📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 নাম ও বংশ পরিচিতি

📄 নাম ও বংশ পরিচিতি


আইলি কাহেনের যুগ শেষ হওয়ার পর সেই কাযিদের মধ্য হতে অন্যতম কাযি শামাবিল আ.-কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত প্রদান করা হয়। তিনি তখন বনি ইসরাইলের হেদায়েত প্রদর্শনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

কোনো কোনো রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে, যখন হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর ইন্তিকালের সময় মিসর ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী রোমসাগরের পাদদেশে বসবাস করতো আমালিকা সম্প্রদায়। তাদের অত্যাচারী শাসক 'জালুত' বনি ইসরাইলকে পরাজিত করে তাদের বাড়ি-ঘর দখল করে ফেলে। এসময় সে তাদের অনেক সর্দার ও বিভিন্ন শাখাগোত্রের সম্মানিত লোকদেরকে গ্রেফতার করে সঙ্গে নিয়ে যায়। আর অন্যদেরকে পরাজিত ও লাঞ্ছিত করে এবং তাদের ওপর কর আরোপ করে। এ সময় জালুত তাওরাতও ধংস করে ফেলে। বনি ইসরাইলের ইতিহাসে এটি ছিলো চরম দুঃসময় ও ক্রান্তিকাল। তাদের মধ্যে কোনো নবী-রাসুল ছিলেন না। এমনকি কোনো সর্দার ও গোত্রপতি ছিলো না। নবুওতের বংশে এক গর্ভবতী মহিলা ছাড়া অন্যকোনো সদস্যও ছিলো না। এমন অধঃপতিত ও সঙ্কটময় অবস্থাতেও মহান আল্লাহ তাদের ওপর অনুগ্রহ করেন। ফলে ওই মহিলার গর্ভ থেকে এক সন্তান ভূমিষ্ট হয়, তার নাম রাখা হয় শামাবিল। বনি ইসরাইলের জনৈক বুযুর্গ তার লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। তার থেকেই হযরত শামাবিল তাওরাত হেফজ করেন এবং দীনি শিক্ষা সমাপ্ত করেন। কালক্রমে সেই শামাবিল বনি ইসরাইলের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অবশেষে মহান আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের পদে ভূষিত করেন এবং বনি ইসরাইলের হেদায়েতের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

ঐতিহাসিকগণ বলেন, হযরত শামাবিল আ. ছিলেন হযরত হারুন আ.-এর বংশধর। তাঁর বংশপরম্পরা হলো, শামাবিল বিন হান্নাহ বিন আকির। আকিরের ঊর্ধতন পুরুষদের নাম সংরক্ষিত নেই। তবে মুকাতিল রহ.-এর বর্ণনায় এ সংযুক্তি রয়েছে, ইশমাবিল বিন বালি বিন আলকামা বিন ইয়ারখام বিন ইয়াহু বিন তাহু বিন সওফ বিন আলকামা বিন মাহেছ বিন আমুস বিন আযায়া।

ইশমাবিল একটি ইবরানি শব্দ। আরবিতে যার অনুবাদ, ইসমাইল। অধিক ব্যবহারের ফলে ইশমাবিল থেকে শামাবিলে রূপান্তরিত হয়েছে।

মোটকথা, যখন শামাবিল আ.-এর যুগেও আমালিকা জাতির আগ্রাসন ও অত্যাচার চলতে থাকে তখন বনি ইসরাইল তাঁর কাছে আবেদন পেশ করে যে, আপনি আমাদের ওপর একজন বাদশাহ (শাসক) নিযুক্ত করে দিন, যার নেতৃত্বে আমরা জালিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে দুশমনদের চাপিয়ে দেয়া মুসিবতের সমাপ্তি ঘটাবো। 'আমাদের ওপর একজন বাদশাহ নিযুক্ত করে দিন' বনি ইসরাইলের এই আবেদনের কারণ ব্যাখ্যা করে তাওরাতে এসেছে—

'আর এমন ঘটলো যে, যখন শামাবিল বৃদ্ধ হয়ে গেলেন তখন তিনি তার সন্তানদেরকে বিচারক নিযুক্ত করলেন যে, তারা ইসরাইলের ন্যায় বিচার করবে। তার প্রথম পুত্রের নাম ছিলো ইউইল। আর দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিলো ইবইয়াহ। তারা দুজন ছিলো বিরে সাবাআ-এর বিচারক। কিন্তু তাঁর পুত্রেরা পিতার পথে চললো না। বরং তারা পার্থিব লাভের অনুগামী হলো। ঘুষ নিতো এবং বিচারকার্যে পক্ষপাতিত্ব করতো। যখন সমস্ত ইসরাইলি বুযুর্গ একত্র হয়ে রাস্তায় শামাবিলের কাছে এলো এবং তাকে বললো, আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন এবং আপনার ছেলেরা আপনার পথে চলছে না, কাজেই কাউকে আমাদের বাদশাহ নিযুক্ত করুন, যিনি আমাদেরকে শাসন করবেন। যেভাবে সমস্ত গোত্রে হয়ে থাকে।'১

তাওরাতে বলা হয়েছে যে, তাদের এ প্রস্তাব শামাবিলের মনঃপূত হয় নি। তিনি তাদের বলেন, যদি কাউকে তোমাদের ওপর বাদশাহ বানিয়ে দিই তাহলে সে তোমাদের সবাইকে তার সেবক ও গোলাম বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু বনি ইসরাইলের লোকেরা তার কথা না শুনে গোঁ ধরে থাকলো। অবশেষে শামাবিল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বিনইয়ামিনের বংশের 'সাউল' [তালুত] নামের এক ব্যক্তিকে বাদশাহ নির্ধারণ করে দিলেন। তালুত ছিলেন সুন্দর চেহারা ও বিশাল দেহের অধিকারী সুপুরুষ।

সালাবি রহ. তালুতের বংশপরিচয় এভাবে দিয়েছেন, সাউল বিন কায়শ বিন উফায়ল বিন সারিদ বিন তাহুরাত বিন উফায়হ বিন উনায়স বিন বিনইয়ামিন বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম।*

কিন্তু কুরআনুল কারিম বনি ইসরাইলের উপর্যুপরি আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত শামাবিল আ.-এর যে জবাব বর্ণনা করেছে তা তাওরাতের বর্ণনা থেকে আলাদা এবং বনি ইসরাইলের অভ্যাস ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

কুরআনুল কারিমে এসেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে বাদশাহ নিযুক্ত করে দেয়ার আবেদন জানালে তিনি তাদেরকে বলেন, 'আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, যখন কাউকে তোমাদের ওপর রাজা নিযুক্ত করে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেয়া হবে, তখন তোমরা কাপুরুষ প্রমাণিত হবে এবং জিহাদ করতে অস্বীকার করবে।'

তখন বনি ইসরাইল বেশ শক্তির সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলো, 'এটা কী করে সম্ভব যে, আমরা জিহাদ করতে অস্বীকার করবো, যখন আমরা খুব ভালোভাবে জানি যে, আমাদেরকে শত্রুপক্ষ চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করেছে, তারা আমাদেরকে আমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দিয়েছে এবং আমাদের সন্তানদেরকে বন্দি করেছে?'

যখন হযরত শামাবিল আ. তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পূর্ণ করলেন তখন আল্লাহর দিকে অভিমুখী হলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে অবহিত করলেন যে, বনি ইসরাইলের আবেদন গৃহীত হয়েছে। আমি তালুতকে, যিনি বিদ্যা-বুদ্ধি ও শারীরিক শক্তি-সামর্থ্যে তোমাদের মধ্যে বিশিষ্ট, তোমাদের জন্য বাদশাহ নিযুক্ত করলাম। আল্লাহর এ সিদ্ধান্ত বনি ইসরাইলের মনঃপূত হলো না। তারা কপালে কুঞ্চন তুলে বললো, 'এ লোকটি তো গরিব। তার কোনো ধন-দৌলত নেই। সে কীভাবে আমাদের বাদশাহ হয়? আমরাই তো রাজা হওয়ার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। আমাদের মধ্য হতে কাউকে রাজা বানিয়ে দিন।'

ঐতিহাসিকগণ বলেন, দীর্ঘকাল পর্যন্ত বনি ইসরাইলের লাবির বংশে নবুওতের ধারা আর ইয়াহুদার বংশে শাসনক্ষমতা ও নেতৃত্বের ধারা চলে।*

আসছিলো। হযরত শামাবিল আ.-এর নির্দেশনায় এ সৌভাগ্য বিনইয়ামিনের বংশে চলে গেলে বনি ইসরাইলের অন্য সর্দারদের মনে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। তারা কিছুতেই ব্যাপারটিকে মেনে নিতে পারছিলো না।

বনি ইসরাইলের আজন্ম অভ্যাস হলো, যে কোনো বিষয় প্রথম প্রথম মেনে নেবে আর এরপর সময়মতো তা অস্বীকার করে বসবে। এখানেও ওই অভ্যাস কাজ করেছে। কেননা, তারা মনে করেছিলো, নিশ্চয়ই শামাবিল আমাদের মধ্য হতে কাউকে রাজা হিসেবে নির্বাচন করবেন। এ কারণে যখন তারা দেখলো যে, তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে বিনইয়ামিনের বংশ থেকে একজন গরিব অথচ শক্তিশালী ও জ্ঞানী ব্যক্তি এ সিংহাসনে আরোহণ করেছে তখন তাদের হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। তারা তখন টালবাহানা করতে শুরু করলো।

হযরত শামাবিল আ.-এর বনি ইসরাইলের এসব আপত্তি উপস্থাপনকারী সর্দারদের সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেন, 'আমি আগে থেকেই জানতাম, তোমাদের কাপুরুষতা ও কূপমণ্ডুকতা তোমাদের সাময়িক আবেগ ও ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনাকে কখনো দৃঢ় ও স্থায়ী হতে দেবে না। সময় ঘনিয়ে এলে তোমাদের এই রক্তগরম করা আবেগ বরফের মতো গলে হারিয়ে যাবে। এ কারণেই তোমরা এখন কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছো। তোমাদের ভালোভাবে জানা থাকা দরকার যে, তোমরা যে সম্পদের প্রাচুর্য ও বিত্ত-বৈভবকে শাসক হওয়ার মানদণ্ড মনে করে আছো, তা সম্পূর্ণ ভুল ও অন্তঃসারশূন্য শ্লোগান বৈ কিছু নয়।

মহান আল্লাহর কাছে একজন শাসকের ব্যক্তিগত গুণ হিসেবে জ্ঞানের শক্তি ও শারীরিক বল সবচাইতে বেশি জরুরি। কেননা, যার মধ্যে এ দুটি গুণ থাকবে, তার থেকে সুন্দর কৌশল, সুস্থ চিন্তা ও সাহসিকতার প্রকাশ ঘটবে। তোমাদের মধ্যে একমাত্র তালুতই এ সকল গুণের অধিকারী। কুরআনুল কারিমের নিম্নের আয়াতসমূহ উল্লিখিত ইতিহাসের ন্যায়ানুগ সাক্ষী-

ا أَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِي لَهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلَّا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا أَلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أُخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَأَبْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ () وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا قَالُوا أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ))

'তুমি কি মুসার পরবর্তী বনি ইসরাইল প্রধানদেরকে দেখোনি? যখন তারা তাদের নবীকে বলেছিলো, 'আমাদের জন্য এক রাজা নিযুক্ত করো যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি।' সে বললো, এটা তো হবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলে তখন তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বললো, 'আমরা যখন নিজ নিজ আবাসভূমি ও নিজেদের সন্তান-সন্ততি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে কেনো যুদ্ধ করবো না? এরপর যখন তাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলো। আর আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলো, 'আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের রাজা করেছেন।' তারা বললো, 'আমাদের ওপর তার রাজত্ব কীভাবে হবে, যখন আমরা তার থেকে রাজত্বের অধিক হকদার এবং তাকে প্রচুর ঐশ্বর্য দেয়া হয় নি।' নবী বললেন, 'আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।' আল্লাহ যাকে ইচ্ছে নিজ রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬-২৪৭]

টিকাঃ
' ফিলিস্তিনের একটি এলাকার নাম।
২. কাসাসুল আম্বিয়া
* রুহুল মা'আনি: ২/১৪২ খাযেন : ২য় খণ্ড
* রুহুল মা'আনি: ২য় খণ্ড
* তারিখে ইবনে কাসির: ২/৫
১. স্যামুয়েল: অধ্যায় ৮, আয়াত: ২৪। ও অধ্যায়: ৯
*. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ২/৬
* ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে হবে। হযরত ইয়াকুব আ.-এর এক পুত্রের নাম ছিলো লাবি। সেই পুত্রের বংশে সাধারণত ইসরাইলি নবীগণ জন্মগ্রহণ করতেন। হযরত মুসা আ. ও হারুন আ. সেই বংশেরই সন্তান। হযরত ইয়াকুব আ.-এর আরেক পুত্রের নাম ছিলো ইয়াহুদা। সাধারণত এ বংশের লোকেরাই রাজা ও সর্দার হতেন। হযরত দাউদ আ. ও সুলাইমান আ. ছিলেন এ বংশেরই সন্তান। হযরত ইয়াকুব আ.-এর অপর সন্তান বিনইয়ামিনের বংশধর হযরত তালুত যেহেতু এ দুই বংশের কোনো বংশের ছিলেন না, এ জন্য তাঁর রাজা হওয়াটা বনি ইসরাইলের অন্য সর্দাররা মেনে নিতে পারে নি।-অনুবাদক।

আইলি কাহেনের যুগ শেষ হওয়ার পর সেই কাযিদের মধ্য হতে অন্যতম কাযি শামাবিল আ.-কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত প্রদান করা হয়। তিনি তখন বনি ইসরাইলের হেদায়েত প্রদর্শনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

কোনো কোনো রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে, যখন হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর ইন্তিকালের সময় মিসর ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী রোমসাগরের পাদদেশে বসবাস করতো আমালিকা সম্প্রদায়। তাদের অত্যাচারী শাসক 'জালুত' বনি ইসরাইলকে পরাজিত করে তাদের বাড়ি-ঘর দখল করে ফেলে। এসময় সে তাদের অনেক সর্দার ও বিভিন্ন শাখাগোত্রের সম্মানিত লোকদেরকে গ্রেফতার করে সঙ্গে নিয়ে যায়। আর অন্যদেরকে পরাজিত ও লাঞ্ছিত করে এবং তাদের ওপর কর আরোপ করে। এ সময় জালুত তাওরাতও ধংস করে ফেলে। বনি ইসরাইলের ইতিহাসে এটি ছিলো চরম দুঃসময় ও ক্রান্তিকাল। তাদের মধ্যে কোনো নবী-রাসুল ছিলেন না। এমনকি কোনো সর্দার ও গোত্রপতি ছিলো না। নবুওতের বংশে এক গর্ভবতী মহিলা ছাড়া অন্যকোনো সদস্যও ছিলো না। এমন অধঃপতিত ও সঙ্কটময় অবস্থাতেও মহান আল্লাহ তাদের ওপর অনুগ্রহ করেন। ফলে ওই মহিলার গর্ভ থেকে এক সন্তান ভূমিষ্ট হয়, তার নাম রাখা হয় শামাবিল। বনি ইসরাইলের জনৈক বুযুর্গ তার লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। তার থেকেই হযরত শামাবিল তাওরাত হেফজ করেন এবং দীনি শিক্ষা সমাপ্ত করেন। কালক্রমে সেই শামাবিল বনি ইসরাইলের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অবশেষে মহান আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের পদে ভূষিত করেন এবং বনি ইসরাইলের হেদায়েতের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

ঐতিহাসিকগণ বলেন, হযরত শামাবিল আ. ছিলেন হযরত হারুন আ.-এর বংশধর। তাঁর বংশপরম্পরা হলো, শামাবিল বিন হান্নাহ বিন আকির। আকিরের ঊর্ধতন পুরুষদের নাম সংরক্ষিত নেই। তবে মুকাতিল রহ.-এর বর্ণনায় এ সংযুক্তি রয়েছে, ইশমাবিল বিন বালি বিন আলকামা বিন ইয়ারখام বিন ইয়াহু বিন তাহু বিন সওফ বিন আলকামা বিন মাহেছ বিন আমুস বিন আযায়া।

ইশমাবিল একটি ইবরানি শব্দ। আরবিতে যার অনুবাদ, ইসমাইল। অধিক ব্যবহারের ফলে ইশমাবিল থেকে শামাবিলে রূপান্তরিত হয়েছে।

মোটকথা, যখন শামাবিল আ.-এর যুগেও আমালিকা জাতির আগ্রাসন ও অত্যাচার চলতে থাকে তখন বনি ইসরাইল তাঁর কাছে আবেদন পেশ করে যে, আপনি আমাদের ওপর একজন বাদশাহ (শাসক) নিযুক্ত করে দিন, যার নেতৃত্বে আমরা জালিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে দুশমনদের চাপিয়ে দেয়া মুসিবতের সমাপ্তি ঘটাবো। 'আমাদের ওপর একজন বাদশাহ নিযুক্ত করে দিন' বনি ইসরাইলের এই আবেদনের কারণ ব্যাখ্যা করে তাওরাতে এসেছে—

'আর এমন ঘটলো যে, যখন শামাবিল বৃদ্ধ হয়ে গেলেন তখন তিনি তার সন্তানদেরকে বিচারক নিযুক্ত করলেন যে, তারা ইসরাইলের ন্যায় বিচার করবে। তার প্রথম পুত্রের নাম ছিলো ইউইল। আর দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিলো ইবইয়াহ। তারা দুজন ছিলো বিরে সাবাআ-এর বিচারক। কিন্তু তাঁর পুত্রেরা পিতার পথে চললো না। বরং তারা পার্থিব লাভের অনুগামী হলো। ঘুষ নিতো এবং বিচারকার্যে পক্ষপাতিত্ব করতো। যখন সমস্ত ইসরাইলি বুযুর্গ একত্র হয়ে রাস্তায় শামাবিলের কাছে এলো এবং তাকে বললো, আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন এবং আপনার ছেলেরা আপনার পথে চলছে না, কাজেই কাউকে আমাদের বাদশাহ নিযুক্ত করুন, যিনি আমাদেরকে শাসন করবেন। যেভাবে সমস্ত গোত্রে হয়ে থাকে।'১

তাওরাতে বলা হয়েছে যে, তাদের এ প্রস্তাব শামাবিলের মনঃপূত হয় নি। তিনি তাদের বলেন, যদি কাউকে তোমাদের ওপর বাদশাহ বানিয়ে দিই তাহলে সে তোমাদের সবাইকে তার সেবক ও গোলাম বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু বনি ইসরাইলের লোকেরা তার কথা না শুনে গোঁ ধরে থাকলো। অবশেষে শামাবিল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বিনইয়ামিনের বংশের 'সাউল' [তালুত] নামের এক ব্যক্তিকে বাদশাহ নির্ধারণ করে দিলেন। তালুত ছিলেন সুন্দর চেহারা ও বিশাল দেহের অধিকারী সুপুরুষ।

সালাবি রহ. তালুতের বংশপরিচয় এভাবে দিয়েছেন, সাউল বিন কায়শ বিন উফায়ল বিন সারিদ বিন তাহুরাত বিন উফায়হ বিন উনায়স বিন বিনইয়ামিন বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম।*

কিন্তু কুরআনুল কারিম বনি ইসরাইলের উপর্যুপরি আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত শামাবিল আ.-এর যে জবাব বর্ণনা করেছে তা তাওরাতের বর্ণনা থেকে আলাদা এবং বনি ইসরাইলের অভ্যাস ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

কুরআনুল কারিমে এসেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে বাদশাহ নিযুক্ত করে দেয়ার আবেদন জানালে তিনি তাদেরকে বলেন, 'আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, যখন কাউকে তোমাদের ওপর রাজা নিযুক্ত করে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেয়া হবে, তখন তোমরা কাপুরুষ প্রমাণিত হবে এবং জিহাদ করতে অস্বীকার করবে।'

তখন বনি ইসরাইল বেশ শক্তির সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলো, 'এটা কী করে সম্ভব যে, আমরা জিহাদ করতে অস্বীকার করবো, যখন আমরা খুব ভালোভাবে জানি যে, আমাদেরকে শত্রুপক্ষ চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করেছে, তারা আমাদেরকে আমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দিয়েছে এবং আমাদের সন্তানদেরকে বন্দি করেছে?'

যখন হযরত শামাবিল আ. তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পূর্ণ করলেন তখন আল্লাহর দিকে অভিমুখী হলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে অবহিত করলেন যে, বনি ইসরাইলের আবেদন গৃহীত হয়েছে। আমি তালুতকে, যিনি বিদ্যা-বুদ্ধি ও শারীরিক শক্তি-সামর্থ্যে তোমাদের মধ্যে বিশিষ্ট, তোমাদের জন্য বাদশাহ নিযুক্ত করলাম। আল্লাহর এ সিদ্ধান্ত বনি ইসরাইলের মনঃপূত হলো না। তারা কপালে কুঞ্চন তুলে বললো, 'এ লোকটি তো গরিব। তার কোনো ধন-দৌলত নেই। সে কীভাবে আমাদের বাদশাহ হয়? আমরাই তো রাজা হওয়ার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। আমাদের মধ্য হতে কাউকে রাজা বানিয়ে দিন।'

ঐতিহাসিকগণ বলেন, দীর্ঘকাল পর্যন্ত বনি ইসরাইলের লাবির বংশে নবুওতের ধারা আর ইয়াহুদার বংশে শাসনক্ষমতা ও নেতৃত্বের ধারা চলে।*

আসছিলো। হযরত শামাবিল আ.-এর নির্দেশনায় এ সৌভাগ্য বিনইয়ামিনের বংশে চলে গেলে বনি ইসরাইলের অন্য সর্দারদের মনে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। তারা কিছুতেই ব্যাপারটিকে মেনে নিতে পারছিলো না।

বনি ইসরাইলের আজন্ম অভ্যাস হলো, যে কোনো বিষয় প্রথম প্রথম মেনে নেবে আর এরপর সময়মতো তা অস্বীকার করে বসবে। এখানেও ওই অভ্যাস কাজ করেছে। কেননা, তারা মনে করেছিলো, নিশ্চয়ই শামাবিল আমাদের মধ্য হতে কাউকে রাজা হিসেবে নির্বাচন করবেন। এ কারণে যখন তারা দেখলো যে, তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে বিনইয়ামিনের বংশ থেকে একজন গরিব অথচ শক্তিশালী ও জ্ঞানী ব্যক্তি এ সিংহাসনে আরোহণ করেছে তখন তাদের হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। তারা তখন টালবাহানা করতে শুরু করলো।

হযরত শামাবিল আ.-এর বনি ইসরাইলের এসব আপত্তি উপস্থাপনকারী সর্দারদের সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেন, 'আমি আগে থেকেই জানতাম, তোমাদের কাপুরুষতা ও কূপমণ্ডুকতা তোমাদের সাময়িক আবেগ ও ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনাকে কখনো দৃঢ় ও স্থায়ী হতে দেবে না। সময় ঘনিয়ে এলে তোমাদের এই রক্তগরম করা আবেগ বরফের মতো গলে হারিয়ে যাবে। এ কারণেই তোমরা এখন কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছো। তোমাদের ভালোভাবে জানা থাকা দরকার যে, তোমরা যে সম্পদের প্রাচুর্য ও বিত্ত-বৈভবকে শাসক হওয়ার মানদণ্ড মনে করে আছো, তা সম্পূর্ণ ভুল ও অন্তঃসারশূন্য শ্লোগান বৈ কিছু নয়।

মহান আল্লাহর কাছে একজন শাসকের ব্যক্তিগত গুণ হিসেবে জ্ঞানের শক্তি ও শারীরিক বল সবচাইতে বেশি জরুরি। কেননা, যার মধ্যে এ দুটি গুণ থাকবে, তার থেকে সুন্দর কৌশল, সুস্থ চিন্তা ও সাহসিকতার প্রকাশ ঘটবে। তোমাদের মধ্যে একমাত্র তালুতই এ সকল গুণের অধিকারী। কুরআনুল কারিমের নিম্নের আয়াতসমূহ উল্লিখিত ইতিহাসের ন্যায়ানুগ সাক্ষী-

ا أَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِي لَهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلَّا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا أَلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أُخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَأَبْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ () وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا قَالُوا أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ))

'তুমি কি মুসার পরবর্তী বনি ইসরাইল প্রধানদেরকে দেখোনি? যখন তারা তাদের নবীকে বলেছিলো, 'আমাদের জন্য এক রাজা নিযুক্ত করো যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি।' সে বললো, এটা তো হবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলে তখন তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বললো, 'আমরা যখন নিজ নিজ আবাসভূমি ও নিজেদের সন্তান-সন্ততি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে কেনো যুদ্ধ করবো না? এরপর যখন তাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলো। আর আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলো, 'আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের রাজা করেছেন।' তারা বললো, 'আমাদের ওপর তার রাজত্ব কীভাবে হবে, যখন আমরা তার থেকে রাজত্বের অধিক হকদার এবং তাকে প্রচুর ঐশ্বর্য দেয়া হয় নি।' নবী বললেন, 'আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।' আল্লাহ যাকে ইচ্ছে নিজ রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬-২৪৭]

টিকাঃ
' ফিলিস্তিনের একটি এলাকার নাম।
২. কাসাসুল আম্বিয়া
* রুহুল মা'আনি: ২/১৪২ খাযেন : ২য় খণ্ড
* রুহুল মা'আনি: ২য় খণ্ড
* তারিখে ইবনে কাসির: ২/৫
১. স্যামুয়েল: অধ্যায় ৮, আয়াত: ২৪। ও অধ্যায়: ৯
*. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ২/৬
* ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে হবে। হযরত ইয়াকুব আ.-এর এক পুত্রের নাম ছিলো লাবি। সেই পুত্রের বংশে সাধারণত ইসরাইলি নবীগণ জন্মগ্রহণ করতেন। হযরত মুসা আ. ও হারুন আ. সেই বংশেরই সন্তান। হযরত ইয়াকুব আ.-এর আরেক পুত্রের নাম ছিলো ইয়াহুদা। সাধারণত এ বংশের লোকেরাই রাজা ও সর্দার হতেন। হযরত দাউদ আ. ও সুলাইমান আ. ছিলেন এ বংশেরই সন্তান। হযরত ইয়াকুব আ.-এর অপর সন্তান বিনইয়ামিনের বংশধর হযরত তালুত যেহেতু এ দুই বংশের কোনো বংশের ছিলেন না, এ জন্য তাঁর রাজা হওয়াটা বনি ইসরাইলের অন্য সর্দাররা মেনে নিতে পারে নি।-অনুবাদক।

আইলি কাহেনের যুগ শেষ হওয়ার পর সেই কাযিদের মধ্য হতে অন্যতম কাযি শামাবিল আ.-কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত প্রদান করা হয়। তিনি তখন বনি ইসরাইলের হেদায়েত প্রদর্শনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

কোনো কোনো রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে, যখন হযরত আল-ইয়াসাআ আ.-এর ইন্তিকালের সময় মিসর ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী রোমসাগরের পাদদেশে বসবাস করতো আমালিকা সম্প্রদায়। তাদের অত্যাচারী শাসক 'জালুত' বনি ইসরাইলকে পরাজিত করে তাদের বাড়ি-ঘর দখল করে ফেলে। এসময় সে তাদের অনেক সর্দার ও বিভিন্ন শাখাগোত্রের সম্মানিত লোকদেরকে গ্রেফতার করে সঙ্গে নিয়ে যায়। আর অন্যদেরকে পরাজিত ও লাঞ্ছিত করে এবং তাদের ওপর কর আরোপ করে। এ সময় জালুত তাওরাতও ধংস করে ফেলে। বনি ইসরাইলের ইতিহাসে এটি ছিলো চরম দুঃসময় ও ক্রান্তিকাল। তাদের মধ্যে কোনো নবী-রাসুল ছিলেন না। এমনকি কোনো সর্দার ও গোত্রপতি ছিলো না। নবুওতের বংশে এক গর্ভবতী মহিলা ছাড়া অন্যকোনো সদস্যও ছিলো না। এমন অধঃপতিত ও সঙ্কটময় অবস্থাতেও মহান আল্লাহ তাদের ওপর অনুগ্রহ করেন। ফলে ওই মহিলার গর্ভ থেকে এক সন্তান ভূমিষ্ট হয়, তার নাম রাখা হয় শামাবিল। বনি ইসরাইলের জনৈক বুযুর্গ তার লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। তার থেকেই হযরত শামাবিল তাওরাত হেফজ করেন এবং দীনি শিক্ষা সমাপ্ত করেন। কালক্রমে সেই শামাবিল বনি ইসরাইলের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অবশেষে মহান আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের পদে ভূষিত করেন এবং বনি ইসরাইলের হেদায়েতের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

ঐতিহাসিকগণ বলেন, হযরত শামাবিল আ. ছিলেন হযরত হারুন আ.-এর বংশধর। তাঁর বংশপরম্পরা হলো, শামাবিল বিন হান্নাহ বিন আকির। আকিরের ঊর্ধতন পুরুষদের নাম সংরক্ষিত নেই। তবে মুকাতিল রহ.-এর বর্ণনায় এ সংযুক্তি রয়েছে, ইশমাবিল বিন বালি বিন আলকামা বিন ইয়ারখام বিন ইয়াহু বিন তাহু বিন সওফ বিন আলকামা বিন মাহেছ বিন আমুস বিন আযায়া।

ইশমাবিল একটি ইবরানি শব্দ। আরবিতে যার অনুবাদ, ইসমাইল। অধিক ব্যবহারের ফলে ইশমাবিল থেকে শামাবিলে রূপান্তরিত হয়েছে।

মোটকথা, যখন শামাবিল আ.-এর যুগেও আমালিকা জাতির আগ্রাসন ও অত্যাচার চলতে থাকে তখন বনি ইসরাইল তাঁর কাছে আবেদন পেশ করে যে, আপনি আমাদের ওপর একজন বাদশাহ (শাসক) নিযুক্ত করে দিন, যার নেতৃত্বে আমরা জালিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে দুশমনদের চাপিয়ে দেয়া মুসিবতের সমাপ্তি ঘটাবো। 'আমাদের ওপর একজন বাদশাহ নিযুক্ত করে দিন' বনি ইসরাইলের এই আবেদনের কারণ ব্যাখ্যা করে তাওরাতে এসেছে—

'আর এমন ঘটলো যে, যখন শামাবিল বৃদ্ধ হয়ে গেলেন তখন তিনি তার সন্তানদেরকে বিচারক নিযুক্ত করলেন যে, তারা ইসরাইলের ন্যায় বিচার করবে। তার প্রথম পুত্রের নাম ছিলো ইউইল। আর দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিলো ইবইয়াহ। তারা দুজন ছিলো বিরে সাবাআ-এর বিচারক। কিন্তু তাঁর পুত্রেরা পিতার পথে চললো না। বরং তারা পার্থিব লাভের অনুগামী হলো। ঘুষ নিতো এবং বিচারকার্যে পক্ষপাতিত্ব করতো। যখন সমস্ত ইসরাইলি বুযুর্গ একত্র হয়ে রাস্তায় শামাবিলের কাছে এলো এবং তাকে বললো, আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন এবং আপনার ছেলেরা আপনার পথে চলছে না, কাজেই কাউকে আমাদের বাদশাহ নিযুক্ত করুন, যিনি আমাদেরকে শাসন করবেন। যেভাবে সমস্ত গোত্রে হয়ে থাকে।'১

তাওরাতে বলা হয়েছে যে, তাদের এ প্রস্তাব শামাবিলের মনঃপূত হয় নি। তিনি তাদের বলেন, যদি কাউকে তোমাদের ওপর বাদশাহ বানিয়ে দিই তাহলে সে তোমাদের সবাইকে তার সেবক ও গোলাম বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু বনি ইসরাইলের লোকেরা তার কথা না শুনে গোঁ ধরে থাকলো। অবশেষে শামাবিল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বিনইয়ামিনের বংশের 'সাউল' [তালুত] নামের এক ব্যক্তিকে বাদশাহ নির্ধারণ করে দিলেন। তালুত ছিলেন সুন্দর চেহারা ও বিশাল দেহের অধিকারী সুপুরুষ।

সালাবি রহ. তালুতের বংশপরিচয় এভাবে দিয়েছেন, সাউল বিন কায়শ বিন উফায়ল বিন সারিদ বিন তাহুরাত বিন উফায়হ বিন উনায়স বিন বিনইয়ামিন বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম।*

কিন্তু কুরআনুল কারিম বনি ইসরাইলের উপর্যুপরি আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত শামাবিল আ.-এর যে জবাব বর্ণনা করেছে তা তাওরাতের বর্ণনা থেকে আলাদা এবং বনি ইসরাইলের অভ্যাস ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

কুরআনুল কারিমে এসেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে বাদশাহ নিযুক্ত করে দেয়ার আবেদন জানালে তিনি তাদেরকে বলেন, 'আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, যখন কাউকে তোমাদের ওপর রাজা নিযুক্ত করে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দেয়া হবে, তখন তোমরা কাপুরুষ প্রমাণিত হবে এবং জিহাদ করতে অস্বীকার করবে।'

তখন বনি ইসরাইল বেশ শক্তির সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলো, 'এটা কী করে সম্ভব যে, আমরা জিহাদ করতে অস্বীকার করবো, যখন আমরা খুব ভালোভাবে জানি যে, আমাদেরকে শত্রুপক্ষ চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করেছে, তারা আমাদেরকে আমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দিয়েছে এবং আমাদের সন্তানদেরকে বন্দি করেছে?'

যখন হযরত শামাবিল আ. তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পূর্ণ করলেন তখন আল্লাহর দিকে অভিমুখী হলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে অবহিত করলেন যে, বনি ইসরাইলের আবেদন গৃহীত হয়েছে। আমি তালুতকে, যিনি বিদ্যা-বুদ্ধি ও শারীরিক শক্তি-সামর্থ্যে তোমাদের মধ্যে বিশিষ্ট, তোমাদের জন্য বাদশাহ নিযুক্ত করলাম। আল্লাহর এ সিদ্ধান্ত বনি ইসরাইলের মনঃপূত হলো না। তারা কপালে কুঞ্চন তুলে বললো, 'এ লোকটি তো গরিব। তার কোনো ধন-দৌলত নেই। সে কীভাবে আমাদের বাদশাহ হয়? আমরাই তো রাজা হওয়ার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। আমাদের মধ্য হতে কাউকে রাজা বানিয়ে দিন।'

ঐতিহাসিকগণ বলেন, দীর্ঘকাল পর্যন্ত বনি ইসরাইলের লাবির বংশে নবুওতের ধারা আর ইয়াহুদার বংশে শাসনক্ষমতা ও নেতৃত্বের ধারা চলে।*

আসছিলো। হযরত শামাবিল আ.-এর নির্দেশনায় এ সৌভাগ্য বিনইয়ামিনের বংশে চলে গেলে বনি ইসরাইলের অন্য সর্দারদের মনে হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। তারা কিছুতেই ব্যাপারটিকে মেনে নিতে পারছিলো না।

বনি ইসরাইলের আজন্ম অভ্যাস হলো, যে কোনো বিষয় প্রথম প্রথম মেনে নেবে আর এরপর সময়মতো তা অস্বীকার করে বসবে। এখানেও ওই অভ্যাস কাজ করেছে। কেননা, তারা মনে করেছিলো, নিশ্চয়ই শামাবিল আমাদের মধ্য হতে কাউকে রাজা হিসেবে নির্বাচন করবেন। এ কারণে যখন তারা দেখলো যে, তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে বিনইয়ামিনের বংশ থেকে একজন গরিব অথচ শক্তিশালী ও জ্ঞানী ব্যক্তি এ সিংহাসনে আরোহণ করেছে তখন তাদের হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। তারা তখন টালবাহানা করতে শুরু করলো।

হযরত শামাবিল আ.-এর বনি ইসরাইলের এসব আপত্তি উপস্থাপনকারী সর্দারদের সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেন, 'আমি আগে থেকেই জানতাম, তোমাদের কাপুরুষতা ও কূপমণ্ডুকতা তোমাদের সাময়িক আবেগ ও ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনাকে কখনো দৃঢ় ও স্থায়ী হতে দেবে না। সময় ঘনিয়ে এলে তোমাদের এই রক্তগরম করা আবেগ বরফের মতো গলে হারিয়ে যাবে। এ কারণেই তোমরা এখন কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছো। তোমাদের ভালোভাবে জানা থাকা দরকার যে, তোমরা যে সম্পদের প্রাচুর্য ও বিত্ত-বৈভবকে শাসক হওয়ার মানদণ্ড মনে করে আছো, তা সম্পূর্ণ ভুল ও অন্তঃসারশূন্য শ্লোগান বৈ কিছু নয়।

মহান আল্লাহর কাছে একজন শাসকের ব্যক্তিগত গুণ হিসেবে জ্ঞানের শক্তি ও শারীরিক বল সবচাইতে বেশি জরুরি। কেননা, যার মধ্যে এ দুটি গুণ থাকবে, তার থেকে সুন্দর কৌশল, সুস্থ চিন্তা ও সাহসিকতার প্রকাশ ঘটবে। তোমাদের মধ্যে একমাত্র তালুতই এ সকল গুণের অধিকারী। কুরআনুল কারিমের নিম্নের আয়াতসমূহ উল্লিখিত ইতিহাসের ন্যায়ানুগ সাক্ষী-

ا أَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلَا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِي لَهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلَّا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا أَلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أُخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَأَبْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ () وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا قَالُوا أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةٌ مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ))

'তুমি কি মুসার পরবর্তী বনি ইসরাইল প্রধানদেরকে দেখোনি? যখন তারা তাদের নবীকে বলেছিলো, 'আমাদের জন্য এক রাজা নিযুক্ত করো যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি।' সে বললো, এটা তো হবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলে তখন তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বললো, 'আমরা যখন নিজ নিজ আবাসভূমি ও নিজেদের সন্তান-সন্ততি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে কেনো যুদ্ধ করবো না? এরপর যখন তাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলো। আর আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলো, 'আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের রাজা করেছেন।' তারা বললো, 'আমাদের ওপর তার রাজত্ব কীভাবে হবে, যখন আমরা তার থেকে রাজত্বের অধিক হকদার এবং তাকে প্রচুর ঐশ্বর্য দেয়া হয় নি।' নবী বললেন, 'আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন।' আল্লাহ যাকে ইচ্ছে নিজ রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৬-২৪৭]

টিকাঃ
' ফিলিস্তিনের একটি এলাকার নাম।
২. কাসাসুল আম্বিয়া
* রুহুল মা'আনি: ২/১৪২ খাযেন : ২য় খণ্ড
* রুহুল মা'আনি: ২য় খণ্ড
* তারিখে ইবনে কাসির: ২/৫
১. স্যামুয়েল: অধ্যায় ৮, আয়াত: ২৪। ও অধ্যায়: ৯
*. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ২/৬
* ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে হবে। হযরত ইয়াকুব আ.-এর এক পুত্রের নাম ছিলো লাবি। সেই পুত্রের বংশে সাধারণত ইসরাইলি নবীগণ জন্মগ্রহণ করতেন। হযরত মুসা আ. ও হারুন আ. সেই বংশেরই সন্তান। হযরত ইয়াকুব আ.-এর আরেক পুত্রের নাম ছিলো ইয়াহুদা। সাধারণত এ বংশের লোকেরাই রাজা ও সর্দার হতেন। হযরত দাউদ আ. ও সুলাইমান আ. ছিলেন এ বংশেরই সন্তান। হযরত ইয়াকুব আ.-এর অপর সন্তান বিনইয়ামিনের বংশধর হযরত তালুত যেহেতু এ দুই বংশের কোনো বংশের ছিলেন না, এ জন্য তাঁর রাজা হওয়াটা বনি ইসরাইলের অন্য সর্দাররা মেনে নিতে পারে নি।-অনুবাদক।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 তাবুতে সাকিনা

📄 তাবুতে সাকিনা


বনি ইসরাইলের সেই টালবাহানা এতটাই দীর্ঘ হলো যে, তারা হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে দাবি করলো, যদি তালুতের নিযুক্তি মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে তাহলে এর সত্যায়নে আল্লাহর নিদর্শন দেখাতে হবে। হযরত শামাবিল আ. বললেন, যদি তোমরা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের সত্যায়নে কোনো প্রমাণ চাও তাহলে তোমাদের যাবতীয় সংশয় দূর করার জন্য তাও দেখানো হবে। আর তা হলো, যে বরকতময় সিন্দুক [তাবুতে সাকিনা] তোমাদের হাতছাড়া হয়ে লুণ্ঠিত হয়ে গেছে, যার মধ্যে তাওরাত এবং হযরত মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষিত ছিলো, সেটি তালুতের বদৌলতে তোমাদের হাতে ফিরে আসবে। আল্লাহর প্রজ্ঞাদীপ্ত কর্মকৌশলের কল্যাণে এমন ঘটবে যে, তোমাদের চোখের সামনে ফেরেশতারা সেটিকে উঠিয়ে আনবে এবং সেটি দ্বিতীয়বার তোমাদের নাগালে আসবে।

وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

'আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, 'তার রাজত্বের নিদর্শন হলো, তোমাদের নিকট তাবুত আসবে যাতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে চিত্তপ্রশান্তি এবং মুসা ও হারুনের বংশধররা যা রেখে গেছে, তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।' [সুরা বাকারা : ২৪৮]

হযরত শামাবিল আ.-এর এ সুসংবাদ অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। বনি ইসরাইলের সামনে আল্লাহর ফেরেশতাগণ তালুতের কাছে 'তাবুতে সাকিনা' অর্পণ করে। ফলে তাদের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা যদি হযরত শামাবিল আ.-এর এই ইলহামি সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেয় তাহলে অনাগত দিনে নিশ্চিত বিজয় ও সাফল্য তাদের পদচুম্বন করবে।

তাওরাতে 'তাবুতে সাকিনা'-এর প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই চটকদার। নিম্নে তার সারাংশ তুলে ধরা হলো-

'স্যামুয়েলের পুস্তিকায় রয়েছে, যেদিন থেকে তাবুতে সাকিনা লুণ্ঠন করে বাইতে দাজুনে রাখা হয় তারপর থেকে ফিলিস্তিনিরা প্রত্যহ এ দৃশ্য দেখতে পেতো যে, যখনই তারা ভোরবেলা তাদের উপাস্য 'দাজুন'-এর পূজা করতে যেতো, তাদের উপাস্য মূর্তিটিকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখতো। তারা সকালবেলা সেটিকে উঠিয়ে জায়গামতো রেখে দিতো।

কিন্তু রাত পেরোতেই ভোরবেলা দেখতে পেতো যে, সেটি আগের মতো মাটিতে উল্টে পড়ে আছে। আরেকটি কাণ্ড ঘটেছিলো যে, তাদের নগরীতে ইঁদুরের উপদ্রব এত বেশি বেড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের সমস্ত শস্য-ফসলাদি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। তার সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের গলগণ্ড রোগের উপদ্রব দেখা দিলো। ফলে তাদের অনেকের প্রাণহানি ঘটতে লাগলো। ফিলিস্তিনিরা যখন দেখলো যে, কিছুতেই এই বিপদসমূহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তারা অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আমাদের ওপর এত সব বিপদাপদের একমাত্র কারণ হলো সেই সিন্দুক। কাজেই সেটিকে এখনই বের করো।

ভাবনামাফিক তারা অনেক জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদদের একত্র করলো। তাদের কাছে গোটা বৃত্তান্ত উপস্থাপন করে নিষ্কৃতির উপায় প্রার্থনা করলো। জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদেরা তাদের বললেন, এর থেকে নিষ্কৃতির উপায় একটি। তা হলো, যত দ্রুত সম্ভব এ সিন্দুকটিকে বের করো। তার পন্থা হবে এমন যে, প্রথমে স্বর্ণের সাতটি ইঁদুর ও সাতটি গলগণ্ড বানানো হবে। সেগুলোকে একটি গাড়ির ওপর সিন্দুকের সঙ্গে রাখা হবে। ওই গাড়ির সঙ্গে দুটি দুগ্ধবতী গাভী বেঁধে দেয়া হবে। এরপর গাড়িকে নগরীর বাইরে নিয়ে রাস্তায় এমনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে যে, যেদিকে সেই গাভী দুটির মুখ থাকবে সেদিকে সিন্দুক নিয়ে ছুটবে।

ফিলিস্তিনিরা তাদের নির্দেশ পালন করলো। আল্লাহর কুদরত দেখুন, সেই গাভীগুলো সেদিকেই ছুটলো যেদিকে ছিলো বনি ইসরাইলিদের বসতি। অবশেষে চলতে চলতে এমন এক ক্ষেতের পাশে গিয়ে থামলো, যেখানে ইসরাইলিরা তাদের শস্য কাটছিলো। তারা সিন্দুকটিকে দেখতে পেয়ে প্রচণ্ড খুশিতে ফেটে পড়লো। তারা দৌড়ে বাইতে শামস শহরে এসে সংবাদ জানালো। তখন বাইতে ইয়ারিম-এর ইহুদিরা এসে সেটিকে সসম্মানে উঠিয়ে নিলো এবং ইন্দাব-এর গৃহে সংরক্ষণ করলো। তার গৃহটি ছিলো একটি টিলার ওপর।'১

আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার উল্লিখিত ঘটনা থেকে উদ্‌ঘাটন করেছেন যে, তাবুতে সাকিনা সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে যে বলা হয়েছে, تحمله الملائكة : [সেটিকে ফেরেশতাগণ বহন করলেন] তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর ফেরেশতাগণের পথপ্রদর্শনের কারণেই সেই গাভীগুলো সিন্দুক বহনকারী গাড়িটিকে কোনো চালক ছাড়াই অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে এসেছিলো। কুরআন ও বাইবেলের ভাষ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার জন্য উল্লিখিত ব্যাখ্যাটিকে বেশ চমৎকার মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাখ্যাটি ভুল। কুরআনুল কারিমের ভাষ্য তা সমর্থন করে না।

কারণ হলো, কুরআনুল কারিমের আলোচনার সারাংশ হলো, তাবুতে সাকিনার প্রত্যাবর্তন ছিলো তালুতের শাসক হওয়ার সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলামত। হযরত শামাবিল আ.-এর হাতে তা এমনভাবে প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ বনি ইসরাইলের চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনে তালুতের সামনে উপস্থিত করে। পক্ষান্তরে তাওরাতের ভাষ্য থেকে বুঝে আসে যে, গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া গাভীগুলো সেটিকে বাইতে শামসের সড়কে এনে ছেড়ে গিয়েছিলো। তবে এতটুকু ঘটেছিলো যে, গাভীগুলো ডানে-বামে মোড় নেয় নি। চোখ বরাবর চলতে চলতে অবশেষে বাইতে শামসের ক্ষেতগুলোর সামনে এসে থেমে পড়ে। যা ফিলিস্তিনিদের সীমান্তের বাইরে প্রথম ইসরাইলি সীমান্ত জনপদ। সেখানে এ কথাও রয়েছে যে, ফিলিস্তিনিরা সেই গাড়ির পেছনে পেছনে বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলো। যখন সেই গাড়ি বাইতে শামসের ক্ষেত পর্যন্ত এসে পড়ে তখন তারা ফিরে যায়। তাওরাতে এসেছে-

'সেই গাভীগুলো বাইতে শামসের সড়কের সোজা পথ ধরলো এবং রাজপথ ধরে চলতে লাগলো। সেগুলো চলার সময় গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিলো। এ সময় সেগুলো ডানে বা বামে মোড় নেয় নি। ফিলিস্তিনি কুতুব সেগুলোর পেছন পেছন বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত যায়। তখন বাইতে শামসের অধিবাসীরা উপত্যকায় গমের ফসল কাটছিলো। তারা চোখ তুলে উপর দিকে তাকাতেই সিন্দুক দেখতে পেলো।'২

তাওরাতের ভাষ্যমতে যে পদ্ধতিতে তাবুত হাতে এসেছে, তা কোনোভাবেই 'মুজেযা' বা 'নিদর্শন' হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তাওরাতে এ ভাষ্য রয়েছে যে, 'বাইতে দাজুন'-এর গণক তার পেছন পেছন ইসরাইলি ক্ষেত-খামারের খুব কাছাকাছি এসেছিলো। যদি তাই সত্য হতো তাহলে কুরআনুল কারিম এরজন্য এত জোরদার শব্দ প্রয়োগ করে বলতো না যে, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ : তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।

এছাড়াও কুরআনুল কারিমের আলোচনার ধরন এবং তার প্রকাশভঙ্গি সম্পর্কে যিনি সামান্য হলেও অবগত তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, যদি তাবুতে সাকিনা বাইবেলে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী প্রাপ্ত হতো তাহলে কুরআনুল কারিম সেটিকে تحمله الملائكة শব্দে ব্যক্ত করতো না; বরং تهدي به الملائكة (সিন্দুকটির ব্যাপারে ফেরেশতাগণ পথ দেখিয়েছেন) বা এ জাতীয় এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করতো, যা থেকে জানা যেতো যে, তাবুতে সাকিনা ফেরেশতাদের দেখানো পথ ধরে ইসরাইলিদের হাতে পৌছেছিলো।

আর যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া হয় যে, তাওরাতে বর্ণিত বিবরণ সঠিক, তবুও তার সারমর্ম দাঁড়াবে এই যে, যখন তাবুতে সাকিনার উপস্থিতির কারণে বাইতে দাজুনের মূর্তিটি প্রতিদিন উপুড় হয়ে পড়ে যেতো এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিন্দুকটিকে দাজুনের অঞ্চল থেকে বের করা হলো, তবে এটিও এক প্রকারের মুজেযা যা কোনো ধরনের বাহ্যিক উপকরণ ছাড়াই দাজুনের মন্দিরে প্রকাশ পেয়েছিলো। কাজেই যে ব্যক্তি এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সঠিক বলে মেনে নিতে প্রস্তুত সে ব্যক্তির জন্য تحمله الملائكة এর এই পরিষ্কার ও সরল অর্থ মেনে নিতে সমস্যা কোথায় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনেছেন।

টিকাঃ
১. স্যামুয়েল: ১. অধ্যায় ৬, আয়াত: ১২
২. স্যামুয়েল: ১, অধ্যায়: ৬, আয়াত: ১২

বনি ইসরাইলের সেই টালবাহানা এতটাই দীর্ঘ হলো যে, তারা হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে দাবি করলো, যদি তালুতের নিযুক্তি মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে তাহলে এর সত্যায়নে আল্লাহর নিদর্শন দেখাতে হবে। হযরত শামাবিল আ. বললেন, যদি তোমরা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের সত্যায়নে কোনো প্রমাণ চাও তাহলে তোমাদের যাবতীয় সংশয় দূর করার জন্য তাও দেখানো হবে। আর তা হলো, যে বরকতময় সিন্দুক [তাবুতে সাকিনা] তোমাদের হাতছাড়া হয়ে লুণ্ঠিত হয়ে গেছে, যার মধ্যে তাওরাত এবং হযরত মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষিত ছিলো, সেটি তালুতের বদৌলতে তোমাদের হাতে ফিরে আসবে। আল্লাহর প্রজ্ঞাদীপ্ত কর্মকৌশলের কল্যাণে এমন ঘটবে যে, তোমাদের চোখের সামনে ফেরেশতারা সেটিকে উঠিয়ে আনবে এবং সেটি দ্বিতীয়বার তোমাদের নাগালে আসবে।

وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

'আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, 'তার রাজত্বের নিদর্শন হলো, তোমাদের নিকট তাবুত আসবে যাতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে চিত্তপ্রশান্তি এবং মুসা ও হারুনের বংশধররা যা রেখে গেছে, তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।' [সুরা বাকারা : ২৪৮]

হযরত শামাবিল আ.-এর এ সুসংবাদ অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। বনি ইসরাইলের সামনে আল্লাহর ফেরেশতাগণ তালুতের কাছে 'তাবুতে সাকিনা' অর্পণ করে। ফলে তাদের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা যদি হযরত শামাবিল আ.-এর এই ইলহামি সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেয় তাহলে অনাগত দিনে নিশ্চিত বিজয় ও সাফল্য তাদের পদচুম্বন করবে।

তাওরাতে 'তাবুতে সাকিনা'-এর প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই চটকদার। নিম্নে তার সারাংশ তুলে ধরা হলো-

'স্যামুয়েলের পুস্তিকায় রয়েছে, যেদিন থেকে তাবুতে সাকিনা লুণ্ঠন করে বাইতে দাজুনে রাখা হয় তারপর থেকে ফিলিস্তিনিরা প্রত্যহ এ দৃশ্য দেখতে পেতো যে, যখনই তারা ভোরবেলা তাদের উপাস্য 'দাজুন'-এর পূজা করতে যেতো, তাদের উপাস্য মূর্তিটিকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখতো। তারা সকালবেলা সেটিকে উঠিয়ে জায়গামতো রেখে দিতো।

কিন্তু রাত পেরোতেই ভোরবেলা দেখতে পেতো যে, সেটি আগের মতো মাটিতে উল্টে পড়ে আছে। আরেকটি কাণ্ড ঘটেছিলো যে, তাদের নগরীতে ইঁদুরের উপদ্রব এত বেশি বেড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের সমস্ত শস্য-ফসলাদি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। তার সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের গলগণ্ড রোগের উপদ্রব দেখা দিলো। ফলে তাদের অনেকের প্রাণহানি ঘটতে লাগলো। ফিলিস্তিনিরা যখন দেখলো যে, কিছুতেই এই বিপদসমূহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তারা অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আমাদের ওপর এত সব বিপদাপদের একমাত্র কারণ হলো সেই সিন্দুক। কাজেই সেটিকে এখনই বের করো।

ভাবনামাফিক তারা অনেক জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদদের একত্র করলো। তাদের কাছে গোটা বৃত্তান্ত উপস্থাপন করে নিষ্কৃতির উপায় প্রার্থনা করলো। জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদেরা তাদের বললেন, এর থেকে নিষ্কৃতির উপায় একটি। তা হলো, যত দ্রুত সম্ভব এ সিন্দুকটিকে বের করো। তার পন্থা হবে এমন যে, প্রথমে স্বর্ণের সাতটি ইঁদুর ও সাতটি গলগণ্ড বানানো হবে। সেগুলোকে একটি গাড়ির ওপর সিন্দুকের সঙ্গে রাখা হবে। ওই গাড়ির সঙ্গে দুটি দুগ্ধবতী গাভী বেঁধে দেয়া হবে। এরপর গাড়িকে নগরীর বাইরে নিয়ে রাস্তায় এমনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে যে, যেদিকে সেই গাভী দুটির মুখ থাকবে সেদিকে সিন্দুক নিয়ে ছুটবে।

ফিলিস্তিনিরা তাদের নির্দেশ পালন করলো। আল্লাহর কুদরত দেখুন, সেই গাভীগুলো সেদিকেই ছুটলো যেদিকে ছিলো বনি ইসরাইলিদের বসতি। অবশেষে চলতে চলতে এমন এক ক্ষেতের পাশে গিয়ে থামলো, যেখানে ইসরাইলিরা তাদের শস্য কাটছিলো। তারা সিন্দুকটিকে দেখতে পেয়ে প্রচণ্ড খুশিতে ফেটে পড়লো। তারা দৌড়ে বাইতে শামস শহরে এসে সংবাদ জানালো। তখন বাইতে ইয়ারিম-এর ইহুদিরা এসে সেটিকে সসম্মানে উঠিয়ে নিলো এবং ইন্দাব-এর গৃহে সংরক্ষণ করলো। তার গৃহটি ছিলো একটি টিলার ওপর।'১

আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার উল্লিখিত ঘটনা থেকে উদ্‌ঘাটন করেছেন যে, তাবুতে সাকিনা সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে যে বলা হয়েছে, تحمله الملائكة : [সেটিকে ফেরেশতাগণ বহন করলেন] তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর ফেরেশতাগণের পথপ্রদর্শনের কারণেই সেই গাভীগুলো সিন্দুক বহনকারী গাড়িটিকে কোনো চালক ছাড়াই অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে এসেছিলো। কুরআন ও বাইবেলের ভাষ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার জন্য উল্লিখিত ব্যাখ্যাটিকে বেশ চমৎকার মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাখ্যাটি ভুল। কুরআনুল কারিমের ভাষ্য তা সমর্থন করে না।

কারণ হলো, কুরআনুল কারিমের আলোচনার সারাংশ হলো, তাবুতে সাকিনার প্রত্যাবর্তন ছিলো তালুতের শাসক হওয়ার সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলামত। হযরত শামাবিল আ.-এর হাতে তা এমনভাবে প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ বনি ইসরাইলের চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনে তালুতের সামনে উপস্থিত করে। পক্ষান্তরে তাওরাতের ভাষ্য থেকে বুঝে আসে যে, গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া গাভীগুলো সেটিকে বাইতে শামসের সড়কে এনে ছেড়ে গিয়েছিলো। তবে এতটুকু ঘটেছিলো যে, গাভীগুলো ডানে-বামে মোড় নেয় নি। চোখ বরাবর চলতে চলতে অবশেষে বাইতে শামসের ক্ষেতগুলোর সামনে এসে থেমে পড়ে। যা ফিলিস্তিনিদের সীমান্তের বাইরে প্রথম ইসরাইলি সীমান্ত জনপদ। সেখানে এ কথাও রয়েছে যে, ফিলিস্তিনিরা সেই গাড়ির পেছনে পেছনে বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলো। যখন সেই গাড়ি বাইতে শামসের ক্ষেত পর্যন্ত এসে পড়ে তখন তারা ফিরে যায়। তাওরাতে এসেছে-

'সেই গাভীগুলো বাইতে শামসের সড়কের সোজা পথ ধরলো এবং রাজপথ ধরে চলতে লাগলো। সেগুলো চলার সময় গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিলো। এ সময় সেগুলো ডানে বা বামে মোড় নেয় নি। ফিলিস্তিনি কুতুব সেগুলোর পেছন পেছন বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত যায়। তখন বাইতে শামসের অধিবাসীরা উপত্যকায় গমের ফসল কাটছিলো। তারা চোখ তুলে উপর দিকে তাকাতেই সিন্দুক দেখতে পেলো।'২

তাওরাতের ভাষ্যমতে যে পদ্ধতিতে তাবুত হাতে এসেছে, তা কোনোভাবেই 'মুজেযা' বা 'নিদর্শন' হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তাওরাতে এ ভাষ্য রয়েছে যে, 'বাইতে দাজুন'-এর গণক তার পেছন পেছন ইসরাইলি ক্ষেত-খামারের খুব কাছাকাছি এসেছিলো। যদি তাই সত্য হতো তাহলে কুরআনুল কারিম এরজন্য এত জোরদার শব্দ প্রয়োগ করে বলতো না যে, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ : তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।

এছাড়াও কুরআনুল কারিমের আলোচনার ধরন এবং তার প্রকাশভঙ্গি সম্পর্কে যিনি সামান্য হলেও অবগত তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, যদি তাবুতে সাকিনা বাইবেলে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী প্রাপ্ত হতো তাহলে কুরআনুল কারিম সেটিকে تحمله الملائكة শব্দে ব্যক্ত করতো না; বরং تهدي به الملائكة (সিন্দুকটির ব্যাপারে ফেরেশতাগণ পথ দেখিয়েছেন) বা এ জাতীয় এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করতো, যা থেকে জানা যেতো যে, তাবুতে সাকিনা ফেরেশতাদের দেখানো পথ ধরে ইসরাইলিদের হাতে পৌছেছিলো।

আর যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া হয় যে, তাওরাতে বর্ণিত বিবরণ সঠিক, তবুও তার সারমর্ম দাঁড়াবে এই যে, যখন তাবুতে সাকিনার উপস্থিতির কারণে বাইতে দাজুনের মূর্তিটি প্রতিদিন উপুড় হয়ে পড়ে যেতো এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিন্দুকটিকে দাজুনের অঞ্চল থেকে বের করা হলো, তবে এটিও এক প্রকারের মুজেযা যা কোনো ধরনের বাহ্যিক উপকরণ ছাড়াই দাজুনের মন্দিরে প্রকাশ পেয়েছিলো। কাজেই যে ব্যক্তি এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সঠিক বলে মেনে নিতে প্রস্তুত সে ব্যক্তির জন্য تحمله الملائكة এর এই পরিষ্কার ও সরল অর্থ মেনে নিতে সমস্যা কোথায় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনেছেন।

টিকাঃ
১. স্যামুয়েল: ১. অধ্যায় ৬, আয়াত: ১২
২. স্যামুয়েল: ১, অধ্যায়: ৬, আয়াত: ১২

বনি ইসরাইলের সেই টালবাহানা এতটাই দীর্ঘ হলো যে, তারা হযরত শামাবিল আ.-এর কাছে দাবি করলো, যদি তালুতের নিযুক্তি মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে তাহলে এর সত্যায়নে আল্লাহর নিদর্শন দেখাতে হবে। হযরত শামাবিল আ. বললেন, যদি তোমরা আল্লাহর এ সিদ্ধান্তের সত্যায়নে কোনো প্রমাণ চাও তাহলে তোমাদের যাবতীয় সংশয় দূর করার জন্য তাও দেখানো হবে। আর তা হলো, যে বরকতময় সিন্দুক [তাবুতে সাকিনা] তোমাদের হাতছাড়া হয়ে লুণ্ঠিত হয়ে গেছে, যার মধ্যে তাওরাত এবং হযরত মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষিত ছিলো, সেটি তালুতের বদৌলতে তোমাদের হাতে ফিরে আসবে। আল্লাহর প্রজ্ঞাদীপ্ত কর্মকৌশলের কল্যাণে এমন ঘটবে যে, তোমাদের চোখের সামনে ফেরেশতারা সেটিকে উঠিয়ে আনবে এবং সেটি দ্বিতীয়বার তোমাদের নাগালে আসবে।

وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

'আর তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন, 'তার রাজত্বের নিদর্শন হলো, তোমাদের নিকট তাবুত আসবে যাতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে চিত্তপ্রশান্তি এবং মুসা ও হারুনের বংশধররা যা রেখে গেছে, তার অবশিষ্টাংশ থাকবে; ফেরেশতাগণ তা বহন করে আনবে। তোমরা যদি মুমিন হও তবে অবশ্যই তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।' [সুরা বাকারা : ২৪৮]

হযরত শামাবিল আ.-এর এ সুসংবাদ অবশেষে বাস্তবায়িত হয়। বনি ইসরাইলের সামনে আল্লাহর ফেরেশতাগণ তালুতের কাছে 'তাবুতে সাকিনা' অর্পণ করে। ফলে তাদের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা যদি হযরত শামাবিল আ.-এর এই ইলহামি সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেয় তাহলে অনাগত দিনে নিশ্চিত বিজয় ও সাফল্য তাদের পদচুম্বন করবে।

তাওরাতে 'তাবুতে সাকিনা'-এর প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই চটকদার। নিম্নে তার সারাংশ তুলে ধরা হলো-

'স্যামুয়েলের পুস্তিকায় রয়েছে, যেদিন থেকে তাবুতে সাকিনা লুণ্ঠন করে বাইতে দাজুনে রাখা হয় তারপর থেকে ফিলিস্তিনিরা প্রত্যহ এ দৃশ্য দেখতে পেতো যে, যখনই তারা ভোরবেলা তাদের উপাস্য 'দাজুন'-এর পূজা করতে যেতো, তাদের উপাস্য মূর্তিটিকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখতো। তারা সকালবেলা সেটিকে উঠিয়ে জায়গামতো রেখে দিতো।

কিন্তু রাত পেরোতেই ভোরবেলা দেখতে পেতো যে, সেটি আগের মতো মাটিতে উল্টে পড়ে আছে। আরেকটি কাণ্ড ঘটেছিলো যে, তাদের নগরীতে ইঁদুরের উপদ্রব এত বেশি বেড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের সমস্ত শস্য-ফসলাদি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। তার সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের গলগণ্ড রোগের উপদ্রব দেখা দিলো। ফলে তাদের অনেকের প্রাণহানি ঘটতে লাগলো। ফিলিস্তিনিরা যখন দেখলো যে, কিছুতেই এই বিপদসমূহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তারা অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আমাদের ওপর এত সব বিপদাপদের একমাত্র কারণ হলো সেই সিন্দুক। কাজেই সেটিকে এখনই বের করো।

ভাবনামাফিক তারা অনেক জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদদের একত্র করলো। তাদের কাছে গোটা বৃত্তান্ত উপস্থাপন করে নিষ্কৃতির উপায় প্রার্থনা করলো। জ্যোতিষী ও জ্যোতির্বিদেরা তাদের বললেন, এর থেকে নিষ্কৃতির উপায় একটি। তা হলো, যত দ্রুত সম্ভব এ সিন্দুকটিকে বের করো। তার পন্থা হবে এমন যে, প্রথমে স্বর্ণের সাতটি ইঁদুর ও সাতটি গলগণ্ড বানানো হবে। সেগুলোকে একটি গাড়ির ওপর সিন্দুকের সঙ্গে রাখা হবে। ওই গাড়ির সঙ্গে দুটি দুগ্ধবতী গাভী বেঁধে দেয়া হবে। এরপর গাড়িকে নগরীর বাইরে নিয়ে রাস্তায় এমনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে যে, যেদিকে সেই গাভী দুটির মুখ থাকবে সেদিকে সিন্দুক নিয়ে ছুটবে।

ফিলিস্তিনিরা তাদের নির্দেশ পালন করলো। আল্লাহর কুদরত দেখুন, সেই গাভীগুলো সেদিকেই ছুটলো যেদিকে ছিলো বনি ইসরাইলিদের বসতি। অবশেষে চলতে চলতে এমন এক ক্ষেতের পাশে গিয়ে থামলো, যেখানে ইসরাইলিরা তাদের শস্য কাটছিলো। তারা সিন্দুকটিকে দেখতে পেয়ে প্রচণ্ড খুশিতে ফেটে পড়লো। তারা দৌড়ে বাইতে শামস শহরে এসে সংবাদ জানালো। তখন বাইতে ইয়ারিম-এর ইহুদিরা এসে সেটিকে সসম্মানে উঠিয়ে নিলো এবং ইন্দাব-এর গৃহে সংরক্ষণ করলো। তার গৃহটি ছিলো একটি টিলার ওপর।'১

আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার উল্লিখিত ঘটনা থেকে উদ্‌ঘাটন করেছেন যে, তাবুতে সাকিনা সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে যে বলা হয়েছে, تحمله الملائكة : [সেটিকে ফেরেশতাগণ বহন করলেন] তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর ফেরেশতাগণের পথপ্রদর্শনের কারণেই সেই গাভীগুলো সিন্দুক বহনকারী গাড়িটিকে কোনো চালক ছাড়াই অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে এসেছিলো। কুরআন ও বাইবেলের ভাষ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার জন্য উল্লিখিত ব্যাখ্যাটিকে বেশ চমৎকার মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাখ্যাটি ভুল। কুরআনুল কারিমের ভাষ্য তা সমর্থন করে না।

কারণ হলো, কুরআনুল কারিমের আলোচনার সারাংশ হলো, তাবুতে সাকিনার প্রত্যাবর্তন ছিলো তালুতের শাসক হওয়ার সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলামত। হযরত শামাবিল আ.-এর হাতে তা এমনভাবে প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ বনি ইসরাইলের চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনে তালুতের সামনে উপস্থিত করে। পক্ষান্তরে তাওরাতের ভাষ্য থেকে বুঝে আসে যে, গাড়ির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া গাভীগুলো সেটিকে বাইতে শামসের সড়কে এনে ছেড়ে গিয়েছিলো। তবে এতটুকু ঘটেছিলো যে, গাভীগুলো ডানে-বামে মোড় নেয় নি। চোখ বরাবর চলতে চলতে অবশেষে বাইতে শামসের ক্ষেতগুলোর সামনে এসে থেমে পড়ে। যা ফিলিস্তিনিদের সীমান্তের বাইরে প্রথম ইসরাইলি সীমান্ত জনপদ। সেখানে এ কথাও রয়েছে যে, ফিলিস্তিনিরা সেই গাড়ির পেছনে পেছনে বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত এসেছিলো। যখন সেই গাড়ি বাইতে শামসের ক্ষেত পর্যন্ত এসে পড়ে তখন তারা ফিরে যায়। তাওরাতে এসেছে-

'সেই গাভীগুলো বাইতে শামসের সড়কের সোজা পথ ধরলো এবং রাজপথ ধরে চলতে লাগলো। সেগুলো চলার সময় গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিলো। এ সময় সেগুলো ডানে বা বামে মোড় নেয় নি। ফিলিস্তিনি কুতুব সেগুলোর পেছন পেছন বাইতে শামসের সীমান্ত পর্যন্ত যায়। তখন বাইতে শামসের অধিবাসীরা উপত্যকায় গমের ফসল কাটছিলো। তারা চোখ তুলে উপর দিকে তাকাতেই সিন্দুক দেখতে পেলো।'২

তাওরাতের ভাষ্যমতে যে পদ্ধতিতে তাবুত হাতে এসেছে, তা কোনোভাবেই 'মুজেযা' বা 'নিদর্শন' হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তাওরাতে এ ভাষ্য রয়েছে যে, 'বাইতে দাজুন'-এর গণক তার পেছন পেছন ইসরাইলি ক্ষেত-খামারের খুব কাছাকাছি এসেছিলো। যদি তাই সত্য হতো তাহলে কুরআনুল কারিম এরজন্য এত জোরদার শব্দ প্রয়োগ করে বলতো না যে, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ : তোমাদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।

এছাড়াও কুরআনুল কারিমের আলোচনার ধরন এবং তার প্রকাশভঙ্গি সম্পর্কে যিনি সামান্য হলেও অবগত তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, যদি তাবুতে সাকিনা বাইবেলে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী প্রাপ্ত হতো তাহলে কুরআনুল কারিম সেটিকে تحمله الملائكة শব্দে ব্যক্ত করতো না; বরং تهدي به الملائكة (সিন্দুকটির ব্যাপারে ফেরেশতাগণ পথ দেখিয়েছেন) বা এ জাতীয় এমন কোনো বাক্য ব্যবহার করতো, যা থেকে জানা যেতো যে, তাবুতে সাকিনা ফেরেশতাদের দেখানো পথ ধরে ইসরাইলিদের হাতে পৌছেছিলো।

আর যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া হয় যে, তাওরাতে বর্ণিত বিবরণ সঠিক, তবুও তার সারমর্ম দাঁড়াবে এই যে, যখন তাবুতে সাকিনার উপস্থিতির কারণে বাইতে দাজুনের মূর্তিটি প্রতিদিন উপুড় হয়ে পড়ে যেতো এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিন্দুকটিকে দাজুনের অঞ্চল থেকে বের করা হলো, তবে এটিও এক প্রকারের মুজেযা যা কোনো ধরনের বাহ্যিক উপকরণ ছাড়াই দাজুনের মন্দিরে প্রকাশ পেয়েছিলো। কাজেই যে ব্যক্তি এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সঠিক বলে মেনে নিতে প্রস্তুত সে ব্যক্তির জন্য تحمله الملائكة এর এই পরিষ্কার ও সরল অর্থ মেনে নিতে সমস্যা কোথায় যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ চোখের সামনে সেটিকে উঠিয়ে এনেছেন।

টিকাঃ
১. স্যামুয়েল: ১. অধ্যায় ৬, আয়াত: ১২
২. স্যামুয়েল: ১, অধ্যায়: ৬, আয়াত: ১২

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 তালুত ও জালুতের যুদ্ধ এবং বনি ইসরাইলের পরীক্ষা

📄 তালুত ও জালুতের যুদ্ধ এবং বনি ইসরাইলের পরীক্ষা


এত টালবাহানা শেষে বনি ইসরাইলিদের নতুন কোনো আপত্তি পেশ করার সুযোগ থাকলো না। অবশেষে হযরত শামাবিল আ.-এর ইলহামপ্রসূত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালুতকে ইসরাইলিদের বাদশাহ মনোনীত করা হয়।

তালুত ক্ষমতায় আরোহণের পর বনি ইসরাইলিদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ঘোষণা জানিয়ে দেন যে, তারা যেনো ফিলিস্তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হতে প্রস্তুত থাকে। তালুতের নেতৃত্বে বনি ইসরাইলিরা রওয়ানা হলে তাদের জন্য শুরু হয় নতুন এক পরীক্ষা। তালুত চিন্তা করলেন যে, যুদ্ধ একটি নাজুক কাজ। অনেক সময় এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কাপুরুষতা বা দ্বৈত ভূমিকার খেসারত হিসেবে গোটা সৈন্যদলকে ধংস হতে হয়। এজন্য যুদ্ধের আগেই বনি ইসরাইলের এ দলটিকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যে, কোন ব্যক্তি নির্দেশ পালন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সততা ও একনিষ্ঠতার অধিকারী আর কোন ব্যক্তি এসব গুণের অধিকারী নয়।

কাজেই কাপুরুষ ও শঠ লোকদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। যাতে যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করার পূর্বেই এমন সদস্যদের আলাদা করে ফেলা যায়। কেননা, এই ময়দানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও নির্দেশ পালন। কাজেই যে ব্যক্তি সামান্য তৃষ্ণার মুহূর্তে নির্দেশের ওপর দৃঢ় থাকতে পারবে না, তার পক্ষে যুদ্ধের মতো নাজুক মুহূর্তে নির্দেশের ওপর অবিচল থাকা অসম্ভব।

দলটি একটি নদীর তীরে এসে উপনীত হলে তালুত ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা এ নদীর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি তৃপ্তিসহ পান করতে পারবে না। যে কেউ এ নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে তাকে আল্লাহর দল থেকে বের করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি নির্দেশ মান্য করবে সে দলভুক্ত থাকবে। তবে কেউ ভীষণ তৃষ্ণা বোধ করলে তার জন্য এক আঁজলা পানি নিয়ে গলা ভেজানোর অনুমতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوْتُ بِالْجُنُوْدِ قَالَ إِنَّ اللهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهْرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّيْ وَمَنْ لَّمْ يَطْعَمهُ فَإِنَّهُ مِنِّيْ إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوْا مِنْهُ إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ

‘অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনীসহ বের হলো সে তখন বললো, আল্লাহ এক নদীর দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। যে কেউ তা থেকে পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয়; আর যে কেউ তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এ ছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সে।’ এরপর অল্পসংখ্যক ব্যতীত তাঁরা সেখান থেকে পান করলো।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৪৯]

মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, ঘটনাটি জর্ডন নদীতে ঘটেছিলো।১ বুখারি শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, আমরা রাসুলের সাহাবীগণ পরস্পরকে বলাবলি করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা তালুতের অনুসারীদের সংখ্যার সমান।২

মোটকথা, ফল দাঁড়ালো এই যে, সৈন্যদল নদীর অতি নিকটস্থ হওয়ার সময় সেসকল লোক নির্দেশ অমান্য করে পানি পান করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, তালুতের মতো শক্তিশালী দেহের অধিকারী বলবান ব্যক্তি ও তার সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আমাদের নেই।

পক্ষান্তরে যেসব লোক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আমিরের নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পেরেছিলো তারা নির্ভয়ে বললো, আমরা অবশ্যই শত্রুদের মোকাবিলা করবো। কেননা, আল্লাহর কুদরতের এই প্রদর্শনী প্রায়ই ঘটে যে, ছোট দল বড় দলের উপর বিজয় লাভ করে। তবে এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, একাগ্রচিত্ততা ও দৃঢ়তা শর্ত। কুরআানুল করিমে ইরশাদ হয়েছে—

فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو اللَّهِ كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ

'সে ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করলো তখন তারা বললে, 'জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যারা বিশ্বাস করতো, আল্লাহর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে তারা বললো, 'আল্লাহর নির্দেশ কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে'! আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।' [সুরা বাকারা: ২৪৯]

অতঃপর মুজাহিদ বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান। শত্রুবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলো জালুত। লোকটি ছিলো শক্তিশালী দৈহিক কাঠামোর অধিকারী বলবান পুরুষ। তার সৈন্য ছিলো সংখ্যায়ও অধিক। মুজাহিদ বাহিনী মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ইখলাসের সঙ্গে মিনতি জানালো যে, হে আল্লাহ, আপনি শত্রুদলের পরাজয় নিশ্চিত করুন। আমাদেরকে দৃঢ় রাখুন এবং বিজয়ের সাফল্যে ভূষিত করুন।

তাওরাতসহ সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে যে, এসময় বনি ইসরাইল ছিলো জালুতের অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রভাবে ভীত। সে যখন ব্যক্তিগতভাবে লড়াই করার আমন্ত্রণ জানালো, তখন তার জবাবি আক্রমণে নেমে আসতে তারা ভীতি অনুভব করছিলো।

টিকাঃ
১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৮
২ বুখারি শরিফ, বাবুল মাগাযি

এত টালবাহানা শেষে বনি ইসরাইলিদের নতুন কোনো আপত্তি পেশ করার সুযোগ থাকলো না। অবশেষে হযরত শামাবিল আ.-এর ইলহামপ্রসূত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালুতকে ইসরাইলিদের বাদশাহ মনোনীত করা হয়।

তালুত ক্ষমতায় আরোহণের পর বনি ইসরাইলিদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ঘোষণা জানিয়ে দেন যে, তারা যেনো ফিলিস্তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হতে প্রস্তুত থাকে। তালুতের নেতৃত্বে বনি ইসরাইলিরা রওয়ানা হলে তাদের জন্য শুরু হয় নতুন এক পরীক্ষা। তালুত চিন্তা করলেন যে, যুদ্ধ একটি নাজুক কাজ। অনেক সময় এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কাপুরুষতা বা দ্বৈত ভূমিকার খেসারত হিসেবে গোটা সৈন্যদলকে ধংস হতে হয়। এজন্য যুদ্ধের আগেই বনি ইসরাইলের এ দলটিকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যে, কোন ব্যক্তি নির্দেশ পালন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সততা ও একনিষ্ঠতার অধিকারী আর কোন ব্যক্তি এসব গুণের অধিকারী নয়।

কাজেই কাপুরুষ ও শঠ লোকদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। যাতে যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করার পূর্বেই এমন সদস্যদের আলাদা করে ফেলা যায়। কেননা, এই ময়দানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও নির্দেশ পালন। কাজেই যে ব্যক্তি সামান্য তৃষ্ণার মুহূর্তে নির্দেশের ওপর দৃঢ় থাকতে পারবে না, তার পক্ষে যুদ্ধের মতো নাজুক মুহূর্তে নির্দেশের ওপর অবিচল থাকা অসম্ভব।

দলটি একটি নদীর তীরে এসে উপনীত হলে তালুত ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা এ নদীর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি তৃপ্তিসহ পান করতে পারবে না। যে কেউ এ নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে তাকে আল্লাহর দল থেকে বের করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি নির্দেশ মান্য করবে সে দলভুক্ত থাকবে। তবে কেউ ভীষণ তৃষ্ণা বোধ করলে তার জন্য এক আঁজলা পানি নিয়ে গলা ভেজানোর অনুমতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوْتُ بِالْجُنُوْدِ قَالَ إِنَّ اللهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهْرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّيْ وَمَنْ لَّمْ يَطْعَمهُ فَإِنَّهُ مِنِّيْ إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوْا مِنْهُ إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ

‘অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনীসহ বের হলো সে তখন বললো, আল্লাহ এক নদীর দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। যে কেউ তা থেকে পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয়; আর যে কেউ তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এ ছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সে।’ এরপর অল্পসংখ্যক ব্যতীত তাঁরা সেখান থেকে পান করলো।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৪৯]

মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, ঘটনাটি জর্ডন নদীতে ঘটেছিলো।১ বুখারি শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, আমরা রাসুলের সাহাবীগণ পরস্পরকে বলাবলি করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা তালুতের অনুসারীদের সংখ্যার সমান।২

মোটকথা, ফল দাঁড়ালো এই যে, সৈন্যদল নদীর অতি নিকটস্থ হওয়ার সময় সেসকল লোক নির্দেশ অমান্য করে পানি পান করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, তালুতের মতো শক্তিশালী দেহের অধিকারী বলবান ব্যক্তি ও তার সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আমাদের নেই।

পক্ষান্তরে যেসব লোক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আমিরের নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পেরেছিলো তারা নির্ভয়ে বললো, আমরা অবশ্যই শত্রুদের মোকাবিলা করবো। কেননা, আল্লাহর কুদরতের এই প্রদর্শনী প্রায়ই ঘটে যে, ছোট দল বড় দলের উপর বিজয় লাভ করে। তবে এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, একাগ্রচিত্ততা ও দৃঢ়তা শর্ত। কুরআানুল করিমে ইরশাদ হয়েছে—

فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو اللَّهِ كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ

'সে ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করলো তখন তারা বললে, 'জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যারা বিশ্বাস করতো, আল্লাহর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে তারা বললো, 'আল্লাহর নির্দেশ কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে'! আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।' [সুরা বাকারা: ২৪৯]

অতঃপর মুজাহিদ বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান। শত্রুবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলো জালুত। লোকটি ছিলো শক্তিশালী দৈহিক কাঠামোর অধিকারী বলবান পুরুষ। তার সৈন্য ছিলো সংখ্যায়ও অধিক। মুজাহিদ বাহিনী মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ইখলাসের সঙ্গে মিনতি জানালো যে, হে আল্লাহ, আপনি শত্রুদলের পরাজয় নিশ্চিত করুন। আমাদেরকে দৃঢ় রাখুন এবং বিজয়ের সাফল্যে ভূষিত করুন।

তাওরাতসহ সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে যে, এসময় বনি ইসরাইল ছিলো জালুতের অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রভাবে ভীত। সে যখন ব্যক্তিগতভাবে লড়াই করার আমন্ত্রণ জানালো, তখন তার জবাবি আক্রমণে নেমে আসতে তারা ভীতি অনুভব করছিলো।

টিকাঃ
১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৮
২ বুখারি শরিফ, বাবুল মাগাযি

এত টালবাহানা শেষে বনি ইসরাইলিদের নতুন কোনো আপত্তি পেশ করার সুযোগ থাকলো না। অবশেষে হযরত শামাবিল আ.-এর ইলহামপ্রসূত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালুতকে ইসরাইলিদের বাদশাহ মনোনীত করা হয়।

তালুত ক্ষমতায় আরোহণের পর বনি ইসরাইলিদের উদ্দেশ্যে সাধারণ ঘোষণা জানিয়ে দেন যে, তারা যেনো ফিলিস্তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হতে প্রস্তুত থাকে। তালুতের নেতৃত্বে বনি ইসরাইলিরা রওয়ানা হলে তাদের জন্য শুরু হয় নতুন এক পরীক্ষা। তালুত চিন্তা করলেন যে, যুদ্ধ একটি নাজুক কাজ। অনেক সময় এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির কাপুরুষতা বা দ্বৈত ভূমিকার খেসারত হিসেবে গোটা সৈন্যদলকে ধংস হতে হয়। এজন্য যুদ্ধের আগেই বনি ইসরাইলের এ দলটিকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যে, কোন ব্যক্তি নির্দেশ পালন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সততা ও একনিষ্ঠতার অধিকারী আর কোন ব্যক্তি এসব গুণের অধিকারী নয়।

কাজেই কাপুরুষ ও শঠ লোকদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। যাতে যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করার পূর্বেই এমন সদস্যদের আলাদা করে ফেলা যায়। কেননা, এই ময়দানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও নির্দেশ পালন। কাজেই যে ব্যক্তি সামান্য তৃষ্ণার মুহূর্তে নির্দেশের ওপর দৃঢ় থাকতে পারবে না, তার পক্ষে যুদ্ধের মতো নাজুক মুহূর্তে নির্দেশের ওপর অবিচল থাকা অসম্ভব।

দলটি একটি নদীর তীরে এসে উপনীত হলে তালুত ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা এ নদীর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। এখান থেকে কোনো ব্যক্তি তৃপ্তিসহ পান করতে পারবে না। যে কেউ এ নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে তাকে আল্লাহর দল থেকে বের করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি নির্দেশ মান্য করবে সে দলভুক্ত থাকবে। তবে কেউ ভীষণ তৃষ্ণা বোধ করলে তার জন্য এক আঁজলা পানি নিয়ে গলা ভেজানোর অনুমতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوْتُ بِالْجُنُوْدِ قَالَ إِنَّ اللهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهْرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّيْ وَمَنْ لَّمْ يَطْعَمهُ فَإِنَّهُ مِنِّيْ إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوْا مِنْهُ إِلَّا قَلِيْلًا مِّنْهُمْ

‘অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনীসহ বের হলো সে তখন বললো, আল্লাহ এক নদীর দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা নেবেন। যে কেউ তা থেকে পান করবে সে আমার দলভুক্ত নয়; আর যে কেউ তার স্বাদ গ্রহণ করবে না সে আমার দলভুক্ত; এ ছাড়া যে তার হাতে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সে।’ এরপর অল্পসংখ্যক ব্যতীত তাঁরা সেখান থেকে পান করলো।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৪৯]

মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, ঘটনাটি জর্ডন নদীতে ঘটেছিলো।১ বুখারি শরিফের একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, আমরা রাসুলের সাহাবীগণ পরস্পরকে বলাবলি করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা তালুতের অনুসারীদের সংখ্যার সমান।২

মোটকথা, ফল দাঁড়ালো এই যে, সৈন্যদল নদীর অতি নিকটস্থ হওয়ার সময় সেসকল লোক নির্দেশ অমান্য করে পানি পান করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, তালুতের মতো শক্তিশালী দেহের অধিকারী বলবান ব্যক্তি ও তার সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আমাদের নেই।

পক্ষান্তরে যেসব লোক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আমিরের নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পেরেছিলো তারা নির্ভয়ে বললো, আমরা অবশ্যই শত্রুদের মোকাবিলা করবো। কেননা, আল্লাহর কুদরতের এই প্রদর্শনী প্রায়ই ঘটে যে, ছোট দল বড় দলের উপর বিজয় লাভ করে। তবে এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, একাগ্রচিত্ততা ও দৃঢ়তা শর্ত। কুরআানুল করিমে ইরশাদ হয়েছে—

فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو اللَّهِ كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةٌ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ

'সে ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণ যখন তা অতিক্রম করলো তখন তারা বললে, 'জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি আজ আমাদের নেই। কিন্তু যারা বিশ্বাস করতো, আল্লাহর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে তারা বললো, 'আল্লাহর নির্দেশ কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছে'! আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।' [সুরা বাকারা: ২৪৯]

অতঃপর মুজাহিদ বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান। শত্রুবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলো জালুত। লোকটি ছিলো শক্তিশালী দৈহিক কাঠামোর অধিকারী বলবান পুরুষ। তার সৈন্য ছিলো সংখ্যায়ও অধিক। মুজাহিদ বাহিনী মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ইখলাসের সঙ্গে মিনতি জানালো যে, হে আল্লাহ, আপনি শত্রুদলের পরাজয় নিশ্চিত করুন। আমাদেরকে দৃঢ় রাখুন এবং বিজয়ের সাফল্যে ভূষিত করুন।

তাওরাতসহ সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে যে, এসময় বনি ইসরাইল ছিলো জালুতের অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার প্রভাবে ভীত। সে যখন ব্যক্তিগতভাবে লড়াই করার আমন্ত্রণ জানালো, তখন তার জবাবি আক্রমণে নেমে আসতে তারা ভীতি অনুভব করছিলো।

টিকাঃ
১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৮
২ বুখারি শরিফ, বাবুল মাগাযি

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম-এর বীরত্ব

📄 হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম-এর বীরত্ব


বনি ইসরাইলের সেই সৈন্যদলে একজন নওজোয়ান ছিলেন। বাহ্যত সে কোনো আহামরি ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সুখ্যাতি ছিলো না। তিনি হলেন হযরত দাউদ আ.। শ্রুতি রয়েছে, তিনি ছিলেন তাঁর পিতার কনিষ্ঠ পুত্র। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যেও তিনি আগমন করেন নি। বরং তাকে তাঁর পিতা ভাইদের ও ইসরাইলিদের অবস্থা জানতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন যে, জালুত প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের জন্য হুঙ্কার ছুঁড়ছে আর তার জবাব দিতে গিয়ে ইসরাইলিদের পা কাঁপছে। ব্যাপারটি তার কাছে অসহনীয় ঠেকলো। তিনি তালুতের কাছে জালুতের উচিত জবাব দেয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তালুত বললেন, তুমি তো অনভিজ্ঞ যুবক। কাজেই তুমি তার মুখোমুখি হতে পারবে না। কিন্তু হযরত দাউদ আ. ছিলেন তার অনুমতি প্রার্থনায় অনড়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হযরত তালুত তাকে অনুমতি প্রদান করলেন।

দাউদ আ. অগ্রসর হয়ে জালুতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। জালুত দেখতে পেলো যে, তার সঙ্গে লড়াই করতে কমবয়স্ক একজন যুবক এসেছে। সে তাঁকে তুচ্ছ ভেবে কোনো পাত্তাই দিলো না। কিন্তু পরস্পরে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জালুত বুঝলো যে, দাউদ আসলেই প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী। হযরত দাউদ আ. যুদ্ধরত অবস্থায় গাওফন১ প্রস্তুত করলেন এবং নিশানা ঠিক করে পরপর তিনটি পাথর জালুতের কপালে ছুঁড়লেন। ফলে জালুতের মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। হযরত দাউদ আ. তখন এগিয়ে এসে তার মুণ্ডু ফেলে দিলেন। জালুত নিহত হতেই রণাঙ্গনের অবস্থা বদলে গেলো। আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ইসরাইলিরা মরণপণ আক্রমণ করলো। অবশেষে তাগুতি বাহিনী পরাস্ত হলো। বনি ইসরাইলিরা বিজয়ীবেশে ফিরে এলো।

এ ঘটনার পর থেকে হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্বগাথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষ সবার মনেই তার সীমাহীন শক্তির প্রভাব গেঁথে গেলো। সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব সবাইকে গুণমুগ্ধ করলো।

যদিও কুরআনুল কারিম গোটা বিবরণ নিষ্প্রয়োজন মনে করে উল্লেখ করে নি অথবা বাস্তবেই তা সঠিক নয়, তবে এ কথার ওপর কুরআন ও তাওরাত উভয় গ্রন্থই একমত যে, জালুতের হত্যাকারী হলেন হযরত দাউদ আ. এবং জালুতের হত্যাই বনি ইসরাইলের জন্য বিজয় ও সাফল্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-

وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ )) فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ

'তারা যখন যুদ্ধার্থে জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হলো তখন তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ধৈর্য দান করো, আমাদের পা অবিচলিত রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো। সুতরাং তারা আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে পরাজিত করলো; দাউদ জালুতকে সংহার করলো, আল্লাহ তাকে হিকমত ও রাজত্ব দান করলেন এবং তিনি যা ইচ্ছে করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন।' (সুরা বাকারা: আয়াত ২৫০-২৫১]

কিছু কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় যে, তালুত দেখতে পেলেন জালুতের ভীষণ শক্তিমত্তা দেখে বনি ইসরাইল তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছে না। তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি জালুতকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তার কাছে আমি আমার কন্যাকে বিয়ে দেবো এবং তাকে রাজত্বের একাংশ দান করবো। হযরত দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করলে তালুত তার অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর সঙ্গে দাউদের কন্যার বিয়ে দিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজত্বের অংশীদার বানিয়ে নেন।১

টিকাঃ
১. গাওফন হলো গুলাল জাতীয় এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র। যা রশি দিয়ে বানানো হয়। এর মাঝে পাথর বা মাটির গুলি রেখে প্রতিপক্ষের দিকে ছোঁড়া হয়।
১. স্যামুয়েলের পুস্তিকা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৮-৯

বনি ইসরাইলের সেই সৈন্যদলে একজন নওজোয়ান ছিলেন। বাহ্যত সে কোনো আহামরি ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সুখ্যাতি ছিলো না। তিনি হলেন হযরত দাউদ আ.। শ্রুতি রয়েছে, তিনি ছিলেন তাঁর পিতার কনিষ্ঠ পুত্র। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যেও তিনি আগমন করেন নি। বরং তাকে তাঁর পিতা ভাইদের ও ইসরাইলিদের অবস্থা জানতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন যে, জালুত প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের জন্য হুঙ্কার ছুঁড়ছে আর তার জবাব দিতে গিয়ে ইসরাইলিদের পা কাঁপছে। ব্যাপারটি তার কাছে অসহনীয় ঠেকলো। তিনি তালুতের কাছে জালুতের উচিত জবাব দেয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তালুত বললেন, তুমি তো অনভিজ্ঞ যুবক। কাজেই তুমি তার মুখোমুখি হতে পারবে না। কিন্তু হযরত দাউদ আ. ছিলেন তার অনুমতি প্রার্থনায় অনড়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হযরত তালুত তাকে অনুমতি প্রদান করলেন।

দাউদ আ. অগ্রসর হয়ে জালুতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। জালুত দেখতে পেলো যে, তার সঙ্গে লড়াই করতে কমবয়স্ক একজন যুবক এসেছে। সে তাঁকে তুচ্ছ ভেবে কোনো পাত্তাই দিলো না। কিন্তু পরস্পরে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জালুত বুঝলো যে, দাউদ আসলেই প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী। হযরত দাউদ আ. যুদ্ধরত অবস্থায় গাওফন১ প্রস্তুত করলেন এবং নিশানা ঠিক করে পরপর তিনটি পাথর জালুতের কপালে ছুঁড়লেন। ফলে জালুতের মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। হযরত দাউদ আ. তখন এগিয়ে এসে তার মুণ্ডু ফেলে দিলেন। জালুত নিহত হতেই রণাঙ্গনের অবস্থা বদলে গেলো। আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ইসরাইলিরা মরণপণ আক্রমণ করলো। অবশেষে তাগুতি বাহিনী পরাস্ত হলো। বনি ইসরাইলিরা বিজয়ীবেশে ফিরে এলো।

এ ঘটনার পর থেকে হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্বগাথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষ সবার মনেই তার সীমাহীন শক্তির প্রভাব গেঁথে গেলো। সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব সবাইকে গুণমুগ্ধ করলো।

যদিও কুরআনুল কারিম গোটা বিবরণ নিষ্প্রয়োজন মনে করে উল্লেখ করে নি অথবা বাস্তবেই তা সঠিক নয়, তবে এ কথার ওপর কুরআন ও তাওরাত উভয় গ্রন্থই একমত যে, জালুতের হত্যাকারী হলেন হযরত দাউদ আ. এবং জালুতের হত্যাই বনি ইসরাইলের জন্য বিজয় ও সাফল্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-

وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ )) فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ

'তারা যখন যুদ্ধার্থে জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হলো তখন তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ধৈর্য দান করো, আমাদের পা অবিচলিত রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো। সুতরাং তারা আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে পরাজিত করলো; দাউদ জালুতকে সংহার করলো, আল্লাহ তাকে হিকমত ও রাজত্ব দান করলেন এবং তিনি যা ইচ্ছে করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন।' (সুরা বাকারা: আয়াত ২৫০-২৫১]

কিছু কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় যে, তালুত দেখতে পেলেন জালুতের ভীষণ শক্তিমত্তা দেখে বনি ইসরাইল তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছে না। তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি জালুতকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তার কাছে আমি আমার কন্যাকে বিয়ে দেবো এবং তাকে রাজত্বের একাংশ দান করবো। হযরত দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করলে তালুত তার অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর সঙ্গে দাউদের কন্যার বিয়ে দিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজত্বের অংশীদার বানিয়ে নেন।১

টিকাঃ
১. গাওফন হলো গুলাল জাতীয় এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র। যা রশি দিয়ে বানানো হয়। এর মাঝে পাথর বা মাটির গুলি রেখে প্রতিপক্ষের দিকে ছোঁড়া হয়।
১. স্যামুয়েলের পুস্তিকা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৮-৯

বনি ইসরাইলের সেই সৈন্যদলে একজন নওজোয়ান ছিলেন। বাহ্যত সে কোনো আহামরি ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সুখ্যাতি ছিলো না। তিনি হলেন হযরত দাউদ আ.। শ্রুতি রয়েছে, তিনি ছিলেন তাঁর পিতার কনিষ্ঠ পুত্র। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যেও তিনি আগমন করেন নি। বরং তাকে তাঁর পিতা ভাইদের ও ইসরাইলিদের অবস্থা জানতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন যে, জালুত প্রচণ্ড বীরত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের জন্য হুঙ্কার ছুঁড়ছে আর তার জবাব দিতে গিয়ে ইসরাইলিদের পা কাঁপছে। ব্যাপারটি তার কাছে অসহনীয় ঠেকলো। তিনি তালুতের কাছে জালুতের উচিত জবাব দেয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তালুত বললেন, তুমি তো অনভিজ্ঞ যুবক। কাজেই তুমি তার মুখোমুখি হতে পারবে না। কিন্তু হযরত দাউদ আ. ছিলেন তার অনুমতি প্রার্থনায় অনড়। অবশেষে নিরুপায় হয়ে হযরত তালুত তাকে অনুমতি প্রদান করলেন।

দাউদ আ. অগ্রসর হয়ে জালুতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। জালুত দেখতে পেলো যে, তার সঙ্গে লড়াই করতে কমবয়স্ক একজন যুবক এসেছে। সে তাঁকে তুচ্ছ ভেবে কোনো পাত্তাই দিলো না। কিন্তু পরস্পরে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জালুত বুঝলো যে, দাউদ আসলেই প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী। হযরত দাউদ আ. যুদ্ধরত অবস্থায় গাওফন১ প্রস্তুত করলেন এবং নিশানা ঠিক করে পরপর তিনটি পাথর জালুতের কপালে ছুঁড়লেন। ফলে জালুতের মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। হযরত দাউদ আ. তখন এগিয়ে এসে তার মুণ্ডু ফেলে দিলেন। জালুত নিহত হতেই রণাঙ্গনের অবস্থা বদলে গেলো। আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ইসরাইলিরা মরণপণ আক্রমণ করলো। অবশেষে তাগুতি বাহিনী পরাস্ত হলো। বনি ইসরাইলিরা বিজয়ীবেশে ফিরে এলো।

এ ঘটনার পর থেকে হযরত দাউদ আ.-এর বীরত্বগাথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষ সবার মনেই তার সীমাহীন শক্তির প্রভাব গেঁথে গেলো। সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব সবাইকে গুণমুগ্ধ করলো।

যদিও কুরআনুল কারিম গোটা বিবরণ নিষ্প্রয়োজন মনে করে উল্লেখ করে নি অথবা বাস্তবেই তা সঠিক নয়, তবে এ কথার ওপর কুরআন ও তাওরাত উভয় গ্রন্থই একমত যে, জালুতের হত্যাকারী হলেন হযরত দাউদ আ. এবং জালুতের হত্যাই বনি ইসরাইলের জন্য বিজয় ও সাফল্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-

وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ )) فَهَزَمُوهُمْ بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ

'তারা যখন যুদ্ধার্থে জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হলো তখন তারা বললো, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে ধৈর্য দান করো, আমাদের পা অবিচলিত রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো। সুতরাং তারা আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে পরাজিত করলো; দাউদ জালুতকে সংহার করলো, আল্লাহ তাকে হিকমত ও রাজত্ব দান করলেন এবং তিনি যা ইচ্ছে করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন।' (সুরা বাকারা: আয়াত ২৫০-২৫১]

কিছু কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় যে, তালুত দেখতে পেলেন জালুতের ভীষণ শক্তিমত্তা দেখে বনি ইসরাইল তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছে না। তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি জালুতকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তার কাছে আমি আমার কন্যাকে বিয়ে দেবো এবং তাকে রাজত্বের একাংশ দান করবো। হযরত দাউদ আ. জালুতকে হত্যা করলে তালুত তার অঙ্গীকার পূরণ করে তাঁর সঙ্গে দাউদের কন্যার বিয়ে দিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজত্বের অংশীদার বানিয়ে নেন।১

টিকাঃ
১. গাওফন হলো গুলাল জাতীয় এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র। যা রশি দিয়ে বানানো হয়। এর মাঝে পাথর বা মাটির গুলি রেখে প্রতিপক্ষের দিকে ছোঁড়া হয়।
১. স্যামুয়েলের পুস্তিকা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২/৮-৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00