📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 একটি সুস্থ তাফসির

📄 একটি সুস্থ তাফসির


সুরা আনআমের যে আয়াতে হযরত ইলয়াস আ.-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, সেটি মূলত হযরত নুহ ও হযরত ইবরাহিম আ.-এর বংশধর ও তার পরবর্তী প্রজন্মের নবী-রাসুলগণের সংক্ষিপ্ত তালিকা।

ইরশাদ হয়েছে- كُلًّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ () وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِنَ الصَّالِحِينَ () وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ ()

'এদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিক করেছিলাম; পূর্বে নুহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তাঁর বংশধর দাউদ, সুলাইমান ও আইয়ুব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকেও; আর এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি; এবং যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা ও ইল্ল্যাসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। এরা সকলই সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত; আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাইল, আল্-ইয়াসাআ, ইউনুস ও লুতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্বজগতের ওপর প্রত্যেককে।' [সুরা আনআম: আয়াত ৮৪-৮৬]

কুরআনুল কারিম এ তালিকায় আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মহলের আলোচনা করেছে। এর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা কী? অধিকাংশ মুফাসসিরিনে কেরাম সেই রহস্য উদ্‌ঘাটনে প্রয়াসী হয়েছেন। তাদের সকলের অভিমত সামনে রাখার পর 'আল মানার' গ্রন্থের লেখকের অভিমতটিকেই সবচেয়ে উত্তম মনে হলো।

যার সারাংশ হলো, আল্লাহ তাআলা এই স্থানে নবী ও রাসুলগণকে তিনটি পৃথক পৃথক জামাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো, বনি ইসরাইলে যত নবী প্রেরিত হয়েছেন, তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রতি তাকালে তিন ধরনের জামাত পাওয়া যাবে।

কতিপয় নবী এমন ছিলেন, যারা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, শাসক ছিলেন অথবা মন্ত্রিত্ব ও সর্দারির অধিকারী ছিলেন।

অন্যদিকে কতিপয় নবীর জীবন ছিলো এর সম্পূর্ণ উল্টো। তারা ছিলেন সম্পূর্ণ সংসারত্যাগী। রাজত্ব ও ঐশ্বর্যকে প্রত্যাখ্যান করে দীনতার জীবন বরণ করে নিয়েছিলেন।

আরেকদল নবী ছিলেন এ দু-দলের মধ্যবর্তী। তারা যেমন জাতির সিংহাসনের শোভাবর্ধনকারী মহাশাসক ছিলেন, তেমনি ছিলেন দুনিয়াত্যাগী সাধক। বরং একদিকে তারা ছিলেন জাতির জন্য সত্যের পথ প্রদর্শনকারী নবী, অপরদিকে মধ্যপন্থী জীবনের সঙ্গে তাদের ছিলো সবসময়ের সম্পর্ক।

এ কারনেই যখন কুরআনুল কারিম সেই নবী-রাসুলদের তালিকা উল্লেখ করার সময় তাদের নবুয়তপ্রাপ্তির কাল এবং সামঞ্জস্যের প্রতি লক্ষ না করে উল্লিখিত দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরকে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোতে বিভক্ত করেছে। তবে মর্যাদাগত ক্রমবিন্যাসের আলোকে নাম উল্লেখ করার নীতি পূর্ণভাবে অনুসরণ করেছে। অর্থাৎ প্রথম তালিকায় প্রথম হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আলাইহিমাস সালামের নাম উল্লেখ করেছে। তাঁরা যেমন নবী ছিলেন, সম্রাজ্যের অধিকারীও ছিলেন। তাঁদের পরে হযরত আইয়ুব ও হযরত ইউসুফ আ.-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা যদিও সম্রাজ্যের অধিকারী ছিলেন না, কিন্তু প্রথমজন একটি ছোট্ট জমিদারির অধিকারী ছিলেন।

আর দ্বিতীয়জন তৎকালীন মিসর সরকারের একজন স্বাধীন মন্ত্রী ছিলেন। তাঁদের পরে এসেছে হযরত মুসা আ. ও হযরত হারুন আ.-এর নাম। তাঁরা কোনো বড় সম্রাজ্যের অধিকারী ছিলেন না, কোনো ছোটখাট জমিদারিও তাঁদের ছিলো না, অথবা তাঁরা কোনো প্রশাসনের মন্ত্রী বা সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন না। বরং তাঁরা ছিলেন জাতির জন্য নবী ও রাসুল, পাশাপাশি তাঁরা ছিলেন জাতির সর্দার।

দ্বিতীয় তালিকায় সেসকল আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের নাম এসেছে, যাঁরা গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ও সংসারত্যাগী অবস্থায়। তাঁরা যেমন বসবাসের উদ্দেশে কোনো গৃহ নির্মাণ করেন নি, তদ্রূপ পানাহারের বস্তুও সঞ্চয় করেন নি। সারাদিন তাঁরা দীনের দাওয়াতে ব্যস্ত থাকতেন আর রাতভর আল্লাহর যিকির করার পর যেখানেই সুযোগ পেতেন, মাথার নিচে হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। হযরত ইয়াহইয়া, যাকারিয়া, ঈসা ও ইলয়াস আলাইহিমুস সালাম ছিলেন এক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও সুখ্যাতির অধিকারী মহান নবী।

তৃতীয় তালিকায় এসেছে সেই মহান নবীদের নাম, যাঁরা রাজত্ব কিংবা সিংহাসনেও আরোহণ করেন নি, আবার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে দুনিয়াত্যাগী জীবনও বরণ করেন নি। বরং তাঁরা ছিলেন এ দুটির মধ্যবর্তী জীবনের অধিকারী। এভাবেই তাঁরা দীনের তাবলিগের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। হযরত ইসমাইল, আল-ইয়াসাআ, ইউনুস ও লুত আলাইহিমুস সালাম ছিলেন সেই মধ্যপন্থী জীবনের অধিকারী।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও উপদেশ

📄 শিক্ষা ও উপদেশ


হযরত ইলয়াস আ. ও তাঁর জাতির আলোচনা যদিও কুরআনুল কারিমে খুবই সংক্ষেপে এসেছে, তারপরও তাদের ইতিহাস থেকে অন্তত এতটুকু শিক্ষা অর্জিত হয় যে, বনি ইসরাইলের ইহুদিদের মানসিকতা এতটাই বিকৃত ছিলো যে, দুনিয়ার হেনো মন্দ কাজ নেই, যা করতে তাদের মন লালায়িত ছিলো না। এর বিপরীতে কোনো ভালো কাজের প্রতি তাদের পাপী মন উৎসাহবোধ করতো না। নবী ও রাসুলের আগমনের ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও মূর্তিপূজা, বস্তুপূজা, নক্ষত্রপূজা মোটকথা গায়রুল্লাহর উপাসনার এমন কোনো ক্ষেত্র অবশিষ্ট ছিলো না, যার সামনে তারা মাথা নত না করে থেকেছে।

কুরআনুল কারিমে আলোচিত বনি ইসরাইলের ইতিহাস যেভাবে তাদের দুশ্চরিত্রতা ও মানসিক বক্রতাকে ফুটিয়ে তুলেছে, তার সঙ্গে আমাদেরকেও এ শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করতে আহান জানিয়েছে যে, এখন যদিও নবী ও রাসুলদের আগমনের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে গেছে এবং শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন ও কুরআনুল কারিমের অবতরণ সেই ধারাবাহিকতার গতিপথ রুদ্ধ করে দিয়েছে, কাজেই এখন আমাদের অনিবার্য দায়িত্ব হলো, বনি ইসরাইলের বিকৃত প্রকৃতি ও ধ্বংসাত্মক মানসিকতার বিরুদ্ধে গিয়ে আল্লাহর আহকাম দৃঢ়তার সঙ্গে আঁকড়ে ধরা।

এক্ষেত্রে কোনোভাবেই খোদাদ্রোহিতা ও মানসিক বক্রতার শিকার হওয়া যাবে না। এমনকি তা কল্পনা করার দুঃসাহসও দেখানো যাবে না। কাজেই আমাদের স্বভাব হতে হবে, আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পন। অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান কোনোভাবেই কাম্য নয়। এরই নাম ইসলাম। ইসলামের এই একটাই অর্থ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00