📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ

📄 পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ


হযরত ইউশা বনি ইসরাইলকে খোদার বার্তা শোনালেন। তারা সবাই সাইনা উপত্যকা থেকে বেরিয়ে কিনআন ভূমির সর্বপ্রথম নগরী 'আরিহা'-এর দিকে অগ্রসর হলেন। শত্রুপক্ষও উত্তেজিত হয়ে উঠলো। তারাও বাইরে বেরিয়ে কঠিনভাবে মোকাবিলা করলো। অবশেষে তারা পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলো। বনি ইসরাইল অনেক বড় বিজয় লাভ করলো। ধীরে ধীরে ইউশা আ.-এর নেতৃত্বে বনি ইসরাইল লড়াই করে গোটা পবিত্র ভূমি করতলগত করলো। এভাবে অত্যাচারী শোষক মুশরিকদের হাত থেকে তা মুক্ত করে পিতৃপুরুষের জন্মভূমির ওপর নতুন করে আরেকবার দখল প্রতিষ্ঠা করলো।

তাওরাতে এসেছে যে, যখন বনি ইসরাইল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো, তখন আল্লাহর নির্দেশে অঙ্গীকারের সিন্দুক (তাবুতে সাকিনাহ) তাদের সঙ্গে ছিলো। যাতে মুসার লাঠি, হারুনের জামা ও মান্না-এর চীনামাটির বাসন সংরক্ষিত ছিলো। এগুলো ছাড়াও আরো অনেকগুলো বরকতময় বস্তুও ছিলো। কেননা, মহান আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেছিলেন, 'তোমরা মান্না সংরক্ষণ করো। যেনো তোমাদের আগামী প্রজন্মও প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায় যে, তোমাদের ওপর খোদার অনুগ্রহ বর্ষিত হয়েছিলো।'

আল্লামা ইবনে আসির রহ. লিখেন, হযরত মুসা আ. বেঁচে থাকতেই পবিত্র ভূমির দখলদার অত্যাচারী শক্তিগুলোর সঙ্গে লড়াই করার জন্য হযরত ইউশা আ.-কে সেনাপতি নির্বাচন করে বনি ইসরাইলের শাখাগোত্রগুলোকে বিভিন্ন শিবিরে ভাগ করে সেগুলোর কমাভারদের নামও চূড়ান্ত করেছিলেন। যার কারণে হযরত ইউশা আ.-এর ব্যাপারটি অনেকটা হযরত উসামা রা.-এর সঙ্গে মিলে যায়। কেননা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁর জীবদ্দশায় শাম অভিযানের জন্য হযরত উসামা রা.-কে সেনাপতি মনোনীত করেছিলেন এবং তাঁর হাতে ঝাণ্ডা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সৈন্যবাহিনী রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তিকাল করেন। পরবর্তীকালে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর শাসনামলে সেই উসামাবাহিনী শামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ইতিহাসের পাতায় সেই যুদ্ধাভিযানটি পরবর্তীকালের রোম, ইরান ও ইরাক বিজয়ের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্থান করে নেয়।

এভাবে হযরত মুসা আ. পবিত্র ভূমির দখলদার শক্তিগুলোর মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইউশা আ.-কে সেনাপতি মনোনীত করেন এবং যুদ্ধের প্রাথমিক পর্বগুলো নিজেই তত্ত্বাবধান করেন। কিন্তু সৈন্যবাহিনী রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তিনি ইন্তিকাল করেন। মহান আল্লাহ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হযরত ইউশাকে নবুয়ত দান করেন। তাঁর হাত ধরেই পবিত্র ভূমি দখলদার মুশরিক শক্তিগুলোর হাত থেকে মুক্ত হয়। প্রকৃত বিচারে আরিহার সফল অভিযানটি গোটা পবিত্র ভূমি জয় ও উদ্ধারের সূচনা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছিলো।

হযরত ইউশা প্রথম 'কিস' নগরী জয় করেন। কুরআনুল কারিম নগরীটির নাম বলে নি, বরং জনপদ বলে অস্পষ্টভাবে ছেড়ে দিয়েছে। কেননা, সেই ঘটনার বৃত্তান্ত যে উদ্দেশ্যে পেশ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে জনপদের নাম নির্দিষ্ট করার কোনো সম্পর্ক নেই।

হাফেয ইমাদুদ্দীন রহ. বলেন, প্রণিধানযোগ্য অভিমত হলো, সেটি বাইতুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম)। এটি 'আরিহা' নগরী না হওয়ার কারণ হলো, তা ইসরাইলিদের যাতায়াতের পথে পড়ে না। মহান আল্লাহ তাদের সঙ্গে এ নগরীর ব্যাপারেও অঙ্গীকার করেন নি। তাঁর প্রতিশ্রুত নগরী ছিলো বাইতুল মুকাদ্দাস।

কিন্তু আমাদের অভিমত হলো, কুরিয়া (জনপদ) বলে বাইতুল মুকাদ্দাস উদ্দেশ্য; তার কথা অন্তত এতটুকু ঠিক। কিন্তু পরবর্তী বিষয়াবলির ক্ষেত্রে তিনি যেসব দলিল-উপাত্ত পেশ করেছেন, সেগুলো সঠিক নয়। কেননা, এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বনি ইসরাইল যদি সাইনা উপত্যকা থেকে সরাসরি বাইতুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশে যাত্রা করেও থাকে, তাহলেও শুষ্কপথে তাদের যাত্রাপথে কিনআন ভূখণ্ড অবশ্যই পড়বে। যার প্রথম নগরী হলো 'আরিহা'। আপনি যদি পৃথিবীর মানচিত্র চোখের সামনে তুলে ধরেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, শুষ্কপথে ওই আদিম যুগে সাইনা উপত্যকা পেরিয়ে কেউ যদি জেরুজালেম যেতে উদ্যত হতো, তাহলে তাকে অবশ্যই কিনআন হয়ে পথ ধরতে হতো। উপরন্তু ইসরাইলিদের সঙ্গে মহান খোদার এ অঙ্গীকারও ছিলো যে, তিনি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষের ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেবেন। আর স্পষ্ট কথা হলো, তাদের পিতৃপুরুষদের মাতৃভূমি শুধু বাইতুল মুকাদ্দাসই নয়, বরং কিনআন ভূখণ্ডও তার অন্তর্ভুক্ত। যেখান থেকে হিজরত করে হযরত ইউসুফ আ.-এর যুগে ইসরাইলিরা মিসরে এসে থিতু হয়েছিলো। কাজেই ইবনে কাসিরের পেশ করা দলিল দুটি দুর্বল ও বাস্তবতা বিবর্জিত। অবশ্য জনপদ বলে বাইতুল মুকাদ্দাস উদ্দেশ্য নেয়াটা সঠিক হওয়ার কারণ হলো, মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইউশা আ.-এর নেতৃত্বে 'আরিহা'-তে প্রথম আমালিকা গোষ্ঠীকে পরাজিত করে। এরপর কিনআন নগরী পদানত করে অবশেষে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে এসে উপস্থিত হয়। যার অব্যবহিত পরে তারা বাইতুল মুকাদ্দাসও জয় করে ফেলে। যেহেতু এ স্থানটি ছিলো তাদের তাবৎ বিজয়াভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও চূড়ান্ত লক্ষ্য; এ কারণে সেটি বিজিত হওয়ার পর মহান আল্লাহ তাদেরকে এই সুবিশাল সাফল্যের প্রেক্ষিতে সেই নির্দেশ প্রদান করেন, যার কথা কুরআনুল কারিমে উঠে এসেছে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 অকৃতজ্ঞতা

📄 অকৃতজ্ঞতা


কুরআনুল কারিমে এসেছে, যখন মহান আল্লাহ বনি ইসরাইলকে বিজয় দান করেন এবং তারা বিজয়ীবেশে শহরের ভেতর প্রবেশ করতে শুরু করে তখন তিনি তাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তোমরা অহঙ্কারী ও আত্মম্ভরী লোকদের মতো প্রবেশ করবে না; বরং খোদার শোকর আদায়কারীদের মতো মহান আল্লাহর দরবারে বিনম্রতার সঙ্গে নতশীর হয়ে ও তওবা-ইসতিগফার করা অবস্থায় প্রবেশ করবে। যাতে আল্লাহর শোকরগোযার বান্দা ও অহঙ্কারী-উদ্ধত শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু বিজয় ও সাহায্যপ্রাপ্ত হতেই ইসরাইলিদের সেই মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য ফিরে আসে। তারা আল্লাহর নির্দেশের অবাধ্যতা করে অহঙ্কারী ও উদ্ধত মানুষদের মতো জনপদে প্রবেশ করে। তারা সদর্প পদক্ষেপে মাথা উঁচু রেখে অহমিকা দেখিয়ে পথ চলছিলো। ইসতিগফার ও প্রার্থনার স্থলে অহঙ্কারী শব্দ ধ্বনিত হচ্ছিলো। যেনো তারা আল্লাহ তাআলার নির্দেশের সঙ্গে বিদ্রূপ করা অবস্থায় শহরে প্রবেশ করছিলো। তার উপর্যুপরি অবাধ্যতার ফলে অবশেষে মহান আল্লাহর আত্মমর্যাদাবোধ জেগে ওঠে। ক্রমাগত নিন্দিত বদ আমলের প্রতিফল স্বরূপ তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসে।

কুরআনুল কারিমের দুটি স্থানে এই ঘটনা আলোচিত হয়েছে। প্রথমটিতে সংক্ষেপে ও দ্বিতীয়টিতে খানিকটা বিশদভাবে তার আলোচনা হয়েছে। সুরা বাকারা ও সুরা আ'রাফে ইরশাদ হয়েছে-

فَبَدَّلَ الَّذِينَ ظَلَمُوا قَوْلًا غَيْرَ الَّذِي قِيلَ لَهُمْ فَأَنْزَلْنَا عَلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ () وَإِذِ اسْتَسْقَى مُوسَى لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَانْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ كُلُوا وَاشْرَبُوا مِنْ رِزْقِ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ ()

'স্মরণ করো, যখন আমি বললাম, 'এ জনপদে প্রবেশ করো। যেথা ইচ্ছে স্বচ্ছন্দে আহার করো, নতশীরে প্রবেশ করো ফটক দিয়ে এবং বলো, 'ক্ষমা চাই'। আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবো এবং সৎকর্মপরায়ণ লোকদের প্রতি আমার দান বৃদ্ধি করবো। কিন্তু যারা অন্যায় করেছিলো তারা তাদেরকে যা বলা হয়েছিলো তার পরিবর্তে অন্য কথা বললো। সুতরাং অনাচারীদের প্রতি আমি আকাশ থেকে শাস্তি প্রেরণ করলাম; কারণ তারা সত্য ত্যাগ করেছিলো।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৫৯-৬০]

وَإِذْ قِيلَ لَهُمُ اسْكُنُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ وَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ وَقُولُوا حِظَةٌ وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا نَغْفِرْ لَكُمْ خَطِيئَاتِكُمْ سَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ () فَبَدَّلَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ قَوْلًا غَيْرَ الَّذِي قِيلَ لَهُمْ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَظْلِمُونَ ()

'স্মরণ করো, তাদেরকে বলা হয়েছিলো, 'তোমরা এ জনপদে বাস করো ও যেথা ইচ্ছে আহার করো এবং বলো, 'ক্ষমা চাই' আর নতশীরে দ্বারে প্রবেশ করো; আমি তোমাদের অপরাধ মার্জনা করবো। আমি সৎকর্মশীলদেরকে আরো অধিক দান করবো। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জালিম ছিলো, তাদেরকে যা বলা হয়েছিলো, তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বললো। সুতরাং আমি আকাশ হতে তাদের প্রতি শাস্তি প্রেরণ করলাম যেহেতু তারা সীমালঙ্ঘন করছিলো।' [সুরা আরাফ: আয়াত ১৬১-১৬২]

উল্লিখিত আয়াতগুলোতে ۖ শব্দের এসেছে। এখানে দুটি প্রশ্ন। ১. উল্লিখিত শব্দ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ২. বনি ইসরাইল এ শব্দের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন করেছিলো?

এ দুটি প্রশ্নের উত্তর ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবাস রা. বলেন, أي مغفرة استغفروا । হযরত কাতাদা রহ. বলেন, احطط عنا خطايانا। উভয়ের বক্তব্যের সারাংশ হলো, তোমরা এ কথা বলা অবস্থায় প্রবেশ করো যে, 'হে আমাদের প্রভু, আপনি আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের ভুলগুলো নিশ্চিত করে দিন।' বলা যেতে পারে حِطّ শব্দটি হলো সেই বড় বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ। যেভাবে بسم الله الرحمن الرحيم [বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম]-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো بسملة [বাসমালা[ এবং لا حول ولا قوة إلا بالله ]লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি]-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো, حوقلة [হাওকালা[ | لا إله إلا الله ]লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু[-এর সংক্ষিপ্ত রূপ هلهلة ]হালহালা]। বুখারি শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, বনি ইসরাইলরা তখন حِطّة শব্দের স্থলে حبة في شعرة ]হাবাতুন ফী শা'রাতিন[ বলা শুরু করেছিলো। অর্থাৎ তারা বলছিলো, 'চুলের ভেতর সংরক্ষিত দানা আমাদের চাই।' এভাবে তারা মহান আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে বিদ্রূপ করতে লাগলো। সেজদাবনত অবস্থায় প্রবেশ না করে নিতম্বের ওপর হেঁচড়ে পথ চলছিলো। বর্ণনায় এ শব্দ এসেছে,ا يزحفون على استارهم।

বুখারি শরিফের উল্লিখিত বাক্যের সাধারণত এ ব্যাখ্যা বুঝা হয়ে থাকে যে, বনি ইসরাইলিরা নিতম্বের ওপর হেঁচড়ে চলছিলো। কিন্তু এমতাবস্থায় একটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয় যে, উদ্ধত ও আত্মম্ভরী ঢঙে পথচলার এই পদ্ধতি কোথাও প্রচলিত নেই এবং এটি যৌক্তিকও নয়। এর মাধ্যমে খোদ নিজেকেই বিদ্রূপের পাত্র বানানো হয়। এভাবে তো অন্যের সঙ্গে বিদ্রূপ করা হয় না। কাজেই হাদিসের উল্লিখিত বাক্যের সঠিক তাফসির হলো সেটাই যা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, বনি ইসরাইলিরা নগরীতে প্রবেশ করার সময় মাথা অবনত না রেখে সদর্পে মাথা উঁচু রেখে পথ চলছিলো। অর্থাৎ, যেভাবে একজন অহঙ্কারী মানুষ সদর্পে পথ চলার সময় নিতম্ব নাচিয়ে বিশেষ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি করে ঠিক তাদের মতোই বনি ইসরাইলিরা নিতম্বদেশ উত্থিত করে তার ওপর হেঁচড়ানোর মতো করে নগরীতে প্রবেশ করছিলো।

মোটকথা, আল্লাহ তাআলা উল্লিখিত আয়াতসমূহে তাঁর সৎ ও ইবাদতগুযার বান্দাদের সঙ্গে অহঙ্কারী-উদ্ধত মানুষদের কী পার্থক্য তা জানিয়ে দিয়েছেন। কেননা, যারা আল্লাহর অনুগত বিনম্র বান্দা হন, তারা করা সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ব্যক্তিগত বড়ত্ব অর্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে লড়াই করেন না, বরং আল্লাহর শত্রু, বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী, সমাজে অস্থিতিশীলতা তৈরিকারী মহলের অনিষ্টতা এবং অত্যচারী, অবিচারী জাতিগোষ্ঠীর অত্যাচার-অনাচার দূরীভূত করার লক্ষ্যে লড়াই করে থাকেন এজন্য যে, এর দ্বারা সাম্য ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁরা এ বিশ্বাস নিয়েই অস্ত্র ধারণ করে থাকেন যে, الفتنة أشد من القتل : ফেতনা ও বিপর্যয় হত্যা থেকেও গুরুতর অপরাধ। এ কারণে যখন তাঁরা কাফেরদের ওপর বিজয়ী হন, তখন তাঁরা নিজেদের আনন্দের প্রকাশ অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতার মাধ্যমে করেন না, বরং এ সময় তাঁরা আল্লাহর সমীপে চূড়ান্ত বিনম্রতা ও আত্মতুচ্ছতার সঙ্গে সেজদাবনত হয়ে তাঁদের আনন্দের প্রকাশ ঘটান। যখন তারা বিজিত এলাকাসমূহে প্রবেশ করেন তখন প্রত্যেকে পরিপূর্ণ শোকরগুজার বিনম্র বান্দার বেশে প্রবেশ করেন। তাইতো নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা নগরীকে কাফেরদের হাত থেকে পবিত্র করে বিজয়ীবেশে প্রবেশ করেন তখন তিনি এতটাই বিনীত ও বিনম্র ছিলেন যে, উটের ওপর আরোহণ করা অবস্থায় তিনি খুব বেশি মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য হলো, এসময় নবীজির দাড়ি মুবারক উটের হাওদার মাথা ছুঁই ছুঁই করছিলো। এরপর যখন নবীজি হেরেম শরিফে প্রবেশ করেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি আল্লাহর সামনে সেজদাবনত হয়ে পড়েন এবং আট রাকাত শোকরিয়ার নামায আদায় করেন।

সাহাবায়ে কেরামের চিত্রও ছিলো অনুরূপ। হযরত উমর রা.-এর হাতে যখন বাইতুল মুকাদ্দাস বিজিত হয়, হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর হাতে যখন ইরান পদানত হয়, তখন এই মহান বিজয়ীগণ বিজিত এলাকাসমূহে অপরাপর অহঙ্কারী রাজাদের মতো সদর্পে প্রবেশ করেন নি, বরং আল্লাহর একজন বিনীত, ভগ্নহৃদয় ও অনুগত বান্দার মতো বেশে তারা প্রবেশ করেছিলেন। যখন হযরত উমর রা. বাইতুল মুকাদ্দাসের হেরেমে প্রবেশ করেন এবং যখন হযরত সা'দ রা. কিসরার রাজপ্রাসাদে ঢোকেন, তখন তাঁরা প্রথম যে কাজটি করেন, তা হলো, তাঁরা মহান আল্লাহর সমীপে মাথা নত করে শোকরিয়ার নামায আদায় করেন। এভাবে তাঁরা তাঁদের দাসত্ব, অক্ষমতা ও আনুগত্যের ব্যবহারিক স্বীকারোক্তি প্রদান করেছিলেন। তাঁদের চিত্র ছিলো এমন যে, তাঁরা যখন আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন, তখন বীরত্ব ও শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রেখে শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন আর যখন বিজয়ী হতেন তখন নীচতা, অক্ষমতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহর শোকর আদায় করতেন। এসময় তাঁরা বিজিত অঞ্চলের লোকদের সঙ্গে একান্ত দয়ালু আচরণ করতেন।

মোটকথা, অবশেষে ইসরাইলি সম্প্রদায় তাদের কৃতকর্মের দণ্ড ভোগ করে। তারা আল্লাহর শাস্তির পাত্রে পরিণত হয়। প্রশ্ন হলো, আল্লাহর ওই শাস্তি কী ছিলো? কুরআনুল কারিম এর কোনো বিশদ ব্যাখ্যা দেয় নি। শুধু رِجْزًا مِّنَ السَّمَاءِ : 'আকাশ হতে শাস্তি' বলে বিষয়টিকে অস্পষ্ট আকারে ছেড়ে দিয়েছে। আর বাস্তবতা হলো, তাদের ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নিতে হলে এতটুকুই যথেষ্ট।

সুরা আ'রাফে এসেছে, فَبَدَّلَ الَّذِيْنَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ : 'কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জালিম ছিলো, তাদেরকে যা বলা হয়েছিলো, তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বললো।' যা থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতার এই ঘৃণিত কাজ বনি ইসরাইলের সব লোক করে নি। বরং সেই সম্প্রদায়ে একটি দল এমনও ছিলো, যারা সবসময় আল্লাহর নির্দেশের অনুগত থেকেছে এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে হযরত ইউশা আ.-কে সঙ্গ দিয়েছে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 শিক্ষা ও উপদেশ

📄 শিক্ষা ও উপদেশ


১। হযরত ইউশা আ. ও বনি ইসরাইলের উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উপলব্ধ হয় তা হলো, একজন মানুষের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব হলো, যখন সে কোনো বিপদ বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে বা সাফল্যের সঙ্গে অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হবে, তখন সে যেনো আত্মম্ভরিতা ও দর্পের জালে ফেঁসে এ কথা না বুঝে বসে যে, এটি আমার ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও প্রতিভার ফসল। বরং এ সময় তার দায়িত্ব হলো, সে মহান আল্লাহর শোকরগুজার হয়ে থাকবে, নিজের অক্ষমতার স্বীকারোক্তি জানিয়ে তাঁরই সামনে বিনীত হয়ে মাথা নত করবে, যাতে সে আগামীতেও সেই মহান সত্তার করুণার আঁচলে বাঁধা থাকে এবং দুনিয়ার মতো আখেরাতেও সফলতা লাভ করে চিরধন্য হতে সক্ষম হয়।

২। চরম থেকে চরমতর হতাশাজনক অবস্থাতেও কোনো ব্যক্তির জন্য মহান আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হওয়া যাবে না। কেননা, একজন ব্যক্তি যদি নিপীড়িতও হয়, অত্যাচারের যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্টও হয়, তারপরও সে মহান আল্লাহর দয়া ও করুণা থেকে বঞ্চিত নয়। তবে সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী কর্মকৌশল ও কল্যাণকামনার প্রেক্ষিতে সেটি আসতে অবশ্যই বিলম্ব হয়ে থাকে।

৩। যে-জাতির ওপর আল্লাহর দয়া, করুণা, অনুগ্রহ ও পুরস্কার অবারিত হয়ে বর্ষিত হতে থাকে যদি তারা কৃতজ্ঞ ও অনুগত না হয়ে অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়, তাহলে সেই জাতির লোকদেরকে অতিদ্রুত মহান সত্তার কঠিন শাস্তি ও চরম জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হয়। কেননা, তারা এতকিছু দেখার পর এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা লাভ করার পরও অবাধ্যতার শিকার হয়েছে। যা নিঃসন্দেহে চরম অন্যায় ও কঠিন দণ্ডনীয় অপরাধ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00