📄 বংশপরিচিতি
হযরত শামাবিল আ.-এর জীবনীর শেষের দিকে হযরত দাউদ আ.-এর ওপরও সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, জালুতকে হত্যা করার ফলে তাঁর বীরত্বের গৌরবগাথা বনি ইসরাইলিদের হৃদয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এমন আসনে সমাসীন করেছিলো। তখন থেকেই তিনি জাতির উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি আল্লাহর মহান নবী হিসেবে মনোনীত হন এবং বনি ইসরাইলের পথপ্রদর্শনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদের সামাজিক জীবনের শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্বশীল হিসেবে 'খলিফা'-ও মনোনীত হন।
ইবনে কাসির রহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে হযরত দাউদ আ.-এর বংশপরিচিতি এভাবে তুলে ধরেছেন:
দাউদ বিন ইশা (ইশি) বিন আওবাদ বিন আবের (অথবা আবেয) বিন সালমূন বিন নাহশুন বিন আউনিয়াযাব (অথবা আমি নাযিব) বিন আরম (অথবা য়ারাম) বিন হাসরূন বিন ফারিস বিন ইয়াহুয়া বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম আলাইহিমুস সালাম। বন্ধনীর ভেতর যেসব নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো ইবনে জারির থেকে বর্ণিত। সা'লাবি 'আরায়িসুল বয়ান' গ্রন্থে কিছু কিছু নামের স্থলে ভিন্ন নাম লিখেছেন। তবে এ কথার ওপর তাঁরা সবাই একমত যে, দাউদ আ. ছিলেন ইয়াহুয়া বিন ইয়াকুব আ.-এর বংশধর।১
তাওরাতে এ কথা এসেছে যে, ইশা বা ইশির অনেকগুলো পুত্র ছিলো। হযরত দাউদ আ. তাদের সকলের কনিষ্ঠ।২
টিকাঃ
১. তারিখে ইবনে কাসির: ২/৯
২. স্যামুয়েলের কিতাব
📄 শারীরিক গড়ন-গঠন
ওয়াহাব ইবনে মুনাবিহ-এর বরাতে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. হযরত দাউদ আ.-এর শারীরিক গড়ন-গঠনের এ বিবরণ দিয়েছেন যে, তিনি ছিলেন কিছুটা খর্বাকৃতির। নীলাটে চোখ। শরীরে পশমের উপস্থিতি ছিলো অপেক্ষাকৃত কম। চেহারা ও অন্যান্য ত্বক থেকে আত্মিক পবিত্রতা ও মানসিক আভিজাত্য পরিস্ফুট হতো।'
টিকাঃ
'. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/১০
📄 হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কুরআন ও তাওরাতের ভাষ্য
এখানে এসে কুরআনুল কারিম ও তাওরাতের ভাষ্যে চরম বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। কুরআনুল কারিম হযরত দাউদ আ.-কে একাধারে প্রতাপ ও প্রতিপত্তির অধিকারী মহাসম্রাট এবং মহান নবী স্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে তাওরাতে তাকে শুধু 'কিং ডেভিড' বা রাজা দাউদ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে তার নবুয়ত ও রিসালাতের স্বীকৃতি নেই। আর বাস্তবতা হলো, তাওরাতের অস্বীকার অমূলক ও অবান্তর। বর্তমানের তাওরাত এতটাই মিথ্যাচার ও অপলাপে পরিপূর্ণ যে, খোদ তাওরাতের পৃষ্ঠাগুলোতেই তার অসংখ্য প্রমাণ জ্বলজ্বল করে।
📄 মিথ্যাচারের বেসাতির দৃষ্টান্ত
মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত উদ্ভট গল্প-কাহিনির একটির সম্পর্ক হযরত দাউদ আ.-কে জড়িয়ে। তাওরাতের স্যামুয়েল পুস্তিকায় হযরত দাউদ আ. সম্পর্কে একটি লম্বা গল্প রয়েছে। সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হলো।
'আর সন্ধ্যাকালে দাউদ তার পালঙ্ক থেকে গাত্রোত্থান করে রাজমহলের ছাদের ওপর পায়চারি করতে লাগলেন। ছাদের উপর থেকে তিনি এক অত্যন্ত রূপসী রমণীকে স্নান করতে দেখলেন। তখন দাউদ লোক পাঠিয়ে রমণীটির অবস্থা জানলেন। জনৈক ব্যক্তি বললো, সে কি আলআমের কন্যা বিনতে সাবা নয়, যে হাত্তা আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রী? দাউদ লোক পাঠিয়ে বিনতে সাবাকে ডেকে আনালেন। সে তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁর সঙ্গে সঙ্গম করলেন। (কেননা, রমণীটি তার ঋতুস্নান শেষে পবিত্র হয়েছিলো) এরপর তিনি তাঁর ঘরে চলে গেলেন। আর এদিকে রমণীটি গর্ভবতী হয়ে পড়লো। তখন সে দাউদের কাছে সংবাদ পাঠালো যে, আমি গর্ভবতী হয়ে পড়েছি। ... প্রত্যুষে দাউদ ইউআবের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখলেন। পত্রটি তিনি আওরিয়্যাহ-র মাধ্যমে পাঠালো। তিনি চিঠিতে এ কথা লেখলেন যে, আওরিয়্যাহকে সংঘর্ষের সময় সবার সম্মুখে রাখবে এবং তুমি তার পাশ থেকে সরে যাবে যাতে সে মারা যায়।... আর ওই নগরীর লোকেরা বেরিয়ে এলো এবং ইউআবের সঙ্গে লড়াই করলো। ওখানে দাউদের স্বল্পসংখ্যক ভৃত্য কাজে এসেছে এবং হাত্তা আওরিয়্যাহ নিহত হয়। তখন ইউআব লোক মারফত যুদ্ধের বৃত্তান্ত দাউদকে জানিলে দিলো... আওরিয়্যাহ-এর স্ত্রী শুনতে পেলো যে, তার স্বামী আওরিয়্যাহ নিহত হয়েছে। সে তার স্বামীর জন্য বিলাপ করতে লাগলো। শোকের দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে দাউদ তাকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁর প্রাসাদে রেখে দিলেন। এভাবে সে তাঁর স্ত্রী হয়ে গেলো। তাঁর গর্ভে এক সন্তান জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু দাউদের এই কাজে খোদা তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হলেন।'২
এই গল্পকথায় হযরত দাউদ আ.-এর যে চারিত্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা পড়ার পর তাকে নবী তো পরের কথা একজন শুদ্ধ চরিত্রসম্পন্ন মানুষও মনে করা যায় না। অন্যের স্ত্রীর প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়া, তার সঙ্গে অবৈধ সঙ্গম করা, তারপর চক্রান্ত করে তার স্বামীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করান্তে এগুলো মানবজীবনের এমনই ঘৃণ্য নাপাক কর্ম, যার জন্য শিষ্টাচার শাস্ত্রের পরিভাষায় 'কুকাম' ছাড়া অন্যকোনো শব্দ প্রয়োগ করা যায় না।
سُبْحَنَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ 'আপনি এর থেকে পবিত্র। এটি গুরুতর অপবাদ ছাড়া কিছু নয়।'
টিকাঃ
২. স্যামুয়েল [২] অধ্যায়: ১১, আয়াত: ২-২৭