📄 তাবুতে সাকিনা
বনি ইসরাইলের সেই টালবাহানা এতটাই দীর্ঘ হলো যে, তারা হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে দাবি করলো, যদি তালুতের নিযুক্তি মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে তাহলে এর সত্যায়নে আল্লাহর নিদর্শন দেখাতে হবে। হযরত শামাবিল আ. বললেন, যদি তোমরা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের সত্যায়নে কোনো প্রমাণ চাও তাহলে তোমাদের যাবতীয় সংশয় দূর করার জন্য তাও দেখানো হবে। আর তা হলো, যে বরকতময় সিন্দুক [তাবুতে সাকিনা] তোমাদের হাতছাড়া হয়ে লুণ্ঠিত হয়ে গেছে, যার মধ্যে তাওরাত এবং হযরত মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষিত ছিলো, সেটি তালুতের বদৌলতে তোমাদের হাতে ফিরে আসবে। আল্লাহর প্রজ্ঞাদীপ্ত কর্মকৌশলের কল্যাণে এমন ঘটবে যে, তোমাদের চোখের সামনে ফেরেশতারা সেটিকে উঠিয়ে আনবে এবং সেটি দ্বিতীয়বার তোমাদের নাগালে আসবে।
وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
'আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, 'তার রাজত্বের নিদর্শন হলো, তোমাদের নিকট তাবুত আসবে যাতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে চিত্তপ্রশান্তি এবং মুসা ও হারুনের বংশধররা যা রেখে গেছে, তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।' [সুরা বাকারা : ২৪৮]
হযরত শামাবিল আ.-এর এ সুসংবাদ অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। বনি ইসরাইলের সামনে আল্লাহর ফেরেশতাগণ তালুতের কাছে 'তাবুতে সাকিনা' অর্পণ করে। ফলে তাদের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা যদি হযরত শামাবিল আ.-এর এই ইলহামি সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেয় তাহলে অনাগত দিনে নিশ্চিত বিজয় ও সাফল্য তাদের পদচুম্বন করবে।
তাওরাতে 'তাবুতে সাকিনা'-এর প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই চটকদার। নিম্নে তার সারাংশ তুলে ধরা হলো-
'স্যামুয়েলের পুস্তিকায় রয়েছে, যেদিন থেকে তাবুতে সাকিনা লুণ্ঠন করে বাইতে দাজুনে রাখা হয় তারপর থেকে ফিলিস্তিনিরা প্রত্যহ এ দৃশ্য দেখতে পেতো যে, যখনই তারা ভোরবেলা তাদের উপাস্য 'দাজুন'-এর পূজা করতে যেতো, তাদের উপাস্য মূর্তিটিকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখতো। তারা সকালবেলা সেটিকে উঠিয়ে জায়গামতো রেখে দিতো।
কিন্তু রাত পেরোতেই ভোরবেলা দেখতে পেতো যে, সেটি আগের মতো মাটিতে উল্টে পড়ে আছে। আরেকটি কাণ্ড ঘটেছিলো যে, তাদের নগরীতে ইঁদুরের উপদ্রব এত বেশি বেড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের সমস্ত শস্য-ফসলাদি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। তার সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের গলগণ্ড রোগের উপদ্রব দেখা দিলো। ফলে তাদের অনেকের প্রাণহানি ঘটতে লাগলো। ফিলিস্তিনিরা যখন দেখলো যে, কিছুতেই এই বিপদসমূহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তারা অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আমাদের ওপর এত সব বিপদাপদের একমাত্র কারণ হলো সেই সিন্দুক। কাজেই সেটিকে এখনই বের করো।
ভাবনামাফিক তারা অনেক জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদদের একত্র করলো। তাদের কাছে গোটা বৃত্তান্ত উপস্থাপন করে নিষ্কৃতির উপায় প্রার্থনা করলো। জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদেরা তাদের বললেন, এর থেকে নিষ্কৃতির উপায় একটি। তা হলো, যত দ্রুত সম্ভব এ সিন্দুকটিকে বের করো। তার পন্থা হবে এমন যে, প্রথমে স্বর্ণের সাতটি ইঁদুর ও সাতটি গলগণ্ড বানানো হবে। সেগুলোকে একটি গাড়ির ওপর সিন্দুকের সঙ্গে রাখা হবে। ওই গাড়ির সঙ্গে দুটি দুগ্ধবতী গাভী বেঁধে দেয়া হবে। এরপর গাড়িকে নগরীর বাইরে নিয়ে রাস্তায় এমনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে যে, যেদিকে সেই গাভী দুটির মুখ থাকবে সেদিকে সিন্দুক নিয়ে ছুটবে।
ফিলিস্তিনিরা তাদের নির্দেশ পালন করলো। আল্লাহর কুদরত দেখুন, সেই গাভীগুলো সেদিকেই ছুটলো যেদিকে ছিলো বনি ইসরাইলিদের বসতি। অবশেষে চলতে চলতে এমন এক ক্ষেতের পাশে গিয়ে থামলো, যেখানে ইসরাইলিরা তাদের শস্য কাটছিলো। তারা সিন্দুকটিকে দেখতে পেয়ে প্রচণ্ড খুশিতে ফেটে পড়লো। তারা দৌড়ে বাইতে শামস শহরে এসে সংবাদ জানালো। তখন বাইতে ইয়ারিম-এর ইহুদিরা এসে সেটিকে সসম্মানে উঠিয়ে নিলো এবং ইন্দাব-এর গৃহে সংরক্ষণ করলো। তার গৃহটি ছিলো একটি টিলার ওপর।'১
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার উল্লিখিত ঘটনা থেকে উদ্ঘাটন করেছেন যে, তাবুতে সাকিনা সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে যে বলা হয়েছে, تحمله الملائكة : [সেটিকে ফেরেশতাগণ বহন করলেন] তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর ফেরেশতাগণের পথপ্রদর্শনের কারণেই সেই গাভীগুলো সিন্দুক বহনকারী গাড়িটিকে কোনো চালক ছাড়াই অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে এসেছিলো। কুরআন ও বাইবেলের ভাষ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার জন্য উল্লিখিত ব্যাখ্যাটিকে বেশ চমৎকার মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাখ্যাটি ভুল। কুরআনুল কারিমের ভাষ্য তা সমর্থন করে না।
কারণ হলো, কুরআনুল কারিমের আলোচনার সারাংশ হলো, তাবুতে সাকিনার প্রত্যাবর্তন ছিলো তালুতের শাসক হওয়ার সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলামত। হযরত শামাবিল আ.-এর হাতে তা এমনভাবে প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ বনি ইসরাইলের চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনে তালুতের সামনে উপস্থিত করে। পক্ষান্তরে তাওরাতের ভাষ্য থেকে বুঝে আসে যে, গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া গাভীগুলো সেটিকে বাইতে শামসের সড়কে এনে ছেড়ে গিয়েছিলো। তবে এতটুকু ঘটেছিলো যে, গাভীগুলো ডানে-বামে মোড় নেয় নি। চোখ বরাবর চলতে চলতে অবশেষে বাইতে শামসের ক্ষেতগুলোর সামনে এসে থেমে পড়ে। যা ফিলিস্তিনিদের সীমান্তের বাইরে প্রথম ইসরাইলি সীমান্ত জনপদ। সেখানে এ কথাও রয়েছে যে, ফিলিস্তিনিরা সেই গাড়ির পেছনে পেছনে বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলো। যখন সেই গাড়ি বাইতে শামসের ক্ষেত পর্যন্ত এসে পড়ে তখন তারা ফিরে যায়। তাওরাতে এসেছে-
'সেই গাভীগুলো বাইতে শামসের সড়কের সোজা পথ ধরলো এবং রাজপথ ধরে চলতে লাগলো। সেগুলো চলার সময় গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিলো। এ সময় সেগুলো ডানে বা বামে মোড় নেয় নি। ফিলিস্তিনি কুতুব সেগুলোর পেছন পেছন বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত যায়। তখন বাইতে শামসের অধিবাসীরা উপত্যকায় গমের ফসল কাটছিলো। তারা চোখ তুলে উপর দিকে তাকাতেই সিন্দুক দেখতে পেলো।'২
তাওরাতের ভাষ্যমতে যে পদ্ধতিতে তাবুত হাতে এসেছে, তা কোনোভাবেই 'মুজেযা' বা 'নিদর্শন' হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তাওরাতে এ ভাষ্য রয়েছে যে, 'বাইতে দাজুন'-এর গণক তার পেছন পেছন ইসরাইলি ক্ষেত-খামারের খুব কাছাকাছি এসেছিলো। যদি তাই সত্য হতো তাহলে কুরআনুল কারিম এরজন্য এত জোরদার শব্দ প্রয়োগ করে বলতো না যে, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ : তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।
এছাড়াও কুরআনুল কারিমের আলোচনার ধরন এবং তার প্রকাশভঙ্গি সম্পর্কে যিনি সামান্য হলেও অবগত তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, যদি তাবুতে সাকিনা বাইবেলে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী প্রাপ্ত হতো তাহলে কুরআনুল কারিম সেটিকে تحمله الملائكة শব্দে ব্যক্ত করতো না; বরং تهدي به الملائكة (সিন্দুকটির ব্যাপারে ফেরেশতাগণ পথ দেখিয়েছেন) বা এ জাতীয় এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করতো, যা থেকে জানা যেতো যে, তাবুতে সাকিনা ফেরেশতাদের দেখানো পথ ধরে ইসরাইলিদের হাতে পৌছেছিলো।
আর যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া হয় যে, তাওরাতে বর্ণিত বিবরণ সঠিক, তবুও তার সারমর্ম দাঁড়াবে এই যে, যখন তাবুতে সাকিনার উপস্থিতির কারণে বাইতে দাজুনের মূর্তিটি প্রতিদিন উপুড় হয়ে পড়ে যেতো এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিন্দুকটিকে দাজুনের অঞ্চল থেকে বের করা হলো, তবে এটিও এক প্রকারের মুজেযা যা কোনো ধরনের বাহ্যিক উপকরণ ছাড়াই দাজুনের মন্দিরে প্রকাশ পেয়েছিলো। কাজেই যে ব্যক্তি এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সঠিক বলে মেনে নিতে প্রস্তুত সে ব্যক্তির জন্য تحمله الملائكة এর এই পরিষ্কার ও সরল অর্থ মেনে নিতে সমস্যা কোথায় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনেছেন।
টিকাঃ
১. স্যামুয়েল: ১. অধ্যায় ৬, আয়াত: ১২
২. স্যামুয়েল: ১, অধ্যায়: ৬, আয়াত: ১২
বনি ইসরাইলের সেই টালবাহানা এতটাই দীর্ঘ হলো যে, তারা হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে দাবি করলো, যদি তালুতের নিযুক্তি মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে তাহলে এর সত্যায়নে আল্লাহর নিদর্শন দেখাতে হবে। হযরত শামাবিল আ. বললেন, যদি তোমরা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের সত্যায়নে কোনো প্রমাণ চাও তাহলে তোমাদের যাবতীয় সংশয় দূর করার জন্য তাও দেখানো হবে। আর তা হলো, যে বরকতময় সিন্দুক [তাবুতে সাকিনা] তোমাদের হাতছাড়া হয়ে লুণ্ঠিত হয়ে গেছে, যার মধ্যে তাওরাত এবং হযরত মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষিত ছিলো, সেটি তালুতের বদৌলতে তোমাদের হাতে ফিরে আসবে। আল্লাহর প্রজ্ঞাদীপ্ত কর্মকৌশলের কল্যাণে এমন ঘটবে যে, তোমাদের চোখের সামনে ফেরেশতারা সেটিকে উঠিয়ে আনবে এবং সেটি দ্বিতীয়বার তোমাদের নাগালে আসবে।
وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
'আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, 'তার রাজত্বের নিদর্শন হলো, তোমাদের নিকট তাবুত আসবে যাতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে চিত্তপ্রশান্তি এবং মুসা ও হারুনের বংশধররা যা রেখে গেছে, তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।' [সুরা বাকারা : ২৪৮]
হযরত শামাবিল আ.-এর এ সুসংবাদ অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। বনি ইসরাইলের সামনে আল্লাহর ফেরেশতাগণ তালুতের কাছে 'তাবুতে সাকিনা' অর্পণ করে। ফলে তাদের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা যদি হযরত শামাবিল আ.-এর এই ইলহামি সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেয় তাহলে অনাগত দিনে নিশ্চিত বিজয় ও সাফল্য তাদের পদচুম্বন করবে।
তাওরাতে 'তাবুতে সাকিনা'-এর প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই চটকদার। নিম্নে তার সারাংশ তুলে ধরা হলো-
'স্যামুয়েলের পুস্তিকায় রয়েছে, যেদিন থেকে তাবুতে সাকিনা লুণ্ঠন করে বাইতে দাজুনে রাখা হয় তারপর থেকে ফিলিস্তিনিরা প্রত্যহ এ দৃশ্য দেখতে পেতো যে, যখনই তারা ভোরবেলা তাদের উপাস্য 'দাজুন'-এর পূজা করতে যেতো, তাদের উপাস্য মূর্তিটিকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখতো। তারা সকালবেলা সেটিকে উঠিয়ে জায়গামতো রেখে দিতো।
কিন্তু রাত পেরোতেই ভোরবেলা দেখতে পেতো যে, সেটি আগের মতো মাটিতে উল্টে পড়ে আছে। আরেকটি কাণ্ড ঘটেছিলো যে, তাদের নগরীতে ইঁদুরের উপদ্রব এত বেশি বেড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের সমস্ত শস্য-ফসলাদি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। তার সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের গলগণ্ড রোগের উপদ্রব দেখা দিলো। ফলে তাদের অনেকের প্রাণহানি ঘটতে লাগলো। ফিলিস্তিনিরা যখন দেখলো যে, কিছুতেই এই বিপদসমূহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তারা অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আমাদের ওপর এত সব বিপদাপদের একমাত্র কারণ হলো সেই সিন্দুক। কাজেই সেটিকে এখনই বের করো।
ভাবনামাফিক তারা অনেক জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদদের একত্র করলো। তাদের কাছে গোটা বৃত্তান্ত উপস্থাপন করে নিষ্কৃতির উপায় প্রার্থনা করলো। জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদেরা তাদের বললেন, এর থেকে নিষ্কৃতির উপায় একটি। তা হলো, যত দ্রুত সম্ভব এ সিন্দুকটিকে বের করো। তার পন্থা হবে এমন যে, প্রথমে স্বর্ণের সাতটি ইঁদুর ও সাতটি গলগণ্ড বানানো হবে। সেগুলোকে একটি গাড়ির ওপর সিন্দুকের সঙ্গে রাখা হবে। ওই গাড়ির সঙ্গে দুটি দুগ্ধবতী গাভী বেঁধে দেয়া হবে। এরপর গাড়িকে নগরীর বাইরে নিয়ে রাস্তায় এমনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে যে, যেদিকে সেই গাভী দুটির মুখ থাকবে সেদিকে সিন্দুক নিয়ে ছুটবে।
ফিলিস্তিনিরা তাদের নির্দেশ পালন করলো। আল্লাহর কুদরত দেখুন, সেই গাভীগুলো সেদিকেই ছুটলো যেদিকে ছিলো বনি ইসরাইলিদের বসতি। অবশেষে চলতে চলতে এমন এক ক্ষেতের পাশে গিয়ে থামলো, যেখানে ইসরাইলিরা তাদের শস্য কাটছিলো। তারা সিন্দুকটিকে দেখতে পেয়ে প্রচণ্ড খুশিতে ফেটে পড়লো। তারা দৌড়ে বাইতে শামস শহরে এসে সংবাদ জানালো। তখন বাইতে ইয়ারিম-এর ইহুদিরা এসে সেটিকে সসম্মানে উঠিয়ে নিলো এবং ইন্দাব-এর গৃহে সংরক্ষণ করলো। তার গৃহটি ছিলো একটি টিলার ওপর।'১
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার উল্লিখিত ঘটনা থেকে উদ্ঘাটন করেছেন যে, তাবুতে সাকিনা সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে যে বলা হয়েছে, تحمله الملائكة : [সেটিকে ফেরেশতাগণ বহন করলেন] তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর ফেরেশতাগণের পথপ্রদর্শনের কারণেই সেই গাভীগুলো সিন্দুক বহনকারী গাড়িটিকে কোনো চালক ছাড়াই অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে এসেছিলো। কুরআন ও বাইবেলের ভাষ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার জন্য উল্লিখিত ব্যাখ্যাটিকে বেশ চমৎকার মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাখ্যাটি ভুল। কুরআনুল কারিমের ভাষ্য তা সমর্থন করে না।
কারণ হলো, কুরআনুল কারিমের আলোচনার সারাংশ হলো, তাবুতে সাকিনার প্রত্যাবর্তন ছিলো তালুতের শাসক হওয়ার সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলামত। হযরত শামাবিল আ.-এর হাতে তা এমনভাবে প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ বনি ইসরাইলের চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনে তালুতের সামনে উপস্থিত করে। পক্ষান্তরে তাওরাতের ভাষ্য থেকে বুঝে আসে যে, গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া গাভীগুলো সেটিকে বাইতে শামসের সড়কে এনে ছেড়ে গিয়েছিলো। তবে এতটুকু ঘটেছিলো যে, গাভীগুলো ডানে-বামে মোড় নেয় নি। চোখ বরাবর চলতে চলতে অবশেষে বাইতে শামসের ক্ষেতগুলোর সামনে এসে থেমে পড়ে। যা ফিলিস্তিনিদের সীমান্তের বাইরে প্রথম ইসরাইলি সীমান্ত জনপদ। সেখানে এ কথাও রয়েছে যে, ফিলিস্তিনিরা সেই গাড়ির পেছনে পেছনে বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলো। যখন সেই গাড়ি বাইতে শামসের ক্ষেত পর্যন্ত এসে পড়ে তখন তারা ফিরে যায়। তাওরাতে এসেছে-
'সেই গাভীগুলো বাইতে শামসের সড়কের সোজা পথ ধরলো এবং রাজপথ ধরে চলতে লাগলো। সেগুলো চলার সময় গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিলো। এ সময় সেগুলো ডানে বা বামে মোড় নেয় নি। ফিলিস্তিনি কুতুব সেগুলোর পেছন পেছন বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত যায়। তখন বাইতে শামসের অধিবাসীরা উপত্যকায় গমের ফসল কাটছিলো। তারা চোখ তুলে উপর দিকে তাকাতেই সিন্দুক দেখতে পেলো।'২
তাওরাতের ভাষ্যমতে যে পদ্ধতিতে তাবুত হাতে এসেছে, তা কোনোভাবেই 'মুজেযা' বা 'নিদর্শন' হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তাওরাতে এ ভাষ্য রয়েছে যে, 'বাইতে দাজুন'-এর গণক তার পেছন পেছন ইসরাইলি ক্ষেত-খামারের খুব কাছাকাছি এসেছিলো। যদি তাই সত্য হতো তাহলে কুরআনুল কারিম এরজন্য এত জোরদার শব্দ প্রয়োগ করে বলতো না যে, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ : তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।
এছাড়াও কুরআনুল কারিমের আলোচনার ধরন এবং তার প্রকাশভঙ্গি সম্পর্কে যিনি সামান্য হলেও অবগত তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, যদি তাবুতে সাকিনা বাইবেলে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী প্রাপ্ত হতো তাহলে কুরআনুল কারিম সেটিকে تحمله الملائكة শব্দে ব্যক্ত করতো না; বরং تهدي به الملائكة (সিন্দুকটির ব্যাপারে ফেরেশতাগণ পথ দেখিয়েছেন) বা এ জাতীয় এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করতো, যা থেকে জানা যেতো যে, তাবুতে সাকিনা ফেরেশতাদের দেখানো পথ ধরে ইসরাইলিদের হাতে পৌছেছিলো।
আর যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া হয় যে, তাওরাতে বর্ণিত বিবরণ সঠিক, তবুও তার সারমর্ম দাঁড়াবে এই যে, যখন তাবুতে সাকিনার উপস্থিতির কারণে বাইতে দাজুনের মূর্তিটি প্রতিদিন উপুড় হয়ে পড়ে যেতো এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিন্দুকটিকে দাজুনের অঞ্চল থেকে বের করা হলো, তবে এটিও এক প্রকারের মুজেযা যা কোনো ধরনের বাহ্যিক উপকরণ ছাড়াই দাজুনের মন্দিরে প্রকাশ পেয়েছিলো। কাজেই যে ব্যক্তি এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সঠিক বলে মেনে নিতে প্রস্তুত সে ব্যক্তির জন্য تحمله الملائكة এর এই পরিষ্কার ও সরল অর্থ মেনে নিতে সমস্যা কোথায় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনেছেন।
টিকাঃ
১. স্যামুয়েল: ১. অধ্যায় ৬, আয়াত: ১২
২. স্যামুয়েল: ১, অধ্যায়: ৬, আয়াত: ১২
বনি ইসরাইলের সেই টালবাহানা এতটাই দীর্ঘ হলো যে, তারা হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে দাবি করলো, যদি তালুতের নিযুক্তি মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে তাহলে এর সত্যায়নে আল্লাহর নিদর্শন দেখাতে হবে। হযরত শামাবিল আ. বললেন, যদি তোমরা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের সত্যায়নে কোনো প্রমাণ চাও তাহলে তোমাদের যাবতীয় সংশয় দূর করার জন্য তাও দেখানো হবে। আর তা হলো, যে বরকতময় সিন্দুক [তাবুতে সাকিনা] তোমাদের হাতছাড়া হয়ে লুণ্ঠিত হয়ে গেছে, যার মধ্যে তাওরাত এবং হযরত মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষিত ছিলো, সেটি তালুতের বদৌলতে তোমাদের হাতে ফিরে আসবে। আল্লাহর প্রজ্ঞাদীপ্ত কর্মকৌশলের কল্যাণে এমন ঘটবে যে, তোমাদের চোখের সামনে ফেরেশতারা সেটিকে উঠিয়ে আনবে এবং সেটি দ্বিতীয়বার তোমাদের নাগালে আসবে।
وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
'আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, 'তার রাজত্বের নিদর্শন হলো, তোমাদের নিকট তাবুত আসবে যাতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে চিত্তপ্রশান্তি এবং মুসা ও হারুনের বংশধররা যা রেখে গেছে, তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।' [সুরা বাকারা : ২৪৮]
হযরত শামাবিল আ.-এর এ সুসংবাদ অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। বনি ইসরাইলের সামনে আল্লাহর ফেরেশতাগণ তালুতের কাছে 'তাবুতে সাকিনা' অর্পণ করে। ফলে তাদের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা যদি হযরত শামাবিল আ.-এর এই ইলহামি সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেয় তাহলে অনাগত দিনে নিশ্চিত বিজয় ও সাফল্য তাদের পদচুম্বন করবে।
তাওরাতে 'তাবুতে সাকিনা'-এর প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই চটকদার। নিম্নে তার সারাংশ তুলে ধরা হলো-
'স্যামুয়েলের পুস্তিকায় রয়েছে, যেদিন থেকে তাবুতে সাকিনা লুণ্ঠন করে বাইতে দাজুনে রাখা হয় তারপর থেকে ফিলিস্তিনিরা প্রত্যহ এ দৃশ্য দেখতে পেতো যে, যখনই তারা ভোরবেলা তাদের উপাস্য 'দাজুন'-এর পূজা করতে যেতো, তাদের উপাস্য মূর্তিটিকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখতো। তারা সকালবেলা সেটিকে উঠিয়ে জায়গামতো রেখে দিতো।
কিন্তু রাত পেরোতেই ভোরবেলা দেখতে পেতো যে, সেটি আগের মতো মাটিতে উল্টে পড়ে আছে। আরেকটি কাণ্ড ঘটেছিলো যে, তাদের নগরীতে ইঁদুরের উপদ্রব এত বেশি বেড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের সমস্ত শস্য-ফসলাদি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। তার সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের গলগণ্ড রোগের উপদ্রব দেখা দিলো। ফলে তাদের অনেকের প্রাণহানি ঘটতে লাগলো। ফিলিস্তিনিরা যখন দেখলো যে, কিছুতেই এই বিপদসমূহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তারা অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আমাদের ওপর এত সব বিপদাপদের একমাত্র কারণ হলো সেই সিন্দুক। কাজেই সেটিকে এখনই বের করো।
ভাবনামাফিক তারা অনেক জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদদের একত্র করলো। তাদের কাছে গোটা বৃত্তান্ত উপস্থাপন করে নিষ্কৃতির উপায় প্রার্থনা করলো। জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদেরা তাদের বললেন, এর থেকে নিষ্কৃতির উপায় একটি। তা হলো, যত দ্রুত সম্ভব এ সিন্দুকটিকে বের করো। তার পন্থা হবে এমন যে, প্রথমে স্বর্ণের সাতটি ইঁদুর ও সাতটি গলগণ্ড বানানো হবে। সেগুলোকে একটি গাড়ির ওপর সিন্দুকের সঙ্গে রাখা হবে। ওই গাড়ির সঙ্গে দুটি দুগ্ধবতী গাভী বেঁধে দেয়া হবে। এরপর গাড়িকে নগরীর বাইরে নিয়ে রাস্তায় এমনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে যে, যেদিকে সেই গাভী দুটির মুখ থাকবে সেদিকে সিন্দুক নিয়ে ছুটবে।
ফিলিস্তিনিরা তাদের নির্দেশ পালন করলো। আল্লাহর কুদরত দেখুন, সেই গাভীগুলো সেদিকেই ছুটলো যেদিকে ছিলো বনি ইসরাইলিদের বসতি। অবশেষে চলতে চলতে এমন এক ক্ষেতের পাশে গিয়ে থামলো, যেখানে ইসরাইলিরা তাদের শস্য কাটছিলো। তারা সিন্দুকটিকে দেখতে পেয়ে প্রচণ্ড খুশিতে ফেটে পড়লো। তারা দৌড়ে বাইতে শামস শহরে এসে সংবাদ জানালো। তখন বাইতে ইয়ারিম-এর ইহুদিরা এসে সেটিকে সসম্মানে উঠিয়ে নিলো এবং ইন্দাব-এর গৃহে সংরক্ষণ করলো। তার গৃহটি ছিলো একটি টিলার ওপর।'১
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার উল্লিখিত ঘটনা থেকে উদ্ঘাটন করেছেন যে, তাবুতে সাকিনা সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে যে বলা হয়েছে, تحمله الملائكة : [সেটিকে ফেরেশতাগণ বহন করলেন] তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর ফেরেশতাগণের পথপ্রদর্শনের কারণেই সেই গাভীগুলো সিন্দুক বহনকারী গাড়িটিকে কোনো চালক ছাড়াই অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে এসেছিলো। কুরআন ও বাইবেলের ভাষ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার জন্য উল্লিখিত ব্যাখ্যাটিকে বেশ চমৎকার মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাখ্যাটি ভুল। কুরআনুল কারিমের ভাষ্য তা সমর্থন করে না।
কারণ হলো, কুরআনুল কারিমের আলোচনার সারাংশ হলো, তাবুতে সাকিনার প্রত্যাবর্তন ছিলো তালুতের শাসক হওয়ার সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলামত। হযরত শামাবিল আ.-এর হাতে তা এমনভাবে প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ বনি ইসরাইলের চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনে তালুতের সামনে উপস্থিত করে। পক্ষান্তরে তাওরাতের ভাষ্য থেকে বুঝে আসে যে, গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া গাভীগুলো সেটিকে বাইতে শামসের সড়কে এনে ছেড়ে গিয়েছিলো। তবে এতটুকু ঘটেছিলো যে, গাভীগুলো ডানে-বামে মোড় নেয় নি। চোখ বরাবর চলতে চলতে অবশেষে বাইতে শামসের ক্ষেতগুলোর সামনে এসে থেমে পড়ে। যা ফিলিস্তিনিদের সীমান্তের বাইরে প্রথম ইসরাইলি সীমান্ত জনপদ। সেখানে এ কথাও রয়েছে যে, ফিলিস্তিনিরা সেই গাড়ির পেছনে পেছনে বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলো। যখন সেই গাড়ি বাইতে শামসের ক্ষেত পর্যন্ত এসে পড়ে তখন তারা ফিরে যায়। তাওরাতে এসেছে-
'সেই গাভীগুলো বাইতে শামসের সড়কের সোজা পথ ধরলো এবং রাজপথ ধরে চলতে লাগলো। সেগুলো চলার সময় গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিলো। এ সময় সেগুলো ডানে বা বামে মোড় নেয় নি। ফিলিস্তিনি কুতুব সেগুলোর পেছন পেছন বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত যায়। তখন বাইতে শামসের অধিবাসীরা উপত্যকায় গমের ফসল কাটছিলো। তারা চোখ তুলে উপর দিকে তাকাতেই সিন্দুক দেখতে পেলো।'২
তাওরাতের ভাষ্যমতে যে পদ্ধতিতে তাবুত হাতে এসেছে, তা কোনোভাবেই 'মুজেযা' বা 'নিদর্শন' হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তাওরাতে এ ভাষ্য রয়েছে যে, 'বাইতে দাজুন'-এর গণক তার পেছন পেছন ইসরাইলি ক্ষেত-খামারের খুব কাছাকাছি এসেছিলো। যদি তাই সত্য হতো তাহলে কুরআনুল কারিম এরজন্য এত জোরদার শব্দ প্রয়োগ করে বলতো না যে, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ : তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।
এছাড়াও কুরআনুল কারিমের আলোচনার ধরন এবং তার প্রকাশভঙ্গি সম্পর্কে যিনি সামান্য হলেও অবগত তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, যদি তাবুতে সাকিনা বাইবেলে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী প্রাপ্ত হতো তাহলে কুরআনুল কারিম সেটিকে تحمله الملائكة শব্দে ব্যক্ত করতো না; বরং تهدي به الملائكة (সিন্দুকটির ব্যাপারে ফেরেশতাগণ পথ দেখিয়েছেন) বা এ জাতীয় এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করতো, যা থেকে জানা যেতো যে, তাবুতে সাকিনা ফেরেশতাদের দেখানো পথ ধরে ইসরাইলিদের হাতে পৌছেছিলো।
আর যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া হয় যে, তাওরাতে বর্ণিত বিবরণ সঠিক, তবুও তার সারমর্ম দাঁড়াবে এই যে, যখন তাবুতে সাকিনার উপস্থিতির কারণে বাইতে দাজুনের মূর্তিটি প্রতিদিন উপুড় হয়ে পড়ে যেতো এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিন্দুকটিকে দাজুনের অঞ্চল থেকে বের করা হলো, তবে এটিও এক প্রকারের মুজেযা যা কোনো ধরনের বাহ্যিক উপকরণ ছাড়াই দাজুনের মন্দিরে প্রকাশ পেয়েছিলো। কাজেই যে ব্যক্তি এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সঠিক বলে মেনে নিতে প্রস্তুত সে ব্যক্তির জন্য تحمله الملائكة এর এই পরিষ্কার ও সরল অর্থ মেনে নিতে সমস্যা কোথায় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনেছেন।
টিকাঃ
১. স্যামুয়েল: ১. অধ্যায় ৬, আয়াত: ১২
২. স্যামুয়েল: ১, অধ্যায়: ৬, আয়াত: ১২
📄 তালুত ও জালুতের যুদ্ধ এবং বনি ইসরাইলের পরীক্ষা
এত টালবাহানা শেষে বনি ইসরাইলিদের নতুন কোনো আপত্তি পেশ করার সুযোগ থাকলো না। অবশেষে হযরত শামাবিল আ.-এর ইলহামপ্রসূত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালুতকে ইসরাইলিদের বাদশাহ মনোনীত করা হয়।
তালুত ক্ষমতায় আরোহণের পর বনি ইসরাইলিদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ঘোষণা জানিয়ে দেন যে, তারা যেনো ফিলিস্তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হতে প্রস্তুত থাকে। তালুতের নেতৃত্বে বনি ইসরাইলিরা রওয়ানা হলে তাদের জন্য শুরু হয় নতুন এক পরীক্ষা। তালুত চিন্তা করলেন যে, যুদ্ধ একটি নাজুক কাজ। অনেক সময় এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কাপুরুষতা বা দ্বৈত ভূমিকার খেসারত হিসেবে গোটা সৈন্যদলকে ধংস হতে হয়। এজন্য যুদ্ধের আগেই বনি ইসরাইলের এ দলটিকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যে, কোন ব্যক্তি নির্দেশ পালন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সততা ও একনিষ্ঠতার অধিকারী আর কোন ব্যক্তি এসব গুণের অধিকারী নয়।
কাজেই কাপুরুষ ও শঠ লোকদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। যাতে যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করার পূর্বেই এমন সদস্যদের আলাদা করে ফেলা যায়। কেননা, এই ময়দানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও নির্দেশ পালন। কাজেই যে ব্যক্তি সামান্য তৃষ্ণার মুহূর্তে নির্দেশের ওপর দৃঢ় থাকতে পারবে না, তার পক্ষে যুদ্ধের মতো নাজুক মুহূর্তে নির্দেশের ওপর অবিচল থাকা অসম্ভব।
দলটি একটি নদীর তীরে এসে উপনীত হলে তালুত ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা এ নদীর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি তৃপ্তিসহ পান করতে পারবে না। যে কেউ এ নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে তাকে আল্লাহর দল থেকে বের করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি নির্দেশ মান্য করবে সে দলভুক্ত থাকবে। তবে কেউ ভীষণ তৃষ্ণা বোধ করলে তার জন্য এক আঁজলা পানি নিয়ে গলা ভেজানোর অনুমতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوْتُ بِالْجُنُوْدِ قَالَ إِنَّ اللهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهْرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّيْ وَمَنْ لَّمْ يَطْعَمهُ فَإِنَّهُ مِنِّيْ إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوْا مِنْهُ إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ
‘অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনীসহ বের হলো সে তখন বললো, আল্লাহ এক নদীর দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। যে কেউ তা থেকে পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয়; আর যে কেউ তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এ ছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সে।’ এরপর অল্পসংখ্যক ব্যতীত তাঁরা সেখান থেকে পান করলো।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৪৯]
মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, ঘটনাটি জর্ডন নদীতে ঘটেছিলো।১ বুখারি শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, আমরা রাসুলের সাহাবীগণ পরস্পরকে বলাবলি করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা তালুতের অনুসারীদের সংখ্যার সমান।২
মোটকথা, ফল দাঁড়ালো এই যে, সৈন্যদল নদীর অতি নিকটস্থ হওয়ার সময় সেসকল লোক নির্দেশ অমান্য করে পানি পান করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, তালুতের মতো শক্তিশালী দেহের অধিকারী বলবান ব্যক্তি ও তার সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আমাদের নেই।
পক্ষান্তরে যেসব লোক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আমিরের নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পেরেছিলো তারা নির্ভয়ে বললো, আমরা অবশ্যই শত্রুদের মোকাবিলা করবো। কেননা, আল্লাহর কুদরতের এই প্রদর্শনী প্রায়ই ঘটে যে, ছোট দল বড় দলের উপর বিজয় লাভ করে। তবে এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, একাগ্রচিত্ততা ও দৃঢ়তা শর্ত। কুরআানুল করিমে ইরশাদ হয়েছে—
فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو اللَّهِ كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'সে ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করলো তখন তারা বললে, 'জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যারা বিশ্বাস করতো, আল্লাহর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে তারা বললো, 'আল্লাহর নির্দেশ কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে'! আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।' [সুরা বাকারা: ২৪৯]
অতঃপর মুজাহিদ বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান। শত্রুবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলো জালুত। লোকটি ছিলো শক্তিশালী দৈহিক কাঠামোর অধিকারী বলবান পুরুষ। তার সৈন্য ছিলো সংখ্যায়ও অধিক। মুজাহিদ বাহিনী মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ইখলাসের সঙ্গে মিনতি জানালো যে, হে আল্লাহ, আপনি শত্রুদলের পরাজয় নিশ্চিত করুন। আমাদেরকে দৃঢ় রাখুন এবং বিজয়ের সাফল্যে ভূষিত করুন।
তাওরাতসহ সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে যে, এসময় বনি ইসরাইল ছিলো জালুতের অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রভাবে ভীত। সে যখন ব্যক্তিগতভাবে লড়াই করার আমন্ত্রণ জানালো, তখন তার জবাবি আক্রমণে নেমে আসতে তারা ভীতি অনুভব করছিলো।
টিকাঃ
১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৮
২ বুখারি শরিফ, বাবুল মাগাযি
এত টালবাহানা শেষে বনি ইসরাইলিদের নতুন কোনো আপত্তি পেশ করার সুযোগ থাকলো না। অবশেষে হযরত শামাবিল আ.-এর ইলহামপ্রসূত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালুতকে ইসরাইলিদের বাদশাহ মনোনীত করা হয়।
তালুত ক্ষমতায় আরোহণের পর বনি ইসরাইলিদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ঘোষণা জানিয়ে দেন যে, তারা যেনো ফিলিস্তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হতে প্রস্তুত থাকে। তালুতের নেতৃত্বে বনি ইসরাইলিরা রওয়ানা হলে তাদের জন্য শুরু হয় নতুন এক পরীক্ষা। তালুত চিন্তা করলেন যে, যুদ্ধ একটি নাজুক কাজ। অনেক সময় এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কাপুরুষতা বা দ্বৈত ভূমিকার খেসারত হিসেবে গোটা সৈন্যদলকে ধংস হতে হয়। এজন্য যুদ্ধের আগেই বনি ইসরাইলের এ দলটিকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যে, কোন ব্যক্তি নির্দেশ পালন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সততা ও একনিষ্ঠতার অধিকারী আর কোন ব্যক্তি এসব গুণের অধিকারী নয়।
কাজেই কাপুরুষ ও শঠ লোকদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। যাতে যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করার পূর্বেই এমন সদস্যদের আলাদা করে ফেলা যায়। কেননা, এই ময়দানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও নির্দেশ পালন। কাজেই যে ব্যক্তি সামান্য তৃষ্ণার মুহূর্তে নির্দেশের ওপর দৃঢ় থাকতে পারবে না, তার পক্ষে যুদ্ধের মতো নাজুক মুহূর্তে নির্দেশের ওপর অবিচল থাকা অসম্ভব।
দলটি একটি নদীর তীরে এসে উপনীত হলে তালুত ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা এ নদীর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি তৃপ্তিসহ পান করতে পারবে না। যে কেউ এ নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে তাকে আল্লাহর দল থেকে বের করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি নির্দেশ মান্য করবে সে দলভুক্ত থাকবে। তবে কেউ ভীষণ তৃষ্ণা বোধ করলে তার জন্য এক আঁজলা পানি নিয়ে গলা ভেজানোর অনুমতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوْتُ بِالْجُنُوْدِ قَالَ إِنَّ اللهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهْرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّيْ وَمَنْ لَّمْ يَطْعَمهُ فَإِنَّهُ مِنِّيْ إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوْا مِنْهُ إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ
‘অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনীসহ বের হলো সে তখন বললো, আল্লাহ এক নদীর দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। যে কেউ তা থেকে পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয়; আর যে কেউ তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এ ছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সে।’ এরপর অল্পসংখ্যক ব্যতীত তাঁরা সেখান থেকে পান করলো।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৪৯]
মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, ঘটনাটি জর্ডন নদীতে ঘটেছিলো।১ বুখারি শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, আমরা রাসুলের সাহাবীগণ পরস্পরকে বলাবলি করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা তালুতের অনুসারীদের সংখ্যার সমান।২
মোটকথা, ফল দাঁড়ালো এই যে, সৈন্যদল নদীর অতি নিকটস্থ হওয়ার সময় সেসকল লোক নির্দেশ অমান্য করে পানি পান করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, তালুতের মতো শক্তিশালী দেহের অধিকারী বলবান ব্যক্তি ও তার সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আমাদের নেই।
পক্ষান্তরে যেসব লোক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আমিরের নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পেরেছিলো তারা নির্ভয়ে বললো, আমরা অবশ্যই শত্রুদের মোকাবিলা করবো। কেননা, আল্লাহর কুদরতের এই প্রদর্শনী প্রায়ই ঘটে যে, ছোট দল বড় দলের উপর বিজয় লাভ করে। তবে এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, একাগ্রচিত্ততা ও দৃঢ়তা শর্ত। কুরআানুল করিমে ইরশাদ হয়েছে—
فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو اللَّهِ كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'সে ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করলো তখন তারা বললে, 'জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যারা বিশ্বাস করতো, আল্লাহর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে তারা বললো, 'আল্লাহর নির্দেশ কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে'! আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।' [সুরা বাকারা: ২৪৯]
অতঃপর মুজাহিদ বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান। শত্রুবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলো জালুত। লোকটি ছিলো শক্তিশালী দৈহিক কাঠামোর অধিকারী বলবান পুরুষ। তার সৈন্য ছিলো সংখ্যায়ও অধিক। মুজাহিদ বাহিনী মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ইখলাসের সঙ্গে মিনতি জানালো যে, হে আল্লাহ, আপনি শত্রুদলের পরাজয় নিশ্চিত করুন। আমাদেরকে দৃঢ় রাখুন এবং বিজয়ের সাফল্যে ভূষিত করুন।
তাওরাতসহ সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে যে, এসময় বনি ইসরাইল ছিলো জালুতের অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রভাবে ভীত। সে যখন ব্যক্তিগতভাবে লড়াই করার আমন্ত্রণ জানালো, তখন তার জবাবি আক্রমণে নেমে আসতে তারা ভীতি অনুভব করছিলো।
টিকাঃ
১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৮
২ বুখারি শরিফ, বাবুল মাগাযি
এত টালবাহানা শেষে বনি ইসরাইলিদের নতুন কোনো আপত্তি পেশ করার সুযোগ থাকলো না। অবশেষে হযরত শামাবিল আ.-এর ইলহামপ্রসূত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালুতকে ইসরাইলিদের বাদশাহ মনোনীত করা হয়।
তালুত ক্ষমতায় আরোহণের পর বনি ইসরাইলিদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ঘোষণা জানিয়ে দেন যে, তারা যেনো ফিলিস্তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হতে প্রস্তুত থাকে। তালুতের নেতৃত্বে বনি ইসরাইলিরা রওয়ানা হলে তাদের জন্য শুরু হয় নতুন এক পরীক্ষা। তালুত চিন্তা করলেন যে, যুদ্ধ একটি নাজুক কাজ। অনেক সময় এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কাপুরুষতা বা দ্বৈত ভূমিকার খেসারত হিসেবে গোটা সৈন্যদলকে ধংস হতে হয়। এজন্য যুদ্ধের আগেই বনি ইসরাইলের এ দলটিকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যে, কোন ব্যক্তি নির্দেশ পালন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সততা ও একনিষ্ঠতার অধিকারী আর কোন ব্যক্তি এসব গুণের অধিকারী নয়।
কাজেই কাপুরুষ ও শঠ লোকদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। যাতে যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করার পূর্বেই এমন সদস্যদের আলাদা করে ফেলা যায়। কেননা, এই ময়দানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও নির্দেশ পালন। কাজেই যে ব্যক্তি সামান্য তৃষ্ণার মুহূর্তে নির্দেশের ওপর দৃঢ় থাকতে পারবে না, তার পক্ষে যুদ্ধের মতো নাজুক মুহূর্তে নির্দেশের ওপর অবিচল থাকা অসম্ভব।
দলটি একটি নদীর তীরে এসে উপনীত হলে তালুত ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা এ নদীর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি তৃপ্তিসহ পান করতে পারবে না। যে কেউ এ নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে তাকে আল্লাহর দল থেকে বের করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি নির্দেশ মান্য করবে সে দলভুক্ত থাকবে। তবে কেউ ভীষণ তৃষ্ণা বোধ করলে তার জন্য এক আঁজলা পানি নিয়ে গলা ভেজানোর অনুমতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوْتُ بِالْجُنُوْدِ قَالَ إِنَّ اللهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهْرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّيْ وَمَنْ لَّمْ يَطْعَمهُ فَإِنَّهُ مِنِّيْ إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوْا مِنْهُ إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ
‘অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনীসহ বের হলো সে তখন বললো, আল্লাহ এক নদীর দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। যে কেউ তা থেকে পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয়; আর যে কেউ তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এ ছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সে।’ এরপর অল্পসংখ্যক ব্যতীত তাঁরা সেখান থেকে পান করলো।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৪৯]
মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, ঘটনাটি জর্ডন নদীতে ঘটেছিলো।১ বুখারি শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, আমরা রাসুলের সাহাবীগণ পরস্পরকে বলাবলি করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা তালুতের অনুসারীদের সংখ্যার সমান।২
মোটকথা, ফল দাঁড়ালো এই যে, সৈন্যদল নদীর অতি নিকটস্থ হওয়ার সময় সেসকল লোক নির্দেশ অমান্য করে পানি পান করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, তালুতের মতো শক্তিশালী দেহের অধিকারী বলবান ব্যক্তি ও তার সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আমাদের নেই।
পক্ষান্তরে যেসব লোক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আমিরের নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পেরেছিলো তারা নির্ভয়ে বললো, আমরা অবশ্যই শত্রুদের মোকাবিলা করবো। কেননা, আল্লাহর কুদরতের এই প্রদর্শনী প্রায়ই ঘটে যে, ছোট দল বড় দলের উপর বিজয় লাভ করে। তবে এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, একাগ্রচিত্ততা ও দৃঢ়তা শর্ত। কুরআানুল করিমে ইরশাদ হয়েছে—
فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو اللَّهِ كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'সে ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করলো তখন তারা বললে, 'জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যারা বিশ্বাস করতো, আল্লাহর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে তারা বললো, 'আল্লাহর নির্দেশ কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে'! আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।' [সুরা বাকারা: ২৪৯]
অতঃপর মুজাহিদ বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান। শত্রুবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলো জালুত। লোকটি ছিলো শক্তিশালী দৈহিক কাঠামোর অধিকারী বলবান পুরুষ। তার সৈন্য ছিলো সংখ্যায়ও অধিক। মুজাহিদ বাহিনী মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ইখলাসের সঙ্গে মিনতি জানালো যে, হে আল্লাহ, আপনি শত্রুদলের পরাজয় নিশ্চিত করুন। আমাদেরকে দৃঢ় রাখুন এবং বিজয়ের সাফল্যে ভূষিত করুন।
তাওরাতসহ সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে যে, এসময় বনি ইসরাইল ছিলো জালুতের অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রভাবে ভীত। সে যখন ব্যক্তিগতভাবে লড়াই করার আমন্ত্রণ জানালো, তখন তার জবাবি আক্রমণে নেমে আসতে তারা ভীতি অনুভব করছিলো।
টিকাঃ
১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৮
২ বুখারি শরিফ, বাবুল মাগাযি
📄 হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম-এর বীরত্ব
বনি ইসরাইলের সেই সৈন্যদলে একজন নওজোয়ান ছিলেন। বাহ্যত সে কোনো আহামরি ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সুখ্যাতি ছিলো না। তিনি হলেন হযরত দাউদ আ.। শ্রুতি রয়েছে, তিনি ছিলেন তাঁর পিতার কনিষ্ঠ পুত্র। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যেও তিনি আগমন করেন নি। বরং তাকে তাঁর পিতা ভাইদের ও ইসরাইলিদের অবস্থা জানতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন যে, জালুত প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের জন্য হুঙ্কার ছুঁড়ছে আর তার জবাব দিতে গিয়ে ইসরাইলিদের পা কাঁপছে। ব্যাপারটি তার কাছে অসহনীয় ঠেকলো। তিনি তালুতের কাছে জালুতের উচিত জবাব দেয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তালুত বললেন, তুমি তো অনভিজ্ঞ যুবক। কাজেই তুমি তার মুখোমুখি হতে পারবে না। কিন্তু হযরত দাউদ আ. ছিলেন তার অনুমতি প্রার্থনায় অনড়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হযরত তালুত তাকে অনুমতি প্রদান করলেন।
দাউদ আ. অগ্রসর হয়ে জালুতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। জালুত দেখতে পেলো যে, তার সঙ্গে লড়াই করতে কমবয়স্ক একজন যুবক এসেছে। সে তাঁকে তুচ্ছ ভেবে কোনো পাত্তাই দিলো না। কিন্তু পরস্পরে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জালুত বুঝলো যে, দাউদ আসলেই প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী। হযরত দাউদ আ. যুদ্ধরত অবস্থায় গাওফন১ প্রস্তুত করলেন এবং নিশানা ঠিক করে পরপর তিনটি পাথর জালুতের কপালে ছুঁড়লেন। ফলে জালুতের মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। হযরত দাউদ আ. তখন এগিয়ে এসে তার মুণ্ডু ফেলে দিলেন। জালুত নিহত হতেই রণাঙ্গনের অবস্থা বদলে গেলো। আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ইসরাইলিরা মরণপণ আক্রমণ করলো। অবশেষে তাগুতি বাহিনী পরাস্ত হলো। বনি ইসরাইলিরা বিজয়ীবেশে ফিরে এলো।
এ ঘটনার পর থেকে হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্বগাথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষ সবার মনেই তার সীমাহীন শক্তির প্রভাব গেঁথে গেলো। সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব সবাইকে গুণমুগ্ধ করলো।
যদিও কুরআনুল কারিম গোটা বিবরণ নিষ্প্রয়োজন মনে করে উল্লেখ করে নি অথবা বাস্তবেই তা সঠিক নয়, তবে এ কথার ওপর কুরআন ও তাওরাত উভয় গ্রন্থই একমত যে, জালুতের হত্যাকারী হলেন হযরত দাউদ আ. এবং জালুতের হত্যাই বনি ইসরাইলের জন্য বিজয় ও সাফল্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ )) فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ
'তারা যখন যুদ্ধার্থে জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হলো তখন তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ধৈর্য দান করো, আমাদের পা অবিচলিত রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো। সুতরাং তারা আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে পরাজিত করলো; দাউদ জালুতকে সংহার করলো, আল্লাহ তাকে হিকমত ও রাজত্ব দান করলেন এবং তিনি যা ইচ্ছে করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন।' (সুরা বাকারা: আয়াত ২৫০-২৫১]
কিছু কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় যে, তালুত দেখতে পেলেন জালুতের ভীষণ শক্তিমত্তা দেখে বনি ইসরাইল তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছে না। তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি জালুতকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তার কাছে আমি আমার কন্যাকে বিয়ে দেবো এবং তাকে রাজত্বের একাংশ দান করবো। হযরত দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করলে তালুত তার অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর সঙ্গে দাউদের কন্যার বিয়ে দিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজত্বের অংশীদার বানিয়ে নেন।১
টিকাঃ
১. গাওফন হলো গুলাল জাতীয় এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র। যা রশি দিয়ে বানানো হয়। এর মাঝে পাথর বা মাটির গুলি রেখে প্রতিপক্ষের দিকে ছোঁড়া হয়।
১. স্যামুয়েলের পুস্তিকা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৮-৯
বনি ইসরাইলের সেই সৈন্যদলে একজন নওজোয়ান ছিলেন। বাহ্যত সে কোনো আহামরি ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সুখ্যাতি ছিলো না। তিনি হলেন হযরত দাউদ আ.। শ্রুতি রয়েছে, তিনি ছিলেন তাঁর পিতার কনিষ্ঠ পুত্র। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যেও তিনি আগমন করেন নি। বরং তাকে তাঁর পিতা ভাইদের ও ইসরাইলিদের অবস্থা জানতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন যে, জালুত প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের জন্য হুঙ্কার ছুঁড়ছে আর তার জবাব দিতে গিয়ে ইসরাইলিদের পা কাঁপছে। ব্যাপারটি তার কাছে অসহনীয় ঠেকলো। তিনি তালুতের কাছে জালুতের উচিত জবাব দেয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তালুত বললেন, তুমি তো অনভিজ্ঞ যুবক। কাজেই তুমি তার মুখোমুখি হতে পারবে না। কিন্তু হযরত দাউদ আ. ছিলেন তার অনুমতি প্রার্থনায় অনড়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হযরত তালুত তাকে অনুমতি প্রদান করলেন।
দাউদ আ. অগ্রসর হয়ে জালুতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। জালুত দেখতে পেলো যে, তার সঙ্গে লড়াই করতে কমবয়স্ক একজন যুবক এসেছে। সে তাঁকে তুচ্ছ ভেবে কোনো পাত্তাই দিলো না। কিন্তু পরস্পরে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জালুত বুঝলো যে, দাউদ আসলেই প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী। হযরত দাউদ আ. যুদ্ধরত অবস্থায় গাওফন১ প্রস্তুত করলেন এবং নিশানা ঠিক করে পরপর তিনটি পাথর জালুতের কপালে ছুঁড়লেন। ফলে জালুতের মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। হযরত দাউদ আ. তখন এগিয়ে এসে তার মুণ্ডু ফেলে দিলেন। জালুত নিহত হতেই রণাঙ্গনের অবস্থা বদলে গেলো। আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ইসরাইলিরা মরণপণ আক্রমণ করলো। অবশেষে তাগুতি বাহিনী পরাস্ত হলো। বনি ইসরাইলিরা বিজয়ীবেশে ফিরে এলো।
এ ঘটনার পর থেকে হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্বগাথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষ সবার মনেই তার সীমাহীন শক্তির প্রভাব গেঁথে গেলো। সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব সবাইকে গুণমুগ্ধ করলো।
যদিও কুরআনুল কারিম গোটা বিবরণ নিষ্প্রয়োজন মনে করে উল্লেখ করে নি অথবা বাস্তবেই তা সঠিক নয়, তবে এ কথার ওপর কুরআন ও তাওরাত উভয় গ্রন্থই একমত যে, জালুতের হত্যাকারী হলেন হযরত দাউদ আ. এবং জালুতের হত্যাই বনি ইসরাইলের জন্য বিজয় ও সাফল্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ )) فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ
'তারা যখন যুদ্ধার্থে জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হলো তখন তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ধৈর্য দান করো, আমাদের পা অবিচলিত রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো। সুতরাং তারা আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে পরাজিত করলো; দাউদ জালুতকে সংহার করলো, আল্লাহ তাকে হিকমত ও রাজত্ব দান করলেন এবং তিনি যা ইচ্ছে করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন।' (সুরা বাকারা: আয়াত ২৫০-২৫১]
কিছু কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় যে, তালুত দেখতে পেলেন জালুতের ভীষণ শক্তিমত্তা দেখে বনি ইসরাইল তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছে না। তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি জালুতকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তার কাছে আমি আমার কন্যাকে বিয়ে দেবো এবং তাকে রাজত্বের একাংশ দান করবো। হযরত দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করলে তালুত তার অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর সঙ্গে দাউদের কন্যার বিয়ে দিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজত্বের অংশীদার বানিয়ে নেন।১
টিকাঃ
১. গাওফন হলো গুলাল জাতীয় এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র। যা রশি দিয়ে বানানো হয়। এর মাঝে পাথর বা মাটির গুলি রেখে প্রতিপক্ষের দিকে ছোঁড়া হয়।
১. স্যামুয়েলের পুস্তিকা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৮-৯
বনি ইসরাইলের সেই সৈন্যদলে একজন নওজোয়ান ছিলেন। বাহ্যত সে কোনো আহামরি ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সুখ্যাতি ছিলো না। তিনি হলেন হযরত দাউদ আ.। শ্রুতি রয়েছে, তিনি ছিলেন তাঁর পিতার কনিষ্ঠ পুত্র। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যেও তিনি আগমন করেন নি। বরং তাকে তাঁর পিতা ভাইদের ও ইসরাইলিদের অবস্থা জানতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন যে, জালুত প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের জন্য হুঙ্কার ছুঁড়ছে আর তার জবাব দিতে গিয়ে ইসরাইলিদের পা কাঁপছে। ব্যাপারটি তার কাছে অসহনীয় ঠেকলো। তিনি তালুতের কাছে জালুতের উচিত জবাব দেয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তালুত বললেন, তুমি তো অনভিজ্ঞ যুবক। কাজেই তুমি তার মুখোমুখি হতে পারবে না। কিন্তু হযরত দাউদ আ. ছিলেন তার অনুমতি প্রার্থনায় অনড়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হযরত তালুত তাকে অনুমতি প্রদান করলেন।
দাউদ আ. অগ্রসর হয়ে জালুতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। জালুত দেখতে পেলো যে, তার সঙ্গে লড়াই করতে কমবয়স্ক একজন যুবক এসেছে। সে তাঁকে তুচ্ছ ভেবে কোনো পাত্তাই দিলো না। কিন্তু পরস্পরে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জালুত বুঝলো যে, দাউদ আসলেই প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী। হযরত দাউদ আ. যুদ্ধরত অবস্থায় গাওফন১ প্রস্তুত করলেন এবং নিশানা ঠিক করে পরপর তিনটি পাথর জালুতের কপালে ছুঁড়লেন। ফলে জালুতের মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। হযরত দাউদ আ. তখন এগিয়ে এসে তার মুণ্ডু ফেলে দিলেন। জালুত নিহত হতেই রণাঙ্গনের অবস্থা বদলে গেলো। আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ইসরাইলিরা মরণপণ আক্রমণ করলো। অবশেষে তাগুতি বাহিনী পরাস্ত হলো। বনি ইসরাইলিরা বিজয়ীবেশে ফিরে এলো।
এ ঘটনার পর থেকে হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্বগাথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষ সবার মনেই তার সীমাহীন শক্তির প্রভাব গেঁথে গেলো। সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব সবাইকে গুণমুগ্ধ করলো।
যদিও কুরআনুল কারিম গোটা বিবরণ নিষ্প্রয়োজন মনে করে উল্লেখ করে নি অথবা বাস্তবেই তা সঠিক নয়, তবে এ কথার ওপর কুরআন ও তাওরাত উভয় গ্রন্থই একমত যে, জালুতের হত্যাকারী হলেন হযরত দাউদ আ. এবং জালুতের হত্যাই বনি ইসরাইলের জন্য বিজয় ও সাফল্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ )) فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ
'তারা যখন যুদ্ধার্থে জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হলো তখন তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ধৈর্য দান করো, আমাদের পা অবিচলিত রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো। সুতরাং তারা আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে পরাজিত করলো; দাউদ জালুতকে সংহার করলো, আল্লাহ তাকে হিকমত ও রাজত্ব দান করলেন এবং তিনি যা ইচ্ছে করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন।' (সুরা বাকারা: আয়াত ২৫০-২৫১]
কিছু কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় যে, তালুত দেখতে পেলেন জালুতের ভীষণ শক্তিমত্তা দেখে বনি ইসরাইল তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছে না। তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি জালুতকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তার কাছে আমি আমার কন্যাকে বিয়ে দেবো এবং তাকে রাজত্বের একাংশ দান করবো। হযরত দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করলে তালুত তার অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর সঙ্গে দাউদের কন্যার বিয়ে দিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজত্বের অংশীদার বানিয়ে নেন।১
টিকাঃ
১. গাওফন হলো গুলাল জাতীয় এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র। যা রশি দিয়ে বানানো হয়। এর মাঝে পাথর বা মাটির গুলি রেখে প্রতিপক্ষের দিকে ছোঁড়া হয়।
১. স্যামুয়েলের পুস্তিকা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৮-৯
📄 একটি ইসরাইলি রেওয়ায়েতের সমালোচনা
তাওরাতের স্যামুয়েল অধ্যায়ে তালুত ও দাউদ আ. সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ উপাখ্যান পাওয়া যায়। তার সারাংশ হলো, তালুত দাউদের বীরত্বোচিত কৃতিত্বের ফলে অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিলেও দাউদের প্রতি ইসরাইলিদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং তাঁর শক্তিমত্তাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তাঁর প্রতি মনের ভেতর হিংসা ও ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছিলো। কিন্তু তিনি তা গোপনে লালন করতে থাকলেন এবং মনে মনে কৌশল খুঁজতে লাগলেন কীভাবে দাউদের গল্পের সমাপ্তি টানা যায়।
তালুতের কন্যা ও পুত্ররা এ সময় পিতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাউদের সহযোগী ও সহমর্মী ছিলেন। ফলে প্রতিটি কৌশলেই তালুতকে ব্যর্থ হতে হয়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি দাউদের প্রকাশ্য বৈরিতায় নেমে এলেন। এ অবস্থা দেখে দাউদ তার স্ত্রী ও শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের একটি ছোট শহরে তালুতের এক শত্রুর ডেরায় আশ্রয় নিলেন। ইসরাইলিদের এই পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে শত্রুপক্ষ কাজে লাগালো। তারা সেনাভিযান চালিয়ে ইসরাইলিদের পরাজিত করলো।
ঘটনার এ পর্যায়ে সুদ্দির বর্ণনা ও তাওরাতের ভাষ্যে কিছুটা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। তাওরাতের বক্তব্য হলো, তালুত সেই যুদ্ধে নিহত হন। পক্ষান্তরে সুদ্দির বর্ণনা হলো, পরাজয় নিশ্চিত হতেই তালুত তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তখনকার শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গ ও জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ মুহূর্তে যদি আমি তওবা করি, তাহলে কি সেটি কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে? সবাই না বলেন। কিন্তু একজন ইবাদতকারী মহিলা 'হ্যাঁ' বলে তাঁকে আল-ইয়াসাআ নবীর মাজারে নিয়ে গেলেন এবং দোয়া করলেন। হযরত আল-ইয়াসাআ কবর থেকে উঠে তাঁকে বললেন, তোমার তওবার একটাই পথ রয়েছে: তুমি রাজত্ব দাউদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমার বংশকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরিক হয়ে শহীদ হয়ে যাও। তালুত নির্দেশনা পালন করলেন। এভাবেই সম্পূর্ণ রাজত্ব হযরত দাউদ আ.-এর হাতে চলে এলো এবং তালুত তার বংশধরসহ শাহাদাতের সুধা পান করলেন।
উল্লিখিত বিবরণের আদ্যোপান্ত স্যামুয়েলের পুস্তিকা হতে সংগৃহীত। অথচ সুদ্দির উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস লেখকগণ ওই ইসরাইলি বর্ণনাকে ইসলামি রেওয়ায়েতের মতো করে বর্ণনা করে থাকেন। এমনকি হযরত দাউদ আ.-এর যে মর্যাদা ও সম্মান সুরা বাকারায় এসেছে, তার তাফসিরে তারা এই ঘটনা বর্ণনা করে থাকেন। আমার বুঝে আসে না যে, বিগত যুগে ইসরাইলি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বর্ণনার জন্য কেনো এত তোড়-জোড় সৃষ্টি হয়েছিলো যে, ইহুদিরা তাদের গোমরাহি ও বিভ্রান্তির সমর্থনে যে মনগড়া কাহিনি রচনা করেছিলো সেগুলোকে কেনো ইসলামি তথ্য ভাণ্ডারে শামিল করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় নি? ইতিহাস ও সিরাতের কিতাব না হয় অনেক পরের বিষয়, কুরআনের তাফসিরের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও এ ধরনের বানোয়াট রচনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে দেয়া হয় নি। এখানেও সেই একই চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে।
কুরআনুল কারিমের ভাষ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, হযরত শামাবিল আ. বনি ইসরাইলের ক্রমাগত দাবির প্রেক্ষিতে তালুতকে বাদশাহ মনোনীত করলে বনি ইসরাইল আনুগত্য ও অধীনতার অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদশাহ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলো। ফলে তারা বিকৃতির পথ অবলম্বন করেছিলো। কিন্তু খোদায়ি নিদর্শন তাদের নিরুত্তর করে ফেললে তারা বাধ্য হয়ে তালুতকে শাসক মেনে নিয়েছিলো। তখন ইহুদি পণ্ডিতেরা মনে মনে ভাবলো আমাদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ও দুষ্ট বৈশিষ্ট্যের তালিকায় নতুন আরেকটি বিষয়ের সংযোজন ঘটতে যাচ্ছে যে, আমরা আল্লাহর মনোনীত বান্দা তালুতকে অযোগ্য বানিয়ে শুরুতেই তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। কাজেই ইতিহাসে এমন কিছু কথা সংযোজন করতে হবে যার দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, শুরু থেকেই আমরা তালুতের ব্যাপারে যে 'শাসক হওয়ার অযোগ্যতা'-এর দাবি করেছিলাম, তা সত্য ও সঠিক। তখন আমরা দুনিয়ার সামনে এ কথা বলার সুযোগ পাবো যে, এগুলোই ওইসব ব্যাপার, যা আমরা আমাদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা দিয়ে পূর্বেই অনুমান করে ফেলেছিলাম। অবশেষে তালুতের অযোগ্যতাই প্রমাণিত হলো। দোষ হালকা করা এবং নিজেদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ওপর পর্দা ফেলার কূটকৌশল হিসেবে তারা এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। যার প্রকাশ ঘটেছে স্যামুয়েলের পুস্তিকায় তালুত ও হযরত দাউদ আ.-এর বিরোধ সম্পর্কিত উপাখ্যানে।
আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের কতিপয় সিরাত বিশেষজ্ঞ ও তাফসিরবিদও সেই বাস্তবতাকে উদ্ঘাটন না করে সরল মনে সিরাত ও তাফসিরের কিতাবে সেগুলোকে স্থান দিয়েছেন। তারা একটু খতিয়েও দেখলেন না যে, যে তালুতকে কুরআনুল কারিম আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত অভিহিত করেছে এবং যাঁর বরকতে 'তাবুতে সাকিনা' বনি ইসরাইল দ্বিতীয়বার অর্জন করতে পেরেছে এবং 'তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন' বলে কুরআন যার জ্ঞান ও বীরত্বের প্রশংসা করেছে, এমন ব্যক্তিকে আমরা কীভাবে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ও শক্ত দলিল ব্যতিরেকে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী অভিহিত করে নিন্দা ও সমালোচনার পাত্র বানাতে পারি?
কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে তো কোনোভাবে এ সন্দেহকে স্থান দেয়া যেতে পারে না যে, যে ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘ সময় অপরাধে কেটেছে, যে ব্যক্তিগতভাবে দোষী, কুরআন তার প্রশংসা ও ফজিলত বর্ণনা করলো আর তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো গোপন করলো? কাজেই যখন কুরআনুল কারিম হযরত তালুতের জন্য প্রশংসাসূচক বাক্যের বাইরে একটিও নিন্দাজ্ঞাপক শব্দ ব্যক্ত করে নি, এমনকি এদিকে ইঙ্গিতও করে নি, তখন একজন মুসলমানের জন্য কী করে জায়েয হয় যে, সে তাওরাতের এই বানোয়াট গল্পকাহিনি মেনে নেবে? এটি কিছুতেই হতে পারে না।
এ কারণেই প্রখ্যাত গবেষক আল্লামা ইবনে কাসির র. তাঁর ইতিহাসে এই বিবরণ পেশ করার পর মন্তব্য করেছেন- وفي بعض هذا نظر ونكارة. এই ঘটনার কিছু অংশ আপত্তিকর ও সংশয়পূর্ণ।
তিনি এ কথাও বলেছেন, এই ঘটনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, জনৈক নারী হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর কবরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে মৃত্যু থেকে জাগ্রত করেন। এ অংশটি এই ঘটনা মিথ্যা হওয়ার শক্ত দলিল। কারণ, একমাত্র নবী-রাসুলদের কাছ থেকেই এ ধরনের মুজেযা ঘটতে পারে, কোনো তাপসী ও আবেদা নারী থেকে নয়।১
এ কারণেই হযরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে এ ঘটনার দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন নি। সত্য হলো, এটি ভ্রূক্ষেপ করার মতোও নয়।
এ সময়ে হযরত শামাবিল আ.-এর ইন্তিকাল হয়।
টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯
তাওরাতের স্যামুয়েল অধ্যায়ে তালুত ও দাউদ আ. সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ উপাখ্যান পাওয়া যায়। তার সারাংশ হলো, তালুত দাউদের বীরত্বোচিত কৃতিত্বের ফলে অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিলেও দাউদের প্রতি ইসরাইলিদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং তাঁর শক্তিমত্তাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তাঁর প্রতি মনের ভেতর হিংসা ও ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছিলো। কিন্তু তিনি তা গোপনে লালন করতে থাকলেন এবং মনে মনে কৌশল খুঁজতে লাগলেন কীভাবে দাউদের গল্পের সমাপ্তি টানা যায়।
তালুতের কন্যা ও পুত্ররা এ সময় পিতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাউদের সহযোগী ও সহমর্মী ছিলেন। ফলে প্রতিটি কৌশলেই তালুতকে ব্যর্থ হতে হয়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি দাউদের প্রকাশ্য বৈরিতায় নেমে এলেন। এ অবস্থা দেখে দাউদ তার স্ত্রী ও শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের একটি ছোট শহরে তালুতের এক শত্রুর ডেরায় আশ্রয় নিলেন। ইসরাইলিদের এই পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে শত্রুপক্ষ কাজে লাগালো। তারা সেনাভিযান চালিয়ে ইসরাইলিদের পরাজিত করলো।
ঘটনার এ পর্যায়ে সুদ্দির বর্ণনা ও তাওরাতের ভাষ্যে কিছুটা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। তাওরাতের বক্তব্য হলো, তালুত সেই যুদ্ধে নিহত হন। পক্ষান্তরে সুদ্দির বর্ণনা হলো, পরাজয় নিশ্চিত হতেই তালুত তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তখনকার শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গ ও জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ মুহূর্তে যদি আমি তওবা করি, তাহলে কি সেটি কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে? সবাই না বলেন। কিন্তু একজন ইবাদতকারী মহিলা 'হ্যাঁ' বলে তাঁকে আল-ইয়াসাআ নবীর মাজারে নিয়ে গেলেন এবং দোয়া করলেন। হযরত আল-ইয়াসাআ কবর থেকে উঠে তাঁকে বললেন, তোমার তওবার একটাই পথ রয়েছে: তুমি রাজত্ব দাউদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমার বংশকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরিক হয়ে শহীদ হয়ে যাও। তালুত নির্দেশনা পালন করলেন। এভাবেই সম্পূর্ণ রাজত্ব হযরত দাউদ আ.-এর হাতে চলে এলো এবং তালুত তার বংশধরসহ শাহাদাতের সুধা পান করলেন।
উল্লিখিত বিবরণের আদ্যোপান্ত স্যামুয়েলের পুস্তিকা হতে সংগৃহীত। অথচ সুদ্দির উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস লেখকগণ ওই ইসরাইলি বর্ণনাকে ইসলামি রেওয়ায়েতের মতো করে বর্ণনা করে থাকেন। এমনকি হযরত দাউদ আ.-এর যে মর্যাদা ও সম্মান সুরা বাকারায় এসেছে, তার তাফসিরে তারা এই ঘটনা বর্ণনা করে থাকেন। আমার বুঝে আসে না যে, বিগত যুগে ইসরাইলি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বর্ণনার জন্য কেনো এত তোড়-জোড় সৃষ্টি হয়েছিলো যে, ইহুদিরা তাদের গোমরাহি ও বিভ্রান্তির সমর্থনে যে মনগড়া কাহিনি রচনা করেছিলো সেগুলোকে কেনো ইসলামি তথ্য ভাণ্ডারে শামিল করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় নি? ইতিহাস ও সিরাতের কিতাব না হয় অনেক পরের বিষয়, কুরআনের তাফসিরের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও এ ধরনের বানোয়াট রচনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে দেয়া হয় নি। এখানেও সেই একই চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে।
কুরআনুল কারিমের ভাষ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, হযরত শামাবিল আ. বনি ইসরাইলের ক্রমাগত দাবির প্রেক্ষিতে তালুতকে বাদশাহ মনোনীত করলে বনি ইসরাইল আনুগত্য ও অধীনতার অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদশাহ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলো। ফলে তারা বিকৃতির পথ অবলম্বন করেছিলো। কিন্তু খোদায়ি নিদর্শন তাদের নিরুত্তর করে ফেললে তারা বাধ্য হয়ে তালুতকে শাসক মেনে নিয়েছিলো। তখন ইহুদি পণ্ডিতেরা মনে মনে ভাবলো আমাদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ও দুষ্ট বৈশিষ্ট্যের তালিকায় নতুন আরেকটি বিষয়ের সংযোজন ঘটতে যাচ্ছে যে, আমরা আল্লাহর মনোনীত বান্দা তালুতকে অযোগ্য বানিয়ে শুরুতেই তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। কাজেই ইতিহাসে এমন কিছু কথা সংযোজন করতে হবে যার দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, শুরু থেকেই আমরা তালুতের ব্যাপারে যে 'শাসক হওয়ার অযোগ্যতা'-এর দাবি করেছিলাম, তা সত্য ও সঠিক। তখন আমরা দুনিয়ার সামনে এ কথা বলার সুযোগ পাবো যে, এগুলোই ওইসব ব্যাপার, যা আমরা আমাদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা দিয়ে পূর্বেই অনুমান করে ফেলেছিলাম। অবশেষে তালুতের অযোগ্যতাই প্রমাণিত হলো। দোষ হালকা করা এবং নিজেদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ওপর পর্দা ফেলার কূটকৌশল হিসেবে তারা এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। যার প্রকাশ ঘটেছে স্যামুয়েলের পুস্তিকায় তালুত ও হযরত দাউদ আ.-এর বিরোধ সম্পর্কিত উপাখ্যানে।
আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের কতিপয় সিরাত বিশেষজ্ঞ ও তাফসিরবিদও সেই বাস্তবতাকে উদ্ঘাটন না করে সরল মনে সিরাত ও তাফসিরের কিতাবে সেগুলোকে স্থান দিয়েছেন। তারা একটু খতিয়েও দেখলেন না যে, যে তালুতকে কুরআনুল কারিম আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত অভিহিত করেছে এবং যাঁর বরকতে 'তাবুতে সাকিনা' বনি ইসরাইল দ্বিতীয়বার অর্জন করতে পেরেছে এবং 'তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন' বলে কুরআন যার জ্ঞান ও বীরত্বের প্রশংসা করেছে, এমন ব্যক্তিকে আমরা কীভাবে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ও শক্ত দলিল ব্যতিরেকে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী অভিহিত করে নিন্দা ও সমালোচনার পাত্র বানাতে পারি?
কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে তো কোনোভাবে এ সন্দেহকে স্থান দেয়া যেতে পারে না যে, যে ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘ সময় অপরাধে কেটেছে, যে ব্যক্তিগতভাবে দোষী, কুরআন তার প্রশংসা ও ফজিলত বর্ণনা করলো আর তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো গোপন করলো? কাজেই যখন কুরআনুল কারিম হযরত তালুতের জন্য প্রশংসাসূচক বাক্যের বাইরে একটিও নিন্দাজ্ঞাপক শব্দ ব্যক্ত করে নি, এমনকি এদিকে ইঙ্গিতও করে নি, তখন একজন মুসলমানের জন্য কী করে জায়েয হয় যে, সে তাওরাতের এই বানোয়াট গল্পকাহিনি মেনে নেবে? এটি কিছুতেই হতে পারে না।
এ কারণেই প্রখ্যাত গবেষক আল্লামা ইবনে কাসির র. তাঁর ইতিহাসে এই বিবরণ পেশ করার পর মন্তব্য করেছেন- وفي بعض هذا نظر ونكارة. এই ঘটনার কিছু অংশ আপত্তিকর ও সংশয়পূর্ণ।
তিনি এ কথাও বলেছেন, এই ঘটনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, জনৈক নারী হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর কবরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে মৃত্যু থেকে জাগ্রত করেন। এ অংশটি এই ঘটনা মিথ্যা হওয়ার শক্ত দলিল। কারণ, একমাত্র নবী-রাসুলদের কাছ থেকেই এ ধরনের মুজেযা ঘটতে পারে, কোনো তাপসী ও আবেদা নারী থেকে নয়।১
এ কারণেই হযরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে এ ঘটনার দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন নি। সত্য হলো, এটি ভ্রূক্ষেপ করার মতোও নয়।
এ সময়ে হযরত শামাবিল আ.-এর ইন্তিকাল হয়।
টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯
তাওরাতের স্যামুয়েল অধ্যায়ে তালুত ও দাউদ আ. সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ উপাখ্যান পাওয়া যায়। তার সারাংশ হলো, তালুত দাউদের বীরত্বোচিত কৃতিত্বের ফলে অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিলেও দাউদের প্রতি ইসরাইলিদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং তাঁর শক্তিমত্তাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তাঁর প্রতি মনের ভেতর হিংসা ও ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছিলো। কিন্তু তিনি তা গোপনে লালন করতে থাকলেন এবং মনে মনে কৌশল খুঁজতে লাগলেন কীভাবে দাউদের গল্পের সমাপ্তি টানা যায়।
তালুতের কন্যা ও পুত্ররা এ সময় পিতার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাউদের সহযোগী ও সহমর্মী ছিলেন। ফলে প্রতিটি কৌশলেই তালুতকে ব্যর্থ হতে হয়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি দাউদের প্রকাশ্য বৈরিতায় নেমে এলেন। এ অবস্থা দেখে দাউদ তার স্ত্রী ও শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের একটি ছোট শহরে তালুতের এক শত্রুর ডেরায় আশ্রয় নিলেন। ইসরাইলিদের এই পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে শত্রুপক্ষ কাজে লাগালো। তারা সেনাভিযান চালিয়ে ইসরাইলিদের পরাজিত করলো।
ঘটনার এ পর্যায়ে সুদ্দির বর্ণনা ও তাওরাতের ভাষ্যে কিছুটা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। তাওরাতের বক্তব্য হলো, তালুত সেই যুদ্ধে নিহত হন। পক্ষান্তরে সুদ্দির বর্ণনা হলো, পরাজয় নিশ্চিত হতেই তালুত তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তখনকার শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গ ও জ্যোতিষীদের শরণাপন্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ মুহূর্তে যদি আমি তওবা করি, তাহলে কি সেটি কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে? সবাই না বলেন। কিন্তু একজন ইবাদতকারী মহিলা 'হ্যাঁ' বলে তাঁকে আল-ইয়াসাআ নবীর মাজারে নিয়ে গেলেন এবং দোয়া করলেন। হযরত আল-ইয়াসাআ কবর থেকে উঠে তাঁকে বললেন, তোমার তওবার একটাই পথ রয়েছে: তুমি রাজত্ব দাউদের হাতে ছেড়ে দাও এবং তোমার বংশকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরিক হয়ে শহীদ হয়ে যাও। তালুত নির্দেশনা পালন করলেন। এভাবেই সম্পূর্ণ রাজত্ব হযরত দাউদ আ.-এর হাতে চলে এলো এবং তালুত তার বংশধরসহ শাহাদাতের সুধা পান করলেন।
উল্লিখিত বিবরণের আদ্যোপান্ত স্যামুয়েলের পুস্তিকা হতে সংগৃহীত। অথচ সুদ্দির উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস লেখকগণ ওই ইসরাইলি বর্ণনাকে ইসলামি রেওয়ায়েতের মতো করে বর্ণনা করে থাকেন। এমনকি হযরত দাউদ আ.-এর যে মর্যাদা ও সম্মান সুরা বাকারায় এসেছে, তার তাফসিরে তারা এই ঘটনা বর্ণনা করে থাকেন। আমার বুঝে আসে না যে, বিগত যুগে ইসরাইলি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বর্ণনার জন্য কেনো এত তোড়-জোড় সৃষ্টি হয়েছিলো যে, ইহুদিরা তাদের গোমরাহি ও বিভ্রান্তির সমর্থনে যে মনগড়া কাহিনি রচনা করেছিলো সেগুলোকে কেনো ইসলামি তথ্য ভাণ্ডারে শামিল করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয় নি? ইতিহাস ও সিরাতের কিতাব না হয় অনেক পরের বিষয়, কুরআনের তাফসিরের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও এ ধরনের বানোয়াট রচনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে দেয়া হয় নি। এখানেও সেই একই চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে।
কুরআনুল কারিমের ভাষ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, হযরত শামাবিল আ. বনি ইসরাইলের ক্রমাগত দাবির প্রেক্ষিতে তালুতকে বাদশাহ মনোনীত করলে বনি ইসরাইল আনুগত্য ও অধীনতার অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদশাহ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলো। ফলে তারা বিকৃতির পথ অবলম্বন করেছিলো। কিন্তু খোদায়ি নিদর্শন তাদের নিরুত্তর করে ফেললে তারা বাধ্য হয়ে তালুতকে শাসক মেনে নিয়েছিলো। তখন ইহুদি পণ্ডিতেরা মনে মনে ভাবলো আমাদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতা ও দুষ্ট বৈশিষ্ট্যের তালিকায় নতুন আরেকটি বিষয়ের সংযোজন ঘটতে যাচ্ছে যে, আমরা আল্লাহর মনোনীত বান্দা তালুতকে অযোগ্য বানিয়ে শুরুতেই তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। কাজেই ইতিহাসে এমন কিছু কথা সংযোজন করতে হবে যার দ্বারা প্রমাণিত হবে যে, শুরু থেকেই আমরা তালুতের ব্যাপারে যে 'শাসক হওয়ার অযোগ্যতা'-এর দাবি করেছিলাম, তা সত্য ও সঠিক। তখন আমরা দুনিয়ার সামনে এ কথা বলার সুযোগ পাবো যে, এগুলোই ওইসব ব্যাপার, যা আমরা আমাদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা দিয়ে পূর্বেই অনুমান করে ফেলেছিলাম। অবশেষে তালুতের অযোগ্যতাই প্রমাণিত হলো। দোষ হালকা করা এবং নিজেদের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ওপর পর্দা ফেলার কূটকৌশল হিসেবে তারা এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। যার প্রকাশ ঘটেছে স্যামুয়েলের পুস্তিকায় তালুত ও হযরত দাউদ আ.-এর বিরোধ সম্পর্কিত উপাখ্যানে।
আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের কতিপয় সিরাত বিশেষজ্ঞ ও তাফসিরবিদও সেই বাস্তবতাকে উদ্ঘাটন না করে সরল মনে সিরাত ও তাফসিরের কিতাবে সেগুলোকে স্থান দিয়েছেন। তারা একটু খতিয়েও দেখলেন না যে, যে তালুতকে কুরআনুল কারিম আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত অভিহিত করেছে এবং যাঁর বরকতে 'তাবুতে সাকিনা' বনি ইসরাইল দ্বিতীয়বার অর্জন করতে পেরেছে এবং 'তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন' বলে কুরআন যার জ্ঞান ও বীরত্বের প্রশংসা করেছে, এমন ব্যক্তিকে আমরা কীভাবে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ও শক্ত দলিল ব্যতিরেকে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী অভিহিত করে নিন্দা ও সমালোচনার পাত্র বানাতে পারি?
কুরআনুল কারিমের ক্ষেত্রে তো কোনোভাবে এ সন্দেহকে স্থান দেয়া যেতে পারে না যে, যে ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘ সময় অপরাধে কেটেছে, যে ব্যক্তিগতভাবে দোষী, কুরআন তার প্রশংসা ও ফজিলত বর্ণনা করলো আর তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো গোপন করলো? কাজেই যখন কুরআনুল কারিম হযরত তালুতের জন্য প্রশংসাসূচক বাক্যের বাইরে একটিও নিন্দাজ্ঞাপক শব্দ ব্যক্ত করে নি, এমনকি এদিকে ইঙ্গিতও করে নি, তখন একজন মুসলমানের জন্য কী করে জায়েয হয় যে, সে তাওরাতের এই বানোয়াট গল্পকাহিনি মেনে নেবে? এটি কিছুতেই হতে পারে না।
এ কারণেই প্রখ্যাত গবেষক আল্লামা ইবনে কাসির র. তাঁর ইতিহাসে এই বিবরণ পেশ করার পর মন্তব্য করেছেন- وفي بعض هذا نظر ونكارة. এই ঘটনার কিছু অংশ আপত্তিকর ও সংশয়পূর্ণ।
তিনি এ কথাও বলেছেন, এই ঘটনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, জনৈক নারী হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর কবরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে মৃত্যু থেকে জাগ্রত করেন। এ অংশটি এই ঘটনা মিথ্যা হওয়ার শক্ত দলিল। কারণ, একমাত্র নবী-রাসুলদের কাছ থেকেই এ ধরনের মুজেযা ঘটতে পারে, কোনো তাপসী ও আবেদা নারী থেকে নয়।১
এ কারণেই হযরত ইবনে কাসির রহ. তাঁর তাফসিরে এ ঘটনার দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন নি। সত্য হলো, এটি ভ্রূক্ষেপ করার মতোও নয়।
এ সময়ে হযরত শামাবিল আ.-এর ইন্তিকাল হয়।
টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯