📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 উপদেশ ও শিক্ষা

📄 উপদেশ ও শিক্ষা


হযরত হিযকিল আ. ও বনি ইসরাইল-সম্পর্কিত উল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে যে শিক্ষা ও উপদেশ অর্জিত হয়, যার দিকে দৃষ্টিপাত করতেই এ আহবান, তা নিম্নরূপ:

১. ব্যক্তির মানসিকতা যদি সুস্থ হয়, তার প্রকৃতি যদি ন্যায়নিষ্ঠ হয়, তাহলে তার হেদায়েত ও শিক্ষগ্রহণের জন্য শুধু একটি বার চিন্তা-ভাবনাকে বাস্তবমুখী করে দেয়াই যথেষ্ট। তখন তার মন মানুষ নিজ থেকেই সরল পথের পথিক হয়ে যাবে এবং অভীষ্ট লক্ষ্যের খোঁজ পেয়ে যাবে। কিন্তু যদি বাইরের বিভিন্ন কারণের প্রেক্ষিতে মানবপ্রকৃতিতে একটা অসুস্থ মানসিকতা অসুস্থ সৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে তাকে সুস্থ করার জন্য, বহুতাকে দূর করার জন্য বারবার আল্লাহর আহ্বান এসে তাকে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু প্রতিটি বার দেখা যাবে যে, তার যোগ্যতা ও সক্ষমতার শক্তি পূর্বাপেক্ষা নিস্তেজ হতে চলেছে। বরং সে আগের চেয়েও অধিকতর গাফলতির শিকার হয়ে পড়ে। এভাবে একসময় তার শক্তি ও যোগ্যতা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপরও ওই লোক যখন ওই স্তরে নেমে যায়, যার কথা কুরআনে কারিম এভাবে বর্ণনা করেছে— خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ أَسْمَاعِهِمْ وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ ‘আল্লাহ তাদের হৃদয় ও কর্ণ মোহর করে দিয়েছেন, তাদের দৃষ্টিশক্তির ওপর আবরণ রয়েছে।’ [সুরা বাকারা : আয়াত ৭] তখন তার ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসে। সে চিরদিনের জন্য তার পথ ও কেন্দ্রের পারে হয়ে যায়। তার উদ্দেশে তখন নিম্নের এই ঘোষণা উচ্চারিত হয়— ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُو بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ ‘তারা লাঞ্ছনা- ও দরিদ্রতাগ্রস্ত হলো এবং আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত হলো।’ [সুরা বাকারা : আয়াত ৬১]

বনি ইসরাইলের ক্রমাগত অবাধ্যতা এবং আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিদ্রোহ তাদের ক্রমক্ষয়কে দ্বিতীয় পথে ঠেলে দিয়েছিল। হযরত হিযকিল আ.-এর যুগেও তারা তাদের মননপথের পঙ্কিলতা পূর্ণ করতেই ব্যস্ত ছিলো। তা সত্ত্বেও তাদের খুবই ক্ষুদ্র একটি দল নবী-রাসূলদের দেখানো পথের যাত্রী হয়ে সত্য ও হেদায়েতের সামনে অবনত মস্তক ছিলো। পথে বিভিন্ন বিভ্রান্তি ও পদস্খলন সত্ত্বেও তারা কোনোমতে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর অবস্থান করছিলো।

২। জিহাদ যদি জাতির কিছু সদস্যের জন্য মৃত্যুবরণয়ানা হয়ে তাদেরকে পার্থিব বিভিন্ন স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে দেয় কিন্তু তা জাতির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সঞ্জীবনী সুধা হয়ে রয় তবে। জাতীয়তা ও স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখার এটাই একমাত্র রক্ষাকবচ। সঙ্গে সঙ্গে যারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তাদের জন্য জিহাদ হলো ক্ষণস্থায়ী জীবনের বিনিময়ে চিরসবুজ ও শাশ্বত সুখময় জীবনপ্রাপ্তির একমাত্র ফটক। এটিই মৃত্যুর সেই দর্শন, যা মুসলমানদের জীবনকে অন্য জাতিদের থেকে এমনভাবে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে যে, আল্লাহর পতাকা সমুন্নতকারী মানুষ যদি পার্থিব জীবনে সফল থাকে তাহলে সে হয় বীর গাজি ও মুজাহিদ। আর যদি মৃত্যুর সুধা পান করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার নাম লেখা হয় মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদদের তালিকায়। ইরশাদ হয়েছে—

وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَّا تَشْعُرُونَ )

'আল্লাহর পথে যারা নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করতে পারো না।' [সুরা বাকারা: আয়াত ১৫৪]

আর সে কারণেই যারা জিহাদের জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ায়, তাদের উদ্দেশ্যে নিম্নের ক্রোধবার্তা উচ্চারিত হয়েছে—

وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ ()

'সেদিন যুদ্ধকৌশল অবলম্বন কিংবা দলে স্থান গ্রহণ ব্যতীত কেউ তাদেরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে আল্লাহর বিরাগভাজন হবে। তার শেষ ঠিকানা জাহান্নাম। যা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।' [সুরা আনফাল: আয়াত ১৬]

৩। ইসলাম বীরত্বকে প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য ও কাপুরুষতাকে নিন্দনীয় স্বভাব গণ্য করে। একটি হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন পাপাচারের তালিকা পেশ করে ইরশাদ করেছেন, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ভুলক্রমে এসব পাপাচার ঘটে যেতে পারে। কিন্তু ইসলামের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই কাপুরুষতা একত্র হতে পারে না। কিন্তু মনে রাখবে, কারো ওপর অন্যায়ভাবে শক্তি প্রদর্শন করাকে বীরত্ব বলে না। বরং সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং বাতিল থেকে নির্ভয় হওয়ার নামই হলো বীরত্ব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00