📄 আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা
এখানে হযরত দাউদ আ.-এর একটি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে করা হয়েছে। হযরত দাউদ আ. প্রথমদিকে তা ধরতে পারেন নি কিন্তু হঠাৎ তার মনে এ খেয়াল এসেছে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। তখন তৎক্ষণাৎ তিনি আল্লাহর মনোনীত নবীদের মতো আল্লাহ-অভিমুখী হন এবং ইসতিগফার করেন। আল্লাহর দরবারে তার সেই ক্ষমাপ্রার্থনা গৃহীত হয়। ফলে তাঁর সম্মান ও আল্লাহর নৈকট্য পূর্বাপেক্ষা অধিক উচ্চতা লাভ করে।
ব্যাপারটি ছিলো শুধুই এতটুকু। কিন্তু যখন কতিপয় মুফাসসির লক্ষ্য করলেন যে, কুরআনুল কারিম সেই পরীক্ষার কোনো বিবরণ জানায় নি আর তাওরাত ও ইসরাইলি রেওয়ায়েতে আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রীর একটি চটকদার কাহিনি আছে; তাতে হযরত দাউদ আ.-এর ওপর আল্লাহর অসন্তুষ্ট হওয়ার কথারও উল্লেখ পাওয়া যায়, তখন তারা পূর্বাপর না ভেবেই সেই মনগড়া গল্পকে ওই আয়াতের তাফসির বানিয়ে পরীক্ষা, ক্ষমাপ্রার্থনা ও তার গৃহীত হওয়ার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন।
তাদের এ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত কাণ্ডকে বিশেষজ্ঞ মুফাসসিরগণ ও গবেষকবৃন্দ কোনোভাবেই মেনে নেন নি। তারা দলিল-প্রমাণের আলোকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওই কল্প-কাহিনির সঙ্গে সুরা সাদের এ সকল আয়াতের তাফসিরের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। শুধু এটাই নয়, বরং এ পুরো গল্পটির আদ্যোপান্ত ইহুদিদের উর্বর মস্তিষ্কের প্রসব। ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারে এর কোনো স্থান হতে পারে না।
হাফেয ইমাদুদদিন ইবনে কাসির রহ. তার তাফসিরে লিখেছেন- قد ذكر المفسرون ههنا قصة أكثرها مأخوذ من الإسرائيليات ولم يثبت فيها عن المعصوم حديث يجب اتباعه.
'এ স্থানে কতিপয় মুফাসসির একটি গল্প উল্লেখ করেছেন। নিঃসন্দেহে যার বৃহৎ অংশ ইসরাইলি বর্ণনা হতে সংগৃহীত। এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আনুগত্য-আবশ্যক একটি হাদিসও বর্ণিত নেই।'
তিনি তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া'য় আরো জোরের সঙ্গে বলেছেন- وقد ذكر كثير من المفسرين من السلف والخلف ههنا قصصا وأخبارا أكثرها إسرائيليات ومنها ما هو مكذوب لا محالة تركنا إيرادها في كتابنا قصدا اكتفاء واقتصارا على مجرد تلاوة القصة من القرآن العظيم والله يهدي من يشاء إلى صراط مستقيم.
'পূর্বের ও পরবর্তী সময়ের বেশ কয়েকজন তাফসিরকার এ স্থানে কয়েকটি গল্প ও কাহিনি বর্ণনা করেছেন। যার বৃহদাংশই ইহুদিদের কপোলকল্পিত। আর কিছু গল্প তো সন্দেহাতীতভাবে আদ্যোপান্ত মিথ্যাচার। যার কারণে আমরা ইচ্ছেকৃতভাবে সেগুলোকে বর্ণনা করি নি। কুরআনুল কারিম যতটুকু ঘটনা জানিয়েছে, শুধু ততটুকুতেই আমরা যথেষ্ট মনে করেছি। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে সরল পথে পরিচালিত করেন।'
'কিতাবুল ফসল'-এ হাফেয আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযাম রহ. উল্লিখিত আয়াতের সূত্রে লিখেছেন-
ما حكاه الله تعالى عن داود قول صادق صحيح. لا يدل على شيئ مما قاله المستهزئون الكاذبون المتعلقون بخرافات ولدها اليهود
'আর হযরত দাউদ আ. সম্পর্কে কুরআন যে ঘটনা বর্ণনা করেছে তা সত্য ও সঠিক। পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদী বিদ্রূপকারীরা যে-রূপকথা বলে বেড়ায়, সেগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। যেগুলো আদ্যোপান্ত ইহুদিদের বিকৃত মস্তিষ্কের তৈরি।'
তদ্রূপ খাফাজি রহ. 'নাসিমুর রিয়াদ'-এ, কাযি আয়ায রহ. 'শিফা'য়, আবু হাইয়ান উন্দুলুসি রহ. 'বাহরুল মুহিত'-এ, ইমাম রাযি রহ. 'আত-তাফসিরুল কাবির'-এ এবং এছাড়া অন্য মুহাক্কিকগণ তাঁদের কিতাবে এ সকল কল্প-কাহিনিকে প্রত্যাখ্যানযোগ্য অভিহিত করে প্রমাণ করেছেন যে, এক্ষেত্রে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো বিশদ বিবরণ বর্ণিত নেই।
📄 আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা
এ সকল কল্পকাহিনিকে ঝেটিয়ে দূর করে মুহাক্কিকগণ উল্লিখিত আয়াতসমূহের এমন ব্যাখ্যা দান করেছেন, যা হয়তো সাহাবায়ে কেরামের বিশুদ্ধ বাণী ও মত হতে প্রাপ্ত অথবা কুরআনুল কারিমের পূর্বাপরের প্রতি লক্ষ্য রেখে শুদ্ধ অভিরুচির মাধ্যমে নির্ণীত। তাই শুধু এগুলোই সহিহ এবং প্রণিধানযোগ্য。
**১ম তাফসির**
আল্লামা ইবনে হাযাম রহ. বলেন, ঘটনা শুধু এতটুকুই যে, অকস্মাৎ দু-ব্যক্তি হযরত দাউদ আ.-এর ইবাদতগৃহে প্রবেশ করে। এ সময় সেখানে হযরত দাউদ আ. ইবাদতে লিপ্ত ছিলেন। যেহেতু বাস্তবেই ওই দুই ব্যক্তি সমস্যায় ছিলো এবং তাদের দ্রুত সমাধানে উপনীত হওয়ার তাড়া ছিলো, এ কারণে তারা দেয়াল টপকে এসেছিলো। হযরত দাউদ আ. বাদীর বক্তব্য শোনার পর প্রথমে তাদের উদ্দেশে তিনি কিছু ওয়ায-নসিহত পেশ করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, অবস্থা ভালো নেই। অধীনদের ওপর শক্তিশালীদদের অত্যাচারের প্রবণতা সবসময় এমনই যে, তারা ওদের জীবনকে নিজেদের বিলাসিতার উপকরণ মনে করে থাকে। যা খুবই ধিকৃত। তবে আল্লাহর মুমিন বান্দাগণ যেহেতু নেককার হয়ে থাকেন, এ জন্য তারা নিজেদেরকে এ ধরনের জুলুম থেকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং আল্লাহকে ভয় করেন। যদিও তাদের সংখ্যা অনেক কম।
এরপর হযরত দাউদ আ. তাদের মামলাটির একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান জানিয়ে বিবাদের অবসান ঘটান। যখন উভয় পক্ষ চলে যায় তখন হযরত দাউদ আ.-এর প্রখর অনুভূতিসম্পন্ন হৃদয়ে এ কথা উদিত হয় যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে এত বিশাল সাম্রাজ্য ও দোর্দণ্ড ক্ষমতা দান করেছেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে এটি আমার জন্য অনেক বড় পরীক্ষা। এভাবে যে, মহান আল্লাহ আমাকে এত বিশাল সংখ্যক মানুষের ওপর যে সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব আমি কতটা সঠিকভাবে পালন করতে সক্ষম হই এবং খোদার এ নিয়ামতের আমি আমার ব্যবহারিক জীবনে কতটা শুকরিয়া আদায় করতে সমর্থ হই?
এই মানসিক ভাবনা হযরত দাউদের ওপর এতটাই প্রভাব ফেলে যে, তিনি তৎক্ষণাৎ আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়ে পড়েন এবং মাগফিরাত প্রার্থনা করে স্বীকারোক্তি প্রদান করেন যে, হে আমার পালনকর্তা, আপনার সহযোগিতা না থাকলে এই বিশাল দায়িত্ব যথাযথভাবে আমি কিছুতেই পালন করতে সমর্থ হতাম না। হযরত দাউদ আ.-এর এই মনোজাগতিক অবস্থা আল্লাহ তাআলার খুবই পছন্দ হলো এবং আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন।
ইবনে হাযাম রহ. উল্লিখিত তাফসির পেশ করার পর বলেন, মাগফিরাত আল্লাহর দরবারে এতটই প্রিয় আমল যে, তার পূর্বে গুনাহ থাকা জরুরি নয়। এমন নয় যে, প্রথমে গুনাহের কাজ করতে হবে আর এরপর সেই কাজের বিপরীতে মেরুতে গিয়ে মাগফিরাত করতে হবে। কেননা, আল্লাহর ফেরেশতাগণ থেকেও মাগফিরাত চাওয়ার কথা প্রমাণিত রয়েছে। অথচ কুরআনুল কারিমের ঘোষণা হলো, ফেরেশতাগণ কখনই আল্লাহর অবাধ্য হন না। ইরশাদ হয়েছে—
لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
'তারা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করেন।' [সুরা তাহরিম: আয়াত ৬] সেই কুরআনও কিন্তু ফেরেশতাদের ইসতিগফার করার কথা উল্লেখ করেছে। ইরশাদ হয়েছে—
وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ
'এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন।' [সূরা আল-মুমিন: ৭]
ইবনে হাযাম রহ.-এর উল্লিখিত তাফসিরের সমর্থনে আমরা একথা যোগ করতে পারি যে, আলোচ্য ঘটনার কোথাও হযরত দাউদ আ. থেকে কোনো গুনাহ প্রকাশিত হওয়ার কথা উঠে নি। কেবল এতটুকু বলা হয়েছে যে, 'আমি তাকে পরীক্ষা করেছি।' আর পরীক্ষা নেয়া কোনো অপরাধ বা গুনাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়া জরুরি নয়, যেমন হযরত আইয়ুব আ.-এর পরীক্ষার ক্ষেত্রে ঘটেছিলো। কাজেই হযরত দাউদ আ.-এর ব্যাপারটিও কোনো পাপ বা গুনাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। বরং তিনি একজন নবীসুলভ দায়িত্বের অনুভূতি ও আল্লাহর দরবারে নিজ দাসত্ব ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।
কুরআনুল কারিমের আলোচিত আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা যদিও উল্লিখিত তাফসিরের সম্ভাবনা রাখে এবং এর দ্বারা হযরত দাউদ আ.-এর নবীসুলভ মাহাত্ম্য প্রতিফলিত হয়, তারপরও শেষ কথা হলো, এটি একটি ইজতিহাদি তাফসির। কারণ হলো, এখানে পরীক্ষার যে সুরতের কথা বলা হয়েছে, তা কোনো আয়াত বা কোনো হাদিসে উল্লেখ নেই। কাজে এর সম্পর্কও ইজতিহাদের সঙ্গে।
**২য় তাফসির**
উল্লিখিত আয়াতসমূহের তাফসিরে আবু মুসলিম রহ. বলেন, হযরত দাউদ আ.-এর সামনে যখন ওই দু-ব্যক্তি বাদী-বিবাদী হিসেবে নিজেদের মামলা পেশ করেন তখন হযরত দাউদ আ. বিবাদীকে উত্তর দেয়ার সুযোগ না দিয়েই শুধু বাদীর বক্তব্য শুনে নিজের নসিহতে এমন কথা বলে ফেলেন, যার দ্বারা সার্বিকভাবে বাদীর কথার সমর্থন হয়ে যায়। যেহেতু এটি সাধারণত ন্যায়বিচার পরিপন্থী। এ কারণে হযরত দাউদ আ.-এর উল্লিখিত ইরশাদ যদিও নসিহতসুলভ ঢঙে প্রদত্ত ছিলো এবং এখনও মামলা থেকে সরে পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় নি, তারপরও এটি তার মতো একজন মহান নবীর অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো না। এটাই ছিলো সেই 'ফিতনা' হযরত dাউদ আ. যার শিকার হয়েছিলেন।
কিন্তু নিয়ম হলো, আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দাদের কেউ যদি এ ধরনের বিচ্যুতির শিকার হন, তাহলে তৎক্ষণাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্ক বার্তা এসে যায়। এখানেও এর ব্যত্যয় ঘটে নি। হযরত দাউদ আ. চকিত সতর্ক হয়ে পড়েন যে, আলোচিত মামলায় ভুল হয়ে গেছে। যা তার জন্য পরীক্ষা। এজন্য তিনি আল্লাহর দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। যা মহান আল্লাহ গ্রহণ করেন। এভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করা আল্লাহর খুব পছন্দও হয়, যার কারণে তিনি তাঁর মর্যাদা ও সম্মান পূর্বাপেক্ষা আরো বাড়িয়ে দেন।১
হযরত আবু মুসলিমের উল্লিখিত ব্যাখ্যার সঙ্গে আমরা আরেকটু যোগ করবো। তা হলো, এসব কিছু ঘটে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ আ.-কে নসিহত করেন যে, দাউদ, তুমি পৃথিবীর সাধারণ রাজা-বাদশাহ ও বিচারকদের মতো নও। যারা অধিকাংশ সময় সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার পরোয়া না করে আল্লাহর সৃষ্টিজীবের ওপর শুধু মনের চাহিদা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্যে রাজত্ব করে বেড়ায়। তুমি আল্লাহর জমিনে তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি ও খলিফা। তোমার পবিত্র জীবনের একমাত্র ব্রত সৃষ্টির সেবা করা। কাজেই তোমার দায়িত্ব হলো, প্রতিটি মুহূর্তে ন্যায় ও ইনসাফের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটারও অবকাশ নেই। সিরাতে মুসতাকিমকেই তোমার রাজপথ জেনো। কুরআনুল কারিম উল্লিখিত বাস্তবতাকে বাঙময় করার জন্য উল্লিখিত আলোচিত আয়াতসমূহের পরেই নিম্নের ঘোষণা জানিয়ে দিয়েছে।
يَـٰدَاوُۥدُ إِنَّا جَعَلْنَـٰكَ خَلِيفَةً فِى ٱلْأَرْضِ
'হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি।'
এখানে আমরা দুটি সত্য তাফসির পেশ করলাম। এ দুই ব্যাখ্যার উভয়টিতেই মুফাসসিরগণ স্পষ্টত জানিয়ে দিয়েছেন যে, সেই মামলাটি কোনো কল্পিত ঘটনা নয়। বাস্তবেই এমনটি ঘটেছিলো। আগত দু-পক্ষই মানুষ ছিলেন। তারা কোনো ফেরেশতা ছিলেন না। কুরআনুল কারিমের প্রতি লক্ষ করলে এমনটিই মনে হয়।
আলোচিত আয়াতসমূহের দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি যদিও ইজতিহাদপ্রসূত, তারপরও স্বীকার করতে হবে যে, আয়াতসমূহের পারস্পরিক মিল ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে উল্লিখিত ব্যাখ্যা খুবই জুৎসই হয়। এ কারণে মুফাসসিরগণের কাছে উল্লিখিত ব্যাখ্যা খুবই সমাদৃত।
কিন্তু উল্লিখিত ব্যাখ্যা দুটির প্রত্যেকটিতেই ভিন্ন ভিন্ন সংশয় থেকে যায়। যা ভেবে দেখার মতো। প্রথম ব্যাখ্যায় আয়াতসমূহের পারস্পরিক মিলের ওপর ভিত্তি করে এ প্রশ্ন সৃষ্টি হয় যে, ইবনে হাযাম রহ. যে কারণ দর্শিয়েছেন, যদি তা মেনে নেয়া হয় তাহলে পরবর্তী আয়াত يُدَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ এর সঙ্গে আলোচিত আয়াতসমূহের কোনো সম্পর্ক ও মিল পরিলক্ষিত হয় না। এ ধরনের প্রেক্ষাপটে হযরত দাউদ আ.-এর এত বড় ফযিলত উল্লেখ করার কী অর্থ, যা কুরআনুল কারিমে হযরত আদম আ.-এর পর সমস্ত নবী-রাসুলদের মধ্য হতে একমাত্র তাঁকেই বলা হলো?
আর আবু মুসলিমের ব্যাখ্যায় এ সংশয় সৃষ্টি হয় যে, মামলা-মুকাদ্দমার ক্ষেত্রে দুনিয়ার সকল বিচারক ও শাসকদের সর্বস্বীকৃত নীতি হলো, অবশ্যই ফয়সালা করার পূর্বে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনতে হবে। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এটি একটি চূড়ান্ত প্রাকৃতিক নিয়ম। হযরত দাউদ আ.-এর মতো একজন সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নবীর ক্ষেত্রে এ কথা কীভাবে বিশ্বাস করে নেয়া যায় যে, তিনি বিবাদীর কথা না শুনেই বাদীর পক্ষে ফয়সালা করে দেবেন? অথবা নিজের মনের টান জানিয়ে দেবেন? এটি এমন কোনো সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় নয় যে, ঘটনাচক্রে হযরত দাউদ আ. তা ভুলে যাবেন এবং এক্ষেত্রে ভুল করে ফেলবেন।
কাজেই উল্লিখিত দুই ব্যাখ্যার বাইরে আমাদের মতে সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হলো সেটাই, যা কথার গতি, আয়াতসমূহের পারস্পরিক মিল ও পূর্বাপরের সঙ্গে সামাঞ্জস্যের বিচারেও শুদ্ধ এবং যার বুনিয়াদ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত একটি আসরের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
**৩য় তাফসির**
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত দাউদ আ. কাজ বণ্টন করে নিজস্ব দায়িত্বগুলো চারটি ভিন্ন ভিন্ন দিনে আলাদাভাবে আদায় করতেন। একদিন তিনি শুধু ইবাদতের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন। একদিন তিনি রেখেছিলেন বিভিন্ন মামলা-মুকাদ্দমা নিরসনের জন্য। একদিন রেখেছিলেন ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের জন্য। আর একদিন রেখেছিলেন বনি ইসরাইলের হেদায়েত ও নসিহতের উদ্দেশ্যে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।১
কিন্তু দিনবণ্টনের এই বিবরণের মধ্য হতে সেই অংশটি ছিলো সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ যা তিনি আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করেছিলেন। কেননা, এমনিতেই হযরত দাউদ আ.-এর কোনো একটি দিনও আল্লাহর ইবাদত হতে শূন্য হতো না। তারপরও তিনি বিশেষ একটি দিন শুধু তার জন্যই নির্দিষ্ট করে নিয়েছিলেন এবং সেদিন এ ছাড়া অন্যকোনো কাজই করতেন না। কুরআনুল কারিম তাঁর এই গুণকে আর্ভা [নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় আল্লাহ-অভিমুখী] বলে প্রকাশ করেছে।
দ্বিতীয় কথা হলো, কুরআনুল কারিম ও বনি ইসরাইলের ইতিহাস থেকে এ কথা প্রমাণিত যে, হযরত দাউদ আ. কামরা বন্ধ করে ইবাদত করতেন ও তাসবিহ জপতেন। যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়। যেনো, বণ্টিত দিবসসমূহের মধ্য হতে এটিই একটি দিন, যেদিনে হযরত দাউদ আ.-এর কাছে কারো পৌঁছা দুঃসাধ্য ছিলো। এদিন তিনি বনি ইসরাইল থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেন। অন্য দিনগুলোতে বিশেষ কোনো হাঙ্গামা দেখা দিলে রুটিনের বাইরেও হযরত দাউদ আ.-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতো এবং তার কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়া যেতো।
এখন চিন্তার বিষয় হলো, নিঃসন্দেহে আল্লাহর ইবাদত করা ও তাঁর তাসবিহ-তাহলিল পাঠ করা একজন মুসলমানের জীবনের লক্ষ্য। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা যেসকল ব্যক্তিত্বকে তাঁর সৃষ্টিজীবের হেদায়েতের জন্য, পথপ্রদর্শনের জন্য, সেবা করার জন্য নির্বাচিত করেছেন, তাদের কাছ থেকে 'ইবাদতের সংখ্যাধিক্য'-এর তুলনায় 'ফরয পালনে অত্যাধিক নিবিষ্টতা ও মনোযোগ' আল্লাহর কাছে সবচাইতে প্রিয়। তিনি এটাকেই সর্বাধিক ভালোবাসেন। নিঃসন্দেহে একজন সংসারত্যাগী সুফি সাধক আবেদ যে পরিমাণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরের কোণে গিয়ে ইবাদতে লিপ্ত হবে, তার বুযুর্গির স্তর তত বেশি উপরের দিকে উঠবে। নবুয়ত ও খেলাফতের দায়িত্ব এমন নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে কাউকে এ পদ ও দায়িত্ব দেয়ার উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টিজীবকে পথ দেখানো ও তাদের সেবা করা। এ কারণে তাঁর বৈশিষ্ট্য হতে হবে, সৃষ্টিজীবের সঙ্গে সম্পর্ক ও বন্ধন কায়েম করে আল্লাহর বিধান কার্যকর করা। ঘরের কোণে পড়ে থেকে সুফি হওয়া এ দায়িত্বে কাম্য নয়।
এ কারণে হযরত দাউদ আ.-এর উল্লিখিত দিবসবণ্টনের ব্যাপারটি যদিও কাজের সুশৃঙ্খলার বিচারে সার্বিকভাবে প্রশংসনীয় ছিলো, কিন্তু সেখানে একটি দিনকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য এমনভাবে নির্দিষ্ট করে ফেলা যে, জনগণ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন, এটি নবুওতের মাকাম ও খেলাফতের দায়িত্বের পরিপন্থী ছিলো। যা হযরত দাউদ আ.-এর মতো উচ্চ শ্রেণির নবী ও খলিফাতুল্লাহর জন্য কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো না। কারণ হলো, একজন জনবিচ্ছিন্ন দুনিয়াত্যাগী হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকার জন্য তাঁকে নবুয়ত দেয়া হয় নি, বরং এ পদ ও দায়িত্বের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টিজীবের দীনি ও দুনিয়াবি সেবা করা ও সত্য পথে তাদেরকে পরিচালিত করতেই তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন। যেনো তাঁর জীবনের ব্রত ছিলো সৃষ্টির সেবা ও পথপ্রদর্শন। 'ইবাদতের আধিক্য' তাঁর জীবনের প্রতীক ছিলো না। এ কারণে হযরত দাউদ আ.-এর উল্লিখিত পদক্ষেপ বন্ধ করতেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে একটি পরীক্ষায় ফেলেছিলেন; এভাবে যে, দুই বিবদমান ব্যক্তি হযরত দাউদ আ.-এর ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা দিনে কামরার দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেছিলো। হযরত দাউদ আ. অকস্মাৎ দেখতে পান যে, তার সামনে রীতিবিরুদ্ধভাবে দু-জন ব্যক্তি দণ্ডায়মাণ, তখন তিনি স্বভাবতই ঘাবড়ে যান। যা অনুমান করতে পেরে তাদের দু-জনই নিবেদন করলেন যে, আপনি ভয় পাবেন না। আমাদের এভাবে আপনার সামনে চলে আসার কারণ হলো, এই মামলা। এক্ষেত্রে আমরা আপনার সিদ্ধান্ত জানতে চাই। তখন হযরত দাউদ আ. তাদের কাছ থেকে গোটা বৃত্তান্ত শোনেন এবং নসিহত করেন।
মামলাটির সাধারণ বিষয়গুলো কুরআনুল কারিম এড়িয়ে গেছে। কেননা, যে কোনো বোধসম্পন্ন ব্যক্তি নিশ্চিত বিশ্বাস করবেন যে, হযরত দাউদ আ. অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন। তবে কুরআনুল কারিম মামলাটির শুধু সে দিকটির ওপরই আলো ফেলেছে, যার সম্পর্ক 'রুশদ ও হেদায়েত'-এর সঙ্গে। অর্থাৎ, দুর্বলদের ওপর শক্তিমানদের জুলুম করা।
মোটকথা, উভয়পক্ষকে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়ার পর হযরত দাউদ আ. সঙ্গে সঙ্গেই সতর্ক হয়ে গেলেন যে, আমাকে আল্লাহ তাআলা এ পরীক্ষায় কেনো ফেলেছেন? তিনি তখন মূল বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরে আল্লাহর দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন ও ইসতিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাআলা তার সেই ইসতিগফার গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর পূর্বের সম্মান ও মর্যাদাকে অধিকতর ও বহুবিধ উচ্চকিত করেন। অতঃপর নসিহত করেন যে, হে দাউদ, আমি তো তোমাকে পৃথিবীর বুকে আমার 'খলিফা' করে প্রেরণ করেছি। কাজেই তোমার দায়িত্ব হলো, আল্লাহর এই প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করা। আর এ কথা সবসময় মনে রাখবে যে, এ পথের বুনিয়াদি পাথেয় হলো, ন্যায় ও সুবিচার। কাজেই সিরাতে মুসতাকিম বা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কখনও বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির শিকার হবে না।
**৪র্থ তাফসির**
কিয়াস, ইজতিহাদ অথবা সাহাবায়ে কেরামের আসার থেকে উদ্ভাবিত; এমন ব্যাখ্যার বাইরে একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রসিদ্ধ রয়েছে। যা প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হাকিম রহ. তার মুসতাদরাকে স্বয়ং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে উল্লিখিত আয়াতসমূহের তাফসির হিসেবে বর্ণিত। মুহাদ্দিসিনে কেরাম সে বর্ণনাটিকে সহিহ ও হাসান স্বীকার করেছেন। কাজেই নিঃসন্দেহে উপরের তিনটি ব্যাখ্যার ওপর এ ব্যাখ্যাটি প্রাধান্য পাবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত দাউদ আ.-এর পরীক্ষার কথা আলোচনা করে বলেন, আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর প্রিয় নবী দাউদ আ.- এর এই গর্বময় আচরণ পছন্দ হয় নি। ওহি এলো, হে দাউদ, যা-ই দেখতে পাচ্ছো, এসব হলো আমার সাহায্য ও আমার দয়া-করুণার ফসল। নয়তো তোমার ও তোমার সন্তানদের মধ্যে সেই সামর্থ্য কোথায় যে, এই ব্যবস্থাপনার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে? কাজেই তুমি যখন এ দাবি করছো, তখন আমি তোমার পরীক্ষা নেবো। হযরত দাউদ আ. নিবেদন করলেন, হে পালনকর্তা, যদি এমনটি হয়, তাহলে আমাকে পূর্ব থেকেই জানিয়ে দেবেন। কিন্তু পরীক্ষার ক্ষেত্রে হযরত দাউদ আ.-এর সেই দোয়া কবুল হয় নি। হযরত দাউদ আ.-কে এভাবে ফেতনায় ফেলে দেয়া হয়, যার কথা কুরআনুল কারিমে আলোচিত হয়েছে।১
অর্থাৎ হযরত দাউদ আ. সেই মামলায় ফয়সালা দেয়ার সময় তাসবিহ ও তাহলিল পাঠ করতে ভুলে গেলেন। আবার ঘটনাচক্রে সে সময় হযরত দাউদ আ.-এর পরিবারের কোনো সদস্যও আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত ছিলো না।
উল্লিখিত তাফসিরের সারমর্ম এটাই অর্জিত হয় যে, দাউদ আ.-এর ব্যাপারটি ছিলো [ حسنات الأبرار سيئات المقربين ]সাধারণ নেককারদের অনেক পুণ্যের কাজ আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত মহাত্মাদের জন্য গুনাহের কাজ বলে বিবেচিত হয়।-এর মূলনীতির বহিঃপ্রকাশ। তা কোনো গুনাহের কাজ বা অপরাধমূলক কাণ্ড ছিলো না। তারপরও তা হযরত দাউদ আ.-এর মতো উচ্চশ্রেণির নবীর জন্য সঙ্গত ছিলো না। এ কারণেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা এসেছিলো।
মোটকথা, কুরআনুল কারিমের উল্লিখিত আয়াতসমূহের তাফসির হিসেবে মুাহাককিক উলামায়ে কেরাম যেসব ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন; একমাত্র সেগুলোই গ্রহণযোগ্য। অথবা কুরআনুল কারিমের মুখপাত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. যে তাফসির বলেছেন, সেটাই প্রকৃত তাফসির। ইহুদিদের মস্তিষ্ক হতে যেসকল উদ্ভট গালগল্প উড়ে এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে উল্লিখিত আয়াতসমূহের কোনো সম্পর্কই নেই।
টিকাঃ
১. রুহুল মা'আনি: ২৩/১৬৮
১. রুহুল মা'আনি: ২৩/১৬২
¹. মুসতাদরাক: ২/৪৩৩
📄 শিক্ষা ও হিতোপদেশ
হযরত দাউদ আ.-এর পবিত্র জীবনের ঘটনাবলি ও বৃত্তান্ত আমাদের জন্য যেসব শিক্ষা ও উপদেশ পেশ করে, যা যদিও অতি ব্যাপক, তবু কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অমূল্য ফলাফল বিশেষভাবে মনোযোগের দাবি রাখে।
১. যখন মহান আল্লাহ কোনো ব্যক্তিত্বকে সুদৃঢ় ঈমানি চেতনাসম্পন্ন বানান এবং সেই ব্যক্তিকে বিশেষ ফযিলতে ভূষিত করেন, তখন তাঁর প্রাকৃতিক দীপ্তিকে শুরু থেকেই জ্বলজ্বলে বানিয়ে দেন। তাঁর ভাগ্যের দ্যুতি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াতে থাকে। হযরত দাউদ আ.-কে যখন আল্লাহ তাআলা সুদৃঢ় ঈমানি চেতনাসম্পন্ন নবী করেন তখন তার জীবনের প্রাথমিক যুগেই জালুতের মতো জালিম ও অত্যাচারী সম্রাটকে তাঁর হাতে হত্যা করিয়ে তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা এবং তাঁর ঈমানি চেতনার সুদৃঢ়তা ও অবিচলতার দ্যুতি এমনভাবে প্রকাশিত করে দেন যে, সমস্ত বনি ইসরাইল একবাক্যে তাঁকে প্রিয় নেতা ও জনপ্রিয় পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নেন।
২. অনেক সময় আমরা একটি জিনিসকে মামুলি মনে করি কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের পর স্পষ্ট হয় যে, সেটি অনেক মূল্যবান বস্তু। তাইতো দেখতে পাই যে, হযরত দাউদ আ.-এর শৈশবে আর তার মুজাহিদসুলভ সত্যপন্থী চেতনা ও আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরার মানসিকতার সঙ্গে সঙ্গে হকের প্রতি দাওয়াত ও নবুওতের পদকে ভূষিত হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। যা উল্লিখিত শিক্ষাকে আরো একবার প্রমাণিত করলো।
৩। সবসময় 'আল্লাহর খলিফা' আর 'তাগুতি সম্রাট'-এর মধ্যে এ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় যে, প্রথমোক্তজন সর্বপ্রকার ক্ষমতা ও প্রতাপের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বিনয় ও বিনম্রতা এবং আল্লাহর সৃষ্টির সেবায় সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত হন। পক্ষান্তরে দ্বিতীয়োক্তজন অহঙ্কার, আত্মমুগ্ধতা, বলপ্রয়োগ ও নিপীড়নের মূর্তপ্রতীক হয়ে থাকে। সে মনে করে, আল্লাহর সৃষ্টিজীব হলো তার সেবা ও বিলাসিতার যন্ত্র।
৪। আল্লাহর বিধান হলো, কোনো ব্যক্তি ইয্যত ও সম্মানের শিখড়ে উন্নীত হওয়ার পর যে পরিমাণ আল্লাহর শুকরিয়া ও তার অনুগ্রহের স্বীকারোক্তি দেবে, তাকে ওই পরিমাণ বেশির থেকে বেশি পুরস্কার ও মর্যাদায় ভূষিত করবেন। হযরত দাউদ আ.-এর গোটা জীবন ছিলো সেই বিধানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৫. ধর্ম ও মাযহাবের সম্পর্ক যদি আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বেশি, কিন্তু বস্তুজাগতিক শক্তি তথা খেলাফত তার জন্য অনেক বড় অভাবনীয়। অর্থাৎ ধর্ম ও মিত্রতা হলো দ্বীনি ও দুনিয়াবি সংশোধনের চাবিকাঠি। আর খেলাফত ও শক্তি হলো তার-ই বদলে দেওয়া সমাজব্যবস্থার সংরক্ষক। হযরত উসমান রা.-এর বচনটি খুবই প্রসিদ্ধ : لاَيَزَعُ اللهُ بِالسُّلْطَانِ مَا لَمْ يَزَعُ بِالْقُرْآنِ -এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা একজন ক্ষমতা দান (খলিফা)-এর মাধ্যমে দ্বীনি প্রতিরোধের সেই কাজ আদায় করিয়ে নেন, যা কুরআনুল কারিমের মাধ্যমে অর্জিত হয় না।"১
৬. মহান আল্লাহ রাজত্ব ও ক্ষমতা প্রদানের জন্য কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন আয়াতে যা ইরশাদ করেছেন, তার সারকথা হলো, সর্বপ্রথম ব্যক্তির মধ্যে এ বিশ্বাস সৃষ্টি হতে হবে যে, রাজত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া ও নেওয়ার শক্তি একমাত্র আল্লাহর। দুনিয়ার বড় থেকে বড় রাজা-বাদশাহদের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী—
اَللَّهُمَّ مَلِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ اِنَّكَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
'হে আল্লাহ, তুমিই রাজা ও রাজত্বের মালিক। তুমি যাকে ইচ্ছে রাজ্য দান করো এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছে রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছে সম্মান দান করো এবং যাকে ইচ্ছে অপদস্থ করো। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।' (সূরা আলে ইমরান : আয়াত ২৬)
কিছু দান করা ও কেড়ে নেওয়ার একটি কানুন তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন। যাকে ‘সুন্নাতুল্লাহ’ [আল্লাহর রীতি] শব্দে ব্যক্ত করাই অধিক সঙ্গত। সেই কানুনটি হলো, কোনো জাতি রাজত্ব ও ক্ষমতা দু-ভাবে পেতে পারে। একটি হলো, 'আল্লাহর উত্তরাধিকার' জানা। অপরটি হলো, 'পার্থিব উপায়-উপকরণ' জানা। প্রথম সুরতে একটি জাতি তখুনি রাজত্বের অধিকারী হবে, যখন তার বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডে পুরোপুরি আল্লাহর উত্তরাধিকার কাজ করবে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সঙ্গে তার আকিদা-বিশ্বাসের সম্পর্কও ঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে এবং তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও সততা-কল্যাণের সেই স্তরে উন্নীত হতে হবে, যাকে কুরআনুল কারিমের পরিভাষায় সালেহীন-এর অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে।
সেই জাতি অবশ্যই আল্লাহর সেই পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার হকদার হবে, যাকে 'আল্লাহর শাসন' শব্দে ব্যক্ত করা যায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের প্রকাশ এবং এটাই নবী-রাসুলদের প্রকৃত উত্তরাধিকার। আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, কোনো জাতি যদি আকিদা ও আমলে নবী-রাসুলদের উত্তরাধিকারী হতে পারে তাহলে সে জমিনি উত্তরাধিকারেরও অধিকারী হবে। তার সেই অর্জনের পথে যদি পার্থিব উপায়-উপকরণের পাহাড় সমান বাধাও আসে, সেগুলোকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে হলেও আল্লাহ তার অঙ্গীকার পূরণ করে দেখাবেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ
'আর আমি যাবুরে নসিহতের পর লিখে দিয়েছি যে, আমার নেককার বান্দাগণ পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।' অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ
'নিশ্চয়ই জমিন আল্লাহর। তিনি তার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছে তার উত্তরাধিকারী বানান।'
আল্লাহর অভিপ্রায়ের সিদ্ধান্ত এই যে, জমিনের উত্তরাধিকার তারাই পাবে যারা তার 'নেককার বান্দা' হবে। যদি কোনো জাতি বা উম্মতের মধ্যে এই যোগ্যতা না থাকে, তবে সে ইসলামের বড় দাবিদার হলেও জমিনি উত্তরাধিকারের অধিকারী হতে পারবে না। 'ইসলামি খেলাফত' তার অধিকার হবে না। এমন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের জন্য আল্লাহর কাছে কোনো অঙ্গীকারও থাকবে না।
তবে আল্লাহ তার নিজ প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার বিচারে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যাকে ইচ্ছে দিতে পারেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছে ছিনিয়ে নিতে পারেন। কারণ ও ফলাফলের মধ্যে যে সম্পর্ক, রাজত্ব দেওয়া-নেওয়ার উল্লিখিত মূলনীতির সঙ্গে তার কুদরতের সেই সম্পর্ক। সেই দেওয়া-নেওয়ার পেছনে তার অনেকগুলো প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা কাজ করে, যার গভীরে পৌঁছা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে যে চিত্রটি সবচেয়ে করুণ ও দুর্ভাগ্যজনক, তা হলো, মুসলমান 'গোলাম ও শাসিত' হবে আর কুফরি ও শিরকির ধ্বজাধারী সরকার তার ওপর 'প্রতাপশালী শাসনক্ষমতা ও কর্তৃত্বশালী' হবে। যেনো এটি আল্লাহর এমনই এক শাস্তি যা বদআমলের কারণে এবং সৎকাজ করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলার ফলে মুসলমানদের ওপর আপতিত হয়।
এর থেকে যে শিক্ষা অর্জিত হয়, তা হলো, এখন যার হাতে কর্তৃত্ব আছে, সে এজন্য কর্তৃত্ব লাভ করে নি যে, আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট। বরং সে এ কারণে কর্তৃত্ব লাভ করেছে যে, জমিনের প্রকৃত উত্তরাধিকারীগণ তাদের বদআমলের কারণে উত্তরাধিকারের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে গোটা পৃথিবীর কল্যাণকামিতার দিকে তাকিয়ে কর্তৃত্ব এমন কাউকে দেয়া হয়েছে, যার জন্য মুসলমান হওয়াও শর্ত নয়, কাফের-মুশরিক হওয়াও শর্ত নয়।
وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ
'আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে তার রাজত্ব দান করেন।'
এখন যদি মুসলমানগণ এর থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নিজেদের বিপর্যস্ত জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে 'সালেহিন'-এর বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে সমর্থ হয়, তাহলে আল্লাহর অঙ্গীকার নিজেই তাদেরকে সুসংবাদ জানাতে এগিয়ে আসবে। আল্লাহ বলেন-
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّ لَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا
'তোমাদের মধ্য হতে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন।' [সুরা আন-নুর: আয়াত ৫৫]
টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/১