📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 গাভী জবাইয়ের ঘটনা

📄 গাভী জবাইয়ের ঘটনা


একবার বনি ইসরাইলের মধ্যে এক ব্যক্তি নিহত হলো। কিন্তু হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিলো না। অবশেষে তা অপবাদের রূপ ধারণ করলো এবং পারস্পরিক মতভেদের কারণে এক ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হলো। এই ঘটনা যখন হযরত মুসা আ.-এর সামনে পেশ করা হলো তখন তিনি আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করলেন এবং নিবেদন করলেন, “হে আল্লাহ, এই ঘটনা কওমের মধ্যে ভীষণ মতানৈক্যের সৃষ্টি করেছে। আপনি মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়। আমাকে সাহায্য করুন।"
আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-কে বললেন, "তাদেরকে প্রথমে একটি গাভী জবাই করতে বলো। তারপর জবাইকৃত গাভীর দেহের কোনো একটি অংশ দ্বারা মৃত ব্যক্তির দেহ স্পর্শ করবে। তারা এই কাজ করা মাত্র আমি নিহত ব্যক্তিকে জীবন দান করবো, তখন ব্যাপারটি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়ে যাবে।"
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে গাভী জবাই করতে বললেন। কিন্তু তারা বক্র স্বভাব এবং কাজ না করার ফন্দি অন্বেষণের চরিত্রের কারণে বিতর্ক শুরু করে দিলো, "মুসা, তুমি কি আমাদের সঙ্গে বিদ্রূপ করছো? নিহত ব্যক্তির ঘটনার সঙ্গে গাভী জবাই করার সম্পর্ক কী? আচ্ছা, বাস্তবিকই যদি তা আল্লাহর আদেশ হয়ে থাকে, তবে বলো ওই গাভীটি কেমন হতে হবে? তার গায়ের রঙ কী? কিন্তু বিস্তারিত বিবরণ জানা আবশ্যক। কারণ এখন পর্যন্ত আমরা তার নির্দিষ্টতা সম্পর্কে অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক অবস্থায় রয়েছি।"
আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে মুসা আ. বনি ইসরাইলকে তাদের সব প্রশ্নের জবাব দিলেন। যখন তাদের আর কোনো ফন্দি আঁটার সুযোগ থাকলো না। তখন তারা নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হলো। আল্লাহর ওহি অনুযায়ী তারা বিষয়টির সমাধা করলো। আল্লাহর আদেশে উল্লিখিত নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে গেলো এবং হত্যার পূর্ণ ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করলো। অনুমান করি, আল্লাহ-প্রদত্ত এই বিস্ময়কর নিদর্শন যখন সত্য ঘটনাটিকে উন্মোচিত করে দিলো, তখন হত্যাকারীরও অপরাধ স্বীকার না করে কোনো উপায় থাকলো না। এভাবে কেবল হত্যাকারীরই সন্ধান পাওয়া গেলো না; বরং বনি ইসরাইলের বিভিন্ন গোত্র ও বংশের মধ্যে যে-মতভেদের সৃষ্টি হয়ে গৃহকলহ ও রক্তপাতের সৃষ্টি হতে যাচ্ছিলো, উত্তমরূপে তারও অবসান ঘটে।
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে দুটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। একটি হলো এই : পরলোক অবিশ্বাসকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, যে-কওমের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে, তারা আজ পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী রয়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা যেভাবে মৃতকে জীবিত করে তাঁর কুদরত প্রদর্শন করেছেন, তোমরা অনুধাবন করো, কিয়ামতের দিনেও একইভাবে তিনি মৃতদেরকে জীবন দান করবেন।
كَذَلِكَ يُحْيِي اللَّهُ الْمَوْتَى
"আর এভাবেই-আল্লাহ তাআলা মৃতদেরকে জীবন দান করে থাকেন।"
দ্বিতীয় বিষয় হলো বনি ইসরাইলের উদ্দেশে এ-কথা বলে দেয়া যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে অর্থাৎ, তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এত অধিক সংখ্যক মুজেযা প্রদান করেছেন যে, যদি অন্যকোনো কওমের সামনে এসব মুজেযা প্রদান করা হতো, তাহলে তারা চিরতরে আল্লাহ তাআলার অনুগত বান্দা হয়ে যেতো এবং তাদের অন্তরে এক মুহূর্তের জন্যেও নাফরমানির কল্পনা উদিত হতো না। কিন্তু তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষদের ওপর তো কোনো ক্রিয়াই হলো না। আর যদি হয়েই থাকে তবে তা নিতান্তই অস্থায়ী এবং নিষ্ক্রিয়ই প্রমাণিত হয়েছে। আর আজো যদি তোমরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবিশ্বাস করো এবং তাঁর বিরোধিতা করতে থাকো, তবে তা তোমাদের জন্মগত ও প্রাচীন একগুঁয়েমি ও মূর্খতারই ফল।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনা সম্পর্কে আমাদেরকে কেবল এতটুকু বলেছে এবং এর চেয়ে অধিক বিস্তারিত বিবরণ আর কিছুই বলে নি-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا قَالَ أَعُوذُ بِاللهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ () قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنُ لَنَا مَا هِيَ قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةً لَا فَارِضٌ وَلَا بِكْرٌ عَوَانٌ بَيْنَ ذَلِكَ فَافْعَلُوا مَا تُؤْمَرُونَ () قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنَ لَنَا مَا لَوْنَهَا قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ صَفْرَاءُ فَاقِعٌ لَوْنَهَا تَسُرُّ النَّاظِرِينَ () قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنَ لَنَا مَا هِيَ إِنَّ الْبَقَرَ تَشَابَهَ عَلَيْنَا وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَمُهْتَدُونَ () قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ لَا ذَلُولٌ تُثِيرُ الْأَرْضَ وَلَا تَسْقِي الْحَرْثَ مُسَلَّمَةٌ لَا شَيَةَ فِيهَا قَالُوا الْآنَ جِئْتَ بِالْحَقِّ فَذَبَحُوهَا وَمَا كَادُوا يَفْعَلُونَ () وَإِذْ قَتَلْتُمْ نَفْسًا فَادَّارَأْتُمْ فِيهَا وَاللهُ مُخْرِجٌ مَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ () فَقُلْنَا اضْرِبُوهُ بِبَعْضِهَا كَذَلِكَ يُحْيِي اللَّهُ الْمَوْتَى وَيُرِيكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (سورة البقرة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু জবাইয়ের আদেশ দিয়েছেন।"¹²⁷ তারা বলেছিলো, "তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছো?" মুসা বললো, "আল্লাহর শরণাপন্ন হচ্ছি, যাতে আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হই।” (অর্থাৎ, আমি বলছি যে, এটা কোনো বিদ্রূপ নয়।)
তারা বললো, "আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তা কীরূপ?" মুসা বললো, "আল্লাহ বলছেন, তা এমন গরু যা বৃদ্ধও নয়, অল্পবয়স্কও নয়-মধ্যবয়সী। সুতরাং তোমরা যা আদিষ্ট হয়েছে তা করো।" তারা বললো, "আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তার রং কী?" মুসা বললো, "আল্লাহ বলছেন, তা হলুদ বর্ণের গরু, তার রং উজ্জ্বল গাঢ়, যা দর্শকদেরকে আনন্দ দেয়।" তারা বললো, "আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তা কোন্টি? আমরা গরুটি সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছি এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় আমরা দিশা পাবো।” মুসা বললো, "তিনি বলছেন, তা এমন গরু যা জমি-চাষে ও ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হয় নি-সুস্থ, নিখুঁত।" তারা বললো, "এখন তুমি সত্য এনেছো।” যদিও তারা জবাই করতে উদ্যত ছিলো না তবুও তারা ওটাকে জবাই করলো। স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে এবং একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করছিলে-তোমরা যা গোপন রাখছিলে আল্লাহ তা ব্যক্ত করছেন। আমি বললাম, "এর (জবাইকৃত গরুর) কোনো অংশ দ্বারা ওকে (মৃত ব্যক্তিকে) আঘাত করো।" (তাতেই নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে তার হত্যাকারীর নাম বলে দেবে।) এইভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তাঁর নিদর্শন তোমাদেরকে দেখিয়ে থাকেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬৭-৭৩]
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "যদি বনি ইসরাইলিরা হযরত মুসা আ.-এর বলার সঙ্গে সঙ্গে গাভী জবাই করার আদেশটি পালন করতো, তবে তাদের গাভীর ব্যাপারে কোনো প্রকারের শর্ত ও বন্ধন থাকতো না। তারা যে- কোনো প্রকারের একটি গাভী জবাই করলেই আদেশ পালন হয়ে যেতো। কিন্তু তারা অনর্থক প্রশ্ন করে নিজেদের ওপর কঠোরতা বৃদ্ধি করলো।" যেমন: কুরআন মাজিদ আল্লাহর নবীর সঙ্গে এমন এমন অনর্থক কথাবার্তা বলা এবং কূটতর্ক করার কঠোর নিন্দা করেছে এবং বলেছে যে, এর শেষফল কুফরি ও বে-মান হওয়া পর্যন্ত গিয়ে সমাপ্ত হয়। সুতরাং মুসলমান উম্মতগণের জন্য এ-জাতীয় কথাবার্তা থেকে আত্মরক্ষা করা একান্ত কর্তব্য। যেমন: কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে—
أَمْ تُرِيدُونَ أَنْ تَسْأَلُوا رَسُولَكُمْ كَمَا سُئِلَ مُوسَى مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَتَبَدَّلِ الْكُفْرَ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ (سورة البقرة)
'তেমারা কি তোমাদের রাসুলকে তেমন প্রশ্ন করতে চাও যেমন পূর্বে মুসাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো? এবং যে-কেউ ঈমানের পরিবর্তে কুফরি গ্রহণ করে সে পথ হারায়।' [সুরা বাকারা: আয়াত ১০৮]
এখানে অবশ্যই একটি প্রশ্ন সামনে এসে পড়ে যে, গাভী জবাই করা এবং নিহত ব্যক্তিকে জীবিত করে দেয়ার মধ্যে কী সামঞ্জস্য, যার ফলে নিহত ব্যক্তিকে জীবিত করে দেয়ার জন্য এই বিশেষ উপায়টি অবলম্বন করা হলো? এই প্রশ্নের জবাব এই যে, আল্লাহ তাআলার হেকমত ও মুসলেহত (প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা) অবগত হওয়ার তো মানবক্ষমতার বহির্ভূত। তবুও জ্ঞান ও বিবেকের যে-আলো তিনি মানুষকে দান করেছেন তা এই রহস্য উদ্‌ঘাটন করছে যে, এই কিতাবের পূর্বের পাতাগুলোতে লিখিত বনি ইসরাইলের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ করলে এ-কথা অতি সহজে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মিসরে অবস্থান ও বসবাস করা তাদের মধ্যে মূর্তিপূজা বিশেষ করে গাভীর শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা এবং গো-বৎস পূজার প্রেরণা সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। যা পদে পদে উথলে উঠতো এবং তাদের ওপর অপক্রিয়া করতো। যেমন: গো-বৎস পূজার ঘটনাটির পরে যখন মুসা আ. তাদেরকে তাওরাতের নির্দেশাবলি পালন করতে বললেন, তখনও তারা যথেষ্ট টালবাহানার আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তখন যদি তুর পাহাড়কে তাদের মাথার ওপর তুলে ধরার মুজেযাটি প্রকাশ না করা হতো তাহলে তারা হযরত মুসা আ.-কে মিথ্যা প্রতিপাদনের জন্যই উঠে-পড়ে লাগতো এবং এটা বিচিত্র কিছু হতো না। আল্লাহপাক এ-ক্ষেত্রে বলেছেন, ওই গো-বৎস পূজাই তাদের অবাধ্যতা ও টালবাহানার স্বভাবের কারণ। তখনো পর্যন্ত তাদের অন্তর থেকে মূর্তিপূজা ও গো-বাছুরের পবিত্রতার বিশ্বাস দূরীভূত হয় নি; বরং তাদের অবস্থা এমনটা অনুমান করা হয় যে, গো-বাছুরের পবিত্রতার বিশ্বাস তাদের হৃদয়ে প্রবেশ করে বদ্ধমূল হয়ে গেছে।
কুরআন মাজিদ এ-বিষয়ে বর্ণনা করছে—
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاسْمَعُوا قَالُوا سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَأُشْرِبُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ قُلْ بِئْسَمَا يَأْمُرُكُمْ بِهِ إِيمَانُكُمْ إِن كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ (سورة البقرة)
স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুরকে তোমাদের ওপর উত্তোলন করেছিলাম। বলেছিলাম, “যা দিলাম তা দৃঢ়রূপে গ্রহণ করো ও শ্রবণ করো।" তারা বলেছিলো, "আমরা শ্রবণ করলাম ও অমান্য করলাম।"¹²⁸ কুফরির কারণে তাদের হৃদয়ে গো-বৎসের প্রেম সিঞ্চিত হয়েছিলো। বলো, "যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে তোমাদের ঈমান যা-কিছুর নির্দেশ দেয় তা কত নিকৃষ্ট!”” [সুরা বাকারা: আয়াত ৯৩]
وَلَقَدْ جَاءَكُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ
'এবং নিশ্চয় মুসা তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছে। এরপর তার প্রস্থানের পর তোমরা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে। আর তোমরা তো জালিম।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৯২]
সুতরাং এখানে আল্লাহ তাআলার কল্যাণকামিতা এই মীমাংসা করেছে যে, বনি ইসরাইল এই পথভ্রষ্টতাকে এমন একটি কাজের মাধ্যমে দূর করে নেবে যা তারা নিজেরাই স্বচক্ষে দর্শন করবে। এইজন্য তাদেরকে এ-বিষয়টা চাক্ষুষ দেখিয়ে দিলেন যে, যে-বস্তুর পবিত্রতা তোমাদের অন্ত রে এভাবে বদ্ধমূল হয়ে গেছে এবং যার পৌনঃপুনিক প্রকাশ ঘটছে তার (ওই গাভীটির) স্বরূপ তো এই যে, তোমরা নিজেরা নিজেদের হাতে তা ধ্বংস করে দিলে এবং তা তোমাদের একগোছা চুলও বাঁকা করতে পারলো না। আবার কখনো এমন কিছু মনে করে বসো না যে, তা গাভীরই পবিত্রতার ক্রিয়া ছিলো যে তার দেহের একটি অংশের আঘাতে মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়ে উঠেছে। কেননা, মৃত্যু ও জীবনপ্রাপ্তির এ-ব্যাপারটি যদি গাভীর পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতো, তবে যে-মাংসখণ্ডটি মৃতকে জীবিত করে দিলো তা নিজে জীবন লাভ করে পুনরায় কোনো জীবিত গাভী হয়ে গেলো না? তোমরা কি দেখছো না যে, যে-গাভীটি তোমরা জবাই করে দিলে, তা তেমনই নির্জীব অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং তার দেহের খণ্ডগুলো তোমাদের দস্তরখানের শোভা বর্ধন করেছে।
বাস্তব অবস্থা এই যে, মৃত্যু ও জীবনের এ-ব্যাপারটি একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতেই রয়েছে। আর যে-গোবৎসের ভালোবাসা তোমাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়ে গেছে, তা তোমাদের চেয়েও নিকৃষ্ট একটি প্রাণী, যা কেবল তোমাদের প্রয়োজনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তা তোমাদের জন্য দেবতা বা দেবী নয়। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই যাকে ইচ্ছা মৃত্যু দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা জীবন দান করেনে। যেমন: তোমরা এই ঘটনার মধ্যে উভয় সত্যকে চাক্ষুষ দর্শন করেছো : তিনি গাভীর জীবনকে মৃত্যু দ্বারা পরিবর্তন করে দিলেন এবং মানুষের মৃতদেহকে নতুন জীবন দান করলেন।
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ (سورة الحشر)
'অতএব, হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।' [সুরা হাশর : আয়াত ২]
কুরআন মাজিদ সম্ভবত এই হেকমতেরই প্রতি লক্ষ করেই গাভী জবাই করার ঘটনাটিকে দুইভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে : প্রথম ভাগে বনি ইসরাইলের গো-বৎস পূজার ঘটনাকে জোর দেয়ার জন্য গাভীর ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, একটি বিশেষ কারণে যখন বনি ইসরাইলকে গাভী জবাই করতে বলা হয়েছিলো, তখন এই গো-বৎস পূজার ভালোবাসাই তাদের সামনে নির্দেশ পালনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তারা মিসরীয়দের গাভীর পবিত্রতার বিশ্বাস অনুসরণ করে অজস্র টালা-বাহানা করলো এবং চেষ্টা করলো যাতে তাদেরকে গাভী জবাই করতে না হয়। কিন্তু অবশেষে যখন নিজেদের প্রশ্নজালে নিজেরাই আবদ্ধ হয়ে পড়লো, তাদেরকে বাধ্য হয়ে আদেশ পালন করতেই হলো।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনা শোনানোর পর স্বাভাবিকভাবেই শ্রোতাদের মনে এই আগ্রহ সঞ্চারিত হওয়া উচিত—যাতে তারা জেনে নিতে পারে—গাভী জবাই করার এই ঘটনা কেনো এবং কীভাবে ঘটেছিলো, যার ব্যাপারে বনিইসরাইলিরা অজুহাত পেশ ও টালবাহানা করছিলো। তাই ঘটনার দ্বিতীয় অংশে কুরআন মাজিদ এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্নের জবাব এইভাবে প্রদান করেছে যে, এই ঘটনার প্রধান দিকটি বর্ণনা করে দিয়েছে, যার সঙ্গে বনি ইসরাইলের বাদানুবাদের প্রকৃত সম্পর্ক ছিলো।
তাই এই অংশের বর্ণনাকে পুনরায় ১ শব্দের মাধ্যমে শুরু করেছে। কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোর তাফসির করা হয়েছে কুরআনের বাক্যগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেই এবং তাতে গাভী জবাই করার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে আগে-পিছে হওয়ার বিতর্কে যাওয়া আদৌ প্রয়োজন পড়ে না। ঘটনাটিকে অদ্ভুত মনে করে মনগড়া ও হালকা ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজনও অবশিষ্ট থাকে না।
নিঃসন্দেহে তা আল্লাহ তাআলার ধারাবাহিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি নিদর্শন যা ইহুদিদের কঠিনচিত্ততা ও মন্দস্বভাব এবং অবাধ্যতামূলক চরিত্রের মোকাবিলায় সত্যের সমর্থনের জন্য আল্লাহ তাআলার হেকমতের চাহিদা অনুসারে প্রকাশিত হয়েছিলো। তা নিদর্শন হওয়া ছাড়াও তাতে কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মুসলেহত (কল্যাণকামিতা) বিদ্যমান ছিলো। যেমন : এই ঘটনার পরেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
كَذَلِكَ يُحْيِ اللَّهُ الْمَوْتَى 'এভাবেই আল্লাহ তাআলা মৃতদেরকে জীবিত করে থাকেন,' এবং এর সঙ্গে সঙ্গেই বলেছেন— وَيُرِيكُمْ آياته 'এবং তোমাদেরকে তাঁর (কুদরতের) নিদর্শন দেখানোর জন্য।'
যেনো, গাভী জবাই করার ঘটনাটি বর্ণনা করার পূর্বে বনি ইসরাইলকে পৌনঃপুনিক আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শনের উল্লেখ করা এবং তারপর ঘটনাটির সঙ্গেই এই ঘটনার মাধ্যমে পরকালে মৃতদেরকে জীবিত করার প্রমাণ দেয়া, এরপর এই ঘটনাকেও আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহ থেকে একটি নিদর্শন বলা—এ-বিষয়ের একটি স্পষ্ট ও উৎকৃষ্ট প্রমাণ যে, কোনো প্রকার ব্যাখ্যা ও বাহুল্য কথার আশ্রয় নেয়া ছাড়াই এই আয়াতগুলোর পরিষ্কার ও সাধাসিধে তাফসির তা-ই যা উপরিউক্ত লাইনগুলোতে বর্ণনা করা হয়েছে।
সুতরাং এ-আয়াতগুলোর যে-তাফসির সমসায়িক যুগের আধুনিক মুফাস্সিরগণ বর্ণনা করেছেন এবং যে-তাফসিরে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় আয়াতকে কখনো দুটি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা এবং কখনো একটি ঘটনা মেনে নিয়ে নানা ধরনের হালকা ও দুর্বল ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তা অগ্রহণযোগ্য এবং কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ভাষ্যের বিরোধী।
যেমন: তাদের কেউ কেউ বলে থাকেন গাভী জবাই করার এই নিয়মটি প্রকৃতপক্ষে বনি ইসরাইলের একটি প্রাচীন প্রথা ছিলো। এই প্রথার উল্লেখ আজো পর্যন্ত তাওরাতে বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ, যখনই কোথাও এমন নিহত ব্যক্তি পাওয়া যেতো এবং তার হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া যেতো না, তখন পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ এড়ানোর জন্য তাদের মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিলো যে, তারা এমন একটি গাভী সংগ্রহ করতো যেটাকে কখনো ভূমি চাষের কাজে খাটানো হয় নি এবং যেটা কখনো শস্যখেতে পানি সেচের কাজেও ব্যবহৃত হয় নি। গাভীটিকে এমন একটি প্রান্তরে নিয়ে যাওয়া হতো যাতে কখনো ফসল ফলানো বা চাষ করা হয় নি এবং যাতে নদী প্রবহমান রয়েছে। আর যে-ব্যক্তিকে হত্যা করেছে বলে সন্দেহ করা হতো, তার মহল্লা, গোত্র বা বসতির লোকদেরকে একত্র করা হতো। এরপর গণক বা জ্যোতিষী অগ্রসর হয়ে প্রবহমান পানির ওপর গাভীটিকে দাঁড় করিয়ে তার ঘাড় কেটে ফেলতো। গাভীটির রক্ত পানির সঙ্গে মিশে গেলে তৎক্ষণাৎ সন্দেহভাজন দলের লোকেরা উঠে রক্তমিশ্রিত পানি দিয়ে হাত ধুতো এবং উচ্চৈঃস্বরে বলতো, আমাদের হাতও এই ব্যক্তিকে হত্যা করে নি এবং আমরা তার হত্যাকারী সম্পর্কেও কিছু অবগত নই। এই প্রথা পালনের পর তাদের ওপর আর কোনো সন্দেহ থাকতো না এবং গৃহকলহের আশঙ্কাও থাকতো না। আর যদি সন্দেহভাজন দলের একজন সরদারও হাত ধুতে এবং এই প্রথা পালন করতে অস্বীকৃতি জানাতো, তবে সে-গোত্রের সরদার নিহত ব্যক্তির খুনের অর্থদণ্ড ওই গোত্র বা মহল্লার ওপর আরোপ করা হতো। ¹²⁹
এই তাফসিরে কুরআন মাজিদের পূর্বপর আয়াতগুলোর প্রেক্ষিতে যে- ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে তা সাধারণ বোধশক্তি ও জ্ঞান দ্বারা অতি সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু এসব ত্রুটি ছাড়াও যে-বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তা এই যে, যদি বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন প্রথা প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত থাকতো, তবে যখন হযরত মুসা আ. ওই প্রথা অনুসারেই তাদেরকে আল্লাহর ফয়সালা শুনিয়ে দিলেন, তখন বনি ইসরাইল একে কেনো আজগুবি মনে করলো এবং কেনো এমন কথা বললো- أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا 'হে মুসা, তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশা করছো যে আমাদেরকে গাভী জবাই করতে বলছো?' যদি তাদের এই প্রশ্ন অবাধ্যতামূলকই হতো তবে হযরত মুসা আ. এই জবাব দিতেন যে, এতে বিস্ময় ও আশ্চর্যের কী আছে? তোমরা তো অবগতই আছো যে, 'এমন সমস্যার সমাধানের জন্য এটাই প্রাচীন রীতি।'
এ-প্রসঙ্গে গাভী সংগ্রহ করা সম্পর্কে তাফসিরের কিতাবসমূহে অদ্ভুত ও বিচিত্র কাহিনি বর্ণিত আছে। কিন্তু বাস্তব ব্যাপার এই যে, এসব কাহিনি ইসরাইলি রেওয়ায়েত ও বর্ণনা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এগুলো এমন কাহিনি যা ইহুদিদের রেওয়ায়েত ও উদ্ধৃতির ফলে খ্যাতি লাভ করেছে এবং তাফসিরের কিতাবসমূহেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু গবেষকগণ অনুসন্ধান করে কুরআন মাজিদের তাফসির থেকে ওই কাহিনিগুলোকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করে দিয়েছেন। যেমন: ইমাদুদ্দিন বিন কাসিরের মতো উচ্চমর্যাদাশীল মুফাস্সির এসব কাহিনি সম্পর্কে এমন মীমাংসা দিয়েছেন:
وهذه السياقات كلها عن عبيدة وأبي العالية والسدي وغيرهم، فيها اختلاف ما، والظاهر أنها مأخوذة من كتب بني إسرائيل وهي مما يجوز نقلها ولكن لا نصدق ولا نكذب فلهذا لا نعتمد عليها إلا ما وافق الحق عندنا، والله أعلم.
"আর এসব ধারাবাহিক বর্ণনা যা উবায়দা, আবুল আলিয়া, সুদ্দি ও অন্যান্য রাবী থেকে উদ্ধৃত হয়েছে, এসব বর্ণনা পরস্পর বিরোধী। পরিষ্কার কথা হলো এই এসব রেওয়ায়েত ইসরাইলিদের কিতাব থেকে গৃহীত হয়েছে। এগুলোকে উদ্ধৃত করা যদিও জায়েযের পর্যায়ে আসতে পারে, তবে আমরা সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করি এবং মিথ্যাও বলি না। সুতরাং এসব রেওয়ায়েতের ওপর মোটেও বিশ্বাস করা যায় না। তবে ওইসব রেওয়ায়েত অবশ্যই গ্রহণযোগ্য যা কুরআন ও হাদিসের আলোকে সত্য বলে বিবেচিত হয়। আল্লাহই ভালো জানেন।"
এই বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলছেন: "তা গাভীর দেহের কোন্ অংশ ছিলো যা দ্বারা নিহত ব্যক্তির দেহকে স্পর্শ করা হয়েছিলো—তা যে-অংশই হোক না কেনো, কোনো একটি অংশ স্থিরীকরণ ব্যতীত অনির্দিষ্টভাবে কুরআন মাজিদে যা বলা হয়েছে তা-ই মুজেযা হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর যদি আমাদের ধর্মীয় ও পার্থিব অবস্থার প্রেক্ষিতে উল্লিখিত অংশের নির্দিষ্টকরণ প্রয়োজনীয় হতো, তবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করতেন। কিন্তু তিনি তা অস্পষ্ট রেখেছেন, যদিও তা প্রকৃত অবস্থার বিচারে নির্দিষ্টই। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট অংশ দ্বারাই স্পর্শ করা হয়েছিলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও গাভীর দেহের অংশ নির্দিষ্টকরণে কোনো সহিহ হাদিস নেই। সুতরাং, আমাদের জন্য এটাই সঙ্গত যে, আমরাও একে তেমনই অস্পষ্ট রেখে দিই, যেমন আল্লাহ তাআলা তাকে অস্পষ্ট রেখেছেন।"¹³⁰
তা ছাড়া মুসলিম শরিফের হাদিসে শুধু এতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'যদি বনি ইসরাইলিরা হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে বাক-বিতণ্ডা না করতো, তবে গাভীর ব্যাপারে তাদের জন্য এত শর্ত আরোপ করা হতো না।' সুতরাং এ-ব্যাপারে যদি আরও বিস্তারিত বিবরণ থাকতো তবে আমাদের নিষ্পাপ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা অবশ্যই উল্লেখ করতেন।
মোটকথা, এই ঘটনা আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি মহান নিদর্শন। অবশ্য কুরআন মাজিদ তার যতটুকু বিবরণ প্রদান করেছে ততটুকু বিবরণই গ্রহণযোগ্য। বাকি যা-কিছু আছে সব অনর্থক ও নিষ্ফল কিচ্ছা-কাহিনিমাত্র।
হযরত মুসা আ.-এর মুজেযাগুলো সম্পর্কে এসব আলোচনা সে-সকল মুফাস্স্সিসরকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছে যাঁরা মূলত আম্বিয়ায়ে কেরামের মুজেযায় বিশ্বাসী। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার সম্ভাবনা আছে মনে করে এমনসব মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদান করেন যার ফলে এসব ঘটনা মুজেযার সীমা থেকে বের হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যেসব খোদাদ্রোহী ইসলামের সর্বজন স্বীকৃত আকিদা মুজেযাকে বিশ্বাস ও স্বীকারই করে না এবং সেজন্য কুরআন মাজিদের এসব ঘটনাকে মিথ্যা অপব্যাখ্যা দিয়ে বিকৃত করে দেওয়াই জরুরি মনে করে, তাদের জন্য প্রথম মুল মুজেযার সম্ভাবনা নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত।
যাইহোক। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, এসব মহান মুজেযাসমূহ চাক্ষুষ দর্শন করা এবং তাদের প্রতি আল্লাহপাকের অসীম অনুগ্রহ ও দয়া থাকা সত্ত্বেও ওইসব দুর্ভাগাদের ওপর কোনো ক্রিয়াই হলো না। তারা একইভাবে বক্র স্বভাব ও ঘাউড়ামির ওপর গোঁ ধরে থাকলো। সত্যকে কবুল করার জন্য তাদের হৃদয় পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেলো; বরং অনবরত নাফরমানি ও অবাধ্যতা তাদের ভালো কাজের যোগ্যতাকেই ধ্বংস করে দিলো। ফলে তাদের অন্তর পাথরের চেয়েও অধিক কঠিন হয়ে গেলো। কেননা, পাথরের মধ্যে কঠিনতা থাকা সত্ত্বেও তা মানুষের অনেক কাজে লাগে; কিন্তু এই হতভাগাদের জীবনে তো অনিষ্ট ও ক্ষতি ছাড়া আর কোনো কল্যাণই থাকলো না।
এ-ব্যাপারে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهَارُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَشْقُقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ الْمَاءُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (سورة البقرة)
'এরপরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেলো, তা পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন। (এটা স্পষ্ট কথা যে,) কিছু পাথরও এমন হয় যে, তা থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয় এবং কিছু এমন যে, বিদীর্ণ হওয়ার পর তা থেকে পানি নির্গত হয়, আবার কিছু এমন যা (ভূমিকম্প ইত্যাদি অবস্থায়) আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ে এবং তোমরা যা করো আল্লাহ সে-সম্পর্কে অনবহিত নন।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৪]
ঘটনার সারমর্ম এই: বনি ইসরাইলিদের অন্তরের কাঠিন্য এবং সত্য কবুল করার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিলো যে, যদি সাধারণ কথায় বলে দেয়া হয় যে তাদের অন্তর পাথরখণ্ডে পরিণত হয়েছিলো, তবুও তাদের অন্তরের কঠিনতার প্রকৃত ছবি সামনে প্রতিভাত পারে না। কেননা, পাথর যদিও কঠিন, কিন্তু তা অকেজো নয়। তোমরা কি পাহাড়সমূহ দেখো আর দেখো নি যে, ওই কঠিন পাথরসমূহ থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয়ে আসছে এবং কোনো কোনো স্থানে ওই পাথরসমূহ থেকেই মিষ্ট ও শীতল পানির ঝরনা প্রবাহিত হচ্ছে। আর ভূমিকম্প হলে বা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলে ওই বিশালাকার পাথরসমূহ ধুনিত তুলার মতো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে উড়ে নিচে নেমে যায় এবং আল্লাহকে ভয়ের স্বীকৃতি প্রদান করছে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই বনি ইসরাইলের ওপর আল্লাহপাকের নিদর্শনসমূহেরও কোনো ক্রিয়া হলো এবং নবীগণের ওয়াজনসিহতেরও কোনো ক্রিয়া হলো না। নাফরমানি করার সময় তাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র আল্লাহভীতির সঞ্চার হলো না।

টিকাঃ
¹²⁷ বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছিলো। তার হত্যাকারী কে তা জানা যাচ্ছিলো না। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশ মুসা আ. তাদেরকে একটি গরু জবাই করে তার এক খণ্ড গোশত দিয়ে নিহত ব্যক্তির দেহে আঘাত করতে বললেন। তারা আদেশমত কাজ করলে নিহত ব্যক্তিটি জীবিত হয়ে ওঠে এবং হত্যাকারীর নাম বলে পুনরায় মারা যায়।
¹²⁸ মুখে বলেছিলো "শ্রবণ করলাম" আর মনে মনে বলেছিলো "অমান্য করলাম"।
¹²⁹ তাওরাত: ইসতিসনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২১, আয়াত ২-৯।
¹³⁰ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১২।

একবার বনি ইসরাইলের মধ্যে এক ব্যক্তি নিহত হলো। কিন্তু হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিলো না। অবশেষে তা অপবাদের রূপ ধারণ করলো এবং পারস্পরিক মতভেদের কারণে এক ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হলো। এই ঘটনা যখন হযরত মুসা আ.-এর সামনে পেশ করা হলো তখন তিনি আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করলেন এবং নিবেদন করলেন, “হে আল্লাহ, এই ঘটনা কওমের মধ্যে ভীষণ মতানৈক্যের সৃষ্টি করেছে। আপনি মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়। আমাকে সাহায্য করুন।"
আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-কে বললেন, "তাদেরকে প্রথমে একটি গাভী জবাই করতে বলো। তারপর জবাইকৃত গাভীর দেহের কোনো একটি অংশ দ্বারা মৃত ব্যক্তির দেহ স্পর্শ করবে। তারা এই কাজ করা মাত্র আমি নিহত ব্যক্তিকে জীবন দান করবো, তখন ব্যাপারটি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়ে যাবে।"
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে গাভী জবাই করতে বললেন। কিন্তু তারা বক্র স্বভাব এবং কাজ না করার ফন্দি অন্বেষণের চরিত্রের কারণে বিতর্ক শুরু করে দিলো, "মুসা, তুমি কি আমাদের সঙ্গে বিদ্রূপ করছো? নিহত ব্যক্তির ঘটনার সঙ্গে গাভী জবাই করার সম্পর্ক কী? আচ্ছা, বাস্তবিকই যদি তা আল্লাহর আদেশ হয়ে থাকে, তবে বলো ওই গাভীটি কেমন হতে হবে? তার গায়ের রঙ কী? কিন্তু বিস্তারিত বিবরণ জানা আবশ্যক। কারণ এখন পর্যন্ত আমরা তার নির্দিষ্টতা সম্পর্কে অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক অবস্থায় রয়েছি।"
আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে মুসা আ. বনি ইসরাইলকে তাদের সব প্রশ্নের জবাব দিলেন। যখন তাদের আর কোনো ফন্দি আঁটার সুযোগ থাকলো না। তখন তারা নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হলো। আল্লাহর ওহি অনুযায়ী তারা বিষয়টির সমাধা করলো। আল্লাহর আদেশে উল্লিখিত নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে গেলো এবং হত্যার পূর্ণ ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করলো। অনুমান করি, আল্লাহ-প্রদত্ত এই বিস্ময়কর নিদর্শন যখন সত্য ঘটনাটিকে উন্মোচিত করে দিলো, তখন হত্যাকারীরও অপরাধ স্বীকার না করে কোনো উপায় থাকলো না। এভাবে কেবল হত্যাকারীরই সন্ধান পাওয়া গেলো না; বরং বনি ইসরাইলের বিভিন্ন গোত্র ও বংশের মধ্যে যে-মতভেদের সৃষ্টি হয়ে গৃহকলহ ও রক্তপাতের সৃষ্টি হতে যাচ্ছিলো, উত্তমরূপে তারও অবসান ঘটে।
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে দুটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। একটি হলো এই : পরলোক অবিশ্বাসকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, যে-কওমের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে, তারা আজ পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী রয়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা যেভাবে মৃতকে জীবিত করে তাঁর কুদরত প্রদর্শন করেছেন, তোমরা অনুধাবন করো, কিয়ামতের দিনেও একইভাবে তিনি মৃতদেরকে জীবন দান করবেন।
كَذَلِكَ يُحْيِي اللَّهُ الْمَوْتَى
"আর এভাবেই-আল্লাহ তাআলা মৃতদেরকে জীবন দান করে থাকেন।"
দ্বিতীয় বিষয় হলো বনি ইসরাইলের উদ্দেশে এ-কথা বলে দেয়া যে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে অর্থাৎ, তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এত অধিক সংখ্যক মুজেযা প্রদান করেছেন যে, যদি অন্যকোনো কওমের সামনে এসব মুজেযা প্রদান করা হতো, তাহলে তারা চিরতরে আল্লাহ তাআলার অনুগত বান্দা হয়ে যেতো এবং তাদের অন্তরে এক মুহূর্তের জন্যেও নাফরমানির কল্পনা উদিত হতো না। কিন্তু তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষদের ওপর তো কোনো ক্রিয়াই হলো না। আর যদি হয়েই থাকে তবে তা নিতান্তই অস্থায়ী এবং নিষ্ক্রিয়ই প্রমাণিত হয়েছে। আর আজো যদি তোমরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবিশ্বাস করো এবং তাঁর বিরোধিতা করতে থাকো, তবে তা তোমাদের জন্মগত ও প্রাচীন একগুঁয়েমি ও মূর্খতারই ফল।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনা সম্পর্কে আমাদেরকে কেবল এতটুকু বলেছে এবং এর চেয়ে অধিক বিস্তারিত বিবরণ আর কিছুই বলে নি-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا قَالَ أَعُوذُ بِاللهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ () قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنُ لَنَا مَا هِيَ قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةً لَا فَارِضٌ وَلَا بِكْرٌ عَوَانٌ بَيْنَ ذَلِكَ فَافْعَلُوا مَا تُؤْمَرُونَ () قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنَ لَنَا مَا لَوْنَهَا قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ صَفْرَاءُ فَاقِعٌ لَوْنَهَا تَسُرُّ النَّاظِرِينَ () قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنَ لَنَا مَا هِيَ إِنَّ الْبَقَرَ تَشَابَهَ عَلَيْنَا وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَمُهْتَدُونَ () قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ لَا ذَلُولٌ تُثِيرُ الْأَرْضَ وَلَا تَسْقِي الْحَرْثَ مُسَلَّمَةٌ لَا شَيَةَ فِيهَا قَالُوا الْآنَ جِئْتَ بِالْحَقِّ فَذَبَحُوهَا وَمَا كَادُوا يَفْعَلُونَ () وَإِذْ قَتَلْتُمْ نَفْسًا فَادَّارَأْتُمْ فِيهَا وَاللهُ مُخْرِجٌ مَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ () فَقُلْنَا اضْرِبُوهُ بِبَعْضِهَا كَذَلِكَ يُحْيِي اللَّهُ الْمَوْتَى وَيُرِيكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (سورة البقرة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু জবাইয়ের আদেশ দিয়েছেন।"¹²⁷ তারা বলেছিলো, "তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছো?" মুসা বললো, "আল্লাহর শরণাপন্ন হচ্ছি, যাতে আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হই।” (অর্থাৎ, আমি বলছি যে, এটা কোনো বিদ্রূপ নয়।)
তারা বললো, "আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তা কীরূপ?" মুসা বললো, "আল্লাহ বলছেন, তা এমন গরু যা বৃদ্ধও নয়, অল্পবয়স্কও নয়-মধ্যবয়সী। সুতরাং তোমরা যা আদিষ্ট হয়েছে তা করো।" তারা বললো, "আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তার রং কী?" মুসা বললো, "আল্লাহ বলছেন, তা হলুদ বর্ণের গরু, তার রং উজ্জ্বল গাঢ়, যা দর্শকদেরকে আনন্দ দেয়।" তারা বললো, "আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তা কোন্টি? আমরা গরুটি সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছি এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় আমরা দিশা পাবো।” মুসা বললো, "তিনি বলছেন, তা এমন গরু যা জমি-চাষে ও ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হয় নি-সুস্থ, নিখুঁত।" তারা বললো, "এখন তুমি সত্য এনেছো।” যদিও তারা জবাই করতে উদ্যত ছিলো না তবুও তারা ওটাকে জবাই করলো। স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে এবং একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করছিলে-তোমরা যা গোপন রাখছিলে আল্লাহ তা ব্যক্ত করছেন। আমি বললাম, "এর (জবাইকৃত গরুর) কোনো অংশ দ্বারা ওকে (মৃত ব্যক্তিকে) আঘাত করো।" (তাতেই নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে তার হত্যাকারীর নাম বলে দেবে।) এইভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তাঁর নিদর্শন তোমাদেরকে দেখিয়ে থাকেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬৭-৭৩]
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "যদি বনি ইসরাইলিরা হযরত মুসা আ.-এর বলার সঙ্গে সঙ্গে গাভী জবাই করার আদেশটি পালন করতো, তবে তাদের গাভীর ব্যাপারে কোনো প্রকারের শর্ত ও বন্ধন থাকতো না। তারা যে- কোনো প্রকারের একটি গাভী জবাই করলেই আদেশ পালন হয়ে যেতো। কিন্তু তারা অনর্থক প্রশ্ন করে নিজেদের ওপর কঠোরতা বৃদ্ধি করলো।" যেমন: কুরআন মাজিদ আল্লাহর নবীর সঙ্গে এমন এমন অনর্থক কথাবার্তা বলা এবং কূটতর্ক করার কঠোর নিন্দা করেছে এবং বলেছে যে, এর শেষফল কুফরি ও বে-মান হওয়া পর্যন্ত গিয়ে সমাপ্ত হয়। সুতরাং মুসলমান উম্মতগণের জন্য এ-জাতীয় কথাবার্তা থেকে আত্মরক্ষা করা একান্ত কর্তব্য। যেমন: কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে—
أَمْ تُرِيدُونَ أَنْ تَسْأَلُوا رَسُولَكُمْ كَمَا سُئِلَ مُوسَى مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَتَبَدَّلِ الْكُفْرَ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ (سورة البقرة)
'তেমারা কি তোমাদের রাসুলকে তেমন প্রশ্ন করতে চাও যেমন পূর্বে মুসাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো? এবং যে-কেউ ঈমানের পরিবর্তে কুফরি গ্রহণ করে সে পথ হারায়।' [সুরা বাকারা: আয়াত ১০৮]
এখানে অবশ্যই একটি প্রশ্ন সামনে এসে পড়ে যে, গাভী জবাই করা এবং নিহত ব্যক্তিকে জীবিত করে দেয়ার মধ্যে কী সামঞ্জস্য, যার ফলে নিহত ব্যক্তিকে জীবিত করে দেয়ার জন্য এই বিশেষ উপায়টি অবলম্বন করা হলো? এই প্রশ্নের জবাব এই যে, আল্লাহ তাআলার হেকমত ও মুসলেহত (প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা) অবগত হওয়ার তো মানবক্ষমতার বহির্ভূত। তবুও জ্ঞান ও বিবেকের যে-আলো তিনি মানুষকে দান করেছেন তা এই রহস্য উদ্‌ঘাটন করছে যে, এই কিতাবের পূর্বের পাতাগুলোতে লিখিত বনি ইসরাইলের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ করলে এ-কথা অতি সহজে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মিসরে অবস্থান ও বসবাস করা তাদের মধ্যে মূর্তিপূজা বিশেষ করে গাভীর শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা এবং গো-বৎস পূজার প্রেরণা সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। যা পদে পদে উথলে উঠতো এবং তাদের ওপর অপক্রিয়া করতো। যেমন: গো-বৎস পূজার ঘটনাটির পরে যখন মুসা আ. তাদেরকে তাওরাতের নির্দেশাবলি পালন করতে বললেন, তখনও তারা যথেষ্ট টালবাহানার আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তখন যদি তুর পাহাড়কে তাদের মাথার ওপর তুলে ধরার মুজেযাটি প্রকাশ না করা হতো তাহলে তারা হযরত মুসা আ.-কে মিথ্যা প্রতিপাদনের জন্যই উঠে-পড়ে লাগতো এবং এটা বিচিত্র কিছু হতো না। আল্লাহপাক এ-ক্ষেত্রে বলেছেন, ওই গো-বৎস পূজাই তাদের অবাধ্যতা ও টালবাহানার স্বভাবের কারণ। তখনো পর্যন্ত তাদের অন্তর থেকে মূর্তিপূজা ও গো-বাছুরের পবিত্রতার বিশ্বাস দূরীভূত হয় নি; বরং তাদের অবস্থা এমনটা অনুমান করা হয় যে, গো-বাছুরের পবিত্রতার বিশ্বাস তাদের হৃদয়ে প্রবেশ করে বদ্ধমূল হয়ে গেছে।
কুরআন মাজিদ এ-বিষয়ে বর্ণনা করছে—
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاسْمَعُوا قَالُوا سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَأُشْرِبُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ قُلْ بِئْسَمَا يَأْمُرُكُمْ بِهِ إِيمَانُكُمْ إِن كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ (سورة البقرة)
স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুরকে তোমাদের ওপর উত্তোলন করেছিলাম। বলেছিলাম, “যা দিলাম তা দৃঢ়রূপে গ্রহণ করো ও শ্রবণ করো।" তারা বলেছিলো, "আমরা শ্রবণ করলাম ও অমান্য করলাম।"¹²⁸ কুফরির কারণে তাদের হৃদয়ে গো-বৎসের প্রেম সিঞ্চিত হয়েছিলো। বলো, "যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে তোমাদের ঈমান যা-কিছুর নির্দেশ দেয় তা কত নিকৃষ্ট!”” [সুরা বাকারা: আয়াত ৯৩]
وَلَقَدْ جَاءَكُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ
'এবং নিশ্চয় মুসা তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছে। এরপর তার প্রস্থানের পর তোমরা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে। আর তোমরা তো জালিম।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৯২]
সুতরাং এখানে আল্লাহ তাআলার কল্যাণকামিতা এই মীমাংসা করেছে যে, বনি ইসরাইল এই পথভ্রষ্টতাকে এমন একটি কাজের মাধ্যমে দূর করে নেবে যা তারা নিজেরাই স্বচক্ষে দর্শন করবে। এইজন্য তাদেরকে এ-বিষয়টা চাক্ষুষ দেখিয়ে দিলেন যে, যে-বস্তুর পবিত্রতা তোমাদের অন্ত রে এভাবে বদ্ধমূল হয়ে গেছে এবং যার পৌনঃপুনিক প্রকাশ ঘটছে তার (ওই গাভীটির) স্বরূপ তো এই যে, তোমরা নিজেরা নিজেদের হাতে তা ধ্বংস করে দিলে এবং তা তোমাদের একগোছা চুলও বাঁকা করতে পারলো না। আবার কখনো এমন কিছু মনে করে বসো না যে, তা গাভীরই পবিত্রতার ক্রিয়া ছিলো যে তার দেহের একটি অংশের আঘাতে মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়ে উঠেছে। কেননা, মৃত্যু ও জীবনপ্রাপ্তির এ-ব্যাপারটি যদি গাভীর পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতো, তবে যে-মাংসখণ্ডটি মৃতকে জীবিত করে দিলো তা নিজে জীবন লাভ করে পুনরায় কোনো জীবিত গাভী হয়ে গেলো না? তোমরা কি দেখছো না যে, যে-গাভীটি তোমরা জবাই করে দিলে, তা তেমনই নির্জীব অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং তার দেহের খণ্ডগুলো তোমাদের দস্তরখানের শোভা বর্ধন করেছে।
বাস্তব অবস্থা এই যে, মৃত্যু ও জীবনের এ-ব্যাপারটি একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতেই রয়েছে। আর যে-গোবৎসের ভালোবাসা তোমাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়ে গেছে, তা তোমাদের চেয়েও নিকৃষ্ট একটি প্রাণী, যা কেবল তোমাদের প্রয়োজনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তা তোমাদের জন্য দেবতা বা দেবী নয়। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই যাকে ইচ্ছা মৃত্যু দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা জীবন দান করেনে। যেমন: তোমরা এই ঘটনার মধ্যে উভয় সত্যকে চাক্ষুষ দর্শন করেছো : তিনি গাভীর জীবনকে মৃত্যু দ্বারা পরিবর্তন করে দিলেন এবং মানুষের মৃতদেহকে নতুন জীবন দান করলেন।
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ (سورة الحشر)
'অতএব, হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।' [সুরা হাশর : আয়াত ২]
কুরআন মাজিদ সম্ভবত এই হেকমতেরই প্রতি লক্ষ করেই গাভী জবাই করার ঘটনাটিকে দুইভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে : প্রথম ভাগে বনি ইসরাইলের গো-বৎস পূজার ঘটনাকে জোর দেয়ার জন্য গাভীর ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, একটি বিশেষ কারণে যখন বনি ইসরাইলকে গাভী জবাই করতে বলা হয়েছিলো, তখন এই গো-বৎস পূজার ভালোবাসাই তাদের সামনে নির্দেশ পালনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তারা মিসরীয়দের গাভীর পবিত্রতার বিশ্বাস অনুসরণ করে অজস্র টালা-বাহানা করলো এবং চেষ্টা করলো যাতে তাদেরকে গাভী জবাই করতে না হয়। কিন্তু অবশেষে যখন নিজেদের প্রশ্নজালে নিজেরাই আবদ্ধ হয়ে পড়লো, তাদেরকে বাধ্য হয়ে আদেশ পালন করতেই হলো।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনা শোনানোর পর স্বাভাবিকভাবেই শ্রোতাদের মনে এই আগ্রহ সঞ্চারিত হওয়া উচিত—যাতে তারা জেনে নিতে পারে—গাভী জবাই করার এই ঘটনা কেনো এবং কীভাবে ঘটেছিলো, যার ব্যাপারে বনিইসরাইলিরা অজুহাত পেশ ও টালবাহানা করছিলো। তাই ঘটনার দ্বিতীয় অংশে কুরআন মাজিদ এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্নের জবাব এইভাবে প্রদান করেছে যে, এই ঘটনার প্রধান দিকটি বর্ণনা করে দিয়েছে, যার সঙ্গে বনি ইসরাইলের বাদানুবাদের প্রকৃত সম্পর্ক ছিলো।
তাই এই অংশের বর্ণনাকে পুনরায় ১ শব্দের মাধ্যমে শুরু করেছে। কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোর তাফসির করা হয়েছে কুরআনের বাক্যগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেই এবং তাতে গাভী জবাই করার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে আগে-পিছে হওয়ার বিতর্কে যাওয়া আদৌ প্রয়োজন পড়ে না। ঘটনাটিকে অদ্ভুত মনে করে মনগড়া ও হালকা ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজনও অবশিষ্ট থাকে না।
নিঃসন্দেহে তা আল্লাহ তাআলার ধারাবাহিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি নিদর্শন যা ইহুদিদের কঠিনচিত্ততা ও মন্দস্বভাব এবং অবাধ্যতামূলক চরিত্রের মোকাবিলায় সত্যের সমর্থনের জন্য আল্লাহ তাআলার হেকমতের চাহিদা অনুসারে প্রকাশিত হয়েছিলো। তা নিদর্শন হওয়া ছাড়াও তাতে কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মুসলেহত (কল্যাণকামিতা) বিদ্যমান ছিলো। যেমন : এই ঘটনার পরেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
كَذَلِكَ يُحْيِ اللَّهُ الْمَوْتَى 'এভাবেই আল্লাহ তাআলা মৃতদেরকে জীবিত করে থাকেন,' এবং এর সঙ্গে সঙ্গেই বলেছেন— وَيُرِيكُمْ آياته 'এবং তোমাদেরকে তাঁর (কুদরতের) নিদর্শন দেখানোর জন্য।'
যেনো, গাভী জবাই করার ঘটনাটি বর্ণনা করার পূর্বে বনি ইসরাইলকে পৌনঃপুনিক আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শনের উল্লেখ করা এবং তারপর ঘটনাটির সঙ্গেই এই ঘটনার মাধ্যমে পরকালে মৃতদেরকে জীবিত করার প্রমাণ দেয়া, এরপর এই ঘটনাকেও আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহ থেকে একটি নিদর্শন বলা—এ-বিষয়ের একটি স্পষ্ট ও উৎকৃষ্ট প্রমাণ যে, কোনো প্রকার ব্যাখ্যা ও বাহুল্য কথার আশ্রয় নেয়া ছাড়াই এই আয়াতগুলোর পরিষ্কার ও সাধাসিধে তাফসির তা-ই যা উপরিউক্ত লাইনগুলোতে বর্ণনা করা হয়েছে।
সুতরাং এ-আয়াতগুলোর যে-তাফসির সমসায়িক যুগের আধুনিক মুফাস্সিরগণ বর্ণনা করেছেন এবং যে-তাফসিরে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় আয়াতকে কখনো দুটি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা এবং কখনো একটি ঘটনা মেনে নিয়ে নানা ধরনের হালকা ও দুর্বল ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তা অগ্রহণযোগ্য এবং কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ভাষ্যের বিরোধী।
যেমন: তাদের কেউ কেউ বলে থাকেন গাভী জবাই করার এই নিয়মটি প্রকৃতপক্ষে বনি ইসরাইলের একটি প্রাচীন প্রথা ছিলো। এই প্রথার উল্লেখ আজো পর্যন্ত তাওরাতে বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ, যখনই কোথাও এমন নিহত ব্যক্তি পাওয়া যেতো এবং তার হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া যেতো না, তখন পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ এড়ানোর জন্য তাদের মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিলো যে, তারা এমন একটি গাভী সংগ্রহ করতো যেটাকে কখনো ভূমি চাষের কাজে খাটানো হয় নি এবং যেটা কখনো শস্যখেতে পানি সেচের কাজেও ব্যবহৃত হয় নি। গাভীটিকে এমন একটি প্রান্তরে নিয়ে যাওয়া হতো যাতে কখনো ফসল ফলানো বা চাষ করা হয় নি এবং যাতে নদী প্রবহমান রয়েছে। আর যে-ব্যক্তিকে হত্যা করেছে বলে সন্দেহ করা হতো, তার মহল্লা, গোত্র বা বসতির লোকদেরকে একত্র করা হতো। এরপর গণক বা জ্যোতিষী অগ্রসর হয়ে প্রবহমান পানির ওপর গাভীটিকে দাঁড় করিয়ে তার ঘাড় কেটে ফেলতো। গাভীটির রক্ত পানির সঙ্গে মিশে গেলে তৎক্ষণাৎ সন্দেহভাজন দলের লোকেরা উঠে রক্তমিশ্রিত পানি দিয়ে হাত ধুতো এবং উচ্চৈঃস্বরে বলতো, আমাদের হাতও এই ব্যক্তিকে হত্যা করে নি এবং আমরা তার হত্যাকারী সম্পর্কেও কিছু অবগত নই। এই প্রথা পালনের পর তাদের ওপর আর কোনো সন্দেহ থাকতো না এবং গৃহকলহের আশঙ্কাও থাকতো না। আর যদি সন্দেহভাজন দলের একজন সরদারও হাত ধুতে এবং এই প্রথা পালন করতে অস্বীকৃতি জানাতো, তবে সে-গোত্রের সরদার নিহত ব্যক্তির খুনের অর্থদণ্ড ওই গোত্র বা মহল্লার ওপর আরোপ করা হতো। ¹²⁹
এই তাফসিরে কুরআন মাজিদের পূর্বপর আয়াতগুলোর প্রেক্ষিতে যে- ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে তা সাধারণ বোধশক্তি ও জ্ঞান দ্বারা অতি সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু এসব ত্রুটি ছাড়াও যে-বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তা এই যে, যদি বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন প্রথা প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত থাকতো, তবে যখন হযরত মুসা আ. ওই প্রথা অনুসারেই তাদেরকে আল্লাহর ফয়সালা শুনিয়ে দিলেন, তখন বনি ইসরাইল একে কেনো আজগুবি মনে করলো এবং কেনো এমন কথা বললো- أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا 'হে মুসা, তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশা করছো যে আমাদেরকে গাভী জবাই করতে বলছো?' যদি তাদের এই প্রশ্ন অবাধ্যতামূলকই হতো তবে হযরত মুসা আ. এই জবাব দিতেন যে, এতে বিস্ময় ও আশ্চর্যের কী আছে? তোমরা তো অবগতই আছো যে, 'এমন সমস্যার সমাধানের জন্য এটাই প্রাচীন রীতি।'
এ-প্রসঙ্গে গাভী সংগ্রহ করা সম্পর্কে তাফসিরের কিতাবসমূহে অদ্ভুত ও বিচিত্র কাহিনি বর্ণিত আছে। কিন্তু বাস্তব ব্যাপার এই যে, এসব কাহিনি ইসরাইলি রেওয়ায়েত ও বর্ণনা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এগুলো এমন কাহিনি যা ইহুদিদের রেওয়ায়েত ও উদ্ধৃতির ফলে খ্যাতি লাভ করেছে এবং তাফসিরের কিতাবসমূহেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু গবেষকগণ অনুসন্ধান করে কুরআন মাজিদের তাফসির থেকে ওই কাহিনিগুলোকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করে দিয়েছেন। যেমন: ইমাদুদ্দিন বিন কাসিরের মতো উচ্চমর্যাদাশীল মুফাস্সির এসব কাহিনি সম্পর্কে এমন মীমাংসা দিয়েছেন:
وهذه السياقات كلها عن عبيدة وأبي العالية والسدي وغيرهم، فيها اختلاف ما، والظاهر أنها مأخوذة من كتب بني إسرائيل وهي مما يجوز نقلها ولكن لا نصدق ولا نكذب فلهذا لا نعتمد عليها إلا ما وافق الحق عندنا، والله أعلم.
"আর এসব ধারাবাহিক বর্ণনা যা উবায়দা, আবুল আলিয়া, সুদ্দি ও অন্যান্য রাবী থেকে উদ্ধৃত হয়েছে, এসব বর্ণনা পরস্পর বিরোধী। পরিষ্কার কথা হলো এই এসব রেওয়ায়েত ইসরাইলিদের কিতাব থেকে গৃহীত হয়েছে। এগুলোকে উদ্ধৃত করা যদিও জায়েযের পর্যায়ে আসতে পারে, তবে আমরা সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করি এবং মিথ্যাও বলি না। সুতরাং এসব রেওয়ায়েতের ওপর মোটেও বিশ্বাস করা যায় না। তবে ওইসব রেওয়ায়েত অবশ্যই গ্রহণযোগ্য যা কুরআন ও হাদিসের আলোকে সত্য বলে বিবেচিত হয়। আল্লাহই ভালো জানেন।"
এই বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলছেন: "তা গাভীর দেহের কোন্ অংশ ছিলো যা দ্বারা নিহত ব্যক্তির দেহকে স্পর্শ করা হয়েছিলো—তা যে-অংশই হোক না কেনো, কোনো একটি অংশ স্থিরীকরণ ব্যতীত অনির্দিষ্টভাবে কুরআন মাজিদে যা বলা হয়েছে তা-ই মুজেযা হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর যদি আমাদের ধর্মীয় ও পার্থিব অবস্থার প্রেক্ষিতে উল্লিখিত অংশের নির্দিষ্টকরণ প্রয়োজনীয় হতো, তবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করতেন। কিন্তু তিনি তা অস্পষ্ট রেখেছেন, যদিও তা প্রকৃত অবস্থার বিচারে নির্দিষ্টই। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট অংশ দ্বারাই স্পর্শ করা হয়েছিলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও গাভীর দেহের অংশ নির্দিষ্টকরণে কোনো সহিহ হাদিস নেই। সুতরাং, আমাদের জন্য এটাই সঙ্গত যে, আমরাও একে তেমনই অস্পষ্ট রেখে দিই, যেমন আল্লাহ তাআলা তাকে অস্পষ্ট রেখেছেন।"¹³⁰
তা ছাড়া মুসলিম শরিফের হাদিসে শুধু এতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'যদি বনি ইসরাইলিরা হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে বাক-বিতণ্ডা না করতো, তবে গাভীর ব্যাপারে তাদের জন্য এত শর্ত আরোপ করা হতো না।' সুতরাং এ-ব্যাপারে যদি আরও বিস্তারিত বিবরণ থাকতো তবে আমাদের নিষ্পাপ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা অবশ্যই উল্লেখ করতেন।
মোটকথা, এই ঘটনা আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি মহান নিদর্শন। অবশ্য কুরআন মাজিদ তার যতটুকু বিবরণ প্রদান করেছে ততটুকু বিবরণই গ্রহণযোগ্য। বাকি যা-কিছু আছে সব অনর্থক ও নিষ্ফল কিচ্ছা-কাহিনিমাত্র।
হযরত মুসা আ.-এর মুজেযাগুলো সম্পর্কে এসব আলোচনা সে-সকল মুফাস্স্সিসরকে উদ্দেশ্য করেই করা হয়েছে যাঁরা মূলত আম্বিয়ায়ে কেরামের মুজেযায় বিশ্বাসী। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার সম্ভাবনা আছে মনে করে এমনসব মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদান করেন যার ফলে এসব ঘটনা মুজেযার সীমা থেকে বের হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যেসব খোদাদ্রোহী ইসলামের সর্বজন স্বীকৃত আকিদা মুজেযাকে বিশ্বাস ও স্বীকারই করে না এবং সেজন্য কুরআন মাজিদের এসব ঘটনাকে মিথ্যা অপব্যাখ্যা দিয়ে বিকৃত করে দেওয়াই জরুরি মনে করে, তাদের জন্য প্রথম মুল মুজেযার সম্ভাবনা নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত।
যাইহোক। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন, এসব মহান মুজেযাসমূহ চাক্ষুষ দর্শন করা এবং তাদের প্রতি আল্লাহপাকের অসীম অনুগ্রহ ও দয়া থাকা সত্ত্বেও ওইসব দুর্ভাগাদের ওপর কোনো ক্রিয়াই হলো না। তারা একইভাবে বক্র স্বভাব ও ঘাউড়ামির ওপর গোঁ ধরে থাকলো। সত্যকে কবুল করার জন্য তাদের হৃদয় পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেলো; বরং অনবরত নাফরমানি ও অবাধ্যতা তাদের ভালো কাজের যোগ্যতাকেই ধ্বংস করে দিলো। ফলে তাদের অন্তর পাথরের চেয়েও অধিক কঠিন হয়ে গেলো। কেননা, পাথরের মধ্যে কঠিনতা থাকা সত্ত্বেও তা মানুষের অনেক কাজে লাগে; কিন্তু এই হতভাগাদের জীবনে তো অনিষ্ট ও ক্ষতি ছাড়া আর কোনো কল্যাণই থাকলো না।
এ-ব্যাপারে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهَارُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَشْقُقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ الْمَاءُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (سورة البقرة)
'এরপরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেলো, তা পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন। (এটা স্পষ্ট কথা যে,) কিছু পাথরও এমন হয় যে, তা থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয় এবং কিছু এমন যে, বিদীর্ণ হওয়ার পর তা থেকে পানি নির্গত হয়, আবার কিছু এমন যা (ভূমিকম্প ইত্যাদি অবস্থায়) আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ে এবং তোমরা যা করো আল্লাহ সে-সম্পর্কে অনবহিত নন।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৪]
ঘটনার সারমর্ম এই: বনি ইসরাইলিদের অন্তরের কাঠিন্য এবং সত্য কবুল করার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিলো যে, যদি সাধারণ কথায় বলে দেয়া হয় যে তাদের অন্তর পাথরখণ্ডে পরিণত হয়েছিলো, তবুও তাদের অন্তরের কঠিনতার প্রকৃত ছবি সামনে প্রতিভাত পারে না। কেননা, পাথর যদিও কঠিন, কিন্তু তা অকেজো নয়। তোমরা কি পাহাড়সমূহ দেখো আর দেখো নি যে, ওই কঠিন পাথরসমূহ থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয়ে আসছে এবং কোনো কোনো স্থানে ওই পাথরসমূহ থেকেই মিষ্ট ও শীতল পানির ঝরনা প্রবাহিত হচ্ছে। আর ভূমিকম্প হলে বা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলে ওই বিশালাকার পাথরসমূহ ধুনিত তুলার মতো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে উড়ে নিচে নেমে যায় এবং আল্লাহকে ভয়ের স্বীকৃতি প্রদান করছে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই বনি ইসরাইলের ওপর আল্লাহপাকের নিদর্শনসমূহেরও কোনো ক্রিয়া হলো এবং নবীগণের ওয়াজনসিহতেরও কোনো ক্রিয়া হলো না। নাফরমানি করার সময় তাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র আল্লাহভীতির সঞ্চার হলো না।

টিকাঃ
¹²⁷ বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছিলো। তার হত্যাকারী কে তা জানা যাচ্ছিলো না। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশ মুসা আ. তাদেরকে একটি গরু জবাই করে তার এক খণ্ড গোশত দিয়ে নিহত ব্যক্তির দেহে আঘাত করতে বললেন। তারা আদেশমত কাজ করলে নিহত ব্যক্তিটি জীবিত হয়ে ওঠে এবং হত্যাকারীর নাম বলে পুনরায় মারা যায়।
¹²⁸ মুখে বলেছিলো "শ্রবণ করলাম" আর মনে মনে বলেছিলো "অমান্য করলাম"।
¹²⁹ তাওরাত: ইসতিসনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২১, আয়াত ২-৯।
¹³⁰ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১২।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত মুসা আ. ও কারুন

📄 হযরত মুসা আ. ও কারুন


বনি ইসরাইলের মধ্যে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলো। কুরআন মাজিদ তার নাম বলেছে কারুন। স্বর্ণ, রুপা, হীরা ও জহরতে তার ধনভাণ্ডারগুলো পরিপূর্ণ ছিলো। বলবান শ্রমিকদের একটি দল অতি কষ্টে তার ধনভাণ্ডারগুলোর চাবির বোঝা বহন করতে পারতো। এই বিরাট পুঁজি ও ধনসম্পদ তাকে চরম অহংকারী করে তুলেছিলো। কারুন ধন-সম্পদের নেশায় এতই মত্ত ছিলো যে, আপন লোকজন, আত্মীয়-স্বজন এবং নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে খুবই তুচ্ছ ও হীন মনে করতো এবং তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতো।
মুফাস্সিরগণ বলেন, কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো এবং তার বংশপরিচয় নিম্নরূপ: কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস।'¹³⁰¹ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে এমন বক্তব্যই বর্ণিত হয়েছে।
ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, কারুন মিসরে অবস্থানকালে ফেরআউনের রাজদরবারে কর্মচারী ছিলো এবং এই অসীম ধনসম্পদরাশি সে ওখানে অবস্থানকালেই সঞ্চয় করেছিলো। আর সামিরি মুনাফিক ছিলো এবং সে হযরত মুসা আ.-এর ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতো না।
হযরত মুসা আ. একবার কারুনকে উপদেশ দিলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে অগণিত ও অসীম ধন-ঐশ্বর্য দান করেছেন। সম্মান ও প্রতিপত্তিও দান করেছে। সুতরাং তুমি আল্লাহর শোকর আদায় করো। ধন-সম্পদের হক যাকাত এবং সদকা প্রদান করে দরিদ্র ও ফকির-মিসকিনদের সাহায্য করো। আল্লাহকে ভুলে থাকা এবং তাঁর বিধি-নিষেধ অমান্য করা চরিত ও মহত্ব উভয় দিক থেকে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতা। আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত সম্মানের প্রতিদান এমন হওয়া উচিত নয় যে, তুমি দরিদ্র ও দুর্বলদেরকে হীন ও নিকৃষ্ট মনে করো এবং আত্মঅহমিকায় দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনদেরকে ঘৃণা করো।
কারুনের আত্মম্ভরিতা হযরত মুসা আ.-এর নসিহত পছন্দ করলো না। সে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সঙ্গে জবাব দিলো, হে মুসা, আমার এই ধন-ঐশ্বর্য তোমার আল্লাহর প্রদত্ত নয়। এগুলো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও কৌশলের বলে অর্জন করেছি। إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى علم عندي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।" সুতরাং আমি তোমার উপদেশ মেনে নিজের অর্জিত ধন-সম্পদকে এভাবে বিনষ্ট করতে পারি না।
কিন্তু হযরত মুসা আ. অনবরত তাঁর দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতেন এবং কারুনকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করতেন। কারুন দেখলো যে, হযরত মুসা আ. কোনোভাবেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। তাই সে মুসা আ.-কে বিরক্ত করার জন্য এবং ধন-সম্পদের আড়ম্বর প্রদর্শন করে তাঁকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে একদিন অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে বের হলো।
হযরত মুসা আ. তখন বনি ইসরাইলের এক দরবারে আল্লাহ তাআলার পয়গام শুনাচ্ছিলেন। এ-সময় কারুন এক বিরাট দল এবং বিশেষ জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে তার ধন-সম্পদ প্রদর্শন করতে করতে মুসা আ.-এর সামনে দিয়ে গমন করলো। এতে কারুনের এই ইঙ্গিত ছিলো যে, যদি মুসার দাওয়াতের ধারা এভাবেই চলতে থাকে, তবে আমারও এক বিরাট দল আছে এবং আমিও বিপুল হীরা ও জহরতের মালিক। সুতরাং লোকবল ও ধনবল—এই দুটি অস্ত্র দিয়েই আমি মুসাকে পরাভূত করবো।
বনি ইসরাইলিগণ যখন কারুনের বিপুল ধন-ঐশ্বর্য দেখলো, তাদের মধ্যে কিছু লোকের অন্তরে মানবিক দুর্বলতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তারা অস্থির হয়ে এমন দোয়া করতে লাগলো, আহা, কতই না উত্তম হতো যদি আমাদের ভাগ্যেও এমন ধন-সম্পদ ও জাঁকজমক জুটতো! কিন্তু বনি ইসরাইলের জ্ঞানী ব্যক্তিরা তৎক্ষণাৎ তাদেরকে বারণ করে দিয়ে বললেন, সাবধান! এই পার্থিব ঐশ্বর্য, সাজসজ্জা ও জাঁমকের মোহে পড়ো না। এসবের লালসায় আবদ্ধ হয়ে পড়ো না। তোমরা অচিরকালের মধ্যেই দেখতে পাবে এই ধন-সম্পদের ভয়াবহ পরিণাম কেমন হচ্ছে।
অবশেষে, কারুন যখন তার গর্ব ও দাম্ভিকতার চরম প্রদর্শনী করলো এবং হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মুসলমানদেরকে হেয়-প্রতিপন্নকরণে সর্বাধিক শক্তি ব্যয় করলো, তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগলো এবং কর্মফলের চিরন্তন ও স্বাভাবিক রীতি ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। কারুন ও তার ধন-সম্পদের প্রতি আল্লাহ তাআলার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলো—
فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ
“এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম।” [সুরা কাসাস: আয়াত ৮১]
বনি ইসরাইলিদের চোখসমূহ দেখতে পেলো যে, কারুনের অহমিকাও থাকলো না এবং অহমিকার উপকরণও থাকলো না। জমিন তার সব ধন-সম্পদ গিলে ফেললো এবং শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দিলো।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনাকে বিভিন্ন স্থানে মোটামুটি ও বিস্তারিত বর্ণনা করেছে—
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ () إِلَى فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَاحِرٌ كَذَّابٌ (سورة مؤمن)
'আমি আমার নিদর্শন ও স্পষ্ট প্রমাণসহ মুসাকে প্রেরণ করেছিলাম, ফেরআউন, হামান ও কারুনের কাছে। কিন্তু তারা বলেছিলো, "এই লোকটা তো এক জাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী।"' [সুরা মুমিন: আয়াত ২৩-২৪]
وَقَارُونُ وَفِرْعَوْنُ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ ( فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (سورة العنكبوت)
'এবং আমি সংহার করেছিলাম কারুন, ফেরআউন ও হামানকে। মুসা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলো; তখন তারা দেশে দম্ভ করতো; কিন্তু তারা আমার শাস্তি এড়াতে পারে নি। তাদের প্রত্যেকেই আমি তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম : তাদের কারো ওপর প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা, তাদের কাউকে আঘাত করেছে মহানিনাদ, কাউকেও আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাউকেও করেছিলাম নিমজ্জিত (সমুদ্রে)। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন নি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো।' [সুরা আনকাবুত: আয়াত ৩৯-৪০]
হযরত মুসা আ. ও কারুনের ঘটনা সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও সঠিক অবস্থা কেবল এতটুকুই। তা ছাড়া অতিরিক্ত যা-কিছু শোনা যায় সব ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে সংগৃহীত। সুতরাং সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। এ-কারণেই হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেছেন-
وقد ذكرها هنا إسرائيليات غريبة أضربنا عنها صفحا
'এখানে বহু অপরিচিত ইসরাইলি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। আমরা সেগুলো বর্জন করলাম।¹³²
إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি"- এখানে علم বা কৌশল বলতে 'ইলমে কিমিয়া', অর্থাৎ, 'পরশমণি'-সম্পর্কিত কৌশল উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে কিমিয়ার কৌশল প্রয়োগ করেই কারুন তার সব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। কিন্তু গবেষক মুফাস্সিরগণ তা খণ্ডন করে বলেছেন যে, এখানে علم দ্বারা জ্ঞান-বুদ্ধিই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, সে জ্ঞান-বুদ্ধির বলে এসব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। علم শব্দকে কিমিয়া বলে ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত অর্থহীন কথা।
মুফাস্সির আলেমগণ এ-বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন নি যে, কারুনের ঘটনাটি কখন ঘটেছিলো। ফেরআউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার আগে মিসরে ঘটেছিলো না-কি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পর তীহ ময়দানে ঘটেছিলো। হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেন, ঘটনাটা যদি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার আগের ঘটনা হয়ে থাকে,
فَخَسَفْنَا "এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম" বাক্যের بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ (অর্থাৎ প্রাসাদ) শব্দ দ্বারা তার আভিধানিক অর্থই উদ্দেশ্য। আর যদি তা ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পরের ঘটনা হয়ে থাকে তবে এখানে বলতে তাঁবু উদ্দেশ্য।¹³³
(এই গ্রন্থের লেখক বলেন,) আমাদের মতে কারুনের ঘটনা ফেরআউনের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পরবর্তীকালে তীহ প্রান্তরেই ঘটেছিলো। কেননা, কুরআন মাজিদ ফেরআউনের নিমজ্জন-সংক্রান্ত সব ঘটনা বলার পর এই ঘটনা বর্ণনা করেছে।
কুরআন মাজিদ কারুনের বিস্তারিত ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছে-
إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ )) وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسَنُ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ () قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ () فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ ( وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِمَنْ آمَنَ وعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ () فَخَسَفْنَا بِه ا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ )) وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيُكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَنْ مِّنَ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيُكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ () تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ (سورة القصص)
'কারুন¹³² ছিলো মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলো। আমি তাকে দান করেছিলাম এমন ধনভাণ্ডার যার চাবিগুলো বহন করা একদল শক্তিশালী লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিলো।
স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিলো, "দম্ভ করো না, নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না; তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালোবাসেন না।" কারুন বললো, "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।” সে কি জানতো না আল্লাহ তার পূর্বে ধ্বংস করেছেন বহু মানবগোষ্ঠীকে যারা তার অপেক্ষা শক্তিতে ছিলো প্রবল, জনসংখ্যায় ছিলো অধিক?
অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না। ¹³⁴ (অর্থাৎ, তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে বলেই তো তারা নানা ধরনের পাককাজে লিপ্ত হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে জিজ্ঞেস করে কী লাভ?)
কারুন তার সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিলো জাঁকজমকের সঙ্গে। যারা পার্থিব জীবন কামনা করতো তারা বললো, "আহা, কারুনকে যেমন দেয়া হয়েছে আমাদেরকেও যদি তা দেয়া হতো! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান।" এবং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিলো তারা বললো, "ধিক তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ব্যতীত তা কেউ পাবে না।"
এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম। তার পক্ষে এমন কোনো দল ছিলো না যারা আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে সাহায্য করতে পারতো এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলো না। আগের দিন যারা তার মতো হওয়ার কামনা করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, "দেখলে তো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা কমিয়ে দেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় না হতেন তবে আমাদেরকেও তিনি ভূগর্ভে প্রোথিত করে দিতেন। দেখলে তো! কফেররা সফলকাম হয় না।” তা আখেরাতের সেই আবাস যা আমি নির্ধারণ করি তাদের জন্য যারা এই পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য। [সুরা কাসাস: আয়াত ৭৬-৮৩]
তাওরাতও এই ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। ¹³⁵ কিন্তু তাওরাতের বর্ণনা ও কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করার পর একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ভালোভাবেই অনুমান করতে পারেন যে, কুরআন যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করে, তখন ঘটনার শুধু ওই অংশগুলোই বর্ণনা করে থাকে যা উপদেশ ও নসিহতের জন্য প্রয়োজনীয় এবং কুরআন প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশগুলো ত্যাগ করে। কিন্তু তাওরাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনাবশ্যক বিবরণসমূহ বর্ণিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো স্থানে তো বেখাপ্পা বিস্তৃত বিবরণ ও বিপরীত বর্ণনাও পাওয়া যায়। যা আমরা প্রয়োজন হলে উদ্ধৃত করে থাকি। যেমন: এখানেও ঘটনাটির কতিপয় অনাবশ্যক অংশকে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

টিকাঃ
¹³⁰¹ কারুনের বংশপরম্পরা কয়েকভাবে বর্ণিত আছে: ১. কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস (ফারুন বিন ইয়াসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ২. কারুন বিন মিসর বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন মসর বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ৩. কারুন বিন নাসহার বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন নসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। আর মুসা আ.-এর বংশপরম্পরা নিম্নরূপ: মুসা বিন ইমরান বিন কাহাস বিন লাবি বিন ইয়াকুব ইসরাইলুল্লাহ বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম আ.। অর্থাৎ, কারুন ও হযরত মুসা আ. কাহাসের নাতি।
¹³² কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো। ফেরআউনের অন্যতম সভাসদ। কৃপণতার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত।
¹³³ বৈধভাবে অর্জন ও ব্যয় করো এবং আখেরাতের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করো।
¹³⁴ জানার জন্য প্রশ্ন করার প্রয়োজন হবে না, কারণ আমালনামায় সব লিপিবদ্ধ থাকবে।
¹³⁵ গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২০-৩৪।

বনি ইসরাইলের মধ্যে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলো। কুরআন মাজিদ তার নাম বলেছে কারুন। স্বর্ণ, রুপা, হীরা ও জহরতে তার ধনভাণ্ডারগুলো পরিপূর্ণ ছিলো। বলবান শ্রমিকদের একটি দল অতি কষ্টে তার ধনভাণ্ডারগুলোর চাবির বোঝা বহন করতে পারতো। এই বিরাট পুঁজি ও ধনসম্পদ তাকে চরম অহংকারী করে তুলেছিলো। কারুন ধন-সম্পদের নেশায় এতই মত্ত ছিলো যে, আপন লোকজন, আত্মীয়-স্বজন এবং নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে খুবই তুচ্ছ ও হীন মনে করতো এবং তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতো।
মুফাস্সিরগণ বলেন, কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো এবং তার বংশপরিচয় নিম্নরূপ: কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস।'¹³⁰¹ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে এমন বক্তব্যই বর্ণিত হয়েছে।
ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, কারুন মিসরে অবস্থানকালে ফেরআউনের রাজদরবারে কর্মচারী ছিলো এবং এই অসীম ধনসম্পদরাশি সে ওখানে অবস্থানকালেই সঞ্চয় করেছিলো। আর সামিরি মুনাফিক ছিলো এবং সে হযরত মুসা আ.-এর ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতো না।
হযরত মুসা আ. একবার কারুনকে উপদেশ দিলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে অগণিত ও অসীম ধন-ঐশ্বর্য দান করেছেন। সম্মান ও প্রতিপত্তিও দান করেছে। সুতরাং তুমি আল্লাহর শোকর আদায় করো। ধন-সম্পদের হক যাকাত এবং সদকা প্রদান করে দরিদ্র ও ফকির-মিসকিনদের সাহায্য করো। আল্লাহকে ভুলে থাকা এবং তাঁর বিধি-নিষেধ অমান্য করা চরিত ও মহত্ব উভয় দিক থেকে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞতা ও অবাধ্যতা। আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত সম্মানের প্রতিদান এমন হওয়া উচিত নয় যে, তুমি দরিদ্র ও দুর্বলদেরকে হীন ও নিকৃষ্ট মনে করো এবং আত্মঅহমিকায় দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনদেরকে ঘৃণা করো।
কারুনের আত্মম্ভরিতা হযরত মুসা আ.-এর নসিহত পছন্দ করলো না। সে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সঙ্গে জবাব দিলো, হে মুসা, আমার এই ধন-ঐশ্বর্য তোমার আল্লাহর প্রদত্ত নয়। এগুলো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও কৌশলের বলে অর্জন করেছি। إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى علم عندي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।" সুতরাং আমি তোমার উপদেশ মেনে নিজের অর্জিত ধন-সম্পদকে এভাবে বিনষ্ট করতে পারি না।
কিন্তু হযরত মুসা আ. অনবরত তাঁর দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতেন এবং কারুনকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করতেন। কারুন দেখলো যে, হযরত মুসা আ. কোনোভাবেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। তাই সে মুসা আ.-কে বিরক্ত করার জন্য এবং ধন-সম্পদের আড়ম্বর প্রদর্শন করে তাঁকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে একদিন অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে বের হলো।
হযরত মুসা আ. তখন বনি ইসরাইলের এক দরবারে আল্লাহ তাআলার পয়গام শুনাচ্ছিলেন। এ-সময় কারুন এক বিরাট দল এবং বিশেষ জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে তার ধন-সম্পদ প্রদর্শন করতে করতে মুসা আ.-এর সামনে দিয়ে গমন করলো। এতে কারুনের এই ইঙ্গিত ছিলো যে, যদি মুসার দাওয়াতের ধারা এভাবেই চলতে থাকে, তবে আমারও এক বিরাট দল আছে এবং আমিও বিপুল হীরা ও জহরতের মালিক। সুতরাং লোকবল ও ধনবল—এই দুটি অস্ত্র দিয়েই আমি মুসাকে পরাভূত করবো।
বনি ইসরাইলিগণ যখন কারুনের বিপুল ধন-ঐশ্বর্য দেখলো, তাদের মধ্যে কিছু লোকের অন্তরে মানবিক দুর্বলতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তারা অস্থির হয়ে এমন দোয়া করতে লাগলো, আহা, কতই না উত্তম হতো যদি আমাদের ভাগ্যেও এমন ধন-সম্পদ ও জাঁকজমক জুটতো! কিন্তু বনি ইসরাইলের জ্ঞানী ব্যক্তিরা তৎক্ষণাৎ তাদেরকে বারণ করে দিয়ে বললেন, সাবধান! এই পার্থিব ঐশ্বর্য, সাজসজ্জা ও জাঁমকের মোহে পড়ো না। এসবের লালসায় আবদ্ধ হয়ে পড়ো না। তোমরা অচিরকালের মধ্যেই দেখতে পাবে এই ধন-সম্পদের ভয়াবহ পরিণাম কেমন হচ্ছে।
অবশেষে, কারুন যখন তার গর্ব ও দাম্ভিকতার চরম প্রদর্শনী করলো এবং হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মুসলমানদেরকে হেয়-প্রতিপন্নকরণে সর্বাধিক শক্তি ব্যয় করলো, তখন আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগলো এবং কর্মফলের চিরন্তন ও স্বাভাবিক রীতি ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। কারুন ও তার ধন-সম্পদের প্রতি আল্লাহ তাআলার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলো—
فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ
“এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম।” [সুরা কাসাস: আয়াত ৮১]
বনি ইসরাইলিদের চোখসমূহ দেখতে পেলো যে, কারুনের অহমিকাও থাকলো না এবং অহমিকার উপকরণও থাকলো না। জমিন তার সব ধন-সম্পদ গিলে ফেললো এবং শিক্ষা গ্রহণের উপকরণ বানিয়ে দিলো।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনাকে বিভিন্ন স্থানে মোটামুটি ও বিস্তারিত বর্ণনা করেছে—
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ () إِلَى فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَاحِرٌ كَذَّابٌ (سورة مؤمن)
'আমি আমার নিদর্শন ও স্পষ্ট প্রমাণসহ মুসাকে প্রেরণ করেছিলাম, ফেরআউন, হামান ও কারুনের কাছে। কিন্তু তারা বলেছিলো, "এই লোকটা তো এক জাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী।"' [সুরা মুমিন: আয়াত ২৩-২৪]
وَقَارُونُ وَفِرْعَوْنُ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ ( فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (سورة العنكبوت)
'এবং আমি সংহার করেছিলাম কারুন, ফেরআউন ও হামানকে। মুসা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলো; তখন তারা দেশে দম্ভ করতো; কিন্তু তারা আমার শাস্তি এড়াতে পারে নি। তাদের প্রত্যেকেই আমি তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম : তাদের কারো ওপর প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা, তাদের কাউকে আঘাত করেছে মহানিনাদ, কাউকেও আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাউকেও করেছিলাম নিমজ্জিত (সমুদ্রে)। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন নি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিলো।' [সুরা আনকাবুত: আয়াত ৩৯-৪০]
হযরত মুসা আ. ও কারুনের ঘটনা সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও সঠিক অবস্থা কেবল এতটুকুই। তা ছাড়া অতিরিক্ত যা-কিছু শোনা যায় সব ইসরাইলি রেওয়ায়েত থেকে সংগৃহীত। সুতরাং সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। এ-কারণেই হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেছেন-
وقد ذكرها هنا إسرائيليات غريبة أضربنا عنها صفحا
'এখানে বহু অপরিচিত ইসরাইলি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। আমরা সেগুলো বর্জন করলাম।¹³²
إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি"- এখানে علم বা কৌশল বলতে 'ইলমে কিমিয়া', অর্থাৎ, 'পরশমণি'-সম্পর্কিত কৌশল উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে কিমিয়ার কৌশল প্রয়োগ করেই কারুন তার সব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। কিন্তু গবেষক মুফাস্সিরগণ তা খণ্ডন করে বলেছেন যে, এখানে علم দ্বারা জ্ঞান-বুদ্ধিই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, সে জ্ঞান-বুদ্ধির বলে এসব ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলো। علم শব্দকে কিমিয়া বলে ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত অর্থহীন কথা।
মুফাস্সির আলেমগণ এ-বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন নি যে, কারুনের ঘটনাটি কখন ঘটেছিলো। ফেরআউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার আগে মিসরে ঘটেছিলো না-কি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পর তীহ ময়দানে ঘটেছিলো। হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির বলেন, ঘটনাটা যদি ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার আগের ঘটনা হয়ে থাকে,
فَخَسَفْنَا "এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম" বাক্যের بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ (অর্থাৎ প্রাসাদ) শব্দ দ্বারা তার আভিধানিক অর্থই উদ্দেশ্য। আর যদি তা ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়ার পরের ঘটনা হয়ে থাকে তবে এখানে বলতে তাঁবু উদ্দেশ্য।¹³³
(এই গ্রন্থের লেখক বলেন,) আমাদের মতে কারুনের ঘটনা ফেরআউনের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পরবর্তীকালে তীহ প্রান্তরেই ঘটেছিলো। কেননা, কুরআন মাজিদ ফেরআউনের নিমজ্জন-সংক্রান্ত সব ঘটনা বলার পর এই ঘটনা বর্ণনা করেছে।
কুরআন মাজিদ কারুনের বিস্তারিত ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছে-
إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ )) وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسَنُ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ () قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ () فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ ( وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِمَنْ آمَنَ وعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ () فَخَسَفْنَا بِه ا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ )) وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيُكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَنْ مِّنَ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيُكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ () تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ (سورة القصص)
'কারুন¹³² ছিলো মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলো। আমি তাকে দান করেছিলাম এমন ধনভাণ্ডার যার চাবিগুলো বহন করা একদল শক্তিশালী লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিলো।
স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিলো, "দম্ভ করো না, নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না; তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালোবাসেন না।" কারুন বললো, "এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।” সে কি জানতো না আল্লাহ তার পূর্বে ধ্বংস করেছেন বহু মানবগোষ্ঠীকে যারা তার অপেক্ষা শক্তিতে ছিলো প্রবল, জনসংখ্যায় ছিলো অধিক?
অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না। ¹³⁴ (অর্থাৎ, তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে বলেই তো তারা নানা ধরনের পাককাজে লিপ্ত হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে জিজ্ঞেস করে কী লাভ?)
কারুন তার সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিলো জাঁকজমকের সঙ্গে। যারা পার্থিব জীবন কামনা করতো তারা বললো, "আহা, কারুনকে যেমন দেয়া হয়েছে আমাদেরকেও যদি তা দেয়া হতো! প্রকৃতই সে মহাভাগ্যবান।" এবং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিলো তারা বললো, "ধিক তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ব্যতীত তা কেউ পাবে না।"
এরপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম। তার পক্ষে এমন কোনো দল ছিলো না যারা আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে সাহায্য করতে পারতো এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলো না। আগের দিন যারা তার মতো হওয়ার কামনা করেছিলো, তারা বলতে লাগলো, "দেখলে তো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা কমিয়ে দেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় না হতেন তবে আমাদেরকেও তিনি ভূগর্ভে প্রোথিত করে দিতেন। দেখলে তো! কফেররা সফলকাম হয় না।” তা আখেরাতের সেই আবাস যা আমি নির্ধারণ করি তাদের জন্য যারা এই পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য। [সুরা কাসাস: আয়াত ৭৬-৮৩]
তাওরাতও এই ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। ¹³⁵ কিন্তু তাওরাতের বর্ণনা ও কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করার পর একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ভালোভাবেই অনুমান করতে পারেন যে, কুরআন যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করে, তখন ঘটনার শুধু ওই অংশগুলোই বর্ণনা করে থাকে যা উপদেশ ও নসিহতের জন্য প্রয়োজনীয় এবং কুরআন প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশগুলো ত্যাগ করে। কিন্তু তাওরাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনাবশ্যক বিবরণসমূহ বর্ণিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো স্থানে তো বেখাপ্পা বিস্তৃত বিবরণ ও বিপরীত বর্ণনাও পাওয়া যায়। যা আমরা প্রয়োজন হলে উদ্ধৃত করে থাকি। যেমন: এখানেও ঘটনাটির কতিপয় অনাবশ্যক অংশকে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

টিকাঃ
¹³⁰¹ কারুনের বংশপরম্পরা কয়েকভাবে বর্ণিত আছে: ১. কারুন বিন ইয়াসহার বিন কাহেস বা কাহাস (ফারুন বিন ইয়াসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ২. কারুন বিন মিসর বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন মসর বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। ৩. কারুন বিন নাসহার বিন ফাহাস বিন লাবী বিন ইয়াকুব। (ফারুন বিন নসহার বিন ফাহাত বিন লাবী বিন ইয়াকুব)। আর মুসা আ.-এর বংশপরম্পরা নিম্নরূপ: মুসা বিন ইমরান বিন কাহাস বিন লাবি বিন ইয়াকুব ইসরাইলুল্লাহ বিন ইসহাক বিন ইবরাহিম আ.। অর্থাৎ, কারুন ও হযরত মুসা আ. কাহাসের নাতি।
¹³² কারুন হযরত মুসা আ.-এর চাচাতো ভাই ছিলো। ফেরআউনের অন্যতম সভাসদ। কৃপণতার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত।
¹³³ বৈধভাবে অর্জন ও ব্যয় করো এবং আখেরাতের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করো।
¹³⁴ জানার জন্য প্রশ্ন করার প্রয়োজন হবে না, কারণ আমালনামায় সব লিপিবদ্ধ থাকবে।
¹³⁵ গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২০-৩৪।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট ও যন্ত্রণা প্রদান

📄 বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট ও যন্ত্রণা প্রদান


পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহ এ-কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-কে সবসময় কথায় ও কাজে সব দিক দিয়েই নানা ধরনের কষ্ট দিয়ে আসছে। এমনকি তাঁর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ ও মিথ্যা অপবাদ প্রদান করতেও ত্রুটি করে নি।
প্রতিমা-পূজার আবদার, গো-বৎসের পূজায় লিপ্ত হওয়া, তাওরাতের বিধি-বিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি, মান্না ও সালওয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা-মোটকথা, প্রতিটি কর্তব্য সম্পন্ন করার ব্যাপারে একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা এবং প্রত্যেকটি ব্যাপারে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে মূর্খতাসুলভ বাদানুবাদ ইত্যাদির এক সক্রিয় ধারা অব্যাহত ছিলো। এসব বিষয় বনি ইসরাইলের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে দৃষ্ট হয়। আর অন্যদিকে দেখা যায় যে, হযরত মুসা আ. দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুলের মতো সবকিছু সহ্য করে হেদায়েত ও নসিহতের কাছে মশগুল ছিলেন।
কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও যদি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে বনি ইসরাইলের ওইসব বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক গুণাবলি জানতে আগ্রহ হয়, তবে তাওরাতের নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করা যেতে পারে: নিষ্ক্রমণ অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১২, আয়াত ১১-১২; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২-৩।
গণনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১-৩; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ১৩-১৪; অনুচ্ছেদ ৭, আয়াত ১২-১৩। ইস্তিসনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ৯; আয়াত ২৩-২৪।
এই গ্রন্থের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যে-ঘটনাবলি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে তা ছাড়াও কুরআন মাজিদ সুরা আহযাব ও সুরা সাফ-এ হযরত মুসা আ.-কে বনি ইসরাইল যেসব দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করে তার নিন্দা করেছে এবং বলেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وَجِيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (سورة الصف)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছো যখন তোমরা জানো যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল।" এরপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' [সুরা সাফ: আয়াত ৫]
মুফাস্সির আলেমগণ উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে আলোচনা করেছেন যে, এখানে যে-কষ্ট প্রদানের কথা উল্লেখ করেছে তাতে কি ওইসব অবস্থাই উদ্দেশ্য যা বনি ইসরাইলের ধারাবাহিক নাফরমানি ও অবাধ্যতার প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবকিছু নিশ্চিতভাবে হযরত মুসা আ.-এর মনঃকষ্টের কারণ ছিলো না-কি ওগুলো ব্যতীত অন্যকোনো বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য। যেমন: কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, উল্লিখিত আয়াত দুটিতে বনি ইসরাইল অবাধ্যতা ও হঠকারিতার মাধ্যমে হযরত মুসা আ.কে যে-যন্ত্রণা ও ক্লেশ দিতো তা-ই উদ্দেশ্য। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থল হিসেবে পূর্ববর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে পৃথক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, কোনো কোনো সহিহ হাদিসে হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন এমন ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় যার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন মাজিদে নেই। সুতরাং, তাঁদের বর্ণিত ঘটনাবলি থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা অথবা এ-জাতীয় সব ঘটনাই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল এবং এ-ঘটনাগুলোই আয়াত দুটির শানে-নুযুল তুল্য।
তাঁদের বর্ণিত ঘটনাসমূহ থেকে একটি ঘটনা সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে।
قَالَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ يَغْتَسِلُونَ عُرَاةً يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى سَوْأَةِ بَعْضٍ وَكَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ يَغْتَسِلُ وَحْدَهُ فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا يَمْنَعُ مُوسَى أَنْ يَغْتَسِلَ مَعَنَا إِلَّا أَنَّهُ آدَرُ. قَالَ فَذَهَبَ مَرَّةً يَغْتَسِلُ فَوَضَعَ ثَوْبَهُ عَلَى حَجَرٍ فَفَرَّ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ - قَالَ - فَجَمَحَ مُوسَى بِأَثَرِهِ يَقُولُ ثَوْبِي حَجَرُ ثَوْبِي حَجَرُ حَتَّى نَظَرَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ إِلَى سَوْأَةِ مُوسَى فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا بِمُوسَى مِنْ بَأْسِ فَقَامَ الْحَجَرُ بَعْدُ حَتَّى نُظِرَ إِلَيْهِ - قَالَ - فَأَخَذَ ثَوْبَهُ فَطَفِقَ بِالْحَجَرِ ضَرْبًا ». قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاللَّهِ إِنَّهُ بِالْحَجَرِ نَدَبٌ سِتَّةٌ أَوْ سَبْعَةٌ ضَرْبُ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالْحَجَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "হযরত মুসা আ. অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর দেহের কোনো অংশের ওপরই কারো দৃষ্টি পড়তে দিতেন না। পক্ষান্তরে বনি ইসরাইলিরা সর্বসাধারণের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করতে অভ্যস্ত ছিলো। তারা একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতো। এ-কারণে তারা হযরত মুসা আ.-কে উত্যক্ত করতো এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতো। কখনো তারা বলতো, 'হযরত মুসা আ.-এর বিশেষ অঙ্গে শ্বেতরোগের দাগ রয়েছে।' কখনো তারা বলতো, 'তাঁর কুরুণ্ডিয়া রোগ (অণ্ডকোষ বৃদ্ধির ব্যাধি) আছে। বা এ-জাতীয় অন্যকোনো খারাপ রোগ আছে। এ-জন্যই তিনি পৃথক স্থানে গোপনে গোসল করে থাকেন।' হযরত মুসা বনি ইসরাইলের এসব অপবাদ শুনে নীরব থাকতেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলো মুসা আ.-কে এসব অপবাদ থেকে মুক্ত ও পবিত্র করবেন। মুসা আ. একটি পৃথকভাবে আড়ালে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি তার পরনের কাপড় খুলে একখণ্ড পাথরের ওপর রাখলেন। তখনই পাথরটি আল্লাহ তাআলার আদেশে তার স্থান থেকে নড়ে উঠলো এবং যেখানে সর্বসাধারণের সামনে বনি ইসরাইলিরা নগ্ন অবস্থায় গোসল করছিলো, পাথরটি মুসা আ.-এর কাপড় নিয়ে ঠিক ওখানে গিয়ে পৌছলো। হযরত মুসা আ. ঘাবড়ে গিয়ে ও ক্রোধান্বিত হয়ে পাথরের পেছনে পেছনে এই বলে ছুটলেন, হে পাথর, আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়! পাথরের সঙ্গে সঙ্গে মুসা আ.-ও সাধারণ মানুষের সামনে এসে পৌঁছলেন এবং সবাই দেখতে পেলো যে, হযরত মুসা আ. তাদের দোষারোপ করা সমস্ত রোগ ও ব্যাধি থেকে পবিত্র। হযরত মুসা আ.-এর ওপর এই ঘটনার প্রভাব এত অধিক হলো যে, ক্রোধে অধীর হয়ে পাথরটির ওপর তাঁর লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন। ওই পাথরের ওপর তাঁর প্রত্যেকটি আঘাতেরই দাগ বসে গেলো।"¹³⁶
ইমাম বুখারি ও মুসলিম এই ঘটনাটিকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে একটি সনদে এই ঘটনাকে সুরা আহযাবের ওই আয়াতের শানে-নুযুল বলা হয়েছে যাতে বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে যন্ত্রণা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত মুসা আ.-এর পবিত্রতা ঘোষণার উল্লেখ রয়েছে। আর এ-আয়াতটিরই শানে-নুযুল হিসেবে ইবনে আবি হাতেম হযরত আলি রা. থেকে অন্য একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন, হযরত মুসা ও হারুন আ. পাহাড়ের ওপর গমন করলেন। পাহাড়ে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেন। ফলে মুসা. একাকী ফিরে আসেন। বনি ইসরাইল তা দেখে হযরত মুসা আ.-এর বিরুদ্ধে এই অপবাদ রটনা করলো যে, তিনি হারুন আ.-কে হত্যা করেছেন। এই অপবাদে হযরত মুসা আ. অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তখন আল্লাহপাক ফেরেশতাদেরকে হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ বনি ইসরাইলের সামনে এনে উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ খোলা প্রান্তরে বনি ইসরাইলের ভরা মজলিসে সবার সামনে এনে উপস্থিত করলেন। তারা তা দেখে নিশ্চিত হলো যে, সত্য সত্যই হযরত হারুন আ.-এর দেহে কোথাও কোনো আঘাত বা হত্যার চিহ্ন নেই।
তৃতীয় হাদিসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও সুদ্দি থেকে তাফসিরের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত মুসা আ.-এর উপদেশ ও নসিহত কারুনের কাছে অত্যন্ত অসহনীয় হয়ে পড়লো। ফলে সে একদিন এক বারবণিতাকে কিছু টাকা দিয়ে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করলো যে, যখন হযরত মুসা ওয়াজ-নসিহতে মশগুল থাকবে, ঠিক সে- সময়ে তুমি মজলিসে দাঁড়িয়ে মুসার বিরুদ্ধে এই দোষারোপ করবে যে, তোমার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বিপুল জনসমাবেশে ওয়াজ করছিলেন। তখন ওই বারবণিতা সমাবেশে দাঁড়িয়ে কারুনের কথামতো হযরত মুসা আ.-এর ওপর দোষারোপ করলো। হযরত মুসা আ. এই রমণীর কথা শোনামাত্র সিজদায় পতিত হলেন। তারপর মাথা তুলের রমণীকে সম্বোধন করে বললেন, তুই কি আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলতে পারিস যে তুই যা বলছিস তা সত্য? এ-কথা শুনে রমণীটির দেহে ভীষণ কাঁপুনি শুরু হয়ে গেলো। সে বললো, আল্লাহর কসম, সত্য কথা এই যে, কারুন আমাকে টাকা দিয়ে এ-ধরনের কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলো। আপনি তো এ-ধরনের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। তখন হযরত মুসা আ. কারুনের জন্য বদদোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশে কারুনকে তার সব ধনসম্পদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেয়া হলো।

টিকাঃ
¹³⁶ সহিহ বুখারি: হাদিস ২98; সহিহ মুসলিম: হাদিস 339।

পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহ এ-কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-কে সবসময় কথায় ও কাজে সব দিক দিয়েই নানা ধরনের কষ্ট দিয়ে আসছে। এমনকি তাঁর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ ও মিথ্যা অপবাদ প্রদান করতেও ত্রুটি করে নি।
প্রতিমা-পূজার আবদার, গো-বৎসের পূজায় লিপ্ত হওয়া, তাওরাতের বিধি-বিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি, মান্না ও সালওয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা-মোটকথা, প্রতিটি কর্তব্য সম্পন্ন করার ব্যাপারে একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা এবং প্রত্যেকটি ব্যাপারে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে মূর্খতাসুলভ বাদানুবাদ ইত্যাদির এক সক্রিয় ধারা অব্যাহত ছিলো। এসব বিষয় বনি ইসরাইলের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে দৃষ্ট হয়। আর অন্যদিকে দেখা যায় যে, হযরত মুসা আ. দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুলের মতো সবকিছু সহ্য করে হেদায়েত ও নসিহতের কাছে মশগুল ছিলেন।
কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও যদি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে বনি ইসরাইলের ওইসব বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক গুণাবলি জানতে আগ্রহ হয়, তবে তাওরাতের নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করা যেতে পারে: নিষ্ক্রমণ অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১২, আয়াত ১১-১২; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২-৩।
গণনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১-৩; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ১৩-১৪; অনুচ্ছেদ ৭, আয়াত ১২-১৩। ইস্তিসনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ৯; আয়াত ২৩-২৪।
এই গ্রন্থের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যে-ঘটনাবলি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে তা ছাড়াও কুরআন মাজিদ সুরা আহযাব ও সুরা সাফ-এ হযরত মুসা আ.-কে বনি ইসরাইল যেসব দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করে তার নিন্দা করেছে এবং বলেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وَجِيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (سورة الصف)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছো যখন তোমরা জানো যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল।" এরপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' [সুরা সাফ: আয়াত ৫]
মুফাস্সির আলেমগণ উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে আলোচনা করেছেন যে, এখানে যে-কষ্ট প্রদানের কথা উল্লেখ করেছে তাতে কি ওইসব অবস্থাই উদ্দেশ্য যা বনি ইসরাইলের ধারাবাহিক নাফরমানি ও অবাধ্যতার প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবকিছু নিশ্চিতভাবে হযরত মুসা আ.-এর মনঃকষ্টের কারণ ছিলো না-কি ওগুলো ব্যতীত অন্যকোনো বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য। যেমন: কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, উল্লিখিত আয়াত দুটিতে বনি ইসরাইল অবাধ্যতা ও হঠকারিতার মাধ্যমে হযরত মুসা আ.কে যে-যন্ত্রণা ও ক্লেশ দিতো তা-ই উদ্দেশ্য। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থল হিসেবে পূর্ববর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে পৃথক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, কোনো কোনো সহিহ হাদিসে হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন এমন ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় যার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন মাজিদে নেই। সুতরাং, তাঁদের বর্ণিত ঘটনাবলি থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা অথবা এ-জাতীয় সব ঘটনাই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল এবং এ-ঘটনাগুলোই আয়াত দুটির শানে-নুযুল তুল্য।
তাঁদের বর্ণিত ঘটনাসমূহ থেকে একটি ঘটনা সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে।
قَالَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ يَغْتَسِلُونَ عُرَاةً يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى سَوْأَةِ بَعْضٍ وَكَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ يَغْتَسِلُ وَحْدَهُ فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا يَمْنَعُ مُوسَى أَنْ يَغْتَسِلَ مَعَنَا إِلَّا أَنَّهُ آدَرُ. قَالَ فَذَهَبَ مَرَّةً يَغْتَسِلُ فَوَضَعَ ثَوْبَهُ عَلَى حَجَرٍ فَفَرَّ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ - قَالَ - فَجَمَحَ مُوسَى بِأَثَرِهِ يَقُولُ ثَوْبِي حَجَرُ ثَوْبِي حَجَرُ حَتَّى نَظَرَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ إِلَى سَوْأَةِ مُوسَى فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا بِمُوسَى مِنْ بَأْسِ فَقَامَ الْحَجَرُ بَعْدُ حَتَّى نُظِرَ إِلَيْهِ - قَالَ - فَأَخَذَ ثَوْبَهُ فَطَفِقَ بِالْحَجَرِ ضَرْبًا ». قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاللَّهِ إِنَّهُ بِالْحَجَرِ نَدَبٌ سِتَّةٌ أَوْ سَبْعَةٌ ضَرْبُ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالْحَجَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "হযরত মুসা আ. অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর দেহের কোনো অংশের ওপরই কারো দৃষ্টি পড়তে দিতেন না। পক্ষান্তরে বনি ইসরাইলিরা সর্বসাধারণের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করতে অভ্যস্ত ছিলো। তারা একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতো। এ-কারণে তারা হযরত মুসা আ.-কে উত্যক্ত করতো এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতো। কখনো তারা বলতো, 'হযরত মুসা আ.-এর বিশেষ অঙ্গে শ্বেতরোগের দাগ রয়েছে।' কখনো তারা বলতো, 'তাঁর কুরুণ্ডিয়া রোগ (অণ্ডকোষ বৃদ্ধির ব্যাধি) আছে। বা এ-জাতীয় অন্যকোনো খারাপ রোগ আছে। এ-জন্যই তিনি পৃথক স্থানে গোপনে গোসল করে থাকেন।' হযরত মুসা বনি ইসরাইলের এসব অপবাদ শুনে নীরব থাকতেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলো মুসা আ.-কে এসব অপবাদ থেকে মুক্ত ও পবিত্র করবেন। মুসা আ. একটি পৃথকভাবে আড়ালে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি তার পরনের কাপড় খুলে একখণ্ড পাথরের ওপর রাখলেন। তখনই পাথরটি আল্লাহ তাআলার আদেশে তার স্থান থেকে নড়ে উঠলো এবং যেখানে সর্বসাধারণের সামনে বনি ইসরাইলিরা নগ্ন অবস্থায় গোসল করছিলো, পাথরটি মুসা আ.-এর কাপড় নিয়ে ঠিক ওখানে গিয়ে পৌছলো। হযরত মুসা আ. ঘাবড়ে গিয়ে ও ক্রোধান্বিত হয়ে পাথরের পেছনে পেছনে এই বলে ছুটলেন, হে পাথর, আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়! পাথরের সঙ্গে সঙ্গে মুসা আ.-ও সাধারণ মানুষের সামনে এসে পৌঁছলেন এবং সবাই দেখতে পেলো যে, হযরত মুসা আ. তাদের দোষারোপ করা সমস্ত রোগ ও ব্যাধি থেকে পবিত্র। হযরত মুসা আ.-এর ওপর এই ঘটনার প্রভাব এত অধিক হলো যে, ক্রোধে অধীর হয়ে পাথরটির ওপর তাঁর লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন। ওই পাথরের ওপর তাঁর প্রত্যেকটি আঘাতেরই দাগ বসে গেলো।"¹³⁶
ইমাম বুখারি ও মুসলিম এই ঘটনাটিকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে একটি সনদে এই ঘটনাকে সুরা আহযাবের ওই আয়াতের শানে-নুযুল বলা হয়েছে যাতে বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে যন্ত্রণা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত মুসা আ.-এর পবিত্রতা ঘোষণার উল্লেখ রয়েছে। আর এ-আয়াতটিরই শানে-নুযুল হিসেবে ইবনে আবি হাতেম হযরত আলি রা. থেকে অন্য একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন, হযরত মুসা ও হারুন আ. পাহাড়ের ওপর গমন করলেন। পাহাড়ে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেন। ফলে মুসা. একাকী ফিরে আসেন। বনি ইসরাইল তা দেখে হযরত মুসা আ.-এর বিরুদ্ধে এই অপবাদ রটনা করলো যে, তিনি হারুন আ.-কে হত্যা করেছেন। এই অপবাদে হযরত মুসা আ. অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তখন আল্লাহপাক ফেরেশতাদেরকে হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ বনি ইসরাইলের সামনে এনে উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ খোলা প্রান্তরে বনি ইসরাইলের ভরা মজলিসে সবার সামনে এনে উপস্থিত করলেন। তারা তা দেখে নিশ্চিত হলো যে, সত্য সত্যই হযরত হারুন আ.-এর দেহে কোথাও কোনো আঘাত বা হত্যার চিহ্ন নেই।
তৃতীয় হাদিসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও সুদ্দি থেকে তাফসিরের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত মুসা আ.-এর উপদেশ ও নসিহত কারুনের কাছে অত্যন্ত অসহনীয় হয়ে পড়লো। ফলে সে একদিন এক বারবণিতাকে কিছু টাকা দিয়ে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করলো যে, যখন হযরত মুসা ওয়াজ-নসিহতে মশগুল থাকবে, ঠিক সে- সময়ে তুমি মজলিসে দাঁড়িয়ে মুসার বিরুদ্ধে এই দোষারোপ করবে যে, তোমার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বিপুল জনসমাবেশে ওয়াজ করছিলেন। তখন ওই বারবণিতা সমাবেশে দাঁড়িয়ে কারুনের কথামতো হযরত মুসা আ.-এর ওপর দোষারোপ করলো। হযরত মুসা আ. এই রমণীর কথা শোনামাত্র সিজদায় পতিত হলেন। তারপর মাথা তুলের রমণীকে সম্বোধন করে বললেন, তুই কি আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলতে পারিস যে তুই যা বলছিস তা সত্য? এ-কথা শুনে রমণীটির দেহে ভীষণ কাঁপুনি শুরু হয়ে গেলো। সে বললো, আল্লাহর কসম, সত্য কথা এই যে, কারুন আমাকে টাকা দিয়ে এ-ধরনের কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলো। আপনি তো এ-ধরনের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। তখন হযরত মুসা আ. কারুনের জন্য বদদোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশে কারুনকে তার সব ধনসম্পদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেয়া হলো।

টিকাঃ
¹³⁶ সহিহ বুখারি: হাদিস ২98; সহিহ মুসলিম: হাদিস 339।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মীমাংসা

📄 মীমাংসা


এই আলোচনায় বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, কুরআন মাজিদ যখন হযরত মুসা আ.-কে ক্লেশ ও যন্ত্রণা প্রদানের ব্যাপরটিকে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে, তখন আমাদের জন্যও এটাই সঙ্গত হবে যে, এর কোনো নির্দিষ্ট বা বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা ব্যতীতই যন্ত্রণা প্রদানের মূল বিষয়টির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না করা। যে-হেকমত ও মুসলেহতের কারণে আল্লাহপাক বিষয়টিকে অস্পষ্ট রাখা সঙ্গত মনে করেছেন, আমরাও তাকেই যথেষ্ট মনে করি। আর যদি বিস্তারিত বিবরণ ও নির্দিষ্টতার প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি হয়, তাহলে এ-কথা মেনে নিতে হবে যে, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটিরই লক্ষ্যস্থল ওইসব ঘটনা যা বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট প্রদান প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ও সহিহ হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর এ-কথার প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে যে, আলোচিত কষ্ট প্রদানের বিষয়টি এ-জাতীয় হবে যাতে হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা.-এর পক্ষ থেকে তা খণ্ডন করেন এবং বনি ইসরাইলের অপবাদ থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র সাব্যস্ত করেন। সুতরাং, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থলের নির্দিষ্টতায় ওই তিনটি রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যা হাদিসের কিতাবসমূহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওই রেওয়ায়েতগুলোই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল।
আরেকটি বিষয় এই : শানে নুযুল হওয়ার জন্য একটি বিষয়কে যে নির্দিষ্ট হতে হবে তা হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর মতে ঠিক নয়। শানে-নুযুলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সময়ে সংঘটিত ওইসব ঘটনা যা কোনো আয়াতের লক্ষ্যস্থল হতে পারে। ওইসব ঘটনাকেই উল্লিখিত আয়াতের জন্য সমানভাবে শানে নুযুল বলা যেতে পারে।
এখানকার তফাসিরে আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি 'কাসাসুল আম্বিয়া' কিতাবে একটি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর ও মিসরের ওলামা মজলিসের মধ্যে এ-বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে সেগুলোকেও উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমরা উভয় ধরনের মতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত নই; বরং আমরা প্রাচীন মুফাস্সিরগণের মধ্যে ইমাদুদ্দিন বিন কাসির ও আবু হাইয়ানের প্রবল মতসমূহেরই সমর্থন করে থাকি। তাই আমরা নাজ্জারের দীর্ঘ আলোচনা পরিত্যাগ করলাম।

এই আলোচনায় বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, কুরআন মাজিদ যখন হযরত মুসা আ.-কে ক্লেশ ও যন্ত্রণা প্রদানের ব্যাপরটিকে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে, তখন আমাদের জন্যও এটাই সঙ্গত হবে যে, এর কোনো নির্দিষ্ট বা বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা ব্যতীতই যন্ত্রণা প্রদানের মূল বিষয়টির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না করা। যে-হেকমত ও মুসলেহতের কারণে আল্লাহপাক বিষয়টিকে অস্পষ্ট রাখা সঙ্গত মনে করেছেন, আমরাও তাকেই যথেষ্ট মনে করি। আর যদি বিস্তারিত বিবরণ ও নির্দিষ্টতার প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি হয়, তাহলে এ-কথা মেনে নিতে হবে যে, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটিরই লক্ষ্যস্থল ওইসব ঘটনা যা বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট প্রদান প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ও সহিহ হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর এ-কথার প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে যে, আলোচিত কষ্ট প্রদানের বিষয়টি এ-জাতীয় হবে যাতে হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা.-এর পক্ষ থেকে তা খণ্ডন করেন এবং বনি ইসরাইলের অপবাদ থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র সাব্যস্ত করেন। সুতরাং, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থলের নির্দিষ্টতায় ওই তিনটি রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যা হাদিসের কিতাবসমূহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওই রেওয়ায়েতগুলোই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল।
আরেকটি বিষয় এই : শানে নুযুল হওয়ার জন্য একটি বিষয়কে যে নির্দিষ্ট হতে হবে তা হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর মতে ঠিক নয়। শানে-নুযুলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সময়ে সংঘটিত ওইসব ঘটনা যা কোনো আয়াতের লক্ষ্যস্থল হতে পারে। ওইসব ঘটনাকেই উল্লিখিত আয়াতের জন্য সমানভাবে শানে নুযুল বলা যেতে পারে।
এখানকার তফাসিরে আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি 'কাসাসুল আম্বিয়া' কিতাবে একটি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর ও মিসরের ওলামা মজলিসের মধ্যে এ-বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে সেগুলোকেও উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমরা উভয় ধরনের মতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত নই; বরং আমরা প্রাচীন মুফাস্সিরগণের মধ্যে ইমাদুদ্দিন বিন কাসির ও আবু হাইয়ানের প্রবল মতসমূহেরই সমর্থন করে থাকি। তাই আমরা নাজ্জারের দীর্ঘ আলোচনা পরিত্যাগ করলাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00