📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 রাজত্বের বিশাল পরিধি

📄 রাজত্বের বিশাল পরিধি


কুরআনুল কারিম, তাওরাত ও ইসরাইলি ইতিহাস এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত দাউদ আ. ছিলেন বীরত্ব, বুদ্ধিমত্তা, সুস্থচিন্তা, কর্মকৌশল, সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষমতা ইত্যাকার গুণাবলি বিবেচনায় একজন পূর্ণ মানুষ। বিজয় ও সাফল্য সবসময় তার পদচুম্বন করতো। তার ওপর মহান আল্লাহর দয়া ও করুণা এতটাই প্রবল ছিলো যে, শত্রুদলের মোকাবিলায় তার দল যতই স্বল্প হোক না কেনো; বিজয়ের পতাকা সবসময় তার হাতেই উড্ডীন হতো। ফলে খুবই অল্প সময়ের ভেতর তিনি শামদেশ, ইরাক, ফিলিস্তিন ও পশ্চিম জর্ডানের সমস্ত এলাকার ওপর তাঁর শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। আইলা [আকাবা উপসাগর) থেকে শুরু করে ফোরাতের সমস্ত এলাকা ও দামেশক পর্যন্ত গোটা অঞ্চল তাঁর কর্তৃত্বাধীন ছিলো। যদিও এতে হেজাযের সেই অংশগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়, যা তার অঙ্গুলি হেলনের আজ্ঞাবহ প্রশাসনের অংশ হয়ে পড়েছিলো, তবুও এ কথা বলা কোনোভাবে অত্যুক্তি হবে না যে, হযরত দাউদ আ.-এর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব কোনো অংশীদার ছাড়াই 'সামি জাতিসমূহ'-এর একক সাম্রাজ্য ছিলো। জাতির নতুন ইতিহাসদর্শন অনুযায়ী 'আরব জাতীয়তাবাদ' বা তার থেকে আরো ব্যাপক শব্দে 'সামি জাতিসমূহের ঐক্য'-এর প্রশাসন বলা যেতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে বিপুল সৈন্যবহর এবং রাজত্বের বিশাল পরিধি ও বিস্তৃত সীমারেখার সঙ্গে সঙ্গে 'আল্লাহর বিধান' কার্যকরের সৌভাগ্য তার বিশালতা, প্রতিপত্তি, প্রতাপ ও বড়ত্বকে অধিকতর উচ্চতা দান করেছিলো। এ রাজত্বে বসবাসকারী জনগণ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতো যে, যদি হযরত দাউদ আ.-এর সামনে কোনো মামলা বা তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা উপস্থাপন করা হয় যা খুবই জটিল বা মিথ্যাচারপূর্ণ, তবুও তিনি 'আল্লাহর ওহি'-এর মাধ্যমে সেটির মূল অবস্থা উদ্‌ঘাটন করতে সক্ষম হবেন। এ কারণে মানুষ বা জিন, কারোরই এ দুঃসাহস হতো না যে, তার আদেশ অমান্য করবে। ইবনে জারির তার ইতিহাসগ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবাস রা. থেকে এ বর্ণনা নকল করেছেন যে, একবার দু-ব্যক্তি একটি ষাঁড়ের মালিকানার বিবাদ নিয়ে হযরত দাউদ আ.-এর খেদমতে হাজির হলো। তাদের দু-জনের প্রত্যেকেই বলছিলো যে, আমিই এর মালিক, অপরজন আত্মসাৎ করতে চাইছে। হযরত দাউদ আ. মামলার ফয়সালা পরদিন পর্যন্ত মুলতবি করলেন। দ্বিতীয় দিন তিনি বাদীকে বললেন, রাতে আমার কাছে আল্লাহর ওহি এসেছে যে, তোমাকে হত্যা করা হোক। কাজেই তুমি সত্যি কথা বলো। বাদী স্বীকারোক্তি দিয়ে বললো, হে আল্লাহর সত্য নবী, এ মামলায় আমার দাবি শতভাগ সত্য ও সঠিক। কিন্তু এ ঘটনার পূর্বে আমি এ বিবাদীর পিতাকে ধোঁকা দিয়ে মেরে ফেলেছিলাম। স্বীকারোক্তি শুনে হযরত দাউদ আ. তাকে কিসাসস্বরূপ হত্যার নির্দেশ দিলেন।১

এ ধরনের ঘটনা প্রায়শই ঘটতো। ফলে হযরত দাউদ আ.-এর বিধান এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপের সামনে সবাই ছিলো অনুগত। কুরআনুল কারিমের নিম্নের আয়াতে হযরত দাউদ আ.-এর বিশাল রাজত্ব এবং প্রজ্ঞা ও রিসালাতের মর্যাদা প্রকাশ করা হয়েছে- وَشَدَدْنَا مُلْكَهُ وَآتَيْنَاهُ الْحِكْمَةَ وَفَصْلَ الْخِطَابِ

'আমি তার সম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও ফয়সালাকারী বাগ্মিতা।' [সুরা সাদ: আয়াত ২০।

এই আয়াতে ও পেছনে অন্যান্য আয়াতে যে 'হিকমত' শব্দ এসেছে, তার দ্বারা কী উদ্দেশ্য? এটি মুফাসসিরিনে কেরামের বহুল আলোচিত প্রশ্ন। মহান পূর্বসূরিদের বিভিন্ন বক্তব্যের সারাংশ হিসেবে আমি মনে করি, এখানে 'হিকমত' দ্বারা দুটি কথা উদ্দেশ্য। একটি হলো, নবুয়ত। আর দ্বিতীয়টি হলো, বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার সেই অত্যুচ্চ সিংহাসন, যার ওপর অধিষ্ঠিত হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি সঠিক পথের স্থলে কখনই কোনো বক্র পথ অবলম্বন করতে পারে না। কতিপয় আলেম এখানে 'হিকমত' দ্বারা যাবুর উদ্দেশ্য নিয়েছেন।

অদ্রূপ [فَضْلَ الْخِطَابِ ফয়সালাকারী বাগ্মিতা] দ্বারাও দুটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে—

১. তিনি বক্তৃতা ও ভাষণে পারঙ্গম ছিলেন। এমনভাবে কথা বলতেন যে, প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি বাক্য ভিন্ন ভিন্নভাবে উচ্চারিত হতো ও স্পষ্টভাবে বুঝে আসতো। তাতে কথায় বিশুদ্ধতা, সৌন্দর্য ও অলঙ্কার সৃষ্টি হতো। ২. তাঁর বিধান ও সিদ্ধান্ত সত্য-মিথ্যার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মীমাংসাকারীর ভূমিকা রাখতো।

টিকাঃ
১. তারিখে ইবনে কাসির: ২/১২

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 যাবুর

📄 যাবুর


বনি ইসরাইলের হেদায়েত ও পথপ্রদর্শনের 'মূল ও বুনিয়াদি গ্রন্থ' ছিলো তাওরাত। তবে চলমান অবস্থা, সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ ও যুগের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে হযরত দাউদ আ.-কেও আল্লাহর পক্ষ থেকে 'যাবুর' প্রদান করা হয়। যা তাওরাতের বিধানাবলি ও মূলনীতিসমূহের অধীনে থেকে ইসরাইলি গোষ্ঠীগুলোকে সত্যের পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে প্রেরিত হয়েছিলো। যার মাধ্যমে হযরত দাউদ আ. হযরত মুসা আ.-এর শরিয়তকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ইসরাইলিদেরকে সত্যপথে পরিচালিত করেন এবং ওহির নুরের সুধায় আল্লাহর পরিচয় অন্বেষীদের পরিতৃপ্ত করেন।

যাবুর ছিলো আল্লাহর প্রশংসাগীতে পরিপূর্ণ। হযরত দাউদ আ.-কে মহান আল্লাহ এমন কণ্ঠস্বর ও যাদুময়ী সুর দান করেছিলেন যে, যখন তিনি যাবুর তেলাওয়াত করতেন তখন জিন ও মানব; এমনকি জীব-জন্তু পর্যন্ত সম্মোহিত হয়ে পড়তো। ফলে আজ পর্যন্ত 'দাউদি কণ্ঠস্বর' একটি প্রবাদ বাক্য।

মুসান্নাফে আবদির রায্যাকে রয়েছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হযরত আবু মুসা আশআরি রা.-এর সুকণ্ঠ শুনতেন, তখন বলতেন, 'আবু মুসা আশআরিকে মহান আল্লাহ দাউদি কণ্ঠ প্রদান করেছেন।'১

অভিধানে যাবুর অর্থ অংশ ও টুকরো। যেহেতু এ কিতাবটি প্রকৃতপক্ষে তাওরাতের পূর্ণতা দানের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিলো। এটি তারই অংশ বা টুকরো।

যাবুর ছিলো এমন কিছু ছন্দ ও অন্ত্যমিলযুক্ত বাণীর সংকলন, যাতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণগান এবং বান্দার অক্ষমতা, দাসত্বের স্বীকারোক্তি, উপদেশ ও নসিহত, শিক্ষা ও হিতোপদেশ সম্বলিত আলোচনা ছিলো। মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় এসেছে যে, 'রমযান মাসে যাবুর অবতীর্ণ হয়। এটি ছিলো উপদেশ ও প্রজ্ঞা সম্বলিত গ্রন্থ'।’ তাতে বেশ কিছু সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণীও বিবৃত ছিলো। এ কারণেই মুফাসসিরিনে কেরাম একথা বলেছেন যে, নিম্নের আয়াতে যাবুরের যে ঘটনা প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের সুসংবাদের বাহক। তাঁরাই এর উদ্দেশ্য।

وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ

'আর নিঃসন্দেহে আমি যাবুরে নসিহতের পর এ কথা বলেছি যে, আমার সৎ বান্দাগণ পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।'। সুরা আম্বিয়া।

কুরআনুল কারিমের অসংখ্য স্থানে তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবুরকে 'আল্লাহর ওহি', 'আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ' বলা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এ ঘোষণাও করা হয়েছে যে, বনি ইসরাইলিরা জেনে-বুঝে আল্লাহর এ কিতাবগুলোতে বিকৃতি সাধন করেছে। স্থানে স্থানে নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করেছে। যার কারণে বর্তমানে তার মূল কাঠামোর ওপর এমনভাবে আবরণ পড়ে গেছে যে, আসল ও জালের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُوْنَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ

'আর কতিপয় ইহুদি এমন, যারা (তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিল-এর) কথাগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃতি করেছে।' (সুরা বাকারা)

কাজেই তাওরাত ও ইঞ্জিলের বাইরে খোদ যাবুর তাদের সেই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হিসেবে বিদ্যমান। বর্তমান যাবুরের অনেকগুলো অংশ রয়েছে। যেগুলোকে আহলে কিতাবদের পরিভাষায় [মাযবুর] বলা হয়।

কথিত আছে যে, এগুলোর সংখ্যা একশো পঞ্চাশটি। সেই অংশগুলোর ওপর একেকটির একেক নাম। এই ভিন্ন নামধারী অজস্র খণ্ডের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এগুলো প্রকৃতপক্ষে হযরত দাউদ আ.-এর ওপর অবতীর্ণ মাযবুর নয়। কেননা, কয়েকটির ওপর হযরত দাউদের নাম অঙ্কিত থাকলেও কয়েকটির ওপর অন্যদের নাম রয়েছে। যেমন, কোনোটির ওপর সংজ্ঞীতজ্ঞরাজ কওরাহ-এর নাম, কয়েকটির ওপর শাওশিনাম-এর শিরোনামে আসিফের এবং কয়েকটির ওপর গুতাইতের নাম লেখা রয়েছে। এমন কিছু মাযবুরও রয়েছে, যার ওপর কারো নাম নেই। এ ছাড়া এমন কিছু মাযবুরও রয়েছে, যা হযরত দাউদ আ.-এর ইন্তিকালের কয়েক শতাব্দী পর সংকলিত হয়েছে। যেমন, এক মাযবুরে এ কথা রয়েছে-

'হে খোদা, বিভিন্ন জাতি তোমার উত্তরাধিকারে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা তোমার পবিত্র মন্দিরি আকৃতিকে অপবিত্র করে ফেলেছে। তারা জেরুজালেমকে ধংসস্তূপে পরিণত করেছে।'১

বুখতেনাস্সার নামক অত্যাচারী রাজা বনি ইসরাইলের ওপর যে ধংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো, মাযবুরে তার বিবরণ রয়েছে। অথচ ঘটনাটি ঘটেছিলো হযরত দাউদ আ.-এর কয়েক শতাব্দী পর।

মোটকথা, মহান আল্লাহ হযরত দাউদ আ.-এর ওপর যাবুর নাযিল করেন এবং এর মাধ্যমে বনি ইসরাইলকে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি আহ্বান জানান-

টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/১১
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/১২
১. মাযবুর: ৭৯ থেকে ৮৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00