📄 হযরত মুসা ও খিযির আলাইহিমুস সালাম
হযরত মুসা আ. এবং একজন বাতেনি ইলমে অভিজ্ঞ মহামানবের মধ্যে যে-সাক্ষাৎ ঘটেছিলো তা হযরত মুসা আ.-এর গোটা জীবনের ঘটনাবলির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। হযরত মুসা আ. তাঁর কাছ থেকে সৃষ্টিজগতের কতিপয় রহস্য ও গোপনীয় তথ্য অবগত হয়েছিলেন। সুরা কাহফে বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে এই সাক্ষাতের উল্লেখ রয়েছে। আর সহিহ বুখারিতে এই ঘটনা সম্পর্কে আরো কিছু অতিরিক্ত বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ বুখারিতে হযরত সাঈদ বিন জুবাযের রা. থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে : তিনি একবার আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর কাছে আরজ করলেন, নুফ আল-বাক্কালি ( نوف البكالي ) বলেন, হযরত খিযির আ.-এর সঙ্গী মুসা এবং বনি ইসরাইলের সঙ্গী মুসা এক ব্যক্তি নন। খিযিরের সঙ্গী মুসা হলেন অন্য মুসা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বললেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা কথা বলছে।
উবাই বিন কা'ব রা. আমার কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছিলেন, একদিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের উদ্দেশে ওয়াজ করছিলেন। এ-সময় এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, 'এই যুগের সবচেয়ে বড় আলেম কে?'
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকেই সবচেয়ে বেশি ইলম দান করেছেন।' আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর এ-কথা পছন্দ করলেন না। তৎক্ষণাৎ তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, 'তোমার কর্তব্য تو এই ছিলো যে, তুমি উক্ত প্রশ্নের জবাব আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের ওপর সোপদ করে দিয়ে বলতে, والله اعلم আল্লাহ তাআলাই সে-সম্পর্কে ভালো অবগত আছেন।' এরপর আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর প্রতি ওহি নাযিল করলেন: 'দুই সাগরের সংযোগস্থলে আমার এক বান্দা রয়েছেন। তিনি কোনো কোনো বিষয়ে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।'
হযরত মুসা আ. আরজ করলেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনার ওই বান্দার কাছে কোন্ পথ দিয়ে যেতে হবে?' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'ভাজা মাছ থলের মধ্যে রেখে দাও। এরপর যে-স্থানে মাছটি হারিয়ে যাবে ওখানেই আমার ওই বান্দাকে দেখতে পাবে।'
হযরত মুসা আ. ভাজা মাছ থলের মধ্যে রেখে তাঁর খলিফা ইউশা বিন নুনকে সঙ্গে নিয়ে ওই নেককার বান্দার সন্ধানে বের হলেন। চলতে চলতে এক জায়গায় পৌঁছে তাঁরা উভয়েই একটি পাথরের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। থলের মধ্যে যে-ভাজা মাছটি ছিলো তাতে প্রাণ সঞ্চারিত হলো এবং তা থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেলো। মাছটি পানির যে-অংশের ওপর দিয়ে চলে গেলো এবং যে-পর্যন্ত গেলো, ওখানকার পানি বরফের মতো জমে গিয়ে একটি ক্ষুদ্র ও সরু রাস্তার মতো হয়ে গেলো। মনে হছিলো যেনো সমুদ্রের মধ্যে একটি রেখা অঙ্কিত হয়েছে।
এই ঘটনা হযরত ইউশ আ. দেখলেন। কেননা, তিনি হযরত মুসা আ.-এর আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলেন। কিন্তু হযরত মুসা আ. ঘুম থেকে জাগলে ইউশা আ. তাঁকে ঘটনাটি জানাতে ভুলে গেলেন। এরপর তাঁরা পুনরায় চলতে শুরু করলেন। সারাদিন ও সারারাত চলতেই থাকলেন। দ্বিতীয় দিন ভোরে হযরত মুসা আ. বললেন, 'এখন অত্যন্ত ক্লান্তি অনুভব করছি। ওই মাছটি বের করো, তার দ্বারা ক্ষুধা নিবারণ করি।' হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হযরত মুসা আ. আল্লাহর বর্ণিত উদ্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত কোনো ক্লান্তি অনুভব করেন নি। কিন্তু পথ ভুলে যখন ওই স্থান পেরিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলেন, তখনই তিনি ক্ষুধা অনুভব করলেন।
হযরত ইউশা আ. বললেন, আপনি নিশ্চয় জেনে থাকবেন, যেখানে আমরা পাথরের ওপর শায়িত ছিলাম, ওখানে এই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো যে, অকস্মাৎ মাছটি থলের মধ্যে নড়ে উঠলো এবং থলে থেকে বের হয়ে সাগরের দিকে চলে গেলো। আর মাছটির গতিপথে সাগরের মধ্যে রাস্তা তৈরি হয়ে গেলো। আমি এই ঘটনা আপনার কাছে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। নিশ্চয় আমার ভুলে যাওয়া শয়তানের একটা চক্রান্ত ছিলো।
হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সাগরের ওই রেখাটি মাছটির জন্য (সাঁতার কাটার) পথ ছিলো আর হযরত মুসা আ. ও ইউশা আ.-এর জন্য ছিলো বিস্ময়কর ব্যাপার।
হযরত মুসা আ. বলেন, আমরা যে-স্থানটি সন্ধান করছিলা, ওটাই ছিলো সেই স্থান। এই বলে তাঁরা উভয়ে পরস্পর কথা বলতে আবার সে-পথেই ফিরে চললেন এবং ওই পাথরখণ্ডগুলোর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তাঁরা ওখানে পৌছে দেখলেন উত্তম পোশাক-পরিহিত একজন লোক ওখানে বসে রয়েছেন। হযরত মুসা আ. তাঁকে সালাম দিলে ওই ব্যক্তি বললেন, 'এই দেশে সালাম কোথায়? এই দেশে তো মুসলমান বাস করে না।' ইনি ছিলেন হযরত খিযির আ.।
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আমার নাম মুসা।' খিযির আ. বললেন, 'বনি ইসরাইল বংশের মুসা?' মুসা আ. বললেন, হ্যাঁ। আমি আপনার কাছ থেকে ওই ইলম শিক্ষা করতে এসেছি যা আল্লাহ তাআলা একমাত্র আপনাকেই দান করেছেন।'
হযরত খিযির আ. বললেন, 'আপনি আমার সঙ্গে থেকে সেসব ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। হে মুসা, আল্লাহ তাআলা আমাকে সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা আপনাকে দান করা হয় নি।'
হযরত মুসা আ. বললেন, 'ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আর আপনার নির্দেশ আমি কখনো লঙ্ঘন করবো না।'
হযরত খিযির আ. বললেন, 'তবে এই শর্ত থাকলো যে, যতক্ষণ আপনি আমার সঙ্গে থাকবে ততক্ষণ কোনো ব্যাপারেই-যা আপনার দৃষ্টিতে গোচরীভূত হবে-আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না। পরে আমি নিজেই আপনাকে ওসব বিষয়ের গূঢ়তত্ত্ব বলে দেবো।'
হযরত মুসা আ. এই শর্ত মেনে নিলেন এবং উভয়ই কোনো এক সাগরের দিকে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে সামনেই একটি নৌকা দেখতে পেলেন। হযরত খিযির আ. নৌকার মাঝিদেরকে ভাড়া কত জিজ্ঞেস করলেন। তারা খিযির আ.-কে চিনতো। কাজেই তারা ভাড়া গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালো এবং তাঁদের উভয়কে অত্যন্ত সমাদর করে নৌকায় তুলে নিলো। নৌকাটি তখনো বেশিদূর অগ্রসর হয় নি, হঠাৎ খিযির আ. নৌকার সামনের অংশের একটি তক্তা খুলে ফেলে নৌকাটিকে ছিদ্র করে দিলেন। হযরত মুসা আ. ধৈর্য ধারণ করতে পারলেন না। তিনি খিযির আ.-কে বললেন, 'নৌকার মাঝিরা তো আমাদের সঙ্গে খুবই সদ্ব্যবহার করলো, আমাকে ও আপনাকে বিনা ভাড়ায় আরোহণ করালো। আর আপনি তার এই বিনিময় প্রদান করলেন যে, নৌকাটির মধ্যে ছিদ্র করে দিলেন। এর ফল তো এই হবে যে, নৌকার আরোহীরা সবাই নৌকাসহ ডুবে যাবে। এটা তো বড় অসঙ্গত কাজ হলো।' হযরত খিযির আ. বললেন, 'আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলাম, আপনি আমার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। অবশেষে তা-ই ঘটলো।' হযরত মুসা আ. বললেন, 'আমি তা ভুলে গিয়েছিলাম। সুতরাং আমি আমার ভুল ত্রুটির জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না এবং আমার ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন না।'
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এই প্রথম প্রশ্নটি বাস্ত বিকই হযরত মুসা আ.-এর ভুলে যাওয়ার কারণেই হয়েছিলো। ঠিক সে-সময় একটি পাখির উড়ে এসে নৌকাটির এক পাশে বসলো এবং সমুদ্রের মধ্যে চঞ্চু ডুবিয়ে দিয়ে এক বিন্দু পানি পান করলো।
হযরত খিযির আ. বললেন, 'তুলনাহীনভাবে আল্লাহ তাআলার সীমাহীন জ্ঞানের মোকাবিলায় আমার ও আপনার জ্ঞান এমনই তুচ্ছ, যেমন সমুদ্রের অথৈ জলরাশির সামনে এই বিন্দুটি, যা পাখিটি পান করলো।'
নৌকা তীরে পৌছলো। তাঁরা উভয়ে নৌকা থেকে অবতরণ করে একদিকে যাত্রা করলেন। তাঁর সমুদ্রের তীর ধরে চলছিলেন। এক জায়গায় কিছু শিশু খেলা করছিলো। হযরত খিযির আ. এগিয়ে গিয়ে তাদের মধ্য থেকে একটি শিশুকে হত্যা করে ফেললেন। হযরত মুসা আ. আবার ধৈর্যহীন হয়ে পড়লেন। খিযির আ.-কে বললেন, 'আপনি অন্যায়ভাবে একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে ফেললেন? এটা তো অত্যন্ত অন্যায় কাজ হলো।' হযরত খিযির আ. বললেন, 'আমি তো প্রথমেই আপনাকে বলেছিলাম, আপনি আমার সঙ্গে থেকে ধৈর্য ও সহনশীলতা রক্ষা করতে পারবেন না।'
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যেহেতু এ-বিষয়টি প্রথম ঘটনার চেয়ে কঠিন ছিলো, তাই হযরত মুসা আ. ধৈর্য ধারণ করতে অপারগ ছিলেন।
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আচ্ছা, এবারও আমাকে ক্ষমা করুন। এরপর যদি আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম না হই, তবে আমার আর কোনো আপত্তি করার সুযোগ থাকবে না। এরপর আমি আমার থেকে পৃথক হয়ে যাবেন।'
তাঁরা উভয়ে আবার চলতে শুরু করলেন এবং চলতে চলতে একটি জনপদে এসে পৌছলেন। জনপদের অধিবাসীরা ছিলো সচ্ছল অবস্থাসম্পন্ন এব সব দিক থেকেই আতিথেয়তা করার উপযুক্ত। কিন্তু হযরত মুসা আ. ও খিযির আ.-এর মুসাফিরসুলভ আবেদন সত্ত্বেও জনপদবাসীরা তাঁদেরকে অতিথি হিসেবে বরণ করতে অস্বীকৃতি জানালো। তাঁরা তখনো জনপদের মধ্য দিয়ে চলছিলেন। হঠাৎ হযরত খিযির আ. এমন একটি ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন যার দেয়াল সামান্য হেলে পড়েছিলো এবং মাটিতে পতিত হওয়ার উপক্রম করছিলো। হযরত খিযির আ. হাতে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালটিকে সোজা করে দিলেন। হযরত মুসা আ. পুনরায় খিযির আ.-কে প্রশ্ন করে বসলেন। তিনি বললেন, 'আমরা মুসাফিররূপে এই জনপদে আগমন করেছি। কিন্তু তার অধিবাসীরা আমাদের আতিথেয়তাও করলো এবং রাতযাপনের জন্য একটু জায়গাও দিলো না। আপনি এটা কী করলেন—এই জনপদেরই একজন বাসিন্দার পতনোন্মুখ দেয়ালটিকে সোজা করে দিলেন, অথচ কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করলেন না? যদি দেয়ালটি সোজা করে দিতেই হতো, তবে আমাদের ক্ষুধা ও পিপাসা নিবারণের জন্য কিছু পারিশ্রমিকই ধার্য করে নিতে পারতেন।' হযরত খিযির আ. বললেন, هَذَا فِرَاقُ بَيْنِي وَبَيْنِكَ 'এখন আপনার ও আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদের সময় এসে গেছে।'
এরপর তিনি হযরত মুসা আ.-কে এই তিনটি বিষয়ের গূঢ়রহস্য বুঝিয়ে দেয়ার জন্য বললেন, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এগুলো এমন বিষয় ছিলো, যা দেখে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন নি।'
এই ঘটনা বর্ণনা করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমার মন চাচ্ছিলো যে, যদি হযরত মুসা আ. আরো কিছু সময় ধৈর্য ধারণ করতেন, তাহলে আমরা আল্লাহর সৃষ্টিরহস্যের আরো কিছু গূঢ়রহস্য জানতে পারতাম।'
হযরত মুসা আ. ও হযরত খিযির আ.-এর মধ্যে বিচ্ছেদের অবস্থা ঘটে গেলে হযরত খিযির আ. ওই ঘটনাগুলোর গূঢ়তত্ত্ব বর্ণনা করলেন। কুরআন মাজিদ এই ঘটনাকে বর্ণনা করে গূঢ়তত্ত্বগুলো প্রকাশ করেছে এভাবে-
قَالَ هَذَا فِرَاقُ بَيْنِي وَبَيْنِكَ سَأُنَبِّئُكَ بِتَأْوِيلِ مَا لَمْ تَسْتَطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا () أَمَّا السَّفِينَةُ فَكَانَتْ لِمَسَاكِينَ يَعْمَلُونَ فِي الْبَحْرِ فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا وَكَانَ وَرَاءَهُمْ مَلِكَ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا )) وَأَمَّا الْغُلَامُ فَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِ فَخَشِينَا أَنْ يُرْهَقَهُمَا طُغْيَانًا وَكُفْرًا )) فَأَرَدْنَا أَنْ يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا خَيْرًا مِنْهُ زَكَاةً وَأَقْرَبَ رُحْمًا ) وَأَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيمَيْنِ فِي الْمَدِينَةِ وَكَانَ تَحْتَهُ كَيْرٌ لَهُمَا وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا فَأَرَادَ رَبُّكَ أَنْ يَبْلُغَا أَشُدَّهُمَا وَيَسْتَخْرِجَا كَنْزَهُمَا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا (سورة الكهف)
'সে (মুসা আ.-এর সঙ্গী খিযির) বললো, "এখানেই আপনার এবং আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হলো; যে-বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন নি আমি তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছি। নৌকাটির ব্যাপার-তা ছিলো কয়েকজন দরিদ্র লোকের, তারা সাগরে জীবিকা অন্বেষণ করতো; আমি ইচ্ছা করলাম নৌকাটি ত্রুটিযুক্ত করতে; কারণ তাদের সামনে ছিলো এক রাজা, যে বল প্রয়োগ করে সব (ভালো) নৌকা ছিনিয়ে নিতো। (খুঁতযুক্ত মনে করে বাদশাহ নৌকাটিকে ছেড়ে দেবে।) আর কিশোরটি, তার পিতা-মাতা ছিলো মুমিন। আমি আশঙ্কা করলাম যে, সে বিদ্রোহাচরণ ও কুফরির মাধ্যমে তাদেরকে বিব্রত করবে (কষ্ট ও যন্ত্রণা দেবে)। তারপর আমি চাইলাম যে, (আমি এই শিশুটিকে হত্যা করে ফেলি এবং) তাদের প্রতিপালক যেনো তাদেরকে তার পরিবর্তে এক সন্তান দান করেন, যে হবে পবিত্রতায় মহত্তর ও ভক্তি-ভালোবাসায় ঘনিষ্ঠতর। আর ওই প্রাচীরটি, তা ছিলো নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের, এর নিচে আছে তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিলো সৎকর্ম পরায়ণ। সুতরাং আপনার প্রতিপালক দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা করলেন যে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হোক এবং তারা তাদের ধনভাণ্ডার উদ্ধার করুক। আমি নিজ থেকে কিছু করি নি। (বরং আল্লাহ তাআলার নির্দেশে করেছি।) আপনি যে-বিষয়ে ধৈর্য ধারণে অপারগ হয়েছিলেন, এই হলো তার ব্যাখ্যা।" [সুরা কাহফ: আয়াত ৭৮-৮২)
কুরআন মাজিদ এই ঘটনার শুরুতে হযরত খিযির আ.-এর ইলম সম্পর্কে বলেছে, وَعَلَمْنَاهُ مِنْ لَدُنَا عِلْمًا 'আর আমি নিজের পক্ষ থেকে তাকে এক ইলম শিখিয়েছি।' আর ঘটনাগুলোর শেষে হযরত খিযির আ.-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে : وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي 'আমি এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো আমার নিজের পক্ষ থেকে করি নি।'
এই দুটি বাক্য থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা খিযির আ.-কে কোনো কোনো বস্তুর গূঢ়তত্ত্বের জ্ঞান দান করেছিলেন। এই জ্ঞান ছিলো সৃষ্টিরহস্য এবং তার অভ্যন্তরীণ (বাতেনি) গূঢ়তত্ত্ব-সংক্রান্ত। আর এগুলো ছিলো এমন বিষয়ের প্রকাশ যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা সত্যপন্থীদের জন্য এ-কথাটি পরিষ্কার করে দিলেন যে, যদি বিশ্বজগতের যাবতীয় গূঢ়তত্ত্ব থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়ে উন্মোচিত করে দেয়া হয়- যেমন হযরত খিযির আ.-এর জন্য কোনো কোনো বিষয়ের গূঢ়তত্ত্ব উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছিলো-তাহলে দুনিয়ার সমস্ত বিধানই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আর আমল ও দায়দায়িত্বের পরীক্ষার সমস্ত জগতই উল্টে-পাল্টে যাবে। কিন্তু দুনিয়া আমলের পরীক্ষাকেন্দ্র। সুতরাং, সৃষ্টিতত্ত্বের গূঢ় রহস্যসমূহ পর্দাবৃত থাকাই আবশ্যক। যেনো হক ও বাতিলের পরিচয়ের জন্য আল্লাহ তাআলা যে-পাল্লা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা অনবরত নিজের কাজ সমাধা করতে পারে।
টিকাঃ
১৩৮ অর্থাৎ, আমি আল্লাহর কাছ থেকে জানতে পারলাম।
📄 মীমাংসা
এই তিনটি মাসআলার মীমাংসা এই : প্রথম বিষয়টি সম্পর্কে কুরআন মাজিদে কিছুই উল্লেখ করা হয় নি; হযরত খিযির আ.-এর নামও উল্লেখ করা হয় নি এবং তাঁর উপাধিও উল্লেখ করা হয় নি। 'আমার বান্দাগণের মধ্যে থেকে একজন বান্দা' বলে তাঁর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। অবশ্য বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফের সহিহ হাদিসে তাঁকে খিযির নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং, আমরা যদি ঐতিহাসিক বর্ণনার দ্বারা তাঁর নাম ও উপাধির সন্ধান লাভ করতে পারতাম তবে সহজেই এ-কথা বলতে পারতাম, এটা তাঁর নাম আর ওটা তাঁর উপাধি। কিন্তু এ-সম্পর্কে ইতিহাসের বর্ণনা এতো এলোমেলো যে, তা দ্বারা কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সামনে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচয় শুধু এতটুকু আছে যে, তাঁকে খিযির বলা হয়েছে। আর এই যে, তিনি হযরত মুসা আ.-এর সময়সাময়িক ছিলেন। এর চেয়ে অতিরিক্ত তাঁর নাম বা তাঁর উপাধি অথবা তাঁর বংশপরিচয়-সম্পর্কিত যাবতীয় আলোচনা প্রমাণহীন এবং শুধু আনুমানিক কথার পর্যায়ভুক্ত।
আর দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা সম্পর্কে প্রবল মত এই যে, তিনি নবী ছিলেন।
কেননা, কুরআনে যেভাবে তাঁর মর্যাদা উল্লেখ করা হয়েছে, তা কেবল নবুওতের মর্যাদার জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে। ওলিত্বের মর্যাদা তার চেয়ে অনেক নিম্নস্তরের। যেমন খিযির আ. যখন বালকটিকে হত্যা করার কারণ বর্ণনা করলেন, তখন তার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এটাও বললেন, 'এই কাজ আমি আমার স্বাধীন ইচ্ছায় করি নি; বরং আমার প্রতিপালকের রহমতের বদৌলতে হয়েছে।' বলা বাহুল্য, কোনো ওলির পক্ষে সম্ভব নয় যে, তিনি ইলহাম দ্বারা অর্থাৎ, ইলহামপ্রাপ্ত হয়ে কাউকে হত্যা করে ফেলেন। কেননা, ইলহামের মধ্যে ভুল বোঝার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ-কারণেই আউলিয়া কেরামের কাশফের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৈপরীত্য পাওয়া যায়। এজন্যই আউলিয়া কেরামের কাশফ ও ইলহামকে শরিয়তের দলিল বলে গণ্য করা হয় নি।
সুতরাং, সৃষ্টি-বিষয়ক গূঢ়তত্ত্বসমূহের মধ্যে একটি রহস্যময় গূঢ়তত্ত্ব যার অনুষ্ঠান বাহ্যিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত খারাপ ও খুব বড় অপরাধ—এমন বিষয় কেবল আল্লাহর ওহি দ্বারাই সম্পন্ন হতে পারে। এ-আয়াতটি ছাড়া হযরত মুসা আ. ও হযরত খিযির আ.-এর মধ্যকার কথোপকথনকে যে-বর্ণনাশৈলীতে ব্যক্ত করা হয়েছে, তা-ও এ-কথার সমর্থন করে যে, খিযির আ. নবী ছিলেন। এ-কারণেই হযরত মুসা আ.-এর মতো উচ্চস্তরের নবী হযরত খিযির আ.-এর সাহচর্য লাভ এবং তাঁর সৃষ্টিরহস্য-সম্পর্কিত জ্ঞান চাক্ষুষ দর্শনের জন্য আবদার করেছিলেন এবং এ-কারণেই হযরত খিযির আ.-কে গর্বের সঙ্গে নিজের জ্ঞানবত্তার প্রকাশ ও হযরত মুসা আ.-এর জ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করতে দেখা যাচ্ছে।
তবুও নবুওত ও রিসালাতের যাবতীয় পূর্ণতামূলক গুণের বিচারে হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা হযরত খিযির আ.-এর মর্যাদা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে। কেননা, মুসা আ. আল্লাহ তাআলার নবী ছিলেন এবং উচ্চ মর্যাদাশীল রাসুলও ছিলেন। তিনি নতুন শরিয়তের ধারক, আসমানি কিতাবের বাহক এবং রাসুলগণের মধ্যেও উলুল আযম (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুল। সুতরাং হযরত খিযির আ.-এর আংশিক জ্ঞান-যা সষ্টিজগতের গূঢ়তত্ত্ব-সম্পর্কিত জ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত—হযরত মুসা আ.-এর শরিয়ত- সম্পর্কিত ব্যাপক জ্ঞানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।
আর তৃতীয় বিষয় সম্পর্কে গবেষক উলামায়ে কেরামেতর মতই বিশুদ্ধ মত। তাঁরা এই মত পোষণ করেন যে, হযরত খিযির আ. অমর নন এবং তিনি স্বাভাবিক আয়ুষ্কালের পর ইন্তেকাল করেছেন। কেননা, কোনো মানুষকেই আল্লাহ তাআলা চিরস্থায়ী জীবন দান করেন নি এবং এই পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যু একটা বাস্তব ব্যাপার।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন—
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَإِنْ مِنْ فَهُمُ الْخَالِدُونَ (سورة الأنبياء)
'আমি তোমার পূর্বেও কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করি নি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে?' [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৩৪]
তা ছাড়া কুরআন মাজিদে এটাও বলা হয়েছে যে, "আমি প্রত্যেক নবী থেকে প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছি: হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওতের যুগ এলে তোমাদের মধ্য থেকে যে-কেউ তখন জীবিত থাকবে, তার ওপর আবশ্যক হবে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর ঈমান আনা এবং তাঁকে সাহায্য করা।” বস্তুত, আম্বিয়াকে কেরাম সবাই এর স্বীকৃতি প্রদান করেছেন এবং তাঁদের ও আল্লাহ তাআলার মধ্যে সাক্ষ্য ও প্রতিজ্ঞা বেশ শক্তিশালী ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে—
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابِ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقَ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ (سورة آل عمران)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, "তোমাদেরকে কিতাব ও হেকমত যা কিছু দান করেছি এরপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসুল আসবে, তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে।" তিনি বললেন, "তোমরা কি স্বীকার করলে? এবং এই সম্পর্কে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে?" তারা বললো, "আমরা স্বীকার করলাম।" তিনি বললেন, "তবে তোমরা সাক্ষী থাকো, আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষী থাকলাম।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৮১]
সুতরাং, হযরত খিযির আ. যদি জীবিত থাকতেন তবে তাঁর ওপর ফরয ছিলো প্রকাশ্যভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হয়ে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর সঙ্গে সব জিহাদে অংশগ্রহণ করে সাহায্য-সহযোগিতা করা। কিন্তু কোনো সহিহ হাদিস দ্বারা এসব বিষয়ের কোনো একটি বিষয়েরও প্রমাণ পাওয়া যায় না। অথচ বদর, হুনাইন ইত্যাদি জিহাদে হযরত জিবরাইল আ. এবং অন্যান্য ফেরেশতার সাহায্য ও সহযোগিতার বিবরণ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে।
কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলো ছাড়াও সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের নিম্নবর্ণিত হাদিসগুলোর এই আকিদাকে খণ্ডন করছে যে, হযরত খিযির আ. অমরত্ব লাভ করেছেন এবং তিনি এখনো জীবিত আছেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন, কোনো এক রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার নামায শেষে বললেন, "এই রাতে তোমরা কী দেখেছো? এ-কথা প্রকাশ থাকে যে, এক শতাব্দী অতীত হওয়ার পর এদের মধ্যে আর একজন্য জমিনের ওপর জীবিত থাকবে না।"
এই সহিহ হাদিসটির ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে হযরত খিযির আ.-এর চিরস্থায়ী জীবন লাভের কোনো অবকাশই থাকে না। এই হাদিসের অর্থের ব্যাপকতা থেকে তিনি বাদ আছেন এ-কথাও কোনো রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত হয় না। অথচ এই রেওয়াতেটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফ ছাড়াও বিভিন্ন সনদে হাদিসের অন্যান্য কিতাবেও বর্ণিত হয়েছে।
এ-কারণেই বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেয ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা এই দাবি করেছেন, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে এমন একটি হাদিসও বর্ণিত হয় নি, যার দ্বারা প্রমাণিত হতে পারে যে, হযরত খিযির আ. এখনো জীবিত আছেন। বরং এর বিপরীতে কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ এবং সহিহ হাদিসসমূহ জোরালোভাবে তাঁর মৃত্যু হওয়াকেই সমর্থন করছে। শাইখুল ইসলাম তাকিযুদ্দিন বিন তাইমিয়া রহ., ইবনুল কায়্যিম আল- জাওযিয়্যা রহ., ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ., আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযি রহ., ইমাম ইসমাইল বুখারি রহ., কাজি আবুল ইয়ালা হাম্বলি, আবু তাহের বিন আল-গুরাবি রহ., আলি বিন মুসা আর-রেযা রহ., আবুল ফযল মুরাইসি রহ., আবু তাহের বিন আল-ইবাদি রহ., আবুল ফযল বিন নাসির রহ., কাজি আবু বকর বিন আল-আরাবি রহ., আবু বকর মুহাম্মদ বিন আল-হাসান রহ., প্রমুখ উচ্চ মর্যাদাশীল মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির হযরত খিযির আ.-এর ইন্তেকাল করেছেন বলেই মত পোষণ করতেন।
সুতরাং, যে-সকল আলেম হযরত খিযির আ. জীবিত রয়েছেন বলে 'ইজমা'র দলিল বর্ণনা করেছেন, তা নিশ্চিতভাবেই সনদহীন। বিখ্যাত মুফাস্স্সির আবু হাইয়ান আল-আন্দালুসি 'ইজমা'র দাবির বিরুদ্ধে এই দাবি করেছেন যে, অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মত এটাই যে, হযরত খিযির আ. ইন্তেকাল করেছেন।
উপরিউক্ত আলোচনার সারমর্ম আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর সাক্ষাৎ এমন বুযুর্গ ব্যক্তির সঙ্গে করিয়েছিলেন যাঁর নাম ছিলো খিযির। তাঁকে সৃষ্টিজগতের গূঢ়তত্ত্ব সম্পর্কে এমন কতিপয় জ্ঞান দান করা হয়েছিলো যা হযরত মুসা আ.-কে দান করা হয় নি। হযরত মুসা আ.- এর স্তর ও মর্যাদা হযরত খিযির আ.-এর মর্যাদা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলো। কুরআন মাজিদ হযরত খিযির আ.-এর আলোচনা যেভাবে করেছে তা থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি নবী ছিলেন। তারপরও উত্তম মনে হয় যে, কুরআন মাজিদ এই ব্যাপারটাকে যেভাবে অস্পষ্ট রেখেছে, আমরা কেবল ততটুকুর ওপরই ঈমান রাখি এবং তার চেয়ে অধিক তত্ত্বানুসন্ধানে প্রবৃত্ত না হই। এটাই হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.- এর বক্তব্য।
আর হযরত খিযির আ.-এর চিরস্থায়ী জীবন লাভ করার ব্যাপারে শরিয়তসম্মত ও ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণই নেই। সুতরাং, নিঃসন্দেহে এ-কথা বলা যেতে পারে যে, তিনিও স্বাভাবিক বয়সে উপনীত হয়ে আল্লাহ তাআলার ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
টিকাঃ
১৩৯ ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেছেন, খিযির আ.-এর বংশধালা এমন : بليا بن ملكان (بن فالغ بن عامر بن شالخ بن أرفخشد بن سام بن نوح عليه السلام বিন ফালিগ বিন আমির বিন শালিখ বিন আরফাখাশাদ বিন সাম বিন নুহ আ.।)
📄 হযরত মুসা আ.-এর ইন্তেকাল
ইতোপূর্বে যেসব ধৈর্যের পরীক্ষামূলক অবস্থার কথা আলোচনা করা হয়েছে সেসব অবস্থায়ই হযরত মুস আ. যথারীতি বনি ইসরাইলের হেদায়েত ও সংশোধনের কাজে নিমগ্ন ছিলেন। একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) নবী রাসুল যেমন কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করে এবং সমস্ত বিরোধিতা ও শত্রুতা সহ্য করে ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন এবং সত্যের পথে অবিচল থাকেন হযরত মুসা আ. তা-ই করেছিলেন। অবশেষে তাঁর পরকালের ডাকে সাড়া দেয়ার সময় চলে এলো।
হযরত খিযির আ.-এর ঘটনা সম্পর্কে আরো অনেক বিচিত্র ও বিস্ময়কর বর্ণনা তাফসির ও ইতিহাসের কিতাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। গবেষকগণের মতে, তার সবগুলোই অমূলক ও ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে সংগৃহীত। সুতরাং নির্ভরযোগ্য নয়।
'দুই সমুদ্রের সংযোগস্থল'- এখানে কোন্ দুই সমুদ্র এবং তাদের সংযোগস্থল বলতে কোন্ স্থানটি উদ্দেশ্য, এ-সম্পর্কে মুফাস্সির ও ইতিহাসবেত্তাদের বিভিন্ন অভিমত বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের যাবতীয় অভিমতের মধ্যে কোনো অভিমতই মীমাংসামূলক নয়। অবশ্য যাঁরা সাগর দুটিকে ভূমধ্য সাগর ও লোহিত সাগর এবং তাদের সংযোগস্থল উদ্দেশ্য করেছেন তাঁরা কিয়াস ও যৌক্তিকতার নিকটবর্তী বলে মনে হয়। আর এটা যে-সময়ের ঘটনা, তখন সম্ভবত এই দুটি সাগরের মধ্যে একটি মিলনরেখা বিদ্যমান ছিলো। যার ওপর হযরত খিযির আ. ও হযরত মুসা আ.-এর মধ্যকার এই ঘটনা ঘটেছিলো। কেননা, মিসর থেকে বের হওয়া এবং তীহ ময়দানে অবস্থানের সময় বাহ্যিকভাবে এই দুটি সমুদ্রের সঙ্গেই এই ঘটনা সম্পর্কিত হতে পারে। হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ. বলেন, এটা ওই স্থান, যাকে আজকাল আকাবা নামে বিখ্যাত হয়েছে।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফে হযরত মুসা আ.-এর ওফাতের ঘটনা বিবৃত হয়েছে এভাবে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ أُرْسِلَ مَلَكُ الْمَوْتِ إِلَى مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ فَلَمَّا جَاءَهُ صَكْهُ فَفَقَا عَيْنَهُ فَرَجَعَ إِلَى رَبِّهِ فَقَالَ أَرْسَلْتَنِي إِلَى عَبْدِ لَا يُرِيدُ الْمَوْتَ - قَالَ - فَرَدَّ اللَّهُ إِلَيْهِ عَيْنَهُ وَقَالَ ارْجِعْ إِلَيْهِ فَقُلْ لَهُ يَضَعُ يَدَهُ عَلَى مَتْنِ ثَوْرٍ فَلَهُ بِمَا غَطَّتْ يَدُهُ بِكُلِّ شَعْرَةٍ سَنَةٌ قَالَ أَيْ رَبِّ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ الْمَوْتُ. قَالَ فَالآنَ فَسَأَلَ اللَّهَ أَنْ يُدْنِيَهُ مِنَ الْأَرْضِ الْمُقَدِّسَةِ رَمْيَةٌ بِحَجَرٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم- فَلَوْ كُنْتُ ثُمَّ لأَرَيْتُكُمْ قَبْرَهُ إِلَى جَانِبِ الطَّرِيقِ تَحْتَ الْكَثِيبِ الْأَحْمَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, যখন হযরত মুসা আ.-এর ওফাতের সময় নিকটবর্তী হলো, তখন মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, 'আপনার প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিন।' হযরত মুসা আ. মৃত্যুর ফেরেশতাকে এমন চপেটাঘাত করলেন যে তাঁর একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেলো। তখন তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে গিয়ে অভিযোগ পেশ করলেন, 'আপনার ওই বান্দা মরতে ইচ্ছুক নন। আরো ব্যাপার এই যে, তিনি আমাকে এক চড় কষিয়েছেন।' আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় মৃত্যুদূতের চোখ ভালো হয়ে গেলো। তাঁর প্রতি আদেশ হলো, তুমি মুসার কাছে গিয়ে বলো, আল্লাহপাক আপনাকে বলেছেন, 'হে মুসা, কোনো বলদের কোমরের ওপর তোমার হাত রেখে দাও। যে-পরিমাণ পশম তোমার হাতের মুঠোর তলায় আসবে আমি তার প্রতিটি পশমের পরিবর্তে তোমার আয়ু এক বছর বাড়িয়ে দেবো।' ফেরেশতা আবার মুসা আ.-এর খেদমতে গিয়ে তাঁকে আল্লাহ তাআলার বাণী শুনালেন। হযরত মুসা আ. বললেন, 'হে আল্লাহ, এই আয়ু বৃদ্ধির পরিণাম কী হবে?' আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জবাব এলো, 'অবশেষে ওই মৃত্যুই।' হযরত মুসা আ. বললেন, 'যদি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম জীবনেরও পরিণাম মৃত্যুই হয়, তবে মৃত্যু আজকেই আসুক।' এরপর তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, 'ইয়া রাব্বুল আলামিন, এই অন্তিম সময়ে আমাকে পবিত্র ভূমির নিকটবর্তী করে দিন।'
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, 'আমি যদি ওখানে যেতে পারতাম তাহলে তোমাদেরকে হযরত মুসা আ.-এর কবরের চিহ্ন দেখিয়ে দিতে পারতাম : তিনি লাল টিলার (কাসিবে আহমার) কাছে এই স্থানে সমাহিত হয়েছেন।
জিয়া মুকাদ্দেসি বলেন, 'আরিহা নামক স্থানে লাল টিলার (কাসিবে আহমার) কাছে একটি সমাধি রয়েছে। একে হযরত মুসা আ.-এর সমাধি বলা হয়ে থাকে।' জিয়া মুকাদ্দেসির উক্তিটি অন্যান্য ভাষ্যের তুলনায় বিশুদ্ধ। কেননা, পবিত্র ভূমির আরিহা জনপদটিই তীহ প্রান্তরের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছিলো এবং এখানেই কাসিবে আহমার বা লাল টিলা অবস্থিত, যার উল্লেখ হাদিস শরিফে রয়েছে।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের উল্লিখিত হাদিসে মৃত্যুর ফেরেশতার সঙ্গে হযরত মুসা আ.-এর যে-ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে-সম্পর্কে ইবনে কুতাইবা' বলেন, তা একটি প্রতীকি ঘটনা।
আমাদের মতে, এই ঘটনায় মানুষের জীবন ও মৃত্যুর বিষয়টিকে এমন ভঙ্গিতে বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে এই শৃঙ্খলের যাবতীয় আবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ কড়াগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, যাতে এ-কথা প্রকাশিত হয়ে পড়ে যে, মানুষ যদি নবুওত ও রিসালাতের গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত থাকে, তবুও সে মানবিক স্বভাবের কারণে মৃত্যুকে একটি অপছন্দনীয় ব্যাপারই মনে করে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন তার সামনে মৃত্যুর স্বরূপ উন্মোচিত করে দেন, তখন তাঁর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত বান্দাগণের জন্য তা সর্বাধিক পছন্দনীয় বিষয় হয়ে ওঠে। তা ছাড়া এটাও যেনো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মৃত্যু কারো কাছে প্রিয় ও পছন্দনীয়ই হোক আর ঘৃণ্য ও অপছন্দনীয়ই হোক, চূড়ান্ত বিচারে তা একটি অটল আদেশ। এর থেকে কোনো অবস্থাতেই পলায়নের পথ নেই। আমাদের এই কামনা করা উচিত নয় যে, আমাদের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পাক; আমাদের এই আকাঙ্ক্ষা করা উচিত যে, জীবনের যে-সময়টুকু আমরা লাভ করেছি তা যেনো পবিত্রতা ও উন্নত চরিত্রের সঙ্গে পূর্ণ হয়। যাতে আল্লাহ তাআলার রহমত লাভ করা যায় এবং মৃত্যু সত্যিকারের অনন্ত জীবনে পরিণত হয়।
সুতরাং, এখন আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত উল্লিখিত হাদিসের বাক্যগুলোর ব্যাখ্যা এমনই হওয়া সমীচীন। হযরত মুসা আ.-এর খেদমতে প্রথম যখন মৃত্যুর ফেরেশতা আগমন করলেন তখন তিনি মানুষের আকৃতিতে আগমন করেছিলেন। হযরত মুসা আ. তাঁকে এই অবস্থায় দেখে চিনতে পারেন নি। যেমন : হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত লুত আ. আযাবের ফেরেশতাগণকে প্রথমে চিনতে পারেন নি।
হযরত মুসা আ.-এর কাছে এটা অপছন্দনীয় ব্যাপার মনো হলো যে, একজন অপরিচিত লোকের বিনা অনুমতিতে তাঁর নির্জন কক্ষে ঢুকে পড়া এবং তাঁকে মৃত্যুর সংবাদ দেয়ার কী অধিকার থাকতে পারে? এই ভেবে তিনি মৃত্যুদূতের গালের ওপর সজোরে চড় কষালেন। ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে এসেছিলেন। মানুষের মুখে চড় কষালে যে-ফল দাঁড়ায়, এখানেও তা-ই ঘটলো। ফেরেশতার একটি চোখ বিনষ্ট হয়ে গেলো। কিন্তু আযাবের ফেরেশতারা ধীরে ধীরে হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত লুত আ.-এর কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন, আর মুসা আ.-এর ক্ষেত্রে মৃত্যুর ফেরেশতা তাঁকে কোনো কিছু না জানিয়ে তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে গিয়ে পৌঁছলেন। আল্লাহ তাআলা পুনরায় তাঁকে ফেরেশতার আকৃতিতে ফিরিয়ে নিলেন এবং এভাবে তিনি ওই ক্ষত থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। যা মানবাকৃতিতে থাকার অবস্থায় চোখ হারানো ফলে সৃষ্টি হয়েছিলো।
মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত মুসা আ.-এর মনোভাব বুঝতে না পেরে মনে করলেন, হযরত মুসা আ. মৃত্যুর নাম শুনে ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেছেন এবং তিনি মৃত্যু চান না। তাই তিনি আল্লাহর দরবারে গিয়ে বললেন, 'আপনার এই বান্দা মৃত্যু চান না।' আল্লাহ তাআলা ফেরেশতার ভুল বুঝা এবং হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা উভয়টি প্রকাশ করার জন্য ফেরেশতাকে বললনে, 'তুমি আবার যাও এবং মুসাকে আমার এই পয়গাম শোনাও।' একটি ফেরেশতা আল্লাহর পক্ষ থেকে পয়গাম লাভ করছিলেন আর অপর দিকে হযরত মুসা আ. অপরিচিত লোকটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ফলে সঙ্গে সঙ্গে অনুধাবন করে ফেললেন যে, এটা মানবীয় ব্যাপার থেকে ভিন্ন, অন্য জগতের বিষয়। এরপর মৃত্যুর ফেরেশতা যখন পুনরায় এসে হযরত মুসা আ.-কে আল্লাহ তাআলার পয়গাম শুনালেন, তখন মুসা আ.-এর সুর ও কথা-বার্তার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হয়ে গেলো। অবশেষে তিনি সর্বোচ্চ বন্ধুর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হলেন। আর মৃত্যু নিকটবর্তী হওয়ার সময় যে-কয়েকটি ঘণ্টা ছিলো, তা এইভাবে মৃত্যুর পূর্বে উপদেশ ও নসিহত গ্রহণের উপকরণ হয়ে থাকলো।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের উল্লিখিত হাদিসের ভাবার্থের এটাই সবচেয়ে যথার্থ বিশ্লেষণ। এ-প্রসঙ্গে উলামায়ে কেরামের মধ্যে যেসব জটিলতা ও জিজ্ঞাসা আলোচিত হয়ে থাকে, এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার সমাধান হয়ে যায়।
তাওরাত ও ইতিহাসের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত মুসা আ.-এর বয়স হয়েছিলো একশো বিশ বছর। আর হযরত ইবরাহিম আ.-এর ইন্তেকাল ও হযরত মুসা আ.-এর জন্মের মধ্যবর্তী সময় প্রায় দুইশো পঞ্চাশ বছর।
তাওরাতের বিভিন্ন অংশে হযরত মুসা আ.-এর ইন্তেকালের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে এক অংশে নিম্নরূপে বর্ণিত হয়েছে: "আর মুসা 'মু-আব'-এর প্রান্তরগুলোর মধ্য থেকে 'বনু'র পর্বতশ্রেণির 'পসগা'র চূড়ায় আরোহণ করলেন, যা 'আরিহু' (আরিহা) নামক জনপদের সামনে অবস্থিত। আল্লাহ তাআলা 'জালআদ' থেকে শুরু করে 'রান' পর্যন্ত সমস্ত ভূমি তাঁকে দেখালেন। আর পেছনের সমুদ্র পর্যন্ত 'নাফতালে'র সমগ্র ভূমি, দক্ষিণের রাজ্য, আরিহু (আরিহা) উপত্যকা, যা ছিলো ধনভাণ্ডারের শহর এবং আরিহু উপত্যকার 'সুগার' প্রান্তর পর্যন্ত মুসা আ.-কে দেখালেন। আর আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, এটাই সেই রাজ্য, যার ব্যাপারে আমি ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবকে কসম খেয়ে বলেছিলাম, এই রাজ্য আমি তোমাদের বংশধরদেরকে দান করবো। সুতরাং আমি এই ব্যবস্থা করলাম, যেনো তুমি তা নিজের চোখে দেখতে পাও। তুমি কিন্তু ওখানে যেতে পারবে না। এরপর আল্লাহ তাআলার বান্দা আল্লাহর কথা অনুযায়ী 'মু-আব' রাজ্যে ইন্তেকাল করলেন এবং ওখানে 'মু-আব'-এর একটি উপত্যকায় 'বাইতে ফাগফুরে'র সামনে তাঁকে সমাহিত করা হলো। আজ পর্যন্ত তাঁর সমাধি সম্পর্কে কেউই অবগত নয়। আর মৃত্যুর সময় মুসা আ.-এর বয়স হয়েছিলো একশো বিশ বছর। অথচ তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ঝাঁপসা হয় নি এবং তাঁর দেহের স্বাভাবিক শক্তিও দুর্বল হয় নি।"
টিকাঃ
১৪০ বিস্তরাতি আলোচনার জন্য দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড: আল-বাহরুল মুহিত, ২য় খণ্ড; রুহুল মাআনি, ১৫শ খণ্ড: উমদাতুল কারি শারহু সহিহিল বুখারি, বদরুদ্দিন আল-আইনী, ৭ম খণ্ড; আল-ইসাবা, ১ম খণ্ড।
১৪১ সহিহ বুখারি: হাদিস ৩২২৬; সহিহ মুসলিম: হাদিস ৬২৯৭।
১৪২ ফাতহুল বারি, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩।
১৪৩ আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বিন মুসলিম বিন কুতাইবা আদ-দিনুরি (৮২৮-৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: تأويل مشكل القرآن تأويل مختلف الحديث كتاب الاختلاف في اللفظ الرد على الجهمية والمشبهة كتاب الصيام، دلالة النبوة إعراب القرآن تفسير غريب القرآن।
১৪৪ ফাতহুল বারি, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩।
১৪৫ ইস্তিসনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩৪, আয়াত ১-৭।
📄 বনি ইসরাইলের জাতিগত স্বভাব এবং নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দেয়া
হযরত মুসা আ. এবং বনি ইসরাইলের ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে পাঠ করলে যে-বিষয়টি সর্বপ্রথম চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা হলো বনি ইসরাইলিদের এক বিচিত্র ধরনের পরিবর্তনশীল স্বভাব। অবাধ্যাচরণ, অনুগ্রহ ভুলে যাওয়া, কলহ-বিবাদ বিস্তার, হিংসা-বিদ্বেষ তাদের জাতিগত স্বভাবের মূল উপাদান বলে পরিলক্ষিত হয়। খুব সম্ভব, তাদের জাতিগত স্বভাবের এই বিশৃঙ্খলা ও হীনতা কয়েক শতাব্দীর দাসত্বের ফল ছিলো। কেননা, যাবতীয় দোষের মধ্যে দাসত্ব এমন একটি দোষ যা মানুষের মধ্যে চরিত্রিক নীচতা, হীনতা ও হিংসা-বিদ্বেষের মতো অপবিত্র ও হীন স্বভাব সৃষ্টি করে দেয়।
বলা বাহুল্য, এমন জাতিকে সরল পথে আনয়ন করা বা সরল পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য নবী ও রাসুলগণকে কঠিন থেকে কঠিনতম প্রতিকূল অবস্থার শিকার হতে হয় এবং দুরতিক্রম্য মঞ্জিলসমূহের সম্মুখীন হতে হয়। এবং এটাই সবসময় হয়ে এসেছে। আর বনি ইসরাইলের জীবনে হযরত মুসা আ.-ই প্রথম নবী, যাঁর নবীসুলভ প্রচেষ্টায় তারা দাসত্ব থকে মুক্তি লাভ করেছে এবং জীবনে স্বাধীনতার সুখ ভোগ করার সুযোগ পেয়েছে। সুতরাং, মুসা আ.-কেই বনি ইসরাইলের জাতিগত নিকৃষ্ট স্বভাবের সম্মুখীন হওয়া এবং তাদের চরিত্র সংশোধনের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতম দুঃখ-যন্ত্রণাসমূহ সহ্য করতে হয়েছে।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেও এমন জাতির সংশোধন ও হেদায়েতের জন্য বিধান (তাওরাত) নাযিল করা ছাড়াও বহু সংখ্যক মুজেযা ও নিদর্শন প্রদর্শন করা হয়েছে। যেনো এভাবে তাদের পরিবর্তনশীল বিভ্রান্তিমূলক স্বভাবের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য তৈরি হয় এবং তাদের মধ্যে সত্য গ্রহণ করা এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার যোগ্যতা সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদের সুরা বাকারা, সুরা আ'রাফ ও সুরা ইবরাহিমে এসব নিদর্শন বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, 'সময়সাময়িক জাতিগুলোর মধ্যে বনি ইসরাইলই ছিলো তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ এবং দান ও ইহসানের কেন্দ্রস্থল।'
কিন্তু আফসোস! এসব নেয়ামত ও দয়া এবং ক্ষমা ও অনুগ্রহ অধিক হওয়া সত্ত্বেও বনি ইসরাইলের অবাধ্যাচার, নাফরমানি, বিদ্রোহ ও চারিত্রিক পরিবর্তন মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো এবং থেমে থেমে আত্মপ্রকাশ করতো। অবশেষে তারা আল্লাহ তাআলার চিরস্থায়ী লানত ও গযবকে তাদের গর্বের উপকরণ বানিয়ে নিলো। এভাবে তারা চিরকালের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান থেকে বঞ্চিত হওয়ার কলঙ্ক বরণ করে নিলো।
সুরা বাকারার আয়াতগুলোতে যা বলা হয়েছে তা এই-
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ
'হে বনি ইসরাইল, আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ করো যার দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছিলাম।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৪০, ৪৭, ১২২]
وَإِذْ نَجَّيْنَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ
'স্মরণ করো, যখন আমি ফেরআউনি সম্প্রদায় থেকে তোমাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলাম।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৪৯]
وَإِذْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَالْفُرْقَانَ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
'আর যখন আমি মুসাকে কিতাব ও ফুরকান দান করেছিলাম যাতে তোমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হও।' (সুরা বাকারা: আয়াত ৫৩]
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نَصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ
'স্মরণ করো, যখন তোমরা বলেছিলে, হে মুসা, আমরা একই রকম খাদ্যে কখনো ধৈর্য ধারণ করবো না।' (সুরা বাকারা: আয়াত ৬১)
وَإِذِ اسْتَسْقَى مُوسَى لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَالْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا
'স্মরণ করো, যখন মুসা তার সম্প্রদায়ের জন্য পানি প্রার্থনা করলো, আমি বললাম, "তুমি লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করো। ফলে তা থেকে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬০]
সুরা আ'রাফে যে-অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে তা এই-
وَإِذْ أَنْجَيْنَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ يُقَتَّلُونَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ
'স্মরণ করো, আমি তোমাদেরকে ফেরআউনের অনুসারীদের হাত থেকে উদ্ধার করেছি যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিতো। তারা তোমাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করতো এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখতো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ৪১]
সুরা ইবরাহিমে বলা হয়েছে-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ أَنْجَاكُمْ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, “হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তিনি তোমাদেরকে ফেরআউনি সম্প্রদায় থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন।' [সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৬]
উল্লিখিত আয়াতসমূহে এসব ঘটনারই আলোচনা রয়েছে এবং চক্ষুষ্মান লোকদের উপদেশ গ্রহণের জন্য শত-সহস্র উপকরণ রয়েছে।
অবশ্য কুরআন মাজিদ বনি ইসরাইলের জাতীয় জীবনের যে-চিত্র অঙ্কন করেছে, তাওরাতেও তার দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। এসব বিষয় সামনে রেখে এই প্রশ্ন উত্থাপিত করা যায় যে, আল্লাহ তাআলা এমন এক জাতিকে এত নেয়ামত ও ফযিলতের জন্য কেনো মনোনীত করলেন? সমস্ত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয়ের পরিজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলা প্রথম থেকেই কেনো এই অবাধ্যাচারী দুর্বিনীত জাতিকে পরিত্যাগ করলেন না এবং নেয়ামত ও ফযিলতের ধারা অন্য জাতির প্রতি ফিরিয়ে দিলেন না?
এই জিজ্ঞাসার জবাব এই যে, আপনারা যদি সে-যুগের ইতিহাস পাঠ করেন এবং علم الاجتماع (sociology /সমাজবিজ্ঞান) এবং (anthropology /নৃবিজ্ঞান)-এর মূলনীতিগুলো অধ্যয়ন করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, যখন থেকে বিশ্বজগতে মানবজাতির ইতিহাস অস্তিত্ব লাভ করেছে তখন এ-বিষয়টি পরিষ্কার ও স্পষ্ট যে, পৃথিবীর জাতিগুলোর সভ্যতা ও সামাজিক অবস্থা এবং তাদের রাজনীতি ও ধর্মনীতির ওপর সামি (Semitic) গোত্রসমূহের প্রভাব ও প্রাধান্য বিরাজমান।
ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের গভীর তল পর্যন্ত পৌছার পরও এমন কোনো জাতি দেখা যায় না যারা ওপর সামি (Semitic) অর্থাৎ, হযরত নুহ আ.-এর পুত্র সামের বংশধর গোত্রসমূহের প্রভাবে প্রভাবিত নয়। কুরআন মাজিদ যে-যুগের অবস্থা বর্ণনা করছে, সে-যুগে এই ভূ-পৃষ্ঠের ওপর ও আকাশের নিচে কাছে ও দূর-দূরান্তে সেসব সামি সম্প্রদায় বসবাস করতো, ইতিহাস তাদেরকে আমালিকা, কিবতি, কিনআনি, আন্নাকিম, সামিরি ইত্যাদি নামে স্মরণ করেছে।
এই জাতিগুলোর সভ্যতা সিরিয়া, ফিলিস্তিন, পূর্ব জর্ডান, মিসর ও ইরাকে দীপ্তিমান ছিলো। কিন্তু এই জাতিগুলোর মধ্যে শিরকি, কুফরি, বিদ্রোহ, অবাধ্যতা, অত্যাচার ও উৎপীড়নের যে-ভয়ঙ্কর অবস্থা বিরাজমান ছিলো, তার সামনে বনি ইসরাইলের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা অনেকাংশে উৎকৃষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। আর সমসাময়িক জাতিগুলোর মধ্য থেকে তাদের ভেতর সত্য গ্রহণের যোগ্যতা কিছুটা নিশ্চিত হওয়ার উপযোগী ছিলো। মিসরের ফেরআউন ও মিসরীয়দের ঘটনাবলি এবং কিবতি সম্প্রদাগুলোর অবস্থা ইতোপূর্বে আপনারা পাঠ করেছেন। আর কিনআনি ও আমালিকা সম্প্রদায়গুলোর ঘটনাবলি কিছু পরেই আপনাদের চোখের সামনে আসবে। আর সামিরি গোত্রের অবস্থা তাদের জনৈক সরদার 'সামিরি'র অবস্থা থেকে সহজেই অনুমিত হতে পারে।
এমনিই ছিলো তখনকার পরিবেশ ও অবস্থা যার ভিত্তিতে হেদায়েত ও সৎপথ প্রদর্শনের জন্য বনি ইসরাইলকে মনোনীত করা হয়েছে। আর ইতিহাস এ-বিষয়ের প্রমাণ দিচ্ছে যে, বনি ইসরাইলের ব্যাপক দুর্ভাগ্য সত্ত্বেও তাদেরই ক্ষুদ্র একটি দলের মাধ্যমে দীর্ঘকাল পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার হেদায়েতের বাণী মানব-সমাজে পৌঁছেছিলো। হাজার হাজার বছর পরে বনি ইসরাইলের বংশ থেকে এই নিয়ামত (নবুওত) ছিনিয়ে নিয়ে বনি ইসমাইল, অর্থাৎ হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধরের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
মোটকথা, হেদায়েত ও নসিহতের জন্য বনি ইসরাইলকে মনোনীত করা তাদের পবিত্রতার প্রেক্ষিতে ছিলো না; বরং উদ্দেশ্য ছিলো তাদের মাধ্যমে তাদের চেয়েও বেশি নৈরাজ্য ও ফেতনা-ফাসাদ বিস্তারকারী শক্তিগুলোকে খর্ব ও দমিত করা। এ-কারণে তাদের আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলির অনুগত করা এবং তাদেরকে সৎপথে আনার জন্য যাবতীয় কিছু করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের যুবকশ্রেণিকে দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করিয়েছেন।
আর তাওরাতও এখানে এই সত্যকে নিম্নবর্ণিত চমৎকার ভাষায় ব্যক্ত করেছে:
"শুনে রাখো হে বনি ইসরাইল, আজ তোমাদেরকে ইয়াদুনের তীরে এইজন্য যেতে হবে যাতে তোমরা জয়লাভ করো এমন জাতিগুলোর বিরুদ্ধে যারা তোমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী; এবং দখল করো এমনসব শহর যেগুলোর প্রাচীরসমূহ আকাশের সঙ্গে সংলাপ করছে। ওখানে আছে আন্নাকিমের বংশধরেরা। তারা বিশাল দেহী ও দুর্দান্ত। তোমরা তোমাদের অবস্থা অবগত আছো, আর তাদের সম্পর্কে লোকদেরকে এ-কথা বলতে শুনেছো যে, আন্নাকিম গোত্রের সঙ্গে কেউই মোকাবিলা করতে পারবে না। সুতরাং, আজ তোমরা জেনে রাখো, আল্লাহ তাআলার—তোমাদের প্রতিপালক—তোমাদের সম্মুখভাবে ভস্মকারী আগুনের মত গমন করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন। তিনি তাদেরকে তোমাদের সামনে অবনমিত করে দেবেন এমনভাবে যে, তোমরা তাদেরকে ওখান থেকে বের করে এনে অতিদ্রুত ধ্বংস করে ফেলবে। যেমন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে বলছেন। তোমাদের প্রতিপালক যখন তাদেরকে তোমাদের সামনে থেকে বের করে দেবেন তখন তোমরা মনে মনে এমন কথা বলো না যে, আমাদের সততার ফলে আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে এই রাজ্য অধিকার করার জন্য এখানে নিয়ে এসেছেন। কেননা, প্রকৃত পক্ষে ওই সম্প্রদায়গুলোর খারাপ কাজের কারণে তোমাদের সামনে থেকে তাদেরকে বের করে দিচ্ছেন। তোমরা নিজেদের সততা ও আন্তরের সদ্ভাবের কারণে ওই রাজ্যকে অধিকার করতে যাচ্ছো না। বরং তোমাদের প্রতিপালক ওই সম্প্রদায়গুলোর খারাপ কাজের কারণে তাদেরকে তোমাদের সামনে থেকে বের করছেন। যেনো এই উপায়ে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন। তিনি তোমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহিম, ইয়াকুব ও ইসহাকের সঙ্গে কসমের সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মোটকথা, তোমরা বুঝে নাও, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের সততার কারণে ওই উত্তম রাজ্যকে তোমাদের দখল করে নিতে দিচ্ছেন না। কেননা, তোমরা একটি হত্যাকারী কওম। এ-কথা তোমরা স্মরণ রেখো এবং কখনো ভুলো না যে, তীহ প্রান্তরে তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে কীভাবে ক্রোধান্বিত করেছো। বরং যখন তোমরা মিসর থেকে বের হয়েছে তখন থেকেই সর্বক্ষণ তোমাদের প্রতিপালকের অবাধ্যাচরণই করে যাচ্ছো। "
টিকাঃ
১৪৬ এই ঐতিহাসিক আলোচনা বিস্তারিত ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী; কিন্তু এখানে এর চেয়ে বেশি বলার সুযোগ নেই।
১৪৭ তাওরাত: ইস্তিসনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৯, আয়াত ১-৭।