📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 পাহাড়-পর্বত ও পশু-পাখির অনুগত হওয়া ও তসবিহ জপা

📄 পাহাড়-পর্বত ও পশু-পাখির অনুগত হওয়া ও তসবিহ জপা


হযরত দাউদ আ. মহান আল্লাহ তাআলার তাসবিহ পাঠ ও তাঁর পবিত্রতা বর্ণনায় খুব বেশি লিপ্ত থাকতেন। তিনি এতটাই সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন যে, যখন তিনি যাবুর পাঠ করতেন বা আল্লাহ তসবিহ ও তাহলিল জপতেন, তখন তাঁর মায়াজালে কেবল মানবজাতিই সম্মোহিত হতো না, বরং মূক জীবজন্তু ও পক্ষিকুলও বিমোহিত হতো। তারা তখন তাঁর চতুর্পাশে একত্র হয়ে সম্মিলিতভাবে আল্লাহর গুণগানের কোরাস সঙ্গীতে কণ্ঠ মেলাতো এবং হৃদয়ছোঁয়া সুরেলা কণ্ঠের প্রশংসাগীতে হযরত দাউদ আ.-এর সঙ্গী হতো। শুধু তাই নয়, পাহাড়-পর্বত পর্যন্ত আল্লাহর প্রশংসার গুঞ্জন তুলতো। হযরত দাউদ আ.-এর সেই মহান বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি কুরআনুল কারিম সুরা আম্বিয়া, সুরা সাবা ও সুরা সাদে স্পষ্টভাবে প্রদান করেছে। ইরশাদ হয়েছে-

وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ

'আর আমি পর্বত ও পক্ষিসমূহকে দাউদের বশীভূত করে দিয়েছিলাম; তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো। এই সমস্ত আমিই করেছিলাম।' [সুরা আম্বিয়া]

وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ مِنَّا فَضْلًا يَا جِبَالُ أَوبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ

'আর নিশ্চয়ই আমি দাউদকে আমার পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (তা হলো, আমি নির্দেশ করেছি) হে পাহাড় ও পাখি, তোমরা দাউদের সঙ্গে মিলে তাসবিহ ও পবিত্র বয়ান করো।' [সুরা সাবা]

إِنَّا سَخَّرْنَا الْجِبَالَ مَعَهُ يُسَبِّحْنَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِشْرَاقِ () وَالطَّيْرَ مَحْشُورَةٌ كُلٌّ لَهُ أَوَابٌ

'নিশ্চয়ই আমি দাউদের জন্য পাহাড়কে অনুগত করে দিয়েছি যে, সে তার সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা তসবিহ জপে। আর পক্ষিকুলকে করেছি সমবেত। তারা সকলই ছিলো আল্লাহ-অভিমুখী।' [সুরা সাদ)

এই আয়াতসমূহের তাফসিরে কোনো কোনো মুফাসসির লিখেছেন, জীব- জন্তু, পশু-পাখি ও পাহাড়-পর্বত তাদের অবস্থার মধ্য দিয়ে তাসবিহ পাঠ করে। যেনো গোটা বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তুর অস্তিত্ব ও সেগুলোর গড়ন- গঠন এমনকি তার অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দু আল্লাহর সৃষ্টিনৈপুণ্যের সাক্ষ্য প্রদান করে। এগুলোই তাদের তাসবিহ ও প্রশংসাগান।

ফলের যদিও বলার মতো মুখ নেই। বাচনিক শক্তি থেকে সে বঞ্চিত। কিন্তু তার স্বাদ, ঘ্রাণ, সৌন্দর্য ও গুণাবলির প্রত্যেকটিই আলাদা আলাদা করে ঘোষণা দেয় যে, فَتَبْرَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخُلِقِينَ: সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান!

ইমাম রাযি রহ. এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। কিন্তু তাজ্জবের বিষয় হলো, তিনি এতো বড় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তার এই মতের প্রমাণে এমন কিছু দার্শনিক তত্ত্ব পেশ করেছেন, যা কুরআন, হাদিস ও যুক্তির বিচারে খুবই ঠুনকো। এমনিক সেগুলোকে দলিল বলাও ভুল হবে।১

উল্লিখিত ব্যাখ্যার বিপরীতে সত্যিকারের গবেষক ও বিশ্লেষকদের বক্তব্য হলো, জীব-জন্তু, উদ্ভিজ্জগৎ ও জড় পদার্থ বাস্তবেই মহান আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে। সেগুলোর তাসবিh পাঠ করার অর্থ এ নয় যে, সেগুলো নিজ নিজ অবস্থার মাধ্যমে মহান স্রষ্টার সৃষ্টিনৈপুণ্যের প্রমাণ দেয় আর এটাই তাদের তাসবিh পাঠ। কারণ, কুরআনুল কারিম সুরা বনি ইসরাইলে পরিষ্কার ঘোষণা করেছে—

تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ

'সাত আসমান ও জমিন এবং সেগুলোর মধ্যকার প্রত্যেকেই আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে। এমন কোনো বস্তু নেই, যা তাঁর প্রশংসায় তাসবিহ জপে না। তবে তোমরা সেগুলোর তাসবিহ বোঝো না।' (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৪৪)।

এখানে পরিষ্কারভাবে দুটি বিষয় বলা হয়েছে। ১. সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তু আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে। ২. জিন ও মানব জাতি সেগুলোর তাসবিহ বোঝার শক্তি রাখে না। এখানে যখন মহান আল্লাহ নিজেই আসমান-জমিনসহ সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তু জীবজন্তু, উদ্ভিজ্জগৎ ও জড়পদার্থের দিকে তাসবিহ ক্রিয়াকে সম্বন্ধিত করেছেন, তাহলে অবশ্যই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে যে, এ সকল বস্তুর মধ্যে তাসবিহের প্রকৃত অস্তিত্ব বিদ্যমান। এবং দ্বিতীয় বাক্যকে এর ওপর প্রয়োগ করা হবে যে, জিন ও মানব জাতি সেগুলোর তাসবিহ বুঝতে অক্ষম।

এখন যদি আপনি এখানে তাসবিহের প্রকৃত অর্থ না ধরে এ অর্থ করেন যে, সকল বস্তু নিজ নিজ অবস্থার মধ্য দিয়ে তাসবিহ জপে, তাহলে কুরআনুল কারিমের এ কথা কী করে সঠিক হবে যে, وَلَكِنْ لَّا تَفْقَهُوْنَ تَسْبِيحَهُمْ তবে তোমরা সেগুলোর তাসবিহ বোঝো না। কারণ, বিশ্বনিখিলের প্রতিটি অণু এক আল্লাহর গুণগান গায়। যদি কোনো নাস্তিকের তা বুঝে নাও আসে, তারপরও সকল ধর্মের সমস্ত আস্তিক বিশেষত প্রত্যেক মুসলমান সন্দেহাতীতভাবে তা বুঝবে। সে যখন আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে ভাবে তখন এ বিশ্বাসের সঙ্গেই ভাবে যে, বিশ্ব চরাচরের প্রতিটি বিন্দু সেই সত্তাকে মানে এবং এ জগতের প্রতিটি বস্তুর অস্তিত্বই আল্লাহর অস্তিত্বের জানান দেয়। ইবনে হাযাম [আল ফসল] গ্রন্থে আলোচনার এ পর্যায়ে এসে একটি সন্দেহ উপস্থাপন করেছেন। তা হলো, যদি সমস্ত প্রাণিকুল, উদ্ভিজ্জগৎ ও জড়-পদার্থের তাসবিহ জপাকে সত্যিকারের তসবিহ মেনে নেয়া হয়, তাহলে এ প্রশ্ন উঠবে যে, একজন নাস্তিক মানুষও তো شئ বা বস্তু কিন্তু সে তো এক মুহূর্তের জন্যও তাসবিহ জপে না। কাজেই উল্লিখিত আয়াতের সামগ্রিকতার শুদ্ধতা কিভাবে বাকি থাকে?

ইবনে হাযামের আপত্তি অগভীর। অবস্থাদৃষ্টে বুঝে আসে যে, এই সন্দেহ উপস্থাপন করার সময় তার দৃষ্টি থেকে কুরআনুল কারিমের ভাষ্য ও উদ্দেশ্য প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো, যা এ পর্যায়ে দৃষ্টির সম্মুখে থাকতে হয়। তিনি আলোচ্য আয়াতের পূর্বাপরের ওপর গভীর চিন্তা করেন নি।

কুরআনুল কারিম উল্লিখিত আয়াতের পূর্বে মুশরিকদের আলোচনা করে মুসলমানদেরকে বলছিলো যে, মুশরিকরা তাদের বোধের বক্রতা ও অপরিপক্বতার কারণে আল্লাহর সঙ্গে অনেক বাতিল উপাস্যকে অংশীদার করে। কিন্তু কুরআন যখন তাদের সামনে তাদের কর্মকাণ্ডের অসারতা স্পষ্ট করে এবং বিভিন্নভাবে বোঝায় তখন তাদের ওপর সেই নসিহতের উল্টো প্রভাব পড়ে। তারা পূর্ব থেকে আরো বেশি ঘৃণা ঘৃণা করতে উদ্যত হয়। অথচ বাস্তবতা এটাই যে, আল্লাহ তাআলা ওই সকল বাতিল অংশীদার থেকে মহান ও পবিত্র, যা মুশরিকরা তাঁদের দিকে সংযুক্ত করে।

এরপর কুরআন বলে, একমাত্র মানবজাতি-ই এ জাতীয় শিরকসর্বস্ব বিভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে। নয়তো সপ্ত আকাশ ও জমিনসহ গোটা বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তু এক আল্লাহর পবিত্রতা বয়ান করে। তারা কোনোভাবে শিরকে লিপ্ত নয়। তবে মানবজাতি তাদের তাসবিহের ভাষা বুঝতে অক্ষম। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ বারংবার ক্ষমাকারী।

এরপর মুশরিকদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের পরিণতি বাতলাতে গিয়ে কুরআন বলেছে যে, যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তেলাওয়াত করেন তখন আমি তাঁর ও মুশরিকদের মধ্যে একটি আবরণ সৃষ্টি করি। অর্থাৎ তারা যখন কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে স্বীকার করে না, তখন তারা তাঁকে রাসুল বলেও মেনে নেয় না। যার পরিণতি গিয়ে দাঁড়ায় যে, তারা আপনার নসিহত থেকে মুখ ফিরিয়ে পরকালের ভয়াবহ ফলাফল থেকে নির্বিকার হয়ে পড়ে। ইরশাদ হয়েছে— وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ لِيَذَّكَّرُوا وَمَا يَزِيدُهُمْ إِلَّا نُفُورًا () قُلْ لَوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذًا لَا بُتَغَوْا إِلَى ذِي الْعَرْشِ سَبِيلًا () سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يَقُولُونَ عُلُوًّا كَبِيرًا () تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا () وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَسْتُورًا ()

'আর অবশ্যই আমি এ কুরআনে বহু বিষয় বারবার বিবৃত করেছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়। বলো, 'যদি তাঁর সঙ্গে আরো ইলাহ থাকতো যেমন তারা বলে, তবে তারা আরশ-অধিপতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় খুঁজতো। তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত এবং তারা যা বলে তা থেকে তিনি বহু উর্ধে। সপ্ত আকাশ, পৃথিবী এবং সেগুলোর অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না; নিশ্চয়ই তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। তুমি যখন কুরআন পাঠ করো তখন তোমার ও যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন পর্দা রেখে দিই।' [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৪৫-৪৭]

কুরআনুল কারিমের এই বিশদ আলোচনা ও পূর্বাপরের স্পষ্ট বক্তব্যের পর ইবনে হাযামের উল্লিখিত আপত্তি ও সংশয় পেশ করার সুযোগ থাকে না। কুরআন তো পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহর সঙ্গে শরিক সাব্যস্ত করার দুঃসাহস একমাত্র মানুষই করতে পারে। কেননা, একমাত্র সে-ই হলো বৈপরীত্যপূর্ণ গুণাগুণের সম্মিলিত রূপ। তার বাইরে বিশ্বচরাচরের প্রতিটি বস্তু আল্লাহর সামনে মূল বাস্তবতার বাইরে অন্য কিছু বলার সাহস রাখে না। এ কারণে তারা শুধু তারই পবিত্রতা স্বীকার করে। তাসবিহ ও তাহমিদই হলো তাদের একমাত্র গীত।

শায়খ বদরুদ্দিন আইনি রহ. গবেষক উলামায়ে কেরামের উল্লিখিত অভিমত সেই হাদিসের অধীনে সংক্ষেপে অথচ প্রামাণিক আকারে আলোচনা করেছেন, যেখানে দুই কবরের মৃত ব্যক্তিদের ওপর আযাব হওয়া এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গাছের একটি সবুজ ঢাল চিরে উভয় কবরের ওপর গেড়ে দেয়ার সময় বলা হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এ ঢালগুলো শুকিয়ে না যাবে, তারা দু-জন আযাব থেকে বেঁচে থাকবে। তিনি বলেছেন—

'উলামায়ে কেরাম এই আয়াত وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ -এর এ অর্থ করেন যে, প্রতিটি জীবিত বস্তুই আল্লাহর গুণগান গায়। প্রতিটি বস্তু তার স্তরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জীবন লাভ করে। গাছের ডালে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাণ বাকি থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত সে সবুজ থাকে। শুকিয়ে যাওয়াটাই তার মৃত্যুর ঘোষণা। পাথরসহ জড় পদার্থের জীবন তা অক্ষত থাকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেগুলোর টুকরো টুকরো হওয়াটাই তার মৃত্যুর বার্তা। মুহাককিকদের এটাই অভিমত যে, উল্লিখিত আয়াতটি (কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়া) শর্তহীন ও সামগ্রিকতাব্যঞ্জক। তবে এ বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে যে, এ বস্তুগুলো কি বাস্তবেই তাসবিহ পাঠ করে না-কি নিজের অবস্থার মাধ্যমে মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের জানান দেয়াটাই তার তাসবিহ?

এক্ষেত্রে গবেষক ও তাত্ত্বিকদের অভিমত হলো, এ বস্তুগুলো প্রকৃত অর্থেই তাসবিহ পাঠ করে। যখন 'মানববুদ্ধি'র বিচারে এটি অসম্ভব নয় এবং শরিয়তের 'নস' (অকাট্য প্রমাণ)-ও স্পষ্টভাবে তা প্রকাশ করেছে তখন আবশ্যক হলো, তার সেই ব্যাখ্যাই দিতে হবে, যা গবেষকগণ বলেছেন।”১ কুরআনুল কারিমের 'নস'-এর স্পষ্ট বক্তব্য তো আপনার সামনেই আছে। কিন্তু 'মানববুদ্ধি'-এর বিবেচনায় সেটি কেনো অসম্ভব নয়, তার বিবরণ আপনি 'মানববুদ্ধি' থেকেই গ্রহণ করুন:

নাস্তিক বুদ্ধিজীবীরা এর ওপর একমত যে, কথাবার্তা ও কথনের জন্য 'বাক শক্তি' শর্ত নয়। যদি কোনো বস্তুর মধ্যে 'প্রাণ' ও 'শব্দ' বিদ্যমান থাকে তাহলে তার দিকে 'কথা'-কে সম্পৃক্ত করা নির্দ্বিধায় শুদ্ধ। গ্রীক দার্শনিকগণ প্রাণিজগতের ভেতর প্রাণের সঙ্গে ছোট ছোট বিষয় অনুভব করার শক্তি রয়েছে বলে স্বীকারও করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ করেছে যে, উদ্ভিদের মধ্যেও 'প্রাণ' ও 'অনুভব' শক্তি উভয়টিই রয়েছে। এমনকি ছোট ছোট বিষয়ে পার্থক্য করার অভিজ্ঞতাও অর্জিত হয়েছে। লজ্জাবতী গাছ হাতের স্পর্শ পেলে গুটিয়ে যায়। এরপর হাত থেকে আলাদা হলে পুনরায় নিজেকে প্রস্ফুটিত করে। মানুষখেকো গাছ মানুষ বা প্রাণী কাছে এলে তার অনুভব করতে পারে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে তার গুল্মগুলো প্রসারিত করে সেটিকে পেঁচিয়ে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসে। এগুলো প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করা হচ্ছে। কলকাতায় প্রখ্যাত উদ্ভিত-বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীর একটি বাগান আজও বিদ্যমান রয়েছে। যেখানে মিস্টার বোস আল্লাহর কুদরতের বিস্ময়কর বিষয়গুলো দেখান যে, একটি গাছ অসুস্থও হয়। আবার সুস্থতাও ফিরে পায়। কিছু গাছের প্রতি কিছু গাছের ঘৃণা করা— এটাও একটি প্রত্যক্ষ বিষয়। আবার কিছু গাছ কিছু গাছের প্রতি আকর্ষণও বোধ করে। এমনকি এখন কতিপয় বিজ্ঞানী এ দাবি তুলেছেন যে, জড়-পদার্থে খুবই দুর্বল ও অনুধাবনীয় নয় এমন প্রাণও পাওয়া যায়। যা-ই তাকে টিকিয়ে রাখে।

মোটকথা, প্রমাণ ও বুদ্ধি উভয়টির বিচারে কুরআনুল কারিমের এই ঘোষণা 'বিশ্ব জগতের প্রতিটি বস্তু আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করে' তা মূল অর্থের ওপর ঠিক থাকবে। এক্ষেত্রে 'অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রকাশ' জাতীয় ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করা নিরর্থক। তবে তাদের তাসবিহ ও প্রশংসার ধরনটি মানুষের উপলব্ধির উর্ধে রাখা হয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছে হলে কখনো কখনো নবী-রাসুলগণ তা উপলব্ধি করার সুযোগ পান, যা তাদেরকে মুজেযা হিসেবে প্রদান করা হয়। হযরত দাউদ আ.-এর অসংখ্য বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্য হতে এটিও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, যখন তিনি সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করতেন তখন জীব-জন্তু, পশু-পাখি ও পাহাড়-পর্বতও তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একসঙ্গে আল্লাহর প্রশংসায় উদ্বেলিত হতো। হযরত দাউদ আ. ও অন্যরা একে অপরের তাসবিহ শুনতেন। হযরত দাউদ আ.-এর এই বৈশিষ্ট্য কুরআনুল কারিম সুরা আম্বিয়া, সুরা সাবা ও সুরা সাদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার যে, যেসকল হকপন্থী উলামায়ে কেরাম সুরা বনি ইসরাইলের আয়াতে জিন ও মানব জাতিদ্বয় ছাড়া অন্য বস্তুগুলোর তাসবিহ-এর ব্যাখ্যা করেছেন 'অবস্থার মাধ্যমে প্রকাশ' তারাও এক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে, এখানে সেই অবস্থার প্রকাশ ঘটে নি। বরং সাধারণ অবস্থার ব্যতিক্রম ঘটেছে এবং তার মাধ্যমে হযরত দাউদ আ.-এর একটি মুজেযার প্রকাশ হয়েছে। এখানে প্রাণিকুল ও পক্ষিকুল বাস্তবেই আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করেছে ও তার গুণকীর্তন করেছে। যেমনটি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিভিন্ন মুজেযার ক্ষেত্রে ঘটেছে। যেমন, কঙ্করের কালিমা পাঠ, উস্তুওয়ানে হান্নানার ক্রন্দন ও বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে আলাপচারিতা। এগুলোর প্রত্যেকটিই বাস্তব এবং তা প্রমাণিতও বটে।

টিকাঃ
১. উল্লিখিত আলোচনার ওপর অধিক জানতে অধ্যয়ন করুন তাফসিরে কাবির: ৫. সুরা বনি ইসরাইল।
১. উমদাতুল কারি শরহে বুখারি: ১/৮৭৪

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম-এর হাতে লোহাও নরম হলো

📄 হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম-এর হাতে লোহাও নরম হলো


এত বিশাল ও প্রকাণ্ড রাজত্বের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হযরত দাউদ আ. রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক রত্তিও গ্রহণ করতেন না। তিনি নিজের জন্য বা পরিবারের ভরণ-পোষণের ভার সরকারি খাজানার ওপর ফেলতেন না, বরং নিজ হাতে হালাল রুজি কামাই করতেন। এটাই ছিলো তাঁর জীবিকা। তাইতো হযরত দাউদ আ.-এর প্রশংসায় একটি বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ما أكل أحد طعاما قط خيرا من أن يأكل من عمل يده وان نبي الله داؤد عليه السلام كان يأكل من عمل یده - بخاري، كتاب التجارة

'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, একজন ব্যক্তির জন্য সর্বোত্তম রিযিক হলো, তার হাতের উপার্জিত রিযিক। নিশ্চয়ই আল্লাহর মহান নবী দাউদ আ. নিজ হাতে জীবিকা উপার্জন করতেন।' [বুখারি শরিফ, কিতাবুত তিজারাহ]

শায়খ বদরুদ্দিন আইনি রহ. বলেন, হযরত দাউদ আ. দোয়া করতেন, হে আল্লাহ, এমন কোনো উপায় বাতলে দিন, যেনো আমার জন্য হাতের কামাই সহজ হয়ে যায়। কেননা, আমি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর আমার জীবিকার বোঝা ফেলতে চাই না। আসলে হযরত দাউদ আ.-এর এই চেতনা ছিলো নবীসুলভ বৈশিষ্টাবলির একটি, যার কথা কুরআনুল কারিম মহান নবীদের হেদায়েত ও পথপ্রদর্শন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছে। প্রত্যেক নবী-ই যখন তাঁর উম্মতকে আল্লাহর পয়গাম শুনাতেন, তখন এ কথাও বলতেন-

وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ 'আর আমি তোমাদের থেকে এ খেদমতের কোনো বিনিময় চাই না; আমার বিনিময় তো আল্লাহর জিম্মায়।”

হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, বুখারি শরিফের এ হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, যদিও ইসলামের খলিফার জন্য বাইতুল মাল থেকে প্রয়োজন অনুপাতে ভাতা নেওয়া জায়েয আছে কিন্তু উত্তম এটাই যে, তার ওপর গলগ্রহ হবে না। এ কারণেই হযরত সিদ্দিকে আকবর রা. খেলাফতকালে ভাতা হিসেবে যা গ্রহণ করেছিলেন, তার সমুদয় অর্থ ইন্তিকালের সময় ফেরত দিয়েছিলেন। অন্যান্য ইসলামি খেদমতের ওপর বিনিময় গ্রহণ করারও একই বিধান।

হযরত দাউদ আ.-এর মনের একান্ত বাসনাকে মহান আল্লাহ গ্রহণ করেছিলেন যে, তার হাতে লোহা ও ইস্পাতকে মোমের মতো নরম বানিয়ে দিয়েছিলেন। যখন তিনি লোহা বা ইস্পাত দিয়ে বর্ম বানাতেন তখন শক্ত পরিশ্রম বা কর্মকারের যন্ত্র ছাড়াই যেভাবে ইচ্ছে গড়ে নিতে পারতেন। লোহা তাঁর হাতে মোমের মতো যেমন ইচ্ছে আকার ধারণ করতো।

কুরআনুল কারিম বিষয়টিকে সুরা আম্বিয়া ও সুরা সাবায় এভাবে উপস্থাপন করেছে-

وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ () أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتٍ وَقَدِرْ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

'আর আমি তার (দাউদের) জন্য লোহাকে নরম করেছিলাম এবং তাকে বলেছিলাম, প্রশস্ত বর্ম তৈরি করো, কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করো এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো। তোমরা যা কিছু করো, আমি তা দেখি।' [সূরা সাবা: ১০-১১]

وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَكُمْ لِتُحْصِنَكُمْ مِنْ بَأْسِكُمْ فَهَلْ أَنتُمْ شَاكِرُونَ

'আমি তাঁকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?' [সুরা আম্বিয়া] তাওরাত ও 'লোহা ব্যবহারের ইতিহাস' থেকে জানা যায় যে, দাউদ আ.- এর পূর্বে লৌহশিল্প এতটুকু উন্নতি করেছিলো যে, ইস্পাত গলিয়ে বিভিন্ন টুকরো বানানো হতো। সেগুলোকে সংযুক্ত করে বর্ম তৈরি করা হতো। কিন্তু সেই বর্ম এতটাই ভারী হতো যে, খুব শক্তিশালী মানুষ ছাড়া অন্য কারো পক্ষে তা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতো। আর তা পরিধান করার পর যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত পদক্ষেপে চলাচল করা যেতো না।

হযরত দাউদ আ.-ই হলেন প্রথম ব্যক্তি যাঁকে মহান আল্লাহ এ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন যে, তিনি ওহির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে এমন বর্ম আবিষ্কার করতে সক্ষম হন যা হতো খুবই পাতলা। সেগুলো ছিলো ছোট ছোট শেকলের আংটা দিয়ে নির্মিত। হালকা ও নরম হওয়ার কারণে তা পরিধান করে একজন সৈনিক যুদ্ধের ময়দানে খুব সহজেই চলাচল করতে পারতো। শত্রু থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও সেই বর্ম কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিলো।

সাইয়িদ মাহমুদ আলুসি রহ. রুহুল মাআনিতে হযরত কাতাদাহ রহ. থেকে এ ধরনের রেওয়ায়েত নকল করেছেন।

টিকাঃ
'. উমদাতুল কারি: ৭/৪২০
°. ফাতহুল বারি: ৪/২৪৩

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 লোহা হলো কোমল

📄 লোহা হলো কোমল


এত বিশাল ও প্রকাণ্ড রাজত্বের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হযরত দাউদ আ. রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক রত্তিও গ্রহণ করতেন না। তিনি নিজের জন্য বা পরিবারের ভরণ-পোষণের ভার সরকারি খাজানার ওপর ফেলতেন না, বরং নিজ হাতে হালাল রুজি কামাই করতেন। এটাই ছিলো তাঁর জীবিকা। তাইতো হযরত দাউদ আ.-এর প্রশংসায় একটি বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ما أكل أحد طعاما قط خيرا من أن يأكل من عمل يده وان نبي الله داؤد عليه السلام كان يأكل من عمل یده - بخاري، كتاب التجارة

'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, একজন ব্যক্তির জন্য সর্বোত্তম রিযিক হলো, তার হাতের উপার্জিত রিযিক। নিশ্চয়ই আল্লাহর মহান নবী দাউদ আ. নিজ হাতে জীবিকা উপার্জন করতেন।' [বুখারি শরিফ, কিতাবুত তিজারাহ]

শায়খ বদরুদ্দিন আইনি রহ. বলেন, হযরত দাউদ আ. দোয়া করতেন, হে আল্লাহ, এমন কোনো উপায় বাতলে দিন, যেনো আমার জন্য হাতের কামাই সহজ হয়ে যায়। কেননা, আমি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর আমার জীবিকার বোঝা ফেলতে চাই না। আসলে হযরত দাউদ আ.-এর এই চেতনা ছিলো নবীসুলভ বৈশিষ্টাবলির একটি, যার কথা কুরআনুল কারিম মহান নবীদের হেদায়েত ও পথপ্রদর্শন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছে। প্রত্যেক নবী-ই যখন তাঁর উম্মতকে আল্লাহর পয়গাম শুনাতেন, তখন এ কথাও বলতেন-

وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ 'আর আমি তোমাদের থেকে এ খেদমতের কোনো বিনিময় চাই না; আমার বিনিময় তো আল্লাহর জিম্মায়।”

হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, বুখারি শরিফের এ হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, যদিও ইসলামের খলিফার জন্য বাইতুল মাল থেকে প্রয়োজন অনুপাতে ভাতা নেওয়া জায়েয আছে কিন্তু উত্তম এটাই যে, তার ওপর গলগ্রহ হবে না। এ কারণেই হযরত সিদ্দিকে আকবর রা. খেলাফতকালে ভাতা হিসেবে যা গ্রহণ করেছিলেন, তার সমুদয় অর্থ ইন্তিকালের সময় ফেরত দিয়েছিলেন। অন্যান্য ইসলামি খেদমতের ওপর বিনিময় গ্রহণ করারও একই বিধান।

হযরত দাউদ আ.-এর মনের একান্ত বাসনাকে মহান আল্লাহ গ্রহণ করেছিলেন যে, তার হাতে লোহা ও ইস্পাতকে মোমের মতো নরম বানিয়ে দিয়েছিলেন। যখন তিনি লোহা বা ইস্পাত দিয়ে বর্ম বানাতেন তখন শক্ত পরিশ্রম বা কর্মকারের যন্ত্র ছাড়াই যেভাবে ইচ্ছে গড়ে নিতে পারতেন। লোহা তাঁর হাতে মোমের মতো যেমন ইচ্ছে আকার ধারণ করতো।

কুরআনুল কারিম বিষয়টিকে সুরা আম্বিয়া ও সুরা সাবায় এভাবে উপস্থাপন করেছে-

وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ () أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتٍ وَقَدِرْ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

'আর আমি তার (দাউদের) জন্য লোহাকে নরম করেছিলাম এবং তাকে বলেছিলাম, প্রশস্ত বর্ম তৈরি করো, কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করো এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো। তোমরা যা কিছু করো, আমি তা দেখি।' [সূরা সাবা: ১০-১১]

وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَكُمْ لِتُحْصِنَكُمْ مِنْ بَأْسِكُمْ فَهَلْ أَنتُمْ شَاكِرُونَ

'আমি তাঁকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?' [সুরা আম্বিয়া] তাওরাত ও 'লোহা ব্যবহারের ইতিহাস' থেকে জানা যায় যে, দাউদ আ.- এর পূর্বে লৌহশিল্প এতটুকু উন্নতি করেছিলো যে, ইস্পাত গলিয়ে বিভিন্ন টুকরো বানানো হতো। সেগুলোকে সংযুক্ত করে বর্ম তৈরি করা হতো। কিন্তু সেই বর্ম এতটাই ভারী হতো যে, খুব শক্তিশালী মানুষ ছাড়া অন্য কারো পক্ষে তা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতো। আর তা পরিধান করার পর যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত পদক্ষেপে চলাচল করা যেতো না।

হযরত দাউদ আ.-ই হলেন প্রথম ব্যক্তি যাঁকে মহান আল্লাহ এ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন যে, তিনি ওহির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে এমন বর্ম আবিষ্কার করতে সক্ষম হন যা হতো খুবই পাতলা। সেগুলো ছিলো ছোট ছোট শেকলের আংটা দিয়ে নির্মিত। হালকা ও নরম হওয়ার কারণে তা পরিধান করে একজন সৈনিক যুদ্ধের ময়দানে খুব সহজেই চলাচল করতে পারতো। শত্রু থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও সেই বর্ম কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিলো।

সাইয়িদ মাহমুদ আলুসি রহ. রুহুল মাআনিতে হযরত কাতাদাহ রহ. থেকে এ ধরনের রেওয়ায়েত নকল করেছেন।

টিকাঃ
'. উমদাতুল কারি: ৭/৪২০
°. ফাতহুল বারি: ৪/২৪৩

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 পাখিদের সঙ্গে কথা বলা

📄 পাখিদের সঙ্গে কথা বলা


হযরত দাউদ আ. ও তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান আ.-কে মহান আল্লাহ এ মহাসম্মান প্রদান করেছিলেন যে, তারা দু'জনই পাখিদের ভাষা জানতেন। যেভাবে একজন মানুষ অন্য মানুষের কথাবার্তা বুঝতে পারে, তদ্রূপ তাঁরাও পাখিদের কথাবার্তা বুঝতে পারতেন।

পাখিদের কথাবার্তা কী এবং হযরত দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালাম পাখিদের ভাষা সম্পর্কে কী ধরনের জ্ঞান রাখতেন, এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হযরত সুলাইমান আ.-এর জীবনীতে উল্লেখ করবো। তবে এতটুকু কথা নিশ্চিত প্রমাণিত যে, বর্তমান যুগের প্রাণীবিদগণ অনুমান ও ধারণানির্ভর জ্ঞান প্রয়োগ করে যে শাস্ত্র আবিষ্কার করেছেন, বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে প্রাণিবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা মনে করা হয়, তাঁদের জ্ঞান ছিলো তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যা ছিলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর একটি বিশেষ দান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00