📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 যাবুর

📄 যাবুর


বনি ইসরাইলের হেদায়েত ও পথপ্রদর্শনের 'মূল ও বুনিয়াদি গ্রন্থ' ছিলো তাওরাত। তবে চলমান অবস্থা, সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ ও যুগের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে হযরত দাউদ আ.-কেও আল্লাহর পক্ষ থেকে 'যাবুর' প্রদান করা হয়। যা তাওরাতের বিধানাবলি ও মূলনীতিসমূহের অধীনে থেকে ইসরাইলি গোষ্ঠীগুলোকে সত্যের পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে প্রেরিত হয়েছিলো। যার মাধ্যমে হযরত দাউদ আ. হযরত মুসা আ.-এর শরিয়তকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ইসরাইলিদেরকে সত্যপথে পরিচালিত করেন এবং ওহির নুরের সুধায় আল্লাহর পরিচয় অন্বেষীদের পরিতৃপ্ত করেন।

যাবুর ছিলো আল্লাহর প্রশংসাগীতে পরিপূর্ণ। হযরত দাউদ আ.-কে মহান আল্লাহ এমন কণ্ঠস্বর ও যাদুময়ী সুর দান করেছিলেন যে, যখন তিনি যাবুর তেলাওয়াত করতেন তখন জিন ও মানব; এমনকি জীব-জন্তু পর্যন্ত সম্মোহিত হয়ে পড়তো। ফলে আজ পর্যন্ত 'দাউদি কণ্ঠস্বর' একটি প্রবাদ বাক্য।

মুসান্নাফে আবদির রায্যাকে রয়েছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হযরত আবু মুসা আশআরি রা.-এর সুকণ্ঠ শুনতেন, তখন বলতেন, 'আবু মুসা আশআরিকে মহান আল্লাহ দাউদি কণ্ঠ প্রদান করেছেন।'১

অভিধানে যাবুর অর্থ অংশ ও টুকরো। যেহেতু এ কিতাবটি প্রকৃতপক্ষে তাওরাতের পূর্ণতা দানের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিলো। এটি তারই অংশ বা টুকরো।

যাবুর ছিলো এমন কিছু ছন্দ ও অন্ত্যমিলযুক্ত বাণীর সংকলন, যাতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণগান এবং বান্দার অক্ষমতা, দাসত্বের স্বীকারোক্তি, উপদেশ ও নসিহত, শিক্ষা ও হিতোপদেশ সম্বলিত আলোচনা ছিলো। মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় এসেছে যে, 'রমযান মাসে যাবুর অবতীর্ণ হয়। এটি ছিলো উপদেশ ও প্রজ্ঞা সম্বলিত গ্রন্থ'।’ তাতে বেশ কিছু সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণীও বিবৃত ছিলো। এ কারণেই মুফাসসিরিনে কেরাম একথা বলেছেন যে, নিম্নের আয়াতে যাবুরের যে ঘটনা প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের সুসংবাদের বাহক। তাঁরাই এর উদ্দেশ্য।

وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ

'আর নিঃসন্দেহে আমি যাবুরে নসিহতের পর এ কথা বলেছি যে, আমার সৎ বান্দাগণ পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।'। সুরা আম্বিয়া।

কুরআনুল কারিমের অসংখ্য স্থানে তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবুরকে 'আল্লাহর ওহি', 'আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ' বলা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এ ঘোষণাও করা হয়েছে যে, বনি ইসরাইলিরা জেনে-বুঝে আল্লাহর এ কিতাবগুলোতে বিকৃতি সাধন করেছে। স্থানে স্থানে নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করেছে। যার কারণে বর্তমানে তার মূল কাঠামোর ওপর এমনভাবে আবরণ পড়ে গেছে যে, আসল ও জালের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُوْنَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ

'আর কতিপয় ইহুদি এমন, যারা (তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিল-এর) কথাগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃতি করেছে।' (সুরা বাকারা)

কাজেই তাওরাত ও ইঞ্জিলের বাইরে খোদ যাবুর তাদের সেই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হিসেবে বিদ্যমান। বর্তমান যাবুরের অনেকগুলো অংশ রয়েছে। যেগুলোকে আহলে কিতাবদের পরিভাষায় [মাযবুর] বলা হয়।

কথিত আছে যে, এগুলোর সংখ্যা একশো পঞ্চাশটি। সেই অংশগুলোর ওপর একেকটির একেক নাম। এই ভিন্ন নামধারী অজস্র খণ্ডের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এগুলো প্রকৃতপক্ষে হযরত দাউদ আ.-এর ওপর অবতীর্ণ মাযবুর নয়। কেননা, কয়েকটির ওপর হযরত দাউদের নাম অঙ্কিত থাকলেও কয়েকটির ওপর অন্যদের নাম রয়েছে। যেমন, কোনোটির ওপর সংজ্ঞীতজ্ঞরাজ কওরাহ-এর নাম, কয়েকটির ওপর শাওশিনাম-এর শিরোনামে আসিফের এবং কয়েকটির ওপর গুতাইতের নাম লেখা রয়েছে। এমন কিছু মাযবুরও রয়েছে, যার ওপর কারো নাম নেই। এ ছাড়া এমন কিছু মাযবুরও রয়েছে, যা হযরত দাউদ আ.-এর ইন্তিকালের কয়েক শতাব্দী পর সংকলিত হয়েছে। যেমন, এক মাযবুরে এ কথা রয়েছে-

'হে খোদা, বিভিন্ন জাতি তোমার উত্তরাধিকারে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা তোমার পবিত্র মন্দিরি আকৃতিকে অপবিত্র করে ফেলেছে। তারা জেরুজালেমকে ধংসস্তূপে পরিণত করেছে।'১

বুখতেনাস্সার নামক অত্যাচারী রাজা বনি ইসরাইলের ওপর যে ধংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো, মাযবুরে তার বিবরণ রয়েছে। অথচ ঘটনাটি ঘটেছিলো হযরত দাউদ আ.-এর কয়েক শতাব্দী পর।

মোটকথা, মহান আল্লাহ হযরত দাউদ আ.-এর ওপর যাবুর নাযিল করেন এবং এর মাধ্যমে বনি ইসরাইলকে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি আহ্বান জানান-

টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/১১
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/১২
১. মাযবুর: ৭৯ থেকে ৮৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00