📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সাধারণ রহমতের ঘোষণা

📄 সাধারণ রহমতের ঘোষণা


সুরা আ'রাফের আয়াত- قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ 'আল্লাহ বললেন, আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া-তা তো প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৬]
এই আয়াত কুরআন মাজিদের গুরুত্বপূর্ণ আয়াতসমূহের অন্যতম। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে যে-আযাব আগমন করে তা বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে হয়ে থাকে। অন্যথায় আযাব প্রদান আল্লাহর সিফত বা গুণ নয়; বরং রহমতই তাঁর আদি ও অনন্ত গুণ। অর্থাৎ, তাঁর রহমত গুণটি সবার জন্য ব্যাপক। বিশ্বজগতের এমন কোনো বস্তুও নেই যা তাঁর রহমতের গুণ থেকে বঞ্চিত বা শূন্য। বরং এরূপ বলুন, 'যাকে তোমরা আল্লাহর আযাব বলছো তা তোমাদের কার্যাবলির সঙ্গে সম্পর্কের বিবেচনায় আযাব। অন্যথায় অস্তিত্বের কারখানার পূর্ণ নকশার প্রতি লক্ষ করে যদি তোমরা গভীরভাবে চিন্তা করো, তবে একেও রহমত বলে দেখতে পাবে।'
এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ 'দয়া করা তিনি তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন।' [সুরা আন'আম : আয়াত ১২]
আর এই ব্যাপক রহমতের পূর্ণ প্রকাশস্থল ও পূর্ণ প্রতিবিম্ব সে-মহান সত্তা, যাঁর উল্লেখ সুরা আ'রাফের ওই আয়াতে এভাবে করা হয়েছে যে, তাঁর আগমনের আগেই পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে তাঁর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে এবং তাঁর গুণাবলি ও চারিত্রিক মাধুর্যও আলোচিত হয়েছে। অন্য এক আয়াতে তাঁকে رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ‘গোটা বিশ্বের জন্য রহমত’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ¹²⁰

টিকাঃ
¹²⁰ এই আয়াতে পূর্ণ ব্যাখ্যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী আলোচনার সময় বলা হবে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বনি ইসরাইল ও তুর পাহাড়ি

📄 বনি ইসরাইল ও তুর পাহাড়ি


যাইহোক। সত্তর জন ব্যক্তি পুনরায় জীবিত হয়ে তাদের কওমের কাছে ফিরে এলো। তারা কওমের কাছে বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরলো এবং বললো, মুসা আ. যা বলছেন তা সত্য। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।
তখন সুস্থ প্রকৃতির চাহিদা তো ছিলো এই, এসব ঘটনা শুনে তাদের আল্লাহপাকের শোকর আদায় করা এবং তাঁর অনুগ্রহ ও দানের প্রাচুর্যের প্রতি লক্ষ করে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও দাসত্বের স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে অবনত মস্তকে তাঁর যাবতীয় নির্দেশ মেনে নেয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে অবস্থা এই হলো যে, তাদের বক্রতার ওপরই অটল থাকলো এবং তাদের নেতৃবৃন্দের সত্যায়ন সত্ত্বেও তাওরাতকে মেনে নিতে বিরোধিতামূলক ইতস্তত ভাব প্রকাশ করতে শুরু করে দিলো। তারা হযরত মুসা আ.-এর কথার প্রতি কর্ণপাত করলো না।
হযরত মুসা আ. তাদের এই অবস্থা দেখে আল্লাহর দরবারে রুজু হয়ে কওমের বিপথে চলার অভিযোগ পেশ করলেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো, এসব নাফরমানদের জন্য আমি তোমাকে আরো একটি দলিল (মুজেযা) প্রদান করছি। তা এই যে-পাহাড়ের ওপর তুমি আমার সঙ্গে কথোপকথন করো, যে-পাহাড়ের ওপর তোমার কওমের মনোনীত নেতৃবৃন্দ সত্যকে দর্শন করেছে, সে-পাহাড়কেই নির্দেশ দিচ্ছি-তা যেনো তার স্থান থেকে সরে গিয়ে বনি ইসরাইলের মাথার ওপর শামিয়ানার মতো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে এবং তার অবস্থানগত ভাষায় ঘোষণা করে যে, মুসা আ. আল্লাহ তাআলার যথার্থ নবী। নিঃসন্দেহে তাওরাত আল্লাহ তাআলার সত্য কিতাব। যদি মুসা আ. আল্লাহর সত্য নবী এবং তাওরাত সত্য কিতাব না হতো তবে তোমরা এই মুজেযা দেখতে পেতে না। এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরত ব্যতীত অন্যকোনো প্রকারেই সম্ভব ছিলো না।
বস্তুত, যখনই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তৎক্ষণাৎ তুর পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে স্থির হয়ে গেলো এবং তা শামিয়ানার মতো দেখা যেতে লাগলো। এই অবস্থানগত ভাষায় পাহাড়টি বলতে লাগলো, হে বনি ইসরাইল, যদি তোমাদের বিবেক ও বুদ্ধি বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে এবং সত্য ও মিথ্যাকে পার্থক্য করার জ্ঞান থাকে, তবে সত্য শ্রবণকারী কানের দ্বারা শোনো, আমি আল্লাহ তাআলার নিদর্শন হয়ে তোমাদেরকে বিশ্বাস প্রদান করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুসা আ. আমার পিঠে আরোহণ করে কয়েকবার আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথনের সম্মান লাভ করেছেন এবং তোমাদের সৎপথ ও হেদায়েত লাভের বিধান (তাওরাত)-ও তাঁকে প্রদান করা হয়েছে আমার পৃষ্ঠদেশের ওপর। আর হে উদাসীনতা ও অবাধ্যতায় মত্ত মানুষের দল, আমার এই অবস্থান-যা তোমাদের জন্য বিস্ময়কর হয়ে আছে-তোমাদের এই বিষয়ের সাক্ষ্য যে, যখন মানুষের বক্ষের মধ্যস্থলে অন্তরের কোমলতা কঠোরতায় রূপান্তরিত হয়ে যায় তখন তা এক খণ্ড পাথর বা তার চেয়েও কঠিন হয়ে যায় এবং কোনো দিক থেকেই তার ভেতরে হেদায়েত ও নসিহত প্রবেশ করতে পারে না। দেখো, আমি পাথরখণ্ডের সমষ্টি পাহাড়; কিন্তু আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে আনুগত্যের মস্তক অবনত করে কেমনভাবে দাসত্ব প্রদর্শন করছি। কিন্তু তোমরা তোমাদের আমিত্বের অহঙ্কারে কোনো অবস্থাতেই 'না'কে 'হ্যাঁ' দ্বারা বদল করতে প্রস্তুত নও।
কুরআন মাজিদ এই সত্যই প্রকাশ করছে-
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً
'এর পরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেলো, তা পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৪]
বনি ইসরাইল যখন এই নিদর্শন দেখলো-এটাকে সাময়িক ভয়ের কারণই মনে করুন বা উপস্থিত জনসমাবেশের সামনে আল্লাহ তাআলার মহান নিদর্শনের ফলই বিশ্বাস করুন-তারা তাওরাতের দিকে ঝুঁকে পড়লো এবং হযরত মুসা আ.-এর সামনে তাওরাতের আহকাম অনুযায়ী আমল করার স্বীকৃতি জানালো। তখন আল্লাহ তাআলার আদেশ এলো, হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদেরকে যা-কিছু দান করলাম, তাকে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করো এবং তাতে যেসব আহকাম রয়েছে তা পালন করো। যেনো তোমরা পরহেযগার ও মুত্তাকি হতে পারো।
কিন্তু আফসোস! বনি ইসরাইলের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি সাময়িক ছিলো বলে প্রতীয়মান হলো এবং তারা অধিককাল তার ওপর কর্মশীল থাকতে পারলো না। তাদের চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী পুনরায় বিরোধিতা শুরু করে দিলো। কুরআন মাজিদ এই ঘটনাগুলোকে খুবই সংক্ষেপে কিন্তু পরিষ্কার ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছে-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ) ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَكُنتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ (سورة البقرة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পাহাড়কে ২২১ তোমাদের ওপর উত্তোলন করেছিলাম'২২২; বলেছিলাম, "আমি যা দিলাম দৃঢ়তার সঙ্গে তা গ্রহণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ রাখো, যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পারো।" এর পরেই তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে! আল্লাহর অনুগ্রহ এবং অনুকম্পা তোমাদের প্রতি না থাকলে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬৩-৬৪]
وَإِذْ نَتَفْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ كَأَنَّهُ ظُلَّةٌ وَظَنُّوا أَنَّهُ وَاقِعٌ بِهِمْ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (سورة الأعراف)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন আমি পর্বতকে তাদের উপরে উত্তোলন করি, আর তা ছিলো যেনো এক চন্দ্রাতপ (শামিয়ানা)। তারা মনে করলো যে, তা তাদের ওপর পড়ে যাবে। বললাম, "আমি যা দিলাম তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ করো। যাতে তোমরা মুত্তাকি (তাওয়ার অধিকারী) হও।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৭১]
এসব আয়াতে পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, বনি ইসরাইলগণ যখন তাওরাতকে গ্রহণ করতে ইতস্তত করলো, বরং অস্বীকারই করে বসলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের মাথার ওপর তুর পাহাড়কে তুলে ধরলেন এবং এভাবে আল্লাহর প্রত্যক্ষ নিদর্শন দেখিয়ে তাদেরকে তাওরাত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করলেন। সুতরাং আয়াতগুলোর পরিষ্কার ও স্পষ্ট অর্থকে মনগড়া ব্যাখ্যার দিকে টেনে নেয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। যেমন: সমসাময়িক যুগের কোনো কোনো মুফাস্সির এমন ব্যাখ্যা করেছেন।
কোনো পাহাড় সমূলে উৎপাটিত হয়ে শূন্যস্থানে ঝুলে থাকা জ্ঞানের দিক থেকেও অসম্ভব নয় এবং আল্লাহ তাআলার কুদরতের বিধানেরও বিরোধী নয়। অবশ্য অসাধারণ ও অস্বাভাবিক ব্যাপার নিশ্চয়ই। এ-কারণে আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শন হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু অপব্যাখ্যাকারীরা বলে, رفع শব্দের অর্থ শুধু উঁচু করা। মাথার ওপর তুলে ধরা নয়। আর একইভাবে نتَق শব্দের অর্থ হয় যেমন সমূলে উৎপাটন করা, তেমনি কম্পিত হওয়ার অর্থও হয় এবং ভীষণভাবে নাড়াচাড়া করার অর্থও হয়। সুতরাং সুরা আ'রাফের আয়াতটির অর্থ এই হয় যে, আর যখন আমি তাদের ওপর পাহাড়কে কম্পিত করলাম, যেনো তা শামিয়ানা, (যা বায়ুর ঝাপটায়) নড়ছে, আর তারা (ভীষণ) ভয়ে মনে করছিলো যে, পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে পতিত হবে....। ১২৩
কিন্তু এসব লোক এই সত্যকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে বসেছেন যে, رفع এবং نتق শব্দ দুটির যদিও কয়েকটি অর্থ রয়েছে, কিন্তু আরবি ভাষার নিয়ম অনুসারে এখানে যে-সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে, সে-অনুসারেই অর্থ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত, কুরআন মাজিদের এক অংশ অপর অংশের ব্যাখ্যা করে থাকে। সুতরাং কোনো শব্দের অর্থ থেকে সে-অর্থই গ্রহণ করতে হবে যা অন্য আয়াতের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়।
অতএব, সুরা বাকারা وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّور আয়াত رفع (উত্তোলন করা) এবং فَوْق (উপরে) শব্দ দুটিকে যখন সুরা আ'রাফের وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ আয়াতে نتق (সমূলে উৎপাটিত করা)-এর সঙ্গে মেলানো হবে, তখন কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোর স্পষ্ট ও পরিষ্কার অর্থ এটাই হবে যে, তুর পাহাড়কে স্থানচ্যুত করে বনি ইসরাইলিদের মাথার ওপর এমনভাবে ধরা হয়েছিলো যেনো তা একটি শামিয়ানা যা শিগগিরই তাদের ওপর পতিত হবে। তা ছাড়া رفع-এর সঙ্গে فوق শব্দটি নিয়ে আসাই এই তাফসির বিশুদ্ধ হওয়ার শক্তিশালী প্রমাণ যা জমহুর মুফাস্সিরগণ করেছেন। তার বিপরীতে সমসাময়িক মুফাস্সিরগণের কৃত তাফসির পরিষ্কার বলছে যে, এই অর্থটি কুরআন মাজিদের মূল বক্তব্যের বিপরীতে টেনে-হিঁচড়ে করা হয়েছে।
এখানে এমন সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, এই দুটি আয়াত দ্বারা বুঝা যায় তাওরাতের বিধান অনুযায়ী আমল করার জন্য বনি ইসরাইলের ওপর জবরদস্তি ও বল প্রয়োগ করা হয়েছিলো। অথচ ধর্মে বল প্রয়োগ ও জবরদস্তি বৈধ নয়। কিন্তু কুরআন মাজিদের পূর্বের ও পরের আয়াতগুলোর প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করলে ঘটনাগুলোর অবস্থা আমরা যেমন বর্ণনা করেছি, তেমন অবস্থায় এমন সন্দেহ উৎপন্ন হতে পারে না। অবশ্য জমহুর মুফাস্সিরগণ এবং আধুনিক যুগের মুফাস্সিরগণের তাফসির থেকে এমন সন্দেহের উৎপাদন হয়।
তবে মুফতি মুহাম্মদ আবদুহু তার তাফসিরে এর উত্তম জবাব প্রদান করেছেন। তার সারমর্ম এই: আসলে তা জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের ব্যাপারই ছিলো না; বরং আল্লাহ তাআলার কুদরতের শেষ নিদর্শন প্রকাশ করা হয়েছিলো এবং তা করা হয়েছিলো তাদের পথপ্রদর্শন ও হেদায়েতকে শক্তিশালী ও দৃঢ় করার জন্য। আর এ-কারণে এই ঘটনা প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণের পরে ঘটেছিলো। কুরআন মাজিদের আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে এটাই বুঝা যায়।

টিকাঃ
¹²¹ সিনাই এলাকায় অবস্থিত তুর পাহাড়, যেখানে হযরত মুসা আ. আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন।
¹²² হযরত মুসা আ.-এর উম্মতগণ একটি ধর্মবিধান চেয়েছিলো। তাওরাতের বিধান অবতীর্ণ হলে তারা তা মানতে অস্বীকার করে। তখন তাদের মাথার ওপর পাহাড় উত্তোলন করে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ভয় দেখালে তারা তা গ্রহণ করে।
¹²³ তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১।

যাইহোক। সত্তর জন ব্যক্তি পুনরায় জীবিত হয়ে তাদের কওমের কাছে ফিরে এলো। তারা কওমের কাছে বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরলো এবং বললো, মুসা আ. যা বলছেন তা সত্য। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।
তখন সুস্থ প্রকৃতির চাহিদা তো ছিলো এই, এসব ঘটনা শুনে তাদের আল্লাহপাকের শোকর আদায় করা এবং তাঁর অনুগ্রহ ও দানের প্রাচুর্যের প্রতি লক্ষ করে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও দাসত্বের স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে অবনত মস্তকে তাঁর যাবতীয় নির্দেশ মেনে নেয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে অবস্থা এই হলো যে, তাদের বক্রতার ওপরই অটল থাকলো এবং তাদের নেতৃবৃন্দের সত্যায়ন সত্ত্বেও তাওরাতকে মেনে নিতে বিরোধিতামূলক ইতস্তত ভাব প্রকাশ করতে শুরু করে দিলো। তারা হযরত মুসা আ.-এর কথার প্রতি কর্ণপাত করলো না।
হযরত মুসা আ. তাদের এই অবস্থা দেখে আল্লাহর দরবারে রুজু হয়ে কওমের বিপথে চলার অভিযোগ পেশ করলেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো, এসব নাফরমানদের জন্য আমি তোমাকে আরো একটি দলিল (মুজেযা) প্রদান করছি। তা এই যে-পাহাড়ের ওপর তুমি আমার সঙ্গে কথোপকথন করো, যে-পাহাড়ের ওপর তোমার কওমের মনোনীত নেতৃবৃন্দ সত্যকে দর্শন করেছে, সে-পাহাড়কেই নির্দেশ দিচ্ছি-তা যেনো তার স্থান থেকে সরে গিয়ে বনি ইসরাইলের মাথার ওপর শামিয়ানার মতো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে এবং তার অবস্থানগত ভাষায় ঘোষণা করে যে, মুসা আ. আল্লাহ তাআলার যথার্থ নবী। নিঃসন্দেহে তাওরাত আল্লাহ তাআলার সত্য কিতাব। যদি মুসা আ. আল্লাহর সত্য নবী এবং তাওরাত সত্য কিতাব না হতো তবে তোমরা এই মুজেযা দেখতে পেতে না। এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরত ব্যতীত অন্যকোনো প্রকারেই সম্ভব ছিলো না।
বস্তুত, যখনই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তৎক্ষণাৎ তুর পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে স্থির হয়ে গেলো এবং তা শামিয়ানার মতো দেখা যেতে লাগলো। এই অবস্থানগত ভাষায় পাহাড়টি বলতে লাগলো, হে বনি ইসরাইল, যদি তোমাদের বিবেক ও বুদ্ধি বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে এবং সত্য ও মিথ্যাকে পার্থক্য করার জ্ঞান থাকে, তবে সত্য শ্রবণকারী কানের দ্বারা শোনো, আমি আল্লাহ তাআলার নিদর্শন হয়ে তোমাদেরকে বিশ্বাস প্রদান করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুসা আ. আমার পিঠে আরোহণ করে কয়েকবার আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথনের সম্মান লাভ করেছেন এবং তোমাদের সৎপথ ও হেদায়েত লাভের বিধান (তাওরাত)-ও তাঁকে প্রদান করা হয়েছে আমার পৃষ্ঠদেশের ওপর। আর হে উদাসীনতা ও অবাধ্যতায় মত্ত মানুষের দল, আমার এই অবস্থান-যা তোমাদের জন্য বিস্ময়কর হয়ে আছে-তোমাদের এই বিষয়ের সাক্ষ্য যে, যখন মানুষের বক্ষের মধ্যস্থলে অন্তরের কোমলতা কঠোরতায় রূপান্তরিত হয়ে যায় তখন তা এক খণ্ড পাথর বা তার চেয়েও কঠিন হয়ে যায় এবং কোনো দিক থেকেই তার ভেতরে হেদায়েত ও নসিহত প্রবেশ করতে পারে না। দেখো, আমি পাথরখণ্ডের সমষ্টি পাহাড়; কিন্তু আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে আনুগত্যের মস্তক অবনত করে কেমনভাবে দাসত্ব প্রদর্শন করছি। কিন্তু তোমরা তোমাদের আমিত্বের অহঙ্কারে কোনো অবস্থাতেই 'না'কে 'হ্যাঁ' দ্বারা বদল করতে প্রস্তুত নও।
কুরআন মাজিদ এই সত্যই প্রকাশ করছে-
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً
'এর পরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেলো, তা পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৪]
বনি ইসরাইল যখন এই নিদর্শন দেখলো-এটাকে সাময়িক ভয়ের কারণই মনে করুন বা উপস্থিত জনসমাবেশের সামনে আল্লাহ তাআলার মহান নিদর্শনের ফলই বিশ্বাস করুন-তারা তাওরাতের দিকে ঝুঁকে পড়লো এবং হযরত মুসা আ.-এর সামনে তাওরাতের আহকাম অনুযায়ী আমল করার স্বীকৃতি জানালো। তখন আল্লাহ তাআলার আদেশ এলো, হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদেরকে যা-কিছু দান করলাম, তাকে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করো এবং তাতে যেসব আহকাম রয়েছে তা পালন করো। যেনো তোমরা পরহেযগার ও মুত্তাকি হতে পারো।
কিন্তু আফসোস! বনি ইসরাইলের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি সাময়িক ছিলো বলে প্রতীয়মান হলো এবং তারা অধিককাল তার ওপর কর্মশীল থাকতে পারলো না। তাদের চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী পুনরায় বিরোধিতা শুরু করে দিলো। কুরআন মাজিদ এই ঘটনাগুলোকে খুবই সংক্ষেপে কিন্তু পরিষ্কার ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছে-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ) ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَكُنتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ (سورة البقرة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পাহাড়কে ২২১ তোমাদের ওপর উত্তোলন করেছিলাম'২২২; বলেছিলাম, "আমি যা দিলাম দৃঢ়তার সঙ্গে তা গ্রহণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ রাখো, যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পারো।" এর পরেই তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে! আল্লাহর অনুগ্রহ এবং অনুকম্পা তোমাদের প্রতি না থাকলে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬৩-৬৪]
وَإِذْ نَتَفْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ كَأَنَّهُ ظُلَّةٌ وَظَنُّوا أَنَّهُ وَاقِعٌ بِهِمْ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (سورة الأعراف)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন আমি পর্বতকে তাদের উপরে উত্তোলন করি, আর তা ছিলো যেনো এক চন্দ্রাতপ (শামিয়ানা)। তারা মনে করলো যে, তা তাদের ওপর পড়ে যাবে। বললাম, "আমি যা দিলাম তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ করো। যাতে তোমরা মুত্তাকি (তাওয়ার অধিকারী) হও।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৭১]
এসব আয়াতে পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, বনি ইসরাইলগণ যখন তাওরাতকে গ্রহণ করতে ইতস্তত করলো, বরং অস্বীকারই করে বসলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের মাথার ওপর তুর পাহাড়কে তুলে ধরলেন এবং এভাবে আল্লাহর প্রত্যক্ষ নিদর্শন দেখিয়ে তাদেরকে তাওরাত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করলেন। সুতরাং আয়াতগুলোর পরিষ্কার ও স্পষ্ট অর্থকে মনগড়া ব্যাখ্যার দিকে টেনে নেয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। যেমন: সমসাময়িক যুগের কোনো কোনো মুফাস্সির এমন ব্যাখ্যা করেছেন।
কোনো পাহাড় সমূলে উৎপাটিত হয়ে শূন্যস্থানে ঝুলে থাকা জ্ঞানের দিক থেকেও অসম্ভব নয় এবং আল্লাহ তাআলার কুদরতের বিধানেরও বিরোধী নয়। অবশ্য অসাধারণ ও অস্বাভাবিক ব্যাপার নিশ্চয়ই। এ-কারণে আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শন হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু অপব্যাখ্যাকারীরা বলে, رفع শব্দের অর্থ শুধু উঁচু করা। মাথার ওপর তুলে ধরা নয়। আর একইভাবে نتَق শব্দের অর্থ হয় যেমন সমূলে উৎপাটন করা, তেমনি কম্পিত হওয়ার অর্থও হয় এবং ভীষণভাবে নাড়াচাড়া করার অর্থও হয়। সুতরাং সুরা আ'রাফের আয়াতটির অর্থ এই হয় যে, আর যখন আমি তাদের ওপর পাহাড়কে কম্পিত করলাম, যেনো তা শামিয়ানা, (যা বায়ুর ঝাপটায়) নড়ছে, আর তারা (ভীষণ) ভয়ে মনে করছিলো যে, পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে পতিত হবে....। ১২৩
কিন্তু এসব লোক এই সত্যকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে বসেছেন যে, رفع এবং نتق শব্দ দুটির যদিও কয়েকটি অর্থ রয়েছে, কিন্তু আরবি ভাষার নিয়ম অনুসারে এখানে যে-সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে, সে-অনুসারেই অর্থ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত, কুরআন মাজিদের এক অংশ অপর অংশের ব্যাখ্যা করে থাকে। সুতরাং কোনো শব্দের অর্থ থেকে সে-অর্থই গ্রহণ করতে হবে যা অন্য আয়াতের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়।
অতএব, সুরা বাকারা وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّور আয়াত رفع (উত্তোলন করা) এবং فَوْق (উপরে) শব্দ দুটিকে যখন সুরা আ'রাফের وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ আয়াতে نتق (সমূলে উৎপাটিত করা)-এর সঙ্গে মেলানো হবে, তখন কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোর স্পষ্ট ও পরিষ্কার অর্থ এটাই হবে যে, তুর পাহাড়কে স্থানচ্যুত করে বনি ইসরাইলিদের মাথার ওপর এমনভাবে ধরা হয়েছিলো যেনো তা একটি শামিয়ানা যা শিগগিরই তাদের ওপর পতিত হবে। তা ছাড়া رفع-এর সঙ্গে فوق শব্দটি নিয়ে আসাই এই তাফসির বিশুদ্ধ হওয়ার শক্তিশালী প্রমাণ যা জমহুর মুফাস্সিরগণ করেছেন। তার বিপরীতে সমসাময়িক মুফাস্সিরগণের কৃত তাফসির পরিষ্কার বলছে যে, এই অর্থটি কুরআন মাজিদের মূল বক্তব্যের বিপরীতে টেনে-হিঁচড়ে করা হয়েছে।
এখানে এমন সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, এই দুটি আয়াত দ্বারা বুঝা যায় তাওরাতের বিধান অনুযায়ী আমল করার জন্য বনি ইসরাইলের ওপর জবরদস্তি ও বল প্রয়োগ করা হয়েছিলো। অথচ ধর্মে বল প্রয়োগ ও জবরদস্তি বৈধ নয়। কিন্তু কুরআন মাজিদের পূর্বের ও পরের আয়াতগুলোর প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করলে ঘটনাগুলোর অবস্থা আমরা যেমন বর্ণনা করেছি, তেমন অবস্থায় এমন সন্দেহ উৎপন্ন হতে পারে না। অবশ্য জমহুর মুফাস্সিরগণ এবং আধুনিক যুগের মুফাস্সিরগণের তাফসির থেকে এমন সন্দেহের উৎপাদন হয়।
তবে মুফতি মুহাম্মদ আবদুহু তার তাফসিরে এর উত্তম জবাব প্রদান করেছেন। তার সারমর্ম এই: আসলে তা জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের ব্যাপারই ছিলো না; বরং আল্লাহ তাআলার কুদরতের শেষ নিদর্শন প্রকাশ করা হয়েছিলো এবং তা করা হয়েছিলো তাদের পথপ্রদর্শন ও হেদায়েতকে শক্তিশালী ও দৃঢ় করার জন্য। আর এ-কারণে এই ঘটনা প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণের পরে ঘটেছিলো। কুরআন মাজিদের আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে এটাই বুঝা যায়।

টিকাঃ
¹²¹ সিনাই এলাকায় অবস্থিত তুর পাহাড়, যেখানে হযরত মুসা আ. আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন।
¹²² হযরত মুসা আ.-এর উম্মতগণ একটি ধর্মবিধান চেয়েছিলো। তাওরাতের বিধান অবতীর্ণ হলে তারা তা মানতে অস্বীকার করে। তখন তাদের মাথার ওপর পাহাড় উত্তোলন করে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ভয় দেখালে তারা তা গ্রহণ করে।
¹²³ তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মুজেযার আধিক্য

📄 মুজেযার আধিক্য


এখানে এ-কথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, পেছনের পাতাতেও এ-কথা উত্তমরূপে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, কয়েক শতাব্দীব্যাপী দাসত্বের জীবনযাপন এবং নীচু ধরনের সেবায় নিযুক্ত থাকার কারণে বনি ইসরাইলের উন্নত মানের স্বভাব ও গুণাবলিও লুপ্ত হয়েছিলো। মূর্তি পূজক মিসরীয়দের মধ্যে বসবাস করার ফলে বহুবাদ ও মূর্তি পূজা তাদের জ্ঞান ও বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলোকে এমন পর্যায়ে অকর্মণ্য করে দিয়েছিলো যে, তারা পদে পদে আল্লাহ তাআলার একত্বের প্রতি বিশ্বাস এবং তাঁর নির্দেশাবলি পালনে মুজেযার অপেক্ষা করতো। এ-ছাড়া তাদের হৃদয়ে বিশ্বাস ও একিনের কোনো স্থানই হতো না। তাদের হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য দুটি উপায় হতে পারতো : একটি এই যে, বিভিন্ন প্রকারে তাদেরকে বুঝিয়ে সত্য গ্রহণ করার জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রাচীনকালের আযিযদের কেরামতের মতো শুধু কোনো বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মুজেযা প্রদর্শন করা। দ্বিতীয় উপায় হলো এই : কয়েক শতাব্দীর উপর অবস্থাকে সংশোধন করার জন্য তাঁবু উড়িয়ে করে আধ্যাত্মিক শক্তি প্রকাশ করা এবং সত্য ও সততার দীক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শনসমূহ (মুজেযা) বার বার প্রকাশ করা, যা তাদের সত্য গ্রহণের যোগ্যতাকে শক্তিশালী করে। ফলে, বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের হীনম্মন্যতা ও নষ্ট হয়ে অবস্থার প্রতি লক্ষ করে তাদের সংশোধন ও শিক্ষার জন্য আল্লাহ তাআলার হেকমত ও মুসলেহত (প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা) এই দ্বিতীয় উপায়টিই অবলম্বন করেছে।
وَاللهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ‘আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’
যাইহোক। এই ঘটনা তাওরাতে বর্ণিত হয়েছে এবং তাতে তুর পর্বত সম্পর্কে তা-ই বলা হয়েছে যা আমাদের আধুনিক যুগের মুফাসসিরগণ আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন।

এখানে এ-কথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, পেছনের পাতাতেও এ-কথা উত্তমরূপে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, কয়েক শতাব্দীব্যাপী দাসত্বের জীবনযাপন এবং নীচু ধরনের সেবায় নিযুক্ত থাকার কারণে বনি ইসরাইলের উন্নত মানের স্বভাব ও গুণাবলিও লুপ্ত হয়েছিলো। মূর্তি পূজক মিসরীয়দের মধ্যে বসবাস করার ফলে বহুবাদ ও মূর্তি পূজা তাদের জ্ঞান ও বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলোকে এমন পর্যায়ে অকর্মণ্য করে দিয়েছিলো যে, তারা পদে পদে আল্লাহ তাআলার একত্বের প্রতি বিশ্বাস এবং তাঁর নির্দেশাবলি পালনে মুজেযার অপেক্ষা করতো। এ-ছাড়া তাদের হৃদয়ে বিশ্বাস ও একিনের কোনো স্থানই হতো না। তাদের হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য দুটি উপায় হতে পারতো : একটি এই যে, বিভিন্ন প্রকারে তাদেরকে বুঝিয়ে সত্য গ্রহণ করার জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রাচীনকালের আযিযদের কেরামতের মতো শুধু কোনো বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মুজেযা প্রদর্শন করা। দ্বিতীয় উপায় হলো এই : কয়েক শতাব্দীর উপর অবস্থাকে সংশোধন করার জন্য তাঁবু উড়িয়ে করে আধ্যাত্মিক শক্তি প্রকাশ করা এবং সত্য ও সততার দীক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শনসমূহ (মুজেযা) বার বার প্রকাশ করা, যা তাদের সত্য গ্রহণের যোগ্যতাকে শক্তিশালী করে। ফলে, বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের হীনম্মন্যতা ও নষ্ট হয়ে অবস্থার প্রতি লক্ষ করে তাদের সংশোধন ও শিক্ষার জন্য আল্লাহ তাআলার হেকমত ও মুসলেহত (প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতা) এই দ্বিতীয় উপায়টিই অবলম্বন করেছে।
وَاللهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ‘আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’
যাইহোক। এই ঘটনা তাওরাতে বর্ণিত হয়েছে এবং তাতে তুর পর্বত সম্পর্কে তা-ই বলা হয়েছে যা আমাদের আধুনিক যুগের মুফাসসিরগণ আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 পবিত্র ভূমির প্রতিশ্রুতি ও বনি ইসরাইল

📄 পবিত্র ভূমির প্রতিশ্রুতি ও বনি ইসরাইল


তাওরাতে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
“তৃতীয় দিন এলে ভোর থেকেই মেঘের গর্জন ও বিদ্যুতের চমক শুরু হয়ে গেলো এবং কালো বর্ণের মেঘ এসে তুর পাহাড়কে আচ্ছন্ন করে ফেললো। শিঙার আওয়াজ অত্যন্ত উচ্চ হয়ে উঠলো। সব মানুষ তাদের নিজ নিজ বাসস্থানে কেঁপে উঠলো। মুসা আ. সব লোককে তাঁবু থেকে বাইরে নিয়ে এলেন এই উদ্দেশ্যে যে, তাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে মেলাবেন। হযরত মুসা আ. পাহাড় থেকে নিচে নেমে দাঁড়ালেন। সাইনা পর্বত উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। কেননা, আল্লাহ তাআলা জ্যোতিতে আবৃতি হয়ে তাতে অবতরণ করলেন আর ধোঁয়া তন্দুরের ধোঁয়ার মতো উপরের দিকে উঠছিলো। গোটা পাহাড় প্রবল বেগে নড়ছিলো। হযরত মুসা আ. নিচে নেমে লোকদের কাছে গেলেন এবং এই কথাগুলো তাদেরকে বললেন।”¹²⁴
তখন সাইনার যে-প্রান্তরে বনি ইসরাইল অবস্থান করছিলো তা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডের নিকটবর্তী ছিলো। বনি ইসরাইলের পূর্বপুরুষ হযরত ইবরাহিম আ., হযরত ইসহাক আ. এবং হযরত ইয়াকুব আ.-এর সঙ্গে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ছিলো যে, তাঁদের বংশধরগণকে পুনরায় ওই ভূখণ্ডের মালিক বানিয়ে দেবেন এবং তারা ওখানেই বৃদ্ধি ও বিস্তার লাভ করবে। এ-কারণে হযরত মুসা আ.-এর মারফতে আল্লাহপাকের আদেশ হলো, “তাদেরকে বলো, তারা যেনো পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করে এবং ওখানকার অত্যাচারী ও উৎপীড়ক শাসকদেরকে বের করে দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফের সঙ্গে জীবনযাপন করতে থাকে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, জয় অবশই তোমাদেরই হবে। আর তোমাদের অত্যাচারী শত্রু পরাভূত হবে।”
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করার জন্য প্রস্তুত করার পূর্বে বারোজন ব্যক্তিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠালেন। তারা ফিলিস্তিনের নিকটবর্তী ‘আরিহা’ শহরে প্রবেশ করে সব অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। ফিরে এসে তারা হযরত মুসা আ.-কে বললো, 'ওখানকার অধিবাসীরা অত্যন্ত বিশাল দেহী, শক্তিশালী ও দুর্দান্ত।'
হযরত মুসা আ. তাদেরকে বললেন, তোমরা তাদের সম্পর্কে আমাকে যেসব কথা বললে কওমের কাছে সেসব কথা বলো না। এইজন্য যে, দীর্ঘদিনের দাসত্বের জীবন তাদেরকে সাহসশূন্য করে দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে বীরত্ব, আত্মমর্যাদাবোধ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার জায়গায় কাপুরুষতা, নীচাশয়তা ও সাহসহীনতা এসে স্থান করে নিয়েছে।" কিন্তু এই বারোজনও তো সেই বনি ইসরাইলেরই লোক ছিলো; তারা হযরত মুসা আ.-এর কথা মানলো না এবং চুপে চুপে কওমের কাছে শত্রুদের ক্ষমতা ও শক্তির কথা খুব বাড়িয়ে ও অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করলো।
অবশ্য কেবল দুইজন-ইউশা বিন নুন (يوشع بن نون ) ও কালিব বিন ইউকান্নাহ (كالب بن يوقنا( -হযরত মুসা আ.-এর আদেশ যথার্থভাবে পালন করলেন। তাঁরা বনি ইসরাইলের কাছে এমন কোনো কথা বললেন না যাতে তাদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে।
তখন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে বললেন, তোমরা এই জনপদে (আরিহায়) প্রবেশ করো এবং শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করে তা দখল করো। আল্লাহ তাআলা তোমাদের সঙ্গে রয়েছেন।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বিবৃত হয়েছে এভাবে-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا وَآتَاكُمْ مَا لَمْ يُؤْتِ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ () يَا قَوْمِ ادْخُلُوا الْأَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ الَّتِي كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَرْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ (سورة المائدة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো যখন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে নবী করেছিলেন এবং তোমাদেরকে রাজ্যের অধিপতি করেছিলেন এবং বিশ্বজগতে কাউকে যা দেন নি তা তোমাদেরকে দিয়েছিলেন। হে আমার সম্প্রদায়, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে-পবিত্র ভূমি¹²⁵ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাতে তোমরা প্রবেশ করো এবং পশ্চাদপসরণ করো না, করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২০-২১]
বনি ইসরাইল এই কথা শুনে বললো, হে মুসা, ওখানে তো এক জালিম ও দুর্দান্ত সম্প্রদায় বসবাস করছে। তারা ওই জনপদ থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা তাতে প্রবেশ করবো না। আফসোস, নির্বোধ হতভাগারা এ-কথা চিন্তা করলো না যে, আমরা যতক্ষণ না সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে তাদেরকে ওখান থেকে বের করবো, তার আগ পর্যন্ত তারা ওখান থেকে কেনো বের হবে?
কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
قَالُوا يَا مُوسَى إِنَّ فِيهَا قَوْمًا جَبَّارِينَ وَإِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا حَتَّى يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنَّا دَاخِلُونَ (سورة المائدة)
'তারা বললো, “হে মুসা, সেখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় (আমালিকা গোষ্ঠী) রয়েছে এবং তারা ওই স্থান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখোনই ওখানে কিছুতেই প্রবেশ করবো না; তারা ওই স্থান থেকে বের হয়ে গেলেই আমার প্রবেশ করবো।”' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২২]
তাদের অবস্থা দেখে ইউশা ও কালিব কওমকে উৎসাহ ও সাহস প্রদান করে বললেন, শহরের ফটক অতিক্রম করা কোনো কঠিন কাজ নয়। এগিয়ে যাও এবং তাদের মোকাবিলা করো। আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে, তোমরাই বিজয়ী হবে।
এ-ব্যাপারে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
قَالَ رَجُلَانِ مِنَ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غَالِبُونَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (سورة المائدة)
'যারা ভয় করছিলো তাদের মধ্য থেকে দুইজন—যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন—বললো, "তোমরা তাদের মোকাবিলা করে দ্বারে প্রবেশ করো, প্রবেশ করলেই তোমরা জয়ী হবে এবং তোমরা মুমিন হলে আল্লাহ তাআলার ওপরই নির্ভর করো।"' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২৩]
কিন্তু বনি ইসরাইলের ওপর এ-কথারও কোনো ক্রিয়া হলো না। তারা আগের মতোই নিজেদের অস্বীকৃতির ওপরই গোঁ ধরে থাকলো। আর যখন হযরত মুসা আ. খুব জোর দিয়ে বললেন, তখন তারা নিজেদের অস্বীকৃতির ওপর হঠকারিতা করে বললে লাগলো-
قَالُوا يَا مُوسَى إِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا أَبَدًا مَا دَامُوا فِيهَا فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِنَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ (سورة المائدة)
'তারা বললো, “হে মুসা, তারা যতদিন ওখানে থাকবে ততদিন আমরা ওখানে প্রবেশ করবোই না; সুতরাং তুমি এবং তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ করো, আমরা এখানেই বসে থাকবো। (বসে বসে তামাশা দেখবো।)'' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২৪]
হযরত মুসা আ. তাদের এই নিকৃষ্ট ও অনর্থক জবাব শুনে অত্যন্ত মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন হলেন। চরম মনঃকষ্ট ও বিরক্তির সঙ্গে আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, হে আল্লাহ, আমার নিজের ও হারুনের ওপর ব্যতীত আমার আর কারো ওপর ক্ষমতা নেই। সুতরাং আমরা দুইজন উপস্থিত আছি। আপনি এখন আমাদের মধ্যে এবং এই নাফরমান কওমের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিন। তারা খুবই অপদার্থ। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর ওপর ওহি নাযিল করলেন, "দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। তাদের নাফরমানি ও অবাধ্যতার কোনো দায়িত্বই তোমার ওপর নেই। এখন আমি তাদের জন্য এই শাস্তি নিধারণ করে দিলাম যে, তারা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এই প্রান্তরেই ঘুরে বেড়াবে। তাদের ভাগ্যে কখনো পবিত্র ভূখণ্ডে প্রবেশ করা হবে না। পবিত্র ভূখণ্ডকে আমি তাদের জন্য হারাম করে দিলাম।"
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقَ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ () قَالَ فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ سَنَةً يَتِيهُونَ فِي الْأَرْضِ فَلَا تَأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ (سورة المائدة)
'মুসা বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমার ও আমার ভাই ব্যতীত আর কারো ওপর আমার আধিপত্য নেই। সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করে দাও।" আল্লাহ বললেন, তবে তা চল্লিশ বছর তাদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো, তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। সুতরাং তুমি সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করো না।” [সূরা মায়েদা: আয়াত ২৬-২৬]
সাইয়্যিদ্‌না আজ্‌রকে তীহ (তীহ্) বলা হয় এ-কারণে যে, কুরআন মাজিদ্‌ বনি ইসরাইলের উদ্দেশ্যে বলেছে—تِيْهُوْنَ فِي الْأَرْضِ (তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে।) কোনো ব্যক্তি পথ ভুলে এদিক সেদিক ঘুরতে থাকলে আরবি ভাষায় বলা হয়— تاه فلان (অমুক ব্যক্তি পথ ভুলে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে।) সুতরাং তীহ শব্দের অর্থ বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ানো।
তাওরাতে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়নি। তারপর গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪-এ পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে বনি ইসরাইলের অস্বীকৃতি, তার কারণে হজরত মুসা আ.-এর অসন্তোষ, তারপর চল্লিশ বছর পর্যন্ত পবিত্র ভূমিতে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাওরাতে এটাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌র আ’আলার আদেশ লঙ্ঘন করেছিলো এবং পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো। তাদের পরে নতুন বংশধরদের জন্য প্রবেশের অনুমতি হবে। তারা কালিব ও ইউশার নেতৃত্বে শত্রুদলকে পর্যুদস্ত করে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করবে। তা ছাড়া ততদিন হজরত মুসা আ. ও হজরত হারুন আ. ইন্তেকাল করবেন।
তাওরাতের বর্ণনা নিম্নরূপ :
“এরপর আল্লাহ্‌ তা’আলা মুসা ও হারুন আ.-কে সম্বোধন করে বললেন, এই নিকৃষ্ট জাতির মোকাবিলায়—যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে—আমি আর কতদিন ধৈর্য ধারণ করবো? বনি ইসরাইল আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করেছে আমি তাদের অভিযোগসমূহ শ্রবণ করেছি। তাদেরকে বলো, আল্লাহ্‌পাক বললেন, “আমার জীবনের কসম, তোমরা আমাকে যেমন শুনিয়ে বলেছো, আমি তোমাদের সঙ্গে তেমনই করবো। তোমাদের এবং ওইসব লোকের যাদেরকে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে তাদের মধ্যে রয়েছে বিশ থেকে ততোর্ধ্ব বয়সের লোক, যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে—সকলে মৃতদেহে এই প্রান্তরেই পতিত হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে, তোমরা সেই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার সম্পর্কে আমি কসম খেয়েছিলাম যে, তোমাদেরকে ওখানে বসবাস করতে দেবো। অতএব, আলফিনার পুত্র কালিব ও নুনের পুত্র ইয়াশু এবং তোমাদের পুত্রদেরকে—যাদের সম্পর্কে তোমরা বলছো যে তারা লুণ্ঠিত হবে—আমি পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করাবো। যে-ভূমির মর্যাদাকে তোমরা হীন মনে করছো, তারা তার মর্যাদা বুঝবে। আর তোমাদের লাশ এই প্রান্তরেই পতিত থাকবে। আর তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ বছর পর্যন্ত এই ময়দানে ইতস্তত ঘুরে বেড়াবে, যতক্ষণ না তোমাদের মৃতদেহসমূহ এই প্রান্তরে হেজেমজে যায়। ওই দিনগুলো—যাতে তোমরা পবিত্র ভূমির অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকবে—সংখ্যা অনুসারে হবে চল্লিশ দিন। আর এক-এক দিনের পরিমাণ হবে এক-এক বছর। সুতরাং তোমরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত তোমাদের পাপের বোঝা বহন করতে থাকবে। তখন তোমরা আমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের ফল জানতে পারবে।"¹²⁶
এখানে এ-ধরনের সন্দেহ করা উচিত নয় যে, হযরত মুসা ও হারুন আ.-কেও এই প্রান্তরে থাকতে হলো এবং তাঁরাও পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারলেন না। কেননা, বনি ইসরাইলের এই গোটা কাফেলার ওপর পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। সুতরাং, তখন অবশ্য কর্তব্য ছিলো তাদের নসিহত ও হেদায়েতের জন্য আল্লাহর নবী তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা, যাতে এই বৃদ্ধেরাও আল্লাহর পথে প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর নতুন বংশধরদের মধ্যে সেই যোগ্যতাও সৃষ্টি হয় যার ফলে তারা পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করে আল্লাহর আদেশ পালন করতে পারে।

টিকাঃ
¹²⁴ নিষ্ক্রমণ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৯, আয়াত ১৫-১৬।
¹²⁵ পবিত্র ভূমি অর্থাৎ, তৎকালীন শাম (বর্তমানে সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের কিছু অংশ)।
¹²⁶ তাওরাত: গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ২৬-৩০

তাওরাতে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
“তৃতীয় দিন এলে ভোর থেকেই মেঘের গর্জন ও বিদ্যুতের চমক শুরু হয়ে গেলো এবং কালো বর্ণের মেঘ এসে তুর পাহাড়কে আচ্ছন্ন করে ফেললো। শিঙার আওয়াজ অত্যন্ত উচ্চ হয়ে উঠলো। সব মানুষ তাদের নিজ নিজ বাসস্থানে কেঁপে উঠলো। মুসা আ. সব লোককে তাঁবু থেকে বাইরে নিয়ে এলেন এই উদ্দেশ্যে যে, তাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে মেলাবেন। হযরত মুসা আ. পাহাড় থেকে নিচে নেমে দাঁড়ালেন। সাইনা পর্বত উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। কেননা, আল্লাহ তাআলা জ্যোতিতে আবৃতি হয়ে তাতে অবতরণ করলেন আর ধোঁয়া তন্দুরের ধোঁয়ার মতো উপরের দিকে উঠছিলো। গোটা পাহাড় প্রবল বেগে নড়ছিলো। হযরত মুসা আ. নিচে নেমে লোকদের কাছে গেলেন এবং এই কথাগুলো তাদেরকে বললেন।”¹²⁴
তখন সাইনার যে-প্রান্তরে বনি ইসরাইল অবস্থান করছিলো তা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডের নিকটবর্তী ছিলো। বনি ইসরাইলের পূর্বপুরুষ হযরত ইবরাহিম আ., হযরত ইসহাক আ. এবং হযরত ইয়াকুব আ.-এর সঙ্গে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ছিলো যে, তাঁদের বংশধরগণকে পুনরায় ওই ভূখণ্ডের মালিক বানিয়ে দেবেন এবং তারা ওখানেই বৃদ্ধি ও বিস্তার লাভ করবে। এ-কারণে হযরত মুসা আ.-এর মারফতে আল্লাহপাকের আদেশ হলো, “তাদেরকে বলো, তারা যেনো পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করে এবং ওখানকার অত্যাচারী ও উৎপীড়ক শাসকদেরকে বের করে দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফের সঙ্গে জীবনযাপন করতে থাকে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, জয় অবশই তোমাদেরই হবে। আর তোমাদের অত্যাচারী শত্রু পরাভূত হবে।”
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করার জন্য প্রস্তুত করার পূর্বে বারোজন ব্যক্তিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠালেন। তারা ফিলিস্তিনের নিকটবর্তী ‘আরিহা’ শহরে প্রবেশ করে সব অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। ফিরে এসে তারা হযরত মুসা আ.-কে বললো, 'ওখানকার অধিবাসীরা অত্যন্ত বিশাল দেহী, শক্তিশালী ও দুর্দান্ত।'
হযরত মুসা আ. তাদেরকে বললেন, তোমরা তাদের সম্পর্কে আমাকে যেসব কথা বললে কওমের কাছে সেসব কথা বলো না। এইজন্য যে, দীর্ঘদিনের দাসত্বের জীবন তাদেরকে সাহসশূন্য করে দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে বীরত্ব, আত্মমর্যাদাবোধ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার জায়গায় কাপুরুষতা, নীচাশয়তা ও সাহসহীনতা এসে স্থান করে নিয়েছে।" কিন্তু এই বারোজনও তো সেই বনি ইসরাইলেরই লোক ছিলো; তারা হযরত মুসা আ.-এর কথা মানলো না এবং চুপে চুপে কওমের কাছে শত্রুদের ক্ষমতা ও শক্তির কথা খুব বাড়িয়ে ও অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করলো।
অবশ্য কেবল দুইজন-ইউশা বিন নুন (يوشع بن نون ) ও কালিব বিন ইউকান্নাহ (كالب بن يوقنا( -হযরত মুসা আ.-এর আদেশ যথার্থভাবে পালন করলেন। তাঁরা বনি ইসরাইলের কাছে এমন কোনো কথা বললেন না যাতে তাদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে।
তখন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে বললেন, তোমরা এই জনপদে (আরিহায়) প্রবেশ করো এবং শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করে তা দখল করো। আল্লাহ তাআলা তোমাদের সঙ্গে রয়েছেন।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বিবৃত হয়েছে এভাবে-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا وَآتَاكُمْ مَا لَمْ يُؤْتِ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ () يَا قَوْمِ ادْخُلُوا الْأَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ الَّتِي كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَرْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ (سورة المائدة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো যখন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে নবী করেছিলেন এবং তোমাদেরকে রাজ্যের অধিপতি করেছিলেন এবং বিশ্বজগতে কাউকে যা দেন নি তা তোমাদেরকে দিয়েছিলেন। হে আমার সম্প্রদায়, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে-পবিত্র ভূমি¹²⁵ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাতে তোমরা প্রবেশ করো এবং পশ্চাদপসরণ করো না, করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২০-২১]
বনি ইসরাইল এই কথা শুনে বললো, হে মুসা, ওখানে তো এক জালিম ও দুর্দান্ত সম্প্রদায় বসবাস করছে। তারা ওই জনপদ থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা তাতে প্রবেশ করবো না। আফসোস, নির্বোধ হতভাগারা এ-কথা চিন্তা করলো না যে, আমরা যতক্ষণ না সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে তাদেরকে ওখান থেকে বের করবো, তার আগ পর্যন্ত তারা ওখান থেকে কেনো বের হবে?
কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
قَالُوا يَا مُوسَى إِنَّ فِيهَا قَوْمًا جَبَّارِينَ وَإِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا حَتَّى يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنَّا دَاخِلُونَ (سورة المائدة)
'তারা বললো, “হে মুসা, সেখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় (আমালিকা গোষ্ঠী) রয়েছে এবং তারা ওই স্থান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখোনই ওখানে কিছুতেই প্রবেশ করবো না; তারা ওই স্থান থেকে বের হয়ে গেলেই আমার প্রবেশ করবো।”' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২২]
তাদের অবস্থা দেখে ইউশা ও কালিব কওমকে উৎসাহ ও সাহস প্রদান করে বললেন, শহরের ফটক অতিক্রম করা কোনো কঠিন কাজ নয়। এগিয়ে যাও এবং তাদের মোকাবিলা করো। আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে, তোমরাই বিজয়ী হবে।
এ-ব্যাপারে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
قَالَ رَجُلَانِ مِنَ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غَالِبُونَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (سورة المائدة)
'যারা ভয় করছিলো তাদের মধ্য থেকে দুইজন—যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন—বললো, "তোমরা তাদের মোকাবিলা করে দ্বারে প্রবেশ করো, প্রবেশ করলেই তোমরা জয়ী হবে এবং তোমরা মুমিন হলে আল্লাহ তাআলার ওপরই নির্ভর করো।"' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২৩]
কিন্তু বনি ইসরাইলের ওপর এ-কথারও কোনো ক্রিয়া হলো না। তারা আগের মতোই নিজেদের অস্বীকৃতির ওপরই গোঁ ধরে থাকলো। আর যখন হযরত মুসা আ. খুব জোর দিয়ে বললেন, তখন তারা নিজেদের অস্বীকৃতির ওপর হঠকারিতা করে বললে লাগলো-
قَالُوا يَا مُوسَى إِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا أَبَدًا مَا دَامُوا فِيهَا فَاذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِنَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ (سورة المائدة)
'তারা বললো, “হে মুসা, তারা যতদিন ওখানে থাকবে ততদিন আমরা ওখানে প্রবেশ করবোই না; সুতরাং তুমি এবং তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ করো, আমরা এখানেই বসে থাকবো। (বসে বসে তামাশা দেখবো।)'' [সুরা মায়েদা: আয়াত ২৪]
হযরত মুসা আ. তাদের এই নিকৃষ্ট ও অনর্থক জবাব শুনে অত্যন্ত মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন হলেন। চরম মনঃকষ্ট ও বিরক্তির সঙ্গে আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, হে আল্লাহ, আমার নিজের ও হারুনের ওপর ব্যতীত আমার আর কারো ওপর ক্ষমতা নেই। সুতরাং আমরা দুইজন উপস্থিত আছি। আপনি এখন আমাদের মধ্যে এবং এই নাফরমান কওমের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিন। তারা খুবই অপদার্থ। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর ওপর ওহি নাযিল করলেন, "দুঃখিত ও চিন্তিত হয়ো না। তাদের নাফরমানি ও অবাধ্যতার কোনো দায়িত্বই তোমার ওপর নেই। এখন আমি তাদের জন্য এই শাস্তি নিধারণ করে দিলাম যে, তারা চল্লিশ বছর পর্যন্ত এই প্রান্তরেই ঘুরে বেড়াবে। তাদের ভাগ্যে কখনো পবিত্র ভূখণ্ডে প্রবেশ করা হবে না। পবিত্র ভূখণ্ডকে আমি তাদের জন্য হারাম করে দিলাম।"
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقَ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ () قَالَ فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ سَنَةً يَتِيهُونَ فِي الْأَرْضِ فَلَا تَأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ (سورة المائدة)
'মুসা বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমার ও আমার ভাই ব্যতীত আর কারো ওপর আমার আধিপত্য নেই। সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করে দাও।" আল্লাহ বললেন, তবে তা চল্লিশ বছর তাদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো, তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। সুতরাং তুমি সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করো না।” [সূরা মায়েদা: আয়াত ২৬-২৬]
সাইয়্যিদ্‌না আজ্‌রকে তীহ (তীহ্) বলা হয় এ-কারণে যে, কুরআন মাজিদ্‌ বনি ইসরাইলের উদ্দেশ্যে বলেছে—تِيْهُوْنَ فِي الْأَرْضِ (তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে।) কোনো ব্যক্তি পথ ভুলে এদিক সেদিক ঘুরতে থাকলে আরবি ভাষায় বলা হয়— تاه فلان (অমুক ব্যক্তি পথ ভুলে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে।) সুতরাং তীহ শব্দের অর্থ বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ানো।
তাওরাতে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়নি। তারপর গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪-এ পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে বনি ইসরাইলের অস্বীকৃতি, তার কারণে হজরত মুসা আ.-এর অসন্তোষ, তারপর চল্লিশ বছর পর্যন্ত পবিত্র ভূমিতে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাওরাতে এটাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌র আ’আলার আদেশ লঙ্ঘন করেছিলো এবং পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো। তাদের পরে নতুন বংশধরদের জন্য প্রবেশের অনুমতি হবে। তারা কালিব ও ইউশার নেতৃত্বে শত্রুদলকে পর্যুদস্ত করে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করবে। তা ছাড়া ততদিন হজরত মুসা আ. ও হজরত হারুন আ. ইন্তেকাল করবেন।
তাওরাতের বর্ণনা নিম্নরূপ :
“এরপর আল্লাহ্‌ তা’আলা মুসা ও হারুন আ.-কে সম্বোধন করে বললেন, এই নিকৃষ্ট জাতির মোকাবিলায়—যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে—আমি আর কতদিন ধৈর্য ধারণ করবো? বনি ইসরাইল আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করেছে আমি তাদের অভিযোগসমূহ শ্রবণ করেছি। তাদেরকে বলো, আল্লাহ্‌পাক বললেন, “আমার জীবনের কসম, তোমরা আমাকে যেমন শুনিয়ে বলেছো, আমি তোমাদের সঙ্গে তেমনই করবো। তোমাদের এবং ওইসব লোকের যাদেরকে তোমাদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে তাদের মধ্যে রয়েছে বিশ থেকে ততোর্ধ্ব বয়সের লোক, যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে—সকলে মৃতদেহে এই প্রান্তরেই পতিত হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে, তোমরা সেই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার সম্পর্কে আমি কসম খেয়েছিলাম যে, তোমাদেরকে ওখানে বসবাস করতে দেবো। অতএব, আলফিনার পুত্র কালিব ও নুনের পুত্র ইয়াশু এবং তোমাদের পুত্রদেরকে—যাদের সম্পর্কে তোমরা বলছো যে তারা লুণ্ঠিত হবে—আমি পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করাবো। যে-ভূমির মর্যাদাকে তোমরা হীন মনে করছো, তারা তার মর্যাদা বুঝবে। আর তোমাদের লাশ এই প্রান্তরেই পতিত থাকবে। আর তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ বছর পর্যন্ত এই ময়দানে ইতস্তত ঘুরে বেড়াবে, যতক্ষণ না তোমাদের মৃতদেহসমূহ এই প্রান্তরে হেজেমজে যায়। ওই দিনগুলো—যাতে তোমরা পবিত্র ভূমির অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকবে—সংখ্যা অনুসারে হবে চল্লিশ দিন। আর এক-এক দিনের পরিমাণ হবে এক-এক বছর। সুতরাং তোমরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত তোমাদের পাপের বোঝা বহন করতে থাকবে। তখন তোমরা আমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের ফল জানতে পারবে।"¹²⁶
এখানে এ-ধরনের সন্দেহ করা উচিত নয় যে, হযরত মুসা ও হারুন আ.-কেও এই প্রান্তরে থাকতে হলো এবং তাঁরাও পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারলেন না। কেননা, বনি ইসরাইলের এই গোটা কাফেলার ওপর পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। সুতরাং, তখন অবশ্য কর্তব্য ছিলো তাদের নসিহত ও হেদায়েতের জন্য আল্লাহর নবী তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা, যাতে এই বৃদ্ধেরাও আল্লাহর পথে প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর নতুন বংশধরদের মধ্যে সেই যোগ্যতাও সৃষ্টি হয় যার ফলে তারা পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করে আল্লাহর আদেশ পালন করতে পারে।

টিকাঃ
¹²⁴ নিষ্ক্রমণ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৯, আয়াত ১৫-১৬।
¹²⁵ পবিত্র ভূমি অর্থাৎ, তৎকালীন শাম (বর্তমানে সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের কিছু অংশ)।
¹²⁶ তাওরাত: গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ২৬-৩০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00