📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত মুসা আ.-এর ইন্তেকাল

📄 হযরত মুসা আ.-এর ইন্তেকাল


ইতোপূর্বে যেসব ধৈর্যের পরীক্ষামূলক অবস্থার কথা আলোচনা করা হয়েছে সেসব অবস্থায়ই হযরত মুস আ. যথারীতি বনি ইসরাইলের হেদায়েত ও সংশোধনের কাজে নিমগ্ন ছিলেন। একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) নবী রাসুল যেমন কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করে এবং সমস্ত বিরোধিতা ও শত্রুতা সহ্য করে ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন এবং সত্যের পথে অবিচল থাকেন হযরত মুসা আ. তা-ই করেছিলেন। অবশেষে তাঁর পরকালের ডাকে সাড়া দেয়ার সময় চলে এলো।
হযরত খিযির আ.-এর ঘটনা সম্পর্কে আরো অনেক বিচিত্র ও বিস্ময়কর বর্ণনা তাফসির ও ইতিহাসের কিতাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। গবেষকগণের মতে, তার সবগুলোই অমূলক ও ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে সংগৃহীত। সুতরাং নির্ভরযোগ্য নয়।
'দুই সমুদ্রের সংযোগস্থল'- এখানে কোন্ দুই সমুদ্র এবং তাদের সংযোগস্থল বলতে কোন্ স্থানটি উদ্দেশ্য, এ-সম্পর্কে মুফাস্সির ও ইতিহাসবেত্তাদের বিভিন্ন অভিমত বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের যাবতীয় অভিমতের মধ্যে কোনো অভিমতই মীমাংসামূলক নয়। অবশ্য যাঁরা সাগর দুটিকে ভূমধ্য সাগর ও লোহিত সাগর এবং তাদের সংযোগস্থল উদ্দেশ্য করেছেন তাঁরা কিয়াস ও যৌক্তিকতার নিকটবর্তী বলে মনে হয়। আর এটা যে-সময়ের ঘটনা, তখন সম্ভবত এই দুটি সাগরের মধ্যে একটি মিলনরেখা বিদ্যমান ছিলো। যার ওপর হযরত খিযির আ. ও হযরত মুসা আ.-এর মধ্যকার এই ঘটনা ঘটেছিলো। কেননা, মিসর থেকে বের হওয়া এবং তীহ ময়দানে অবস্থানের সময় বাহ্যিকভাবে এই দুটি সমুদ্রের সঙ্গেই এই ঘটনা সম্পর্কিত হতে পারে। হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ. বলেন, এটা ওই স্থান, যাকে আজকাল আকাবা নামে বিখ্যাত হয়েছে।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে হযরত মুসা আ.-এর ওফাতের ঘটনা বিবৃত হয়েছে এভাবে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ أُرْسِلَ مَلَكُ الْمَوْتِ إِلَى مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ فَلَمَّا جَاءَهُ صَكْهُ فَفَقَا عَيْنَهُ فَرَجَعَ إِلَى رَبِّهِ فَقَالَ أَرْسَلْتَنِي إِلَى عَبْدِ لَا يُرِيدُ الْمَوْتَ - قَالَ - فَرَدَّ اللَّهُ إِلَيْهِ عَيْنَهُ وَقَالَ ارْجِعْ إِلَيْهِ فَقُلْ لَهُ يَضَعُ يَدَهُ عَلَى مَتْنِ ثَوْرٍ فَلَهُ بِمَا غَطَّتْ يَدُهُ بِكُلِّ شَعْرَةٍ سَنَةٌ قَالَ أَيْ رَبِّ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ الْمَوْتُ. قَالَ فَالآنَ فَسَأَلَ اللَّهَ أَنْ يُدْنِيَهُ مِنَ الْأَرْضِ الْمُقَدِّسَةِ رَمْيَةٌ بِحَجَرٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم- فَلَوْ كُنْتُ ثُمَّ لأَرَيْتُكُمْ قَبْرَهُ إِلَى جَانِبِ الطَّرِيقِ تَحْتَ الْكَثِيبِ الْأَحْمَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, যখন হযরত মুসা আ.-এর ওফাতের সময় নিকটবর্তী হলো, তখন মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, 'আপনার প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিন।' হযরত মুসা আ. মৃত্যুর ফেরেশতাকে এমন চপেটাঘাত করলেন যে তাঁর একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেলো। তখন তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে গিয়ে অভিযোগ পেশ করলেন, 'আপনার ওই বান্দা মরতে ইচ্ছুক নন। আরো ব্যাপার এই যে, তিনি আমাকে এক চড় কষিয়েছেন।' আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় মৃত্যুদূতের চোখ ভালো হয়ে গেলো। তাঁর প্রতি আদেশ হলো, তুমি মুসার কাছে গিয়ে বলো, আল্লাহপাক আপনাকে বলেছেন, 'হে মুসা, কোনো বলদের কোমরের ওপর তোমার হাত রেখে দাও। যে-পরিমাণ পশম তোমার হাতের মুঠোর তলায় আসবে আমি তার প্রতিটি পশমের পরিবর্তে তোমার আয়ু এক বছর বাড়িয়ে দেবো।' ফেরেশতা আবার মুসা আ.-এর খেদমতে গিয়ে তাঁকে আল্লাহ তাআলার বাণী শুনালেন। হযরত মুসা আ. বললেন, 'হে আল্লাহ, এই আয়ু বৃদ্ধির পরিণাম কী হবে?' আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জবাব এলো, 'অবশেষে ওই মৃত্যুই।' হযরত মুসা আ. বললেন, 'যদি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম জীবনেরও পরিণাম মৃত্যুই হয়, তবে মৃত্যু আজকেই আসুক।' এরপর তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, 'ইয়া রাব্বুল আলামিন, এই অন্তিম সময়ে আমাকে পবিত্র ভূমির নিকটবর্তী করে দিন।'
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, 'আমি যদি ওখানে যেতে পারতাম তাহলে তোমাদেরকে হযরত মুসা আ.-এর কবরের চিহ্ন দেখিয়ে দিতে পারতাম : তিনি লাল টিলার (কাসিবে আহমার) কাছে এই স্থানে সমাহিত হয়েছেন।
জিয়া মুকাদ্দেসি বলেন, 'আরিহা নামক স্থানে লাল টিলার (কাসিবে আহমার) কাছে একটি সমাধি রয়েছে। একে হযরত মুসা আ.-এর সমাধি বলা হয়ে থাকে।' জিয়া মুকাদ্দেসির উক্তিটি অন্যান্য ভাষ্যের তুলনায় বিশুদ্ধ। কেননা, পবিত্র ভূমির আরিহা জনপদটিই তীহ প্রান্তরের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছিলো এবং এখানেই কাসিবে আহমার বা লাল টিলা অবস্থিত, যার উল্লেখ হাদিস শরিফে রয়েছে।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের উল্লিখিত হাদিসে মৃত্যুর ফেরেশতার সঙ্গে হযরত মুসা আ.-এর যে-ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে-সম্পর্কে ইবনে কুতাইবা' বলেন, তা একটি প্রতীকি ঘটনা।
আমাদের মতে, এই ঘটনায় মানুষের জীবন ও মৃত্যুর বিষয়টিকে এমন ভঙ্গিতে বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে এই শৃঙ্খলের যাবতীয় আবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ কড়াগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, যাতে এ-কথা প্রকাশিত হয়ে পড়ে যে, মানুষ যদি নবুওত ও রিসালাতের গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত থাকে, তবুও সে মানবিক স্বভাবের কারণে মৃত্যুকে একটি অপছন্দনীয় ব্যাপারই মনে করে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন তার সামনে মৃত্যুর স্বরূপ উন্মোচিত করে দেন, তখন তাঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত বান্দাগণের জন্য তা সর্বাধিক পছন্দনীয় বিষয় হয়ে ওঠে। তা ছাড়া এটাও যেনো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মৃত্যু কারো কাছে প্রিয় ও পছন্দনীয়ই হোক আর ঘৃণ্য ও অপছন্দনীয়ই হোক, চূড়ান্ত বিচারে তা একটি অটল আদেশ। এর থেকে কোনো অবস্থাতেই পলায়নের পথ নেই। আমাদের এই কামনা করা উচিত নয় যে, আমাদের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পাক; আমাদের এই আকাঙ্ক্ষা করা উচিত যে, জীবনের যে-সময়টুকু আমরা লাভ করেছি তা যেনো পবিত্রতা ও উন্নত চরিত্রের সঙ্গে পূর্ণ হয়। যাতে আল্লাহ তাআলার রহমত লাভ করা যায় এবং মৃত্যু সত্যিকারের অনন্ত জীবনে পরিণত হয়।
সুতরাং, এখন আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত উল্লিখিত হাদিসের বাক্যগুলোর ব্যাখ্যা এমনই হওয়া সমীচীন। হযরত মুসা আ.-এর খেদমতে প্রথম যখন মৃত্যুর ফেরেশতা আগমন করলেন তখন তিনি মানুষের আকৃতিতে আগমন করেছিলেন। হযরত মুসা আ. তাঁকে এই অবস্থায় দেখে চিনতে পারেন নি। যেমন : হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত লুত আ. আযাবের ফেরেশতাগণকে প্রথমে চিনতে পারেন নি।
হযরত মুসা আ.-এর কাছে এটা অপছন্দনীয় ব্যাপার মনো হলো যে, একজন অপরিচিত লোকের বিনা অনুমতিতে তাঁর নির্জন কক্ষে ঢুকে পড়া এবং তাঁকে মৃত্যুর সংবাদ দেয়ার কী অধিকার থাকতে পারে? এই ভেবে তিনি মৃত্যুদূতের গালের ওপর সজোরে চড় কষালেন। ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে এসেছিলেন। মানুষের মুখে চড় কষালে যে-ফল দাঁড়ায়, এখানেও তা-ই ঘটলো। ফেরেশতার একটি চোখ বিনষ্ট হয়ে গেলো। কিন্তু আযাবের ফেরেশতারা ধীরে ধীরে হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত লুত আ.-এর কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন, আর মুসা আ.-এর ক্ষেত্রে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁকে কোনো কিছু না জানিয়ে তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে গিয়ে পৌঁছলেন। আল্লাহ তাআলা পুনরায় তাঁকে ফেরেশতার আকৃতিতে ফিরিয়ে নিলেন এবং এভাবে তিনি ওই ক্ষত থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। যা মানবাকৃতিতে থাকার অবস্থায় চোখ হারানো ফলে সৃষ্টি হয়েছিলো।
মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত মুসা আ.-এর মনোভাব বুঝতে না পেরে মনে করলেন, হযরত মুসা আ. মৃত্যুর নাম শুনে ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেছেন এবং তিনি মৃত্যু চান না। তাই তিনি আল্লাহর দরবারে গিয়ে বললেন, 'আপনার এই বান্দা মৃত্যু চান না।' আল্লাহ তাআলা ফেরেশতার ভুল বুঝা এবং হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা উভয়টি প্রকাশ করার জন্য ফেরেশতাকে বললনে, 'তুমি আবার যাও এবং মুসাকে আমার এই পয়গাম শোনাও।' একটি ফেরেশতা আল্লাহর পক্ষ থেকে পয়গাম লাভ করছিলেন আর অপর দিকে হযরত মুসা আ. অপরিচিত লোকটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ফলে সঙ্গে সঙ্গে অনুধাবন করে ফেললেন যে, এটা মানবীয় ব্যাপার থেকে ভিন্ন, অন্য জগতের বিষয়। এরপর মৃত্যুর ফেরেশতা যখন পুনরায় এসে হযরত মুসা আ.-কে আল্লাহ তাআলার পয়গাম শুনালেন, তখন মুসা আ.-এর সুর ও কথা-বার্তার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হয়ে গেলো। অবশেষে তিনি সর্বোচ্চ বন্ধুর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হলেন। আর মৃত্যু নিকটবর্তী হওয়ার সময় যে-কয়েকটি ঘণ্টা ছিলো, তা এইভাবে মৃত্যুর পূর্বে উপদেশ ও নসিহত গ্রহণের উপকরণ হয়ে থাকলো।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের উল্লিখিত হাদিসের ভাবার্থের এটাই সবচেয়ে যথার্থ বিশ্লেষণ। এ-প্রসঙ্গে উলামায়ে কেরামের মধ্যে যেসব জটিলতা ও জিজ্ঞাসা আলোচিত হয়ে থাকে, এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার সমাধান হয়ে যায়।
তাওরাত ও ইতিহাসের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত মুসা আ.-এর বয়স হয়েছিলো একশো বিশ বছর। আর হযরত ইবরাহিম আ.-এর ইন্তেকাল ও হযরত মুসা আ.-এর জন্মের মধ্যবর্তী সময় প্রায় দুইশো পঞ্চাশ বছর।
তাওরাতের বিভিন্ন অংশে হযরত মুসা আ.-এর ইন্তেকালের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে এক অংশে নিম্নরূপে বর্ণিত হয়েছে: "আর মুসা 'মু-আব'-এর প্রান্তরগুলোর মধ্য থেকে 'বনু'র পর্বতশ্রেণির 'পসগা'র চূড়ায় আরোহণ করলেন, যা 'আরিহু' (আরিহা) নামক জনপদের সামনে অবস্থিত। আল্লাহ তাআলা 'জালআদ' থেকে শুরু করে 'রান' পর্যন্ত সমস্ত ভূমি তাঁকে দেখালেন। আর পেছনের সমুদ্র পর্যন্ত 'নাফতালে'র সমগ্র ভূমি, দক্ষিণের রাজ্য, আরিহু (আরিহা) উপত্যকা, যা ছিলো ধনভাণ্ডারের শহর এবং আরিহু উপত্যকার 'সুগার' প্রান্তর পর্যন্ত মুসা আ.-কে দেখালেন। আর আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, এটাই সেই রাজ্য, যার ব্যাপারে আমি ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবকে কসম খেয়ে বলেছিলাম, এই রাজ্য আমি তোমাদের বংশধরদেরকে দান করবো। সুতরাং আমি এই ব্যবস্থা করলাম, যেনো তুমি তা নিজের চোখে দেখতে পাও। তুমি কিন্তু ওখানে যেতে পারবে না। এরপর আল্লাহ তাআলার বান্দা আল্লাহর কথা অনুযায়ী 'মু-আব' রাজ্যে ইন্তেকাল করলেন এবং ওখানে 'মু-আব'-এর একটি উপত্যকায় 'বাইতে ফাগফুরে'র সামনে তাঁকে সমাহিত করা হলো। আজ পর্যন্ত তাঁর সমাধি সম্পর্কে কেউই অবগত নয়। আর মৃত্যুর সময় মুসা আ.-এর বয়স হয়েছিলো একশো বিশ বছর। অথচ তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ঝাঁপসা হয় নি এবং তাঁর দেহের স্বাভাবিক শক্তিও দুর্বল হয় নি।"

টিকাঃ
১৪০ বিস্তরাতি আলোচনার জন্য দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড: আল-বাহরুল মুহিত, ২য় খণ্ড; রুহুল মাআনি, ১৫শ খণ্ড: উমদাতুল কারি শারহু সহিহিল বুখারি, বদরুদ্দিন আল-আইনী, ৭ম খণ্ড; আল-ইসাবা, ১ম খণ্ড।
১৪১ সহিহ বুখারি: হাদিস ৩২২৬; সহিহ মুসলিম: হাদিস ৬২৯৭।
১৪২ ফাতহুল বারি, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩।
১৪৩ আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বিন মুসলিম বিন কুতাইবা আদ-দিনুরি (৮২৮-৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: تأويل مشكل القرآن تأويل مختلف الحديث كتاب الاختلاف في اللفظ الرد على الجهمية والمشبهة كتاب الصيام، دلالة النبوة إعراب القرآن تفسير غريب القرآن।
১৪৪ ফাতহুল বারি, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩।
১৪৫ ইস্তিসনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩৪, আয়াত ১-৭।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বনি ইসরাইলের জাতিগত স্বভাব এবং নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দেয়া

📄 বনি ইসরাইলের জাতিগত স্বভাব এবং নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দেয়া


হযরত মুসা আ. এবং বনি ইসরাইলের ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে পাঠ করলে যে-বিষয়টি সর্বপ্রথম চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা হলো বনি ইসরাইলিদের এক বিচিত্র ধরনের পরিবর্তনশীল স্বভাব। অবাধ্যাচরণ, অনুগ্রহ ভুলে যাওয়া, কলহ-বিবাদ বিস্তার, হিংসা-বিদ্বেষ তাদের জাতিগত স্বভাবের মূল উপাদান বলে পরিলক্ষিত হয়। খুব সম্ভব, তাদের জাতিগত স্বভাবের এই বিশৃঙ্খলা ও হীনতা কয়েক শতাব্দীর দাসত্বের ফল ছিলো। কেননা, যাবতীয় দোষের মধ্যে দাসত্ব এমন একটি দোষ যা মানুষের মধ্যে চরিত্রিক নীচতা, হীনতা ও হিংসা-বিদ্বেষের মতো অপবিত্র ও হীন স্বভাব সৃষ্টি করে দেয়।
বলা বাহুল্য, এমন জাতিকে সরল পথে আনয়ন করা বা সরল পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য নবী ও রাসুলগণকে কঠিন থেকে কঠিনতম প্রতিকূল অবস্থার শিকার হতে হয় এবং দুরতিক্রম্য মঞ্জিলসমূহের সম্মুখীন হতে হয়। এবং এটাই সবসময় হয়ে এসেছে। আর বনি ইসরাইলের জীবনে হযরত মুসা আ.-ই প্রথম নবী, যাঁর নবীসুলভ প্রচেষ্টায় তারা দাসত্ব থকে মুক্তি লাভ করেছে এবং জীবনে স্বাধীনতার সুখ ভোগ করার সুযোগ পেয়েছে। সুতরাং, মুসা আ.-কেই বনি ইসরাইলের জাতিগত নিকৃষ্ট স্বভাবের সম্মুখীন হওয়া এবং তাদের চরিত্র সংশোধনের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতম দুঃখ-যন্ত্রণাসমূহ সহ্য করতে হয়েছে।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেও এমন জাতির সংশোধন ও হেদায়েতের জন্য বিধান (তাওরাত) নাযিল করা ছাড়াও বহু সংখ্যক মুজেযা ও নিদর্শন প্রদর্শন করা হয়েছে। যেনো এভাবে তাদের পরিবর্তনশীল বিভ্রান্তিমূলক স্বভাবের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য তৈরি হয় এবং তাদের মধ্যে সত্য গ্রহণ করা এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার যোগ্যতা সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদের সুরা বাকারা, সুরা আ'রাফ ও সুরা ইবরাহিমে এসব নিদর্শন বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, 'সময়সাময়িক জাতিগুলোর মধ্যে বনি ইসরাইলই ছিলো তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ এবং দান ও ইহসানের কেন্দ্রস্থল।'
কিন্তু আফসোস! এসব নেয়ামত ও দয়া এবং ক্ষমা ও অনুগ্রহ অধিক হওয়া সত্ত্বেও বনি ইসরাইলের অবাধ্যাচার, নাফরমানি, বিদ্রোহ ও চারিত্রিক পরিবর্তন মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো এবং থেমে থেমে আত্মপ্রকাশ করতো। অবশেষে তারা আল্লাহ তাআলার চিরস্থায়ী লানত ও গযবকে তাদের গর্বের উপকরণ বানিয়ে নিলো। এভাবে তারা চিরকালের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান থেকে বঞ্চিত হওয়ার কলঙ্ক বরণ করে নিলো।
সুরা বাকারার আয়াতগুলোতে যা বলা হয়েছে তা এই-
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ
'হে বনি ইসরাইল, আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ করো যার দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছিলাম।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৪০, ৪৭, ১২২]
وَإِذْ نَجَّيْنَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ
'স্মরণ করো, যখন আমি ফেরআউনি সম্প্রদায় থেকে তোমাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলাম।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৪৯]
وَإِذْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَالْفُرْقَانَ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
'আর যখন আমি মুসাকে কিতাব ও ফুরকান দান করেছিলাম যাতে তোমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হও।' (সুরা বাকারা: আয়াত ৫৩]
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نَصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ
'স্মরণ করো, যখন তোমরা বলেছিলে, হে মুসা, আমরা একই রকম খাদ্যে কখনো ধৈর্য ধারণ করবো না।' (সুরা বাকারা: আয়াত ৬১)
وَإِذِ اسْتَسْقَى مُوسَى لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَالْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا
'স্মরণ করো, যখন মুসা তার সম্প্রদায়ের জন্য পানি প্রার্থনা করলো, আমি বললাম, "তুমি লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করো। ফলে তা থেকে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬০]
সুরা আ'রাফে যে-অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে তা এই-
وَإِذْ أَنْجَيْنَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ يُقَتَّلُونَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ
'স্মরণ করো, আমি তোমাদেরকে ফেরআউনের অনুসারীদের হাত থেকে উদ্ধার করেছি যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিতো। তারা তোমাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করতো এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখতো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ৪১]
সুরা ইবরাহিমে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ أَنْجَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, “হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তিনি তোমাদেরকে ফেরআউনি সম্প্রদায় থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন।' [সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৬]
উল্লিখিত আয়াতসমূহে এসব ঘটনারই আলোচনা রয়েছে এবং চক্ষুষ্মান লোকদের উপদেশ গ্রহণের জন্য শত-সহস্র উপকরণ রয়েছে।
অবশ্য কুরআন মাজিদ বনি ইসরাইলের জাতীয় জীবনের যে-চিত্র অঙ্কন করেছে, তাওরাতেও তার দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। এসব বিষয় সামনে রেখে এই প্রশ্ন উত্থাপিত করা যায় যে, আল্লাহ তাআলা এমন এক জাতিকে এত নেয়ামত ও ফযিলতের জন্য কেনো মনোনীত করলেন? সমস্ত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয়ের পরিজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলা প্রথম থেকেই কেনো এই অবাধ্যাচারী দুর্বিনীত জাতিকে পরিত্যাগ করলেন না এবং নেয়ামত ও ফযিলতের ধারা অন্য জাতির প্রতি ফিরিয়ে দিলেন না?
এই জিজ্ঞাসার জবাব এই যে, আপনারা যদি সে-যুগের ইতিহাস পাঠ করেন এবং علم الاجتماع (sociology /সমাজবিজ্ঞান) এবং (anthropology /নৃবিজ্ঞান)-এর মূলনীতিগুলো অধ্যয়ন করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, যখন থেকে বিশ্বজগতে মানবজাতির ইতিহাস অস্তিত্ব লাভ করেছে তখন এ-বিষয়টি পরিষ্কার ও স্পষ্ট যে, পৃথিবীর জাতিগুলোর সভ্যতা ও সামাজিক অবস্থা এবং তাদের রাজনীতি ও ধর্মনীতির ওপর সামি (Semitic) গোত্রসমূহের প্রভাব ও প্রাধান্য বিরাজমান।
ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের গভীর তল পর্যন্ত পৌছার পরও এমন কোনো জাতি দেখা যায় না যারা ওপর সামি (Semitic) অর্থাৎ, হযরত নুহ আ.-এর পুত্র সামের বংশধর গোত্রসমূহের প্রভাবে প্রভাবিত নয়। কুরআন মাজিদ যে-যুগের অবস্থা বর্ণনা করছে, সে-যুগে এই ভূ-পৃষ্ঠের ওপর ও আকাশের নিচে কাছে ও দূর-দূরান্তে সেসব সামি সম্প্রদায় বসবাস করতো, ইতিহাস তাদেরকে আমালিকা, কিবতি, কিনআনি, আন্নাকিম, সামিরি ইত্যাদি নামে স্মরণ করেছে।
এই জাতিগুলোর সভ্যতা সিরিয়া, ফিলিস্তিন, পূর্ব জর্ডান, মিসর ও ইরাকে দীপ্তিমান ছিলো। কিন্তু এই জাতিগুলোর মধ্যে শিরকি, কুফরি, বিদ্রোহ, অবাধ্যতা, অত্যাচার ও উৎপীড়নের যে-ভয়ঙ্কর অবস্থা বিরাজমান ছিলো, তার সামনে বনি ইসরাইলের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা অনেকাংশে উৎকৃষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। আর সমসাময়িক জাতিগুলোর মধ্য থেকে তাদের ভেতর সত্য গ্রহণের যোগ্যতা কিছুটা নিশ্চিত হওয়ার উপযোগী ছিলো। মিসরের ফেরআউন ও মিসরীয়দের ঘটনাবলি এবং কিবতি সম্প্রদাগুলোর অবস্থা ইতোপূর্বে আপনারা পাঠ করেছেন। আর কিনআনি ও আমালিকা সম্প্রদায়গুলোর ঘটনাবলি কিছু পরেই আপনাদের চোখের সামনে আসবে। আর সামিরি গোত্রের অবস্থা তাদের জনৈক সরদার 'সামিরি'র অবস্থা থেকে সহজেই অনুমিত হতে পারে।
এমনিই ছিলো তখনকার পরিবেশ ও অবস্থা যার ভিত্তিতে হেদায়েত ও সৎপথ প্রদর্শনের জন্য বনি ইসরাইলকে মনোনীত করা হয়েছে। আর ইতিহাস এ-বিষয়ের প্রমাণ দিচ্ছে যে, বনি ইসরাইলের ব্যাপক দুর্ভাগ্য সত্ত্বেও তাদেরই ক্ষুদ্র একটি দলের মাধ্যমে দীর্ঘকাল পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার হেদায়েতের বাণী মানব-সমাজে পৌঁছেছিলো। হাজার হাজার বছর পরে বনি ইসরাইলের বংশ থেকে এই নিয়ামত (নবুওত) ছিনিয়ে নিয়ে বনি ইসমাইল, অর্থাৎ হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধরের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
মোটকথা, হেদায়েত ও নসিহতের জন্য বনি ইসরাইলকে মনোনীত করা তাদের পবিত্রতার প্রেক্ষিতে ছিলো না; বরং উদ্দেশ্য ছিলো তাদের মাধ্যমে তাদের চেয়েও বেশি নৈরাজ্য ও ফেতনা-ফাসাদ বিস্তারকারী শক্তিগুলোকে খর্ব ও দমিত করা। এ-কারণে তাদের আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলির অনুগত করা এবং তাদেরকে সৎপথে আনার জন্য যাবতীয় কিছু করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের যুবকশ্রেণিকে দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করিয়েছেন।
আর তাওরাতও এখানে এই সত্যকে নিম্নবর্ণিত চমৎকার ভাষায় ব্যক্ত করেছে:
"শুনে রাখো হে বনি ইসরাইল, আজ তোমাদেরকে ইয়াদুনের তীরে এইজন্য যেতে হবে যাতে তোমরা জয়লাভ করো এমন জাতিগুলোর বিরুদ্ধে যারা তোমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী; এবং দখল করো এমনসব শহর যেগুলোর প্রাচীরসমূহ আকাশের সঙ্গে সংলাপ করছে। ওখানে আছে আন্নাকিমের বংশধরেরা। তারা বিশাল দেহী ও দুর্দান্ত। তোমরা তোমাদের অবস্থা অবগত আছো, আর তাদের সম্পর্কে লোকদেরকে এ-কথা বলতে শুনেছো যে, আন্নাকিম গোত্রের সঙ্গে কেউই মোকাবিলা করতে পারবে না। সুতরাং, আজ তোমরা জেনে রাখো, আল্লাহ তাআলার—তোমাদের প্রতিপালক—তোমাদের সম্মুখভাবে ভস্মকারী আগুনের মত গমন করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন। তিনি তাদেরকে তোমাদের সামনে অবনমিত করে দেবেন এমনভাবে যে, তোমরা তাদেরকে ওখান থেকে বের করে এনে অতিদ্রুত ধ্বংস করে ফেলবে। যেমন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে বলছেন। তোমাদের প্রতিপালক যখন তাদেরকে তোমাদের সামনে থেকে বের করে দেবেন তখন তোমরা মনে মনে এমন কথা বলো না যে, আমাদের সততার ফলে আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে এই রাজ্য অধিকার করার জন্য এখানে নিয়ে এসেছেন। কেননা, প্রকৃত পক্ষে ওই সম্প্রদায়গুলোর খারাপ কাজের কারণে তোমাদের সামনে থেকে তাদেরকে বের করে দিচ্ছেন। তোমরা নিজেদের সততা ও আন্তরের সদ্ভাবের কারণে ওই রাজ্যকে অধিকার করতে যাচ্ছো না। বরং তোমাদের প্রতিপালক ওই সম্প্রদায়গুলোর খারাপ কাজের কারণে তাদেরকে তোমাদের সামনে থেকে বের করছেন। যেনো এই উপায়ে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন। তিনি তোমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহিম, ইয়াকুব ও ইসহাকের সঙ্গে কসমের সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মোটকথা, তোমরা বুঝে নাও, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের সততার কারণে ওই উত্তম রাজ্যকে তোমাদের দখল করে নিতে দিচ্ছেন না। কেননা, তোমরা একটি হত্যাকারী কওম। এ-কথা তোমরা স্মরণ রেখো এবং কখনো ভুলো না যে, তীহ প্রান্তরে তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে কীভাবে ক্রোধান্বিত করেছো। বরং যখন তোমরা মিসর থেকে বের হয়েছে তখন থেকেই সর্বক্ষণ তোমাদের প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণই করে যাচ্ছো। "

টিকাঃ
১৪৬ এই ঐতিহাসিক আলোচনা বিস্তারিত ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী; কিন্তু এখানে এর চেয়ে বেশি বলার সুযোগ নেই।
১৪৭ তাওরাত: ইস্তিসনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৯, আয়াত ১-৭।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কুরআন মাজিদে হযরত মুসা আ.-এর প্রশংসা ও ফযিলত

📄 কুরআন মাজিদে হযরত মুসা আ.-এর প্রশংসা ও ফযিলত


কুরআন মাজিদে এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসসমূহে হযরত মুসা আ.-এর ফযিলত এবং বনি ইসরাইলের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে তাঁর উচ্চ মর্যাদা, মাহাত্ম্য যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, তা থেকে এ-কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, খাতিমুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুজাদ্দিদে আম্বিয়া হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর পরেই হযরত মুসা আ. 'উলুল আযম' নবী ও রাসুল এবং অন্য নবী ও রাসুলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা ও মরতবার অধিকারী।
অন্যকথায় এভাবে বলুন, হযরত মুসা আ.-এর শৈশব থেকে মৃত্যু অবধি কালের ঘটনাবলি এমন বিস্ময়কর ও বিচিত্র নিয়মে অতিবাহিত হয়েছে যে, তা পাঠ করলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বলতে হয়, হযরত মুসা আ. অতি উচ্চ মর্যাদাশীল রাসুল ছিলেন। এটাও মেনে নিতে হয় যে, ফেরআউন, ফেরআউনের সম্প্রদায় এবং বনি ইসরাইলিদের হাতে হযরত মুসা আ. যে-ক্লেশ ও যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন এবং তাদের অবস্থার সংশোধনের জন্য যে-ধরনের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন, তার দৃষ্টান্ত নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ইবরাহিম আ. ব্যতীত অন্যকোনো নবী ও রাসুলের জীবনে পাওয়া যায় না।
কুরআন মাজিদ জায়গায় জায়গায় হযরত মুসা আ.-এর ঘটনাবলির মাধ্যমে এইজন্য সাক্ষ্য পেশ করেছে যে, উম্মত ও গোত্রসমূহের শৈথিল্য, সত্য বিমুখতা, বরং অবাধ্যতা, বিরোধিতা ও শত্রুতা, নবীগণকে অপমান করা, অপদস্থ করা, যন্ত্রণা দেয়া আর অপরদিকে নবী ও রাসুলগণের ধৈর্য ও সহনশীলতা, পথভ্রষ্ট উম্মত ও জাতির সংশোধন এবং তাদের হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য অবিরাম চেষ্টা ও পরিশ্রম করার এত অধিক পরিমাণ উপকরণ আর কোথাও পাওয়া যায় না, যা হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের ঘটনাবলিতে সন্নিহিত রয়েছে।
সুতরাং, কুরআন মাজিদের আয়াতের মাধ্যমে হযরত মুসা আ.-এর উচ্চ মর্যাদাশীল ও 'উলুল আযম' নবী ও রাসুল হওয়াই প্রমাণিত হয়, যা তাঁর ঘটনাবলি ব্যক্ত করছে। আর নিম্নলিখিত আয়াতগুলোতে বিশেষভাবে তাঁর প্রশংসা ও ফযিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে হারুন আ.-এর প্রশংসা করা হয়েছে।
যেমন: সুরা মারইয়ামের নিম্নলিখিত আয়াতে বলা হয়েছে-
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى إِنَّهُ كَانَ مُخلَصًا وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا () وَنَادَيْنَاهُ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ الْأَيْمَنِ وَقَرِّبْنَاهُ نَجِيًّا ( وَوَهَبْنَا لَهُ مِنْ رَحْمَتِنَا أَخَاهُ هَارُونَ نَبِيًّا (سورة مريم)
'স্মরণ করো এই কিতাবে মুসার কথা, সে ছিলো বিশেষ মনোনীত এবং সে ছিলো রাসুল, নবী। তাকে আমি আহ্বান করেছিলাম তুর পাহাড়ের দক্ষিণ দিক থেকে এবং আমি অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছিলাম। আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভাই হারুনকে নবীরূপে।' [সুরা মারইয়াম: আয়াত ৫১-৫৩]
সুর আ'রাফে বর্ণিত আছে-
قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَاتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُنْ من الشاكرين (سورة الأعراف)
'তিনি (আল্লাহ তাআলা) বললেন, “হে মুসা, আমি তোমাকে আমার রিসালাত (রাসুলের মর্যাদা ও দায়িত্ব) ও আমার বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি; সুতরাং আমি যা (তাওরাত কিতাব) দিলাম তা গ্রহণ করো এবং কৃতজ্ঞ হও।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৪]
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের বার্ণিত হাদিসে আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لَا تُخَيِّرُونِي عَلَى مُوسَى فَإِنَّ النَّاسَ يَصْعَقُونَ فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ بُعِثَ أَوْ فِي أَوَّلِ مَنْ بُعِثَ فَإِذَا مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ آخِذٌ بِالْعَرْشِ فَلَا أَدْرِي أَحُوسِبَ بِصَعْقَتِهِ يَوْمَ الطُّورِ أَوْ بُعِثَ قَبْلِي.
"আমাকে হযরত মুসা আ.-এর ফযিলত প্রদান করো না। কেননা, কিয়ামতের দিন সকল মানুষ সেদিনের বিভীষিকায় বেহুঁশ হয়ে পড়ার পর যে-ব্যক্তি সর্বপ্রথম জ্ঞান ফিরে পাবে, সে হবো আমি। কিন্তু আমি উঠে দেখবো যে, মুসা আ. আরশের পায়া ধরে দণ্ডায়মান রয়েছেন। আমি বলতে পারি না যে, তিনি কি আমার পূর্বে চেতন লাভ করেছেন না তুর পাহাড়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ার বিনিময়ে আজকের বেহুঁশ হওয়া থেকে তাঁকে মুক্ত রাখা হয়েছে।"
ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উক্তি—'আমাকে মুসার ওপর ফযিলত প্রদান করো না'—তাঁর বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ ছিলো। অন্যথায়, তিনি নিজেই অন্য সময়ে বলেছেন, وانا سيد ولد آدم يوم القيامة ولا فخر 'আমি গর্ব প্রকাশ ছাড়াই বলছি যে, কিয়ামতের দিন আমিই সমস্ত আদম-সন্তানের সরদার।' তাঁর খাতিমুন নাবিয়ি‍্যন হওয়াই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে কিয়ামতের দিবসের এই ঘটনা, তা হলো আংশিক ফযিলত। এ-কারণে যাবতীয় পূর্ণতাসূচক গুণাবলির যে-সমাবেশস্থল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতা বিন্দুমাত্রও ক্ষুণ্ণ হয় না।
যাইহোক। আলোচ্য হাদিসটির সারবস্তু হলো হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ও মহত্বের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতা প্রকাশ করা, অন্যকিছু নয়।
সুরা নিসায় এসেছে-
وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلًا لَمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تكليمًا (سورة النساء)
'অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি, যাদের কথা আমি তোমাকে পূর্বে বলেছি এবং অনেক রাসুল রাসুল যাদের কথা তোমাকে বলি নি। এবং মুসার সঙ্গে আল্লাহ তাআলা বাক্যালাপ করেছিলেন।' [সুরা নিসা: আয়াত ১৬৪]
আর সুরা সাফাতে বিবৃত করা হয়েছে-
وَلَقَدْ مَنَنَّا عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ () وَنَجَّيْنَاهُمَا وَقَوْمَهُمَا مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ () وَنَصَرْنَاهُمْ فَكَانُوا هُمُ الْغَالِبِينَ () وَآتَيْنَاهُمَا الْكِتَابَ الْمُسْتَبِينَ () وَهَدَيْنَاهُمَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ () وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآخِرِينَ () سَلَامٌ عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ () إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ () إِنَّهُمَا مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (سورة الصافات)
'আমি অনুগ্রহ করেছিলাম মুসা ও হারুনের প্রতি, এবং তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়কে আমি উদ্ধার করেছিলাম মহাসঙ্কট থেকে। আমি সাহায্য করেছিলাম তাদেরকে, ফলে তারাই হয়েছিলো বিজয়ী (ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের ওপর)। আমি উভয়কে দিয়েছিলাম বিশদ কিতাব। এবং তাদেরকে আমি পরিচালিত করেছিলাম সরল পথে। আমি তাদের উভয়কে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। (তারা বলবে,) "মুসা ও হারুনের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” এইভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। তারা উভয়ই ছিলো আমার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা সাফফাত: আয়াত ১১৪-১২২]
সুরা আহযাবে এসেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وجيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে পবিত্র মেরাজ সম্পর্কিত হাদিসে হযরত মুসা আ. ও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যকার যে-কথোপকথন বর্ণনা করা হয়েছে তাতেও হযরত মুসা আ.- এর মর্যাদা ও মহত্বের স্পষ্ট প্রকাশ রয়েছে।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে আরো একটি রেয়ায়েত আছে যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন মাউস রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কোনো বস্তু বণ্টন করলেন। জনৈক (মুনাফিক) ব্যক্তি বললো, 'এই বণ্টনে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ রাখা হয় নি।' কোনো এক মুনাফিক লোকের এই উক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কানে গেলে ক্রোধে তাঁর চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করলো। তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর প্রতি রহম করুন। তাঁকে তো তাঁর সম্প্রদায় এর চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দিয়েছে। কিন্তু তিনি সব কষ্ট ও ক্লেশেই ধৈর্য ও সহনশীলতার পথ অবলম্বন করেছেন।' অর্থাৎ, মুনাফিকের এই কষ্টদায়ক উক্তিতে আমিও উচ্চ মর্যাদাশীল নবী ও রাসুলগণের মতো ধৈর্য ও সহনশীলতার আশ্রয় গ্রহণ করছি।
মোটকথা, এই রেওয়ায়েতগুলো এবং অনুরূপ আরো অনেক ফযিলতমূলক রেওয়ায়েত রয়েছে যা হযরত মুসা আ.-এর উচ্চ পর্যায়ের রাসুল হওয়া প্রমাণ করছে এবং আমাদের জন্য হেদায়েতের ভাণ্ডার জুগিয়ে দিচ্ছে।

টিকাঃ
১৪৮ সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৪১৪; সহিহ মুসলিম: হাদিস ৬৩০০।
১৪৯ তাদের সুখ্যাতি পৃথিবীতে অব্যাহত রয়েছে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 একটি সুস্থ ঐতিহাসিক তত্ত্ব

📄 একটি সুস্থ ঐতিহাসিক তত্ত্ব


ইহুদি (বনি ইসরাইলি)-দের ইতিহাস যাঁরা পাঠ করেছেন তাদের কাছে এ-বিষয়টি অজানা থাকার কথা নয় যে, ইহুদিরা হযরত ইসা আ.-এর বহুকাল পূর্বে হেজাযে এসে বসতি স্থাপন করেছিলো এবং তাইমা, ওয়াদিয়ে কুযা, ফাদাক, খায়বার, মদীনা (ইয়াসরিব)-এ তারা ঘরবাড়ি, গির্জা, ভূ-সম্পত্তি, ধর্মীয় পাঠশালা, সেনানিবাস, দুর্গসমূহ নির্মাণ করে নিজেদের স্বতন্ত্র সভ্যতা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিলো। আরব ইতিহাসবেত্তাদের মতে বনু কুরাইযা, বুন নাযির, বনু কাইনুকাহ, বনু হারেস নামক বড় বড় ইহুদি গোত্রসমূহ ওইসব স্থানে তাদের স্বতন্ত্র বাসস্থান স্থাপন করে ওখানেই বসবাস করতে থাকে।
এই বাস্তবতার প্রতি লক্ষ করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তপত্তি হয়, যার সমাধান জরুরি। একটি প্রশ্ন এই এমন কোন্ অপরিহার্য ঘটনা ঘটেছিলো যার ফলে ইহুদিরা ফিলিস্তিন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, যে-ভূমি সম্পর্কে ইহুদিদের আকিদা এই যে, তা পবিত্র ভূমি এবং তাতে দুধ ও মধুর নহর প্রবাহিত রয়েছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, কোনো অপরিহার্য কারণে তাদেরকে এই পবিত্র ভূমি ত্যাগ করতেই হয়েছিলো, তবে তারা কী কারণে তাদের নিকটস্থ সবুজ, সতেজ, মনোরম অঞ্চলসমূহ ছেড়ে এমন এক অঞ্চলে এসে বসবাস করতে শুরু করলো, গাছপালা এবং জীবন ধারণের উপযোগী সরঞ্জাম ও উপকরণসমূহ পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিলো না? অথচ মিসর তাদের আবাসভূমির কাছেই ছিলো। ইরাক তাদের পুরাতন দারুল হিজরত ছিলো এবং নিকটবর্তীও ছিলো। আর উত্তর দিকে সিরিয়া ছিলো তাদের আবাসভূমির সংলগ্ন। এই স্থানগুলো অত্যন্ত সবুজ, সতেজ ও সভ্যতার সরঞ্জামও উপকরণসমূহের কেন্দ্রভূমি ছিলো।
ইতিহাস তো প্রথম প্রশ্নের জবাব এই দিচ্ছে যে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০১ সালে রোমান সম্রাট তিতাউস (Titues)-এর যুগে বনি ইসরাইলিরা ফিলিস্তি নের প্রিয় ও পবিত্র ভূমি থেকে বের হতে বাধ্য হয়েছিলো। সম্রাট তিতাউস সেনাবাহিনিী নিয়ে আক্রমণ করে ফিলিস্তিন ভূমিকে ধ্বংস করে উলট-পালট করে দিয়েছিলো। বাইতুল মুকাদ্দাসকে ধ্বংস করে ফেলেছিলা। যে-দুর্গটির জন্য ইহুদিরা গৌরববোধ করতো, যার দৃঢ়তা ও আড়ম্বরপূর্ণ নির্মাণের দৃষ্টান্ত পেশ করতো এবং যার সাজ-সরঞ্জাম এবং স্বর্ণ-রৌপ্য-মোড়ানো তৈজসপত্রের জন্য তারা গর্বিত ছিলো, অত্যাচারী তিতাউস সেগুলোকে ভেঙে-চুরে নষ্ট করে দিয়েছিলো। আর অতি মূল্যবান সরঞ্জামগুলোর সব লুণ্ঠন করে নিয়ে গিয়েছিলো।
দ্বিতীয় জিজ্ঞাসার জবাই এই যে, ইহুদিরা তাওরাতে পাঠ করেছিলো এবং তাদের নবীদের মুখে শুনতে পেয়েছিলো যে, আল্লাহ তাআলা এক সময় তাঁর এই নবুওতের পদকে বনি ইসরাইল থেকে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের ভ্রাতৃবংশ বনি ইসরাইলের মধ্যে নতুনরূপে দান করবেন। তারা এটাও জানতো যে, সেই নবী ইয়াসরিবে (মদীনায়) আগমন করবেন। ইয়াসরিব হবে সেই নবীর 'দারুল হিজরত' এবং তাঁর 'দাওয়াতে ইসলামে'র কেন্দ্রস্থল। মূর্তিপূজকদের বিরুদ্ধে তাঁর মুজাহিদি জীবন সফলকাম হবে। আর পুনরায় তাঁর হাতেই ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক ও ইয়াকুব আলাইহিমুস সালাম-এর সত্যের আহ্বান শির উঁচু করে দাঁড়াবে।
সুতরাং, যখন ইহুদিরা মূর্তিপূজক সম্রাট তিতাউসের শক্তির কাছে অক্ষম ও অপারগ হয়ে গেলো, তখন তারা হেজাযের ইয়াসরিব বা মদিনাকেই মস্তক উন্নত করে দাঁড়াবার শেষ আশ্রয়স্থল মনে করলো। হেজাযের এ- স্থানেই তারা তাদের বাসস্থান নির্মাণ করলো যা শেষ নবী আবির্ভূত হওয়ার নগরী (মক্কা) এবং ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত ছিলো। এভাবে তারা আকাঙ্ক্ষিত নবীর প্রতীক্ষা এবং তাদের লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধারের আশায় দিনাতিপাত করতে লাগলো।
যেমন: ইয়াসা'ইয়াহ নবীর গ্রন্থে স্পষ্টভাবে শেষ নবী সম্পর্কে যে- ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখ করা হয়েছে তা এই:
"সেই নবী সালা নামক পর্বতের নিকটবর্তী স্থানে আবির্ভূত হবেন। বলাবাহুল্য, মদিনার বসতি এমন জায়গায় অবস্থিত ছিলো যার পুবদিকে ওহুদ পর্বত এবং পশ্চিমে সালা পর্বত। আর এ-দুটি পর্বতের উপত্যকা ভূমিতে মদিনার বসতি অবস্থিত।"
"হে সামুদ্রিক পথ অতিক্রমকারিগণ আর হে তাতে অবস্থানকারিগণ, আর হে দ্বীপাঞ্চল ও তার অধিবাসিগণ, আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে নতুন গীত গাও। ভূ-পৃষ্ঠে সর্বত্র তাঁরই প্রশংসা করো। বনাঞ্চল ও তার জনপদসমূহ, কিদারের বংশধর কর্তৃক আবাদকৃত গ্রামসমূহ তাদের আওয়াজ উঁচু করুক। সালার বাসিন্দারা গীত গাক। তারা আল্লাহ তাআলার প্রতাপ ঘোষণা করুক। আর দ্বীপাঞ্চলসমূহ তাঁর প্রশংসাগীতি পাঠ করুক, আল্লাহ বীরের মতো বের হবেন, তিনি সৈনিক পুরুষদের মতো নিজের আত্মমর্যাদা প্রকাশ করবেন। আওয়াজ উঁচু করবেন। হ্যাঁ, অবশ্যই তিনি বিজয়-হুঙ্কার ছাড়বেন। তিনি নিজের শত্রুদের ওপর জয়লাভ করবেন। 'আমি দীর্ঘকাল যাবৎ নীরব রয়েছি, আমি নীরব হয়ে থেকেছিলাম এবং ধৈর্যধারণ করছিলাম... যারা নিজেদের হাতে বানানো মূর্তিসমূহের ওপর নির্ভর করে এবং ভগ্ন-বিচূর্ণ মূর্তিসমূহকে সম্বোধন করে বলে, তোমরা আমাদের উপাস্য। তারা পেছনে হটে যাবে এবং যারপরনেই লজ্জিত হবে।"
এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, হযরত মুসা আ.-এর পরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত এমন কোনে নবী আসেন নি যিনি মূর্তিপূজকদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন এবং অবশেষে মূর্তিপূজকেরা ব্যর্থকাম হয়েছে।
তবে, কারা এই কিদারের বংশ? সালা পর্বতটি কোথায় অবস্থিত? বার বার কেনো দ্বীপ ও পর্বতসমূহের উল্লেখ করা হলো? বনি ইসরাইলের গীত ব্যতীত নতুন গীত কোন্টি? এই সমস্ত জিজ্ঞাসা চিৎকার করে বলছে যে, এটা এমন শরিয়ত এবং এমন নবীর আগমনের সুসংবাদ প্রদানের বর্ণনা, যা হেযাজের ভূ-খণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে কি এটাই সেই কথা নয় যা কুরআন মাজিদ ইহুদিদের উদ্দেশে সম্বোধন করে জীবন্ত ঐতিহাসিক সাক্ষ্যরূপে বর্ণনা করেছে এভাবে—
وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقَ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ (سورة البقرة)
'তাদের কাছে যা আছে আল্লাহর কাছ থেকে তার (তাওরাতের) সমর্থক কিতাব (কুরআন মাজিদ) এলো; যদিও পূর্বে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তারা (ইহুদিরা) এর সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করতো। তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিলো তা যখন তাদের কাছে এলো (যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন) তখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করলো। সুতরাং কাফেরদের প্রতি আল্লাহর লানত।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৮৯]
অর্থাৎ, যখন কিতাবি ইহুদিদের সঙ্গে ইয়াসরিবের মূর্তিপূজকদের যুদ্ধ হতো এবং কিতাবি ইহুদিরা পরাজিত হতো, তখন আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করতো, 'হে আল্লাহ, আমরা যে-নবীর প্রতীক্ষা করছি তাঁকে সত্বর প্রেরণ করা। যেনো তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে মূর্তিপূজকদের মূলোৎপাটন করে দিতে পারি এবং আপনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সত্যেরই সফলতা অর্জিত হয়। কিন্তু যখন সেই কাঙ্ক্ষিত নবী আরবের ভূমিতে পদার্পণ করলেন এবং নবুওতপ্রাপ্ত হলেন, তখন কিতাবি ইহুদিরা হিংসাবশত তাঁকে অস্বীকার করতে লাগলো—এই নবী ইসমাইলের বংশের কেনো? ইসরাইলি বংশের নর কেনো?
অনুমিত হয় যে, কোনো ইহুদি আলেম এই ধোঁকায় পতিত ছিলো যে, যদিও এই নবীর আবির্ভূত ও প্রকাশিত হওয়ার স্থান সালা পর্বতের নিকটবর্তী স্থানই বলা হয়েছে, তাঁর আবির্ভাব বনি ইসরাইলের মধ্য থেকেই হওয়া উচিত। এইজন্য তারা ওখানে এসে বসতি স্থাপন করেছে যে, আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি আমাদের মধ্য থেকেই পূর্ণ হোক। কিন্তু তারা এ-কথা ভুলে গিয়েছিল যে, তাদের সেই তাওরাতেই সেই আকাঙ্ক্ষিত নবী সম্পর্কে এটাও বলা হয়েছিল যে, ‘আমি তাদের জন্য তাদের ভ্রাতৃগোত্র থেকে একজন নবী প্রেরণ করবো।’ এ-কথা বলা হয়নি যে, সেই নবী হবে বনি ইসরাইল বংশ থেকে। কিন্তু ইহুদিদের আলেমগণ এবং তাদের অনুসারী সাধারণ জনগণ এই তথ্য সম্পর্কে অবহিত ছিল না যে, এই নেয়ামত (নবুওত) এখন তাদের ভ্রাতৃগোত্র বনি ইসমাইল বংশে স্থানান্তরিত হয়ে তাদেরকে বরকত দান করতে উপকৃত করতে থাকবে।
কুরআন মাজিদে এ-দিকেই ইঙ্গিত রয়েছে-
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنْ فَرِيقًا مِنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (سورة البقرة)
'আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে তেমনই জানে যেমন তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চেনে এবং তাদের একদল জেনে-শুনে সত্য গোপন করে থাকে।' (সুরা বাকারা: আয়াত ১৪৮]
মোটকথা, এটাই একমাত্র কারণ যে, কয়েক শতাব্দী পূর্বে বনি ইসরাইলিরা বড় শক্তির কাছে নিপীড়িত হয়ে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো। তারা তখন মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের সবুজ, সতেজ ও সুসভ্য দেশগুলো ত্যাগ করে হেজাযের মরুভূমিকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। তারা ইয়াসরিব (মদিনা) ও তার আশ-পাশের অঞ্চলগুলোতে এসে বসতি স্থাপন করেছিলো। কিন্তু আফসোস! সেই নবীর আবির্ভাবের পর হিংসা ও বিদ্বেষ তাদেরকে ঈমানের মতো মহামূল্যবান সম্পদ থেকে বঞ্চিত রাখলে।
আধুনিক ঐতিহাসিক তথ্যাবলির প্রতি লক্ষ করলে এখানে এই জিজ্ঞাসা উত্থাপিত হয় যে, উপরিউক্ত প্রশ্নোত্তরের গোটা আলোচনা নিরর্থক। নিরর্থক এ-কারণে যে, হেজায ভূমিতে যেসব ইহুদি বসবাস করতো তারা সবাই আরব বংশোদ্ভূত ছিলো, বনি ইসরাইলি বংশের লোক ছিলো না। কেননা, বনি ইসরাইলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য এটাও ছিলো যে, তারা পৃথিবীর যে-প্রান্তে গিয়েই বসতি স্থাপন করেছে, কখনো তাদের ইসরাইলি নাম ও পরিচয় ত্যাগ করে নি। পক্ষান্তরে হেজাযের ইহুদিদের পূর্বপুরুষদের কুরাইযা, নাযির, কাইনুকাহ ইত্যাদি নাম আরবি এবং ইসরাইলি নাম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হবে, এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ যদি এটাই হয় যে, হেজায ভূ-বিভাগের ইহুদিরা কেবল আরব বংশোদ্ভূতই এবং তাদের বনি ইসরাইল বংশীয় ইহুদি মোটেই ছিলো না, তবে তা হবে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বিপরীত। কারণ, হেজাযের ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে কতিপয় গোত্র এমনও ছিলো যারা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি থেকে হিজরত করে আরব দেশে এসে বসতি স্থাপন করার কথা আজ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় সুরক্ষিত রয়েছে। আর যদি তার অর্থ এই হয় যে, এখানে আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে ইসরাইলি ইহুদি গোত্রগুলোও বসবাস করতো এবং তাদেরই মাধ্যমে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে ইহুদি ধর্মের বীজ বপন করা হয়েছিলো। তবে পুনরায় উপরিউক্ত প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার ওই জবাবই দেয়া যেতে পারে যা ইতোপূর্বে যথাস্থানে দেয়া হয়েছে।

টিকাঃ
১৫০ ইয়াসা'ইয়াহ: অনুচ্ছেদ ৪২, আয়াত ১-১৭, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার রচিত 'কাসাসুল আম্বিয়া' থেকে গৃহীত।
১৫১ এখানে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী বলতে মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। ইহুদিরা কখনো মুশরিকদের কাছে পরাজিত হলে শেষ নবীর ওসিলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করতো। তারা এটাও বলতো যে, শেষ নবী তাদের মধ্যেই আগমন করবেন। কিন্তু নবীর আগমনের পর তারা তাঁর বিরোধিতা করতে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00