📄 নবুয়ত লাভ
মুফাসসিরিনে কেরাম ও ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে একমত যে, হযরত ইলয়াস আ. শামদেশের অধিবাসীদের হেদায়েতের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। বা'লাবাক্কা নামের প্রসিদ্ধ শহরটি ছিলো তাঁর রিসালাত ও হেদায়েতের কেন্দ্রভূমি।
হযরত ইলয়াস আ.-এর জাতি প্রসিদ্ধ মূর্তি 'বা'ল'-এর উপাসনা করতো। তাওহিদের শিক্ষা বেমালুম ভুলে গিয়ে তারা শিরকে লিপ্ত হয়েছিলো। আল্লাহর এ মহান নবী তাদেরকে বুঝান এবং হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করেন। মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রপূজার বিরুদ্ধে ওয়ায-নসিহত করে একনিষ্ঠ তাওহিদের দিকে আহবান করেন।
📄 হযরত ইলয়াস আলাইহিস সালাম-এর জাতি ও বা’ল দেবতা
বা'ল দেবতা ছিলো পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী বিভিন্ন সামি সম্প্রদায়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় দেবতা। এটি ছিলো পুরুষ দেবতা। তার স্ত্রী মনে করা হতো যুহাল অথবা মুশতারি দেবীকে।
ফাইনিকি, কিনআনি, মু-আবি এবং মাদয়ানি গোত্রগুলো বিশেষভাবে তার পূজা করতো। এ-কারণে প্রাচীন যুগ থেকেই এই বা'ল দেবতার পূজা চলে আসছিলো। মু-আবি ও মাদয়ানিরা হযরত মুসা আ.-এর যুগ থেকেই এই দেবতার পূজা করে আসছিলো। শামদেশের প্রসিদ্ধ নগরী বা'লাবাক্কার' নাম রাখা হয় সেই দেবতার নামের সঙ্গে মিলিয়ে। মাদয়ান নগরীতে এই দেবতার পূজারীদের হেদায়েতের জন্য হযরত শুয়াইব আ. প্রেরিত হন। কিছু কিছু ইতিহাসবিদের ধারণা, হিজায অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মূর্তি 'হুবাল'-ই হলো ওই 'বা'ল' দেবতা।
বা'ল দেবতার বড়ত্ব তাদের মনে এতটাই গেঁথে গিয়েছিলো যে, তারা এ দেবতাকে অসংখ্য বদান্যতার অধিকারী বিশ্বাস করে আরো অনেকগুলো নাম দিয়েছিলো। তাওরাতে সামি জাতিগুলোর পূজ্য দেবতা হিসেবে 'বা'ল'-এর নাম বলা হয়েছে, بعل بریٹ [বা'লে বারিস] ও بعل فغور [বা'লে ফাগুর]। আকরুনি জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা তাকে স্মরণ করতো بعل زبوب [বা'লে যাবুব] নামে। কালদানি গোষ্ঠীর লোকেরা উচ্চারণ করতো বি'ল [বা বর্ণে যের দিয়ে]। এছাড়াও তারা بیل [বিল] بیلوس [বিলুস] এবং بعل [বি'ল] بعلوس [বি'লুস ও বলতো।
সামি ও ইবরানি ভাষায় بعل শব্দের অর্থ হলো, মালিক, সর্দার, শাসক ও প্রভু। এ কারণে আরবের লোকেরা স্বামীকে بعل বলে থাকেন। কিন্তু যখন এ শব্দের শুরুতে الف لام [আলিফ লাম] আসে অথবা তাকে কোনো বস্তুর দিকে اضافت [যুক্ত বর্ণ] হিসেবে বলা হয়, তখন তার দ্বারা শুধু দেবতা ও উপাস্য অর্থই উদ্দেশ্য হয়।
ইয়াহুদের ও পূর্বাঞ্চলীয় ইসরাইলিরা বা'ল দেবতার অর্চনা করার জন্য বিভিন্ন মৌসূমে বিশাল আকারে সভার আয়োজন করতো। তার জন্য বিশাল আকারের বেদী নির্মাণ করতো। জ্যোতিষীরা সেটির ওপর লোবানের ধোঁয়া দিয়ে বিভিন্ন রকমের সুগন্ধি মেখে দিতো। কখনো কখনো বেদীতে নরবলিও দিতো।*
তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত রয়েছে যে, বা'ল দেবতা ছিলো স্বর্ণনির্মিত। তার উচ্চতা ছিলো বিশ গজ। তার চারটি মুখ ছিলো। তার সেবা করার জন্য চারশো সেবক নিযুক্ত ছিলো।৩
হযরত ইলয়াস আ.-এর যুগেও ইয়ামান ও শামদেশে এই বা'ল দেবতাই সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলো। তাঁর জাতির লোকেরা অন্যান্য দেবতার সঙ্গে বিশেষভাবে এই মূর্তিটির পূজা-অর্চনা করতো। হযরত ইলয়াস আ.-এর আলোচনার সূত্র ধরে কুরআনুল কারিমে এ মূর্তিটির আলোচনাও উঠে এসেছে।
ইরশাদ হয়েছে- وَإِنَّ إِلْيَاسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ () إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَلَّا تَتَّقُونَ () أَتَدْعُونَ بَعْلًا وَتَذَرُونَ أَحْسَنَ الْخَالِقِينَ () اللَّهَ رَبَّكُمْ وَرَبَّ آبَائِكُمُ الْأَوَّلِينَ () فَكَذَّبُوهُ فَإِنَّهُمْ لَمُحْضَرُونَ () إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ () وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ () سَلَامٌ عَلَى إِنْ يَأْسِينَ ) إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ () إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ () وَإِنَّ لُوطًا لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ))
'ইল্যাসও ছিলো রাসুলদের একজন। স্মরণ করো, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, 'তোমরা কি সাবধান হবে না? তোমরা কি বা'লকে ডাকবে আর শ্রেষ্ঠ স্রষ্টাকে ছেড়ে দেবে আল্লাহকে, যিনি প্রতিপালক তোমাদের, প্রতিপালক তোমাদের পূর্বপুরুষদের।' কিন্তু তারা তাদের মিথ্যাবাদী বলেছিলো। কাজেই তাদেরকে অবশ্যই শাস্তির জন্য উপস্থিত করা হবে। তবে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের কথা ভিন্ন। আমি তা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। ইল্যাসীনের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। সে ছিলো আমার মুমিন বান্দাদের একজন।' [সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১২৩-১৩০]
টিকাঃ
'বর্তমানে লেবাননে।
* দায়েরাতুল মা'আরিফ আল বুসতানি: ৫
৩. রূহুল মা'আনি: ২৩/৬২৭
* ইলইয়াসীন আ.-এর আরেক নাম ইলয়াস আ.।
📄 একটি সুস্থ তাফসির
সুরা আনআমের যে আয়াতে হযরত ইলয়াস আ.-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, সেটি মূলত হযরত নুহ ও হযরত ইবরাহিম আ.-এর বংশধর ও তার পরবর্তী প্রজন্মের নবী-রাসুলগণের সংক্ষিপ্ত তালিকা।
ইরশাদ হয়েছে- كُلًّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ () وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِنَ الصَّالِحِينَ () وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ ()
'এদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিক করেছিলাম; পূর্বে নুহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তাঁর বংশধর দাউদ, সুলাইমান ও আইয়ুব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকেও; আর এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি; এবং যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা ও ইল্ল্যাসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। এরা সকলই সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত; আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাইল, আল্-ইয়াসাআ, ইউনুস ও লুতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্বজগতের ওপর প্রত্যেককে।' [সুরা আনআম: আয়াত ৮৪-৮৬]
কুরআনুল কারিম এ তালিকায় আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মহলের আলোচনা করেছে। এর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা কী? অধিকাংশ মুফাসসিরিনে কেরাম সেই রহস্য উদ্ঘাটনে প্রয়াসী হয়েছেন। তাদের সকলের অভিমত সামনে রাখার পর 'আল মানার' গ্রন্থের লেখকের অভিমতটিকেই সবচেয়ে উত্তম মনে হলো।
যার সারাংশ হলো, আল্লাহ তাআলা এই স্থানে নবী ও রাসুলগণকে তিনটি পৃথক পৃথক জামাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো, বনি ইসরাইলে যত নবী প্রেরিত হয়েছেন, তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রতি তাকালে তিন ধরনের জামাত পাওয়া যাবে।
কতিপয় নবী এমন ছিলেন, যারা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, শাসক ছিলেন অথবা মন্ত্রিত্ব ও সর্দারির অধিকারী ছিলেন।
অন্যদিকে কতিপয় নবীর জীবন ছিলো এর সম্পূর্ণ উল্টো। তারা ছিলেন সম্পূর্ণ সংসারত্যাগী। রাজত্ব ও ঐশ্বর্যকে প্রত্যাখ্যান করে দীনতার জীবন বরণ করে নিয়েছিলেন।
আরেকদল নবী ছিলেন এ দু-দলের মধ্যবর্তী। তারা যেমন জাতির সিংহাসনের শোভাবর্ধনকারী মহাশাসক ছিলেন, তেমনি ছিলেন দুনিয়াত্যাগী সাধক। বরং একদিকে তারা ছিলেন জাতির জন্য সত্যের পথ প্রদর্শনকারী নবী, অপরদিকে মধ্যপন্থী জীবনের সঙ্গে তাদের ছিলো সবসময়ের সম্পর্ক।
এ কারনেই যখন কুরআনুল কারিম সেই নবী-রাসুলদের তালিকা উল্লেখ করার সময় তাদের নবুয়তপ্রাপ্তির কাল এবং সামঞ্জস্যের প্রতি লক্ষ না করে উল্লিখিত দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরকে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোতে বিভক্ত করেছে। তবে মর্যাদাগত ক্রমবিন্যাসের আলোকে নাম উল্লেখ করার নীতি পূর্ণভাবে অনুসরণ করেছে। অর্থাৎ প্রথম তালিকায় প্রথম হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আলাইহিমাস সালামের নাম উল্লেখ করেছে। তাঁরা যেমন নবী ছিলেন, সম্রাজ্যের অধিকারীও ছিলেন। তাঁদের পরে হযরত আইয়ুব ও হযরত ইউসুফ আ.-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা যদিও সম্রাজ্যের অধিকারী ছিলেন না, কিন্তু প্রথমজন একটি ছোট্ট জমিদারির অধিকারী ছিলেন।
আর দ্বিতীয়জন তৎকালীন মিসর সরকারের একজন স্বাধীন মন্ত্রী ছিলেন। তাঁদের পরে এসেছে হযরত মুসা আ. ও হযরত হারুন আ.-এর নাম। তাঁরা কোনো বড় সম্রাজ্যের অধিকারী ছিলেন না, কোনো ছোটখাট জমিদারিও তাঁদের ছিলো না, অথবা তাঁরা কোনো প্রশাসনের মন্ত্রী বা সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন না। বরং তাঁরা ছিলেন জাতির জন্য নবী ও রাসুল, পাশাপাশি তাঁরা ছিলেন জাতির সর্দার।
দ্বিতীয় তালিকায় সেসকল আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের নাম এসেছে, যাঁরা গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ও সংসারত্যাগী অবস্থায়। তাঁরা যেমন বসবাসের উদ্দেশে কোনো গৃহ নির্মাণ করেন নি, তদ্রূপ পানাহারের বস্তুও সঞ্চয় করেন নি। সারাদিন তাঁরা দীনের দাওয়াতে ব্যস্ত থাকতেন আর রাতভর আল্লাহর যিকির করার পর যেখানেই সুযোগ পেতেন, মাথার নিচে হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। হযরত ইয়াহইয়া, যাকারিয়া, ঈসা ও ইলয়াস আলাইহিমুস সালাম ছিলেন এক্ষেত্রে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও সুখ্যাতির অধিকারী মহান নবী।
তৃতীয় তালিকায় এসেছে সেই মহান নবীদের নাম, যাঁরা রাজত্ব কিংবা সিংহাসনেও আরোহণ করেন নি, আবার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে দুনিয়াত্যাগী জীবনও বরণ করেন নি। বরং তাঁরা ছিলেন এ দুটির মধ্যবর্তী জীবনের অধিকারী। এভাবেই তাঁরা দীনের তাবলিগের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। হযরত ইসমাইল, আল-ইয়াসাআ, ইউনুস ও লুত আলাইহিমুস সালাম ছিলেন সেই মধ্যপন্থী জীবনের অধিকারী।
📄 শিক্ষা ও উপদেশ
হযরত ইলয়াস আ. ও তাঁর জাতির আলোচনা যদিও কুরআনুল কারিমে খুবই সংক্ষেপে এসেছে, তারপরও তাদের ইতিহাস থেকে অন্তত এতটুকু শিক্ষা অর্জিত হয় যে, বনি ইসরাইলের ইহুদিদের মানসিকতা এতটাই বিকৃত ছিলো যে, দুনিয়ার হেনো মন্দ কাজ নেই, যা করতে তাদের মন লালায়িত ছিলো না। এর বিপরীতে কোনো ভালো কাজের প্রতি তাদের পাপী মন উৎসাহবোধ করতো না। নবী ও রাসুলের আগমনের ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও মূর্তিপূজা, বস্তুপূজা, নক্ষত্রপূজা মোটকথা গায়রুল্লাহর উপাসনার এমন কোনো ক্ষেত্র অবশিষ্ট ছিলো না, যার সামনে তারা মাথা নত না করে থেকেছে।
কুরআনুল কারিমে আলোচিত বনি ইসরাইলের ইতিহাস যেভাবে তাদের দুশ্চরিত্রতা ও মানসিক বক্রতাকে ফুটিয়ে তুলেছে, তার সঙ্গে আমাদেরকেও এ শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করতে আহান জানিয়েছে যে, এখন যদিও নবী ও রাসুলদের আগমনের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে গেছে এবং শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন ও কুরআনুল কারিমের অবতরণ সেই ধারাবাহিকতার গতিপথ রুদ্ধ করে দিয়েছে, কাজেই এখন আমাদের অনিবার্য দায়িত্ব হলো, বনি ইসরাইলের বিকৃত প্রকৃতি ও ধ্বংসাত্মক মানসিকতার বিরুদ্ধে গিয়ে আল্লাহর আহকাম দৃঢ়তার সঙ্গে আঁকড়ে ধরা।
এক্ষেত্রে কোনোভাবেই খোদাদ্রোহিতা ও মানসিক বক্রতার শিকার হওয়া যাবে না। এমনকি তা কল্পনা করার দুঃসাহসও দেখানো যাবে না। কাজেই আমাদের স্বভাব হতে হবে, আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পন। অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান কোনোভাবেই কাম্য নয়। এরই নাম ইসলাম। ইসলামের এই একটাই অর্থ।