📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কুরআন মাজিদে হযরত মুসা আ.-এর প্রশংসা ও ফযিলত

📄 কুরআন মাজিদে হযরত মুসা আ.-এর প্রশংসা ও ফযিলত


কুরআন মাজিদে এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসসমূহে হযরত মুসা আ.-এর ফযিলত এবং বনি ইসরাইলের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে তাঁর উচ্চ মর্যাদা, মাহাত্ম্য যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, তা থেকে এ-কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, খাতিমুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুজাদ্দিদে আম্বিয়া হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর পরেই হযরত মুসা আ. 'উলুল আযম' নবী ও রাসুল এবং অন্য নবী ও রাসুলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা ও মরতবার অধিকারী।
অন্যকথায় এভাবে বলুন, হযরত মুসা আ.-এর শৈশব থেকে মৃত্যু অবধি কালের ঘটনাবলি এমন বিস্ময়কর ও বিচিত্র নিয়মে অতিবাহিত হয়েছে যে, তা পাঠ করলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বলতে হয়, হযরত মুসা আ. অতি উচ্চ মর্যাদাশীল রাসুল ছিলেন। এটাও মেনে নিতে হয় যে, ফেরআউন, ফেরআউনের সম্প্রদায় এবং বনি ইসরাইলিদের হাতে হযরত মুসা আ. যে-ক্লেশ ও যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন এবং তাদের অবস্থার সংশোধনের জন্য যে-ধরনের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন, তার দৃষ্টান্ত নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ইবরাহিম আ. ব্যতীত অন্যকোনো নবী ও রাসুলের জীবনে পাওয়া যায় না।
কুরআন মাজিদ জায়গায় জায়গায় হযরত মুসা আ.-এর ঘটনাবলির মাধ্যমে এইজন্য সাক্ষ্য পেশ করেছে যে, উম্মত ও গোত্রসমূহের শৈথিল্য, সত্য বিমুখতা, বরং অবাধ্যতা, বিরোধিতা ও শত্রুতা, নবীগণকে অপমান করা, অপদস্থ করা, যন্ত্রণা দেয়া আর অপরদিকে নবী ও রাসুলগণের ধৈর্য ও সহনশীলতা, পথভ্রষ্ট উম্মত ও জাতির সংশোধন এবং তাদের হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য অবিরাম চেষ্টা ও পরিশ্রম করার এত অধিক পরিমাণ উপকরণ আর কোথাও পাওয়া যায় না, যা হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের ঘটনাবলিতে সন্নিহিত রয়েছে।
সুতরাং, কুরআন মাজিদের আয়াতের মাধ্যমে হযরত মুসা আ.-এর উচ্চ মর্যাদাশীল ও 'উলুল আযম' নবী ও রাসুল হওয়াই প্রমাণিত হয়, যা তাঁর ঘটনাবলি ব্যক্ত করছে। আর নিম্নলিখিত আয়াতগুলোতে বিশেষভাবে তাঁর প্রশংসা ও ফযিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে হারুন আ.-এর প্রশংসা করা হয়েছে।
যেমন: সুরা মারইয়ামের নিম্নলিখিত আয়াতে বলা হয়েছে-
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى إِنَّهُ كَانَ مُخلَصًا وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا () وَنَادَيْنَاهُ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ الْأَيْمَنِ وَقَرِّبْنَاهُ نَجِيًّا ( وَوَهَبْنَا لَهُ مِنْ رَحْمَتِنَا أَخَاهُ هَارُونَ نَبِيًّا (سورة مريم)
'স্মরণ করো এই কিতাবে মুসার কথা, সে ছিলো বিশেষ মনোনীত এবং সে ছিলো রাসুল, নবী। তাকে আমি আহ্বান করেছিলাম তুর পাহাড়ের দক্ষিণ দিক থেকে এবং আমি অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছিলাম। আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভাই হারুনকে নবীরূপে।' [সুরা মারইয়াম: আয়াত ৫১-৫৩]
সুর আ'রাফে বর্ণিত আছে-
قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَاتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُنْ من الشاكرين (سورة الأعراف)
'তিনি (আল্লাহ তাআলা) বললেন, “হে মুসা, আমি তোমাকে আমার রিসালাত (রাসুলের মর্যাদা ও দায়িত্ব) ও আমার বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি; সুতরাং আমি যা (তাওরাত কিতাব) দিলাম তা গ্রহণ করো এবং কৃতজ্ঞ হও।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৪]
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের বার্ণিত হাদিসে আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لَا تُخَيِّرُونِي عَلَى مُوسَى فَإِنَّ النَّاسَ يَصْعَقُونَ فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ بُعِثَ أَوْ فِي أَوَّلِ مَنْ بُعِثَ فَإِذَا مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ آخِذٌ بِالْعَرْشِ فَلَا أَدْرِي أَحُوسِبَ بِصَعْقَتِهِ يَوْمَ الطُّورِ أَوْ بُعِثَ قَبْلِي.
"আমাকে হযরত মুসা আ.-এর ফযিলত প্রদান করো না। কেননা, কিয়ামতের দিন সকল মানুষ সেদিনের বিভীষিকায় বেহুঁশ হয়ে পড়ার পর যে-ব্যক্তি সর্বপ্রথম জ্ঞান ফিরে পাবে, সে হবো আমি। কিন্তু আমি উঠে দেখবো যে, মুসা আ. আরশের পায়া ধরে দণ্ডায়মান রয়েছেন। আমি বলতে পারি না যে, তিনি কি আমার পূর্বে চেতন লাভ করেছেন না তুর পাহাড়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ার বিনিময়ে আজকের বেহুঁশ হওয়া থেকে তাঁকে মুক্ত রাখা হয়েছে।"
ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উক্তি—'আমাকে মুসার ওপর ফযিলত প্রদান করো না'—তাঁর বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ ছিলো। অন্যথায়, তিনি নিজেই অন্য সময়ে বলেছেন, وانا سيد ولد آدم يوم القيامة ولا فخر 'আমি গর্ব প্রকাশ ছাড়াই বলছি যে, কিয়ামতের দিন আমিই সমস্ত আদম-সন্তানের সরদার।' তাঁর খাতিমুন নাবিয়ি‍্যন হওয়াই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে কিয়ামতের দিবসের এই ঘটনা, তা হলো আংশিক ফযিলত। এ-কারণে যাবতীয় পূর্ণতাসূচক গুণাবলির যে-সমাবেশস্থল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতা বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হয় না।
যাইহোক। আলোচ্য হাদিসটির সারবস্তু হলো হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ও মহত্বের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতা প্রকাশ করা, অন্যকিছু নয়।
সুরা নিসায় এসেছে-
وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلًا لَمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تكليمًا (سورة النساء)
'অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি, যাদের কথা আমি তোমাকে পূর্বে বলেছি এবং অনেক রাসুল রাসুল যাদের কথা তোমাকে বলি নি। এবং মুসার সঙ্গে আল্লাহ তাআলা বাক্যালাপ করেছিলেন।' [সুরা নিসা: আয়াত ১৬৪]
আর সুরা সাফাতে বিবৃত করা হয়েছে-
وَلَقَدْ مَنَنَّا عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ () وَنَجَّيْنَاهُمَا وَقَوْمَهُمَا مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ () وَنَصَرْنَاهُمْ فَكَانُوا هُمُ الْغَالِبِينَ () وَآتَيْنَاهُمَا الْكِتَابَ الْمُسْتَبِينَ () وَهَدَيْنَاهُمَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ () وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآخِرِينَ () سَلَامٌ عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ () إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ () إِنَّهُمَا مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (سورة الصافات)
'আমি অনুগ্রহ করেছিলাম মুসা ও হারুনের প্রতি, এবং তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়কে আমি উদ্ধার করেছিলাম মহাসঙ্কট থেকে। আমি সাহায্য করেছিলাম তাদেরকে, ফলে তারাই হয়েছিলো বিজয়ী (ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের ওপর)। আমি উভয়কে দিয়েছিলাম বিশদ কিতাব। এবং তাদেরকে আমি পরিচালিত করেছিলাম সরল পথে। আমি তাদের উভয়কে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। (তারা বলবে,) "মুসা ও হারুনের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” এইভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। তারা উভয়ই ছিলো আমার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা সাফফাত: আয়াত ১১৪-১২২]
সুরা আহযাবে এসেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وجيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে পবিত্র মেরাজ সম্পর্কিত হাদিসে হযরত মুসা আ. ও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যকার যে-কথোপকথন বর্ণনা করা হয়েছে তাতেও হযরত মুসা আ.- এর মর্যাদা ও মহত্বের স্পষ্ট প্রকাশ রয়েছে।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে আরো একটি রেয়ায়েত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাউস রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কোনো বস্তু বণ্টন করলেন। জনৈক (মুনাফিক) ব্যক্তি বললো, 'এই বণ্টনে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ রাখা হয় নি।' কোনো এক মুনাফিক লোকের এই উক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কানে গেলে ক্রোধে তাঁর চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করলো। তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর প্রতি রহম করুন। তাঁকে তো তাঁর সম্প্রদায় এর চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দিয়েছে। কিন্তু তিনি সব কষ্ট ও ক্লেশেই ধৈর্য ও সহনশীলতার পথ অবলম্বন করেছেন।' অর্থাৎ, মুনাফিকের এই কষ্টদায়ক উক্তিতে আমিও উচ্চ মর্যাদাশীল নবী ও রাসুলগণের মতো ধৈর্য ও সহনশীলতার আশ্রয় গ্রহণ করছি।
মোটকথা, এই রেওয়ায়েতগুলো এবং অনুরূপ আরো অনেক ফযিলতমূলক রেওয়ায়েত রয়েছে যা হযরত মুসা আ.-এর উচ্চ পর্যায়ের রাসুল হওয়া প্রমাণ করছে এবং আমাদের জন্য হেদায়েতের ভাণ্ডার জুগিয়ে দিচ্ছে।

টিকাঃ
১৪৮ সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৪১৪; সহিহ মুসলিম: হাদিস ৬৩০০।
১৪৯ তাদের সুখ্যাতি পৃথিবীতে অব্যাহত রয়েছে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 একটি সুস্থ ঐতিহাসিক তত্ত্ব

📄 একটি সুস্থ ঐতিহাসিক তত্ত্ব


ইহুদি (বনি ইসরাইলি)-দের ইতিহাস যাঁরা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ-বিষয়টি অজানা থাকার কথা নয় যে, ইহুদিরা হযরত ইসা আ.-এর বহুকাল পূর্বে হেজাযে এসে বসতি স্থাপন করেছিলো এবং তাইমা, ওয়াদিয়ে কুযা, ফাদাক, খায়বার, মদীনা (ইয়াসরিব)-এ তারা ঘরবাড়ি, গির্জা, ভূ-সম্পত্তি, ধর্মীয় পাঠশালা, সেনানিবাস, দুর্গসমূহ নির্মাণ করে নিজেদের স্বতন্ত্র সভ্যতা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিলো। আরব ইতিহাসবেত্তাদের মতে বনু কুরাইযা, বুন নাযির, বনু কাইনুকাহ, বনু হারেস নামক বড় বড় ইহুদি গোত্রসমূহ ওইসব স্থানে তাদের স্বতন্ত্র বাসস্থান স্থাপন করে ওখানেই বসবাস করতে থাকে।
এই বাস্তবতার প্রতি লক্ষ করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তপত্তি হয়, যার সমাধান জরুরি। একটি প্রশ্ন এই এমন কোন্ অপরিহার্য ঘটনা ঘটেছিলো যার ফলে ইহুদিরা ফিলিস্তিন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, যে-ভূমি সম্পর্কে ইহুদিদের আকিদা এই যে, তা পবিত্র ভূমি এবং তাতে দুধ ও মধুর নহর প্রবাহিত রয়েছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, কোনো অপরিহার্য কারণে তাদেরকে এই পবিত্র ভূমি ত্যাগ করতেই হয়েছিলো, তবে তারা কী কারণে তাদের নিকটস্থ সবুজ, সতেজ, মনোরম অঞ্চলসমূহ ছেড়ে এমন এক অঞ্চলে এসে বসবাস করতে শুরু করলো, গাছপালা এবং জীবন ধারণের উপযোগী সরঞ্জাম ও উপকরণসমূহ পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিলো না? অথচ মিসর তাদের আবাসভূমির কাছেই ছিলো। ইরাক তাদের পুরাতন দারুল হিজরত ছিলো এবং নিকটবর্তীও ছিলো। আর উত্তর দিকে সিরিয়া ছিলো তাদের আবাসভূমির সংলগ্ন। এই স্থানগুলো অত্যন্ত সবুজ, সতেজ ও সভ্যতার সরঞ্জামও উপকরণসমূহের কেন্দ্রভূমি ছিলো।
ইতিহাস তো প্রথম প্রশ্নের জবাব এই দিচ্ছে যে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০১ সালে রোমান সম্রাট তিতাউস (Titues)-এর যুগে বনি ইসরাইলিরা ফিলিস্তি নের প্রিয় ও পবিত্র ভূমি থেকে বের হতে বাধ্য হয়েছিলো। সম্রাট তিতাউস সেনাবাহিনিী নিয়ে আক্রমণ করে ফিলিস্তিন ভূমিকে ধ্বংস করে উলট-পালট করে দিয়েছিলো। বাইতুল মুকাদ্দাসকে ধ্বংস করে ফেলেছিলা। যে-দুর্গটির জন্য ইহুদিরা গৌরববোধ করতো, যার দৃঢ়তা ও আড়ম্বরপূর্ণ নির্মাণের দৃষ্টান্ত পেশ করতো এবং যার সাজ-সরঞ্জাম এবং স্বর্ণ-রৌপ্য-মোড়ানো তৈজসপত্রের জন্য তারা গর্বিত ছিলো, অত্যাচারী তিতাউস সেগুলোকে ভেঙে-চুরে নষ্ট করে দিয়েছিলো। আর অতি মূল্যবান সরঞ্জামগুলোর সব লুণ্ঠন করে নিয়ে গিয়েছিলো।
দ্বিতীয় জিজ্ঞাসার জবাই এই যে, ইহুদিরা তাওরাতে পাঠ করেছিলো এবং তাদের নবীদের মুখে শুনতে পেয়েছিলো যে, আল্লাহ তাআলা এক সময় তাঁর এই নবুওতের পদকে বনি ইসরাইল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের ভ্রাতৃবংশ বনি ইসরাইলের মধ্যে নতুনরূপে দান করবেন। তারা এটাও জানতো যে, সেই নবী ইয়াসরিবে (মদীনায়) আগমন করবেন। ইয়াসরিব হবে সেই নবীর 'দারুল হিজরত' এবং তাঁর 'দাওয়াতে ইসলামে'র কেন্দ্রস্থল। মূর্তিপূজকদের বিরুদ্ধে তাঁর মুজাহিদি জীবন সফলকাম হবে। আর পুনরায় তাঁর হাতেই ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক ও ইয়াকুব আলাইহিমুস সালাম-এর সত্যের আহ্বান শির উঁচু করে দাঁড়াবে।
সুতরাং, যখন ইহুদিরা মূর্তিপূজক সম্রাট তিতাউসের শক্তির কাছে অক্ষম ও অপারগ হয়ে গেলো, তখন তারা হেজাযের ইয়াসরিব বা মদিনাকেই মস্তক উন্নত করে দাঁড়াবার শেষ আশ্রয়স্থল মনে করলো। হেজাযের এ- স্থানেই তারা তাদের বাসস্থান নির্মাণ করলো যা শেষ নবী আবির্ভূত হওয়ার নগরী (মক্কা) এবং ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত ছিলো। এভাবে তারা আকাঙ্ক্ষিত নবীর প্রতীক্ষা এবং তাদের লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধারের আশায় দিনাতিপাত করতে লাগলো।
যেমন: ইয়াসা'ইয়াহ নবীর গ্রন্থে স্পষ্টভাবে শেষ নবী সম্পর্কে যে- ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখ করা হয়েছে তা এই:
"সেই নবী সালা নামক পর্বতের নিকটবর্তী স্থানে আবির্ভূত হবেন। বলাবাহুল্য, মদিনার বসতি এমন জায়গায় অবস্থিত ছিলো যার পুবদিকে ওহুদ পর্বত এবং পশ্চিমে সালা পর্বত। আর এ-দুটি পর্বতের উপত্যকা ভূমিতে মদিনার বসতি অবস্থিত।"
"হে সামুদ্রিক পথ অতিক্রমকারিগণ আর হে তাতে অবস্থানকারিগণ, আর হে দ্বীপাঞ্চল ও তার অধিবাসিগণ, আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে নতুন গীত গাও। ভূ-পৃষ্ঠে সর্বত্র তাঁরই প্রশংসা করো। বনাঞ্চল ও তার জনপদসমূহ, কিদারের বংশধর কর্তৃক আবাদকৃত গ্রামসমূহ তাদের আওয়াজ উঁচু করুক। সালার বাসিন্দারা গীত গাক। তারা আল্লাহ তাআলার প্রতাপ ঘোষণা করুক। আর দ্বীপাঞ্চলসমূহ তাঁর প্রশংসাগীতি পাঠ করুক, আল্লাহ বীরের মতো বের হবেন, তিনি সৈনিক পুরুষদের মতো নিজের আত্মমর্যাদা প্রকাশ করবেন। আওয়াজ উঁচু করবেন। হ্যাঁ, অবশ্যই তিনি বিজয়-হুঙ্কার ছাড়বেন। তিনি নিজের শত্রুদের ওপর জয়লাভ করবেন। 'আমি দীর্ঘকাল যাবৎ নীরব রয়েছি, আমি নীরব হয়ে থেকেছিলাম এবং ধৈর্যধারণ করছিলাম... যারা নিজেদের হাতে বানানো মূর্তিসমূহের ওপর নির্ভর করে এবং ভগ্ন-বিচূর্ণ মূর্তিসমূহকে সম্বোধন করে বলে, তোমরা আমাদের উপাস্য। তারা পেছনে হটে যাবে এবং যারপরনেই লজ্জিত হবে।"
এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, হযরত মুসা আ.-এর পরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত এমন কোনে নবী আসেন নি যিনি মূর্তিপূজকদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন এবং অবশেষে মূর্তিপূজকেরা ব্যর্থকাম হয়েছে।
তবে, কারা এই কিদারের বংশ? সালা পর্বতটি কোথায় অবস্থিত? বার বার কেনো দ্বীপ ও পর্বতসমূহের উল্লেখ করা হলো? বনি ইসরাইলের গীত ব্যতীত নতুন গীত কোন্টি? এই সমস্ত জিজ্ঞাসা চিৎকার করে বলছে যে, এটা এমন শরিয়ত এবং এমন নবীর আগমনের সুসংবাদ প্রদানের বর্ণনা, যা হেযাজের ভূ-খণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে কি এটাই সেই কথা নয় যা কুরআন মাজিদ ইহুদিদের উদ্দেশে সম্বোধন করে জীবন্ত ঐতিহাসিক সাক্ষ্যরূপে বর্ণনা করেছে এভাবে—
وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقَ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ (سورة البقرة)
'তাদের কাছে যা আছে আল্লাহর কাছ থেকে তার (তাওরাতের) সমর্থক কিতাব (কুরআন মাজিদ) এলো; যদিও পূর্বে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তারা (ইহুদিরা) এর সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করতো। তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিলো তা যখন তাদের কাছে এলো (যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন) তখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করলো। সুতরাং কাফেরদের প্রতি আল্লাহর লানত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৮৯]
অর্থাৎ, যখন কিতাবি ইহুদিদের সঙ্গে ইয়াসরিবের মূর্তিপূজকদের যুদ্ধ হতো এবং কিতাবি ইহুদিরা পরাজিত হতো, তখন আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করতো, 'হে আল্লাহ, আমরা যে-নবীর প্রতীক্ষা করছি তাঁকে সত্বর প্রেরণ করা। যেনো তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে মূর্তিপূজকদের মূলোৎপাটন করে দিতে পারি এবং আপনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সত্যেরই সফলতা অর্জিত হয়। কিন্তু যখন সেই কাঙ্ক্ষিত নবী আরবের ভূমিতে পদার্পণ করলেন এবং নবুওতপ্রাপ্ত হলেন, তখন কিতাবি ইহুদিরা হিংসাবশত তাঁকে অস্বীকার করতে লাগলো—এই নবী ইসমাইলের বংশের কেনো? ইসরাইলি বংশের নর কেনো?
অনুমিত হয় যে, কোনো ইহুদি আলেম এই ধোঁকায় পতিত ছিলো যে, যদিও এই নবীর আবির্ভূত ও প্রকাশিত হওয়ার স্থান সালা পর্বতের নিকটবর্তী স্থানই বলা হয়েছে, তাঁর আবির্ভাব বনি ইসরাইলের মধ্য থেকেই হওয়া উচিত। এইজন্য তারা ওখানে এসে বসতি স্থাপন করেছে যে, আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি আমাদের মধ্য থেকেই পূর্ণ হোক। কিন্তু তারা এ-কথা ভুলে গিয়েছিল যে, তাদের সেই তাওরাতেই সেই আকাঙ্ক্ষিত নবী সম্পর্কে এটাও বলা হয়েছিল যে, ‘আমি তাদের জন্য তাদের ভ্রাতৃগোত্র থেকে একজন নবী প্রেরণ করবো।’ এ-কথা বলা হয়নি যে, সেই নবী হবে বনি ইসরাইল বংশ থেকে। কিন্তু ইহুদিদের আলেমগণ এবং তাদের অনুসারী সাধারণ জনগণ এই তথ্য সম্পর্কে অবহিত ছিল না যে, এই নেয়ামত (নবুওত) এখন তাদের ভ্রাতৃগোত্র বনি ইসমাইল বংশে স্থানান্তরিত হয়ে তাদেরকে বরকত দান করতে উপকৃত করতে থাকবে।
কুরআন মাজিদে এ-দিকেই ইঙ্গিত রয়েছে-
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنْ فَرِيقًا مِنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (سورة البقرة)
'আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে তেমনই জানে যেমন তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চেনে এবং তাদের একদল জেনে-শুনে সত্য গোপন করে থাকে।' (সুরা বাকারা: আয়াত ১৪৮]
মোটকথা, এটাই একমাত্র কারণ যে, কয়েক শতাব্দী পূর্বে বনি ইসরাইলিরা বড় শক্তির কাছে নিপীড়িত হয়ে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো। তারা তখন মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের সবুজ, সতেজ ও সুসভ্য দেশগুলো ত্যাগ করে হেজাযের মরুভূমিকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। তারা ইয়াসরিব (মদিনা) ও তার আশ-পাশের অঞ্চলগুলোতে এসে বসতি স্থাপন করেছিলো। কিন্তু আফসোস! সেই নবীর আবির্ভাবের পর হিংসা ও বিদ্বেষ তাদেরকে ঈমানের মতো মহামূল্যবান সম্পদ থেকে বঞ্চিত রাখলে।
আধুনিক ঐতিহাসিক তথ্যাবলির প্রতি লক্ষ করলে এখানে এই জিজ্ঞাসা উত্থাপিত হয় যে, উপরিউক্ত প্রশ্নোত্তরের গোটা আলোচনা নিরর্থক। নিরর্থক এ-কারণে যে, হেজায ভূমিতে যেসব ইহুদি বসবাস করতো তারা সবাই আরব বংশোদ্ভূত ছিলো, বনি ইসরাইলি বংশের লোক ছিলো না। কেননা, বনি ইসরাইলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য এটাও ছিলো যে, তারা পৃথিবীর যে-প্রান্তে গিয়েই বসতি স্থাপন করেছে, কখনো তাদের ইসরাইলি নাম ও পরিচয় ত্যাগ করে নি। পক্ষান্তরে হেজাযের ইহুদিদের পূর্বপুরুষদের কুরাইযা, নাযির, কাইনুকাহ ইত্যাদি নাম আরবি এবং ইসরাইলি নাম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হবে, এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ যদি এটাই হয় যে, হেজায ভূ-বিভাগের ইহুদিরা কেবল আরব বংশোদ্ভূতই এবং তাদের বনি ইসরাইল বংশীয় ইহুদি মোটেই ছিলো না, তবে তা হবে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বিপরীত। কারণ, হেজাযের ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে কতিপয় গোত্র এমনও ছিলো যারা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি থেকে হিজরত করে আরব দেশে এসে বসতি স্থাপন করার কথা আজ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় সুরক্ষিত রয়েছে। আর যদি তার অর্থ এই হয় যে, এখানে আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে ইসরাইলি ইহুদি গোত্রগুলোও বসবাস করতো এবং তাদেরই মাধ্যমে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে ইহুদি ধর্মের বীজ বপন করা হয়েছিলো। তবে পুনরায় উপরিউক্ত প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার ওই জবাবই দেয়া যেতে পারে যা ইতোপূর্বে যথাস্থানে দেয়া হয়েছে।

টিকাঃ
১৫০ ইয়াসা'ইয়াহ: অনুচ্ছেদ ৪২, আয়াত ১-১৭, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার রচিত 'কাসাসুল আম্বিয়া' থেকে গৃহীত।
১৫১ এখানে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী বলতে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। ইহুদিরা কখনো মুশরিকদের কাছে পরাজিত হলে শেষ নবীর ওসিলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করতো। তারা এটাও বলতো যে, শেষ নবী তাদের মধ্যেই আগমন করবেন। কিন্তু নবীর আগমনের পর তারা তাঁর বিরোধিতা করতে থাকে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এবং শিক্ষামূলক উপদেশ

📄 জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এবং শিক্ষামূলক উপদেশ


হযরত মুসা আ., বনি ইসরাইল, ফেরআউন এবং ফেরআউনের সম্প্রদায়ের এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক কাহিনি শুধু একটি কাহিনি বা গল্প নয়। বরং এটি সত্য ও মিথ্যার প্রতিযোগিতা, ন্যায় ও অন্যায়ের লড়াই, স্বাধীনতা ও দাসত্বের মধ্যকার সংগ্রাম, দুর্বল ও হীনদের মাথা তুলে দাঁড়ানো, অত্যাচারী ও উন্নতশিরদের হীনতাবরণ ও বিনাশ, সত্যের জয় ও সফলতা এবং মিথ্যার পরাজয় ও অপদস্থ হওয়া, ধৈর্য ও পরীক্ষা এবং শোকর ও অনুগ্রহের প্রকাশস্থল। মোটকথা, এটি অবাধ্যতা, অকৃতজ্ঞতা ও না-শোকরির নিকৃষ্ট পরিণামের মহৎ ফলাফলপূর্ণ এবং সত্য ও বাস্তবতাসমৃদ্ধ সারগর্ভ কাহিনি। এই কাহিনিতে অসংখ্য উপদেশ ও জ্ঞানগর্ভ বিষয় সন্নিহিত রয়েছে। তা প্রত্যেক রুচিসম্পন্ন ও সত্যপ্রিয় ব্যক্তিকে জ্ঞানের সীমা ও সূক্ষ্মদৃষ্টির প্রয়োগে চিন্তা ও গবেষণার আহ্বান জানাচ্ছে।
এসবের মধ্য থেকে নমুনা হিসেবে নিম্নের কয়েকটি জ্ঞানগর্ভ বিষয় বিশেষভাবে চিন্তনীয় ও অনুধাবনযোগ্য।
এক. মানুষ যদি কোনো বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তবে তার অবশ্য কর্তব্য ধৈর্য ও সন্তুষ্টির সঙ্গে তার মোকাবিলা করা। ধৈর্য ও সন্তুষ্টির সঙ্গে কাজ করলে নিঃসন্দেহে সে মহাকল্যাণ লাভ করবে এবং অবশ্যই সে সফলকাম হবে। হযরত মুসা আ. ও ফেরআউনের ধারাবাহিক ঘটনা তার জ্বলন্ত সাক্ষী।
দুই. যে-ব্যক্তি তার যাবতীয় কাজকর্মে আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা রাখে ও নির্ভর করে এবং একমাত্র আল্লাহকেই খাঁটি অন্তরের সঙ্গে তাঁর পৃষ্ঠপোষক বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই যা যাবতীয় বিপদ-আপদ সহজ ও হালকা করে দেন। আল্লাহ তার সব বিপদকে মুক্তি সফলতায় রূপান্তরিত করে দেন। হযরত মুসা আ. কর্তৃক কিবতিকে হত্যা করা, হযরত মুসা আ.-কে হত্যা করার জন্য মিসরীয়দের সলাপরামর্শ করা, এরপর শত্রুদলের মধ্য থেকেই একজন সমব্যথী ব্যক্তি কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে মিসরীয়দের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করা, এভাবে তাঁর মাদয়ানের চলে যাওয়া, আল্লাহ তাআলার ওহি লাভের সম্মানে সম্মানিত হওয়া, রিসালাতের উচ্চ মর্যাদাশীল পদ লাভ করা তার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
তিন. আল্লাহ তাআলার সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক ইশক (প্রেম) পর্যন্ত পৌছে যায়, তাঁর কাছে বাতিলের বড় শক্তিও তুচ্ছ ও অস্তিত্বশূন্য হয়ে পড়ে। চিন্তা করুন, বস্তুবাদী শক্তির প্রেক্ষিতে হযরত মুসা আ. ও ফেরআউনের মধ্যে কী সম্পর্ক! এক নিঃসহায়, অক্ষম ও দুর্বল, অপর পক্ষ অজস্র রকমের প্রতাপ-প্রতিপত্তি, জাঁকজমক ও অহমিকায় পরিপূর্ণ। কিন্তু ফেরআউন তার রাজদরবারে সভাষদমণ্ডলীর সামনে হযরত মুসা আ.-কে বললো-
إِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا مُوسَى مَسْحُورًا
“হে মুসা, আমি মনে করি তুমি তো জাদুগ্রস্ত।” [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০১]
হযরত মুসা আ. তার জবাবে তৎক্ষণাৎ বললেন—
لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُورًا
‘মুসা বলেছিলো, “তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, এইসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন—প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। হে ফেরআউন, আমি তো দেখছি (এসব নিদর্শন অস্বীকার করার কারণে) তোমার ধ্বংস আসন্ন।” [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০২]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার এসব স্পষ্ট নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও ফেরআউনের নাফরমানি করার পরিণাম ধ্বংস ছাড়া কিছুই নয়।
চার. যদি আল্লাহ তাআলার কোনো বান্দা সত্যকে সাহায্য করার জন্য জীবন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাআলা বাতিলের পূজারীদের মধ্য থেকেই তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন।
আপনাদের সামনে হযরত মুসা আ.-এর দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। যখন ফেরআউন ও তার সভাষদবর্গ তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেললো, তখন তাদের মধ্য থেকেই একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি তৈরি হয়ে গেলেন, যিনি হযরত মুসা আ.-এর পক্ষ থেকে তাদের চক্রান্তের প্রতিবাদ করলেন। এমনিভাবে কিবতিকে হত্যা করার পর যখন তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিলো তখন একজন আল্লাহভক্ত কিবতি ব্যক্তি হযরত মুসা আ.-কে এ-ব্যাপারে সংবাদ দিলেন এবং মিসর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সৎ পরামর্শ দিলেন। মিসর থেকে বের হয়ে যাওয়া মুসা আ.-এর জন্য নানা ধরনের মহাসফলতার কারণ হয়েছিলো।
পাঁচ. একবারও যদি কেউ ঈমানের সুস্বাদ আস্বাদন করে নেয় এবং সত্য মনে ও খাঁটি অন্তরে তা গ্রহণ করে নেয়, তবে এই স্পৃহা তাকে এতটাই ব্যাকুল করে তুলে যে, তার প্রতিটি ধমনী থেকে শুধু সত্যের আওয়াজ ধ্বনিত হতে থাকে। এটা কি অলৌকিক ব্যাপার নয় যে, যে-জাদুকরেরা কয়েক মিনিট আগে ফেরআউনের মহাশক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার আদেশ পালন করাকে তাদের জীবনের রক্ষ-কবচ বানিয়ে নিয়েছিলো এবং যারা কলাকৌশলের সফলতার বিনিময়ে পুরস্কার ও মর্যাদালাভের আকাঙ্ক্ষা করছিলো, সেই জাদুকরেরাই কয়েক মিনিট পরে হযরত মুসা আ.-এর হাতে ঈমান আনলো। তারপর ঈমানের এতটাই বিমোহিত হয়ে গেলো যে, ফেরআউনের কঠোর থেকে কঠোরতম হুমকি এবং তার অত্যাচার ও শাস্তিদণ্ডকে খেল-তামাশার চেয়ে বেশি কিছু মনে করলো না। তারা বলতে লাগলো-
لَنْ نُؤْثِرَكَ عَلَى مَا جَاءَنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالَّذِي فَطَرَنَا فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا (سورة طه)
"আমাদের কাছে যে-স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার ওপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার ওপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দেবো না। সুতরাং তুমি করো যা তুমি করতে চাও। তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারো।” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৭২]
ছয়.
ধৈর্যের ফল সবসময় মিষ্ট হয়ে থাকে। ধৈর্যের ফল লাভ করতে যত দুঃখ-কষ্টই সহ্য করতে হোক না কেনো, তবুও সেই ফল মিষ্টই লাগবে। বনি ইসরাইল কত দীর্ঘকাল মিসরে নিঃসহায়তা, দাসত্ব ও দুর্দশা ও লাঞ্ছনাকর অবস্থার মধ্যে জীবন কাটিয়েছে। তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করা হয়েছে, মেয়ে সন্তানদেরকে দাসী হওয়ার অপমান সহ্য করতে হয়েছে। অবশেষে এমন সময় এলো, যখন তারা ধৈর্যের মিষ্ট ফল লাভ করলো। ফেরআউনের বিনাশ এবং বনি ইসরাইলের সম্মানজনক মুক্তি তাদের সব ধরনের সফলতার পথ উন্মুক্ত করে দিলো। যেমন:
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ الْحُسْنَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ بِمَا صَبَرُوا
'এবং বনি ইসরাইল সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের শুভ বাণী সত্যে পরিণত হলো, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৩৭।
সাত. দাসত্ব ও পরাধীনতার নিগড়ে বন্দি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া এই যে, সাহস ও সংকল্পের অনুভূতি ও স্পৃহা হীন হয়ে পড়ে এবং মরে যায়। মানুষ এই নোংরা ও অপবিত্র জীবনের নিরাপত্তা ও শান্তি কে নেয়ামত মনে করে। তারা তুচ্ছ আরাম-আয়েশকে সবচেয়ে বড় মহত্ব চিন্তা করে। চেষ্টা ও পরিশ্রমের জীবনধারার ক্ষেত্রে তাদেরকে অস্থির ও উদ্বিগ্ন দেখা যায়। বনি ইসরাইলিদের জীবনের চিত্রাবলিই এর জীবন্ত সাক্ষ্য। হযরত মুসা আ.-এর মুজেযা ও নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন, সাহস ও সংকল্পের দীক্ষাদান এবং তাদের সাফল্যের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করিয়ে দেয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে জীবনের চাঞ্চল্য, উদ্দীপনা ও দৃঢ়তার লক্ষণ দেখা যায় না। পদে পদে তাদেরকে অভিযোগ ও অস্থিরতা প্রকাশ করতে দেখা যায়।
পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সাহায্য করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও তারা মূর্তিপূজক শত্রুদের মোকাবিলা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যে-ঐতিহাসিক বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলো তা এ- কথার ন্যায্য সাক্ষী-
يَا مُوسَى إِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا أَبَدًا مَا دَامُوا فِيهَا فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِنَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ
“হে মুসা, তারা যতদিন ওখানে থাকবে ততদিন আমরা ওখানে প্রবেশ করবোই না; সুতরাং তুমি এবং তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ করো, আমরা এখানেই বসে থাকবো।" [সুরা মায়েদা: আয়াত ২৪]
আট. পৃথিবীর বা রাজ্যের উত্তরাধিক সেই জাতিরই প্রাপ্য যারা নিঃসহায়তা ও নিঃস্বতা থেকে নির্ভীক হয়ে এবং দৃঢ়সংকল্প ও সাহসের পরিচয় দিয়ে সব ধরনের বাধা-বিপত্তির মোকাবিলা করে। ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার সাহায্যের ভরসা করে প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ময়দানে দৃঢ়পদ থাকে।
নয়. মিথ্যার শক্তি যত বিশালই হোক এবং যতই প্রতাপ ও পরাক্রমশালী হোক, চূড়ান্ত বিচারে তাকে ব্যর্থকাম হতেই হবে, বিফলতার মুখ দেখতেই হবে। পরিণামে সাফল্যের মুকুট তাদের জন্যই নিশ্চিত যারা সৎকর্মপরায়ণ ও সাহসী। কারণ-
وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
'পরিণামে সাফল্য মুত্তাকিদের জন্যই অবধারিত।'
দশ. এটা আল্লাহ তাআলার চিরন্তর রীতি-অত্যাচারী ও উৎপীড়ক জাতিগুলো যেসব সম্প্রদায়কে হীন ও নীচ মনে করে, এমন এক দিন আসে, যখন ওই উৎপীড়িত ও নির্যাতিত জাতিগুলো আল্লাহ তাআলার জমিনের উত্তরাধিকারী এবং ক্ষমতা ও শাসনের অধিকারী হয়। অত্যাচারী জাতিগুলোর ক্ষমতা মাটির সঙ্গে মিশে যায়। হযরত মুসা আ. ও ফেরআউনের কাহিনি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
نُرِيدُ أَنْ نَمُنْ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ )) وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَنُرِيَ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُمْ مَا كَانُوا يَحْذَرُونَ (سورة القصص)
'আমি ইচ্ছা করলাম সে-দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিলো তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধিকারী করতে; এবং তাদেরকে দেশে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফেরআউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের (বনি ইসরাইলের) কাছে তারা আশঙ্কা করতো।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৫-৬]
এগারো. শক্তি ও শাসনক্ষমতা এবং ধন ও ঐশ্বর্যের মদে মত্ত জাতিগুলোর রীতি সবসময় এই ছিলো যে, তারাই সবার আগে সত্যের আহ্বান ও সত্যপ্রচারের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু জাতিগুলোর ইতিহাস সাক্ষ্য প্রদান করে যে, সবসময় সত্যের মোকাবিলায় তাদেরই পরাজয় ঘটেছে এবং পরিণামে তাদেরকেই বিফলতার মুখ দেখতে হয়েছে, ব্যর্থকাম হতে হয়েছে। এ-বিষয়ের সাক্ষী কেবল হযরত মুসা আ.-এর ঘটনাই নয়, বরং সকল নবী ও রাসুলের সত্যের আহ্বান ও সত্যপ্রচার এবং বিরুদ্ধ জাতিগুলোর বিরোধিতার পরিণাম ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে বাস্তবদর্শী মানুষের জন্য শিক্ষামূলক উপদেশ প্রদান করছে।
বারো, যে-ব্যক্তি বা যে-জাতি দেখে-শুনে ও জেনে সত্য সত্যরূপে উপলব্ধি করেও তার বিরোধিতা করে, আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত নিদর্শনসমূহের অস্বীকারকারী ও অমান্যকারী হয়, তার জন্য আল্লাহ তাআলার বিধান এই যে, তিনি তাদের সত্য গ্রহণের যোগ্যতা নিঃশেষ করে দেন। কেননা এটাই তাদের সার্বক্ষণিক অবাধ্যাচরণের স্বাভাবিক পরিণতি। যেমন-
سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ
'পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে দম্ভ করে বেড়ায় তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শন থেকে ফিরিয়ে দেবো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৬]
এই আয়াতের এবং একই অর্থবোধক অন্যান্য আয়াতের অভিপ্রায় এটাই যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তাআলা কাউকে নির্বুদ্ধিতা ও পথভ্রষ্টতার জন্য বাধ্য করেন।
তেরো. এটা অত্যন্ত মারাত্মক ভ্রষ্টতা যে, সত্যের বদৌলতে মানুষ সফলতা লাভ ও কৃতকার্য হওয়ার পর আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা, আনুগত্য, মিনতি ও বিনয়ের পরিবর্তে সত্যের বিরোধীদের মতো গাফলত ও অবাধ্যাচরণে, লিপ্ত হয়ে পড়ে। আফসোস! ফেরআউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করে লোহিত সাগর অতিক্রম করার পর থেকে বনি ইসরাইলের কাহিনির যে- অংশ শুরু হয়েছে তা উল্লিখিত ভ্রষ্টতা ও ভ্রান্তিতে ভরপুর।
চৌদ্দ. ধর্মীয় ব্যাপারে আরো একটি বড় ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা হলো মানুষের সততা ও সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মীয় বিধান না মানা এবং সেভাবে না চলা। আপন কু- প্রবৃত্তির অনুসরণ করে আল্লাহর বিধি-বিধানসমূহে ইচ্ছেমতো টালবাহানা করা। আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হয়ে এমন মনে করে বসা যে, মনস্কামও পূর্ণ হয়ে গেলো এবং ধর্মীয় বিধানও পালিত হলো। খারাপকে খারাপ মনে করে তাতে লিপ্ত হওয়া ততটা মন্দ ও নিন্দনীয় নয়, যতটা মন্দ ও নিন্দনীয় হলো খারাপকে ভালোরূপ দান করা এবং নিষিদ্ধ কার্যাবলিতে টালবাহানা করে তাকে জায়েয বানিয়ে নেয়া। এমন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের কাণেই অধিকাংশ জাতির ওপর আল্লাহপাকের আযাব নাযিল হয়েছে। ইহুদিরাও শনিবারের ব্যাপারে এই পন্থা অবলম্বন করেছিলো এবং আল্লাহ তাআলার শাস্তির উপযুক্ত হয়েছিলো। শনিবারে বনি ইসরাইলিদের জন্য শিকার করা নিষিদ্ধ ছিলো এবং গোটা দিনটি ইবাদতের জন্য নির্ধারিত ছিলো। তারা কিছুকাল ধৈর্যের সঙ্গে এই আদেশ মেনে চললো; কিন্তু বেশি দিন তারা তাদের ধৈর্যের ওপর অটল থাকতে পারলো না। তারা একটি বাহানা বের করলো ও ফন্দি আঁটলো। শনিবারের আগের রাতে নদীর ধারে গর্ত খনন করে নদীর সঙ্গে তার নালা যুক্ত করে দিতো। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ এসে তাদের গর্তে পড়তো। শনিবারের দিবস অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বনি ইসরাইলিরা ওই মাছগুলো ধরে ফেলতো। আল্লাহ তাআলার সৎকর্মপরায়ণ বান্দারা তাদের এই ঘৃণ্য কৌশলের প্রতিবাদ করলে তারা গর্বের সঙ্গে বলতো, আমরা শনিবারের মর্যাদা কখন ক্ষুণ্ণ করলাম যে তোমরা এসব প্রশ্ন উত্থাপন করছো? কিন্তু আল্লাহ তাআলার শাস্তি এসে যখন তাদেরকে পাকড়াও করলো, তারা বুঝতে পারলো ধর্মীয় ব্যাপারে টালবাহানা করা এবং নিকৃষ্ট কৌশল অবলম্বন করা কত বড় মারাত্মক অপরাধ।
পনেরো. সত্যকে কেউ গ্রহণ করুক বা না করুক—সত্যের প্রতি আহ্বানকারীর কর্তব্য হলো সত্যের উপদেশ প্রদান ও সত্যপ্রচারে বিরত না হওয়া। যেমন : শনিবারের মর্যাদা নষ্ট করায় তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন সৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি তাদেরকে বুঝালো। তাদের কয়েজন লোক এটাও বলেছিলো যে, এদেরকে বুঝানো নিষ্ফল। কিন্তু সত্যের প্রতি একনিষ্ঠ আহ্বানকারীরা জবাব দিলেন—
مَعْذِرَةً إِلَى رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ
কিয়ামতের দিন আমরা আল্লাহর কাছে এই ওজর তো পেশ করতে পারবো যে, আমরা অবিরাম সত্যের আহ্বান ও সত্যপ্রচারে লিপ্ত ছিলাম। অদৃশ্য জগতে কী রয়েছে সে-সম্পর্কে তো আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। আশ্চর্যের কী আছে যে তারা মুক্তাকি ও পরহেযগার হয়ে যাবে।
ষোলো. কোনো জাতির ওপর অত্যাচারী ও জালেম শাসক ক্ষমতাশীল হয়ে বসলে এটা প্রমাণিত হয় না যে, ওই অত্যাচারী শাসক আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয় ও সম্মানিত। অত্যচারী এবং দমন- ও নিপীড়নকারী শাসক মূলত আল্লাহ তাআলা আযাব ও শাস্তিবিশেষ; শাসিত জাতির কার্যকলাপের ফল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অত্যাচারী শক্তির প্রভাব শাসিত জাতির মস্তিষ্ককে এমনভাবে আচ্ছন্ন ও মোহগ্রস্ত করে ফেলে যে, তারা উৎপীড়ক শাসকের প্রতাপ ও প্রতিপত্তিকে তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত এবং নিজেদের কৃতকর্মের পুরস্কার বলে বিশ্বাস করে। যেমন: ফেরআউন ও বনি ইসরাইলের ইতিহাসের এই অংশ—যেখানে হযরত মুসা আ. বনি ইসরালিদেরকে ফেরআউনের শোষণের নিগড় থেকে মুক্ত করার জন্য তাদেরকে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করলেন আর তারা পদে পদে মুসা আ.-এর কাছে বার বার তাদের অভিযোগসমূহ উত্থাপন করলো এবং দাসত্বজর্জরিত সচ্ছল জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলো—উপরিউক্ত বক্তব্যের জ্বলন্ত প্রমাণ। কুরআন মাজিদ এ-বিয়ষটিকে নিম্নলিখিত অলৌকিক ভাষায় প্রকাশ করেছে—
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكَ لَيَبْعَثَنَّ عَلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ يَسُومُهُمْ سُوءَ الْعَذَابِ إِنَّ رَبُّكَ لَسَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَحِيمٌ (سورة الأعراف)
‘স্মরণ করো, তোমার প্রতিপালক ঘোষণা করেন যে, তিনি তো কিয়ামত পর্যন্ত তাদের ওপর এমন লোকদেরকে প্রেরণ করবেন যারা তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতে থাকবে, আর তোমার প্রতিপালক তো শাস্তিদানে তৎপর এবং তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।’ [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৬৭]
সতেরো, ফেরআউন ও তার কওমের অবাধ্যাচরণ যখন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌছে গেলো এবং সীমা লঙ্ঘন করলো, তখন হযরত মুসা আ. আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ, এই পাপিষ্ঠদেরকে তাদের আবাধ্যাচরণ ও নিকৃষ্ট কার্যকলাপের কারণে শাস্তি প্রদান করুন। কোনোভাবেই তারা সৎপথে আসছে না। কিন্তু যখনই হযরত মুসা আ.-এর দোয়া কবুল হওয়ার সময় আসতো এবং আল্লাহ তাআলার শাস্তির লক্ষণসমূহ প্রকাশ পেতে শুরু করতো, তৎক্ষণাৎ ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের লোকেরা হযরত মুসা আ.-এর কাছে আবদার করতো, যদি এবার আমাদের ওপর থেকে এই শাস্তি দূর হয়ে যায়, তবে আমরা অবশ্যই তোমার কথা মেনে নিবো। এরপর যখন ওই শাস্তি দূর হয়ে যেতো, তারা যথারীতি আগের মতোই অবাধ্যাচরণ করতে শুরু করতো। এভাবে দীর্ঘকাল পর্যন্ত তারা অবকাশ লাভ করলো। কোনোক্রমেই তারা তাদের নাফরমানি, বক্রতা ও অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত হলো না। অবশেষে অকস্মাৎ আল্লাহ তাআলার শাস্তি এসে তাদেরকে পাকড়াও করলো এবং চিরকালের জন্য বিলীন করে দিলো। এভাবে শনিবারের মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারীদেরও বার বার অবকাশ দেয়া হয়েছিলো; কিন্তু যখন তারা কোনোক্রমেই বিরত হলো না, আল্লাহ তাআলার শাস্তি এসে তাদেরকে ধ্বংস করে দিলো।
এই ঘটনা এবং প্রচীনকালের উম্মতদের এ-জাতীয় ঘটনাবলি এ-কথার প্রমাণ যে, কোনো জাতি বা সম্প্রদায় অসৎ কাজ ও আবাধ্যাচরণে লিপ্ত হলে আল্লাহ তাআলার নীতি এই যে, সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে পাকড়াও করা হয় না, শাস্তি দেয়া হয় না। তারা ক্রমশ অবকাশ লাভ করে। যাতে তারা নিজেদের অপরাধ বুঝতে পেরে তা থেকে বিরত হয় এবং নিজেদের অবস্থা সংশোধন করে নেয়। কিন্তু তারা যখন অপকর্ম থেকে বিরত হয় না, নিজেদের অবস্থা সংশোধনে তৎপর হয় না, আল্লাহ তাআলার পাকড়াও করার কঠিন হাত তাদেরকে পাকড়াও করে এবং তারা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
আঠারো. কোনো মানুষের পক্ষেই—তিনি নবীই হোন আর রাসুলই হোন—এমন দাবি করা সঙ্গত নয় যে, গোট জগতে তাঁর মতো জ্ঞানী বা বড় আলেম আর কেউই নেই। বরং, সবকিছু আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের ওপরই সোপর্দ করে দেয়া উচিত। কেননা, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন—
وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ
'প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির ওপরই একজন অধিক জ্ঞানী রয়েছেন।'
হযরত মুসা আ. উচ্চমর্যাদাশীল নবী ও রাসুল এবং নবুওতের যাবতীয় পূর্ণতাসূচক গুণের অধিকারী হওয়ার পর এই উক্তি করলেন যে, আমি বর্তমানে সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম ও জ্ঞানী। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে সতর্ক করে দিলেন এবং হযরত খিযির আ.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিলেন। আল্লাহ তাঁকে এই শিক্ষা প্রদান করলেন যে, সমস্ত পূর্ণতাসূচক গুণ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের রহস্যসমূহ অসীম ও ব্যাপক। রহস্যময় কয়েকটি বিষয়ের জ্ঞান তিনি একজন বুযুর্গ ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করেছেন। আর হযরত মুসা আ. সেই রহস্য বুঝতে অক্ষম হলেন।
উনিশ. ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের জন্য দাসত্ব মারাত্মক লানত ও অভিশাপ; আল্লাহ তাআলার একটি বড় শাস্তি। আর দাসত্বে তৃপ্তি ও মনোতুষ্টি লাভ করা আল্লাহ তাআলার আযাব ও গযবের প্রতি সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত হওয়ার শামিল। এ-কারণেই হযরত মুসা আ. ফেরআউনকে সত্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রথমেই দাবি করলেন—বনি ইসরাইলকে তোমার দাসত্ব ও গোলামি থেকে মুক্ত করে দাও। যাতে তারা আমার সঙ্গে থেকে স্বাধীনভাবে আল্লাহ তাআলার একত্বের অনুসারী ও তাঁর ইবাদতকারী হয়ে থাকতে পারে এবং তাদের ধর্মীয় জীবনের কোনো শাখাতেই যেনো অত্যাচারী ও কুফরি শক্তি প্রতিবন্ধক না হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বিষয়টিকে ব্যক্ত করেছেন এভাবে—
وَقَالَ مُوسَى يَا فِرْعَوْنُ إِنِّي رَسُولٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ () حَقِيقٌ عَلَى أَنْ لَا أَقُولَ عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقِّ قَدْ جِئْتُكُمْ بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَأَرْسِلْ مَعِيَ بَنِي إِسْرَائِيلَ (سورة الأعراف)
‘এবং মুসা বললো, “হে ফেরআউন, আমি তো জগৎসমূহের প্রতিপালকের কাছ থেকে প্রেরিত। এটা স্থির নিশ্চিত যে, আমি আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ব্যতীত বলবো না। (আমার জন্য এটা কখনোই শোভনীয় নয় যে, আমি আল্লাহ তাআলার সম্পর্কে সত্য ব্যতীত অন্যকিছু বলি।) আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ এনেছি, সুতরাং বনি ইসরাইলকে তুমি আমার সঙ্গে যেতে দাও।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১০৪-১০৫]
فَأْتِيَا فِرْعَوْنَ فَقُولَا إِنَّا رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ () أَنْ أَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ
"অতএব, তোমরা উভয়ে ফেরআউনের কাছে যাও এবং বলো, আমরা তো জগৎসমূহের প্রতিপালকের রাসুল। বনি ইসরাইলকে তুমি আমাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দাও।" [সুরা শুআরা: আয়াত ১৬-১৭]
সুরা শুআরার এই আয়াত এ-বিয়ষটির গুরুত্ব এত উঁচুতে তুলে ধরেছে যে, হযরত মুসা আ.-এর মতা উচ্চ মর্যাদাশীল ও উলুল আযম (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) নবীর নবুওতের উদ্দেশ্যই যেনো ছিলো আম্বিয়ায়ে কেরামের বিখ্যাত বংশ বনি ইসরাইলকে ফেরআউনের অত্যাচারী ও কুফরি শক্তির নিগড় থেকে মুক্ত করা এবং তাদেরকে স্বাধীনতা উপহার দেয়া।
তা ছাড়া সুরা আ'রাফের আয়াতগুলো যদি গভীর দৃষ্টি ও মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করা হয়, তবে তাতেও এ-বিষয়টিই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। হযরত মুসা আ. ফেরআউনের দরবারে প্রথমে তাঁর নবুওতের ঘোষণা দেন। তারপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হেয়ায়েতের দাওয়াত দেন। মুজেযা ও নিদর্শনসমূহের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেন। এরপর তিনি তাঁর নবুওত ও রিসালাতের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেন: 'বনি ইসরাইলকে তোমার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আমার সঙ্গে যেতে দাও।'
আবার এ-বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, নবুওত ও রিসালাতের দাবি পেশ করার পর হযরত মুসা আ. এক দীর্ঘকাল মিসরে অবস্থান করেছেন। তারপরও ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ওপর হেদায়েতের বিধান (তাওরাত) নাযিল হয় নি যতক্ষণ না তারা ফেরআউনের দাসত্ব ও গোলামি থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং অত্যাচারী শক্তির কবল থেকে মুক্তি লাভ করে পবিত্র ভূমিতে ফিরে এসেছে।
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
'সুতরাং, হে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানীগণ, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00