📄 গো-বৎস পূজার ঘটনা
ইতোমধ্যে এর একটি বিচিত্র ও অভিনব ঘটনা ঘটলো। এটিকে যেমন বিস্ময়কর ব্যাপার বলা যায়, তেমনি আফসোসেরও বিষয় বলা যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে বনি ইসরাইলের নীচ মানসিকতা ও চারিত্রিক হীনতা উন্মোচিত হয়ে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে হযরত মুসা আ. তুর বা হাওরাব পাহাড়ের ওপর বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে মগ্ন এবং বনি ইসরাইলের জন্য আল্লাহ তাআলার বিধান (তাওরাত) অর্জন করার কাজে ব্যস্ত। আর এদিকে নিম্নদেশে সাইনা প্রান্তরে বনি ইসরাইলিরা সামিরির নেতৃত্বে নিজেরাই নিজেদের মাবুদ (গো-বৎস) মনোনীত করে তার চারপাশে আসর বানিয়ে তার পূজা করতে লাগলো।
অধিকাংশ মুফাস্সিরের তাফসির অনুযায়ী ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ এই: হযরত মুসা আ. যখন তাওরাত আনার জন্য তুর পাহাড়ে যেতে প্রস্তুত হলেন, তিনি বনি ইসরাইলকে বললেন, "তুর পাহাড়ে আমারা ইতিকাফের মুদ্দত (সময়সীমা) একমাস। মুদ্দত শেষ হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আমি তোমাদের কাছে ফিরে আসবো। হারুন আ. তোমাদের কাছে থাকলেন। তিনি তোমাদের যাবতীয় অবস্থার তত্ত্ববধান করবেন। কিন্তু তাঁর তুর পাহাড়ে পৌছার পর ইতিকাফের মুদ্দত চল্লিশ দিন হয়ে গেলো। মুসা আ.-এর ফিরে আসার বিলম্ব দেখে সামিরি নামের এক ব্যক্তি সুযোগ গ্রহণ করলো। সে দেখলো যে, মুসা আ.-এর ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় বনি ইসরাইল অস্থির হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা দেখে সে বনি ইসরাইলকে বললো, যদি তোমরা তোমাদের ওইসব অলঙ্কার আমার কাছে নিয়ে আসো, যা তোমরা মিসরীয়দের কাছ থেকে ধার করে এনেছিলে এবং মিসর থেকে বের হয়ে আসার সময় তাড়াহুড়ার কারণে ফিরিয়ে দিতে পারো নি, তবে আমি সেগুলো দিয়ে তোমাদের জন্য একটি মঙ্গলজনক কাজ করে দেবো।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে সামিরি যদিও মুসলমান ছিলো, কিন্তু তার অন্তরে কুফরি ও শিরকের অপবিত্রতা পরিপূর্ণভাবেই ছিলো। বনি ইসরাইলিরা তাদের সব অলঙ্কার তার কাছে এনে জমা করলো। সে অলঙ্কারগুলোকে আগুনের ভাটার মধ্যে রেখে গলিয়ে ফেললো এবং ওগুলো দিয়ে গো-বৎসরের অবয়ব প্রস্তুত করলো। এরপর তার থলি থেকে একমুষ্টি মাটি বের করে ওই অবয়বটির ভেতর রাখলো। এই পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে বাছুরটির মধ্যে প্রাণের লক্ষণ জেগে উঠলো এবং তা গো-বাছুরের মতো হাম্বা হাম্বা রবে ডাকতে শুরু করলো।
তখন সামিরি বনি ইসরাইলকে বললো, মুসা আ.-এর ভ্রান্তি ও ভুল হয়েছে। তিনি খোদার অন্বেষণে তুর পাহাড়ে গিয়েছেন। তোমাদের মাবুদ তো এখানেই বিদ্যমান।
একটু পূর্বে বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বর্ণিত হয়েছে যে, কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর রাজ্যের গোলামি বনি ইসরাইলের মধ্যে শিরকি আকিদা ও এবং কুসংস্কার ও প্রথার রঙ ছড়িয়ে দিয়েছিলো এবং তারা ওই রঙে যথেষ্ট পরিমাণে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিলো। আর গো-বাছুরের পূজা মিসরের প্রাচীনকালের একটি বিশ্বাস ছিলো। তাদের ধর্মে গো-বাছুরের পূজা ছিলো বেশ গুরুত্ব ও মর্যাদার অধিকারী। এ-কারণেই তাদের এক বড় দেবতা (হাওরাস)-এর মুখ গাভীর আকৃতির ছিলো। তাদের বিশ্বাস ছিলো যে, গাভীর মাথার ওপর ভূগোলকটি স্থাপিত রয়েছে। ¹⁰¹
সামিরি বনি ইসরাইলকে উৎসাহ প্রদান করলো যে, তারা যেনো তার নিজ হাতে নির্মিত গো-বৎসকে তাদের উপাস্য মনে করে এবং সেটার পূজা করে। তারা সামিরির এই কথাকে সহজেই গ্রহণ করে নিলো। হযরত হারুন আ. বনি ইসরাইলের এই কাণ্ড দেখে তাদের খুব বুঝালেন যে, তোমরা এমন করো না। এটা ভ্রষ্টতার পথ। কিন্তু তারা হযরত হারুন আ.-এর কথা মানতে অস্বীকৃতি জানালো এবং তারা বললো, আমরা যা-কিছু অবলম্বন করেছি, মুসা আ. ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা তা থেকে বিরত হবো না।
বনি ইসরাইলের ব্যাপার যখন এই পর্যন্ত পৌঁছে গেলো, তখন আল্লাহ তাআলার কল্যাণকামিতা ও প্রজ্ঞার চাহিদা হলো যে তিনি মুসা আ.-কে সে-সম্পর্কে অবহিত করে দেন। সুতরাং তিনি হযরত মুসা আ.-কে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে মুসা, তুমি তোমার কওমকে ফেলে রেখে এখানে আসার ব্যাপারে এত তাড়াহুড়া করলে কেনো?' হযরত মুসা আ. আরজ করলেন, 'হে আল্লাহ, এইজন্য যে, আপনার কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছে কওমের জন্য হেদায়েত লাভ করি।' আল্লাহ তাআলা তখন বললেন, 'যাদের হেদায়েতের জন্য তুমি এত অস্থির তারা তো এমন গোমরাহির মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছে।' হযরত মুসা আ. এ-কথা শুনে অত্যন্ত মর্মবেদনা, ক্রোধ ও লজ্জার সঙ্গে তাঁর কওমের কাছে ফিরে এলেন। তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন, তোমরা এটা কী করলে? আমার এমন কী বিলম্ব হয়েছিলো যে তোমরা এমন আপদ ঘটিয়ে ফেললে? তিনি এসব কথা বলছিলেন এবং ক্ষেভে ও ক্রোধে কাঁপছিলেন। এমনকি তাঁর হাত থেকে তাওরাতের ফলকগুলো পড়ে গেলো।
বনি ইসরাইলিরা বললো, আমাদের কোনো দোষ নেই। মিসরীয়দের অলঙ্কারগুলো আমরা সঙ্গে নিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। সেগুলোই সামিরি আমাদের থেকে চেয়ে নিয়েছে এবং এই সঙ বানিয়েছে। এভাবে সে আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।
'শিরক' নবুওতের পদের জন্য একটি অসহ্যকর বিষয়। এটি একটি কারণ, আরো একটি কারণ এই যে, হযরত মুসা আ. অত্যন্ত গরম মেজাজের লোক ছিলেন—তিনি তার ভাই হারুন আ.-এর ঘাড় ধরে ফেললেন এবং তার দাড়ির দিকেও হাত বাড়ালেন। তখন হারুন আ. বললেন, 'হে আমার ভাই, আমার কোনোই দোষ নেই। আমি তাদেরকে যতই বুঝালাম, তারা কোনোভাবেই মানলো না। তারা আমাকে বলতে শুরু করলো, মুসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা তোমার কোনো কথাই শুনবো না। বরং তারা আমাকে দুর্বল পেয়ে আমাকে হত্যা করার সংকল্প করেছিলো। আমি তাদের এই অবস্থা দেখে ভাবলাম, এখন যদি আমি এদের মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে দিই এবং পূর্ণ ঈমানদার ও এদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে, তাহলে পরে আমার ওপর এই দোষারোপ হতে পারে যে, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি কওমের মধ্যে বিভেদ বাঁধিয়ে দিয়েছো। এ-কারণে আমি নীরব থেকে তোমার অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রিয় ভাই, তুমি আমার মাথার চুল ধরে টেনো না এবং দাড়িও ধরো না। এভাবে তুমি অন্য লোকদের হাসার সুযোগ দিও না।
হারুন আ.-এর এই যুক্তিযুক্ত বক্তব্য শুনে তাঁর ওপর থেকে হযরত মুসা আ.-এর ক্রোধ প্রশমিত হয়ে গেলো। এখন সামিরিকে লক্ষ করে বলতে লাগলেন, 'হে সামিরি, তুমি এটা কেমন সঙ বানালে?' সামিরি জবাব দিলো, 'আমি এমন একটি বিষয় দেখতে পেয়েছি যা বনি ইসরাইলের মধ্যে আর কেউ দেখতে পায় নি। অর্থাৎ, ফেরআউনের ডুবে মরার সময় হযরত জিবরাইল আ. ঘোড়ার পিঠে চড়ে ফেরআউন ও বনি ইসরাইলের মধ্যস্থলে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি দেখলাম যে, তাঁর ঘোড়ার খুরের আঘাতে জমিনে প্রাণের লক্ষণ সঞ্চারিত হচ্ছে এবং শুকনো মাটিতে উদ্ভিদ উৎপন্ন হচ্ছে। তখন আমি হযরত জিবরাইল আ.-এর ঘোড়ার পায়ের মাটি থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে নিজের কাছে রাখলাম। সেই মাটিকে আমি এই বাছুরের ভেতর নিক্ষেপ করলাম। তৎক্ষণাৎ বাছুরটির মধ্যে প্রাণের লক্ষণ সঞ্চারিত হয়ে গেলো এবং তা 'হাম্বা' 'হাম্বা' আওয়াজ দিতে শুরু করলো।'
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আচ্ছা, তোমার জন্য পৃথিবীতে এই শাস্তি নির্ধারিত করা হলো যে, তুমি উন্মাদের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াবে। কোনো মানুষকে তোমার কাছে আসতে দেখলেই তার থেকে পলায়ন করতে করতে বলবে, দেখো, আমাকে স্পর্শ করো না। এই তো হলো তোমার পার্থিব শান্তি। আর কিয়ামতের দিনে এমন অবাধ্য ও পথভ্রষ্টের জন্য যে-শাস্তি নির্ধারিত আছে, তা তোমার জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতির আকারে পূর্ণ হবে।
হে সামিরি, তুমি এটাও দেখে রাখো যে, তুমি যে-গোবৎসকে উপাস্য বানিয়েছিলে এবং তার চারপাশে জটলা বেঁধে পূজায় বসেছিলে, আমি এখনই ওটাকে আগুনে নিক্ষেপ করে ভস্ম করে দিচ্ছি এবং সেই ভস্মকে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছি—যেনো তুই ও তোর নির্বোধ অনুসারীরা বুঝতে পারিস তোদের উপাস্যের মর্যাদা ও মূল্য এবং ক্ষমতা ও শক্তির অবস্থা হলো এই, সে অপরের দয়া ও করুণা কী করবে, সে নিজের অস্তিত্বকেই ধ্বংস ও বিনাশ থেকে রক্ষা করতে পারে না।
ওরে হতভাগার দল, তোমরা কি এই সাধারণ কথাটুকুও বুঝতে পারলে না যে, একমাত্র আল্লাহই তোমার মাবুদ ও উপাস্য, তাঁর কোনো সঙ্গীও নেই এবং শরিকও নেই। তিনি সর্ববিষয়ে জ্ঞানী ও অবহিত।
ঘটনার এই অংশ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَ لَقَدْ جَآءَكُمْ مُوْسٰى بِالْبَيِّنٰتِ ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهٖ وَاَنْتُمْ ظٰلِمُوْنَ () وَاِذْ اَخَذْنَا مِیْثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّوْرَ خُذُوْا مَآ اٰتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَّاسْمَعُوْا قَالُوْا سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَاُشْرِبُوْا فِیْ قُلُوْبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ قُلْ بِئْسَمَا يَاْمُرُكُمْ بِهٖ اِيْمَانُكُمْ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ (سورة البقرة)
'এবং নিশ্চয় মুসা তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছে। এরপর তার প্রস্থানের পর তোমার গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে। আর তোমরা তো জালিম। (তোমরা ঈমানের পথে দৃঢ় ছিলে না; তোমরা কাফের হয়ে গিয়েছিলে।) স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুরকে তোমাদের (মাথার) ওপর উত্তোলন করেছিলাম। বলেছিলাম, “যা দিলাম তা দৃঢ়রূপে গ্রহণ করো ও শ্রবণ করো।" তারা বলেছিলো, "আমরা শ্রবণ করলাম ও অমান্য করলাম।"¹⁰² কুফরির কারণে তাদের হৃদয়ে (-এর পরতে পরতে) গো-বৎস প্রেম সিঞ্চিত হয়েছিলো। বলো, "যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে তোমাদের ঈমান যা-কিছুর নির্দেশ দেয় তা কত নিকৃষ্ট!"' [সূরা বাকারা: আয়াত ৯২-৯৩]
وَاتَّخَذَ قَوْمُ مُوسَى مِنْ بَعْدِهِ مِنْ حُلِيِّهِمْ عِجْلًا جَسَدًا لَهُ خُوَارٌ أَلَمْ يَرَوْا أَنَّهُ لَا يُكَلِّمُهُمْ وَلَا يَهْدِيهِمْ سَبِيلًا اتَّخَذُوهُ وَكَانُوا ظَالِمِينَ () وَلَمَّا سُقِطَ فِي أَيْدِيهِمْ وَرَأَوْا أَنَّهُمْ قَدْ ضَلُّوا قَالُوا لَئِنْ لَمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ () وَلَمَّا رَجَعَ مُوسَى إِلَى قَوْمِهِ غَضْبَانَ أَسِفًا قَالَ بِئْسَمَا خَلَفْتُمُونِي مِنْ بَعْدِي أَعَجِلْتُمْ أَمْرَ رَبِّكُمْ وَأَلْقَى الْأَلْوَاحَ وَأَخَذَ بِرَأْسِ أَخِيهِ يَجُرُّهُ إِلَيْهِ قَالَ ابْنَ أُمَّ إِنَّ الْقَوْمَ اسْتَضْعَفُونِي وَكَادُوا يَقْتُلُونَنِي فَلَا تُشْمِتْ بِيَ الْأَعْدَاء وَلَا تَجْعَلْنِي مَعَ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ )) قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ (( إِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَذِلَّةٌ فِي الْحَيَياةِ الدُّنْيَا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُفْتَرِينَ (( وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَحِيمٌ (( وَلَمَّا سَكَتَ عَنْ مُوسَى الْغَضَبُ أَخَذَ الْأَلْوَاحَ وَفِي نُسْخَتِهَا هُدًى وَرَحْمَةٌ لِلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُونَ (سورة الأعراف)
'মুসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে (তাঁর তুর পাহাড়ে চলে যাওয়ার পর) নিজেদের অলঙ্কার দিয়ে (অলঙ্কারগুলো গলিয়ে) গড়ে নিলো একটি গো-বৎস-একটি অবয়ব, যা 'হাম্বা' আওয়াজ করতো। (আফসোস তাদের বুদ্ধির ওপর!) তারা কি (এই সাধারণ বিষয়টাও) দেখলো না যে, তা তাদের সঙ্গে কথাও বলে না এবং তাদেরকে পথও দেখায় না? তারা এটিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করলো এবং তারা ছিলো জালিম। তারা যখন অনুতপ্ত হলো ও দেখলো যে তারা (সত্য থেকে) পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, তখন তারা বললো, "আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের প্রতি দয়া না করেন এবং আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবোই।" মুসা যখন ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এলো, তাদেরকে বললো, "আমার অনুপস্থিতিতে তোমারা আমার কত নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্ব করেছো! তোমাদের প্রতিপালকের আদেশের পূর্বে তোমরা ত্বরান্বিত করলে?”¹⁰⁰ এবং সে (উত্তেজিত হয়ে তাওরাত- লিখিত) ফলকগুলো ফেলে দিলো এবং তার ভাইকে চুলে¹⁰⁴ ধরে নিজের দিকে টেনে আনলো। হারুন বললো, "হে আমার সহোদর, (আমি কী করবো?) লোকেরা তো আমাকে দুর্বল মনে করেছিলো এবং আমাকে প্রায় খুন করেই ফেলেছিলো। তুমি আমার সঙ্গে এমন করো না যাতে শত্রুরা আনন্দিত হয় এবং তুমি আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত করো না।" মুসা বললো, “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন, (কেননা, আমি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম) এবং আমার ভাইকে (-ও) ক্ষমা করুন (কারণ তিনি পথভ্রষ্টদেরকে কঠোরভাবে বারণ করতে পারেন নি) আর আমাদেরকে আপনার রহমতের মধ্যে দাখিল করুন। তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” যারা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে পার্থিব জীবনে তাদের ওপর তাদের প্রতিপালকের ক্রোধ ও লাঞ্ছনা আপতিত হবেই। আর এইভাবে আমি মিথ্যারচনাকারীদের (তাদের দুষ্কর্মের) প্রতিফল দিয়ে থাকি। যার অসৎকাজ করে তার পরে তওবা করলে ও ঈমান আনলে তোমার প্রতিপালক তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। মুসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হলো, তখন সে (তাওরাতের) ফলকগুলো তুলে নিলো। যারা তাদেরকে প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য ফলকগুলোতে যা লিখিত ছিলো তাতে ছিলো পথনির্দেশ ও রহমত।' [সুরা আ'রাফ : ১৪৮-১৫৪]
وَمَا أَعْجَلَكَ عَنْ قَوْمِكَ يَا مُوسَى () قَالَ هُمْ أُولَاءِ عَلَى أَثَرِي وَعَجِلْتُ إِلَيْكَ رَبِّ لِتَرْضَى () قَالَ فَإِنَّا قَدْ فَتَنَّا قَوْمَكَ مِنْ بَعْدِكَ وَأَضَلُّهُمُ السَّامِرِيُّ () فَرَجَعَ مُوسَى إِلَى قَوْمِهِ غَضَبَانَ أَسِفًا قَالَ يَا قَوْمِ أَلَمْ يَعِدُكُمْ رَبُّكُمْ وَعْدًا حَسَنًا أَفَطَالَ عَلَيْكُمُ الْعَهْدُ أَمْ أَرَدْتُمْ أَنْ يَحِلَّ عَلَيْكُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّكُمْ فَأَخْلَفْتُمْ مَوْعِدِي )) قَالُوا مَا أَخْلَفْنَا مَوْعِدَكَ بِمَلْكِنَا وَلَكِنَّا حُمِّلْنَا أَوْزَارًا مِنْ زِينَةِ الْقَوْمِ فَقَذَفْنَاهَا فَكَذَلِكَ أَلْقَى السَّامِرِيُّ ( فَأَخْرَجَ لَهُمْ عِجْلًا جَسَدًا لَهُ خُوَارٌ فَقَالُوا هَذَا إِلَهُكُمْ وَإِلَهُ مُوسَى فَنَسِيَ () أَفَلَا يَرَوْنَ أَلَّا يَرْجِعُ إِلَيْهِمْ قَوْلًا وَلَا يَمْلِكُ لَهُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا ) وَلَقَدْ قَالَ لَهُمْ هَارُونُ مِنْ قَبْلُ يَا قَوْمِ إِنَّمَا فُتِنْتُمْ بِهِ وَإِنْ رَبَّكُمُ الرَّحْمَنُ فَاتَّبِعُونِي وَأَطِيعُوا أَمْرِي )) قَالُوا لَنْ تَبْرَحَ عَلَيْهِ عَاكِفِينَ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْنَا مُوسَى () قَالَ يَا هَارُونُ مَا مَنَعَكَ إِذْ رَأَيْتَهُمْ ضَلُّوا )) أَلَّا تَتَّبِعَنِ أَفَعَصَيْتَ أَمْرِي () قَالَ يَبْنَوْمَ لَا تَأْخُذْ بِلحْيَتِي وَلَا بِرَأْسِي إِنِّي خَشِيتُ أَنْ تَقُولَ فَرَّقْتَ بَيْنَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَمْ تَرْقُبْ قَوْلِي () قَالَ فَمَا خَطْبُكَ يَا سَامِرِيُّ )) قَالَ بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا بِهِ فَقَبَضَتُ قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ فَنَبَذْتُهَا وَكَذَلِكَ سَوَّلَتْ لِي نَفْسِي () قَالَ فَاذْهَبْ فَإِن لَكَ فِي الْحَيَياةِ أَنْ تَقُولَ لَا مِسَاسَ وَإِنْ لَكَ مَوْعِدًا لَنْ تُخْلَفَهُ وَانْظُرْ إِلَى إِلَهِكَ الَّذِي ظَلْتَ عَلَيْهِ عَاكِفًا لَنُحَرِّقَتْهُ ثُمَّ لَنَنْسِفَنَّهُ فِي الْيَمِّ نَسْفًا () إِنَّمَا إِلَهُكُمُ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَسِعَ كُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا (سورة طه)
(মুসা তুর পর্বতে পৌছার পর আল্লাহপাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন,) “হে মুসা, তোমার সম্প্রদায়কে পেছনে ফেলে (এখানে আসার জন্য) তোমাকে ত্বরা করতে বাধ্য করলো কীসে? মুসা বললো, “এই তো তারা আমার পেছনে¹⁰⁵ এবং হে আমার প্রতিপালক, আমি ত্বরায় তোমার কাছে এলাম, তুমি সন্তুষ্ট হবে এইজন্য।" আল্লাহ বললেন, "আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলেছি তোমার চলে আসার পর, এবং সামিরি¹⁰⁶ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।" এরপর মুসা তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলো ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে। সে বললো, “হে আমার সম্প্রদায়, (এটা তোমরা কী করলে!) তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেন নি? তবে কি প্রতিশ্রুতিকাল তোমাদের কাছে সুদীর্ঘ হয়েছে (যে, তোমরা তা মনে রাখতে পারলে না) না তোমরা চেয়েছো তোমাদের প্রতি আপতিত হোক তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ, যে-কারণে তোমরা আমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?” তারা বললো, “আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করি নি তবে (অন্য একটি ঘটনা ঘটে গেলো,) আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো (মিসরীয়) লোকদের অলঙ্কারের বোঝা (ভারী ভারী অলঙ্কারের বোঝা যা বহন করতে আমরা ইচ্ছুক ছিলাম না) এবং আমরা তা অগ্নিকুণ্ডে¹⁰⁷ নিক্ষেপ করি, (এটাই আমাদের অপরাধ!) অনুরূপভাবে সামিরিও নিক্ষেপ করে।" এরপর সে (সামিরি) তাদের জন্য গড়ে দিলো একটি (স্বর্ণের) গো-বৎস—এক অবয়ব, যা 'হাম্বা' আওয়াজ করতো। তারা বললো, "এটা তোমাদের ইলাহ (উপাস্য) এবং মুসারও ইলাহ, কিন্তু মুসা ভুলে গেছে।” (তাদের বুদ্ধির ওপর আফসোস!) তবে কি তারা ভেবে (এই সাধারণ বিষয়টাও ভেবে) দেখি নি যে, তা তাদের কথায় সাড়া দেয় না এবং তাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না? হারুন তাদেরকে আগেই বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, এটা (গো-বৎস) দ্বারা তো তোমাদেরকে কেবল (ধৈর্য ও দৃঢ়তার) পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। তোমাদের প্রতিপালক তো দয়াময়; সুতরাং তোমরা আমার অনুসরণ করো এবং আমার আদেশ মেনে চলো।" তারা বলেছিলো, "আমাদের কাছে মুসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজা থেকে কিছুতেই বিরত হবো না।" মুসা বললো, "হে হারুন, তুমি যখন দেখলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তখন কীসে তোমাকে নিবৃত্ত করলো—আমার অনুসরণ করা থেকে? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে?" হারুন বললো, “হে আমার সহোদর, আমার দাড়ি ও চুল ধরো না। (আমি যদি কঠোরতা না করে থাকি তবে তা কেবল এটা মনে করে যে,) আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে, তুমি বলবে, তুমি বনি ইসরাইলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছো এবং তুমি আমার বাক্য পালনে যত্নবান হও নি।” (এরপর সামিরিকে) মুসা বললো, "হে সামিরি, তোমার ব্যাপার কী?" সামিরি বললো, "আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখে নি। এরপর আমি সেই দূতের (ফেরেশতা জিবরাইল) পদচিহ্ন থেকে একমুষ্টি (ধুলো বা মাটি) নিয়েছিলাম এবং আমি তা (আমার বানানো বাছুরের মধ্যে) নিক্ষেপ করেছিলাম; আমার মন আমার জন্য শোভন করেছিলো এমন কাজ করা।" মুসা বললো, "দূর হও, তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্য এটাই থাকলো যে, তুমি বলবে, 'আমি অস্পৃশ্য' (আমাকে কেউ স্পর্শ করো না) এবং তোমার জন্য থাকলো এক নির্দিষ্টকাল, তোমার বেলায় যার ব্যতিক্রম হবে না এবং তুমি তোমার সেই ইলাহের প্রতি লক্ষ করো যার পূজায় তুমি রত ছিলে; আমরা ওটাকে জ্বালিয়ে দেবোই, এরপর ওটাকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে নিক্ষিপ্ত করবোই।" তোমাদের ইলাহ তো কেবল আল্লাহই, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, তাঁর জ্ঞান সর্ববিষয়ে ব্যাপ্ত।” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৮৩-৯৮]
উল্লিখিত আয়াতসমূহের মধ্যে নিম্নবর্ণিত আয়াতটির তাফসিরের ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে:
قَالَ فَمَا خَطْبُكَ يَا سَامِرِيُّ )) قَالَ بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا بِهِ فَقَبَضْتُ قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ فَنَبَذْتُهَا وَكَذَلِكَ سَوَّلَتْ لِي نَفْسِي (سورة طه)
মুসা বললো, "হে সামিরি, তোমার ব্যাপার কী?" সামিরি বললো, "আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখে নি। এরপর আমি সেই দূতের (ফেরেশতা জিবরাইল) পদচিহ্ন থেকে একমুষ্টি (ধুলো) নিয়েছিলাম এবং আমি তা নিক্ষেপ করেছিলাম; আমার মন আমার জন্য শোভন করেছিলো এমন কাজ করা।" [সুরা তোয়া-হা : আয়াত ৯৫-৯৬]
আসলে এই আয়াতের মধ্যে কয়েকটি বিষয় আলোচিত হওয়ার যোগ্য। এই বিষয়গুলোর মীমাংসার ওপরই পুরো ঘটনার তাফসির নির্ভর করছে। ১. সামিরি কোন্ বস্তু দেখতে পেয়েছিলো যা অন্যরা, অর্থাৎ বনি ইসরাইলিরা দেখতে পায় নি? ২. 'এক মুষ্টি নিয়েছিলাম' কথার উদ্দেশ্য কী? ৩. রাসুল শব্দের উদ্দেশ্য হযরত মুসা আ. না-কি ফেরেশতা? ৪. 'আমি সেই একমুষ্টি মাটি নিক্ষেপ করলাম' কথার অর্থ কী?
ঘটনাটির পূর্ববর্ণিত বিবরণ থেকে অধিকাংশ মুফাসসিরের সিদ্ধান্ত ও মত জানা গেছে। তবুও এখানে তা সংক্ষিপ্ত আকারে হযরত শাহ আবদুল কাদির সাহেব দেহলবি রহ.-এর ভাষায় শ্রবণ করুন :
"বনি ইসরাইল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া সমুদ্রের ভেতর প্রবেশ করলো। তাদের পেছনে পেছনে ফেরআউন দলবলসহ প্রবেশ করলো। যাতে ফেরআউন বনি ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছতে না পারে, এজন্য জিবরাইল আ. মধ্যস্থলে এসে দাঁড়ালেন। সামিরি চিনতে পারলো যে, ইনি হযরত জিবরাইল আ.। সে তাঁর পদচিহ্ন থেকে কিছু মাটি উঠিয়ে নিলো। এখন সে সেই মাটিটাকেই স্বর্ণনির্মিত গো-বৎসের মধ্যে নিক্ষেপ করলো। স্বর্ণের অলঙ্কারগুলো ছিলো কাফেরদের সম্পদ। ধোঁকার মধ্য দিয়ে এগুলো গ্রহণ করা হয়েছিলো। এখন তাতে বরকতময় মাটি নিক্ষিপ্ত হলো। হক ও বাতিল মিশ্রিত হয়ে একটি কারিশমার সৃষ্টি হলো। ফলে এটির মধ্যে প্রাণ সঞ্চারিত হলো এবং আওয়াজ উৎপন্ন হলো। এমন বস্তু থেকে দূরে থাকা উচিত। এগুলো থেকেই মূর্তিপূজা প্রসার লাভ করে।"
এই তাফসির প্রসঙ্গে রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম ওয়াস সাবয়িল মাসানি-এর লেখক আবুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল- আলুসি বলেন, 'আayatটির এই তাফসির সেই তাফসিরই বটে যা হযরত সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন এবং উচ্চমর্যাদাশীল মুফাস্সিরগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে। ¹⁰⁸
শাহ আবদুল কাদির দেহলবি রহ.-এর তাফসিরের বিপরীত অন্য একটি তাফসির রয়েছে। বিখ্যাত মুতাযিলি আলেম আবু মুসলিম ইসফাহানি এই তাফসির করেছেন। তিনি বলেন, "আয়াতের অর্থ হলো এই: সামিরি হযরত মুসা আ.-কে জবাব দিলো, বনি ইসরাইলের আকিদা ও বিশ্বাসের বিপরীতে আমার এমন ধারণা ছিলো যে, আপনি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নন। সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনার অনুসরণও করেছিলাম এবং আপনার কিছু আদেশ-নিষেধও মান্য করেছিলাম। কিন্তু আপনার অনুসরণের প্রতি আমার অন্তর কখনো একনিষ্ঠ হয় নি এবং অবশেষে আমি আপনার অনুসরণ ও অনুগমনকেও পরিত্যাগ করেছি। এই কর্মপন্থাকেই আমার মন আমার জন্য শোভন করে তুলেছিলো।"
আবু মুসলিম ইসফাহানির কাছে بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا به বাক্যের অর্থ যেনো এই: সামিরি বনি ইসরাইলের আকিদার বিপরীতে গিয়ে হযরত মুসা আ.-কে সত্যপথের ওপর প্রতিষ্ঠিত মনে করতো না। আর فقبضت قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ বাক্যে রাসুলের অর্থ হযরত মুসা আ.। আর أثر الرَّسُولِ অর্থ তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ। শব্দের قبضَة অর্থ সামান্য আনুগত্য আর ذتها শব্দের উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করা।
আবু মুসলিম তাঁর এই তাফসিরের পক্ষে আরবি অভিধান থেকে কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণও উপস্থিত করেছেন এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের তফাসিরের ওপর কিছু প্রশ্নও উত্থাপন করেছেন। সাইয়িদ শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি তাঁর তাফসিরগ্রন্থে এসব প্রশ্নের বিস্তারিত জবাবও দিয়েছেন।
এতকিছু সত্ত্বেও ইমাম আবু আবদুল্লাহ আর-রাযি তাঁর আত-তাফসিরুল কাবিরে (মাফাতিহুল গাইব) আবু মুসলিম ইসফাহানির তাফসিরকেই শক্তিশালী, প্রণিধানযোগ্য ও বিশুদ্ধ বলে মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন: “এটা স্পষ্ট যে, আবু মুসলিম যে-তাফসির বর্ণনা করেছেন তাতে তো অবশ্যই মুফাস্সিসরিনে কেরামের বিরোধিতা পাওয়া যায়; কিন্তু নিম্নবর্ণিত কয়েকটি কারণের প্রতি লক্ষ করলে তাঁর তাফসিরই সত্যের অধিক নিকটবর্তী।”¹⁰⁹
বর্তমান যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে মাওলানা আবুল কালাম আযাদও তরজুমানুল কুরআনে ইসফাহানির তাফসিরকেই অবলম্বন করেছেন।
আলোচ্য আয়াতটি সম্পর্কে কুরআন মাজিদের পূর্বাপর আয়াতগুলো পাঠ করলে এবং এ-প্রসঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহিহ হাদিসগুলোর অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে সত্য ও প্রাধান্যযোগ্য বক্তব্য দাঁড়ায় এটি যে, এ-বিষয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা বর্ণিত হয় নি যার দ্বারা একটি দিকের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় আর অপর দিকটি বাতিল বলে সাব্যস্ত হয়। সম্ভবত এ-কারণেই বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির হাফেযে হাদিস আল্লামা ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. এই প্রসঙ্গে বর্ণিত যাবতীয় রেওয়ায়েতকে সামনে রেখেছেন। তিনি জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরেরই সমর্থন করেছেন এবং আবু মুসলিম ইসফাহানির তাফসিরের সমর্থন করেন নি। এমনকি তিনি ইসফাহানির তাফসির উদ্ধৃতও করেন নি। তারপরও তিনি জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরকে তেমন মর্যাদা প্রদান করেন নি যা রুহুল মাআনির গ্রন্থাকার উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এই যে, এখানে জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরই হাদিসের অকাট্য ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং এখানে অন্য ধরনের তাফসিরের সম্ভাবনা খোদাদ্রোহিতা ও রাসুলের বিরোধিতা বলে গণ্য হবে।
যেমন : আল্লামা ইবনে কাসির উল্লিখিত আয়াতটির তাফসির বর্ণনা করার পর শুধু এতটুকু বলেছেন—
وهذا هو المشهور عند كثير من المفسرين أو أكثرهم.
"এই তাফসিরই বহু মুফাস্স্সির বরং অধিকাংশ মুফাসসিরের কাছে প্রসিদ্ধ।”¹¹⁰
একইভাবে তাঁদের সমসাময়িক বিখ্যাত মুফাস্সির আল্লামা আবু হাইয়ান আল-আন্দালুসি তাঁর 'তাফসিরুল বাহরিল মুহিত' কিতাবে আবু মুসলিম ইসফাহানির তাফসিরকে قل বা 'বলা হয়েছে”¹¹¹ বলে উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তিনি তার সমালোচনায় একটি বাক্যও লেখেন নি এবং নীরবতা অবলম্বন করেছেন।
অতএব, এ-সকল উচ্চমর্যাদাশীল মুফাসিরের এ-ধরনের বক্তব্য থেকে এ-কথা প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরকেই বিশুদ্ধ ও প্রণিধানযোগ্য মনে করছেন; কিন্তু ভিন্ন ধরনের তাফসিরের সম্ভাবনার ব্যাপারে এমন দাবি করেন না যে, তা হাদিসে বর্ণিত নিশ্চিত তাফসিরের বিরোধী এবং তাতে এই আশঙ্কা রয়েছে যে, তার অন্তরালে ধর্মদ্রোহিতা ও ধর্মহীনতা ক্রিয়াশীল।
যাইহোক। এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, এই আয়াতের পূর্বাপর অবস্থা এবং কবুল ও হওয়া ও না হওয়ার ব্যাপারে এখানে কুরআন মাজিদের যাবতীয় আয়াতের বর্ণনাশৈলী-উভয়টিই আবু মুসলিমের তাফসিরকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে এবং প্রকাশ করে যে, তাঁর তাফসির কোনো তাফসিরই নয়, মনগড়া ব্যাখ্যা মাত্র। কেননা, আলোচ্য আয়াতের بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَنْصُرُوا بِهِ (বাসারাহ) দর্শন করা) দ্বারা (بصارة العين )চাক্ষুষ দর্শন)-এর পরিবর্তে (بصارة القلب )অন্তরের দর্শন( অর্থ করা, হযরত মুসা আ.-কে সম্বোধন করেও الرسول বলে তাঁকে তৃতীয় পুরুষের স্থানে দাঁড় করানো, فَقَبَضْتُ قَبْضَةً-এর অর্থ 'একমুষ্টি' না করে 'সামান্য পরিমাণ আনুগত্য করা' বর্ণনা করা এবং فذتها বাক্যে 'আনুগত্য পরিত্যাগ করা' অর্থ গ্রহণ করা-এগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন বাক্যের হিসেবে আরবের কথ্য ভাষায় মেনে নেয়ার যোগ্য; কিন্তু আল্লাহপাকের কালামের পূর্ণ ইবারতের প্রতি লক্ষ করলে আবু মুসলিমের তাফসিরটি একটি দুর্বল ব্যাখ্যার চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী হয় না। আর আগের ও পরের আয়াতগুলো সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, এখানে ওই অর্থই প্রবল ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, যা জমহুর মুফাস্সিরগণ গ্রহণ করেছেন।
এখানে কি এই মৌলিক প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় না যে, যদি সামিরির এ-কথা বলাই উদ্দেশ্য হতো- "আমি অন্তরে আপনার সত্য নবী হওয়ার বিশ্বাস পোষণ করতাম না, কিন্তু সুযোগ ও সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে কিছু দিনের জন্য আপনার আনুগত্য করছিলাম, এখন তাও পরিত্যাগ করলাম"-তবে এমন পরিষ্কার ও সাধাসিধে কথাটুকুর জন্য কুরআন মাজিদের দ্ব্যর্থবোধক ও অস্পষ্ট বিবরণ প্রকাশের প্রয়োজন হলো কেনো?
যার ফলে-মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ভাষায়-মুফাস্সিরগণ এই সুযোগ পেলেন যে, তাঁরা ইহুদি সমাজে প্রচলিত অলীক রেওয়ায়েতগুলোকে আলোচ্য আয়াতের সঙ্গে ঠিক ঠিকভাবে খাপ খাইয়ে দিলেন।
সুতরাং জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসির ইহুদিদের অলীক রেওয়ায়েত নয়; বরং তা কুরআনেরই বর্ণিত বয়ান এবং পরিষ্কারভাবে এদিকে ইঙ্গিত করছে যে, হযরত মুসা আ.-এর জিজ্ঞাসায় সামিরির জবাব অবশ্যই এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ছিলো বিস্ময়রকর বক্রস্বভাব মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তাকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করা হয়েছিলো।
এখন একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, এমন একটি বিচিত্র ও অভিনব ঘটনা একজন পথভ্রষ্ট লোকের হাতে কেমন করে প্রকাশ পেলো? এ-ব্যাপারে সর্বোত্তম জবাব হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ.-এর বক্তব্য যা তাঁর বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ 'মুযিহুল কুরআন' থেকে একটু আগে উদ্ধৃত করা হয়েছে। অর্থাৎ, যখন একটি বাতিলকে অপর কোনো সত্যের সঙ্গে মিশ্রিত করা হয় তখন তাদের সংমিশ্রনে একটি কারিশমা উৎপন্ন হয়। এটি সেই সংমিশ্রণেরই বিশেষত্ব এবং তারই প্রকৃত স্বভাব নামে বর্ণিত হয়ে থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ মনে করুন : আপনি গোলাবি আতরের সঙ্গে কিছু পরিমাণ বিষ্ঠা মিশ্রিত করলেন। তাতের গোলাবের উত্তম ও মনমাতানো সুগন্ধ বিষ্ঠার জঘন্য দুর্গন্ধের সঙ্গে মিলিত হয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করবে যা নিঃসন্দেহে মন ও মস্তিষ্কের ওপর আসল বিষ্ঠার দুর্গন্ধের চেয়েও অত্যন্ত নিকৃষ্ট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। অবস্থা তখন এমন হয়ে যাবে যে, একজন সুস্থ-স্বভাব মানুষ বিষ্ঠার স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সহ্য করতে পারবে; কিন্তু মিশ্রিত এই দুর্গন্ধকে এক নিমিষের জন্য বরদাশত করতে পারবে না। এ-কারণেই ইসলাম সত্য ও মিথ্যার এমন মিশ্রণকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কেননা, এতে কঠিন পথভ্রষ্টতা বিস্তার লাভ করে।
মোটকথা, জমহুরের তাফসিরই সঠিক এবং কুরআন মাজিদের বর্ণনার সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য রাখে।
টিকাঃ
¹⁰¹ মনে হয়, পৃথিবীর সকল মূর্তিপূজক দলের মধ্যে গাভীর পবিত্রতা ও গো-বৎস পূজার এক বিপুল মর্যাদা রয়েছে। এ-কারণেই হিন্দস্তান, ইরাক, ইরান, চীন ও জাপানের মূর্তিপূজক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সমভাবে এর গুরুত্ব পরিলক্ষিত হয়।
¹⁰² মুখে বলেছিলো "শ্রবণ করলাম" আর মনে মনে বলেছিলো "অমান্য করলাম"।
¹⁰⁰ হযরত মুসা আ. বললেন, "আমি তোমাদের প্রতিপালকের নির্দেশ লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গিয়েছি, আর তোমার আমার ফিরে আসার অপেক্ষা না করে এমন ঘৃণ্য কাজ করে ফেললে?"
¹⁰⁴ رأس অর্থ মাথা, এখানে 'মাথার চুল'।
¹⁰⁵ হযরত মুসা আ. তাওরাত আনতে তুর পাহাড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে কয়েকজন গোত্রীয় প্রধানকে নিয়ে যান। তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের আগ্রহে তাদের আগেই পাহাড়ে পৌঁছে যান।
¹⁰⁶ সামিরি সামিরা গোত্রের জনৈক ব্যক্তি, মতান্তরে বনি ইসরাইলের সামিরি নামক জনৈক ব্যক্তি। কাশাফ, কুরতুবি ইত্যাদি।
¹⁰⁷ এখানে 'অগ্নিকুণ্ড' শব্দটি আরবিতে উহ্য আছে। - জালালাইন, কুরতুবি ইত্যাদি।
¹⁰⁸ রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৯, সুরা তোয়া-হা।
¹⁰⁹ আত-তাফসিরুল কাবির : মাফাতিহুল গাইব, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭০।
¹¹⁰ তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা তোয়া-হা।
¹¹¹ কারো কোনো বক্তব্যকে দুর্বল মনে করা হলে قبل বা 'বলা হয়েছে' বলে উদ্ধৃত করা হয়।
📄 সত্তর জন সরদার মনোনয়ন
বনি ইসরাইলের এই অপরাধ যখন ক্ষমা করা হলো তখন হযরত মুসা আ. তাদেরকে বললেন, "এই যে তোমরা আমার কাছে ফলকগুলো দেখছো এটা আল্লাহ তাআলার কিতাব। তোমাদের হেদায়েত এবং ধর্মীয় ও পার্থিব জীবনের কল্যাণের জন্য আল্লাহ তাআলা এই কিতাব আমাকে দান করেছেন। এই কিতাবের নাম তাওরাত। এখন তোমাদের ওপর অবশ্য কর্তব্য ও ফরয হলো এই কিতাববে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব বলে বিশ্বাস করা এবং তার নির্দেশসমূহ পালন করা।"
বনি ইসরাইল আসলে সর্বাবস্থায় বনি ইসরাইলই ছিলো। তারা বলতে লাগলো, "মুসা আমরা কীভাবে বিশ্বাস করি যে এটি আল্লাহর কিতাব। শুধু তোমার কথাতেই তো আমরা বিশ্বাস করবো না। আমরা তো এই কিতাবের ওপর তখনই বিশ্বাস স্থাপন করবো যখন আল্লাহকে আবরণহীন অবস্থায় নিজেদের চোখে দেখতে পাবো। আর আল্লাহ আমাদেরকে বলে দেবেন যে, এটা তাওরাত—আমার কিতাব; তোমরা এই কিতাবের প্রতি ঈমান আনো।"
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে বুঝালেন যে, এটা তো একটা নির্বোধের আবদার। এই চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহ তাআলাকে কে দেখেছে যে তোমরা দেখতে পাবে? এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু বনি ইসরাইল হঠকারিতায় যথারীতি অটল থাকলো। হযরত মুসা আ. তাদের এই অবস্থা দেখে একটু চিন্তা-ভাবনা করে বললেন, এটা তো সম্ভব হতে পারে না যে, তোমরা লাখ লাখ লোক এই কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আমার সঙ্গে তুর পাহাড়ে গমন করো। সুতরাং এটা সমীচীন হবে যে, তোমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোককে নির্বাচিত করে আমার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। তারা যখন ফিরে এসে সত্যতার সাক্ষ্য দেবে তখন তোমরাও তা মেনে নেবে। আর যেহেতু তোমরা এখন গো-বৎসের পূজা করে খুব বড় একটি অন্যায় করে ফেলেছো, তাই লজ্জা ও অনুতাপ প্রকাশ করা এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে ভবিষ্যতে ভালো কাজ করার প্রতিজ্ঞার জন্যও এটি সুবর্ণ সুযোগ। বনি ইসরাইল মুসা আ.-এর এই কথার ওপর সম্মত হলো।
হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্র থেকে সত্তর জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে মনোনীত করে সঙ্গে নিলেন এবং তুর পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছালেন। তৎক্ষণাৎ শুভ্র মেঘের আকারে এক নুর এসে হযরত মুসা আ.-কে আচ্ছাদিত করে ফেললো এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথন শুরু হয়ে গেলো। হযরত মুসা আ. আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, আপনি বনি ইসরাইলের সব অবস্থা জানেন এবং দেখেন। তাদের হঠকারিতার কারণে সত্তর জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে বাছাই করে সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছে। কতই না উত্তম হতো যদি এই নুরের আবরণে আমার ও আপনার মধ্যকার কথোপকথন তারাও শুনতে পেতো এবং কওমের কাছে ফিরে গিয়ে সত্যতা প্রমাণ করার যোগ্য হতো।
আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর দোয়া মঞ্জুর করলেন এবং তাদেরকে নুরের আবরণের ভেতর নিয়ে যাওয়া হলো। তারাও হযরত মুসা আ. এবং আল্লাহপাকের মধ্যকার কথাবার্তা শুনতে পেলো। এরপর নুরের আবরণ সরে গেলো এবং মুসা আ. ও ওই নেতৃবৃন্দের মধ্যে মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলো। ওই সরদারেরা আগের মতোই তাদের হঠকারিতার ওপর গোঁ ধরে থাকলো যে, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহ তাআলাকে অনাবৃত অবস্থায় নিজেদের চোখে দেখবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ঈমান আনবো না। নির্বোধের মতো এই হঠকারিতা ও একগুঁয়েমির কারণে আল্লাহপাকের ক্রোধের উদ্রেক হলো। তিনি তৎক্ষণাৎ সরদারদের ওপর শাস্তি অবতীর্ণ করলেন: এক ভয়ঙ্কর বিদ্যুৎ, বজ্রধ্বনি ও ভূমিকম্প এসে তাদেরকে গ্রাস করলো এবং জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দিলো। হযরত মুসা আ. এই ঘটনা দেখে অত্যন্ত কাকুতি-মিনতির সঙ্গে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ, এই নির্বোধেরা বোকামি করে ফেলেছে। সে জন্য কি আপনি আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেবেন? হে আল্লাহ, আপনার অনুগ্রহে তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর প্রার্থনা কবুল করলেন এবং তাদের সবাইকে পুনরায় জীবন দান করলেন। এভাবে যখন তারা নতুন জীবন লাভ করে জীবিত হয়ে উঠছিলো, তারা একে অন্যের নতুন জীবন লাভ করাকে স্বচক্ষে দেখছিলো।
কুরআন মাজিদে এই ঘটনাকে ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে-
وَاخْتَارَ مُوسَى قَوْمَهُ سَبْعِينَ رَجُلًا لِمِيقَاتِنَا فَلَمَّا أَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ قَالَ رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُمْ مِنْ قَبْلُ وَإِيَّايَ أَتَهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاءُ مِنَّا إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَنْ تَشَاءُ وَتَهْدِي مَنْ تَشَاءُ أَنْتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ () وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ )) الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزْرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (سورة الأعراف)
'মুসা তার সম্প্রদায় থেকে সত্তর জন লোককে আমার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করলো। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হলো, তখন মুসা বললো, "হে আমার প্রতিপালক, তুমি ইচ্ছা করলে আগেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে! (কিন্তু তোমার দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে অবকাশ দিয়েছো।) আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ, তারা যা করেছে সেইজন্য কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এ তো শুধু তোমার পরীক্ষা, যার দ্বারা তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করো এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করো। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক; সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো এবং ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ। আমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে নির্ধারিত করো কল্যাণ, আমরা তোমার কাছে প্রত্যাবর্তন করেছি।" আল্লাহ বললেন, "আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া—তা তো প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারণ করবো যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত প্রদান করে এবং আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে। যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মি নবীর, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইনজিল, যা তাদের কাছে আছে তাতে লিপিব্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে বাধা দে, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং যে মুক্ত তাদেরকে তাদের গুরুভার থেকে ও শৃঙ্খল¹¹⁷ থেকে যা তাদের ওপর ছিলো। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে (সত্যের পথে) সাহায্য করে এবং যে-নুর তার (নবীর) সঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৫-১৫৭)
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً فَأَخَذَتْكُمُ الصَّاعِقَةُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ () ثُمَّ بَعَثْنَاكُمْ مِنْ بَعْدِ مَوْتِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (سورة البقرة)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মুসা, আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনো বিশ্বাস করবো না", তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে এবং তোমরা নিজেরাই দেখছিলে।¹¹⁸ এরপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমি তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করলাম যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।' [সুরা বাকারা : আয়াত ৫৫-৫৬) ¹¹⁹
টিকাঃ
¹¹⁷ অর্থাৎ, কঠিন বিধানাবলি-যা পূর্ববর্তী শরিয়তে ছিলো। অথবা পরাক্রমশালী শত্রুর অত্যাচার ও পরধীনতার শঙ্খল।
¹¹⁸ আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখার দাবি জানানোয় শাস্তিস্বরূপ তাদের সত্তরজন প্রতিনিধির মৃত্যু ঘটে।
¹¹⁹ এরপর হযরত মুসা আ.-এর দোয়ায় আল্লাহপাক তাদেরকে পুনর্জীবিত করেছিলেন।
📄 মৃত্যুর পরে জীবন
কুরআন মাজিদ মৃত্যুর পর জীবনের সাধারণ নিয়ম এই বলেছে যে, এই পার্থিব মৃত্যুর পরে আবার পরলোকেও পুনরায় জীবন দান করা হবে। কিন্তু বিশেষ নিয়ম এই যে, কোনো কোনো সময় প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার প্রতি লক্ষ রেখে আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়াতেই মৃতকে জীবন দান করে থাকেন। আম্বিয়ায়ে কেরামের মুজেযাময় জীবনে কুরআনের সাক্ষ্য অনুযায়ী এই সত্য কয়েকবার প্রকাশিত হয়েছে।
কুরআন মাজিদ যখন 'মুত্যুর পরবর্তী জীবনের' উল্লেখ করে, তখন তার ইঙ্গিত এই যে, কুরআন এই জীবনকে بعث বা জীবিত হয়ে ওঠা বলে ব্যক্ত করে থাকে।
সুরা বাকারার এই আয়াতেও কুরআন মাজিদ বনি ইসরাইলের নেতৃবৃন্দের মৃত্যু ও ধ্বংস এবং তাদের পুনরুজ্জীবিত হওয়াকে بعث শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছে। আর لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ যেনো 'তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো' বলে এই ঘটনার মূল সত্যকে আরো অধিক পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ঘটনা ঘটেছিলো এই, তাদের অযৌক্তিক ও ধৃষ্টতামূলক হঠকারিতার কারণে ভূমিকম্প এসে তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দিলো। এরপর হযরত মুসা আ.-এর বিনীত আবেদনে আল্লাহর অসীম রহমত উদ্বেলিত হয়ে উঠলো আর ওই ভস্মীভূত লোকগুলো পুনরায় জীবন দান করলো। যেনো তারা শোকর আদায় করে এবং ভবিষ্যতে এমন অনর্থক হঠকারিতা ও একগুঁয়েমি না করে এবং আল্লাহর সত্যিকারের আনুগত্যশীল বান্দা হয়ে যায়।
এই বিস্তারিত বিবরণের পর সহজেই এ-কথা বোধগম্য হতে পারে যে, যে-সকল সমসাময়িক মুফাস্সিরগণ উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে 'হায়াত বা'দাল মামাত' অর্থাৎ, 'মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করা' অর্থকে এড়ানোর জন্য হালকা ও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন তা সঠিক নয়। তাঁরা নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ ব্যতীতই কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ও পরিষ্কার বর্ণনাশৈলীকে মনগড়া ব্যাখ্যার ওপর কুরবান করে দিয়েছেন।
📄 সাধারণ রহমতের ঘোষণা
সুরা আ'রাফের আয়াত- قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ 'আল্লাহ বললেন, আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া-তা তো প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৬]
এই আয়াত কুরআন মাজিদের গুরুত্বপূর্ণ আয়াতসমূহের অন্যতম। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে যে-আযাব আগমন করে তা বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে হয়ে থাকে। অন্যথায় আযাব প্রদান আল্লাহর সিফত বা গুণ নয়; বরং রহমতই তাঁর আদি ও অনন্ত গুণ। অর্থাৎ, তাঁর রহমত গুণটি সবার জন্য ব্যাপক। বিশ্বজগতের এমন কোনো বস্তুও নেই যা তাঁর রহমতের গুণ থেকে বঞ্চিত বা শূন্য। বরং এরূপ বলুন, 'যাকে তোমরা আল্লাহর আযাব বলছো তা তোমাদের কার্যাবলির সঙ্গে সম্পর্কের বিবেচনায় আযাব। অন্যথায় অস্তিত্বের কারখানার পূর্ণ নকশার প্রতি লক্ষ করে যদি তোমরা গভীরভাবে চিন্তা করো, তবে একেও রহমত বলে দেখতে পাবে।'
এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ 'দয়া করা তিনি তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন।' [সুরা আন'আম : আয়াত ১২]
আর এই ব্যাপক রহমতের পূর্ণ প্রকাশস্থল ও পূর্ণ প্রতিবিম্ব সে-মহান সত্তা, যাঁর উল্লেখ সুরা আ'রাফের ওই আয়াতে এভাবে করা হয়েছে যে, তাঁর আগমনের আগেই পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে তাঁর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে এবং তাঁর গুণাবলি ও চারিত্রিক মাধুর্যও আলোচিত হয়েছে। অন্য এক আয়াতে তাঁকে رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ‘গোটা বিশ্বের জন্য রহমত’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ¹²⁰
টিকাঃ
¹²⁰ এই আয়াতে পূর্ণ ব্যাখ্যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী আলোচনার সময় বলা হবে।