📄 হযরত মুসা আ. ও কারুন
বনি ইসরাইলের মধ্যে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলো। কুরআন মাজিদ তার নাম বলেছে কারুন। স্বর্ণ, রুপা, হীরা ও জহরতে তার ধনভাণ্ডারগুলো পরিপূর্ণ ছিলো। বলবান শ্রমিকদের একটি দল অতি কষ্টে তার ধনভাণ্ডারগুলোর চাবির বোঝা বহন করতে পারতো। এই বিরাট পুঁজি ও ধনসম্পদ তাকে চরম অহংকারী করে তুলেছিলো। কারুন ধন-সম্পদের নেশায় এতই মত্ত ছিলো যে, আপন লোকজন, আত্মীয়-স্বজন এবং নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে খুবই তুচ্ছ ও হীন মনে করতো এবং তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতো।
মুফাস্সিরগণ বলেন, কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো এবং তার বংশপরিচয় নিম্নরূপ: কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস।'¹³⁰¹ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে এমন বক্তব্যই বর্ণিত হয়েছে।
ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, কারুন মিসরে অবস্থানকালে ফেরআউনের রাজদরবারে কর্মচারী ছিলো এবং এই অসীম ধনসম্পদরাশি সে ওখানে অবস্থানকালেই সঞ্চয় করেছিলো। আর সামিরি মুনাফিক ছিলো এবং সে হযরত মুসা আ.-এর ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতো না।
হযরত মুসা আ. একবার কারুনকে উপদেশ দিলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে অগণিত ও অসীম ধন-ঐশ্বর্য দান করেছেন। সম্মান ও প্রতিপত্তিও দান করেছে। সুতরাং তুমি আল্লাহর শোকর আদায় করো। ধন-সম্পদের হক যাকাত এবং সদকা প্রদান করে দরিদ্র ও ফকির-মিসকিনদের সাহায্য করো। আল্লাহকে ভুলে থাকা এবং তাঁর বিধি-নিষেধ অমান্য করা চরিত ও মহত্ব উভয় দিক থেকে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতা। আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত সম্মানের প্রতিদান এমন হওয়া উচিত নয় যে, তুমি দরিদ্র ও দুর্বলদেরকে হীন ও নিকৃষ্ট মনে করো এবং আত্মঅহমিকায় দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনদেরকে ঘৃণা করো।
কারুনের আত্মম্ভরিতা হযরত মুসা আ.-এর নসিহত পছন্দ করলো না। সে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সঙ্গে জবাব দিলো, হে মুসা, আমার এই ধন-ঐশ্বর্য তোমার আল্লাহর প্রদত্ত নয়। এগুলো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও কৌশলের বলে অর্জন করেছি। إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى علم عندي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।" সুতরাং আমি তোমার উপদেশ মেনে নিজের অর্জিত ধন-সম্পদকে এভাবে বিনষ্ট করতে পারি না।
কিন্তু হযরত মুসা আ. অনবরত তাঁর দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতেন এবং কারুনকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করতেন। কারুন দেখলো যে, হযরত মুসা আ. কোনোভাবেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। তাই সে মুসা আ.-কে বিরক্ত করার জন্য এবং ধন-সম্পদের আড়ম্বর প্রদর্শন করে তাঁকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে একদিন অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে বের হলো।
হযরত মুসা আ. তখন বনি ইসরাইলের এক দরবারে আল্লাহ তাআলার পয়গام শুনাচ্ছিলেন। এ-সময় কারুন এক বিরাট দল এবং বিশেষ জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে তার ধন-সম্পদ প্রদর্শন করতে করতে মুসা আ.-এর সামনে দিয়ে গমন করলো। এতে কারুনের এই ইঙ্গিত ছিলো যে, যদি মুসার দাওয়াতের ধারা এভাবেই চলতে থাকে, তবে আমারও এক বিরাট দল আছে এবং আমিও বিপুল হীরা ও জহরতের মালিক। সুতরাং লোকবল ও ধনবল—এই দুটি অস্ত্র দিয়েই আমি মুসাকে পরাভূত করবো।
বনি ইসরাইলিগণ যখন কারুনের বিপুল ধন-ঐশ্বর্য দেখলো, তাদের মধ্যে কিছু লোকের অন্তরে মানবিক দুর্বলতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তারা অস্থির হয়ে এমন দোয়া করতে লাগলো, আহা, কতই না উত্তম হতো যদি আমাদের ভাগ্যেও এমন ধন-সম্পদ ও জাঁকজমক জুটতো! কিন্তু বনি ইসরাইলের জ্ঞানী ব্যক্তিরা তৎক্ষণাৎ তাদেরকে বারণ করে দিয়ে বললেন, সাবধান! এই পার্থিব ঐশ্বর্য, সাজসজ্জা ও জাঁমকের মোহে পড়ো না। এসবের লালসায় আবদ্ধ হয়ে পড়ো না। তোমরা অচিরকালের মধ্যেই দেখতে পাবে এই ধন-সম্পদের ভয়াবহ পরিণাম কেমন হচ্ছে।
অবশেষে, কারুন যখন তার গর্ব ও দাম্ভিকতার চরম প্রদর্শনী করলো এবং হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মুসলমানদেরকে হেয়-প্রতিপন্নকরণে সর্বাধিক শক্তি ব্যয় করলো, তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগলো এবং কর্মফলের চিরন্তন ও স্বাভাবিক রীতি ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। কারুন ও তার ধন-সম্পদের প্রতি আল্লাহ তাআলার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলো—
فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ
“এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম।” [সুরা কাসাস: আয়াত ৮১]
বনি ইসরাইলিদের চোখসমূহ দেখতে পেলো যে, কারুনের অহমিকাও থাকলো না এবং অহমিকার উপকরণও থাকলো না। জমিন তার সব ধন-সম্পদ গিলে ফেললো এবং শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দিলো।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনাকে বিভিন্ন স্থানে মোটামুটি ও বিস্তারিত বর্ণনা করেছে—
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ () إِلَى فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَاحِرٌ كَذَّابٌ (سورة مؤمن)
'আমি আমার নিদর্শন ও স্পষ্ট প্রমাণসহ মুসাকে প্রেরণ করেছিলাম, ফেরআউন, হামান ও কারুনের কাছে। কিন্তু তারা বলেছিলো, "এই লোকটা তো এক জাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী।"' [সুরা মুমিন: আয়াত ২৩-২৪]
وَقَارُونُ وَفِرْعَوْنُ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ ( فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (سورة العنكبوت)
'এবং আমি সংহার করেছিলাম কারুন, ফেরআউন ও হামানকে। মুসা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলো; তখন তারা দেশে দম্ভ করতো; কিন্তু তারা আমার শাস্তি এড়াতে পারে নি। তাদের প্রত্যেকেই আমি তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম : তাদের কারো ওপর প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা, তাদের কাউকে আঘাত করেছে মহানিনাদ, কাউকেও আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাউকেও করেছিলাম নিমজ্জিত (সমুদ্রে)। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন নি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো।' [সুরা আনকাবুত: আয়াত ৩৯-৪০]
হযরত মুসা আ. ও কারুনের ঘটনা সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও সঠিক অবস্থা কেবল এতটুকুই। তা ছাড়া অতিরিক্ত যা-কিছু শোনা যায় সব ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে সংগৃহীত। সুতরাং সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। এ-কারণেই হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেছেন-
وقد ذكرها هنا إسرائيليات غريبة أضربنا عنها صفحا
'এখানে বহু অপরিচিত ইসরাইলি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। আমরা সেগুলো বর্জন করলাম।¹³²
إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি"- এখানে علم বা কৌশল বলতে 'ইলমে কিমিয়া', অর্থাৎ, 'পরশমণি'-সম্পর্কিত কৌশল উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে কিমিয়ার কৌশল প্রয়োগ করেই কারুন তার সব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। কিন্তু গবেষক মুফাস্সিরগণ তা খণ্ডন করে বলেছেন যে, এখানে علم দ্বারা জ্ঞান-বুদ্ধিই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, সে জ্ঞান-বুদ্ধির বলে এসব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। علم শব্দকে কিমিয়া বলে ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত অর্থহীন কথা।
মুফাস্সির আলেমগণ এ-বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন নি যে, কারুনের ঘটনাটি কখন ঘটেছিলো। ফেরআউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার আগে মিসরে ঘটেছিলো না-কি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পর তীহ ময়দানে ঘটেছিলো। হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেন, ঘটনাটা যদি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার আগের ঘটনা হয়ে থাকে,
فَخَسَفْنَا "এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম" বাক্যের بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ (অর্থাৎ প্রাসাদ) শব্দ দ্বারা তার আভিধানিক অর্থই উদ্দেশ্য। আর যদি তা ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পরের ঘটনা হয়ে থাকে তবে এখানে বলতে তাঁবু উদ্দেশ্য।¹³³
(এই গ্রন্থের লেখক বলেন,) আমাদের মতে কারুনের ঘটনা ফেরআউনের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পরবর্তীকালে তীহ প্রান্তরেই ঘটেছিলো। কেননা, কুরআন মাজিদ ফেরআউনের নিমজ্জন-সংক্রান্ত সব ঘটনা বলার পর এই ঘটনা বর্ণনা করেছে।
কুরআন মাজিদ কারুনের বিস্তারিত ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছে-
إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ )) وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسَنُ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ () قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ () فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ ( وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِمَنْ آمَنَ وعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ () فَخَسَفْنَا بِه ا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ )) وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيُكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَنْ مِّنَ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيُكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ () تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ (سورة القصص)
'কারুন¹³² ছিলো মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলো। আমি তাকে দান করেছিলাম এমন ধনভাণ্ডার যার চাবিগুলো বহন করা একদল শক্তিশালী লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিলো।
স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিলো, "দম্ভ করো না, নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না; তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালোবাসেন না।" কারুন বললো, "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।” সে কি জানতো না আল্লাহ তার পূর্বে ধ্বংস করেছেন বহু মানবগোষ্ঠীকে যারা তার অপেক্ষা শক্তিতে ছিলো প্রবল, জনসংখ্যায় ছিলো অধিক?
অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না। ¹³⁴ (অর্থাৎ, তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে বলেই তো তারা নানা ধরনের পাককাজে লিপ্ত হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে জিজ্ঞেস করে কী লাভ?)
কারুন তার সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিলো জাঁকজমকের সঙ্গে। যারা পার্থিব জীবন কামনা করতো তারা বললো, "আহা, কারুনকে যেমন দেয়া হয়েছে আমাদেরকেও যদি তা দেয়া হতো! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান।" এবং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিলো তারা বললো, "ধিক তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ব্যতীত তা কেউ পাবে না।"
এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম। তার পক্ষে এমন কোনো দল ছিলো না যারা আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে সাহায্য করতে পারতো এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলো না। আগের দিন যারা তার মতো হওয়ার কামনা করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, "দেখলে তো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা কমিয়ে দেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় না হতেন তবে আমাদেরকেও তিনি ভূগর্ভে প্রোথিত করে দিতেন। দেখলে তো! কফেররা সফলকাম হয় না।” তা আখেরাতের সেই আবাস যা আমি নির্ধারণ করি তাদের জন্য যারা এই পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য। [সুরা কাসাস: আয়াত ৭৬-৮৩]
তাওরাতও এই ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। ¹³⁵ কিন্তু তাওরাতের বর্ণনা ও কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করার পর একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ভালোভাবেই অনুমান করতে পারেন যে, কুরআন যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করে, তখন ঘটনার শুধু ওই অংশগুলোই বর্ণনা করে থাকে যা উপদেশ ও নসিহতের জন্য প্রয়োজনীয় এবং কুরআন প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশগুলো ত্যাগ করে। কিন্তু তাওরাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনাবশ্যক বিবরণসমূহ বর্ণিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো স্থানে তো বেখাপ্পা বিস্তৃত বিবরণ ও বিপরীত বর্ণনাও পাওয়া যায়। যা আমরা প্রয়োজন হলে উদ্ধৃত করে থাকি। যেমন: এখানেও ঘটনাটির কতিপয় অনাবশ্যক অংশকে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
টিকাঃ
¹³⁰¹ কারুনের বংশপরম্পরা কয়েকভাবে বর্ণিত আছে: ১. কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস (ফারুন বিন ইয়াসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ২. কারুন বিন মিসর বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন মসর বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ৩. কারুন বিন নাসহার বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন নসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। আর মুসা আ.-এর বংশপরম্পরা নিম্নরূপ: মুসা বিন ইমরান বিন কাহাস বিন লাবি বিন ইয়াকুব ইসরাইলুল্লাহ বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম আ.। অর্থাৎ, কারুন ও হযরত মুসা আ. কাহাসের নাতি।
¹³² কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো। ফেরআউনের অন্যতম সভাসদ। কৃপণতার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত।
¹³³ বৈধভাবে অর্জন ও ব্যয় করো এবং আখেরাতের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করো।
¹³⁴ জানার জন্য প্রশ্ন করার প্রয়োজন হবে না, কারণ আমালনামায় সব লিপিবদ্ধ থাকবে।
¹³⁵ গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২০-৩৪।
বনি ইসরাইলের মধ্যে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলো। কুরআন মাজিদ তার নাম বলেছে কারুন। স্বর্ণ, রুপা, হীরা ও জহরতে তার ধনভাণ্ডারগুলো পরিপূর্ণ ছিলো। বলবান শ্রমিকদের একটি দল অতি কষ্টে তার ধনভাণ্ডারগুলোর চাবির বোঝা বহন করতে পারতো। এই বিরাট পুঁজি ও ধনসম্পদ তাকে চরম অহংকারী করে তুলেছিলো। কারুন ধন-সম্পদের নেশায় এতই মত্ত ছিলো যে, আপন লোকজন, আত্মীয়-স্বজন এবং নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে খুবই তুচ্ছ ও হীন মনে করতো এবং তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতো।
মুফাস্সিরগণ বলেন, কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো এবং তার বংশপরিচয় নিম্নরূপ: কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস।'¹³⁰¹ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে এমন বক্তব্যই বর্ণিত হয়েছে।
ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, কারুন মিসরে অবস্থানকালে ফেরআউনের রাজদরবারে কর্মচারী ছিলো এবং এই অসীম ধনসম্পদরাশি সে ওখানে অবস্থানকালেই সঞ্চয় করেছিলো। আর সামিরি মুনাফিক ছিলো এবং সে হযরত মুসা আ.-এর ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতো না।
হযরত মুসা আ. একবার কারুনকে উপদেশ দিলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে অগণিত ও অসীম ধন-ঐশ্বর্য দান করেছেন। সম্মান ও প্রতিপত্তিও দান করেছে। সুতরাং তুমি আল্লাহর শোকর আদায় করো। ধন-সম্পদের হক যাকাত এবং সদকা প্রদান করে দরিদ্র ও ফকির-মিসকিনদের সাহায্য করো। আল্লাহকে ভুলে থাকা এবং তাঁর বিধি-নিষেধ অমান্য করা চরিত ও মহত্ব উভয় দিক থেকে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতা। আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত সম্মানের প্রতিদান এমন হওয়া উচিত নয় যে, তুমি দরিদ্র ও দুর্বলদেরকে হীন ও নিকৃষ্ট মনে করো এবং আত্মঅহমিকায় দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনদেরকে ঘৃণা করো।
কারুনের আত্মম্ভরিতা হযরত মুসা আ.-এর নসিহত পছন্দ করলো না। সে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সঙ্গে জবাব দিলো, হে মুসা, আমার এই ধন-ঐশ্বর্য তোমার আল্লাহর প্রদত্ত নয়। এগুলো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও কৌশলের বলে অর্জন করেছি। إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى علم عندي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।" সুতরাং আমি তোমার উপদেশ মেনে নিজের অর্জিত ধন-সম্পদকে এভাবে বিনষ্ট করতে পারি না।
কিন্তু হযরত মুসা আ. অনবরত তাঁর দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতেন এবং কারুনকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করতেন। কারুন দেখলো যে, হযরত মুসা আ. কোনোভাবেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। তাই সে মুসা আ.-কে বিরক্ত করার জন্য এবং ধন-সম্পদের আড়ম্বর প্রদর্শন করে তাঁকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে একদিন অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে বের হলো।
হযরত মুসা আ. তখন বনি ইসরাইলের এক দরবারে আল্লাহ তাআলার পয়গام শুনাচ্ছিলেন। এ-সময় কারুন এক বিরাট দল এবং বিশেষ জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে তার ধন-সম্পদ প্রদর্শন করতে করতে মুসা আ.-এর সামনে দিয়ে গমন করলো। এতে কারুনের এই ইঙ্গিত ছিলো যে, যদি মুসার দাওয়াতের ধারা এভাবেই চলতে থাকে, তবে আমারও এক বিরাট দল আছে এবং আমিও বিপুল হীরা ও জহরতের মালিক। সুতরাং লোকবল ও ধনবল—এই দুটি অস্ত্র দিয়েই আমি মুসাকে পরাভূত করবো।
বনি ইসরাইলিগণ যখন কারুনের বিপুল ধন-ঐশ্বর্য দেখলো, তাদের মধ্যে কিছু লোকের অন্তরে মানবিক দুর্বলতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তারা অস্থির হয়ে এমন দোয়া করতে লাগলো, আহা, কতই না উত্তম হতো যদি আমাদের ভাগ্যেও এমন ধন-সম্পদ ও জাঁকজমক জুটতো! কিন্তু বনি ইসরাইলের জ্ঞানী ব্যক্তিরা তৎক্ষণাৎ তাদেরকে বারণ করে দিয়ে বললেন, সাবধান! এই পার্থিব ঐশ্বর্য, সাজসজ্জা ও জাঁমকের মোহে পড়ো না। এসবের লালসায় আবদ্ধ হয়ে পড়ো না। তোমরা অচিরকালের মধ্যেই দেখতে পাবে এই ধন-সম্পদের ভয়াবহ পরিণাম কেমন হচ্ছে।
অবশেষে, কারুন যখন তার গর্ব ও দাম্ভিকতার চরম প্রদর্শনী করলো এবং হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মুসলমানদেরকে হেয়-প্রতিপন্নকরণে সর্বাধিক শক্তি ব্যয় করলো, তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগলো এবং কর্মফলের চিরন্তন ও স্বাভাবিক রীতি ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। কারুন ও তার ধন-সম্পদের প্রতি আল্লাহ তাআলার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলো—
فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ
“এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম।” [সুরা কাসাস: আয়াত ৮১]
বনি ইসরাইলিদের চোখসমূহ দেখতে পেলো যে, কারুনের অহমিকাও থাকলো না এবং অহমিকার উপকরণও থাকলো না। জমিন তার সব ধন-সম্পদ গিলে ফেললো এবং শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দিলো।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনাকে বিভিন্ন স্থানে মোটামুটি ও বিস্তারিত বর্ণনা করেছে—
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ () إِلَى فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَاحِرٌ كَذَّابٌ (سورة مؤمن)
'আমি আমার নিদর্শন ও স্পষ্ট প্রমাণসহ মুসাকে প্রেরণ করেছিলাম, ফেরআউন, হামান ও কারুনের কাছে। কিন্তু তারা বলেছিলো, "এই লোকটা তো এক জাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী।"' [সুরা মুমিন: আয়াত ২৩-২৪]
وَقَارُونُ وَفِرْعَوْنُ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ ( فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (سورة العنكبوت)
'এবং আমি সংহার করেছিলাম কারুন, ফেরআউন ও হামানকে। মুসা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলো; তখন তারা দেশে দম্ভ করতো; কিন্তু তারা আমার শাস্তি এড়াতে পারে নি। তাদের প্রত্যেকেই আমি তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম : তাদের কারো ওপর প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা, তাদের কাউকে আঘাত করেছে মহানিনাদ, কাউকেও আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাউকেও করেছিলাম নিমজ্জিত (সমুদ্রে)। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন নি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো।' [সুরা আনকাবুত: আয়াত ৩৯-৪০]
হযরত মুসা আ. ও কারুনের ঘটনা সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও সঠিক অবস্থা কেবল এতটুকুই। তা ছাড়া অতিরিক্ত যা-কিছু শোনা যায় সব ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে সংগৃহীত। সুতরাং সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। এ-কারণেই হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেছেন-
وقد ذكرها هنا إسرائيليات غريبة أضربنا عنها صفحا
'এখানে বহু অপরিচিত ইসরাইলি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। আমরা সেগুলো বর্জন করলাম।¹³²
إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি"- এখানে علم বা কৌশল বলতে 'ইলমে কিমিয়া', অর্থাৎ, 'পরশমণি'-সম্পর্কিত কৌশল উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে কিমিয়ার কৌশল প্রয়োগ করেই কারুন তার সব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। কিন্তু গবেষক মুফাস্সিরগণ তা খণ্ডন করে বলেছেন যে, এখানে علم দ্বারা জ্ঞান-বুদ্ধিই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, সে জ্ঞান-বুদ্ধির বলে এসব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। علم শব্দকে কিমিয়া বলে ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত অর্থহীন কথা।
মুফাস্সির আলেমগণ এ-বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন নি যে, কারুনের ঘটনাটি কখন ঘটেছিলো। ফেরআউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার আগে মিসরে ঘটেছিলো না-কি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পর তীহ ময়দানে ঘটেছিলো। হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেন, ঘটনাটা যদি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার আগের ঘটনা হয়ে থাকে,
فَخَسَفْنَا "এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম" বাক্যের بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ (অর্থাৎ প্রাসাদ) শব্দ দ্বারা তার আভিধানিক অর্থই উদ্দেশ্য। আর যদি তা ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পরের ঘটনা হয়ে থাকে তবে এখানে বলতে তাঁবু উদ্দেশ্য।¹³³
(এই গ্রন্থের লেখক বলেন,) আমাদের মতে কারুনের ঘটনা ফেরআউনের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পরবর্তীকালে তীহ প্রান্তরেই ঘটেছিলো। কেননা, কুরআন মাজিদ ফেরআউনের নিমজ্জন-সংক্রান্ত সব ঘটনা বলার পর এই ঘটনা বর্ণনা করেছে।
কুরআন মাজিদ কারুনের বিস্তারিত ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছে-
إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ )) وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسَنُ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ () قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ () فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ ( وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِمَنْ آمَنَ وعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ () فَخَسَفْنَا بِه ا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ )) وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيُكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَنْ مِّنَ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيُكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ () تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ (سورة القصص)
'কারুন¹³² ছিলো মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলো। আমি তাকে দান করেছিলাম এমন ধনভাণ্ডার যার চাবিগুলো বহন করা একদল শক্তিশালী লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিলো।
স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিলো, "দম্ভ করো না, নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না; তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালোবাসেন না।" কারুন বললো, "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।” সে কি জানতো না আল্লাহ তার পূর্বে ধ্বংস করেছেন বহু মানবগোষ্ঠীকে যারা তার অপেক্ষা শক্তিতে ছিলো প্রবল, জনসংখ্যায় ছিলো অধিক?
অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না। ¹³⁴ (অর্থাৎ, তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে বলেই তো তারা নানা ধরনের পাককাজে লিপ্ত হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে জিজ্ঞেস করে কী লাভ?)
কারুন তার সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিলো জাঁকজমকের সঙ্গে। যারা পার্থিব জীবন কামনা করতো তারা বললো, "আহা, কারুনকে যেমন দেয়া হয়েছে আমাদেরকেও যদি তা দেয়া হতো! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান।" এবং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিলো তারা বললো, "ধিক তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ব্যতীত তা কেউ পাবে না।"
এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম। তার পক্ষে এমন কোনো দল ছিলো না যারা আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে সাহায্য করতে পারতো এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলো না। আগের দিন যারা তার মতো হওয়ার কামনা করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, "দেখলে তো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা কমিয়ে দেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় না হতেন তবে আমাদেরকেও তিনি ভূগর্ভে প্রোথিত করে দিতেন। দেখলে তো! কফেররা সফলকাম হয় না।” তা আখেরাতের সেই আবাস যা আমি নির্ধারণ করি তাদের জন্য যারা এই পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য। [সুরা কাসাস: আয়াত ৭৬-৮৩]
তাওরাতও এই ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। ¹³⁵ কিন্তু তাওরাতের বর্ণনা ও কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করার পর একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ভালোভাবেই অনুমান করতে পারেন যে, কুরআন যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করে, তখন ঘটনার শুধু ওই অংশগুলোই বর্ণনা করে থাকে যা উপদেশ ও নসিহতের জন্য প্রয়োজনীয় এবং কুরআন প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশগুলো ত্যাগ করে। কিন্তু তাওরাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনাবশ্যক বিবরণসমূহ বর্ণিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো স্থানে তো বেখাপ্পা বিস্তৃত বিবরণ ও বিপরীত বর্ণনাও পাওয়া যায়। যা আমরা প্রয়োজন হলে উদ্ধৃত করে থাকি। যেমন: এখানেও ঘটনাটির কতিপয় অনাবশ্যক অংশকে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
টিকাঃ
¹³⁰¹ কারুনের বংশপরম্পরা কয়েকভাবে বর্ণিত আছে: ১. কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস (ফারুন বিন ইয়াসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ২. কারুন বিন মিসর বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন মসর বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ৩. কারুন বিন নাসহার বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন নসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। আর মুসা আ.-এর বংশপরম্পরা নিম্নরূপ: মুসা বিন ইমরান বিন কাহাস বিন লাবি বিন ইয়াকুব ইসরাইলুল্লাহ বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম আ.। অর্থাৎ, কারুন ও হযরত মুসা আ. কাহাসের নাতি।
¹³² কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো। ফেরআউনের অন্যতম সভাসদ। কৃপণতার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত।
¹³³ বৈধভাবে অর্জন ও ব্যয় করো এবং আখেরাতের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করো।
¹³⁴ জানার জন্য প্রশ্ন করার প্রয়োজন হবে না, কারণ আমালনামায় সব লিপিবদ্ধ থাকবে।
¹³⁵ গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২০-৩৪।
📄 বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট ও যন্ত্রণা প্রদান
পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহ এ-কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-কে সবসময় কথায় ও কাজে সব দিক দিয়েই নানা ধরনের কষ্ট দিয়ে আসছে। এমনকি তাঁর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ ও মিথ্যা অপবাদ প্রদান করতেও ত্রুটি করে নি।
প্রতিমা-পূজার আবদার, গো-বৎসের পূজায় লিপ্ত হওয়া, তাওরাতের বিধি-বিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি, মান্না ও সালওয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা-মোটকথা, প্রতিটি কর্তব্য সম্পন্ন করার ব্যাপারে একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা এবং প্রত্যেকটি ব্যাপারে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে মূর্খতাসুলভ বাদানুবাদ ইত্যাদির এক সক্রিয় ধারা অব্যাহত ছিলো। এসব বিষয় বনি ইসরাইলের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে দৃষ্ট হয়। আর অন্যদিকে দেখা যায় যে, হযরত মুসা আ. দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুলের মতো সবকিছু সহ্য করে হেদায়েত ও নসিহতের কাছে মশগুল ছিলেন।
কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও যদি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে বনি ইসরাইলের ওইসব বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক গুণাবলি জানতে আগ্রহ হয়, তবে তাওরাতের নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করা যেতে পারে: নিষ্ক্রমণ অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১২, আয়াত ১১-১২; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২-৩।
গণনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১-৩; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ১৩-১৪; অনুচ্ছেদ ৭, আয়াত ১২-১৩। ইস্তিসনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ৯; আয়াত ২৩-২৪।
এই গ্রন্থের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যে-ঘটনাবলি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে তা ছাড়াও কুরআন মাজিদ সুরা আহযাব ও সুরা সাফ-এ হযরত মুসা আ.-কে বনি ইসরাইল যেসব দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করে তার নিন্দা করেছে এবং বলেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وَجِيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (سورة الصف)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছো যখন তোমরা জানো যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল।" এরপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' [সুরা সাফ: আয়াত ৫]
মুফাস্সির আলেমগণ উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে আলোচনা করেছেন যে, এখানে যে-কষ্ট প্রদানের কথা উল্লেখ করেছে তাতে কি ওইসব অবস্থাই উদ্দেশ্য যা বনি ইসরাইলের ধারাবাহিক নাফরমানি ও অবাধ্যতার প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবকিছু নিশ্চিতভাবে হযরত মুসা আ.-এর মনঃকষ্টের কারণ ছিলো না-কি ওগুলো ব্যতীত অন্যকোনো বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য। যেমন: কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, উল্লিখিত আয়াত দুটিতে বনি ইসরাইল অবাধ্যতা ও হঠকারিতার মাধ্যমে হযরত মুসা আ.কে যে-যন্ত্রণা ও ক্লেশ দিতো তা-ই উদ্দেশ্য। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থল হিসেবে পূর্ববর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে পৃথক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, কোনো কোনো সহিহ হাদিসে হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন এমন ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় যার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন মাজিদে নেই। সুতরাং, তাঁদের বর্ণিত ঘটনাবলি থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা অথবা এ-জাতীয় সব ঘটনাই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল এবং এ-ঘটনাগুলোই আয়াত দুটির শানে-নুযুল তুল্য।
তাঁদের বর্ণিত ঘটনাসমূহ থেকে একটি ঘটনা সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে।
قَالَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ يَغْتَسِلُونَ عُرَاةً يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى سَوْأَةِ بَعْضٍ وَكَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ يَغْتَسِلُ وَحْدَهُ فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا يَمْنَعُ مُوسَى أَنْ يَغْتَسِلَ مَعَنَا إِلَّا أَنَّهُ آدَرُ. قَالَ فَذَهَبَ مَرَّةً يَغْتَسِلُ فَوَضَعَ ثَوْبَهُ عَلَى حَجَرٍ فَفَرَّ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ - قَالَ - فَجَمَحَ مُوسَى بِأَثَرِهِ يَقُولُ ثَوْبِي حَجَرُ ثَوْبِي حَجَرُ حَتَّى نَظَرَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ إِلَى سَوْأَةِ مُوسَى فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا بِمُوسَى مِنْ بَأْسِ فَقَامَ الْحَجَرُ بَعْدُ حَتَّى نُظِرَ إِلَيْهِ - قَالَ - فَأَخَذَ ثَوْبَهُ فَطَفِقَ بِالْحَجَرِ ضَرْبًا ». قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاللَّهِ إِنَّهُ بِالْحَجَرِ نَدَبٌ سِتَّةٌ أَوْ سَبْعَةٌ ضَرْبُ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالْحَجَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "হযরত মুসা আ. অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর দেহের কোনো অংশের ওপরই কারো দৃষ্টি পড়তে দিতেন না। পক্ষান্তরে বনি ইসরাইলিরা সর্বসাধারণের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করতে অভ্যস্ত ছিলো। তারা একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতো। এ-কারণে তারা হযরত মুসা আ.-কে উত্যক্ত করতো এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতো। কখনো তারা বলতো, 'হযরত মুসা আ.-এর বিশেষ অঙ্গে শ্বেতরোগের দাগ রয়েছে।' কখনো তারা বলতো, 'তাঁর কুরুণ্ডিয়া রোগ (অণ্ডকোষ বৃদ্ধির ব্যাধি) আছে। বা এ-জাতীয় অন্যকোনো খারাপ রোগ আছে। এ-জন্যই তিনি পৃথক স্থানে গোপনে গোসল করে থাকেন।' হযরত মুসা বনি ইসরাইলের এসব অপবাদ শুনে নীরব থাকতেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলো মুসা আ.-কে এসব অপবাদ থেকে মুক্ত ও পবিত্র করবেন। মুসা আ. একটি পৃথকভাবে আড়ালে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি তার পরনের কাপড় খুলে একখণ্ড পাথরের ওপর রাখলেন। তখনই পাথরটি আল্লাহ তাআলার আদেশে তার স্থান থেকে নড়ে উঠলো এবং যেখানে সর্বসাধারণের সামনে বনি ইসরাইলিরা নগ্ন অবস্থায় গোসল করছিলো, পাথরটি মুসা আ.-এর কাপড় নিয়ে ঠিক ওখানে গিয়ে পৌছলো। হযরত মুসা আ. ঘাবড়ে গিয়ে ও ক্রোধান্বিত হয়ে পাথরের পেছনে পেছনে এই বলে ছুটলেন, হে পাথর, আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়! পাথরের সঙ্গে সঙ্গে মুসা আ.-ও সাধারণ মানুষের সামনে এসে পৌঁছলেন এবং সবাই দেখতে পেলো যে, হযরত মুসা আ. তাদের দোষারোপ করা সমস্ত রোগ ও ব্যাধি থেকে পবিত্র। হযরত মুসা আ.-এর ওপর এই ঘটনার প্রভাব এত অধিক হলো যে, ক্রোধে অধীর হয়ে পাথরটির ওপর তাঁর লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন। ওই পাথরের ওপর তাঁর প্রত্যেকটি আঘাতেরই দাগ বসে গেলো।"¹³⁶
ইমাম বুখারি ও মুসলিম এই ঘটনাটিকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে একটি সনদে এই ঘটনাকে সুরা আহযাবের ওই আয়াতের শানে-নুযুল বলা হয়েছে যাতে বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে যন্ত্রণা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত মুসা আ.-এর পবিত্রতা ঘোষণার উল্লেখ রয়েছে। আর এ-আয়াতটিরই শানে-নুযুল হিসেবে ইবনে আবি হাতেম হযরত আলি রা. থেকে অন্য একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন, হযরত মুসা ও হারুন আ. পাহাড়ের ওপর গমন করলেন। পাহাড়ে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেন। ফলে মুসা. একাকী ফিরে আসেন। বনি ইসরাইল তা দেখে হযরত মুসা আ.-এর বিরুদ্ধে এই অপবাদ রটনা করলো যে, তিনি হারুন আ.-কে হত্যা করেছেন। এই অপবাদে হযরত মুসা আ. অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তখন আল্লাহপাক ফেরেশতাদেরকে হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ বনি ইসরাইলের সামনে এনে উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ খোলা প্রান্তরে বনি ইসরাইলের ভরা মজলিসে সবার সামনে এনে উপস্থিত করলেন। তারা তা দেখে নিশ্চিত হলো যে, সত্য সত্যই হযরত হারুন আ.-এর দেহে কোথাও কোনো আঘাত বা হত্যার চিহ্ন নেই।
তৃতীয় হাদিসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও সুদ্দি থেকে তাফসিরের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত মুসা আ.-এর উপদেশ ও নসিহত কারুনের কাছে অত্যন্ত অসহনীয় হয়ে পড়লো। ফলে সে একদিন এক বারবণিতাকে কিছু টাকা দিয়ে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করলো যে, যখন হযরত মুসা ওয়াজ-নসিহতে মশগুল থাকবে, ঠিক সে- সময়ে তুমি মজলিসে দাঁড়িয়ে মুসার বিরুদ্ধে এই দোষারোপ করবে যে, তোমার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বিপুল জনসমাবেশে ওয়াজ করছিলেন। তখন ওই বারবণিতা সমাবেশে দাঁড়িয়ে কারুনের কথামতো হযরত মুসা আ.-এর ওপর দোষারোপ করলো। হযরত মুসা আ. এই রমণীর কথা শোনামাত্র সিজদায় পতিত হলেন। তারপর মাথা তুলের রমণীকে সম্বোধন করে বললেন, তুই কি আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলতে পারিস যে তুই যা বলছিস তা সত্য? এ-কথা শুনে রমণীটির দেহে ভীষণ কাঁপুনি শুরু হয়ে গেলো। সে বললো, আল্লাহর কসম, সত্য কথা এই যে, কারুন আমাকে টাকা দিয়ে এ-ধরনের কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলো। আপনি তো এ-ধরনের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। তখন হযরত মুসা আ. কারুনের জন্য বদদোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশে কারুনকে তার সব ধনসম্পদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেয়া হলো।
টিকাঃ
¹³⁶ সহিহ বুখারি: হাদিস ২98; সহিহ মুসলিম: হাদিস 339।
পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহ এ-কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-কে সবসময় কথায় ও কাজে সব দিক দিয়েই নানা ধরনের কষ্ট দিয়ে আসছে। এমনকি তাঁর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ ও মিথ্যা অপবাদ প্রদান করতেও ত্রুটি করে নি।
প্রতিমা-পূজার আবদার, গো-বৎসের পূজায় লিপ্ত হওয়া, তাওরাতের বিধি-বিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি, মান্না ও সালওয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা-মোটকথা, প্রতিটি কর্তব্য সম্পন্ন করার ব্যাপারে একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা এবং প্রত্যেকটি ব্যাপারে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে মূর্খতাসুলভ বাদানুবাদ ইত্যাদির এক সক্রিয় ধারা অব্যাহত ছিলো। এসব বিষয় বনি ইসরাইলের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে দৃষ্ট হয়। আর অন্যদিকে দেখা যায় যে, হযরত মুসা আ. দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুলের মতো সবকিছু সহ্য করে হেদায়েত ও নসিহতের কাছে মশগুল ছিলেন।
কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও যদি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে বনি ইসরাইলের ওইসব বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক গুণাবলি জানতে আগ্রহ হয়, তবে তাওরাতের নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করা যেতে পারে: নিষ্ক্রমণ অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১২, আয়াত ১১-১২; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২-৩।
গণনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১-৩; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ১৩-১৪; অনুচ্ছেদ ৭, আয়াত ১২-১৩। ইস্তিসনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ৯; আয়াত ২৩-২৪।
এই গ্রন্থের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যে-ঘটনাবলি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে তা ছাড়াও কুরআন মাজিদ সুরা আহযাব ও সুরা সাফ-এ হযরত মুসা আ.-কে বনি ইসরাইল যেসব দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করে তার নিন্দা করেছে এবং বলেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وَجِيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (سورة الصف)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছো যখন তোমরা জানো যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল।" এরপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' [সুরা সাফ: আয়াত ৫]
মুফাস্সির আলেমগণ উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে আলোচনা করেছেন যে, এখানে যে-কষ্ট প্রদানের কথা উল্লেখ করেছে তাতে কি ওইসব অবস্থাই উদ্দেশ্য যা বনি ইসরাইলের ধারাবাহিক নাফরমানি ও অবাধ্যতার প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবকিছু নিশ্চিতভাবে হযরত মুসা আ.-এর মনঃকষ্টের কারণ ছিলো না-কি ওগুলো ব্যতীত অন্যকোনো বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য। যেমন: কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, উল্লিখিত আয়াত দুটিতে বনি ইসরাইল অবাধ্যতা ও হঠকারিতার মাধ্যমে হযরত মুসা আ.কে যে-যন্ত্রণা ও ক্লেশ দিতো তা-ই উদ্দেশ্য। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থল হিসেবে পূর্ববর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে পৃথক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, কোনো কোনো সহিহ হাদিসে হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন এমন ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় যার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন মাজিদে নেই। সুতরাং, তাঁদের বর্ণিত ঘটনাবলি থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা অথবা এ-জাতীয় সব ঘটনাই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল এবং এ-ঘটনাগুলোই আয়াত দুটির শানে-নুযুল তুল্য।
তাঁদের বর্ণিত ঘটনাসমূহ থেকে একটি ঘটনা সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে।
قَالَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ يَغْتَسِلُونَ عُرَاةً يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى سَوْأَةِ بَعْضٍ وَكَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ يَغْتَسِلُ وَحْدَهُ فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا يَمْنَعُ مُوسَى أَنْ يَغْتَسِلَ مَعَنَا إِلَّا أَنَّهُ آدَرُ. قَالَ فَذَهَبَ مَرَّةً يَغْتَسِلُ فَوَضَعَ ثَوْبَهُ عَلَى حَجَرٍ فَفَرَّ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ - قَالَ - فَجَمَحَ مُوسَى بِأَثَرِهِ يَقُولُ ثَوْبِي حَجَرُ ثَوْبِي حَجَرُ حَتَّى نَظَرَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ إِلَى سَوْأَةِ مُوسَى فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا بِمُوسَى مِنْ بَأْسِ فَقَامَ الْحَجَرُ بَعْدُ حَتَّى نُظِرَ إِلَيْهِ - قَالَ - فَأَخَذَ ثَوْبَهُ فَطَفِقَ بِالْحَجَرِ ضَرْبًا ». قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاللَّهِ إِنَّهُ بِالْحَجَرِ نَدَبٌ سِتَّةٌ أَوْ سَبْعَةٌ ضَرْبُ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالْحَجَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "হযরত মুসা আ. অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর দেহের কোনো অংশের ওপরই কারো দৃষ্টি পড়তে দিতেন না। পক্ষান্তরে বনি ইসরাইলিরা সর্বসাধারণের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করতে অভ্যস্ত ছিলো। তারা একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতো। এ-কারণে তারা হযরত মুসা আ.-কে উত্যক্ত করতো এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতো। কখনো তারা বলতো, 'হযরত মুসা আ.-এর বিশেষ অঙ্গে শ্বেতরোগের দাগ রয়েছে।' কখনো তারা বলতো, 'তাঁর কুরুণ্ডিয়া রোগ (অণ্ডকোষ বৃদ্ধির ব্যাধি) আছে। বা এ-জাতীয় অন্যকোনো খারাপ রোগ আছে। এ-জন্যই তিনি পৃথক স্থানে গোপনে গোসল করে থাকেন।' হযরত মুসা বনি ইসরাইলের এসব অপবাদ শুনে নীরব থাকতেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলো মুসা আ.-কে এসব অপবাদ থেকে মুক্ত ও পবিত্র করবেন। মুসা আ. একটি পৃথকভাবে আড়ালে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি তার পরনের কাপড় খুলে একখণ্ড পাথরের ওপর রাখলেন। তখনই পাথরটি আল্লাহ তাআলার আদেশে তার স্থান থেকে নড়ে উঠলো এবং যেখানে সর্বসাধারণের সামনে বনি ইসরাইলিরা নগ্ন অবস্থায় গোসল করছিলো, পাথরটি মুসা আ.-এর কাপড় নিয়ে ঠিক ওখানে গিয়ে পৌছলো। হযরত মুসা আ. ঘাবড়ে গিয়ে ও ক্রোধান্বিত হয়ে পাথরের পেছনে পেছনে এই বলে ছুটলেন, হে পাথর, আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়! পাথরের সঙ্গে সঙ্গে মুসা আ.-ও সাধারণ মানুষের সামনে এসে পৌঁছলেন এবং সবাই দেখতে পেলো যে, হযরত মুসা আ. তাদের দোষারোপ করা সমস্ত রোগ ও ব্যাধি থেকে পবিত্র। হযরত মুসা আ.-এর ওপর এই ঘটনার প্রভাব এত অধিক হলো যে, ক্রোধে অধীর হয়ে পাথরটির ওপর তাঁর লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন। ওই পাথরের ওপর তাঁর প্রত্যেকটি আঘাতেরই দাগ বসে গেলো।"¹³⁶
ইমাম বুখারি ও মুসলিম এই ঘটনাটিকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে একটি সনদে এই ঘটনাকে সুরা আহযাবের ওই আয়াতের শানে-নুযুল বলা হয়েছে যাতে বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে যন্ত্রণা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত মুসা আ.-এর পবিত্রতা ঘোষণার উল্লেখ রয়েছে। আর এ-আয়াতটিরই শানে-নুযুল হিসেবে ইবনে আবি হাতেম হযরত আলি রা. থেকে অন্য একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন, হযরত মুসা ও হারুন আ. পাহাড়ের ওপর গমন করলেন। পাহাড়ে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেন। ফলে মুসা. একাকী ফিরে আসেন। বনি ইসরাইল তা দেখে হযরত মুসা আ.-এর বিরুদ্ধে এই অপবাদ রটনা করলো যে, তিনি হারুন আ.-কে হত্যা করেছেন। এই অপবাদে হযরত মুসা আ. অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তখন আল্লাহপাক ফেরেশতাদেরকে হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ বনি ইসরাইলের সামনে এনে উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ খোলা প্রান্তরে বনি ইসরাইলের ভরা মজলিসে সবার সামনে এনে উপস্থিত করলেন। তারা তা দেখে নিশ্চিত হলো যে, সত্য সত্যই হযরত হারুন আ.-এর দেহে কোথাও কোনো আঘাত বা হত্যার চিহ্ন নেই।
তৃতীয় হাদিসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও সুদ্দি থেকে তাফসিরের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত মুসা আ.-এর উপদেশ ও নসিহত কারুনের কাছে অত্যন্ত অসহনীয় হয়ে পড়লো। ফলে সে একদিন এক বারবণিতাকে কিছু টাকা দিয়ে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করলো যে, যখন হযরত মুসা ওয়াজ-নসিহতে মশগুল থাকবে, ঠিক সে- সময়ে তুমি মজলিসে দাঁড়িয়ে মুসার বিরুদ্ধে এই দোষারোপ করবে যে, তোমার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বিপুল জনসমাবেশে ওয়াজ করছিলেন। তখন ওই বারবণিতা সমাবেশে দাঁড়িয়ে কারুনের কথামতো হযরত মুসা আ.-এর ওপর দোষারোপ করলো। হযরত মুসা আ. এই রমণীর কথা শোনামাত্র সিজদায় পতিত হলেন। তারপর মাথা তুলের রমণীকে সম্বোধন করে বললেন, তুই কি আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলতে পারিস যে তুই যা বলছিস তা সত্য? এ-কথা শুনে রমণীটির দেহে ভীষণ কাঁপুনি শুরু হয়ে গেলো। সে বললো, আল্লাহর কসম, সত্য কথা এই যে, কারুন আমাকে টাকা দিয়ে এ-ধরনের কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলো। আপনি তো এ-ধরনের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। তখন হযরত মুসা আ. কারুনের জন্য বদদোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশে কারুনকে তার সব ধনসম্পদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেয়া হলো।
টিকাঃ
¹³⁶ সহিহ বুখারি: হাদিস ২98; সহিহ মুসলিম: হাদিস 339।
📄 মীমাংসা
এই আলোচনায় বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, কুরআন মাজিদ যখন হযরত মুসা আ.-কে ক্লেশ ও যন্ত্রণা প্রদানের ব্যাপরটিকে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে, তখন আমাদের জন্যও এটাই সঙ্গত হবে যে, এর কোনো নির্দিষ্ট বা বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা ব্যতীতই যন্ত্রণা প্রদানের মূল বিষয়টির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না করা। যে-হেকমত ও মুসলেহতের কারণে আল্লাহপাক বিষয়টিকে অস্পষ্ট রাখা সঙ্গত মনে করেছেন, আমরাও তাকেই যথেষ্ট মনে করি। আর যদি বিস্তারিত বিবরণ ও নির্দিষ্টতার প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি হয়, তাহলে এ-কথা মেনে নিতে হবে যে, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটিরই লক্ষ্যস্থল ওইসব ঘটনা যা বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট প্রদান প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ও সহিহ হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর এ-কথার প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে যে, আলোচিত কষ্ট প্রদানের বিষয়টি এ-জাতীয় হবে যাতে হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা.-এর পক্ষ থেকে তা খণ্ডন করেন এবং বনি ইসরাইলের অপবাদ থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র সাব্যস্ত করেন। সুতরাং, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থলের নির্দিষ্টতায় ওই তিনটি রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যা হাদিসের কিতাবসমূহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওই রেওয়ায়েতগুলোই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল।
আরেকটি বিষয় এই : শানে নুযুল হওয়ার জন্য একটি বিষয়কে যে নির্দিষ্ট হতে হবে তা হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর মতে ঠিক নয়। শানে-নুযুলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সময়ে সংঘটিত ওইসব ঘটনা যা কোনো আয়াতের লক্ষ্যস্থল হতে পারে। ওইসব ঘটনাকেই উল্লিখিত আয়াতের জন্য সমানভাবে শানে নুযুল বলা যেতে পারে।
এখানকার তফাসিরে আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি 'কাসাসুল আম্বিয়া' কিতাবে একটি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর ও মিসরের ওলামা মজলিসের মধ্যে এ-বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে সেগুলোকেও উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমরা উভয় ধরনের মতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত নই; বরং আমরা প্রাচীন মুফাস্সিরগণের মধ্যে ইমাদুদ্দিন বিন কাসির ও আবু হাইয়ানের প্রবল মতসমূহেরই সমর্থন করে থাকি। তাই আমরা নাজ্জারের দীর্ঘ আলোচনা পরিত্যাগ করলাম।
এই আলোচনায় বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, কুরআন মাজিদ যখন হযরত মুসা আ.-কে ক্লেশ ও যন্ত্রণা প্রদানের ব্যাপরটিকে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে, তখন আমাদের জন্যও এটাই সঙ্গত হবে যে, এর কোনো নির্দিষ্ট বা বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা ব্যতীতই যন্ত্রণা প্রদানের মূল বিষয়টির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না করা। যে-হেকমত ও মুসলেহতের কারণে আল্লাহপাক বিষয়টিকে অস্পষ্ট রাখা সঙ্গত মনে করেছেন, আমরাও তাকেই যথেষ্ট মনে করি। আর যদি বিস্তারিত বিবরণ ও নির্দিষ্টতার প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি হয়, তাহলে এ-কথা মেনে নিতে হবে যে, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটিরই লক্ষ্যস্থল ওইসব ঘটনা যা বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট প্রদান প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ও সহিহ হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর এ-কথার প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে যে, আলোচিত কষ্ট প্রদানের বিষয়টি এ-জাতীয় হবে যাতে হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা.-এর পক্ষ থেকে তা খণ্ডন করেন এবং বনি ইসরাইলের অপবাদ থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র সাব্যস্ত করেন। সুতরাং, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থলের নির্দিষ্টতায় ওই তিনটি রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যা হাদিসের কিতাবসমূহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওই রেওয়ায়েতগুলোই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল।
আরেকটি বিষয় এই : শানে নুযুল হওয়ার জন্য একটি বিষয়কে যে নির্দিষ্ট হতে হবে তা হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর মতে ঠিক নয়। শানে-নুযুলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সময়ে সংঘটিত ওইসব ঘটনা যা কোনো আয়াতের লক্ষ্যস্থল হতে পারে। ওইসব ঘটনাকেই উল্লিখিত আয়াতের জন্য সমানভাবে শানে নুযুল বলা যেতে পারে।
এখানকার তফাসিরে আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি 'কাসাসুল আম্বিয়া' কিতাবে একটি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর ও মিসরের ওলামা মজলিসের মধ্যে এ-বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে সেগুলোকেও উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমরা উভয় ধরনের মতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত নই; বরং আমরা প্রাচীন মুফাস্সিরগণের মধ্যে ইমাদুদ্দিন বিন কাসির ও আবু হাইয়ানের প্রবল মতসমূহেরই সমর্থন করে থাকি। তাই আমরা নাজ্জারের দীর্ঘ আলোচনা পরিত্যাগ করলাম।
📄 হযরত হারুন আ.-এর ইন্তেকাল
পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহে বলা হয়েছে যে, বনি ইসরাইল পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকার করলে আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এখন তোমাদেরকে চল্লিশ বছরকাল যাবৎ এই প্রান্তরেই ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে হবে। এখন যারা প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছে তাদের মধ্য থেকে কেউই আর পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারবে না।
তার সঙ্গে বনি ইসরাইলকে এ-কথাও বলা হয়েছিলো যে, মুসা ও হারুনও তাদের কাছেই থাকবেন। কেননা, তাদের এবং তাদের পরবর্তী বংশধরদের হেদায়েত ও নসিহতের জন্য মুসা ও হারুন আ.-এর ওখানে থাকা একান্ত আবশ্যক। বনি ইসরাইল তীহ ময়দানে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে ঘুরতে পর্বতের এক চূড়ার কাছে গিয়ে পৌঁছলো। পাহাড়ের এই চূড়া 'হুর' নামে বিখ্যাত ছিলো। এ-সময় হযরত হারুন আ.-এর কাছে পরলোকের ডাক এলো। তিনি ও হযরত মুসা আ. পাহাড়ের হুর চূড়ার ওপর আরোহণ করলেন। ওখানে কিছুদিন আল্লাহ তাআলার ইবাদতে মশগুল থাকলেন। একসময় হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করলেন। হযরত মুসা আ. তাঁর দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করার জন্য নিচে নেমে এলেন এবং বনি ইসরাইলকে হারুন আ.-এর ইন্তেকাল সম্পর্কে সংবাদ প্রদান করলেন।
তাওরাত এই ঘটনাকে নিম্নবর্ণিত ভাষায় বর্ণনা করেছে:
"এরপর বনি ইসরাইলের গোটা দল কাবেস থেকে যাত্রা করে হুর নামক পাহাড়ের কাছে পৌঁছলো। আল্লাহ তাআলা হুর পাহাড়ের ওপর—যা 'আদওয়াম' সীমান্তের সঙ্গে মিলিত ছিলো—হযরত মুসা ও হারুন আ.-কে বললেন, হারুন তার নিজের লোকদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হবে। কেননা, আমি বনি ইসরাইলকে যে-রাজ্য দিলাম হারুন সেই রাজ্যে যেতে পারবে না। কারণ তোমরা 'মুরিবাহ'র ঝরনার কাছে আমার কথার বিপরীত কাজ করেছো। সুতরাং তুমি হারুন ও তার পুত্র আল-ইয়ারাযকে সঙ্গে নিয়ে হুর পাহাড়ের ওপর আসো এবং হারুনের পোশাক খুলে তার পুত্র আল-ইয়ারাযকে পরিয়ে দাও। কেননা, হারুন ওখানে মৃত্যুপ্রাপ্ত হয়ে তার নিজেদের লোকদের সঙ্গে মিলিত হবে। মুসা আ. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে কাজ করলেন। তিনি বনি ইসরাইলের গোটা দলের চোখের সামনে হুর পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করলেন। মুসা আ. হারুন আ.-এর পরিধেয় বস্ত্র খুলে তাঁর পুত্র আল-ইয়ারাযকে পরিয়ে দিলেন। হারুন আ. ওখানেই পাহাড়ের চূড়ার ওপর ইন্তেকাল করলেন। এরপর মুসা আ. ও আল-ইয়ারায পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে নেমে এলেন। বনি ইসরাইল শুনতে পেলো যে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেছেন। তাদের সব গোত্রের লোকেরা তিরিশ দিনব্যাপী শোক পালন করলো। "
টিকাঃ
১৩৭ গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৬, আয়াত ২২-২৯।