়া ও তার অনুগ্রহের স্বীকারোক্তি দেবে, তাকে ওই পরিমাণ বেশির থেকে বেশি পুরস্কার ও মর্যাদায় ভূষিত করবেন। হযরত দাউদ আ.-এর গোটা জীবন ছিলো সেই বিধানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৫. ধর্ম ও মাযহাবের সম্পর্ক যদি আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বেশি, কিন্তু বস্তুজাগতিক শক্তি তথা খেলাফত তার জন্য অনেক বড় অভাবনীয়। অর্থাৎ ধর্ম ও মিত্রতা হলো দ্বীনি ও দুনিয়াবি সংশোধনের চাবিকাঠি। আর খেলাফত ও শক্তি হলো তার-ই বদলে দেওয়া সমাজব্যবস্থার সংরক্ষক। হযরত উসমান রা.-এর বচনটি খুবই প্রসিদ্ধ : لاَيَزَعُ اللهُ بِالسُّلْطَانِ مَا لَمْ يَزَعُ بِالْقُرْآنِ -এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা একজন ক্ষমতা দান (খলিফা)-এর মাধ্যমে দ্বীনি প্রতিরোধের সেই কাজ আদায় করিয়ে নেন, যা কুরআনুল কারিমের মাধ্যমে অর্জিত হয় না।"১
৬. মহান আল্লাহ রাজত্ব ও ক্ষমতা প্রদানের জন্য কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন আয়াতে যা ইরশাদ করেছেন, তার সারকথা হলো, সর্বপ্রথম ব্যক্তির মধ্যে এ বিশ্বাস সৃষ্টি হতে হবে যে, রাজত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া ও নেওয়ার শক্তি একমাত্র আল্লাহর। দুনিয়ার বড় থেকে বড় রাজা-বাদশাহদের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী—
اَللَّهُمَّ مَلِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ اِنَّكَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
'হে আল্লাহ, তুমিই রাজা ও রাজত্বের মালিক। তুমি যাকে ইচ্ছে রাজ্য দান করো এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছে রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছে সম্মান দান করো এবং যাকে ইচ্ছে অপদস্থ করো। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।' (সূরা আলে ইমরান : আয়াত ২৬)
কিছু দান করা ও কেড়ে নেওয়ার একটি কানুন তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন। যাকে ‘সুন্নাতুল্লাহ’ [আল্লাহর রীতি] শব্দে ব্যক্ত করাই অধিক সঙ্গত। সেই কানুনটি হলো, কোনো জাতি রাজত্ব ও ক্ষমতা দু-ভাবে পেতে পারে। একটি হলো, 'আল্লাহর উত্তরাধিকার' জানা। অপরটি হলো, 'পার্থিব উপায়-উপকরণ' জানা। প্রথম সুরতে একটি জাতি তখুনি রাজত্বের অধিকারী হবে, যখন তার বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি আল্লাহর উত্তরাধিকার কাজ করবে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সঙ্গে তার আকিদা-বিশ্বাসের সম্পর্কও ঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে এবং তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও সততা-কল্যাণের সেই স্তরে উন্নীত হতে হবে, যাকে কুরআনুল কারিমের পরিভাষায় সালেহীন-এর অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে।
সেই জাতি অবশ্যই আল্লাহর সেই পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার হকদার হবে, যাকে 'আল্লাহর শাসন' শব্দে ব্যক্ত করা যায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের প্রকাশ এবং এটাই নবী-রাসুলদের প্রকৃত উত্তরাধিকার। আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, কোনো জাতি যদি আকিদা ও আমলে নবী-রাসুলদের উত্তরাধিকারী হতে পারে তাহলে সে জমিনি উত্তরাধিকারেরও অধিকারী হবে। তার সেই অর্জনের পথে যদি পার্থিব উপায়-উপকরণের পাহাড় সমান বাধাও আসে, সেগুলোকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে হলেও আল্লাহ তার অঙ্গীকার পূরণ করে দেখাবেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ
'আর আমি যাবুরে নসিহতের পর লিখে দিয়েছি যে, আমার নেককার বান্দাগণ পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।' অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ
'নিশ্চয়ই জমিন আল্লাহর। তিনি তার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছে তার উত্তরাধিকারী বানান।'
আল্লাহর অভিপ্রায়ের সিদ্ধান্ত এই যে, জমিনের উত্তরাধিকার তারাই পাবে যারা তার 'নেককার বান্দা' হবে। যদি কোনো জাতি বা উম্মতের মধ্যে এই যোগ্যতা না থাকে, তবে সে ইসলামের বড় দাবিদার হলেও জমিনি উত্তরাধিকারের অধিকারী হতে পারবে না। 'ইসলামি খেলাফত' তার অধিকার হবে না। এমন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের জন্য আল্লাহর কাছে কোনো অঙ্গীকারও থাকবে না।
তবে আল্লাহ তার নিজ প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার বিচারে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যাকে ইচ্ছে দিতে পারেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছে ছিনিয়ে নিতে পারেন। কারণ ও ফলাফলের মধ্যে যে সম্পর্ক, রাজত্ব দেওয়া-নেওয়ার উল্লিখিত মূলনীতির সঙ্গে তার কুদরতের সেই সম্পর্ক। সেই দেওয়া-নেওয়ার পেছনে তার অনেকগুলো প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা কাজ করে, যার গভীরে পৌঁছা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে যে চিত্রটি সবচেয়ে করুণ ও দুর্ভাগ্যজনক, তা হলো, মুসলমান 'গোলাম ও শাসিত' হবে আর কুফরি ও শিরকির ধ্বজাধারী সরকার তার ওপর 'প্রতাপশালী শাসনক্ষমতা ও কর্তৃত্বশালী' হবে। যেনো এটি আল্লাহর এমনই এক শাস্তি যা বদআমলের কারণে এবং সৎকাজ করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলার ফলে মুসলমানদের ওপর আপতিত হয়।
এর থেকে যে শিক্ষা অর্জিত হয়, তা হলো, এখন যার হাতে কর্তৃত্ব আছে, সে এজন্য কর্তৃত্ব লাভ করে নি যে, আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট। বরং সে এ কারণে কর্তৃত্ব লাভ করেছে যে, জমিনের প্রকৃত উত্তরাধিকারীগণ তাদের বদআমলের কারণে উত্তরাধিকারের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে গোটা পৃথিবীর কল্যাণকামিতার দিকে তাকিয়ে কর্তৃত্ব এমন কাউকে দেয়া হয়েছে, যার জন্য মুসলমান হওয়াও শর্ত নয়, কাফের-মুশরিক হওয়াও শর্ত নয়।
وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ
'আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে তার রাজত্ব দান করেন।'
এখন যদি মুসলমানগণ এর থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নিজেদের বিপর্যস্ত জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে 'সালেহিন'-এর বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে সমর্থ হয়, তাহলে আল্লাহর অঙ্গীকার নিজেই তাদেরকে সুসংবাদ জানাতে এগিয়ে আসবে। আল্লাহ বলেন-
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّ لَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا
'তোমাদের মধ্য হতে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন।' [সুরা আন-নুর: আয়াত ৫৫]
টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/১