📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মৃত ব্যক্তির পুনরুজ্জীবন

📄 মৃত ব্যক্তির পুনরুজ্জীবন


সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মাযহাব অনুসারে আমরা আমাদের উল্লিখিত আলোচনা পেশ করেছি।

ইবনে কাসির রহ. বলেন, মৃত ব্যক্তিকে পুনরুজ্জীবনের ঘটনাটি ওই সকল লোককে শিক্ষা দেয়ার জন্য ঘটেছিলো যারা কিয়ামতের দিন মৃতদেহের পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে। কেননা, বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন একদল মুশরিকও ছিলো, যারা মৃতদেহের পুনরুত্থানকে মেনে নিতে পারতো না।

যদিও আমরা ইতোপূর্বে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি, তারপরও এখানে কিছুটা খোলাসা করার প্রয়োজন বোধ করছি। আধ্যাত্মিকতা (Spiritualism) বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, 'রূহ' দেহ থেকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টি। একটি দেহ যদি পচে-গলেও যায় এবং তার উপাদানগত সংযুক্ত কাঠামো যদি শতধা বিচ্ছিন্ন হয়েও যায়, তারপরও রূহ জীবিত থাকে। দ্বিতীয়ত, এ বিষয় অবশ্যই যৌক্তিক যে, যে মহান সত্তা কোনো বস্তুকে সংযুক্ত কাঠামো দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সংযুক্ত কাঠামো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর তাকে দ্বিতীয়বার সংযুক্ত করতে সক্ষম। কাজেই রূহের জীবিত থাকা এবং দেহের সংযুক্ত কাঠামোর অংশগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পুনরায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি যখন যুক্তিসম্মত, তখন মৃতদেহের পুনরুত্থানকে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। তা কখনো কখনো বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে নবী-রাসুলদের বক্তব্য সত্য প্রমাণিত করার প্রয়োজনে, তাদের আহবানের সমর্থনে এই দুনিয়াতেও মুজেযা আকারে সংঘটিত হয়।

এখানে কারো কারো মনে এ সংশয় সৃষ্টি হতে পারে যে, পার্থিব জীবনের সাধারণ নিয়ম অনুসারে কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার জীবন পেতে পারে না এবং কিয়ামত দিবসেই মৃতদেহের পুনরুত্থানের ঘটনাটি ঘটবে। তাহলে কী করে বনি ইসরাইলের ওই বিশেষ দলটির ক্ষেত্রে উল্লিখিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলো? যারা এ গ্রন্থের প্রথম খণ্ড অধ্যয়ন করেছেন, তারা অবশ্যই সেখানে উত্তর পেয়ে গেছেন যে, কখনো কখনো বিশেষ আইন অনুযায়ী কোনো প্রয়োজন ও প্রজ্ঞানির্ভর কৌশলী সিদ্ধান্তমতে এ জাতীয় ব্যত্যয় সংঘটিত হওয়া যুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু সম্ভবই নয়, বরং ঘটেছেও।

যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের বিপরীতে প্রখ্যাত তাবেঈ মুফাসসির ইবনে জুরাইজ রহ. বলেন, উল্লিখিত আয়াতসমূহে যা কিছু বলা হয়েছে তা একটি تمثیل বা উপমার প্রয়োগমাত্র। তা জিহাদ থেকে পলায়নকারীদেরকে উপদেশ ও শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে। এটি কোনো সত্যিকার ঘটনার উল্লেখ নয়। বনি ইসরাইলের প্রাগৈতিহাসিক যুগে এমন কিছু ঘটে নি।

আমাদের মতে সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের মতই সঠিক। কেননা, কুরআনুল কারিমের বর্ণনাশৈলী থেকে জানা যায় যে, উল্লিখিত আয়াতসমূহের পূর্বে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কিত তালাকের কিছু বিধান বলা হয়েছে। তাতে জিহাদের সামান্যতম উল্লেখও নেই। অবশ্য সেই আয়াতসমূহের পরে জিহাদের আলোচনা এসেছে। যদি উল্লিখিত আয়াতসমূহ 'জিহাদ'-এর প্রতি উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যেই উপমাস্বরূপ পেশ করা হয়ে থাকে, তাহলে আরবি সাহিত্যের স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী দরকার ছিলো, প্রথমে জিহাদের বিধান বলা। এরপর যারা জিহাদকে ভয় পায় সেই পলায়নপর মনোবৃত্তির লোকদের উপদেশ ও শিক্ষা দেয়ার জন্য উপমার দৃশ্যায়ন করে এই সত্যের উদ্‌ঘাটন করা যে, জিহাদ থেকে পলায়নকারীদের পুনরুত্থান মন্দভাবে হয়। কিন্তু এখানে এর উল্টো ঘটেছে। অর্থাৎ প্রথমে ঘটনার দৃশ্যায়ন ঘটেছে, এরপর জিহাদের আয়াত এসেছে।

কাজেই সঠিক ব্যাখ্যা হলো, যখন জিহাদের দিকে কথার মোড় ঘুরতে শুরু করেছে, তখন তার পূর্বেই বনি ইসরাইলের একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রাচীন যুগের একটি জাতি জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণে আল্লাহর শাস্তির পাত্র হয়েছিলো। আর তারপরই কুরআনুল কারিমের পাঠকদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তোমরা জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। এই পদ্ধতিতে আলোচনা পেশ করার একটি কার্যকর মানসিক প্রভাব রয়েছে। তা হলো, এর ফলে সেই নির্দেশ এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের চরম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থায় একজন মানুষের হৃদয়াকাশে কুমন্ত্রণা, সংশয় ও জীবন বাঁচানোর যে ভাবনা উকি দিতে শুরু করে তা মুহূর্তেই সেই সুস্থ মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি থেকে দূর হয়ে যায়। তখন সে নিজেকে সত্যের পথে উৎসর্গ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যায়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 উপদেশ ও শিক্ষা

📄 উপদেশ ও শিক্ষা


হযরত হিযকিল আ. ও বনি ইসরাইল-সম্পর্কিত উল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে যে শিক্ষা ও উপদেশ অর্জিত হয়, যার দিকে দৃষ্টিপাত করতেই এ আহবান, তা নিম্নরূপ:

১. ব্যক্তির মানসিকতা যদি সুস্থ হয়, তার প্রকৃতি যদি ন্যায়নিষ্ঠ হয়, তাহলে তার হেদায়েত ও শিক্ষগ্রহণের জন্য শুধু একটি বার চিন্তা-ভাবনাকে বাস্তবমুখী করে দেয়াই যথেষ্ট। তখন তার মন মানুষ নিজ থেকেই সরল পথের পথিক হয়ে যাবে এবং অভীষ্ট লক্ষ্যের খোঁজ পেয়ে যাবে। কিন্তু যদি বাইরের বিভিন্ন কারণের প্রেক্ষিতে মানবপ্রকৃতিতে একটা অসুস্থ মানসিকতা অসুস্থ সৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে তাকে সুস্থ করার জন্য, বহুতাকে দূর করার জন্য বারবার আল্লাহর আহ্বান এসে তাকে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু প্রতিটি বার দেখা যাবে যে, তার যোগ্যতা ও সক্ষমতার শক্তি পূর্বাপেক্ষা নিস্তেজ হতে চলেছে। বরং সে আগের চেয়েও অধিকতর গাফলতির শিকার হয়ে পড়ে। এভাবে একসময় তার শক্তি ও যোগ্যতা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপরও ওই লোক যখন ওই স্তরে নেমে যায়, যার কথা কুরআনে কারিম এভাবে বর্ণনা করেছে— خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ أَسْمَاعِهِمْ وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ ‘আল্লাহ তাদের হৃদয় ও কর্ণ মোহর করে দিয়েছেন, তাদের দৃষ্টিশক্তির ওপর আবরণ রয়েছে।’ [সুরা বাকারা : আয়াত ৭] তখন তার ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসে। সে চিরদিনের জন্য তার পথ ও কেন্দ্রের পারে হয়ে যায়। তার উদ্দেশে তখন নিম্নের এই ঘোষণা উচ্চারিত হয়— ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُو بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ ‘তারা লাঞ্ছনা- ও দরিদ্রতাগ্রস্ত হলো এবং আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত হলো।’ [সুরা বাকারা : আয়াত ৬১]

বনি ইসরাইলের ক্রমাগত অবাধ্যতা এবং আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিদ্রোহ তাদের ক্রমক্ষয়কে দ্বিতীয় পথে ঠেলে দিয়েছিল। হযরত হিযকিল আ.-এর যুগেও তারা তাদের মননপথের পঙ্কিলতা পূর্ণ করতেই ব্যস্ত ছিলো। তা সত্ত্বেও তাদের খুবই ক্ষুদ্র একটি দল নবী-রাসূলদের দেখানো পথের যাত্রী হয়ে সত্য ও হেদায়েতের সামনে অবনত মস্তক ছিলো। পথে বিভিন্ন বিভ্রান্তি ও পদস্খলন সত্ত্বেও তারা কোনোমতে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর অবস্থান করছিলো।

২। জিহাদ যদি জাতির কিছু সদস্যের জন্য মৃত্যুবরণয়ানা হয়ে তাদেরকে পার্থিব বিভিন্ন স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে দেয় কিন্তু তা জাতির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সঞ্জীবনী সুধা হয়ে রয় তবে। জাতীয়তা ও স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখার এটাই একমাত্র রক্ষাকবচ। সঙ্গে সঙ্গে যারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তাদের জন্য জিহাদ হলো ক্ষণস্থায়ী জীবনের বিনিময়ে চিরসবুজ ও শাশ্বত সুখময় জীবনপ্রাপ্তির একমাত্র ফটক। এটিই মৃত্যুর সেই দর্শন, যা মুসলমানদের জীবনকে অন্য জাতিদের থেকে এমনভাবে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে যে, আল্লাহর পতাকা সমুন্নতকারী মানুষ যদি পার্থিব জীবনে সফল থাকে তাহলে সে হয় বীর গাজি ও মুজাহিদ। আর যদি মৃত্যুর সুধা পান করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার নাম লেখা হয় মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদদের তালিকায়। ইরশাদ হয়েছে—

وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَّا تَشْعُرُونَ )

'আল্লাহর পথে যারা নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করতে পারো না।' [সুরা বাকারা: আয়াত ১৫৪]

আর সে কারণেই যারা জিহাদের জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ায়, তাদের উদ্দেশ্যে নিম্নের ক্রোধবার্তা উচ্চারিত হয়েছে—

وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ ()

'সেদিন যুদ্ধকৌশল অবলম্বন কিংবা দলে স্থান গ্রহণ ব্যতীত কেউ তাদেরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে আল্লাহর বিরাগভাজন হবে। তার শেষ ঠিকানা জাহান্নাম। যা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।' [সুরা আনফাল: আয়াত ১৬]

৩। ইসলাম বীরত্বকে প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য ও কাপুরুষতাকে নিন্দনীয় স্বভাব গণ্য করে। একটি হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন পাপাচারের তালিকা পেশ করে ইরশাদ করেছেন, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ভুলক্রমে এসব পাপাচার ঘটে যেতে পারে। কিন্তু ইসলামের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই কাপুরুষতা একত্র হতে পারে না। কিন্তু মনে রাখবে, কারো ওপর অন্যায়ভাবে শক্তি প্রদর্শন করাকে বীরত্ব বলে না। বরং সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং বাতিল থেকে নির্ভয় হওয়ার নামই হলো বীরত্ব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00