📄 শিক্ষা ও উপদেশ
হযরত শামাবিল আ. তালুত ও দাউদ আ.-এর উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। তা থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি নির্বাচিত বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে:
১. মহান আল্লাহ সকল জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় এ বৈশিষ্ট্য গেঁথে দিয়েছেন যে, যখন তাদের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হয়, অন্যকোনো জাতি তাদেরকে দাসে পরিণত করার জন্য অত্যাচারের খড়গ হাতে নেমে আসে তখন তারা নিজেদের অধিকার সংরক্ষণ ও অত্যাচারীর প্রতিরোধে বিভেদ ভুলে ও বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ এক কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ সময় তারা তাদের জন্য একজন সৎ ও যোগ্য নেতা খুঁজতে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, তার হাত ধরে তারা অধঃপতনের গহর থেকে উঠে আসবে। এই চিরন্তন স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছিলো বনি ইসরাইলিদের জীবনেও। হযরত শামাবিল আ.-এর শরণাপন্ন হয়ে তাদের জন্য একজন শাসক নির্বাচিত করে দেয়ার দাবিটি ছিলো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ।
২. স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংরক্ষণের এই চেতনা প্রথমে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বিশেষ সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে তা সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিকশিত হতে শুরু করে। যে জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ ও বিশেষ সন্তানদের সংখ্যা যত বেশি সেই জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে এই চেতনা ততটা দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে।
৩. যখন কোনো জাতির বিশেষ সদস্যদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা ও শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের চেতনা খুব দ্রুত উন্নতি করতে থাকে তখন সেটি ওই জাতির সাধারণ জনগণ বা অপেক্ষাকৃত কমবুদ্ধিসম্পন্ন সদস্যদের প্রভাবিত না করে পারে না। তখন তারাও এ কথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে জাতীয়তা সুরক্ষার যে চেতনা ও অনুভূতি রয়েছে, তা ওই বিশেষ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু যখন ওই চেতনা ও অনুভূতি কর্মে বাস্তবায়িত করার সময় হয়, তখন তাদের নিজেদের অক্ষমতা ও দুর্বল কর্মপন্থার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে।
একটি চেতনাকে কর্মে বাস্তবায়িত করার এই ব্যাপারটি বাস্তবতার নিরিখে খুবই কণ্টকাকীর্ণ ও বন্ধুর গিরিপথ। আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ ও লক্ষ্যে অবিচল না হলে এই বন্ধুর গিরিপিথ অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই সত্যকেই কুরআনুল কারিম নিম্নের শব্দে ব্যক্ত করেছে- فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ
'অতঃপর যখন তাদের ওপর জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে। আর আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬]
৪. বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় যেসব জাহেলি প্রথা ও অপবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, তার একটি হলো, নেতৃত্ব ও শাসন করাকে একমাত্র ওই ব্যক্তিরই অধিকার মনে করা হয় যার বিত্ত ও ঐশ্বর্যর আছে। যার হাতে প্রচুর পুঁজি রয়েছে। বংশে-আভিজাত্যে যার অবস্থান উঁচুতে।
বিভিন্ন জাতির মধ্যে এ ধারণা এতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যে, যেসব জাতিগোষ্ঠীকে সভ্যতা ও কৃষ্টিতে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অগ্রসর মনে করা হয়, তারাও অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ চিন্তার অধিকারী জাতিসমূহের মতো এই বিভ্রান্ত প্রথার শিকার। বরং তাদেরকে দেখা যায় যে, তারা এক কাঠি অগ্রসর হয়ে সেই অপবিশ্বাসকে দুষ্ট বুদ্ধি ও বাকচাতুর্যের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালায়। বনি ইসরাইলিদের মানসিকতাও এই ভুল বিশ্বাস থেকে মুক্ত ছিলো না। ফলে তারাও তালুতের নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছিলো- أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ
'কী করে আমাদের ওপর তার রাজত্ব হবে অথচ আমরা তার চাইতে রাজত্বের অধিক যোগ্য এবং তাকে সম্পদের প্রাচুর্য দেয়া হয় নি।'
৫. কিন্তু ইসলাম এই অজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্বাসের বিপরীতে এ সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহর কাছে সম্পদ ও ঐশ্বর্য নেতৃত্ব ও শাসনের মাপকাঠি নয়, বংশ-বুনিয়াদের ওপর নেতৃত্ব নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে একমাত্র জ্ঞান ও শক্তিই মাপকাঠি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কেননা, নেতৃত্ব ও শাসনের সর্বপ্রথম শর্তই হলো, সততা, নিরপেক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সুস্থ রায় দেয়ার ক্ষমতা। আর এগুলো সম্পদের প্রাচুর্য ও বংশের আভিজাত্য থেকে সৃষ্টি হয় না। বরং জ্ঞানই এগুলোর একমাত্র উৎস।
একইসঙ্গে নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য বীরত্ব, সাহসিকতা ও সত্য প্রকাশের দৃঢ় চেতনাও প্রয়োজন। [بسطة في الجسم : দেহে সমৃদ্ধি] বলে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দেহের সেই শক্তি ও সামর্থ্য, যা জিহাদের ময়দানে শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় প্রতাপ ও প্রভাব সৃষ্টি করবে, প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার ঘটাবে।
কুরআনুল কারিম এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নেতৃত্ব ও শাসনের অধিকারের এ মাসআলাটি ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং আবহমানকালের জাহেলি যুগের বিরুদ্ধে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে জাতির সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। যখনই তারা এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, সঙ্গে সঙ্গে কোনো নবী বা রাসুল বা তাদের স্থলাভিষিক্তদের মাধ্যমে তাদের সেই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং হেদায়েতের পথ দেখানো হয়। বনি ইসরাইল যখন হযরত শামাবিল আ.-এর সামনে তালুতের বিরুদ্ধে উল্লিখিত ভুল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদেরকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন এ কথা বলে—
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর তালুতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।'
৬. যখন সত্য ও মিথ্যার সংঘাত হয় আর সত্যের পক্ষ থেকে আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ মুখলিসগণ জান কুরবানের চেতনা নিয়ে সত্যের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রাণ সঞ্চারিত হয়, তখন দেখা যায় যে, সদস্যের স্বল্পতা তাদের বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রকৃত বিচারে সদস্যসংখ্যার কম-বেশি হওয়া বিজয়ের নিয়ামক নয়। প্রায়শই স্বল্পতার কাছে আধিক্য পরাজিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম এই সত্যেরই ঘোষণা দিয়েছে-
كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'কত ক্ষুদ্র দল আল্লাহর নির্দেশে কত বৃহৎ দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে।'
হযরত শামাবিল আ. তালুত ও দাউদ আ.-এর উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। তা থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি নির্বাচিত বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে:
১. মহান আল্লাহ সকল জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় এ বৈশিষ্ট্য গেঁথে দিয়েছেন যে, যখন তাদের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হয়, অন্যকোনো জাতি তাদেরকে দাসে পরিণত করার জন্য অত্যাচারের খড়গ হাতে নেমে আসে তখন তারা নিজেদের অধিকার সংরক্ষণ ও অত্যাচারীর প্রতিরোধে বিভেদ ভুলে ও বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ এক কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ সময় তারা তাদের জন্য একজন সৎ ও যোগ্য নেতা খুঁজতে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, তার হাত ধরে তারা অধঃপতনের গহর থেকে উঠে আসবে। এই চিরন্তন স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছিলো বনি ইসরাইলিদের জীবনেও। হযরত শামাবিল আ.-এর শরণাপন্ন হয়ে তাদের জন্য একজন শাসক নির্বাচিত করে দেয়ার দাবিটি ছিলো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ।
২. স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংরক্ষণের এই চেতনা প্রথমে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বিশেষ সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে তা সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিকশিত হতে শুরু করে। যে জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ ও বিশেষ সন্তানদের সংখ্যা যত বেশি সেই জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে এই চেতনা ততটা দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে।
৩. যখন কোনো জাতির বিশেষ সদস্যদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা ও শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের চেতনা খুব দ্রুত উন্নতি করতে থাকে তখন সেটি ওই জাতির সাধারণ জনগণ বা অপেক্ষাকৃত কমবুদ্ধিসম্পন্ন সদস্যদের প্রভাবিত না করে পারে না। তখন তারাও এ কথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে জাতীয়তা সুরক্ষার যে চেতনা ও অনুভূতি রয়েছে, তা ওই বিশেষ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু যখন ওই চেতনা ও অনুভূতি কর্মে বাস্তবায়িত করার সময় হয়, তখন তাদের নিজেদের অক্ষমতা ও দুর্বল কর্মপন্থার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে।
একটি চেতনাকে কর্মে বাস্তবায়িত করার এই ব্যাপারটি বাস্তবতার নিরিখে খুবই কণ্টকাকীর্ণ ও বন্ধুর গিরিপথ। আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ ও লক্ষ্যে অবিচল না হলে এই বন্ধুর গিরিপিথ অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই সত্যকেই কুরআনুল কারিম নিম্নের শব্দে ব্যক্ত করেছে- فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ
'অতঃপর যখন তাদের ওপর জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে। আর আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬]
৪. বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় যেসব জাহেলি প্রথা ও অপবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, তার একটি হলো, নেতৃত্ব ও শাসন করাকে একমাত্র ওই ব্যক্তিরই অধিকার মনে করা হয় যার বিত্ত ও ঐশ্বর্যর আছে। যার হাতে প্রচুর পুঁজি রয়েছে। বংশে-আভিজাত্যে যার অবস্থান উঁচুতে।
বিভিন্ন জাতির মধ্যে এ ধারণা এতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যে, যেসব জাতিগোষ্ঠীকে সভ্যতা ও কৃষ্টিতে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অগ্রসর মনে করা হয়, তারাও অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ চিন্তার অধিকারী জাতিসমূহের মতো এই বিভ্রান্ত প্রথার শিকার। বরং তাদেরকে দেখা যায় যে, তারা এক কাঠি অগ্রসর হয়ে সেই অপবিশ্বাসকে দুষ্ট বুদ্ধি ও বাকচাতুর্যের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালায়। বনি ইসরাইলিদের মানসিকতাও এই ভুল বিশ্বাস থেকে মুক্ত ছিলো না। ফলে তারাও তালুতের নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছিলো- أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ
'কী করে আমাদের ওপর তার রাজত্ব হবে অথচ আমরা তার চাইতে রাজত্বের অধিক যোগ্য এবং তাকে সম্পদের প্রাচুর্য দেয়া হয় নি।'
৫. কিন্তু ইসলাম এই অজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্বাসের বিপরীতে এ সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহর কাছে সম্পদ ও ঐশ্বর্য নেতৃত্ব ও শাসনের মাপকাঠি নয়, বংশ-বুনিয়াদের ওপর নেতৃত্ব নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে একমাত্র জ্ঞান ও শক্তিই মাপকাঠি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কেননা, নেতৃত্ব ও শাসনের সর্বপ্রথম শর্তই হলো, সততা, নিরপেক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সুস্থ রায় দেয়ার ক্ষমতা। আর এগুলো সম্পদের প্রাচুর্য ও বংশের আভিজাত্য থেকে সৃষ্টি হয় না। বরং জ্ঞানই এগুলোর একমাত্র উৎস।
একইসঙ্গে নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য বীরত্ব, সাহসিকতা ও সত্য প্রকাশের দৃঢ় চেতনাও প্রয়োজন। [بسطة في الجسم : দেহে সমৃদ্ধি] বলে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দেহের সেই শক্তি ও সামর্থ্য, যা জিহাদের ময়দানে শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় প্রতাপ ও প্রভাব সৃষ্টি করবে, প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার ঘটাবে।
কুরআনুল কারিম এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নেতৃত্ব ও শাসনের অধিকারের এ মাসআলাটি ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং আবহমানকালের জাহেলি যুগের বিরুদ্ধে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে জাতির সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। যখনই তারা এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, সঙ্গে সঙ্গে কোনো নবী বা রাসুল বা তাদের স্থলাভিষিক্তদের মাধ্যমে তাদের সেই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং হেদায়েতের পথ দেখানো হয়। বনি ইসরাইল যখন হযরত শামাবিল আ.-এর সামনে তালুতের বিরুদ্ধে উল্লিখিত ভুল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদেরকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন এ কথা বলে—
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর তালুতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।'
৬. যখন সত্য ও মিথ্যার সংঘাত হয় আর সত্যের পক্ষ থেকে আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ মুখলিসগণ জান কুরবানের চেতনা নিয়ে সত্যের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রাণ সঞ্চারিত হয়, তখন দেখা যায় যে, সদস্যের স্বল্পতা তাদের বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রকৃত বিচারে সদস্যসংখ্যার কম-বেশি হওয়া বিজয়ের নিয়ামক নয়। প্রায়শই স্বল্পতার কাছে আধিক্য পরাজিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম এই সত্যেরই ঘোষণা দিয়েছে-
كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'কত ক্ষুদ্র দল আল্লাহর নির্দেশে কত বৃহৎ দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে।'
হযরত শামাবিল আ. তালুত ও দাউদ আ.-এর উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। তা থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি নির্বাচিত বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে:
১. মহান আল্লাহ সকল জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় এ বৈশিষ্ট্য গেঁথে দিয়েছেন যে, যখন তাদের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হয়, অন্যকোনো জাতি তাদেরকে দাসে পরিণত করার জন্য অত্যাচারের খড়গ হাতে নেমে আসে তখন তারা নিজেদের অধিকার সংরক্ষণ ও অত্যাচারীর প্রতিরোধে বিভেদ ভুলে ও বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ এক কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ সময় তারা তাদের জন্য একজন সৎ ও যোগ্য নেতা খুঁজতে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, তার হাত ধরে তারা অধঃপতনের গহর থেকে উঠে আসবে। এই চিরন্তন স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছিলো বনি ইসরাইলিদের জীবনেও। হযরত শামাবিল আ.-এর শরণাপন্ন হয়ে তাদের জন্য একজন শাসক নির্বাচিত করে দেয়ার দাবিটি ছিলো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ।
২. স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংরক্ষণের এই চেতনা প্রথমে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বিশেষ সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে তা সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিকশিত হতে শুরু করে। যে জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ ও বিশেষ সন্তানদের সংখ্যা যত বেশি সেই জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে এই চেতনা ততটা দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে।
৩. যখন কোনো জাতির বিশেষ সদস্যদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা ও শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের চেতনা খুব দ্রুত উন্নতি করতে থাকে তখন সেটি ওই জাতির সাধারণ জনগণ বা অপেক্ষাকৃত কমবুদ্ধিসম্পন্ন সদস্যদের প্রভাবিত না করে পারে না। তখন তারাও এ কথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে জাতীয়তা সুরক্ষার যে চেতনা ও অনুভূতি রয়েছে, তা ওই বিশেষ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু যখন ওই চেতনা ও অনুভূতি কর্মে বাস্তবায়িত করার সময় হয়, তখন তাদের নিজেদের অক্ষমতা ও দুর্বল কর্মপন্থার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে।
একটি চেতনাকে কর্মে বাস্তবায়িত করার এই ব্যাপারটি বাস্তবতার নিরিখে খুবই কণ্টকাকীর্ণ ও বন্ধুর গিরিপথ। আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ ও লক্ষ্যে অবিচল না হলে এই বন্ধুর গিরিপিথ অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই সত্যকেই কুরআনুল কারিম নিম্নের শব্দে ব্যক্ত করেছে- فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ
'অতঃপর যখন তাদের ওপর জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে। আর আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬]
৪. বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় যেসব জাহেলি প্রথা ও অপবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, তার একটি হলো, নেতৃত্ব ও শাসন করাকে একমাত্র ওই ব্যক্তিরই অধিকার মনে করা হয় যার বিত্ত ও ঐশ্বর্যর আছে। যার হাতে প্রচুর পুঁজি রয়েছে। বংশে-আভিজাত্যে যার অবস্থান উঁচুতে।
বিভিন্ন জাতির মধ্যে এ ধারণা এতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যে, যেসব জাতিগোষ্ঠীকে সভ্যতা ও কৃষ্টিতে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অগ্রসর মনে করা হয়, তারাও অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ চিন্তার অধিকারী জাতিসমূহের মতো এই বিভ্রান্ত প্রথার শিকার। বরং তাদেরকে দেখা যায় যে, তারা এক কাঠি অগ্রসর হয়ে সেই অপবিশ্বাসকে দুষ্ট বুদ্ধি ও বাকচাতুর্যের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালায়। বনি ইসরাইলিদের মানসিকতাও এই ভুল বিশ্বাস থেকে মুক্ত ছিলো না। ফলে তারাও তালুতের নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছিলো- أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ
'কী করে আমাদের ওপর তার রাজত্ব হবে অথচ আমরা তার চাইতে রাজত্বের অধিক যোগ্য এবং তাকে সম্পদের প্রাচুর্য দেয়া হয় নি।'
৫. কিন্তু ইসলাম এই অজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্বাসের বিপরীতে এ সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহর কাছে সম্পদ ও ঐশ্বর্য নেতৃত্ব ও শাসনের মাপকাঠি নয়, বংশ-বুনিয়াদের ওপর নেতৃত্ব নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে একমাত্র জ্ঞান ও শক্তিই মাপকাঠি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কেননা, নেতৃত্ব ও শাসনের সর্বপ্রথম শর্তই হলো, সততা, নিরপেক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সুস্থ রায় দেয়ার ক্ষমতা। আর এগুলো সম্পদের প্রাচুর্য ও বংশের আভিজাত্য থেকে সৃষ্টি হয় না। বরং জ্ঞানই এগুলোর একমাত্র উৎস।
একইসঙ্গে নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য বীরত্ব, সাহসিকতা ও সত্য প্রকাশের দৃঢ় চেতনাও প্রয়োজন। [بسطة في الجسم : দেহে সমৃদ্ধি] বলে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দেহের সেই শক্তি ও সামর্থ্য, যা জিহাদের ময়দানে শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় প্রতাপ ও প্রভাব সৃষ্টি করবে, প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার ঘটাবে।
কুরআনুল কারিম এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নেতৃত্ব ও শাসনের অধিকারের এ মাসআলাটি ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং আবহমানকালের জাহেলি যুগের বিরুদ্ধে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে জাতির সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। যখনই তারা এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, সঙ্গে সঙ্গে কোনো নবী বা রাসুল বা তাদের স্থলাভিষিক্তদের মাধ্যমে তাদের সেই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং হেদায়েতের পথ দেখানো হয়। বনি ইসরাইল যখন হযরত শামাবিল আ.-এর সামনে তালুতের বিরুদ্ধে উল্লিখিত ভুল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদেরকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন এ কথা বলে—
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর তালুতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।'
৬. যখন সত্য ও মিথ্যার সংঘাত হয় আর সত্যের পক্ষ থেকে আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ মুখলিসগণ জান কুরবানের চেতনা নিয়ে সত্যের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রাণ সঞ্চারিত হয়, তখন দেখা যায় যে, সদস্যের স্বল্পতা তাদের বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রকৃত বিচারে সদস্যসংখ্যার কম-বেশি হওয়া বিজয়ের নিয়ামক নয়। প্রায়শই স্বল্পতার কাছে আধিক্য পরাজিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম এই সত্যেরই ঘোষণা দিয়েছে-
كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'কত ক্ষুদ্র দল আল্লাহর নির্দেশে কত বৃহৎ দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে।'