📄 তুর পাহাড়ের ওপর ইতিকাফ
হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ছিলো যে, বনি ইসরাইলিরা যখন মিসরীয় শাসনের দাসত্ব থেকে স্বাধীন হয়ে যাবে তখন তাঁকে শরিয়ত প্রদান করা হবে। এখন সেই সময় এসে পড়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছে। সুতরাং হযরত মুসা আ. আল্লাহ তাআলার ওহির ইঙ্গিতে তুর পাহাড়ে গিয়ে উপনীত হলেন এবং ওখানে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার জন্য ইতিকাফ করলেন। এই ইতিকাফের মেয়াদ ছিলো তিরিশ দিন বা একমাস। পরে তিনি আরো দশ দিন বাড়িয়ে চল্লিশ দিন পূর্ণ করেন।
তাফসিরে রুহুল মাআনিতে এ-বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে—
وأخرج الديلمي عن ابن عباس يرفعه فَلَمَّا أَتَى رَبَّهُ أَرَادَ أَنْ يُكَلِّمَهُ فِي ثَلَاثِينَ وَقَدْ صَامَهُنَّ : لَيْلَهُنَّ وَنَهَارَهُنَّ ، كَرِهَ أَنْ يُكَلِّمَ رَبَّهُ وَيَخْرُجَ مِنْ فَمِهِ رِيحَ فَمِ الصَّائِمِ ، فَتَنَاوَلَ مُوسَى شَيْئًا مِنْ نَبَاتِ الْأَرْضِ فَمَضَغَهُ ، فَقَالَ لَهُ رَبُّهُ حِينَ أَتَاهُ : أَفَطَرْتَ ؟ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالَّذِي كَانَ ، قَالَ : رَبِّ كَرِهْتُ أَنْ أُكَلِّمَكَ إِلَّا وَفَمِي طَيّبُ الرِّيحِ ، قَالَ : أَوَمَا عَلِمْتَ يَا مُوسَى أَنْ رِيحَ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدِي مِنْ ريحِ الْمِسْكِ ؟ ارْجِعْ حَتَّى تَصُومَ عَشْرًا ، ثُمَّ ائْتِنِي ، فَفَعَلَ مُوسَى مَا أُمِرَ بِهِ
"দাইলামি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং এটি মারফু বলেছেন: হযরত মুসা আ. যখন তাঁর প্রতিপালকের কাছে এলেন, তিরিশ দিনব্যাপী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। তিনি এই তিরিশ দিন অনবরত রোযা রেখেছেন। ফলে মুসা আ. অনুভব করলেন যে, তাঁর মুখ থেকে রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধের মতো দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। তাই এ-অবস্থায় তিনি রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে কথা বলতে অপছন্দ করলেন। মুসা আ. জমিনের গাছ থেকে একটি অংশ নিলেন এবং তা দিয়ে দাঁত মর্দন করলেন। তিনি তাঁর রবের কাছে যাওয়ার পর তাঁর রব তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রোযা ভেঙে দিয়েছো? যা হয়েছে সে-সম্পর্কে আল্লাহপাক অবহিতই ছিলেন। মুসা আ. বললেন, হে আমার রব, আমার মুখ সুগন্ধময় না করে আপনার সঙ্গে কথা বলতে অপছন্দ করেছি। আল্লাহ বললেন, হে মুসা, তুমি কি জানো না রোযাদারের মুখের গন্ধ আমার কাছে মেসকের ঘ্রাণের চেয়েও উত্তম? তুমি ফিরে যাও এবং আরো দশ দিন রোযা রাখো। তারপর আমার কাছে এসো। মুসা আ. যে-বিষয়ে আদিষ্ট হলেন, তখন তা-ই করলেন। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হলো।"⁹²
কিন্তু কুরআন মাজিদে শুধু এতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সময়সীমা প্রথমে তিরিশ দিন ছিলো। এরপর দশ দিন বাড়িয়ে চল্লিশ দিন করা হলো। কিন্তু তার কারণ বর্ণনা করা হয় নি।
ঘটনার এই অংশটুকু কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
وَوَاعَدْنَا مُوسَى ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً (سورة الأعراف)
'স্মরণ করো, মুসার জন্য আমি তিরিশ রাত নির্ধারিত করি (অর্থাৎ, পূর্ণ একমাস তুর পাহাড়ে ইতিকাফে থেকে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে থাকো। তারপর তোমাকে শরিয়ত প্রদান করা হবে। মুসা আ. এই মুদ্দত শেষ করলেন) এবং আরো দশ দ্বারা তা পূর্ণ করি। এইভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাতে পূর্ণ হয়।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪২]
হযরত মুসা আ. যখন তুর পাহাড়ের ওপর প্রতিশ্রুত ইতিকাফের মুদ্দত পালন করতে গেলেন তখন তার সহোদর বড়ভাই হারুন আ.-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে গেলেন এ-ব্যাপারে যে, তিনি বনি ইসরাইলকে সত্যপথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং প্রতিটি ব্যাপারে তাদের দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।
১-বিষয়টি কুরআন মাজিদ বর্ণনা করছে এভাবে—
وَقَالَ مُوسَى لِأَخِيهِ هَارُونَ اخْلُفْنِي فِي قَوْمِي وَأَصْلِحْ وَلَا تَتَّبِعْ سَبِيلَ الْمُفْسِدِي (سورة الأعراف)
এবং মুসা তার ভাই হারুনকে বললো, "আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন এবং বপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।" [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪২]
টিকাঃ
⁹² রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম ওয়াস সাবয়িল মাসানি, আবুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি, সুরা আ'রাফ, আয়াত ১৪২। কিন্তু হাদিসের বর্ণনাকারীদের নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাদের কাছে দাইলামি নির্ভরযোগ্য নন।—গ্রন্থকার।
⁹³ আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য সুফিয়ানে কেরামের চিল্লা পালন করার নিয়ম খুব সম্ভব এই ঘটনা থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত, কোনো কাজে আল্লাহ পক্ষ থেকে দৃঢ়তা লাভের জন্য সাধারণত এই চিল্লা পালন করা কল্যাণকর।
⁹⁴ হযরত মুসা আ.-কে তাওরাত প্রাপ্তির জন্য প্রথমে তিরিশ দিন, আরও পরে দশ দিন বৃদ্ধি করে মোট চল্লিশ দিন সিয়ামসহ ইতিকাফের মতো একই স্থানে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় থাকতে হয়েছিলো।
📄 পবিত্র সত্তার তাজাল্লি
ইতিকাফের মুদ্দত পূর্ণ হয়ে গেলো এবং আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা মা.-কে পারস্পরিক কথোপকথনের মর্যাদা দান করলেন। হযরত মুসা আ. চরম আনন্দানুভূতি ও প্রফুল্ল চিত্ততার সঙ্গে আরজ করলেন, “হে আল্লাহপাক, আপনি যখন আমাকে আপনার বাণী শ্রবণের স্বাদ উপভোগ করালেন, তখন আর আপনাকে স্বচক্ষে দর্শনের এবং আপনার দিদার লাভের স্বাদ থেকে কেনো বঞ্চিত থাকবো? এটিও দান করে আমাকে সৌভাগ্যবান করুন।" আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে জবাব এলো, "হে মুসা, তুমি 'যাতে পাক'কে (পবিত্র সত্তাকে) দর্শন করতে সক্ষম হবে না। আচ্ছা, তবে দেখো, এই পাহাড়ের ওপর আমি আমার সত্তার নুরের তাজাল্লি প্রকাশ করবো, যদি তুমি এই তাজ্জালিকে সহ্য করে নিতে পারো, এরপর তাহলে তুমি আবেদন করো (স্বচক্ষে আমার দর্শন লাভের আবেদন করো)।" এরপর তুর পাহাড়ের অংশবিশেষের ওপর আল্লাহ তাআলার নুরের তাজাল্লি প্রকাশিত হলো। এতে পাহাড়ের ওই অংশটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো। হযরত মুসা আ. তা দর্শনে অপারগ ও সংজ্ঞাহারা হয়ে পড়লেন।
মুসা আ. যখন পুনরায় সংজ্ঞা ফিরে পেলেন, তিনি মহান আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও স্তুতিবাণী বর্ণনা করতে লাগলেন। তাঁর আবেদন প্রত্যাহার করে নিলেন এবং বললেন, "আমি স্বীকার করছি এবং এ-কথার ওপর ঈমান আনছি যে, আপনার সৌন্দর্যের তাজাল্লি, মারেফাত ও সত্য প্রকাশে কোনো ত্রুটি নেই। ত্রুটি কেবল আমার সত্তার অপারগতার এবং নিরুপায়তার।" এই ঘটনা কুরআন মাজিদে নিম্নলিখিত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে—
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَنْ تَرَانِي وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرْ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكَّا وَخَرٌ مُوسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ (سورة الأعراف)
'মুসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন তখন সে বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখবো।" তিনি বললেন, "তুমি কখনোই আমাকে দেখতে পাবে না।"⁹⁵ তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ করো, তা (আল্লাহ তাআলার জ্যোতি সহ্য করতে পারলে এবং) স্বস্থানে স্থির থাকলে তবে তুমি আমাকে দেখবে।' যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলো এবং মুসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো। যখন সে জ্ঞান ফিরে ফেলো তখন বললো, "মহামহিম তুমি, আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম।" [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৩]
টিকাঃ
⁹⁵ দুনিয়াতে দেখবে না, পরকালে জান্নাতে প্রবেশের পর সকল জান্নাতবাসী আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করবে।
📄 তাওরাত নাযিল হওয়া
এই রহস্য উন্মোচিত হওয়ার পর হযরত মুসা আ.-কে তাওরাত প্রদান করা হলো। আল্লাহ রাব্বুল আলামি মুসা আ.-কে নির্দেশ দিলেন, এই কিতাবের বিধি-বিধানের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থেকো। তোমার সম্প্রদায় বনি ইসরাইলকে বলো, তারা যেনো এই কিতাবের ওপর এমনভাবে আমল করে যাতে, যে-নেক আমল যত অধিক আল্লাহর নৈকট্যলাভের কারণ হয়, তাকে অন্যান্য আমলের ওপর প্রাধান্য দান করে। এই কিতাবে আমি তোমাদের জন্য যাবতীয় ধর্মীয় ও পার্থিব কল্যাণকর বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি। আর হালাল ও হারাম এবং প্রশংসনীয় গুণাবলি ও নিন্দনীয় দোষাবলি—মোটকথা যাবতীয় নির্দেশ ও নিষেধকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছি এবং এটাই আমার শরিয়ত।
এই মর্মে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করছে—
قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَاتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُنْ مِنَ الشَّاكِرِينَ () وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْعِظَةً وَتَفْصِيلًا لِكُلِّ شَيْءٍ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍ وَأْمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا بِأَحْسَنِهَا سَأُرِيكُمْ دَارَ الْفَاسِقِينَ (سورة الأعراف)
'তিনি (আল্লাহ তাআলা) বললেন, “হে মুসা, আমি তোমাকে আমার রিসালাত (রাসুলের মর্যাদা ও দায়িত্ব) ও আমার বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি; সুতরাং আমি যা (তাওরাত কিতাব) দিলাম তা গ্রহণ করো এবং কৃতজ্ঞ হও।" আমি তার (মুসার) জন্য (তাওরাতের) ফলকগুলোতে সর্ববিষয়ে উপদেশ এবং সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছি; সুতরাং সেগুলো শক্তভাবে ধরো এবং তোমার সম্প্রদায় সেগুলোর যা উত্তম তা গ্রহণ করতে নির্দেশ দাও।⁹⁶ আমি শিগগিরই সত্যাত্যাগীদের (নাফরমান লোকদের) বাসস্থান তোমাদেরকে দেখাবো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৪-১৪৫]
এখানে দুটি বিষয় মনোযোগ প্রদানের যোগ্য:
১. উলামায়ে ইসলাম (ইসলামের মনীষী ও তত্ত্বজ্ঞানীবৃন্দ) বলেন, তুর পাহাড়ের এই ঘটনায় যে-আহকামগুলো নাযিল হয়ে তা তাওরাত। আর উলামায়ে নাসারার (খ্রিস্টান ধর্মজ্ঞানী) বর্তমান সম্প্রদায় বলেন, এই ঘটনার আহকামগুলোর উদ্দেশ্য ওই দশটি আহকাম যা হযরত মুসা আ.-এর ধর্মে 'শরিয়ত বা আহকামে আহ্দ' নামে অভিহিত। অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারো ইবাদত করো না; ব্যভিচার করো না; চুরি করো না ইত্যাদি। আর সমসাময়িক কোনো কোনো মুফাস্স্সিরও আলোচ্য আয়াতটির লক্ষ্যস্থল আহকামে আহ্দকেই সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় অভিমতটি কুরআন মাজিদ ও তাওরাত উভয়ের সাক্ষ্য থেকেই ভুল প্রমাণিত হয় এবং প্রথম অভিমতই শুদ্ধ ও সঠিক। কেননা, কুরআন মাজিদ সুরা বাকারায় হযরত মুসা আ.-এর ইতিকাফের মুদ্দতের উল্লেখ করে যখন আহকামগুলোর আলোচনা করেছে তখন সেগুলোকে কিতাব ও ফুরকান বলেছে। আর কুরআন মাজিদে এই দুটি বিশেষণ তাওরাতের জন্য বলা হয়েছে; 'আহকামে আহ্দ'-এর জন্য বলা হয় নি। যেমন: কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ () ثُمَّ عَفَوْنَا عَنْكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (( وَإِذْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَالْفُرْقَانَ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ (سورة البقرة)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা) যখন মুসার জন্য চল্লিশ রাত⁹⁷ নির্ধারিত করেছিলাম, তাঁর প্রস্থানের পর তোমরা গো-বৎসকে⁹⁸ উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে; আর তোমরা তো জালিম। এরপরও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো। এবং স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা) যখন আমি মুসাকে কিতাব ও ফুরকান দান করেছিলাম যাতে তোমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হও।' (সুরা বাকারা: ৫১-৫৩)
কুরআন মাজিদের অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ مِنْ بَعْدِ مَا أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ الْأُولَى بَصَائِرَ لِلْנَّاسِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّרُونَ (sورة القصص)
'আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পর মুসাকে দিয়েছিলাম কিতাব, মানবজাতির জন্য জ্ঞানবর্তিকা, পথনির্দেশ ও অনুগ্রহরস্বরূপ, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৪৩]
আর তাওরাত (বর্তমান যুগের বাইবেল)-এর 'সিফরে খুরুজ' (নিষ্ক্রমণ- পুস্তক); 'সিফরে ইসতিসনা' (ব্যতিক্রম-পুস্তক) ও 'কিতাবে ইয়াসু' (ইয়াসু অধ্যায়)-এ উল্লেখিত হযরত মুসা আ.-এর ইতিকাফের মুদ্দতের পর যদিও 'আহকামে আহ্দ' বা 'শরিয়ত' শব্দ পাওয়া যায়, কিন্তু মাওলানা রহমতুল্লাহ কিরানবি রহ. তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'ইযহারুল হক'-এ আরবি, ফার্সি, উর্দু এবং প্রাচীনকালের তরজমার উদ্ধৃতি দিয়ে এ-কথা প্রমাণ করেছেন যে, তাওরাতের ওইসব নুসখা বা প্রতিলিপিতে 'আহকামে আহ্দ' ও 'শরিয়ত' শব্দ দুটির স্থরে 'তাওরাত' লিখিত পাওয়া যায়। যেমন: মাওলানা আবদুল হক রহ.-ও তাঁর তাফসিরগ্রন্থ 'তাফসিরে হক্কানি'তে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে উর্দু ও ফার্সি ভাষায় মুদ্রিত বাইবেল থেকে নিম্নবর্ণিত তথ্যপ্রমাণ উদ্ধৃত করেছেন: ১। "আর ওই ফলকগুলোর ওপর এই তাওরাতের সমস্ত কথা স্পষ্ট অক্ষরে লিখো।” [ইসতিসনা-পুস্তক, অনুচ্ছেদ ২৭, আয়াত ২৮] এখানে তাওরাত শব্দটির উল্লেখ আছে। ২। "বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-এর নির্দেশ অনুসারে জবাই করার একটি স্থান নির্মাণ করলো এবং তার পাথরগুলোর ওপর তাওরাত লিখে দিলো।” [ইয়াসু অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৮, আয়াত ১৫, ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত। এখানেও তাওরাত শব্দটির উল্লেখ আছে।
এসব তথ্যপ্রমাণ থেকে এ-কথা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, হযরত মুসা আ.-কে তুর পাহাড়ে ইতিকাফের মুদ্দতের পর যে-কাষ্ঠফলক প্রদান করা হয়েছিলো, তা তাওরাতেরই ছিলো, 'আহকামে আহ্দ'-এর নয়। আর তাওরাতের ইংরেজি অনুবাদে Law এবং আরবি ও উর্দু অনুবাদের নুসখাগুলোতে 'শরিয়ত' শব্দকে মেনে নিলেও এই শব্দগুলোও তাদের অর্থের ব্যাপকতায় তাওরাতকে বুঝাতে পারে। বস্তুত, তাওরাত, শরিয়ত, বিধান-এই শব্দ তিনটির লক্ষ্যস্থল একই বস্তু। আর প্রাচীন খ্রিস্টান দুনিয়ায় এই অর্থই গ্রহণ করা হতো; 'আহকামে আহ্দ' তারই একটি অংশ এবং এটিকে স্বতন্ত্র সাব্যস্ত বহু পরবর্তীকালের উদ্ভাবন।
সুরা আ'রাফের উপরিউক্ত আয়াতে এই বাক্যটি রয়েছে-
سَأُرِيكُمْ دَارَ الْفَاسِقِينَ 'অচিরেই আমি তোমাদেরকে সত্যত্যাগীদের (নাফরমান লোকদের) আবাসস্থল দেখাবো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৫]
এখানে বিবেচ্য বিষয় এই যে, এই আয়াতে আবাসস্থল দ্বারা কোন্ স্থান উদ্দেশ্য। বর্ণনাকারীরা ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে বিভিন্ন জবাব দিয়েছেন: এই আবাসস্থল দ্বারা উদ্দেশ্য 'আদ' ও সামুদ' সম্প্রদায় দুটির (বসতভূমির) ধ্বংসাবশেষ; ২. মিসর ভূমি, অর্থাৎ, বনি ইসরাইল পুনরায় তাতে প্রবেশ করবে; ৩. কাতাদা রহ. বলেন, এর দ্বারা শামদেশের পবিত্র ভূমি উদ্দেশ্য। শামদেশে তখন আমালিকা সম্প্রদায়ের দুর্দান্ত রাজাদের শাসন ছিলো। আর এখানেই বনি ইসরাইলের প্রবেশ করার কথা ছিলো। ¹⁰⁰
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি কাতাদা রহ.-এর বর্ণিত মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর আমার (গ্রন্থকার) মতে এটিই বিশুদ্ধ মত। তবে এই কথা হলো এই যে, হযরত মুসা আ. এবং বনি ইসরাইলের বৃদ্ধরা শামদেশের আবাসভূমিগুলোতে প্রবেশ করতে পারেন নি। কেননা, এই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের পূর্বেই হযরত মুসা আ.-এর ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছিলো। সামনে বর্ণিত বিস্তারিত বিবরণ অনুসারে, একইভাবে বনি ইসরাইলের বৃদ্ধদের ওপর পবিত্র শামদেশের ভূমিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। সুতরাং, আয়াতটির অর্থ হয়তো এই দাঁড়াবে যে, বনি ইসরাইলের যুবকদের—যারা সংখ্যায় অন্য সবার চেয়ে বেশি ছিলো—প্রবেশকেই সকলের প্রবেশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ-জাতীয় অর্থগ্রহণ আরবদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। অথবা, আয়াতটির উদ্দেশ্য এই যে, হযরত মুসা আ. ইউশা বিন নুন ও কালিব বিন ইউকান্নাহ এবং বনি ইসরাইলের অন্য কতিপয় বীরবাহাদুরকে পবিত্র ভূমিতে পাঠিয়েছিলেন। তা এইজন্য যে, তাঁরা ওখানে গিয়ে ওখানকার বিস্তারিত অবস্থা জেনে আসবেন যে, তাঁরা কীভাবে শত্রুকে পরাজিত করে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারেন। তাঁরা ফিরে এসে সব অবস্থা হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের কাছে বর্ণনা করলেন। এই কয়েকজনের পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করা, পর্যবেক্ষণ করা এবং তারপর সবাইকে ওখানকার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা—আয়াতে যেনো এরই দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কাতাদাহ রহ.-এর বক্তব্যের মোকাবিলায় দ্বিতীয় উক্তিটি এ-কারণে দুর্বল যে, এই ঘটনার পর বনি ইসরাইলের গোটা জাতি কখনো একত্র হয়ে মিসরে প্রবেশ করে নি। আর প্রথম উক্তিটি এ-কারণে গ্রহণযোগ্য নয় যে, সামুদ সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষগুলো অবশ্যই সাইনা প্রান্তরের নিকটবর্তীই ছিলো; কিন্তু আদ সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষগুলো আরব দেশের পশ্চিমাংশে সাইনা প্রান্তর থেকে কয়েক মাসের দূরত্বে অবস্থিত ছিলো। সুতরাং, এ থেকে এমন কোনো কারণ আমাদের বোধগম্য হয় না, যার ফলে বনি ইসরাইলকে কেবল বিলুপ্তপ্রায় চিহ্নসমূহ এবং ধ্বংসাবশেষগুলো দেখানোর জন্য পাঠানো হয়েছিলো। আর এর জন্য আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি এত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হতো না। এখানে আরেকটি অভিমত এটিও আছে যে, 'সত্যত্যাগী লোকদের আবাসস্থল' বলে 'জাহান্নাম' উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আর কথাটি কাফেরদেরকে ভয় প্রদর্শনের জন্য বলা হয়েছে।
যাইহোক। হযরত মুসা আ.-কে তাওরাত প্রদান করা হলো। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলে দেয়া হলো, আমার বিধান এই-হেদায়েত আসার পর এবং তার সত্যতার পক্ষে উজ্জ্বল প্রমাণসমূহ উপস্থিত হওয়ার পরও যখন কোনো সম্প্রদায় তাদের বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না, বিপথগামিতা এবং পিতৃপুরুষদের অসৎ প্রথা ও কুসংস্কারের ওপরই প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তার ওপর বাড়াবাড়িই করতে থাকে, তবে আমিও তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতার ওপরই ছেড়ে রাখি এবং আমার সত্যের পয়গামে তাদের জন্য কোনো অংশই অবশিষ্ট থাকে না। কেননা, তারা নিজেদের অবাধ্যতামূলক নাফরমানির কারণে সত্য গ্রহণের যোগ্যতাকেই বিনষ্ট করে দেয়।
কুরআন মাজিদে এই মর্মার্থকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-
سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِنْ يَرَوْا كُلِّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الْغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ () وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَلِقَاءِ الْآخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (سورة الأعراف)
'পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে দম্ভ করে বেড়ায় তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শন থেকে (অন্যদিকে) ফিরিয়ে দেবো; তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও বিশ্বাস করবে না, তারা সৎপথ দেখলেও তাকে পথ বলে গ্রহণ করবে না; কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে তাকে তারা পথ হিসেবে গ্রহণ করবে। তা এইজন্য যে, তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করেছে এবং সে-সম্পর্কে তারা ছিলো গাফিল। যারা আমার নিদর্শন ও আখেরাতের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়। তারা যা করে সে-অনুযায়ীই তাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৬-১৪৭]
টিকাঃ
⁹⁶ তাওরাতে যে-নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা-ই উত্তম এবং যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা-ই মন্দ। প্রদত্ত বিধানাবলির মধ্যে কিছু অতি উচ্চ পর্যায়ের, এগুলোকে পালন করা عزيمة অর্থাৎ অতি উচ্চমানের নিষ্ঠা আর সাধারণ বিধানের অনুসরণ رخصة অর্থাৎ নিচু স্তরের নিষ্ঠা, যাকে জায়েয বলা যায়।
⁹⁷ হযরত মুসা আ. আল্লাহর নির্দেশে তুর পাহাড়ে চল্লিশ দিন ও চল্লিশ রাত ইবাদতে মশগুল থাকার পর প্রতিশ্রুত তাওরাত কিতাব লাভ করেছিলেন।
⁹⁸ সামিরি নামক এক ব্যক্তি গো-বৎসের একটি প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছিলো। তার প্ররোচনায় কিছু সংখ্যক বনি ইসরাইল এই গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলো।
¹⁰⁰ রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম ওয়াস সাবয়িল মাসানি, আবুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩, সুরা আ'রাফ।
📄 গো-বৎস পূজার ঘটনা
ইতোমধ্যে এর একটি বিচিত্র ও অভিনব ঘটনা ঘটলো। এটিকে যেমন বিস্ময়কর ব্যাপার বলা যায়, তেমনি আফসোসেরও বিষয় বলা যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে বনি ইসরাইলের নীচ মানসিকতা ও চারিত্রিক হীনতা উন্মোচিত হয়ে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে হযরত মুসা আ. তুর বা হাওরাব পাহাড়ের ওপর বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে মগ্ন এবং বনি ইসরাইলের জন্য আল্লাহ তাআলার বিধান (তাওরাত) অর্জন করার কাজে ব্যস্ত। আর এদিকে নিম্নদেশে সাইনা প্রান্তরে বনি ইসরাইলিরা সামিরির নেতৃত্বে নিজেরাই নিজেদের মাবুদ (গো-বৎস) মনোনীত করে তার চারপাশে আসর বানিয়ে তার পূজা করতে লাগলো।
অধিকাংশ মুফাস্সিরের তাফসির অনুযায়ী ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ এই: হযরত মুসা আ. যখন তাওরাত আনার জন্য তুর পাহাড়ে যেতে প্রস্তুত হলেন, তিনি বনি ইসরাইলকে বললেন, "তুর পাহাড়ে আমারা ইতিকাফের মুদ্দত (সময়সীমা) একমাস। মুদ্দত শেষ হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আমি তোমাদের কাছে ফিরে আসবো। হারুন আ. তোমাদের কাছে থাকলেন। তিনি তোমাদের যাবতীয় অবস্থার তত্ত্ববধান করবেন। কিন্তু তাঁর তুর পাহাড়ে পৌছার পর ইতিকাফের মুদ্দত চল্লিশ দিন হয়ে গেলো। মুসা আ.-এর ফিরে আসার বিলম্ব দেখে সামিরি নামের এক ব্যক্তি সুযোগ গ্রহণ করলো। সে দেখলো যে, মুসা আ.-এর ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় বনি ইসরাইল অস্থির হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা দেখে সে বনি ইসরাইলকে বললো, যদি তোমরা তোমাদের ওইসব অলঙ্কার আমার কাছে নিয়ে আসো, যা তোমরা মিসরীয়দের কাছ থেকে ধার করে এনেছিলে এবং মিসর থেকে বের হয়ে আসার সময় তাড়াহুড়ার কারণে ফিরিয়ে দিতে পারো নি, তবে আমি সেগুলো দিয়ে তোমাদের জন্য একটি মঙ্গলজনক কাজ করে দেবো।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে সামিরি যদিও মুসলমান ছিলো, কিন্তু তার অন্তরে কুফরি ও শিরকের অপবিত্রতা পরিপূর্ণভাবেই ছিলো। বনি ইসরাইলিরা তাদের সব অলঙ্কার তার কাছে এনে জমা করলো। সে অলঙ্কারগুলোকে আগুনের ভাটার মধ্যে রেখে গলিয়ে ফেললো এবং ওগুলো দিয়ে গো-বৎসরের অবয়ব প্রস্তুত করলো। এরপর তার থলি থেকে একমুষ্টি মাটি বের করে ওই অবয়বটির ভেতর রাখলো। এই পদ্ধতি অবলম্বনের ফলে বাছুরটির মধ্যে প্রাণের লক্ষণ জেগে উঠলো এবং তা গো-বাছুরের মতো হাম্বা হাম্বা রবে ডাকতে শুরু করলো।
তখন সামিরি বনি ইসরাইলকে বললো, মুসা আ.-এর ভ্রান্তি ও ভুল হয়েছে। তিনি খোদার অন্বেষণে তুর পাহাড়ে গিয়েছেন। তোমাদের মাবুদ তো এখানেই বিদ্যমান।
একটু পূর্বে বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বর্ণিত হয়েছে যে, কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর রাজ্যের গোলামি বনি ইসরাইলের মধ্যে শিরকি আকিদা ও এবং কুসংস্কার ও প্রথার রঙ ছড়িয়ে দিয়েছিলো এবং তারা ওই রঙে যথেষ্ট পরিমাণে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিলো। আর গো-বাছুরের পূজা মিসরের প্রাচীনকালের একটি বিশ্বাস ছিলো। তাদের ধর্মে গো-বাছুরের পূজা ছিলো বেশ গুরুত্ব ও মর্যাদার অধিকারী। এ-কারণেই তাদের এক বড় দেবতা (হাওরাস)-এর মুখ গাভীর আকৃতির ছিলো। তাদের বিশ্বাস ছিলো যে, গাভীর মাথার ওপর ভূগোলকটি স্থাপিত রয়েছে। ¹⁰¹
সামিরি বনি ইসরাইলকে উৎসাহ প্রদান করলো যে, তারা যেনো তার নিজ হাতে নির্মিত গো-বৎসকে তাদের উপাস্য মনে করে এবং সেটার পূজা করে। তারা সামিরির এই কথাকে সহজেই গ্রহণ করে নিলো। হযরত হারুন আ. বনি ইসরাইলের এই কাণ্ড দেখে তাদের খুব বুঝালেন যে, তোমরা এমন করো না। এটা ভ্রষ্টতার পথ। কিন্তু তারা হযরত হারুন আ.-এর কথা মানতে অস্বীকৃতি জানালো এবং তারা বললো, আমরা যা-কিছু অবলম্বন করেছি, মুসা আ. ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা তা থেকে বিরত হবো না।
বনি ইসরাইলের ব্যাপার যখন এই পর্যন্ত পৌঁছে গেলো, তখন আল্লাহ তাআলার কল্যাণকামিতা ও প্রজ্ঞার চাহিদা হলো যে তিনি মুসা আ.-কে সে-সম্পর্কে অবহিত করে দেন। সুতরাং তিনি হযরত মুসা আ.-কে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে মুসা, তুমি তোমার কওমকে ফেলে রেখে এখানে আসার ব্যাপারে এত তাড়াহুড়া করলে কেনো?' হযরত মুসা আ. আরজ করলেন, 'হে আল্লাহ, এইজন্য যে, আপনার কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছে কওমের জন্য হেদায়েত লাভ করি।' আল্লাহ তাআলা তখন বললেন, 'যাদের হেদায়েতের জন্য তুমি এত অস্থির তারা তো এমন গোমরাহির মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছে।' হযরত মুসা আ. এ-কথা শুনে অত্যন্ত মর্মবেদনা, ক্রোধ ও লজ্জার সঙ্গে তাঁর কওমের কাছে ফিরে এলেন। তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন, তোমরা এটা কী করলে? আমার এমন কী বিলম্ব হয়েছিলো যে তোমরা এমন আপদ ঘটিয়ে ফেললে? তিনি এসব কথা বলছিলেন এবং ক্ষেভে ও ক্রোধে কাঁপছিলেন। এমনকি তাঁর হাত থেকে তাওরাতের ফলকগুলো পড়ে গেলো।
বনি ইসরাইলিরা বললো, আমাদের কোনো দোষ নেই। মিসরীয়দের অলঙ্কারগুলো আমরা সঙ্গে নিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। সেগুলোই সামিরি আমাদের থেকে চেয়ে নিয়েছে এবং এই সঙ বানিয়েছে। এভাবে সে আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।
'শিরক' নবুওতের পদের জন্য একটি অসহ্যকর বিষয়। এটি একটি কারণ, আরো একটি কারণ এই যে, হযরত মুসা আ. অত্যন্ত গরম মেজাজের লোক ছিলেন—তিনি তার ভাই হারুন আ.-এর ঘাড় ধরে ফেললেন এবং তার দাড়ির দিকেও হাত বাড়ালেন। তখন হারুন আ. বললেন, 'হে আমার ভাই, আমার কোনোই দোষ নেই। আমি তাদেরকে যতই বুঝালাম, তারা কোনোভাবেই মানলো না। তারা আমাকে বলতে শুরু করলো, মুসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা তোমার কোনো কথাই শুনবো না। বরং তারা আমাকে দুর্বল পেয়ে আমাকে হত্যা করার সংকল্প করেছিলো। আমি তাদের এই অবস্থা দেখে ভাবলাম, এখন যদি আমি এদের মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে দিই এবং পূর্ণ ঈমানদার ও এদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে, তাহলে পরে আমার ওপর এই দোষারোপ হতে পারে যে, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি কওমের মধ্যে বিভেদ বাঁধিয়ে দিয়েছো। এ-কারণে আমি নীরব থেকে তোমার অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রিয় ভাই, তুমি আমার মাথার চুল ধরে টেনো না এবং দাড়িও ধরো না। এভাবে তুমি অন্য লোকদের হাসার সুযোগ দিও না।
হারুন আ.-এর এই যুক্তিযুক্ত বক্তব্য শুনে তাঁর ওপর থেকে হযরত মুসা আ.-এর ক্রোধ প্রশমিত হয়ে গেলো। এখন সামিরিকে লক্ষ করে বলতে লাগলেন, 'হে সামিরি, তুমি এটা কেমন সঙ বানালে?' সামিরি জবাব দিলো, 'আমি এমন একটি বিষয় দেখতে পেয়েছি যা বনি ইসরাইলের মধ্যে আর কেউ দেখতে পায় নি। অর্থাৎ, ফেরআউনের ডুবে মরার সময় হযরত জিবরাইল আ. ঘোড়ার পিঠে চড়ে ফেরআউন ও বনি ইসরাইলের মধ্যস্থলে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি দেখলাম যে, তাঁর ঘোড়ার খুরের আঘাতে জমিনে প্রাণের লক্ষণ সঞ্চারিত হচ্ছে এবং শুকনো মাটিতে উদ্ভিদ উৎপন্ন হচ্ছে। তখন আমি হযরত জিবরাইল আ.-এর ঘোড়ার পায়ের মাটি থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে নিজের কাছে রাখলাম। সেই মাটিকে আমি এই বাছুরের ভেতর নিক্ষেপ করলাম। তৎক্ষণাৎ বাছুরটির মধ্যে প্রাণের লক্ষণ সঞ্চারিত হয়ে গেলো এবং তা 'হাম্বা' 'হাম্বা' আওয়াজ দিতে শুরু করলো।'
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আচ্ছা, তোমার জন্য পৃথিবীতে এই শাস্তি নির্ধারিত করা হলো যে, তুমি উন্মাদের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াবে। কোনো মানুষকে তোমার কাছে আসতে দেখলেই তার থেকে পলায়ন করতে করতে বলবে, দেখো, আমাকে স্পর্শ করো না। এই তো হলো তোমার পার্থিব শান্তি। আর কিয়ামতের দিনে এমন অবাধ্য ও পথভ্রষ্টের জন্য যে-শাস্তি নির্ধারিত আছে, তা তোমার জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতির আকারে পূর্ণ হবে।
হে সামিরি, তুমি এটাও দেখে রাখো যে, তুমি যে-গোবৎসকে উপাস্য বানিয়েছিলে এবং তার চারপাশে জটলা বেঁধে পূজায় বসেছিলে, আমি এখনই ওটাকে আগুনে নিক্ষেপ করে ভস্ম করে দিচ্ছি এবং সেই ভস্মকে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছি—যেনো তুই ও তোর নির্বোধ অনুসারীরা বুঝতে পারিস তোদের উপাস্যের মর্যাদা ও মূল্য এবং ক্ষমতা ও শক্তির অবস্থা হলো এই, সে অপরের দয়া ও করুণা কী করবে, সে নিজের অস্তিত্বকেই ধ্বংস ও বিনাশ থেকে রক্ষা করতে পারে না।
ওরে হতভাগার দল, তোমরা কি এই সাধারণ কথাটুকুও বুঝতে পারলে না যে, একমাত্র আল্লাহই তোমার মাবুদ ও উপাস্য, তাঁর কোনো সঙ্গীও নেই এবং শরিকও নেই। তিনি সর্ববিষয়ে জ্ঞানী ও অবহিত।
ঘটনার এই অংশ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَ لَقَدْ جَآءَكُمْ مُوْسٰى بِالْبَيِّنٰتِ ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهٖ وَاَنْتُمْ ظٰلِمُوْنَ () وَاِذْ اَخَذْنَا مِیْثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّوْرَ خُذُوْا مَآ اٰتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَّاسْمَعُوْا قَالُوْا سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَاُشْرِبُوْا فِیْ قُلُوْبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ قُلْ بِئْسَمَا يَاْمُرُكُمْ بِهٖ اِيْمَانُكُمْ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ (سورة البقرة)
'এবং নিশ্চয় মুসা তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছে। এরপর তার প্রস্থানের পর তোমার গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে। আর তোমরা তো জালিম। (তোমরা ঈমানের পথে দৃঢ় ছিলে না; তোমরা কাফের হয়ে গিয়েছিলে।) স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুরকে তোমাদের (মাথার) ওপর উত্তোলন করেছিলাম। বলেছিলাম, “যা দিলাম তা দৃঢ়রূপে গ্রহণ করো ও শ্রবণ করো।" তারা বলেছিলো, "আমরা শ্রবণ করলাম ও অমান্য করলাম।"¹⁰² কুফরির কারণে তাদের হৃদয়ে (-এর পরতে পরতে) গো-বৎস প্রেম সিঞ্চিত হয়েছিলো। বলো, "যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে তোমাদের ঈমান যা-কিছুর নির্দেশ দেয় তা কত নিকৃষ্ট!"' [সূরা বাকারা: আয়াত ৯২-৯৩]
وَاتَّخَذَ قَوْمُ مُوسَى مِنْ بَعْدِهِ مِنْ حُلِيِّهِمْ عِجْلًا جَسَدًا لَهُ خُوَارٌ أَلَمْ يَرَوْا أَنَّهُ لَا يُكَلِّمُهُمْ وَلَا يَهْدِيهِمْ سَبِيلًا اتَّخَذُوهُ وَكَانُوا ظَالِمِينَ () وَلَمَّا سُقِطَ فِي أَيْدِيهِمْ وَرَأَوْا أَنَّهُمْ قَدْ ضَلُّوا قَالُوا لَئِنْ لَمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ () وَلَمَّا رَجَعَ مُوسَى إِلَى قَوْمِهِ غَضْبَانَ أَسِفًا قَالَ بِئْسَمَا خَلَفْتُمُونِي مِنْ بَعْدِي أَعَجِلْتُمْ أَمْرَ رَبِّكُمْ وَأَلْقَى الْأَلْوَاحَ وَأَخَذَ بِرَأْسِ أَخِيهِ يَجُرُّهُ إِلَيْهِ قَالَ ابْنَ أُمَّ إِنَّ الْقَوْمَ اسْتَضْعَفُونِي وَكَادُوا يَقْتُلُونَنِي فَلَا تُشْمِتْ بِيَ الْأَعْدَاء وَلَا تَجْعَلْنِي مَعَ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ )) قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ (( إِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَذِلَّةٌ فِي الْحَيَياةِ الدُّنْيَا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُفْتَرِينَ (( وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَحِيمٌ (( وَلَمَّا سَكَتَ عَنْ مُوسَى الْغَضَبُ أَخَذَ الْأَلْوَاحَ وَفِي نُسْخَتِهَا هُدًى وَرَحْمَةٌ لِلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُونَ (سورة الأعراف)
'মুসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে (তাঁর তুর পাহাড়ে চলে যাওয়ার পর) নিজেদের অলঙ্কার দিয়ে (অলঙ্কারগুলো গলিয়ে) গড়ে নিলো একটি গো-বৎস-একটি অবয়ব, যা 'হাম্বা' আওয়াজ করতো। (আফসোস তাদের বুদ্ধির ওপর!) তারা কি (এই সাধারণ বিষয়টাও) দেখলো না যে, তা তাদের সঙ্গে কথাও বলে না এবং তাদেরকে পথও দেখায় না? তারা এটিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করলো এবং তারা ছিলো জালিম। তারা যখন অনুতপ্ত হলো ও দেখলো যে তারা (সত্য থেকে) পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, তখন তারা বললো, "আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের প্রতি দয়া না করেন এবং আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবোই।" মুসা যখন ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এলো, তাদেরকে বললো, "আমার অনুপস্থিতিতে তোমারা আমার কত নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্ব করেছো! তোমাদের প্রতিপালকের আদেশের পূর্বে তোমরা ত্বরান্বিত করলে?”¹⁰⁰ এবং সে (উত্তেজিত হয়ে তাওরাত- লিখিত) ফলকগুলো ফেলে দিলো এবং তার ভাইকে চুলে¹⁰⁴ ধরে নিজের দিকে টেনে আনলো। হারুন বললো, "হে আমার সহোদর, (আমি কী করবো?) লোকেরা তো আমাকে দুর্বল মনে করেছিলো এবং আমাকে প্রায় খুন করেই ফেলেছিলো। তুমি আমার সঙ্গে এমন করো না যাতে শত্রুরা আনন্দিত হয় এবং তুমি আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত করো না।" মুসা বললো, “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন, (কেননা, আমি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম) এবং আমার ভাইকে (-ও) ক্ষমা করুন (কারণ তিনি পথভ্রষ্টদেরকে কঠোরভাবে বারণ করতে পারেন নি) আর আমাদেরকে আপনার রহমতের মধ্যে দাখিল করুন। তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” যারা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে পার্থিব জীবনে তাদের ওপর তাদের প্রতিপালকের ক্রোধ ও লাঞ্ছনা আপতিত হবেই। আর এইভাবে আমি মিথ্যারচনাকারীদের (তাদের দুষ্কর্মের) প্রতিফল দিয়ে থাকি। যার অসৎকাজ করে তার পরে তওবা করলে ও ঈমান আনলে তোমার প্রতিপালক তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। মুসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হলো, তখন সে (তাওরাতের) ফলকগুলো তুলে নিলো। যারা তাদেরকে প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য ফলকগুলোতে যা লিখিত ছিলো তাতে ছিলো পথনির্দেশ ও রহমত।' [সুরা আ'রাফ : ১৪৮-১৫৪]
وَمَا أَعْجَلَكَ عَنْ قَوْمِكَ يَا مُوسَى () قَالَ هُمْ أُولَاءِ عَلَى أَثَرِي وَعَجِلْتُ إِلَيْكَ رَبِّ لِتَرْضَى () قَالَ فَإِنَّا قَدْ فَتَنَّا قَوْمَكَ مِنْ بَعْدِكَ وَأَضَلُّهُمُ السَّامِرِيُّ () فَرَجَعَ مُوسَى إِلَى قَوْمِهِ غَضَبَانَ أَسِفًا قَالَ يَا قَوْمِ أَلَمْ يَعِدُكُمْ رَبُّكُمْ وَعْدًا حَسَنًا أَفَطَالَ عَلَيْكُمُ الْعَهْدُ أَمْ أَرَدْتُمْ أَنْ يَحِلَّ عَلَيْكُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّكُمْ فَأَخْلَفْتُمْ مَوْعِدِي )) قَالُوا مَا أَخْلَفْنَا مَوْعِدَكَ بِمَلْكِنَا وَلَكِنَّا حُمِّلْنَا أَوْزَارًا مِنْ زِينَةِ الْقَوْمِ فَقَذَفْنَاهَا فَكَذَلِكَ أَلْقَى السَّامِرِيُّ ( فَأَخْرَجَ لَهُمْ عِجْلًا جَسَدًا لَهُ خُوَارٌ فَقَالُوا هَذَا إِلَهُكُمْ وَإِلَهُ مُوسَى فَنَسِيَ () أَفَلَا يَرَوْنَ أَلَّا يَرْجِعُ إِلَيْهِمْ قَوْلًا وَلَا يَمْلِكُ لَهُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا ) وَلَقَدْ قَالَ لَهُمْ هَارُونُ مِنْ قَبْلُ يَا قَوْمِ إِنَّمَا فُتِنْتُمْ بِهِ وَإِنْ رَبَّكُمُ الرَّحْمَنُ فَاتَّبِعُونِي وَأَطِيعُوا أَمْرِي )) قَالُوا لَنْ تَبْرَحَ عَلَيْهِ عَاكِفِينَ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْنَا مُوسَى () قَالَ يَا هَارُونُ مَا مَنَعَكَ إِذْ رَأَيْتَهُمْ ضَلُّوا )) أَلَّا تَتَّبِعَنِ أَفَعَصَيْتَ أَمْرِي () قَالَ يَبْنَوْمَ لَا تَأْخُذْ بِلحْيَتِي وَلَا بِرَأْسِي إِنِّي خَشِيتُ أَنْ تَقُولَ فَرَّقْتَ بَيْنَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَمْ تَرْقُبْ قَوْلِي () قَالَ فَمَا خَطْبُكَ يَا سَامِرِيُّ )) قَالَ بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا بِهِ فَقَبَضَتُ قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ فَنَبَذْتُهَا وَكَذَلِكَ سَوَّلَتْ لِي نَفْسِي () قَالَ فَاذْهَبْ فَإِن لَكَ فِي الْحَيَياةِ أَنْ تَقُولَ لَا مِسَاسَ وَإِنْ لَكَ مَوْعِدًا لَنْ تُخْلَفَهُ وَانْظُرْ إِلَى إِلَهِكَ الَّذِي ظَلْتَ عَلَيْهِ عَاكِفًا لَنُحَرِّقَتْهُ ثُمَّ لَنَنْسِفَنَّهُ فِي الْيَمِّ نَسْفًا () إِنَّمَا إِلَهُكُمُ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَسِعَ كُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا (سورة طه)
(মুসা তুর পর্বতে পৌছার পর আল্লাহপাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন,) “হে মুসা, তোমার সম্প্রদায়কে পেছনে ফেলে (এখানে আসার জন্য) তোমাকে ত্বরা করতে বাধ্য করলো কীসে? মুসা বললো, “এই তো তারা আমার পেছনে¹⁰⁵ এবং হে আমার প্রতিপালক, আমি ত্বরায় তোমার কাছে এলাম, তুমি সন্তুষ্ট হবে এইজন্য।" আল্লাহ বললেন, "আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলেছি তোমার চলে আসার পর, এবং সামিরি¹⁰⁶ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।" এরপর মুসা তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলো ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে। সে বললো, “হে আমার সম্প্রদায়, (এটা তোমরা কী করলে!) তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেন নি? তবে কি প্রতিশ্রুতিকাল তোমাদের কাছে সুদীর্ঘ হয়েছে (যে, তোমরা তা মনে রাখতে পারলে না) না তোমরা চেয়েছো তোমাদের প্রতি আপতিত হোক তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ, যে-কারণে তোমরা আমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?” তারা বললো, “আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করি নি তবে (অন্য একটি ঘটনা ঘটে গেলো,) আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো (মিসরীয়) লোকদের অলঙ্কারের বোঝা (ভারী ভারী অলঙ্কারের বোঝা যা বহন করতে আমরা ইচ্ছুক ছিলাম না) এবং আমরা তা অগ্নিকুণ্ডে¹⁰⁷ নিক্ষেপ করি, (এটাই আমাদের অপরাধ!) অনুরূপভাবে সামিরিও নিক্ষেপ করে।" এরপর সে (সামিরি) তাদের জন্য গড়ে দিলো একটি (স্বর্ণের) গো-বৎস—এক অবয়ব, যা 'হাম্বা' আওয়াজ করতো। তারা বললো, "এটা তোমাদের ইলাহ (উপাস্য) এবং মুসারও ইলাহ, কিন্তু মুসা ভুলে গেছে।” (তাদের বুদ্ধির ওপর আফসোস!) তবে কি তারা ভেবে (এই সাধারণ বিষয়টাও ভেবে) দেখি নি যে, তা তাদের কথায় সাড়া দেয় না এবং তাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না? হারুন তাদেরকে আগেই বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, এটা (গো-বৎস) দ্বারা তো তোমাদেরকে কেবল (ধৈর্য ও দৃঢ়তার) পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। তোমাদের প্রতিপালক তো দয়াময়; সুতরাং তোমরা আমার অনুসরণ করো এবং আমার আদেশ মেনে চলো।" তারা বলেছিলো, "আমাদের কাছে মুসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজা থেকে কিছুতেই বিরত হবো না।" মুসা বললো, "হে হারুন, তুমি যখন দেখলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তখন কীসে তোমাকে নিবৃত্ত করলো—আমার অনুসরণ করা থেকে? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে?" হারুন বললো, “হে আমার সহোদর, আমার দাড়ি ও চুল ধরো না। (আমি যদি কঠোরতা না করে থাকি তবে তা কেবল এটা মনে করে যে,) আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে, তুমি বলবে, তুমি বনি ইসরাইলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছো এবং তুমি আমার বাক্য পালনে যত্নবান হও নি।” (এরপর সামিরিকে) মুসা বললো, "হে সামিরি, তোমার ব্যাপার কী?" সামিরি বললো, "আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখে নি। এরপর আমি সেই দূতের (ফেরেশতা জিবরাইল) পদচিহ্ন থেকে একমুষ্টি (ধুলো বা মাটি) নিয়েছিলাম এবং আমি তা (আমার বানানো বাছুরের মধ্যে) নিক্ষেপ করেছিলাম; আমার মন আমার জন্য শোভন করেছিলো এমন কাজ করা।" মুসা বললো, "দূর হও, তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্য এটাই থাকলো যে, তুমি বলবে, 'আমি অস্পৃশ্য' (আমাকে কেউ স্পর্শ করো না) এবং তোমার জন্য থাকলো এক নির্দিষ্টকাল, তোমার বেলায় যার ব্যতিক্রম হবে না এবং তুমি তোমার সেই ইলাহের প্রতি লক্ষ করো যার পূজায় তুমি রত ছিলে; আমরা ওটাকে জ্বালিয়ে দেবোই, এরপর ওটাকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে নিক্ষিপ্ত করবোই।" তোমাদের ইলাহ তো কেবল আল্লাহই, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, তাঁর জ্ঞান সর্ববিষয়ে ব্যাপ্ত।” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৮৩-৯৮]
উল্লিখিত আয়াতসমূহের মধ্যে নিম্নবর্ণিত আয়াতটির তাফসিরের ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে:
قَالَ فَمَا خَطْبُكَ يَا سَامِرِيُّ )) قَالَ بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا بِهِ فَقَبَضْتُ قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ فَنَبَذْتُهَا وَكَذَلِكَ سَوَّلَتْ لِي نَفْسِي (سورة طه)
মুসা বললো, "হে সামিরি, তোমার ব্যাপার কী?" সামিরি বললো, "আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখে নি। এরপর আমি সেই দূতের (ফেরেশতা জিবরাইল) পদচিহ্ন থেকে একমুষ্টি (ধুলো) নিয়েছিলাম এবং আমি তা নিক্ষেপ করেছিলাম; আমার মন আমার জন্য শোভন করেছিলো এমন কাজ করা।" [সুরা তোয়া-হা : আয়াত ৯৫-৯৬]
আসলে এই আয়াতের মধ্যে কয়েকটি বিষয় আলোচিত হওয়ার যোগ্য। এই বিষয়গুলোর মীমাংসার ওপরই পুরো ঘটনার তাফসির নির্ভর করছে। ১. সামিরি কোন্ বস্তু দেখতে পেয়েছিলো যা অন্যরা, অর্থাৎ বনি ইসরাইলিরা দেখতে পায় নি? ২. 'এক মুষ্টি নিয়েছিলাম' কথার উদ্দেশ্য কী? ৩. রাসুল শব্দের উদ্দেশ্য হযরত মুসা আ. না-কি ফেরেশতা? ৪. 'আমি সেই একমুষ্টি মাটি নিক্ষেপ করলাম' কথার অর্থ কী?
ঘটনাটির পূর্ববর্ণিত বিবরণ থেকে অধিকাংশ মুফাসসিরের সিদ্ধান্ত ও মত জানা গেছে। তবুও এখানে তা সংক্ষিপ্ত আকারে হযরত শাহ আবদুল কাদির সাহেব দেহলবি রহ.-এর ভাষায় শ্রবণ করুন :
"বনি ইসরাইল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া সমুদ্রের ভেতর প্রবেশ করলো। তাদের পেছনে পেছনে ফেরআউন দলবলসহ প্রবেশ করলো। যাতে ফেরআউন বনি ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছতে না পারে, এজন্য জিবরাইল আ. মধ্যস্থলে এসে দাঁড়ালেন। সামিরি চিনতে পারলো যে, ইনি হযরত জিবরাইল আ.। সে তাঁর পদচিহ্ন থেকে কিছু মাটি উঠিয়ে নিলো। এখন সে সেই মাটিটাকেই স্বর্ণনির্মিত গো-বৎসের মধ্যে নিক্ষেপ করলো। স্বর্ণের অলঙ্কারগুলো ছিলো কাফেরদের সম্পদ। ধোঁকার মধ্য দিয়ে এগুলো গ্রহণ করা হয়েছিলো। এখন তাতে বরকতময় মাটি নিক্ষিপ্ত হলো। হক ও বাতিল মিশ্রিত হয়ে একটি কারিশমার সৃষ্টি হলো। ফলে এটির মধ্যে প্রাণ সঞ্চারিত হলো এবং আওয়াজ উৎপন্ন হলো। এমন বস্তু থেকে দূরে থাকা উচিত। এগুলো থেকেই মূর্তিপূজা প্রসার লাভ করে।"
এই তাফসির প্রসঙ্গে রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম ওয়াস সাবয়িল মাসানি-এর লেখক আবুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল- আলুসি বলেন, 'আayatটির এই তাফসির সেই তাফসিরই বটে যা হযরত সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন এবং উচ্চমর্যাদাশীল মুফাস্সিরগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে। ¹⁰⁸
শাহ আবদুল কাদির দেহলবি রহ.-এর তাফসিরের বিপরীত অন্য একটি তাফসির রয়েছে। বিখ্যাত মুতাযিলি আলেম আবু মুসলিম ইসফাহানি এই তাফসির করেছেন। তিনি বলেন, "আয়াতের অর্থ হলো এই: সামিরি হযরত মুসা আ.-কে জবাব দিলো, বনি ইসরাইলের আকিদা ও বিশ্বাসের বিপরীতে আমার এমন ধারণা ছিলো যে, আপনি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নন। সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনার অনুসরণও করেছিলাম এবং আপনার কিছু আদেশ-নিষেধও মান্য করেছিলাম। কিন্তু আপনার অনুসরণের প্রতি আমার অন্তর কখনো একনিষ্ঠ হয় নি এবং অবশেষে আমি আপনার অনুসরণ ও অনুগমনকেও পরিত্যাগ করেছি। এই কর্মপন্থাকেই আমার মন আমার জন্য শোভন করে তুলেছিলো।"
আবু মুসলিম ইসফাহানির কাছে بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَبْصُرُوا به বাক্যের অর্থ যেনো এই: সামিরি বনি ইসরাইলের আকিদার বিপরীতে গিয়ে হযরত মুসা আ.-কে সত্যপথের ওপর প্রতিষ্ঠিত মনে করতো না। আর فقبضت قَبْضَةً مِنْ أَثَرِ الرَّسُولِ বাক্যে রাসুলের অর্থ হযরত মুসা আ.। আর أثر الرَّسُولِ অর্থ তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ। শব্দের قبضَة অর্থ সামান্য আনুগত্য আর ذتها শব্দের উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করা।
আবু মুসলিম তাঁর এই তাফসিরের পক্ষে আরবি অভিধান থেকে কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণও উপস্থিত করেছেন এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের তফাসিরের ওপর কিছু প্রশ্নও উত্থাপন করেছেন। সাইয়িদ শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি তাঁর তাফসিরগ্রন্থে এসব প্রশ্নের বিস্তারিত জবাবও দিয়েছেন।
এতকিছু সত্ত্বেও ইমাম আবু আবদুল্লাহ আর-রাযি তাঁর আত-তাফসিরুল কাবিরে (মাফাতিহুল গাইব) আবু মুসলিম ইসফাহানির তাফসিরকেই শক্তিশালী, প্রণিধানযোগ্য ও বিশুদ্ধ বলে মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন: “এটা স্পষ্ট যে, আবু মুসলিম যে-তাফসির বর্ণনা করেছেন তাতে তো অবশ্যই মুফাস্সিসরিনে কেরামের বিরোধিতা পাওয়া যায়; কিন্তু নিম্নবর্ণিত কয়েকটি কারণের প্রতি লক্ষ করলে তাঁর তাফসিরই সত্যের অধিক নিকটবর্তী।”¹⁰⁹
বর্তমান যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে মাওলানা আবুল কালাম আযাদও তরজুমানুল কুরআনে ইসফাহানির তাফসিরকেই অবলম্বন করেছেন।
আলোচ্য আয়াতটি সম্পর্কে কুরআন মাজিদের পূর্বাপর আয়াতগুলো পাঠ করলে এবং এ-প্রসঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহিহ হাদিসগুলোর অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে সত্য ও প্রাধান্যযোগ্য বক্তব্য দাঁড়ায় এটি যে, এ-বিষয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা বর্ণিত হয় নি যার দ্বারা একটি দিকের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় আর অপর দিকটি বাতিল বলে সাব্যস্ত হয়। সম্ভবত এ-কারণেই বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাস্সির হাফেযে হাদিস আল্লামা ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. এই প্রসঙ্গে বর্ণিত যাবতীয় রেওয়ায়েতকে সামনে রেখেছেন। তিনি জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরেরই সমর্থন করেছেন এবং আবু মুসলিম ইসফাহানির তাফসিরের সমর্থন করেন নি। এমনকি তিনি ইসফাহানির তাফসির উদ্ধৃতও করেন নি। তারপরও তিনি জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরকে তেমন মর্যাদা প্রদান করেন নি যা রুহুল মাআনির গ্রন্থাকার উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এই যে, এখানে জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরই হাদিসের অকাট্য ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং এখানে অন্য ধরনের তাফসিরের সম্ভাবনা খোদাদ্রোহিতা ও রাসুলের বিরোধিতা বলে গণ্য হবে।
যেমন : আল্লামা ইবনে কাসির উল্লিখিত আয়াতটির তাফসির বর্ণনা করার পর শুধু এতটুকু বলেছেন—
وهذا هو المشهور عند كثير من المفسرين أو أكثرهم.
"এই তাফসিরই বহু মুফাস্স্সির বরং অধিকাংশ মুফাসসিরের কাছে প্রসিদ্ধ।”¹¹⁰
একইভাবে তাঁদের সমসাময়িক বিখ্যাত মুফাস্সির আল্লামা আবু হাইয়ান আল-আন্দালুসি তাঁর 'তাফসিরুল বাহরিল মুহিত' কিতাবে আবু মুসলিম ইসফাহানির তাফসিরকে قل বা 'বলা হয়েছে”¹¹¹ বলে উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তিনি তার সমালোচনায় একটি বাক্যও লেখেন নি এবং নীরবতা অবলম্বন করেছেন।
অতএব, এ-সকল উচ্চমর্যাদাশীল মুফাসিরের এ-ধরনের বক্তব্য থেকে এ-কথা প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসিরকেই বিশুদ্ধ ও প্রণিধানযোগ্য মনে করছেন; কিন্তু ভিন্ন ধরনের তাফসিরের সম্ভাবনার ব্যাপারে এমন দাবি করেন না যে, তা হাদিসে বর্ণিত নিশ্চিত তাফসিরের বিরোধী এবং তাতে এই আশঙ্কা রয়েছে যে, তার অন্তরালে ধর্মদ্রোহিতা ও ধর্মহীনতা ক্রিয়াশীল।
যাইহোক। এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, এই আয়াতের পূর্বাপর অবস্থা এবং কবুল ও হওয়া ও না হওয়ার ব্যাপারে এখানে কুরআন মাজিদের যাবতীয় আয়াতের বর্ণনাশৈলী-উভয়টিই আবু মুসলিমের তাফসিরকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে এবং প্রকাশ করে যে, তাঁর তাফসির কোনো তাফসিরই নয়, মনগড়া ব্যাখ্যা মাত্র। কেননা, আলোচ্য আয়াতের بَصُرْتُ بِمَا لَمْ يَنْصُرُوا بِهِ (বাসারাহ) দর্শন করা) দ্বারা (بصارة العين )চাক্ষুষ দর্শন)-এর পরিবর্তে (بصارة القلب )অন্তরের দর্শন( অর্থ করা, হযরত মুসা আ.-কে সম্বোধন করেও الرسول বলে তাঁকে তৃতীয় পুরুষের স্থানে দাঁড় করানো, فَقَبَضْتُ قَبْضَةً-এর অর্থ 'একমুষ্টি' না করে 'সামান্য পরিমাণ আনুগত্য করা' বর্ণনা করা এবং فذتها বাক্যে 'আনুগত্য পরিত্যাগ করা' অর্থ গ্রহণ করা-এগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন বাক্যের হিসেবে আরবের কথ্য ভাষায় মেনে নেয়ার যোগ্য; কিন্তু আল্লাহপাকের কালামের পূর্ণ ইবারতের প্রতি লক্ষ করলে আবু মুসলিমের তাফসিরটি একটি দুর্বল ব্যাখ্যার চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী হয় না। আর আগের ও পরের আয়াতগুলো সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, এখানে ওই অর্থই প্রবল ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, যা জমহুর মুফাস্সিরগণ গ্রহণ করেছেন।
এখানে কি এই মৌলিক প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় না যে, যদি সামিরির এ-কথা বলাই উদ্দেশ্য হতো- "আমি অন্তরে আপনার সত্য নবী হওয়ার বিশ্বাস পোষণ করতাম না, কিন্তু সুযোগ ও সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে কিছু দিনের জন্য আপনার আনুগত্য করছিলাম, এখন তাও পরিত্যাগ করলাম"-তবে এমন পরিষ্কার ও সাধাসিধে কথাটুকুর জন্য কুরআন মাজিদের দ্ব্যর্থবোধক ও অস্পষ্ট বিবরণ প্রকাশের প্রয়োজন হলো কেনো?
যার ফলে-মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ভাষায়-মুফাস্সিরগণ এই সুযোগ পেলেন যে, তাঁরা ইহুদি সমাজে প্রচলিত অলীক রেওয়ায়েতগুলোকে আলোচ্য আয়াতের সঙ্গে ঠিক ঠিকভাবে খাপ খাইয়ে দিলেন।
সুতরাং জমহুর মুফাস্সিরগণের তাফসির ইহুদিদের অলীক রেওয়ায়েত নয়; বরং তা কুরআনেরই বর্ণিত বয়ান এবং পরিষ্কারভাবে এদিকে ইঙ্গিত করছে যে, হযরত মুসা আ.-এর জিজ্ঞাসায় সামিরির জবাব অবশ্যই এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ছিলো বিস্ময়রকর বক্রস্বভাব মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তাকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করা হয়েছিলো।
এখন একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, এমন একটি বিচিত্র ও অভিনব ঘটনা একজন পথভ্রষ্ট লোকের হাতে কেমন করে প্রকাশ পেলো? এ-ব্যাপারে সর্বোত্তম জবাব হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ.-এর বক্তব্য যা তাঁর বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ 'মুযিহুল কুরআন' থেকে একটু আগে উদ্ধৃত করা হয়েছে। অর্থাৎ, যখন একটি বাতিলকে অপর কোনো সত্যের সঙ্গে মিশ্রিত করা হয় তখন তাদের সংমিশ্রনে একটি কারিশমা উৎপন্ন হয়। এটি সেই সংমিশ্রণেরই বিশেষত্ব এবং তারই প্রকৃত স্বভাব নামে বর্ণিত হয়ে থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ মনে করুন : আপনি গোলাবি আতরের সঙ্গে কিছু পরিমাণ বিষ্ঠা মিশ্রিত করলেন। তাতের গোলাবের উত্তম ও মনমাতানো সুগন্ধ বিষ্ঠার জঘন্য দুর্গন্ধের সঙ্গে মিলিত হয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করবে যা নিঃসন্দেহে মন ও মস্তিষ্কের ওপর আসল বিষ্ঠার দুর্গন্ধের চেয়েও অত্যন্ত নিকৃষ্ট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। অবস্থা তখন এমন হয়ে যাবে যে, একজন সুস্থ-স্বভাব মানুষ বিষ্ঠার স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সহ্য করতে পারবে; কিন্তু মিশ্রিত এই দুর্গন্ধকে এক নিমিষের জন্য বরদাশত করতে পারবে না। এ-কারণেই ইসলাম সত্য ও মিথ্যার এমন মিশ্রণকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কেননা, এতে কঠিন পথভ্রষ্টতা বিস্তার লাভ করে।
মোটকথা, জমহুরের তাফসিরই সঠিক এবং কুরআন মাজিদের বর্ণনার সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য রাখে।
টিকাঃ
¹⁰¹ মনে হয়, পৃথিবীর সকল মূর্তিপূজক দলের মধ্যে গাভীর পবিত্রতা ও গো-বৎস পূজার এক বিপুল মর্যাদা রয়েছে। এ-কারণেই হিন্দস্তান, ইরাক, ইরান, চীন ও জাপানের মূর্তিপূজক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সমভাবে এর গুরুত্ব পরিলক্ষিত হয়।
¹⁰² মুখে বলেছিলো "শ্রবণ করলাম" আর মনে মনে বলেছিলো "অমান্য করলাম"।
¹⁰⁰ হযরত মুসা আ. বললেন, "আমি তোমাদের প্রতিপালকের নির্দেশ লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গিয়েছি, আর তোমার আমার ফিরে আসার অপেক্ষা না করে এমন ঘৃণ্য কাজ করে ফেললে?"
¹⁰⁴ رأس অর্থ মাথা, এখানে 'মাথার চুল'।
¹⁰⁵ হযরত মুসা আ. তাওরাত আনতে তুর পাহাড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে কয়েকজন গোত্রীয় প্রধানকে নিয়ে যান। তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের আগ্রহে তাদের আগেই পাহাড়ে পৌঁছে যান।
¹⁰⁶ সামিরি সামিরা গোত্রের জনৈক ব্যক্তি, মতান্তরে বনি ইসরাইলের সামিরি নামক জনৈক ব্যক্তি। কাশাফ, কুরতুবি ইত্যাদি।
¹⁰⁷ এখানে 'অগ্নিকুণ্ড' শব্দটি আরবিতে উহ্য আছে। - জালালাইন, কুরতুবি ইত্যাদি।
¹⁰⁸ রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৯, সুরা তোয়া-হা।
¹⁰⁹ আত-তাফসিরুল কাবির : মাফাতিহুল গাইব, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭০।
¹¹⁰ তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা তোয়া-হা।
¹¹¹ কারো কোনো বক্তব্যকে দুর্বল মনে করা হলে قبل বা 'বলা হয়েছে' বলে উদ্ধৃত করা হয়।