📄 হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কুরআন ও তাওরাতের ভাষ্য
এখানে এসে কুরআনুল কারিম ও তাওরাতের ভাষ্যে চরম বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। কুরআনুল কারিম হযরত দাউদ আ.-কে একাধারে প্রতাপ ও প্রতিপত্তির অধিকারী মহাসম্রাট এবং মহান নবী স্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে তাওরাতে তাকে শুধু 'কিং ডেভিড' বা রাজা দাউদ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে তার নবুয়ত ও রিসালাতের স্বীকৃতি নেই। আর বাস্তবতা হলো, তাওরাতের অস্বীকার অমূলক ও অবান্তর। বর্তমানের তাওরাত এতটাই মিথ্যাচার ও অপলাপে পরিপূর্ণ যে, খোদ তাওরাতের পৃষ্ঠাগুলোতেই তার অসংখ্য প্রমাণ জ্বলজ্বল করে।
📄 মিথ্যাচারের বেসাতির দৃষ্টান্ত
মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত উদ্ভট গল্প-কাহিনির একটির সম্পর্ক হযরত দাউদ আ.-কে জড়িয়ে। তাওরাতের স্যামুয়েল পুস্তিকায় হযরত দাউদ আ. সম্পর্কে একটি লম্বা গল্প রয়েছে। সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হলো।
'আর সন্ধ্যাকালে দাউদ তার পালঙ্ক থেকে গাত্রোত্থান করে রাজমহলের ছাদের ওপর পায়চারি করতে লাগলেন। ছাদের উপর থেকে তিনি এক অত্যন্ত রূপসী রমণীকে স্নান করতে দেখলেন। তখন দাউদ লোক পাঠিয়ে রমণীটির অবস্থা জানলেন। জনৈক ব্যক্তি বললো, সে কি আলআমের কন্যা বিনতে সাবা নয়, যে হাত্তা আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রী? দাউদ লোক পাঠিয়ে বিনতে সাবাকে ডেকে আনালেন। সে তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁর সঙ্গে সঙ্গম করলেন। (কেননা, রমণীটি তার ঋতুস্নান শেষে পবিত্র হয়েছিলো) এরপর তিনি তাঁর ঘরে চলে গেলেন। আর এদিকে রমণীটি গর্ভবতী হয়ে পড়লো। তখন সে দাউদের কাছে সংবাদ পাঠালো যে, আমি গর্ভবতী হয়ে পড়েছি। ... প্রত্যুষে দাউদ ইউআবের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখলেন। পত্রটি তিনি আওরিয়্যাহ-র মাধ্যমে পাঠালো। তিনি চিঠিতে এ কথা লেখলেন যে, আওরিয়্যাহকে সংঘর্ষের সময় সবার সম্মুখে রাখবে এবং তুমি তার পাশ থেকে সরে যাবে যাতে সে মারা যায়।... আর ওই নগরীর লোকেরা বেরিয়ে এলো এবং ইউআবের সঙ্গে লড়াই করলো। ওখানে দাউদের স্বল্পসংখ্যক ভৃত্য কাজে এসেছে এবং হাত্তা আওরিয়্যাহ নিহত হয়। তখন ইউআব লোক মারফত যুদ্ধের বৃত্তান্ত দাউদকে জানিলে দিলো... আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রী শুনতে পেলো যে, তার স্বামী আওরিয়্যাহ নিহত হয়েছে। সে তার স্বামীর জন্য বিলাপ করতে লাগলো। শোকের দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে দাউদ তাকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁর প্রাসাদে রেখে দিলেন। এভাবে সে তাঁর স্ত্রী হয়ে গেলো। তাঁর গর্ভে এক সন্তান জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু দাউদের এই কাজে খোদা তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হলেন।'২
এই গল্পকথায় হযরত দাউদ আ.-এর যে চারিত্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা পড়ার পর তাকে নবী তো পরের কথা একজন শুদ্ধ চরিত্রসম্পন্ন মানুষও মনে করা যায় না। অন্যের স্ত্রীর প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়া, তার সঙ্গে অবৈধ সঙ্গম করা, তারপর চক্রান্ত করে তার স্বামীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করান্তে এগুলো মানবজীবনের এমনই ঘৃণ্য নাপাক কর্ম, যার জন্য শিষ্টাচার শাস্ত্রের পরিভাষায় 'কুকাম' ছাড়া অন্যকোনো শব্দ প্রয়োগ করা যায় না।
سُبْحَنَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ 'আপনি এর থেকে পবিত্র। এটি গুরুতর অপবাদ ছাড়া কিছু নয়।'
টিকাঃ
২. স্যামুয়েল [২] অধ্যায়: ১১, আয়াত: ২-২৭
📄 তাওরাতের পরস্পরবিরোধী বর্ণনা
আমরা হযরত দাউদ আ.-এর নিষ্পাপ ব্যক্তিত্বের ওপর আরোপিত অপবাদের প্রামাণিক খণ্ডন করার আগে তাওরাতের ভাষাতেই জানিয়ে দেবো যে, তাওরাত হযরত দাউদ আ. সম্পর্কে অন্য অনেক জায়গায় কী বলেছে এবং তাঁর পবিত্রতা ও খোদাভীরুতাকে কীভাবে উল্লেখ করেছে।
তাওরাতের স্যামুয়েল অধ্যায়ে রয়েছে- তখন নাতন (নবী) রাজা (দাউদ)-কে বললো, যাও যা তোমার ইচ্ছে করো। কেননা, খোদাওয়ান্দ তোমার সঙ্গে আছেন। আর সে রাতে এমন ঘটলো যে, খোদাওয়ান্দের বাণী নাতনের কাছে পৌঁছলো-
যাও, আমার বান্দা দাউদকে বলো, খোদাওয়ান্দ একথা বলেছেন....। সুতরাং এখন তুমি আমার বান্দা দাউদকে বলো, রাবুল আফওয়াজ (সব সৈনিকের প্রতিপালক) এ কথা বলেছেন, আমি তোমাকে মেঘপাল থেস্তেযেখানে তুমি মেষের পেছনে পেছনে ঘুরতেউঠিয়ে এনেছি যাতে তুমি আমার জাতি ইসরাইলের পথপ্রদর্শক হও।'১
এসব বক্তব্য তাওরাত থেকেই নেয়া। এ থেকে জানা যায় যে, হযরত দাউদ আ. ছিলেন মহান আল্লাহর একজন প্রিয় ও পছন্দনীয় বান্দা। তিনি সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার গৌরব লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর শরিয়তের পূর্ণ অনুগত ও বাধ্য। তিনি ছিলেন কালিমামুক্ত, নিষ্কলুষ, পূতঃপবিত্র চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহর দেয়া রাজত্বে তিনি ছিলেন বনি ইসরাইলের আমির ও আল্লাহর খলিফা। সবসময় ইলাহি রক্ষাকবচ তাঁকে সবকিছু থেকে বাঁচিয়ে রাখতো। কাজেই তিনি ছিলেন মহান নবী ও প্রতাপশালী সম্রাট। কাজেই জানি না, আহলে কিতাবগণ কীভাবে তাওরাতের এই পরস্পরবিরোধী কথাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করবেন এবং হযরত দাউদ আ. তাদের চোখে কতটা মর্যাদাবান? যদি তাদের দৃষ্টিতে তিনি একজন নবী বা উত্তম চরিত্রবান হয়ে থাকেন তাহলে হাত্তা আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রী সম্পর্কিত কাহিনি সম্পর্কে তাদের কাছে কী জবাব আছে? আর যদি আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রীর ঘটনাটি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে উপরিউক্ত প্রশংসা ও মর্যাদার অধিকারী দাউদ কোনজন?
এর বিপরীতে কুরআনুল কারিম হযরত দাউদ আ. সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তিনি ছিলেন আল্লাহর নির্বাচিত রাসুল ও একজন নিষ্পাপ নবী। তিনি ছিলেন আল্লাহর খলিফা ও বনি ইসরাইলের পরিচালক ও শাসক। কুরআন ঘোষণা করেছে-
وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا
'আমি তো কতক নবীকে কতক নবীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি এবং দাউদকে যাবুর দান করেছি।' [সুরা ইসরা: আয়াত ৫৫]
সুরা সাদে ইরশাদ করে-
وَوَهَبْنَا لِدَاوُودَ سُلَيْمَانَ نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ
'আমি দাউদকে সুলাইমান দান করেছি। সে একজন উত্তম বান্দা। সে ছিলো আল্লাহ-অভিমুখী।' [সুরা সাদ: ৩০]
সেখানে আরো ইরশাদ হয়েছে-
وَشَدَدْنَا مُلْكَهُ وَآتَيْنَاهُ الْحِكْمَةَ وَفَصْلَ الْخِطَابِ
'আমি তার সম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও ফয়সালাকারী বাগ্মিতা।' [সুরা সাদ: আয়াত ২০]
সুরা নামলে এসেছে-
وَ لَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ عِلْمًا وَقَالَا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي فَضَّلَنَا عَلَى كَثِيرٍ مِنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ
'আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলাইমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম। তারা বলেছিলেন, 'আল্লাহর প্রশংসা, যিনি আমাদেরকে তাঁর অনেক মুমিন বান্দার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। [সুরা নামল: আয়াত ১৫]
উল্লিখিত আয়াতসমূহে কুরআনুল কারিম যথারীতি পূর্বের কিতাবসমূহের সেই ভ্রান্ত ধারণার খণ্ডন ও সংশোধন করেছে, যা প্রবৃত্তিপূজারী জ্ঞানপাপীদের বিকৃতি ও পরিবর্তনের ফলে সেখানে আশ্রয় পেয়েছিলো এবং নিজ অনুসারীদের বিশ্বাসে স্থান পেয়েছিলো। কুরআনুল কারিম ইতিহাসের সেই অন্ধকার পর্দা ভেদ করে প্রমাণিত করেছে যে, হযরত দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালাম ছিলেন বনি ইসরাইলের মহান নবীদের অন্তর্ভুক্ত। তারা ছিলেন আল্লাহর সত্য নবী। তারা ছিলেন সর্বপ্রকার গুনাহ ও কলুষ হতে মুক্ত। তাদের চরিত্রে আল্লাহর অবাধ্যতার কোনো কালিমা লেপন হয় নি।
কিন্তু আফসোস, হাজার আফসোস যে, কুরআনুল কারিমের ঘোষণা সত্ত্বেও হাত্তা আওরিয়্যাহর স্ত্রীর কল্পিত, অলীক ও উদ্ভট বানোয়াট কাহিনি তাওরাত ও ইসরাইলি রেওয়ায়েতের সূত্রে পেয়ে কতিপয় মুফাসসির কুরআনুল কারিমের তাফসিরে উদ্ধৃত করেছেন এবং ইসরাইলি মনগড়া গল্প-কাহিনিকে কোনো প্রকার দলিল-প্রমাণ ছাড়াই ইসলামি রেওয়ায়েতের সমান মর্যাদা দিয়েছেন!
ওইসকল সরল বুযুর্গ কেনো ভাবলেন না যে, যে কল্পিত কাহিনিগুলোকে আজ তারা ইসরাইলি রেওয়ায়েত হিসেবে কুরআনুল কারিমের তাফসিরে উদ্ধৃত করছেন, এ উম্মতের অনেকই আগামীকাল সেগুলোকে কুরআনের আয়াতের তাফসির ও ব্যাখ্যা মনে করে ফেতনায় পড়ে যাবে। হতে পারে, তা তাদের গোমরাহির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাজ্জব! শত তাজ্জব আধুনিক ও প্রাচীন সেইসব আকায়িদশাস্ত্রবিশারদের প্রতি!! তারা এ জাতীয় উদ্ভট কল্প-কাহিনিকে শক্ত ভাষায় প্রত্যাখ্যান ও এ সকল মিথ্যা অপবাদকে খণ্ডণ না করে সেগুলোর জন্য কোনো ভালো প্রয়োগস্থল বের করে কবুল করে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং অপাত্রে সুধারণা পোষণের নীতি অবলম্বন করে রূঢ় সত্যকে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, ওই উদ্ভট কল্প-কাহিনিগুলোর ব্যাপারে তাঁরা যে ব্যাখ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন, তার ফলে তারা ধীরে ধীরে একটি জটিল জালে আবদ্ধ হতে চলেছেন। কেননা, এগুলোকে কোনো-না-কোনোভাবে মেনে নেয়া হলে, ইসমতে আম্বিয়া তথা নবীগণের সত্তা নিষ্পাপ হওয়া-সংক্রান্ত অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও বুনিয়াদি ইসলামি আকিদার ওপর আঘাত আসছে। যখন কুরআনুল কারিম তাঁদেরকে নিষ্পাপ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং এগুলোকে মিথ্যাচার অভিহিত করেছে, তখন কোন সাহসে তাঁদের দিকে এ মিথ্যা কাহিনিগুলো সম্বন্ধিত করা হয়? কার এমন দুঃসাহস যে, সে এগুলোকে কুরআনুল কারিমের তাফসিরে স্থান দেয়? যাইহোক। এই মুফাসসিরগণ যে সকল আয়াতের তাফসিরে এই প্রাণঘাতী বিষ মিলিয়েছেন, তা সুরা সাদে হযরত দাউদ আ.-এর নিম্নের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট-
وَهَلْ أَتَاكَ نَبَأُ الْخَصْمِ إِذْ تَسَوَّرُوا الْمِحْرَابَ () إِذْ دَخَلُوا عَلَى دَاوُودَ فَفَزِعَ مِنْهُمْ قَالُوا لَا تَخَفْ خَصْمَانِ بَغَى بَعْضُنَا عَلَى بَعْضٍ فَاحْكُمْ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَلَا تُشْطِطْ وَاهْدِنَا إِلَى سَوَاءِ الصِّرَاطِ () إِنَّ هَذَا أَخِي لَهُ تِسْعٌ وَتِسْعُونَ نَعْجَةٌ وَلِيَ نَعْجَةٌ وَاحِدَةٌ فَقَالَ أَلْفِلْنِيهَا وَعَزَّنِي فِي الْخِطَابِ ( ) قَالَ لَقَدْ ظَلَمَكَ بِسُؤَالِ نَعْجَتِكَ إِلَى نِعَاجِهِ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ وَظَنَّ دَاوُودُ أَنَّهَا فَتَنَّاهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَأَنَابَ () فَغَفَرْنَا لَهُ ذَلِكَ وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآبِ ( يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ ()
'তোমার নিকট বিবদমান লোকদের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? যখন তারা প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে আসলো ইবাদতখানায়। এবং দাউদের নিকট পৌঁছলো, তখন তাদের কারণে সে ভীত হয়ে পড়লো। তারা বললো, ভীত হবেন না, আমরা দুই বিবদমান পক্ষ আমাদের একে অপরের ওপর যুলুম করেছে; অতএব আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন; অবিচার করবেন না এবং আমাদেরকে সঠিক পথনির্দেশ করুন। এ ব্যক্তি আমার ভাই, তার আছে নিরানব্বইটি দুম্বা এবং আমার আছে মাত্র একটি দুম্বা। তবুও সে বলে, 'আমার যিম্মায় এটি দিয়ে দাও', এবং কথায় সে আমার প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেছে। দাউদ বললো, 'তোমার দুম্বাটিকে তার দুম্বাগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার দাবি করে সে তোমার প্রতি যুলুম করেছে। শরিকদের অনেকে একে অন্যের ওপর তো অবিচার করে থাকে- করে না কেবল মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ এবং তারা সংখ্যায় স্বল্প। দাউদ বুঝতে পারলো, আমি তাকে পরীক্ষা করলাম। অতঃপর সে তার প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলো এবং নত হয়ে লুটিয়ে পড়লো ও তাঁর অভিমুখী হলো। অতঃপর আমি তার ত্রুটি ক্ষমা করলাম। আমার নিকট তার জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম। হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার করো এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না, কেননা, এটি তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। যারা আল্লাহ পথ থেকে ভ্রষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি, কারণ তারা বিচারদিবসকে বিস্মৃত হয়ে আছে।। [সুরা সাদ : আয়াত ২১-২৬]
টিকাঃ
১. স্যামুয়েল [২] অধ্যায়: ৭, আয়াত: ৩-৮
📄 আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা
এখানে হযরত দাউদ আ.-এর একটি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে করা হয়েছে। হযরত দাউদ আ. প্রথমদিকে তা ধরতে পারেন নি কিন্তু হঠাৎ তার মনে এ খেয়াল এসেছে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। তখন তৎক্ষণাৎ তিনি আল্লাহর মনোনীত নবীদের মতো আল্লাহ-অভিমুখী হন এবং ইসতিগফার করেন। আল্লাহর দরবারে তার সেই ক্ষমাপ্রার্থনা গৃহীত হয়। ফলে তাঁর সম্মান ও আল্লাহর নৈকট্য পূর্বাপেক্ষা অধিক উচ্চতা লাভ করে।
ব্যাপারটি ছিলো শুধুই এতটুকু। কিন্তু যখন কতিপয় মুফাসসির লক্ষ্য করলেন যে, কুরআনুল কারিম সেই পরীক্ষার কোনো বিবরণ জানায় নি আর তাওরাত ও ইসরাইলি রেওয়ায়েতে আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রীর একটি চটকদার কাহিনি আছে; তাতে হযরত দাউদ আ.-এর ওপর আল্লাহর অসন্তুষ্ট হওয়ার কথারও উল্লেখ পাওয়া যায়, তখন তারা পূর্বাপর না ভেবেই সেই মনগড়া গল্পকে ওই আয়াতের তাফসির বানিয়ে পরীক্ষা, ক্ষমাপ্রার্থনা ও তার গৃহীত হওয়ার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন।
তাদের এ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত কাণ্ডকে বিশেষজ্ঞ মুফাসসিরগণ ও গবেষকবৃন্দ কোনোভাবেই মেনে নেন নি। তারা দলিল-প্রমাণের আলোকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওই কল্প-কাহিনির সঙ্গে সুরা সাদের এ সকল আয়াতের তাফসিরের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। শুধু এটাই নয়, বরং এ পুরো গল্পটির আদ্যোপান্ত ইহুদিদের উর্বর মস্তিষ্কের প্রসব। ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারে এর কোনো স্থান হতে পারে না।
হাফেয ইমাদুদদিন ইবনে কাসির রহ. তার তাফসিরে লিখেছেন- قد ذكر المفسرون ههنا قصة أكثرها مأخوذ من الإسرائيليات ولم يثبت فيها عن المعصوم حديث يجب اتباعه.
'এ স্থানে কতিপয় মুফাসসির একটি গল্প উল্লেখ করেছেন। নিঃসন্দেহে যার বৃহৎ অংশ ইসরাইলি বর্ণনা হতে সংগৃহীত। এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আনুগত্য-আবশ্যক একটি হাদিসও বর্ণিত নেই।'
তিনি তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া'য় আরো জোরের সঙ্গে বলেছেন- وقد ذكر كثير من المفسرين من السلف والخلف ههنا قصصا وأخبارا أكثرها إسرائيليات ومنها ما هو مكذوب لا محالة تركنا إيرادها في كتابنا قصدا اكتفاء واقتصارا على مجرد تلاوة القصة من القرآن العظيم والله يهدي من يشاء إلى صراط مستقيم.
'পূর্বের ও পরবর্তী সময়ের বেশ কয়েকজন তাফসিরকার এ স্থানে কয়েকটি গল্প ও কাহিনি বর্ণনা করেছেন। যার বৃহদাংশই ইহুদিদের কপোলকল্পিত। আর কিছু গল্প তো সন্দেহাতীতভাবে আদ্যোপান্ত মিথ্যাচার। যার কারণে আমরা ইচ্ছেকৃতভাবে সেগুলোকে বর্ণনা করি নি। কুরআনুল কারিম যতটুকু ঘটনা জানিয়েছে, শুধু ততটুকুতেই আমরা যথেষ্ট মনে করেছি। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে সরল পথে পরিচালিত করেন।'
'কিতাবুল ফসল'-এ হাফেয আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযাম রহ. উল্লিখিত আয়াতের সূত্রে লিখেছেন-
ما حكاه الله تعالى عن داود قول صادق صحيح. لا يدل على شيئ مما قاله المستهزئون الكاذبون المتعلقون بخرافات ولدها اليهود
'আর হযরত দাউদ আ. সম্পর্কে কুরআন যে ঘটনা বর্ণনা করেছে তা সত্য ও সঠিক। পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদী বিদ্রূপকারীরা যে-রূপকথা বলে বেড়ায়, সেগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। যেগুলো আদ্যোপান্ত ইহুদিদের বিকৃত মস্তিষ্কের তৈরি।'
তদ্রূপ খাফাজি রহ. 'নাসিমুর রিয়াদ'-এ, কাযি আয়ায রহ. 'শিফা'য়, আবু হাইয়ান উন্দুলুসি রহ. 'বাহরুল মুহিত'-এ, ইমাম রাযি রহ. 'আত-তাফসিরুল কাবির'-এ এবং এছাড়া অন্য মুহাক্কিকগণ তাঁদের কিতাবে এ সকল কল্প-কাহিনিকে প্রত্যাখ্যানযোগ্য অভিহিত করে প্রমাণ করেছেন যে, এক্ষেত্রে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো বিশদ বিবরণ বর্ণিত নেই।