📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 একটি ইসরাইলি রেওয়ায়েতের সমালোচনা

📄 একটি ইসরাইলি রেওয়ায়েতের সমালোচনা


তাওরাতের স্যামুয়েল অধ্যায়ে তালুত ও দাউদ আ. সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ উপাখ্যান পাওয়া যায়। তার সারাংশ হলো, তালুত দাউদের বীরত্বোচিত কৃতিত্বের ফলে অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিলেও দাউদের প্রতি ইসরাইলিদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং তাঁর শক্তিমত্তাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তাঁর প্রতি মনের ভেতর হিংসা ও ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছিলো। কিন্তু তিনি তা গোপনে লালন করতে থাকলেন এবং মনে মনে কৌশল খুঁজতে লাগলেন কীভাবে দাউদের গল্পের সমাপ্তি টানা যায়।

তালুতের কন্যা ও পুত্ররা এ সময় পিতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাউদের সহযোগী ও সহমর্মী ছিলেন। ফলে প্রতিটি কৌশলেই তালুতকে ব্যর্থ হতে হয়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি দাউদের প্রকাশ্য বৈরিতায় নেমে এলেন। এ অবস্থা দেখে দাউদ তার স্ত্রী ও শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের একটি ছোট শহরে তালুতের এক শত্রুর ডেরায় আশ্রয় নিলেন। ইসরাইলিদের এই পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে শত্রুপক্ষ কাজে লাগালো। তারা সেনাভিযান চালিয়ে ইসরাইলিদের পরাজিত করলো।

ঘটনার এ পর্যায়ে সুদ্দির বর্ণনা ও তাওরাতের ভাষ্যে কিছুটা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। তাওরাতের বক্তব্য হলো, তালুত সেই যুদ্ধে নিহত হন। পক্ষান্তরে সুদ্দির বর্ণনা হলো, পরাজয় নিশ্চিত হতেই তালুত তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তখনকার শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গ ও জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ মুহূর্তে যদি আমি তওবা করি, তাহলে কি সেটি কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে? সবাই না বলেন। কিন্তু একজন ইবাদতকারী মহিলা 'হ্যাঁ' বলে তাঁকে আল-ইয়াসাআ নবীর মাজারে নিয়ে গেলেন এবং দোয়া করলেন। হযরত আল-ইয়াসাআ কবর থেকে উঠে তাঁকে বললেন, তোমার তওবার একটাই পথ রয়েছে: তুমি রাজত্ব দাউদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমার বংশকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরিক হয়ে শহীদ হয়ে যাও। তালুত নির্দেশনা পালন করলেন। এভাবেই সম্পূর্ণ রাজত্ব হযরত দাউদ আ.-এর হাতে চলে এলো এবং তালুত তার বংশধরসহ শাহাদাতের সুধা পান করলেন।

উল্লিখিত বিবরণের আদ্যোপান্ত স্যামুয়েলের পুস্তিকা হতে সংগৃহীত। অথচ সুদ্দির উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস লেখকগণ ওই ইসরাইলি বর্ণনাকে ইসলামি রেওয়ায়েতের মতো করে বর্ণনা করে থাকেন। এমনকি হযরত দাউদ আ.-এর যে মর্যাদা ও সম্মান সুরা বাকারায় এসেছে, তার তাফসিরে তারা এই ঘটনা বর্ণনা করে থাকেন। আমার বুঝে আসে না যে, বিগত যুগে ইসরাইলি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বর্ণনার জন্য কেনো এত তোড়-জোড় সৃষ্টি হয়েছিলো যে, ইহুদিরা তাদের গোমরাহি ও বিভ্রান্তির সমর্থনে যে মনগড়া কাহিনি রচনা করেছিলো সেগুলোকে কেনো ইসলামি তথ্য ভাণ্ডারে শামিল করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় নি? ইতিহাস ও সিরাতের কিতাব না হয় অনেক পরের বিষয়, কুরআনের তাফসিরের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও এ ধরনের বানোয়াট রচনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে দেয়া হয় নি। এখানেও সেই একই চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে।

কুরআনুল কারিমের ভাষ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, হযরত শামাবিল আ. বনি ইসরাইলের ক্রমাগত দাবির প্রেক্ষিতে তালুতকে বাদশাহ মনোনীত করলে বনি ইসরাইল আনুগত্য ও অধীনতার অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদশাহ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলো। ফলে তারা বিকৃতির পথ অবলম্বন করেছিলো। কিন্তু খোদায়ি নিদর্শন তাদের নিরুত্তর করে ফেললে তারা বাধ্য হয়ে তালুতকে শাসক মেনে নিয়েছিলো। তখন ইহুদি পণ্ডিতেরা মনে মনে ভাবলো আমাদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ও দুষ্ট বৈশিষ্ট্যের তালিকায় নতুন আরেকটি বিষয়ের সংযোজন ঘটতে যাচ্ছে যে, আমরা আল্লাহর মনোনীত বান্দা তালুতকে অযোগ্য বানিয়ে শুরুতেই তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। কাজেই ইতিহাসে এমন কিছু কথা সংযোজন করতে হবে যার দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, শুরু থেকেই আমরা তালুতের ব্যাপারে যে 'শাসক হওয়ার অযোগ্যতা'-এর দাবি করেছিলাম, তা সত্য ও সঠিক। তখন আমরা দুনিয়ার সামনে এ কথা বলার সুযোগ পাবো যে, এগুলোই ওইসব ব্যাপার, যা আমরা আমাদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা দিয়ে পূর্বেই অনুমান করে ফেলেছিলাম। অবশেষে তালুতের অযোগ্যতাই প্রমাণিত হলো। দোষ হালকা করা এবং নিজেদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ওপর পর্দা ফেলার কূটকৌশল হিসেবে তারা এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। যার প্রকাশ ঘটেছে স্যামুয়েলের পুস্তিকায় তালুত ও হযরত দাউদ আ.-এর বিরোধ সম্পর্কিত উপাখ্যানে।

আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের কতিপয় সিরাত বিশেষজ্ঞ ও তাফসিরবিদও সেই বাস্তবতাকে উদ্‌ঘাটন না করে সরল মনে সিরাত ও তাফসিরের কিতাবে সেগুলোকে স্থান দিয়েছেন। তারা একটু খতিয়েও দেখলেন না যে, যে তালুতকে কুরআনুল কারিম আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত অভিহিত করেছে এবং যাঁর বরকতে 'তাবুতে সাকিনা' বনি ইসরাইল দ্বিতীয়বার অর্জন করতে পেরেছে এবং 'তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন' বলে কুরআন যার জ্ঞান ও বীরত্বের প্রশংসা করেছে, এমন ব্যক্তিকে আমরা কীভাবে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ও শক্ত দলিল ব্যতিরেকে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী অভিহিত করে নিন্দা ও সমালোচনার পাত্র বানাতে পারি?

কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে তো কোনোভাবে এ সন্দেহকে স্থান দেয়া যেতে পারে না যে, যে ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘ সময় অপরাধে কেটেছে, যে ব্যক্তিগতভাবে দোষী, কুরআন তার প্রশংসা ও ফজিলত বর্ণনা করলো আর তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো গোপন করলো? কাজেই যখন কুরআনুল কারিম হযরত তালুতের জন্য প্রশংসাসূচক বাক্যের বাইরে একটিও নিন্দাজ্ঞাপক শব্দ ব্যক্ত করে নি, এমনকি এদিকে ইঙ্গিতও করে নি, তখন একজন মুসলমানের জন্য কী করে জায়েয হয় যে, সে তাওরাতের এই বানোয়াট গল্পকাহিনি মেনে নেবে? এটি কিছুতেই হতে পারে না।

এ কারণেই প্রখ্যাত গবেষক আল্লামা ইবনে কাসির র. তাঁর ইতিহাসে এই বিবরণ পেশ করার পর মন্তব্য করেছেন- وفي بعض هذا نظر ونكارة. এই ঘটনার কিছু অংশ আপত্তিকর ও সংশয়পূর্ণ।

তিনি এ কথাও বলেছেন, এই ঘটনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, জনৈক নারী হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর কবরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে মৃত্যু থেকে জাগ্রত করেন। এ অংশটি এই ঘটনা মিথ্যা হওয়ার শক্ত দলিল। কারণ, একমাত্র নবী-রাসুলদের কাছ থেকেই এ ধরনের মুজেযা ঘটতে পারে, কোনো তাপসী ও আবেদা নারী থেকে নয়।১

এ কারণেই হযরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে এ ঘটনার দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন নি। সত্য হলো, এটি ভ্রূক্ষেপ করার মতোও নয়।

এ সময়ে হযরত শামাবিল আ.-এর ইন্তিকাল হয়।

টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯

তাওরাতের স্যামুয়েল অধ্যায়ে তালুত ও দাউদ আ. সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ উপাখ্যান পাওয়া যায়। তার সারাংশ হলো, তালুত দাউদের বীরত্বোচিত কৃতিত্বের ফলে অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিলেও দাউদের প্রতি ইসরাইলিদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং তাঁর শক্তিমত্তাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তাঁর প্রতি মনের ভেতর হিংসা ও ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছিলো। কিন্তু তিনি তা গোপনে লালন করতে থাকলেন এবং মনে মনে কৌশল খুঁজতে লাগলেন কীভাবে দাউদের গল্পের সমাপ্তি টানা যায়।

তালুতের কন্যা ও পুত্ররা এ সময় পিতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাউদের সহযোগী ও সহমর্মী ছিলেন। ফলে প্রতিটি কৌশলেই তালুতকে ব্যর্থ হতে হয়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি দাউদের প্রকাশ্য বৈরিতায় নেমে এলেন। এ অবস্থা দেখে দাউদ তার স্ত্রী ও শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের একটি ছোট শহরে তালুতের এক শত্রুর ডেরায় আশ্রয় নিলেন। ইসরাইলিদের এই পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে শত্রুপক্ষ কাজে লাগালো। তারা সেনাভিযান চালিয়ে ইসরাইলিদের পরাজিত করলো।

ঘটনার এ পর্যায়ে সুদ্দির বর্ণনা ও তাওরাতের ভাষ্যে কিছুটা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। তাওরাতের বক্তব্য হলো, তালুত সেই যুদ্ধে নিহত হন। পক্ষান্তরে সুদ্দির বর্ণনা হলো, পরাজয় নিশ্চিত হতেই তালুত তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তখনকার শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গ ও জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ মুহূর্তে যদি আমি তওবা করি, তাহলে কি সেটি কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে? সবাই না বলেন। কিন্তু একজন ইবাদতকারী মহিলা 'হ্যাঁ' বলে তাঁকে আল-ইয়াসাআ নবীর মাজারে নিয়ে গেলেন এবং দোয়া করলেন। হযরত আল-ইয়াসাআ কবর থেকে উঠে তাঁকে বললেন, তোমার তওবার একটাই পথ রয়েছে: তুমি রাজত্ব দাউদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমার বংশকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরিক হয়ে শহীদ হয়ে যাও। তালুত নির্দেশনা পালন করলেন। এভাবেই সম্পূর্ণ রাজত্ব হযরত দাউদ আ.-এর হাতে চলে এলো এবং তালুত তার বংশধরসহ শাহাদাতের সুধা পান করলেন।

উল্লিখিত বিবরণের আদ্যোপান্ত স্যামুয়েলের পুস্তিকা হতে সংগৃহীত। অথচ সুদ্দির উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস লেখকগণ ওই ইসরাইলি বর্ণনাকে ইসলামি রেওয়ায়েতের মতো করে বর্ণনা করে থাকেন। এমনকি হযরত দাউদ আ.-এর যে মর্যাদা ও সম্মান সুরা বাকারায় এসেছে, তার তাফসিরে তারা এই ঘটনা বর্ণনা করে থাকেন। আমার বুঝে আসে না যে, বিগত যুগে ইসরাইলি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বর্ণনার জন্য কেনো এত তোড়-জোড় সৃষ্টি হয়েছিলো যে, ইহুদিরা তাদের গোমরাহি ও বিভ্রান্তির সমর্থনে যে মনগড়া কাহিনি রচনা করেছিলো সেগুলোকে কেনো ইসলামি তথ্য ভাণ্ডারে শামিল করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় নি? ইতিহাস ও সিরাতের কিতাব না হয় অনেক পরের বিষয়, কুরআনের তাফসিরের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও এ ধরনের বানোয়াট রচনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে দেয়া হয় নি। এখানেও সেই একই চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে।

কুরআনুল কারিমের ভাষ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, হযরত শামাবিল আ. বনি ইসরাইলের ক্রমাগত দাবির প্রেক্ষিতে তালুতকে বাদশাহ মনোনীত করলে বনি ইসরাইল আনুগত্য ও অধীনতার অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদশাহ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলো। ফলে তারা বিকৃতির পথ অবলম্বন করেছিলো। কিন্তু খোদায়ি নিদর্শন তাদের নিরুত্তর করে ফেললে তারা বাধ্য হয়ে তালুতকে শাসক মেনে নিয়েছিলো। তখন ইহুদি পণ্ডিতেরা মনে মনে ভাবলো আমাদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ও দুষ্ট বৈশিষ্ট্যের তালিকায় নতুন আরেকটি বিষয়ের সংযোজন ঘটতে যাচ্ছে যে, আমরা আল্লাহর মনোনীত বান্দা তালুতকে অযোগ্য বানিয়ে শুরুতেই তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। কাজেই ইতিহাসে এমন কিছু কথা সংযোজন করতে হবে যার দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, শুরু থেকেই আমরা তালুতের ব্যাপারে যে 'শাসক হওয়ার অযোগ্যতা'-এর দাবি করেছিলাম, তা সত্য ও সঠিক। তখন আমরা দুনিয়ার সামনে এ কথা বলার সুযোগ পাবো যে, এগুলোই ওইসব ব্যাপার, যা আমরা আমাদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা দিয়ে পূর্বেই অনুমান করে ফেলেছিলাম। অবশেষে তালুতের অযোগ্যতাই প্রমাণিত হলো। দোষ হালকা করা এবং নিজেদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ওপর পর্দা ফেলার কূটকৌশল হিসেবে তারা এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। যার প্রকাশ ঘটেছে স্যামুয়েলের পুস্তিকায় তালুত ও হযরত দাউদ আ.-এর বিরোধ সম্পর্কিত উপাখ্যানে।

আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের কতিপয় সিরাত বিশেষজ্ঞ ও তাফসিরবিদও সেই বাস্তবতাকে উদ্‌ঘাটন না করে সরল মনে সিরাত ও তাফসিরের কিতাবে সেগুলোকে স্থান দিয়েছেন। তারা একটু খতিয়েও দেখলেন না যে, যে তালুতকে কুরআনুল কারিম আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত অভিহিত করেছে এবং যাঁর বরকতে 'তাবুতে সাকিনা' বনি ইসরাইল দ্বিতীয়বার অর্জন করতে পেরেছে এবং 'তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন' বলে কুরআন যার জ্ঞান ও বীরত্বের প্রশংসা করেছে, এমন ব্যক্তিকে আমরা কীভাবে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ও শক্ত দলিল ব্যতিরেকে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী অভিহিত করে নিন্দা ও সমালোচনার পাত্র বানাতে পারি?

কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে তো কোনোভাবে এ সন্দেহকে স্থান দেয়া যেতে পারে না যে, যে ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘ সময় অপরাধে কেটেছে, যে ব্যক্তিগতভাবে দোষী, কুরআন তার প্রশংসা ও ফজিলত বর্ণনা করলো আর তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো গোপন করলো? কাজেই যখন কুরআনুল কারিম হযরত তালুতের জন্য প্রশংসাসূচক বাক্যের বাইরে একটিও নিন্দাজ্ঞাপক শব্দ ব্যক্ত করে নি, এমনকি এদিকে ইঙ্গিতও করে নি, তখন একজন মুসলমানের জন্য কী করে জায়েয হয় যে, সে তাওরাতের এই বানোয়াট গল্পকাহিনি মেনে নেবে? এটি কিছুতেই হতে পারে না।

এ কারণেই প্রখ্যাত গবেষক আল্লামা ইবনে কাসির র. তাঁর ইতিহাসে এই বিবরণ পেশ করার পর মন্তব্য করেছেন- وفي بعض هذا نظر ونكارة. এই ঘটনার কিছু অংশ আপত্তিকর ও সংশয়পূর্ণ।

তিনি এ কথাও বলেছেন, এই ঘটনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, জনৈক নারী হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর কবরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে মৃত্যু থেকে জাগ্রত করেন। এ অংশটি এই ঘটনা মিথ্যা হওয়ার শক্ত দলিল। কারণ, একমাত্র নবী-রাসুলদের কাছ থেকেই এ ধরনের মুজেযা ঘটতে পারে, কোনো তাপসী ও আবেদা নারী থেকে নয়।১

এ কারণেই হযরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে এ ঘটনার দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন নি। সত্য হলো, এটি ভ্রূক্ষেপ করার মতোও নয়।

এ সময়ে হযরত শামাবিল আ.-এর ইন্তিকাল হয়।

টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯

তাওরাতের স্যামুয়েল অধ্যায়ে তালুত ও দাউদ আ. সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ উপাখ্যান পাওয়া যায়। তার সারাংশ হলো, তালুত দাউদের বীরত্বোচিত কৃতিত্বের ফলে অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিলেও দাউদের প্রতি ইসরাইলিদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং তাঁর শক্তিমত্তাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তাঁর প্রতি মনের ভেতর হিংসা ও ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছিলো। কিন্তু তিনি তা গোপনে লালন করতে থাকলেন এবং মনে মনে কৌশল খুঁজতে লাগলেন কীভাবে দাউদের গল্পের সমাপ্তি টানা যায়।

তালুতের কন্যা ও পুত্ররা এ সময় পিতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাউদের সহযোগী ও সহমর্মী ছিলেন। ফলে প্রতিটি কৌশলেই তালুতকে ব্যর্থ হতে হয়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি দাউদের প্রকাশ্য বৈরিতায় নেমে এলেন। এ অবস্থা দেখে দাউদ তার স্ত্রী ও শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের একটি ছোট শহরে তালুতের এক শত্রুর ডেরায় আশ্রয় নিলেন। ইসরাইলিদের এই পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে শত্রুপক্ষ কাজে লাগালো। তারা সেনাভিযান চালিয়ে ইসরাইলিদের পরাজিত করলো।

ঘটনার এ পর্যায়ে সুদ্দির বর্ণনা ও তাওরাতের ভাষ্যে কিছুটা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। তাওরাতের বক্তব্য হলো, তালুত সেই যুদ্ধে নিহত হন। পক্ষান্তরে সুদ্দির বর্ণনা হলো, পরাজয় নিশ্চিত হতেই তালুত তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তখনকার শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গ ও জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ মুহূর্তে যদি আমি তওবা করি, তাহলে কি সেটি কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে? সবাই না বলেন। কিন্তু একজন ইবাদতকারী মহিলা 'হ্যাঁ' বলে তাঁকে আল-ইয়াসাআ নবীর মাজারে নিয়ে গেলেন এবং দোয়া করলেন। হযরত আল-ইয়াসাআ কবর থেকে উঠে তাঁকে বললেন, তোমার তওবার একটাই পথ রয়েছে: তুমি রাজত্ব দাউদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমার বংশকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরিক হয়ে শহীদ হয়ে যাও। তালুত নির্দেশনা পালন করলেন। এভাবেই সম্পূর্ণ রাজত্ব হযরত দাউদ আ.-এর হাতে চলে এলো এবং তালুত তার বংশধরসহ শাহাদাতের সুধা পান করলেন।

উল্লিখিত বিবরণের আদ্যোপান্ত স্যামুয়েলের পুস্তিকা হতে সংগৃহীত। অথচ সুদ্দির উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস লেখকগণ ওই ইসরাইলি বর্ণনাকে ইসলামি রেওয়ায়েতের মতো করে বর্ণনা করে থাকেন। এমনকি হযরত দাউদ আ.-এর যে মর্যাদা ও সম্মান সুরা বাকারায় এসেছে, তার তাফসিরে তারা এই ঘটনা বর্ণনা করে থাকেন। আমার বুঝে আসে না যে, বিগত যুগে ইসরাইলি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বর্ণনার জন্য কেনো এত তোড়-জোড় সৃষ্টি হয়েছিলো যে, ইহুদিরা তাদের গোমরাহি ও বিভ্রান্তির সমর্থনে যে মনগড়া কাহিনি রচনা করেছিলো সেগুলোকে কেনো ইসলামি তথ্য ভাণ্ডারে শামিল করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় নি? ইতিহাস ও সিরাতের কিতাব না হয় অনেক পরের বিষয়, কুরআনের তাফসিরের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও এ ধরনের বানোয়াট রচনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে দেয়া হয় নি। এখানেও সেই একই চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে।

কুরআনুল কারিমের ভাষ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, হযরত শামাবিল আ. বনি ইসরাইলের ক্রমাগত দাবির প্রেক্ষিতে তালুতকে বাদশাহ মনোনীত করলে বনি ইসরাইল আনুগত্য ও অধীনতার অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদশাহ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলো। ফলে তারা বিকৃতির পথ অবলম্বন করেছিলো। কিন্তু খোদায়ি নিদর্শন তাদের নিরুত্তর করে ফেললে তারা বাধ্য হয়ে তালুতকে শাসক মেনে নিয়েছিলো। তখন ইহুদি পণ্ডিতেরা মনে মনে ভাবলো আমাদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ও দুষ্ট বৈশিষ্ট্যের তালিকায় নতুন আরেকটি বিষয়ের সংযোজন ঘটতে যাচ্ছে যে, আমরা আল্লাহর মনোনীত বান্দা তালুতকে অযোগ্য বানিয়ে শুরুতেই তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। কাজেই ইতিহাসে এমন কিছু কথা সংযোজন করতে হবে যার দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, শুরু থেকেই আমরা তালুতের ব্যাপারে যে 'শাসক হওয়ার অযোগ্যতা'-এর দাবি করেছিলাম, তা সত্য ও সঠিক। তখন আমরা দুনিয়ার সামনে এ কথা বলার সুযোগ পাবো যে, এগুলোই ওইসব ব্যাপার, যা আমরা আমাদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা দিয়ে পূর্বেই অনুমান করে ফেলেছিলাম। অবশেষে তালুতের অযোগ্যতাই প্রমাণিত হলো। দোষ হালকা করা এবং নিজেদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ওপর পর্দা ফেলার কূটকৌশল হিসেবে তারা এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। যার প্রকাশ ঘটেছে স্যামুয়েলের পুস্তিকায় তালুত ও হযরত দাউদ আ.-এর বিরোধ সম্পর্কিত উপাখ্যানে।

আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের কতিপয় সিরাত বিশেষজ্ঞ ও তাফসিরবিদও সেই বাস্তবতাকে উদ্‌ঘাটন না করে সরল মনে সিরাত ও তাফসিরের কিতাবে সেগুলোকে স্থান দিয়েছেন। তারা একটু খতিয়েও দেখলেন না যে, যে তালুতকে কুরআনুল কারিম আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত অভিহিত করেছে এবং যাঁর বরকতে 'তাবুতে সাকিনা' বনি ইসরাইল দ্বিতীয়বার অর্জন করতে পেরেছে এবং 'তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন' বলে কুরআন যার জ্ঞান ও বীরত্বের প্রশংসা করেছে, এমন ব্যক্তিকে আমরা কীভাবে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ও শক্ত দলিল ব্যতিরেকে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী অভিহিত করে নিন্দা ও সমালোচনার পাত্র বানাতে পারি?

কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে তো কোনোভাবে এ সন্দেহকে স্থান দেয়া যেতে পারে না যে, যে ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘ সময় অপরাধে কেটেছে, যে ব্যক্তিগতভাবে দোষী, কুরআন তার প্রশংসা ও ফজিলত বর্ণনা করলো আর তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো গোপন করলো? কাজেই যখন কুরআনুল কারিম হযরত তালুতের জন্য প্রশংসাসূচক বাক্যের বাইরে একটিও নিন্দাজ্ঞাপক শব্দ ব্যক্ত করে নি, এমনকি এদিকে ইঙ্গিতও করে নি, তখন একজন মুসলমানের জন্য কী করে জায়েয হয় যে, সে তাওরাতের এই বানোয়াট গল্পকাহিনি মেনে নেবে? এটি কিছুতেই হতে পারে না।

এ কারণেই প্রখ্যাত গবেষক আল্লামা ইবনে কাসির র. তাঁর ইতিহাসে এই বিবরণ পেশ করার পর মন্তব্য করেছেন- وفي بعض هذا نظر ونكارة. এই ঘটনার কিছু অংশ আপত্তিকর ও সংশয়পূর্ণ।

তিনি এ কথাও বলেছেন, এই ঘটনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, জনৈক নারী হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর কবরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে মৃত্যু থেকে জাগ্রত করেন। এ অংশটি এই ঘটনা মিথ্যা হওয়ার শক্ত দলিল। কারণ, একমাত্র নবী-রাসুলদের কাছ থেকেই এ ধরনের মুজেযা ঘটতে পারে, কোনো তাপসী ও আবেদা নারী থেকে নয়।১

এ কারণেই হযরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে এ ঘটনার দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন নি। সত্য হলো, এটি ভ্রূক্ষেপ করার মতোও নয়।

এ সময়ে হযরত শামাবিল আ.-এর ইন্তিকাল হয়।

টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও উপদেশ

📄 শিক্ষা ও উপদেশ


হযরত শামাবিল আ. তালুত ও দাউদ আ.-এর উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। তা থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি নির্বাচিত বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে:

১. মহান আল্লাহ সকল জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় এ বৈশিষ্ট্য গেঁথে দিয়েছেন যে, যখন তাদের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হয়, অন্যকোনো জাতি তাদেরকে দাসে পরিণত করার জন্য অত্যাচারের খড়গ হাতে নেমে আসে তখন তারা নিজেদের অধিকার সংরক্ষণ ও অত্যাচারীর প্রতিরোধে বিভেদ ভুলে ও বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ এক কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ সময় তারা তাদের জন্য একজন সৎ ও যোগ্য নেতা খুঁজতে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, তার হাত ধরে তারা অধঃপতনের গহর থেকে উঠে আসবে। এই চিরন্তন স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছিলো বনি ইসরাইলিদের জীবনেও। হযরত শামাবিল আ.-এর শরণাপন্ন হয়ে তাদের জন্য একজন শাসক নির্বাচিত করে দেয়ার দাবিটি ছিলো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ।

২. স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংরক্ষণের এই চেতনা প্রথমে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বিশেষ সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে তা সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিকশিত হতে শুরু করে। যে জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ ও বিশেষ সন্তানদের সংখ্যা যত বেশি সেই জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে এই চেতনা ততটা দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে।

৩. যখন কোনো জাতির বিশেষ সদস্যদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা ও শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের চেতনা খুব দ্রুত উন্নতি করতে থাকে তখন সেটি ওই জাতির সাধারণ জনগণ বা অপেক্ষাকৃত কমবুদ্ধিসম্পন্ন সদস্যদের প্রভাবিত না করে পারে না। তখন তারাও এ কথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে জাতীয়তা সুরক্ষার যে চেতনা ও অনুভূতি রয়েছে, তা ওই বিশেষ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু যখন ওই চেতনা ও অনুভূতি কর্মে বাস্তবায়িত করার সময় হয়, তখন তাদের নিজেদের অক্ষমতা ও দুর্বল কর্মপন্থার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

একটি চেতনাকে কর্মে বাস্তবায়িত করার এই ব্যাপারটি বাস্তবতার নিরিখে খুবই কণ্টকাকীর্ণ ও বন্ধুর গিরিপথ। আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ ও লক্ষ্যে অবিচল না হলে এই বন্ধুর গিরিপিথ অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই সত্যকেই কুরআনুল কারিম নিম্নের শব্দে ব্যক্ত করেছে- فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ

'অতঃপর যখন তাদের ওপর জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে। আর আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬]

৪. বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় যেসব জাহেলি প্রথা ও অপবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, তার একটি হলো, নেতৃত্ব ও শাসন করাকে একমাত্র ওই ব্যক্তিরই অধিকার মনে করা হয় যার বিত্ত ও ঐশ্বর্যর আছে। যার হাতে প্রচুর পুঁজি রয়েছে। বংশে-আভিজাত্যে যার অবস্থান উঁচুতে।

বিভিন্ন জাতির মধ্যে এ ধারণা এতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যে, যেসব জাতিগোষ্ঠীকে সভ্যতা ও কৃষ্টিতে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অগ্রসর মনে করা হয়, তারাও অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ চিন্তার অধিকারী জাতিসমূহের মতো এই বিভ্রান্ত প্রথার শিকার। বরং তাদেরকে দেখা যায় যে, তারা এক কাঠি অগ্রসর হয়ে সেই অপবিশ্বাসকে দুষ্ট বুদ্ধি ও বাকচাতুর্যের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালায়। বনি ইসরাইলিদের মানসিকতাও এই ভুল বিশ্বাস থেকে মুক্ত ছিলো না। ফলে তারাও তালুতের নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছিলো- أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ

'কী করে আমাদের ওপর তার রাজত্ব হবে অথচ আমরা তার চাইতে রাজত্বের অধিক যোগ্য এবং তাকে সম্পদের প্রাচুর্য দেয়া হয় নি।'

৫. কিন্তু ইসলাম এই অজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্বাসের বিপরীতে এ সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহর কাছে সম্পদ ও ঐশ্বর্য নেতৃত্ব ও শাসনের মাপকাঠি নয়, বংশ-বুনিয়াদের ওপর নেতৃত্ব নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে একমাত্র জ্ঞান ও শক্তিই মাপকাঠি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কেননা, নেতৃত্ব ও শাসনের সর্বপ্রথম শর্তই হলো, সততা, নিরপেক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সুস্থ রায় দেয়ার ক্ষমতা। আর এগুলো সম্পদের প্রাচুর্য ও বংশের আভিজাত্য থেকে সৃষ্টি হয় না। বরং জ্ঞানই এগুলোর একমাত্র উৎস।

একইসঙ্গে নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য বীরত্ব, সাহসিকতা ও সত্য প্রকাশের দৃঢ় চেতনাও প্রয়োজন। [بسطة في الجسم : দেহে সমৃদ্ধি] বলে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দেহের সেই শক্তি ও সামর্থ্য, যা জিহাদের ময়দানে শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় প্রতাপ ও প্রভাব সৃষ্টি করবে, প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার ঘটাবে।

কুরআনুল কারিম এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নেতৃত্ব ও শাসনের অধিকারের এ মাসআলাটি ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং আবহমানকালের জাহেলি যুগের বিরুদ্ধে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে জাতির সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। যখনই তারা এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, সঙ্গে সঙ্গে কোনো নবী বা রাসুল বা তাদের স্থলাভিষিক্তদের মাধ্যমে তাদের সেই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং হেদায়েতের পথ দেখানো হয়। বনি ইসরাইল যখন হযরত শামাবিল আ.-এর সামনে তালুতের বিরুদ্ধে উল্লিখিত ভুল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদেরকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন এ কথা বলে—

إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর তালুতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।'

৬. যখন সত্য ও মিথ্যার সংঘাত হয় আর সত্যের পক্ষ থেকে আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ মুখলিসগণ জান কুরবানের চেতনা নিয়ে সত্যের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রাণ সঞ্চারিত হয়, তখন দেখা যায় যে, সদস্যের স্বল্পতা তাদের বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রকৃত বিচারে সদস্যসংখ্যার কম-বেশি হওয়া বিজয়ের নিয়ামক নয়। প্রায়শই স্বল্পতার কাছে আধিক্য পরাজিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম এই সত্যেরই ঘোষণা দিয়েছে-

كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ

'কত ক্ষুদ্র দল আল্লাহর নির্দেশে কত বৃহৎ দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে।'

হযরত শামাবিল আ. তালুত ও দাউদ আ.-এর উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। তা থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি নির্বাচিত বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে:

১. মহান আল্লাহ সকল জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় এ বৈশিষ্ট্য গেঁথে দিয়েছেন যে, যখন তাদের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হয়, অন্যকোনো জাতি তাদেরকে দাসে পরিণত করার জন্য অত্যাচারের খড়গ হাতে নেমে আসে তখন তারা নিজেদের অধিকার সংরক্ষণ ও অত্যাচারীর প্রতিরোধে বিভেদ ভুলে ও বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ এক কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ সময় তারা তাদের জন্য একজন সৎ ও যোগ্য নেতা খুঁজতে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, তার হাত ধরে তারা অধঃপতনের গহর থেকে উঠে আসবে। এই চিরন্তন স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছিলো বনি ইসরাইলিদের জীবনেও। হযরত শামাবিল আ.-এর শরণাপন্ন হয়ে তাদের জন্য একজন শাসক নির্বাচিত করে দেয়ার দাবিটি ছিলো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ।

২. স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংরক্ষণের এই চেতনা প্রথমে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বিশেষ সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে তা সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিকশিত হতে শুরু করে। যে জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ ও বিশেষ সন্তানদের সংখ্যা যত বেশি সেই জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে এই চেতনা ততটা দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে।

৩. যখন কোনো জাতির বিশেষ সদস্যদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা ও শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের চেতনা খুব দ্রুত উন্নতি করতে থাকে তখন সেটি ওই জাতির সাধারণ জনগণ বা অপেক্ষাকৃত কমবুদ্ধিসম্পন্ন সদস্যদের প্রভাবিত না করে পারে না। তখন তারাও এ কথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে জাতীয়তা সুরক্ষার যে চেতনা ও অনুভূতি রয়েছে, তা ওই বিশেষ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু যখন ওই চেতনা ও অনুভূতি কর্মে বাস্তবায়িত করার সময় হয়, তখন তাদের নিজেদের অক্ষমতা ও দুর্বল কর্মপন্থার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

একটি চেতনাকে কর্মে বাস্তবায়িত করার এই ব্যাপারটি বাস্তবতার নিরিখে খুবই কণ্টকাকীর্ণ ও বন্ধুর গিরিপথ। আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ ও লক্ষ্যে অবিচল না হলে এই বন্ধুর গিরিপিথ অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই সত্যকেই কুরআনুল কারিম নিম্নের শব্দে ব্যক্ত করেছে- فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ

'অতঃপর যখন তাদের ওপর জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে। আর আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬]

৪. বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় যেসব জাহেলি প্রথা ও অপবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, তার একটি হলো, নেতৃত্ব ও শাসন করাকে একমাত্র ওই ব্যক্তিরই অধিকার মনে করা হয় যার বিত্ত ও ঐশ্বর্যর আছে। যার হাতে প্রচুর পুঁজি রয়েছে। বংশে-আভিজাত্যে যার অবস্থান উঁচুতে।

বিভিন্ন জাতির মধ্যে এ ধারণা এতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যে, যেসব জাতিগোষ্ঠীকে সভ্যতা ও কৃষ্টিতে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অগ্রসর মনে করা হয়, তারাও অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ চিন্তার অধিকারী জাতিসমূহের মতো এই বিভ্রান্ত প্রথার শিকার। বরং তাদেরকে দেখা যায় যে, তারা এক কাঠি অগ্রসর হয়ে সেই অপবিশ্বাসকে দুষ্ট বুদ্ধি ও বাকচাতুর্যের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালায়। বনি ইসরাইলিদের মানসিকতাও এই ভুল বিশ্বাস থেকে মুক্ত ছিলো না। ফলে তারাও তালুতের নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছিলো- أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ

'কী করে আমাদের ওপর তার রাজত্ব হবে অথচ আমরা তার চাইতে রাজত্বের অধিক যোগ্য এবং তাকে সম্পদের প্রাচুর্য দেয়া হয় নি।'

৫. কিন্তু ইসলাম এই অজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্বাসের বিপরীতে এ সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহর কাছে সম্পদ ও ঐশ্বর্য নেতৃত্ব ও শাসনের মাপকাঠি নয়, বংশ-বুনিয়াদের ওপর নেতৃত্ব নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে একমাত্র জ্ঞান ও শক্তিই মাপকাঠি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কেননা, নেতৃত্ব ও শাসনের সর্বপ্রথম শর্তই হলো, সততা, নিরপেক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সুস্থ রায় দেয়ার ক্ষমতা। আর এগুলো সম্পদের প্রাচুর্য ও বংশের আভিজাত্য থেকে সৃষ্টি হয় না। বরং জ্ঞানই এগুলোর একমাত্র উৎস।

একইসঙ্গে নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য বীরত্ব, সাহসিকতা ও সত্য প্রকাশের দৃঢ় চেতনাও প্রয়োজন। [بسطة في الجسم : দেহে সমৃদ্ধি] বলে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দেহের সেই শক্তি ও সামর্থ্য, যা জিহাদের ময়দানে শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় প্রতাপ ও প্রভাব সৃষ্টি করবে, প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার ঘটাবে।

কুরআনুল কারিম এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নেতৃত্ব ও শাসনের অধিকারের এ মাসআলাটি ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং আবহমানকালের জাহেলি যুগের বিরুদ্ধে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে জাতির সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। যখনই তারা এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, সঙ্গে সঙ্গে কোনো নবী বা রাসুল বা তাদের স্থলাভিষিক্তদের মাধ্যমে তাদের সেই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং হেদায়েতের পথ দেখানো হয়। বনি ইসরাইল যখন হযরত শামাবিল আ.-এর সামনে তালুতের বিরুদ্ধে উল্লিখিত ভুল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদেরকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন এ কথা বলে—

إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর তালুতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।'

৬. যখন সত্য ও মিথ্যার সংঘাত হয় আর সত্যের পক্ষ থেকে আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ মুখলিসগণ জান কুরবানের চেতনা নিয়ে সত্যের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রাণ সঞ্চারিত হয়, তখন দেখা যায় যে, সদস্যের স্বল্পতা তাদের বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রকৃত বিচারে সদস্যসংখ্যার কম-বেশি হওয়া বিজয়ের নিয়ামক নয়। প্রায়শই স্বল্পতার কাছে আধিক্য পরাজিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম এই সত্যেরই ঘোষণা দিয়েছে-

كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ

'কত ক্ষুদ্র দল আল্লাহর নির্দেশে কত বৃহৎ দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে।'

হযরত শামাবিল আ. তালুত ও দাউদ আ.-এর উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহে অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ রয়েছে। তা থেকে সংক্ষেপে কয়েকটি নির্বাচিত বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে:

১. মহান আল্লাহ সকল জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় এ বৈশিষ্ট্য গেঁথে দিয়েছেন যে, যখন তাদের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হয়, অন্যকোনো জাতি তাদেরকে দাসে পরিণত করার জন্য অত্যাচারের খড়গ হাতে নেমে আসে তখন তারা নিজেদের অধিকার সংরক্ষণ ও অত্যাচারীর প্রতিরোধে বিভেদ ভুলে ও বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ এক কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ সময় তারা তাদের জন্য একজন সৎ ও যোগ্য নেতা খুঁজতে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, তার হাত ধরে তারা অধঃপতনের গহর থেকে উঠে আসবে। এই চিরন্তন স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছিলো বনি ইসরাইলিদের জীবনেও। হযরত শামাবিল আ.-এর শরণাপন্ন হয়ে তাদের জন্য একজন শাসক নির্বাচিত করে দেয়ার দাবিটি ছিলো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ।

২. স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংরক্ষণের এই চেতনা প্রথমে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বিশেষ সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে তা সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিকশিত হতে শুরু করে। যে জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ ও বিশেষ সন্তানদের সংখ্যা যত বেশি সেই জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে এই চেতনা ততটা দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে।

৩. যখন কোনো জাতির বিশেষ সদস্যদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা ও শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের চেতনা খুব দ্রুত উন্নতি করতে থাকে তখন সেটি ওই জাতির সাধারণ জনগণ বা অপেক্ষাকৃত কমবুদ্ধিসম্পন্ন সদস্যদের প্রভাবিত না করে পারে না। তখন তারাও এ কথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে জাতীয়তা সুরক্ষার যে চেতনা ও অনুভূতি রয়েছে, তা ওই বিশেষ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু যখন ওই চেতনা ও অনুভূতি কর্মে বাস্তবায়িত করার সময় হয়, তখন তাদের নিজেদের অক্ষমতা ও দুর্বল কর্মপন্থার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

একটি চেতনাকে কর্মে বাস্তবায়িত করার এই ব্যাপারটি বাস্তবতার নিরিখে খুবই কণ্টকাকীর্ণ ও বন্ধুর গিরিপথ। আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ ও লক্ষ্যে অবিচল না হলে এই বন্ধুর গিরিপিথ অতিক্রম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই সত্যকেই কুরআনুল কারিম নিম্নের শব্দে ব্যক্ত করেছে- فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ

'অতঃপর যখন তাদের ওপর জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে। আর আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬]

৪. বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মন-মানসিকতায় যেসব জাহেলি প্রথা ও অপবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, তার একটি হলো, নেতৃত্ব ও শাসন করাকে একমাত্র ওই ব্যক্তিরই অধিকার মনে করা হয় যার বিত্ত ও ঐশ্বর্যর আছে। যার হাতে প্রচুর পুঁজি রয়েছে। বংশে-আভিজাত্যে যার অবস্থান উঁচুতে।

বিভিন্ন জাতির মধ্যে এ ধারণা এতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যে, যেসব জাতিগোষ্ঠীকে সভ্যতা ও কৃষ্টিতে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অগ্রসর মনে করা হয়, তারাও অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ চিন্তার অধিকারী জাতিসমূহের মতো এই বিভ্রান্ত প্রথার শিকার। বরং তাদেরকে দেখা যায় যে, তারা এক কাঠি অগ্রসর হয়ে সেই অপবিশ্বাসকে দুষ্ট বুদ্ধি ও বাকচাতুর্যের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালায়। বনি ইসরাইলিদের মানসিকতাও এই ভুল বিশ্বাস থেকে মুক্ত ছিলো না। ফলে তারাও তালুতের নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছিলো- أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ

'কী করে আমাদের ওপর তার রাজত্ব হবে অথচ আমরা তার চাইতে রাজত্বের অধিক যোগ্য এবং তাকে সম্পদের প্রাচুর্য দেয়া হয় নি।'

৫. কিন্তু ইসলাম এই অজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্বাসের বিপরীতে এ সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আল্লাহর কাছে সম্পদ ও ঐশ্বর্য নেতৃত্ব ও শাসনের মাপকাঠি নয়, বংশ-বুনিয়াদের ওপর নেতৃত্ব নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে একমাত্র জ্ঞান ও শক্তিই মাপকাঠি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কেননা, নেতৃত্ব ও শাসনের সর্বপ্রথম শর্তই হলো, সততা, নিরপেক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সুস্থ রায় দেয়ার ক্ষমতা। আর এগুলো সম্পদের প্রাচুর্য ও বংশের আভিজাত্য থেকে সৃষ্টি হয় না। বরং জ্ঞানই এগুলোর একমাত্র উৎস।

একইসঙ্গে নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য বীরত্ব, সাহসিকতা ও সত্য প্রকাশের দৃঢ় চেতনাও প্রয়োজন। [بسطة في الجسم : দেহে সমৃদ্ধি] বলে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দেহের সেই শক্তি ও সামর্থ্য, যা জিহাদের ময়দানে শত্রুপক্ষের মোকাবিলায় প্রতাপ ও প্রভাব সৃষ্টি করবে, প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার ঘটাবে।

কুরআনুল কারিম এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নেতৃত্ব ও শাসনের অধিকারের এ মাসআলাটি ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং আবহমানকালের জাহেলি যুগের বিরুদ্ধে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে জাতির সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। যখনই তারা এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়, সঙ্গে সঙ্গে কোনো নবী বা রাসুল বা তাদের স্থলাভিষিক্তদের মাধ্যমে তাদের সেই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং হেদায়েতের পথ দেখানো হয়। বনি ইসরাইল যখন হযরত শামাবিল আ.-এর সামনে তালুতের বিরুদ্ধে উল্লিখিত ভুল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদেরকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন এ কথা বলে—

إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةٌ فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর তালুতকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।'

৬. যখন সত্য ও মিথ্যার সংঘাত হয় আর সত্যের পক্ষ থেকে আদ্যোপান্ত একনিষ্ঠ মুখলিসগণ জান কুরবানের চেতনা নিয়ে সত্যের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রাণ সঞ্চারিত হয়, তখন দেখা যায় যে, সদস্যের স্বল্পতা তাদের বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রকৃত বিচারে সদস্যসংখ্যার কম-বেশি হওয়া বিজয়ের নিয়ামক নয়। প্রায়শই স্বল্পতার কাছে আধিক্য পরাজিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম এই সত্যেরই ঘোষণা দিয়েছে-

كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ

'কত ক্ষুদ্র দল আল্লাহর নির্দেশে কত বৃহৎ দলের ওপর বিজয় লাভ করেছে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00