📄 সত্তর জন সরদার মনোনয়ন
বনি ইসরাইলের এই অপরাধ যখন ক্ষমা করা হলো তখন হযরত মুসা আ. তাদেরকে বললেন, "এই যে তোমরা আমার কাছে ফলকগুলো দেখছো এটা আল্লাহ তাআলার কিতাব। তোমাদের হেদায়েত এবং ধর্মীয় ও পার্থিব জীবনের কল্যাণের জন্য আল্লাহ তাআলা এই কিতাব আমাকে দান করেছেন। এই কিতাবের নাম তাওরাত। এখন তোমাদের ওপর অবশ্য কর্তব্য ও ফরয হলো এই কিতাববে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব বলে বিশ্বাস করা এবং তার নির্দেশসমূহ পালন করা।"
বনি ইসরাইল আসলে সর্বাবস্থায় বনি ইসরাইলই ছিলো। তারা বলতে লাগলো, "মুসা আমরা কীভাবে বিশ্বাস করি যে এটি আল্লাহর কিতাব। শুধু তোমার কথাতেই তো আমরা বিশ্বাস করবো না। আমরা তো এই কিতাবের ওপর তখনই বিশ্বাস স্থাপন করবো যখন আল্লাহকে আবরণহীন অবস্থায় নিজেদের চোখে দেখতে পাবো। আর আল্লাহ আমাদেরকে বলে দেবেন যে, এটা তাওরাত—আমার কিতাব; তোমরা এই কিতাবের প্রতি ঈমান আনো।"
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে বুঝালেন যে, এটা তো একটা নির্বোধের আবদার। এই চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহ তাআলাকে কে দেখেছে যে তোমরা দেখতে পাবে? এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু বনি ইসরাইল হঠকারিতায় যথারীতি অটল থাকলো। হযরত মুসা আ. তাদের এই অবস্থা দেখে একটু চিন্তা-ভাবনা করে বললেন, এটা তো সম্ভব হতে পারে না যে, তোমরা লাখ লাখ লোক এই কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আমার সঙ্গে তুর পাহাড়ে গমন করো। সুতরাং এটা সমীচীন হবে যে, তোমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোককে নির্বাচিত করে আমার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। তারা যখন ফিরে এসে সত্যতার সাক্ষ্য দেবে তখন তোমরাও তা মেনে নেবে। আর যেহেতু তোমরা এখন গো-বৎসের পূজা করে খুব বড় একটি অন্যায় করে ফেলেছো, তাই লজ্জা ও অনুতাপ প্রকাশ করা এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে ভবিষ্যতে ভালো কাজ করার প্রতিজ্ঞার জন্যও এটি সুবর্ণ সুযোগ। বনি ইসরাইল মুসা আ.-এর এই কথার ওপর সম্মত হলো।
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্র থেকে সত্তর জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে মনোনীত করে সঙ্গে নিলেন এবং তুর পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছালেন। তৎক্ষণাৎ শুভ্র মেঘের আকারে এক নুর এসে হযরত মুসা আ.-কে আচ্ছাদিত করে ফেললো এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথন শুরু হয়ে গেলো। হযরত মুসা আ. আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, আপনি বনি ইসরাইলের সব অবস্থা জানেন এবং দেখেন। তাদের হঠকারিতার কারণে সত্তর জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে বাছাই করে সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছে। কতই না উত্তম হতো যদি এই নুরের আবরণে আমার ও আপনার মধ্যকার কথোপকথন তারাও শুনতে পেতো এবং কওমের কাছে ফিরে গিয়ে সত্যতা প্রমাণ করার যোগ্য হতো।
আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর দোয়া মঞ্জুর করলেন এবং তাদেরকে নুরের আবরণের ভেতর নিয়ে যাওয়া হলো। তারাও হযরত মুসা আ. এবং আল্লাহপাকের মধ্যকার কথাবার্তা শুনতে পেলো। এরপর নুরের আবরণ সরে গেলো এবং মুসা আ. ও ওই নেতৃবৃন্দের মধ্যে মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলো। ওই সরদারেরা আগের মতোই তাদের হঠকারিতার ওপর গোঁ ধরে থাকলো যে, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহ তাআলাকে অনাবৃত অবস্থায় নিজেদের চোখে দেখবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ঈমান আনবো না। নির্বোধের মতো এই হঠকারিতা ও একগুঁয়েমির কারণে আল্লাহপাকের ক্রোধের উদ্রেক হলো। তিনি তৎক্ষণাৎ সরদারদের ওপর শাস্তি অবতীর্ণ করলেন: এক ভয়ঙ্কর বিদ্যুৎ, বজ্রধ্বনি ও ভূমিকম্প এসে তাদেরকে গ্রাস করলো এবং জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দিলো। হযরত মুসা আ. এই ঘটনা দেখে অত্যন্ত কাকুতি-মিনতির সঙ্গে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ, এই নির্বোধেরা বোকামি করে ফেলেছে। সে জন্য কি আপনি আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেবেন? হে আল্লাহ, আপনার অনুগ্রহে তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর প্রার্থনা কবুল করলেন এবং তাদের সবাইকে পুনরায় জীবন দান করলেন। এভাবে যখন তারা নতুন জীবন লাভ করে জীবিত হয়ে উঠছিলো, তারা একে অন্যের নতুন জীবন লাভ করাকে স্বচক্ষে দেখছিলো।
কুরআন মাজিদে এই ঘটনাকে ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে-
وَاخْتَارَ مُوسَى قَوْمَهُ سَبْعِينَ رَجُلًا لِمِيقَاتِنَا فَلَمَّا أَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ قَالَ رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُمْ مِنْ قَبْلُ وَإِيَّايَ أَتَهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاءُ مِنَّا إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَنْ تَشَاءُ وَتَهْدِي مَنْ تَشَاءُ أَنْتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ () وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ )) الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزْرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (سورة الأعراف)
'মুসা তার সম্প্রদায় থেকে সত্তর জন লোককে আমার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করলো। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হলো, তখন মুসা বললো, "হে আমার প্রতিপালক, তুমি ইচ্ছা করলে আগেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে! (কিন্তু তোমার দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে অবকাশ দিয়েছো।) আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ, তারা যা করেছে সেইজন্য কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এ তো শুধু তোমার পরীক্ষা, যার দ্বারা তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করো এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করো। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক; সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো এবং ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ। আমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে নির্ধারিত করো কল্যাণ, আমরা তোমার কাছে প্রত্যাবর্তন করেছি।" আল্লাহ বললেন, "আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া—তা তো প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারণ করবো যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত প্রদান করে এবং আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে। যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মি নবীর, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইনজিল, যা তাদের কাছে আছে তাতে লিপিব্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে বাধা দে, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং যে মুক্ত তাদেরকে তাদের গুরুভার থেকে ও শৃঙ্খল¹¹⁷ থেকে যা তাদের ওপর ছিলো। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে (সত্যের পথে) সাহায্য করে এবং যে-নুর তার (নবীর) সঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৫-১৫৭)
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً فَأَخَذَتْكُمُ الصَّاعِقَةُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ () ثُمَّ بَعَثْنَاكُمْ مِنْ بَعْدِ مَوْتِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (سورة البقرة)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মুসা, আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনো বিশ্বাস করবো না", তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে এবং তোমরা নিজেরাই দেখছিলে।¹¹⁸ এরপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমি তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করলাম যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।' [সুরা বাকারা : আয়াত ৫৫-৫৬) ¹¹⁹
টিকাঃ
¹¹⁷ অর্থাৎ, কঠিন বিধানাবলি-যা পূর্ববর্তী শরিয়তে ছিলো। অথবা পরাক্রমশালী শত্রুর অত্যাচার ও পরধীনতার শঙ্খল।
¹¹⁸ আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখার দাবি জানানোয় শাস্তিস্বরূপ তাদের সত্তরজন প্রতিনিধির মৃত্যু ঘটে।
¹¹⁹ এরপর হযরত মুসা আ.-এর দোয়ায় আল্লাহপাক তাদেরকে পুনর্জীবিত করেছিলেন।
📄 মৃত্যুর পরে জীবন
কুরআন মাজিদ মৃত্যুর পর জীবনের সাধারণ নিয়ম এই বলেছে যে, এই পার্থিব মৃত্যুর পরে আবার পরলোকেও পুনরায় জীবন দান করা হবে। কিন্তু বিশেষ নিয়ম এই যে, কোনো কোনো সময় প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার প্রতি লক্ষ রেখে আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়াতেই মৃতকে জীবন দান করে থাকেন। আম্বিয়ায়ে কেরামের মুজেযাময় জীবনে কুরআনের সাক্ষ্য অনুযায়ী এই সত্য কয়েকবার প্রকাশিত হয়েছে।
কুরআন মাজিদ যখন 'মুত্যুর পরবর্তী জীবনের' উল্লেখ করে, তখন তার ইঙ্গিত এই যে, কুরআন এই জীবনকে بعث বা জীবিত হয়ে ওঠা বলে ব্যক্ত করে থাকে।
সুরা বাকারার এই আয়াতেও কুরআন মাজিদ বনি ইসরাইলের নেতৃবৃন্দের মৃত্যু ও ধ্বংস এবং তাদের পুনরুজ্জীবিত হওয়াকে بعث শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছে। আর لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ যেনো 'তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো' বলে এই ঘটনার মূল সত্যকে আরো অধিক পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ঘটনা ঘটেছিলো এই, তাদের অযৌক্তিক ও ধৃষ্টতামূলক হঠকারিতার কারণে ভূমিকম্প এসে তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দিলো। এরপর হযরত মুসা আ.-এর বিনীত আবেদনে আল্লাহর অসীম রহমত উদ্বেলিত হয়ে উঠলো আর ওই ভস্মীভূত লোকগুলো পুনরায় জীবন দান করলো। যেনো তারা শোকর আদায় করে এবং ভবিষ্যতে এমন অনর্থক হঠকারিতা ও একগুঁয়েমি না করে এবং আল্লাহর সত্যিকারের আনুগত্যশীল বান্দা হয়ে যায়।
এই বিস্তারিত বিবরণের পর সহজেই এ-কথা বোধগম্য হতে পারে যে, যে-সকল সমসাময়িক মুফাস্সিরগণ উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে 'হায়াত বা'দাল মামাত' অর্থাৎ, 'মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করা' অর্থকে এড়ানোর জন্য হালকা ও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন তা সঠিক নয়। তাঁরা নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ ব্যতীতই কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ও পরিষ্কার বর্ণনাশৈলীকে মনগড়া ব্যাখ্যার ওপর কুরবান করে দিয়েছেন।
📄 সাধারণ রহমতের ঘোষণা
সুরা আ'রাফের আয়াত- قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ 'আল্লাহ বললেন, আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া-তা তো প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৬]
এই আয়াত কুরআন মাজিদের গুরুত্বপূর্ণ আয়াতসমূহের অন্যতম। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে যে-আযাব আগমন করে তা বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে হয়ে থাকে। অন্যথায় আযাব প্রদান আল্লাহর সিফত বা গুণ নয়; বরং রহমতই তাঁর আদি ও অনন্ত গুণ। অর্থাৎ, তাঁর রহমত গুণটি সবার জন্য ব্যাপক। বিশ্বজগতের এমন কোনো বস্তুও নেই যা তাঁর রহমতের গুণ থেকে বঞ্চিত বা শূন্য। বরং এরূপ বলুন, 'যাকে তোমরা আল্লাহর আযাব বলছো তা তোমাদের কার্যাবলির সঙ্গে সম্পর্কের বিবেচনায় আযাব। অন্যথায় অস্তিত্বের কারখানার পূর্ণ নকশার প্রতি লক্ষ করে যদি তোমরা গভীরভাবে চিন্তা করো, তবে একেও রহমত বলে দেখতে পাবে।'
এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ 'দয়া করা তিনি তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন।' [সুরা আন'আম : আয়াত ১২]
আর এই ব্যাপক রহমতের পূর্ণ প্রকাশস্থল ও পূর্ণ প্রতিবিম্ব সে-মহান সত্তা, যাঁর উল্লেখ সুরা আ'রাফের ওই আয়াতে এভাবে করা হয়েছে যে, তাঁর আগমনের আগেই পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে তাঁর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে এবং তাঁর গুণাবলি ও চারিত্রিক মাধুর্যও আলোচিত হয়েছে। অন্য এক আয়াতে তাঁকে رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ‘গোটা বিশ্বের জন্য রহমত’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ¹²⁰
টিকাঃ
¹²⁰ এই আয়াতে পূর্ণ ব্যাখ্যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী আলোচনার সময় বলা হবে।
📄 বনি ইসরাইল ও তুর পাহাড়ি
যাইহোক। সত্তর জন ব্যক্তি পুনরায় জীবিত হয়ে তাদের কওমের কাছে ফিরে এলো। তারা কওমের কাছে বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরলো এবং বললো, মুসা আ. যা বলছেন তা সত্য। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।
তখন সুস্থ প্রকৃতির চাহিদা তো ছিলো এই, এসব ঘটনা শুনে তাদের আল্লাহপাকের শোকর আদায় করা এবং তাঁর অনুগ্রহ ও দানের প্রাচুর্যের প্রতি লক্ষ করে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও দাসত্বের স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে অবনত মস্তকে তাঁর যাবতীয় নির্দেশ মেনে নেয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে অবস্থা এই হলো যে, তাদের বক্রতার ওপরই অটল থাকলো এবং তাদের নেতৃবৃন্দের সত্যায়ন সত্ত্বেও তাওরাতকে মেনে নিতে বিরোধিতামূলক ইতস্তত ভাব প্রকাশ করতে শুরু করে দিলো। তারা হযরত মুসা আ.-এর কথার প্রতি কর্ণপাত করলো না।
হযরত মুসা আ. তাদের এই অবস্থা দেখে আল্লাহর দরবারে রুজু হয়ে কওমের বিপথে চলার অভিযোগ পেশ করলেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো, এসব নাফরমানদের জন্য আমি তোমাকে আরো একটি দলিল (মুজেযা) প্রদান করছি। তা এই যে-পাহাড়ের ওপর তুমি আমার সঙ্গে কথোপকথন করো, যে-পাহাড়ের ওপর তোমার কওমের মনোনীত নেতৃবৃন্দ সত্যকে দর্শন করেছে, সে-পাহাড়কেই নির্দেশ দিচ্ছি-তা যেনো তার স্থান থেকে সরে গিয়ে বনি ইসরাইলের মাথার ওপর শামিয়ানার মতো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে এবং তার অবস্থানগত ভাষায় ঘোষণা করে যে, মুসা আ. আল্লাহ তাআলার যথার্থ নবী। নিঃসন্দেহে তাওরাত আল্লাহ তাআলার সত্য কিতাব। যদি মুসা আ. আল্লাহর সত্য নবী এবং তাওরাত সত্য কিতাব না হতো তবে তোমরা এই মুজেযা দেখতে পেতে না। এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরত ব্যতীত অন্যকোনো প্রকারেই সম্ভব ছিলো না।
বস্তুত, যখনই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তৎক্ষণাৎ তুর পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে স্থির হয়ে গেলো এবং তা শামিয়ানার মতো দেখা যেতে লাগলো। এই অবস্থানগত ভাষায় পাহাড়টি বলতে লাগলো, হে বনি ইসরাইল, যদি তোমাদের বিবেক ও বুদ্ধি বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে এবং সত্য ও মিথ্যাকে পার্থক্য করার জ্ঞান থাকে, তবে সত্য শ্রবণকারী কানের দ্বারা শোনো, আমি আল্লাহ তাআলার নিদর্শন হয়ে তোমাদেরকে বিশ্বাস প্রদান করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুসা আ. আমার পিঠে আরোহণ করে কয়েকবার আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথনের সম্মান লাভ করেছেন এবং তোমাদের সৎপথ ও হেদায়েত লাভের বিধান (তাওরাত)-ও তাঁকে প্রদান করা হয়েছে আমার পৃষ্ঠদেশের ওপর। আর হে উদাসীনতা ও অবাধ্যতায় মত্ত মানুষের দল, আমার এই অবস্থান-যা তোমাদের জন্য বিস্ময়কর হয়ে আছে-তোমাদের এই বিষয়ের সাক্ষ্য যে, যখন মানুষের বক্ষের মধ্যস্থলে অন্তরের কোমলতা কঠোরতায় রূপান্তরিত হয়ে যায় তখন তা এক খণ্ড পাথর বা তার চেয়েও কঠিন হয়ে যায় এবং কোনো দিক থেকেই তার ভেতরে হেদায়েত ও নসিহত প্রবেশ করতে পারে না। দেখো, আমি পাথরখণ্ডের সমষ্টি পাহাড়; কিন্তু আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে আনুগত্যের মস্তক অবনত করে কেমনভাবে দাসত্ব প্রদর্শন করছি। কিন্তু তোমরা তোমাদের আমিত্বের অহঙ্কারে কোনো অবস্থাতেই 'না'কে 'হ্যাঁ' দ্বারা বদল করতে প্রস্তুত নও।
কুরআন মাজিদ এই সত্যই প্রকাশ করছে-
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً
'এর পরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেলো, তা পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৪]
বনি ইসরাইল যখন এই নিদর্শন দেখলো-এটাকে সাময়িক ভয়ের কারণই মনে করুন বা উপস্থিত জনসমাবেশের সামনে আল্লাহ তাআলার মহান নিদর্শনের ফলই বিশ্বাস করুন-তারা তাওরাতের দিকে ঝুঁকে পড়লো এবং হযরত মুসা আ.-এর সামনে তাওরাতের আহকাম অনুযায়ী আমল করার স্বীকৃতি জানালো। তখন আল্লাহ তাআলার আদেশ এলো, হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদেরকে যা-কিছু দান করলাম, তাকে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করো এবং তাতে যেসব আহকাম রয়েছে তা পালন করো। যেনো তোমরা পরহেযগার ও মুত্তাকি হতে পারো।
কিন্তু আফসোস! বনি ইসরাইলের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি সাময়িক ছিলো বলে প্রতীয়মান হলো এবং তারা অধিককাল তার ওপর কর্মশীল থাকতে পারলো না। তাদের চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী পুনরায় বিরোধিতা শুরু করে দিলো। কুরআন মাজিদ এই ঘটনাগুলোকে খুবই সংক্ষেপে কিন্তু পরিষ্কার ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছে-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ) ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَكُنتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ (سورة البقرة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পাহাড়কে ২২১ তোমাদের ওপর উত্তোলন করেছিলাম'২২২; বলেছিলাম, "আমি যা দিলাম দৃঢ়তার সঙ্গে তা গ্রহণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ রাখো, যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পারো।" এর পরেই তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে! আল্লাহর অনুগ্রহ এবং অনুকম্পা তোমাদের প্রতি না থাকলে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬৩-৬৪]
وَإِذْ نَتَفْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ كَأَنَّهُ ظُلَّةٌ وَظَنُّوا أَنَّهُ وَاقِعٌ بِهِمْ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (سورة الأعراف)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন আমি পর্বতকে তাদের উপরে উত্তোলন করি, আর তা ছিলো যেনো এক চন্দ্রাতপ (শামিয়ানা)। তারা মনে করলো যে, তা তাদের ওপর পড়ে যাবে। বললাম, "আমি যা দিলাম তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ করো। যাতে তোমরা মুত্তাকি (তাওয়ার অধিকারী) হও।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৭১]
এসব আয়াতে পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, বনি ইসরাইলগণ যখন তাওরাতকে গ্রহণ করতে ইতস্তত করলো, বরং অস্বীকারই করে বসলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের মাথার ওপর তুর পাহাড়কে তুলে ধরলেন এবং এভাবে আল্লাহর প্রত্যক্ষ নিদর্শন দেখিয়ে তাদেরকে তাওরাত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করলেন। সুতরাং আয়াতগুলোর পরিষ্কার ও স্পষ্ট অর্থকে মনগড়া ব্যাখ্যার দিকে টেনে নেয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। যেমন: সমসাময়িক যুগের কোনো কোনো মুফাস্সির এমন ব্যাখ্যা করেছেন।
কোনো পাহাড় সমূলে উৎপাটিত হয়ে শূন্যস্থানে ঝুলে থাকা জ্ঞানের দিক থেকেও অসম্ভব নয় এবং আল্লাহ তাআলার কুদরতের বিধানেরও বিরোধী নয়। অবশ্য অসাধারণ ও অস্বাভাবিক ব্যাপার নিশ্চয়ই। এ-কারণে আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শন হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু অপব্যাখ্যাকারীরা বলে, رفع শব্দের অর্থ শুধু উঁচু করা। মাথার ওপর তুলে ধরা নয়। আর একইভাবে نتَق শব্দের অর্থ হয় যেমন সমূলে উৎপাটন করা, তেমনি কম্পিত হওয়ার অর্থও হয় এবং ভীষণভাবে নাড়াচাড়া করার অর্থও হয়। সুতরাং সুরা আ'রাফের আয়াতটির অর্থ এই হয় যে, আর যখন আমি তাদের ওপর পাহাড়কে কম্পিত করলাম, যেনো তা শামিয়ানা, (যা বায়ুর ঝাপটায়) নড়ছে, আর তারা (ভীষণ) ভয়ে মনে করছিলো যে, পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে পতিত হবে....। ১২৩
কিন্তু এসব লোক এই সত্যকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে বসেছেন যে, رفع এবং نتق শব্দ দুটির যদিও কয়েকটি অর্থ রয়েছে, কিন্তু আরবি ভাষার নিয়ম অনুসারে এখানে যে-সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে, সে-অনুসারেই অর্থ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত, কুরআন মাজিদের এক অংশ অপর অংশের ব্যাখ্যা করে থাকে। সুতরাং কোনো শব্দের অর্থ থেকে সে-অর্থই গ্রহণ করতে হবে যা অন্য আয়াতের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়।
অতএব, সুরা বাকারা وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّور আয়াত رفع (উত্তোলন করা) এবং فَوْق (উপরে) শব্দ দুটিকে যখন সুরা আ'রাফের وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ আয়াতে نتق (সমূলে উৎপাটিত করা)-এর সঙ্গে মেলানো হবে, তখন কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোর স্পষ্ট ও পরিষ্কার অর্থ এটাই হবে যে, তুর পাহাড়কে স্থানচ্যুত করে বনি ইসরাইলিদের মাথার ওপর এমনভাবে ধরা হয়েছিলো যেনো তা একটি শামিয়ানা যা শিগগিরই তাদের ওপর পতিত হবে। তা ছাড়া رفع-এর সঙ্গে فوق শব্দটি নিয়ে আসাই এই তাফসির বিশুদ্ধ হওয়ার শক্তিশালী প্রমাণ যা জমহুর মুফাস্সিরগণ করেছেন। তার বিপরীতে সমসাময়িক মুফাস্সিরগণের কৃত তাফসির পরিষ্কার বলছে যে, এই অর্থটি কুরআন মাজিদের মূল বক্তব্যের বিপরীতে টেনে-হিঁচড়ে করা হয়েছে।
এখানে এমন সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, এই দুটি আয়াত দ্বারা বুঝা যায় তাওরাতের বিধান অনুযায়ী আমল করার জন্য বনি ইসরাইলের ওপর জবরদস্তি ও বল প্রয়োগ করা হয়েছিলো। অথচ ধর্মে বল প্রয়োগ ও জবরদস্তি বৈধ নয়। কিন্তু কুরআন মাজিদের পূর্বের ও পরের আয়াতগুলোর প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করলে ঘটনাগুলোর অবস্থা আমরা যেমন বর্ণনা করেছি, তেমন অবস্থায় এমন সন্দেহ উৎপন্ন হতে পারে না। অবশ্য জমহুর মুফাস্সিরগণ এবং আধুনিক যুগের মুফাস্সিরগণের তাফসির থেকে এমন সন্দেহের উৎপাদন হয়।
তবে মুফতি মুহাম্মদ আবদুহু তার তাফসিরে এর উত্তম জবাব প্রদান করেছেন। তার সারমর্ম এই: আসলে তা জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের ব্যাপারই ছিলো না; বরং আল্লাহ তাআলার কুদরতের শেষ নিদর্শন প্রকাশ করা হয়েছিলো এবং তা করা হয়েছিলো তাদের পথপ্রদর্শন ও হেদায়েতকে শক্তিশালী ও দৃঢ় করার জন্য। আর এ-কারণে এই ঘটনা প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণের পরে ঘটেছিলো। কুরআন মাজিদের আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে এটাই বুঝা যায়।
টিকাঃ
¹²¹ সিনাই এলাকায় অবস্থিত তুর পাহাড়, যেখানে হযরত মুসা আ. আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন।
¹²² হযরত মুসা আ.-এর উম্মতগণ একটি ধর্মবিধান চেয়েছিলো। তাওরাতের বিধান অবতীর্ণ হলে তারা তা মানতে অস্বীকার করে। তখন তাদের মাথার ওপর পাহাড় উত্তোলন করে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ভয় দেখালে তারা তা গ্রহণ করে।
¹²³ তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১।
যাইহোক। সত্তর জন ব্যক্তি পুনরায় জীবিত হয়ে তাদের কওমের কাছে ফিরে এলো। তারা কওমের কাছে বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরলো এবং বললো, মুসা আ. যা বলছেন তা সত্য। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।
তখন সুস্থ প্রকৃতির চাহিদা তো ছিলো এই, এসব ঘটনা শুনে তাদের আল্লাহপাকের শোকর আদায় করা এবং তাঁর অনুগ্রহ ও দানের প্রাচুর্যের প্রতি লক্ষ করে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও দাসত্বের স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে অবনত মস্তকে তাঁর যাবতীয় নির্দেশ মেনে নেয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে অবস্থা এই হলো যে, তাদের বক্রতার ওপরই অটল থাকলো এবং তাদের নেতৃবৃন্দের সত্যায়ন সত্ত্বেও তাওরাতকে মেনে নিতে বিরোধিতামূলক ইতস্তত ভাব প্রকাশ করতে শুরু করে দিলো। তারা হযরত মুসা আ.-এর কথার প্রতি কর্ণপাত করলো না।
হযরত মুসা আ. তাদের এই অবস্থা দেখে আল্লাহর দরবারে রুজু হয়ে কওমের বিপথে চলার অভিযোগ পেশ করলেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো, এসব নাফরমানদের জন্য আমি তোমাকে আরো একটি দলিল (মুজেযা) প্রদান করছি। তা এই যে-পাহাড়ের ওপর তুমি আমার সঙ্গে কথোপকথন করো, যে-পাহাড়ের ওপর তোমার কওমের মনোনীত নেতৃবৃন্দ সত্যকে দর্শন করেছে, সে-পাহাড়কেই নির্দেশ দিচ্ছি-তা যেনো তার স্থান থেকে সরে গিয়ে বনি ইসরাইলের মাথার ওপর শামিয়ানার মতো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে এবং তার অবস্থানগত ভাষায় ঘোষণা করে যে, মুসা আ. আল্লাহ তাআলার যথার্থ নবী। নিঃসন্দেহে তাওরাত আল্লাহ তাআলার সত্য কিতাব। যদি মুসা আ. আল্লাহর সত্য নবী এবং তাওরাত সত্য কিতাব না হতো তবে তোমরা এই মুজেযা দেখতে পেতে না। এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরত ব্যতীত অন্যকোনো প্রকারেই সম্ভব ছিলো না।
বস্তুত, যখনই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হলো, তৎক্ষণাৎ তুর পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে স্থির হয়ে গেলো এবং তা শামিয়ানার মতো দেখা যেতে লাগলো। এই অবস্থানগত ভাষায় পাহাড়টি বলতে লাগলো, হে বনি ইসরাইল, যদি তোমাদের বিবেক ও বুদ্ধি বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে এবং সত্য ও মিথ্যাকে পার্থক্য করার জ্ঞান থাকে, তবে সত্য শ্রবণকারী কানের দ্বারা শোনো, আমি আল্লাহ তাআলার নিদর্শন হয়ে তোমাদেরকে বিশ্বাস প্রদান করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুসা আ. আমার পিঠে আরোহণ করে কয়েকবার আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথনের সম্মান লাভ করেছেন এবং তোমাদের সৎপথ ও হেদায়েত লাভের বিধান (তাওরাত)-ও তাঁকে প্রদান করা হয়েছে আমার পৃষ্ঠদেশের ওপর। আর হে উদাসীনতা ও অবাধ্যতায় মত্ত মানুষের দল, আমার এই অবস্থান-যা তোমাদের জন্য বিস্ময়কর হয়ে আছে-তোমাদের এই বিষয়ের সাক্ষ্য যে, যখন মানুষের বক্ষের মধ্যস্থলে অন্তরের কোমলতা কঠোরতায় রূপান্তরিত হয়ে যায় তখন তা এক খণ্ড পাথর বা তার চেয়েও কঠিন হয়ে যায় এবং কোনো দিক থেকেই তার ভেতরে হেদায়েত ও নসিহত প্রবেশ করতে পারে না। দেখো, আমি পাথরখণ্ডের সমষ্টি পাহাড়; কিন্তু আল্লাহ তাআলার আদেশের সামনে আনুগত্যের মস্তক অবনত করে কেমনভাবে দাসত্ব প্রদর্শন করছি। কিন্তু তোমরা তোমাদের আমিত্বের অহঙ্কারে কোনো অবস্থাতেই 'না'কে 'হ্যাঁ' দ্বারা বদল করতে প্রস্তুত নও।
কুরআন মাজিদ এই সত্যই প্রকাশ করছে-
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً
'এর পরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেলো, তা পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৪]
বনি ইসরাইল যখন এই নিদর্শন দেখলো-এটাকে সাময়িক ভয়ের কারণই মনে করুন বা উপস্থিত জনসমাবেশের সামনে আল্লাহ তাআলার মহান নিদর্শনের ফলই বিশ্বাস করুন-তারা তাওরাতের দিকে ঝুঁকে পড়লো এবং হযরত মুসা আ.-এর সামনে তাওরাতের আহকাম অনুযায়ী আমল করার স্বীকৃতি জানালো। তখন আল্লাহ তাআলার আদেশ এলো, হে বনি ইসরাইল, আমি তোমাদেরকে যা-কিছু দান করলাম, তাকে দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করো এবং তাতে যেসব আহকাম রয়েছে তা পালন করো। যেনো তোমরা পরহেযগার ও মুত্তাকি হতে পারো।
কিন্তু আফসোস! বনি ইসরাইলের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি সাময়িক ছিলো বলে প্রতীয়মান হলো এবং তারা অধিককাল তার ওপর কর্মশীল থাকতে পারলো না। তাদের চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী পুনরায় বিরোধিতা শুরু করে দিলো। কুরআন মাজিদ এই ঘটনাগুলোকে খুবই সংক্ষেপে কিন্তু পরিষ্কার ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছে-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ) ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَكُنتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ (سورة البقرة)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পাহাড়কে ২২১ তোমাদের ওপর উত্তোলন করেছিলাম'২২২; বলেছিলাম, "আমি যা দিলাম দৃঢ়তার সঙ্গে তা গ্রহণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ রাখো, যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পারো।" এর পরেই তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে! আল্লাহর অনুগ্রহ এবং অনুকম্পা তোমাদের প্রতি না থাকলে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৬৩-৬৪]
وَإِذْ نَتَفْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ كَأَنَّهُ ظُلَّةٌ وَظَنُّوا أَنَّهُ وَاقِعٌ بِهِمْ خُذُوا مَا آتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (سورة الأعراف)
'স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন আমি পর্বতকে তাদের উপরে উত্তোলন করি, আর তা ছিলো যেনো এক চন্দ্রাতপ (শামিয়ানা)। তারা মনে করলো যে, তা তাদের ওপর পড়ে যাবে। বললাম, "আমি যা দিলাম তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং তাতে যা আছে তা স্মরণ করো। যাতে তোমরা মুত্তাকি (তাওয়ার অধিকারী) হও।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৭১]
এসব আয়াতে পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, বনি ইসরাইলগণ যখন তাওরাতকে গ্রহণ করতে ইতস্তত করলো, বরং অস্বীকারই করে বসলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের মাথার ওপর তুর পাহাড়কে তুলে ধরলেন এবং এভাবে আল্লাহর প্রত্যক্ষ নিদর্শন দেখিয়ে তাদেরকে তাওরাত কবুল করার জন্য প্রস্তুত করলেন। সুতরাং আয়াতগুলোর পরিষ্কার ও স্পষ্ট অর্থকে মনগড়া ব্যাখ্যার দিকে টেনে নেয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। যেমন: সমসাময়িক যুগের কোনো কোনো মুফাস্সির এমন ব্যাখ্যা করেছেন।
কোনো পাহাড় সমূলে উৎপাটিত হয়ে শূন্যস্থানে ঝুলে থাকা জ্ঞানের দিক থেকেও অসম্ভব নয় এবং আল্লাহ তাআলার কুদরতের বিধানেরও বিরোধী নয়। অবশ্য অসাধারণ ও অস্বাভাবিক ব্যাপার নিশ্চয়ই। এ-কারণে আল্লাহ তাআলার কুদরতের নিদর্শন হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু অপব্যাখ্যাকারীরা বলে, رفع শব্দের অর্থ শুধু উঁচু করা। মাথার ওপর তুলে ধরা নয়। আর একইভাবে نتَق শব্দের অর্থ হয় যেমন সমূলে উৎপাটন করা, তেমনি কম্পিত হওয়ার অর্থও হয় এবং ভীষণভাবে নাড়াচাড়া করার অর্থও হয়। সুতরাং সুরা আ'রাফের আয়াতটির অর্থ এই হয় যে, আর যখন আমি তাদের ওপর পাহাড়কে কম্পিত করলাম, যেনো তা শামিয়ানা, (যা বায়ুর ঝাপটায়) নড়ছে, আর তারা (ভীষণ) ভয়ে মনে করছিলো যে, পাহাড় তাদের মাথার ওপর এসে পতিত হবে....। ১২৩
কিন্তু এসব লোক এই সত্যকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে বসেছেন যে, رفع এবং نتق শব্দ দুটির যদিও কয়েকটি অর্থ রয়েছে, কিন্তু আরবি ভাষার নিয়ম অনুসারে এখানে যে-সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে, সে-অনুসারেই অর্থ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত, কুরআন মাজিদের এক অংশ অপর অংশের ব্যাখ্যা করে থাকে। সুতরাং কোনো শব্দের অর্থ থেকে সে-অর্থই গ্রহণ করতে হবে যা অন্য আয়াতের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়।
অতএব, সুরা বাকারা وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّور আয়াত رفع (উত্তোলন করা) এবং فَوْق (উপরে) শব্দ দুটিকে যখন সুরা আ'রাফের وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ আয়াতে نتق (সমূলে উৎপাটিত করা)-এর সঙ্গে মেলানো হবে, তখন কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোর স্পষ্ট ও পরিষ্কার অর্থ এটাই হবে যে, তুর পাহাড়কে স্থানচ্যুত করে বনি ইসরাইলিদের মাথার ওপর এমনভাবে ধরা হয়েছিলো যেনো তা একটি শামিয়ানা যা শিগগিরই তাদের ওপর পতিত হবে। তা ছাড়া رفع-এর সঙ্গে فوق শব্দটি নিয়ে আসাই এই তাফসির বিশুদ্ধ হওয়ার শক্তিশালী প্রমাণ যা জমহুর মুফাস্সিরগণ করেছেন। তার বিপরীতে সমসাময়িক মুফাস্সিরগণের কৃত তাফসির পরিষ্কার বলছে যে, এই অর্থটি কুরআন মাজিদের মূল বক্তব্যের বিপরীতে টেনে-হিঁচড়ে করা হয়েছে।
এখানে এমন সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, এই দুটি আয়াত দ্বারা বুঝা যায় তাওরাতের বিধান অনুযায়ী আমল করার জন্য বনি ইসরাইলের ওপর জবরদস্তি ও বল প্রয়োগ করা হয়েছিলো। অথচ ধর্মে বল প্রয়োগ ও জবরদস্তি বৈধ নয়। কিন্তু কুরআন মাজিদের পূর্বের ও পরের আয়াতগুলোর প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করলে ঘটনাগুলোর অবস্থা আমরা যেমন বর্ণনা করেছি, তেমন অবস্থায় এমন সন্দেহ উৎপন্ন হতে পারে না। অবশ্য জমহুর মুফাস্সিরগণ এবং আধুনিক যুগের মুফাস্সিরগণের তাফসির থেকে এমন সন্দেহের উৎপাদন হয়।
তবে মুফতি মুহাম্মদ আবদুহু তার তাফসিরে এর উত্তম জবাব প্রদান করেছেন। তার সারমর্ম এই: আসলে তা জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের ব্যাপারই ছিলো না; বরং আল্লাহ তাআলার কুদরতের শেষ নিদর্শন প্রকাশ করা হয়েছিলো এবং তা করা হয়েছিলো তাদের পথপ্রদর্শন ও হেদায়েতকে শক্তিশালী ও দৃঢ় করার জন্য। আর এ-কারণে এই ঘটনা প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণের পরে ঘটেছিলো। কুরআন মাজিদের আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে এটাই বুঝা যায়।
টিকাঃ
¹²¹ সিনাই এলাকায় অবস্থিত তুর পাহাড়, যেখানে হযরত মুসা আ. আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন।
¹²² হযরত মুসা আ.-এর উম্মতগণ একটি ধর্মবিধান চেয়েছিলো। তাওরাতের বিধান অবতীর্ণ হলে তারা তা মানতে অস্বীকার করে। তখন তাদের মাথার ওপর পাহাড় উত্তোলন করে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ভয় দেখালে তারা তা গ্রহণ করে।
¹²³ তরজুমানুল কুরআন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১।