📄 বনি ইসরাইলের অন্যান্য দাবি এবং স্পষ্ট নিদর্শনসমূহের প্রকাশ
বনি ইসরাইল লোহিত সাগর অতিক্রম করে প্রথমে যে-ভূখণ্ডে পা রাখলো তা ছিলো তা ছিলো আরব দেশ। তা লোহিত সাগরের পূর্ব অংশে অবস্থিত। তা বিস্তীর্ণ মরুময় স্থান, পানি ও তৃণলতাহীন প্রান্তর থেকে শুরু হয়েছে। তাওরাতের ভাষায় তা শুর বা সিন প্রান্তর অথবা সাইনা উপত্যকা (তীহ) নামে বিখ্যাত। তুর পর্বত পর্যন্ত তার সীমা বিস্তৃত। এটি গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল। যত দূর যাওয়া যায় পানি বা তৃণলতার নাম-গন্ধও পর্যন্ত নেই। এই অবস্থা দেখে বনি ইসরাইলিরা ঘাবড়ে গেলো এবং হযরত মুসা আ.-এর কাছে ফরিয়াদ করতে লাগলো, আমরা পানি কোথা থেকে পান করবো? আমরা তো পিপাসায় কাতর হয়ে ছটফট করে মারা যাবো। এখানে তো পান করার জন্য একফোঁটা পানিও নেই। তখন মুসা আ. আল্লাহ তাআলার দরবারে আরজি জানালেন। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাঁকে নির্দেশ দিলেন, তুমি তোমার লাঠি দিয়ে মাটিতে আঘাত করো। হযরত মুসা আ. আল্লাহর নির্দেশ পালন করামাত্র সঙ্গে সঙ্গে বারোটি ঝরনা উৎসারিত হলো এবং বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্রের জন্য ভিন্ন ভিন্নভাবে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো। পনির দিক থেকে বনি ইসরাইল নিশ্চিত হয়ে গেলো। তারপর তারা বলতে লাগলো, পানির ব্যবস্থা তো হয়েই গেলো; কিন্তু জীবন ধারণের জন্য এটাই তো যথেষ্ট নয়। আমাদের ক্ষুধা পেয়েছে, কোথা থেকে খাবো এখন? এখানে তো কোনো উপায়ই দেখা যাচ্ছে না। হযরত মুসা আ. পুনরায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে আরজি পেশ করলেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, হে মুসা, তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলো, অস্থির হয়ো না। আমি অদৃশ্য জগৎ থেকে সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
এরপর ব্যবস্থা এই হলো যে, রাত শেষ হওয়ার ভোরবেলা বনি ইসরাইলিরা দেখতে পেলো, মাটিতে ও গাছের পাতায় পাতায় আকাশ থেকে শিশিরের আকারে সাদা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফের টুকরোর মতো কোনো বস্তু বর্ষিত হয়ে পড়ে আছে। তারা স্বাদ গ্রহণ করে দেখলো তা অত্যন্ত মিষ্ট হালুয়ার মতো। এটা ছিলো মান্না। দিনের বেলায় প্রবল বায়ু প্রবাহিত হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দলে দলে বটের পাখি এসে মাটির ওপর নামলো এবং চারদিকে ছড়িয়ে গেলো। বনি ইসরাইলিরা অতি সহজে হাত দিয়ে পাখিদের ধরলো এবং ভেজে ভেজে খেতে লাগলো। এটা ছিলো সালওয়া। এইভাবে কোনো ধরনের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই প্রতিদিন তাদের জন্য এই দুই প্রকারের নেয়ামত জুটে গেলো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর মারফতে বনি ইসরাইলকে সতর্ক করে দিলেন যে, তারা যেনো মান্না ও সালওয়াকে নিজেদের প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্যবহার করে এবং পরের দিনের জন্য যেনো সংগ্রহ করে না রাখে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই নেয়ামত প্রতিদিনই সরবরাহ করতে থাকবেন।⁹⁰
প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয় বস্তু সংগ্রহ করা থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে এখন বনি ইসরাইল তৃতীয় দাবি জানালো। তারা এবার দাবি করলো, গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপে এবং ছায়াধারী বৃক্ষ ও ঘরবাড়ির শান্তি ও বিশ্রাম গ্রহণের অভাবে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। এমন না হয় যে, সূর্যের এই প্রখর উত্তাপ ও তীব্র কিরণ আমাদের জীবনেরই অবসান ঘটিয়ে দেয়। হযরত মুসা আ. তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে আরজি পেশ করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আপনি যখন এদের ওপর বড় বড় নেয়ামত, অনুগ্রহ ও দানের বারি বর্ষণ করলেন, তখন এই কঠিন কষ্ট থেকেও তাদের মুক্তি দিন। হযরত মুসা আ.-এর পার্থনা মঞ্জুর করা হলো। আকাশে সারি সারি মেঘমালা এসে বনি ইসরাইলের মাথার ওপর ছায়া দিয়ে দাঁড়ালো। তারা যখন যে-দিকেই যেতো, মেঘের এই শামিয়ানা তাদের মাথার ওপর সবসময় ছায়া দিয়ে থাকতো।
আল্লামা ইসমাইল আস-সুদ্দির এব বর্ণনায় উপরিউক্ত আল্লাহ তাআলার তিনটি নিদর্শনের আলোচনা একই স্থানে এইভাবে করা হয়েছে যে, খন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলকে নিয়ে তীহ ময়দানে পৌঁছলেন, এন বনি ইসরাইলিরা বলতে লাগলো, অনন্ত-অসীম এই প্রান্তরে কি মাদের হাশর হবে? খাবো কোথা থেকে, পান করবো কোথা থেকে াং ছায়াই বা পাবো কোথা থেকে? তখন আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য যা ও সালওয়া নাযিল করলেন এবং পানি পান করার জন্য বারোটি না উৎসারিত করলেন। আর ছায়ার জন্য মেঘমালা এসে মাথার ওপর বা প্রদান করতে লাগলো।
বিষয়গুলো কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَإِذِ اسْتَسْقَى مُوسَى لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَانْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ كُلُوا وَاشْرَبُوا مِنْ رِزْقِ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ (سورة البقرة)
রণ (সেই ঘটনার কথা) করো, যখন মুসা তার সম্প্রদায়ের জন্য পানি র্ধনা করলো, আমি বললাম, "তুমি লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করো। মি দেখবে যে, পানি তোমার সামনে উপস্থিত। মুসা আ. আল্লাহর দেশ পালন করলেন।) ফলে তা থেকে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত না। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পান-স্থান চিনে নিলো। (তখন মাদেরকে বলা হয়েছিলো, এই পানি ও তৃণলতাহীন প্রান্তরে মাদের জন্য জীবন-যাপনের সমস্ত বস্তুরই ব্যবস্থা হয়ে গেছে।) লাম, "আল্লাহ-প্রদত্ত জীবিকা থেকে তোমরা পানাহার করো এবং তকারীরূপে পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে বেড়িও না।” (অর্থাৎ, নযাপনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য ঝগড়া-কলহ করো না বা দিকে চ লুটতরাজ করে বেড়িয়ো না।) [সুরা বাকারা: আয়াত ৬০]
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَا وَ مَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (سورة البقرة)
(যখন তোমরা সাইনা প্রান্তরের পানি ও তৃণলতাহীন ভূমিতে সূর্যের উত্তাপে এবং খাদ্যের অভাবে ধ্বংসোম্মুখ হয়ে পড়েছিলে, তখন) মেঘ দ্বারা তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করলাম এবং তোমাদের (খাদ্যরূপে) মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করলাম। বলেছিলাম, মাদেরকে ভালো যা দান করেছি তা থেকে আহার করো।” (গভীর চিন্তা করে দেখো) তারা আমার প্রতি কোনো জুলুম করে নি; বরং তারা তাদের প্রতিই জুলুম করেছে। [সুরা বাকারা: আয়াত ৫৭]
وَمِنْ قَوْمِ مُوسَى أُمَّةٌ يَهْدُونَ بِالْحَقِّ وَبِهِ يَعْدِلُونَ ( ) وَقَطَّعْنَاهُمُ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أَسْبَاطًا أُمَمًا وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى إِذِ اسْتَسْقَاهُ قَوْمُهُ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَالْبَجَسَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنَا قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ وَظَلَّلْنَا عَلَيْهِمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْهِمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (سورة الأعراف)
'মুসার সম্প্রদায়ের মধ্যে (অবশ্যই) এমন দল রয়েছে যারা অন্যকে ন্যায়পথে পথ দেখায় এবং ন্যায়ভাবেই বিচার করে। তাদেরকে আমি বারোটি গোত্রে বিভক্ত করেছি। মুসার সম্প্রদায় যখন তার কাছে পানি প্রার্থনা করলো, তখন তার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, "তোমার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করো"; ফলে তা থেকে বারোটি প্রস্রবণ উৎসারিত হলো। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পানস্থান চিনে নিলো। এবং মেঘ দ্বারা তাদের ওপর ছায়া বিস্তার করেছিলাম, তাদের কাছে (খাবারের জন্য) মান্না ও সালওয়া পাঠিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, "ভালো যা তোমাদেরকে দিয়েছি তা থেকে আহার করো।" (আর তোমরা ঝগড়া-কলহে লিপ্ত হয়ো না।) তারা (নাফরমানি করে) আমার প্রতি কোনো জুলুম করে নি; কিন্তু তারা নিজেদের প্রতিই জুলুম করছিলো। [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৯-১৬০]
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ قَدْ أَنْجَيْنَاكُمْ مِنْ عَدُوِّكُمْ وَوَاعَدْنَاكُمْ جَانِبَ الطُّورِ الْأَيْمَنَ وَنَزَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَى ( كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَلَا تَطْغَوْا فِيهِ فَيَحِلَّ عَلَيْكُمْ غَضَبِي وَمَنْ يَحْلِلْ عَلَيْهِ غَضَبِي فَقَدْ هَوَى () وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وعمل صالحًا ثُمَّ اهْتَدَى (سورة طه)
"হে বনি ইসরাইল, আমি তো তোমাদেরকে শত্রু থেকে উদ্ধার করেছিলাম, আমি তোমাদেরকে (বরকত প্রাপ্তি ও সফলকাম হওয়ার এবং তাওরাত প্রদানের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তুর পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে এবং (সাইনা প্রান্তরে) তোমাদের কাছে মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করেছিলাম। তোমাদেরকে যা দান করেছি তা থেকে ভালো বস্তু আহার করো এবং এ-বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করো না, (এবং এ-ব্যাপারে সতর্ক থাকো যে, নাফরমানি) করলে তোমাদের ওপর আমার ক্রোধ অবধারিত এবং যার ওপর আমার ক্রোধ অবধারিত সে তো ধ্বংস হয়ে যায়। এবং আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি, যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে ও সৎপথে অবিচলিত থাকে।' [সুরা তোয়া-হা: ৮০-৮২)
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি তাঁর 'কাসাসুল আম্বিয়া' গ্রন্থে লিখেছেন, "বনি ইসরাইলের ঘটনাবলির মধ্যে পানির যে-ঝরনাগুলোর আলোচনা করা হয়েছে, লোহিত সাগরের পুব দিকে মরুপ্রান্তরে উৎসারিত হয়েছিলো। সেগুলো সুয়েজ থেকে বেশি দূরে নয় এবং আজো সেগুলো 'মুসার ঝরনা' নামে বিখ্যাত। ঝরনাগুলো বর্তমানে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে এবং কোনো কোনোটার চিহ্নও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার কোনো কোনো সেসব ঝরনার ওপর খেজুরের বাগান দেখা যাচ্ছে।"
কুরআন মাজিদে বর্ণিত ঘটনাবলি থেকে মনে হয়, লাঠি দিয়ে আঘাত করে পানি প্রাপ্তির ঘটনা শুধু একবারই ঘটে নি; বরং তীহ ময়দানে বিভিন্ন জায়গায় কয়েকবার ঘটেছিলো।
যাইহোক। হযরত মুসা আ.-এর বরকতে বনি ইসরাইলিদের ওপর আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহের বারিবর্ষণ অবিরাম অব্যাহত ছিলো।
আর কয়েক শতাব্দীর দাসত্বের ফলে তাদের মানসিক নীচতা ও চারিত্রিক দুর্বলতা এবং সাহসিকতা ও বীরত্বের বিলুপ্তি তাদের ওপর এক স্বতন্ত্র নৈরাশ্য ও হতাশা বিস্তার করেছিলো। আল্লাহ তাআলার এসব নিদর্শন একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত তাদের সাহসকে দৃঢ় ও তাদের হৃদয়কে শক্তিশালী করে দিয়েছিলো। কিন্তু বিচিত্র স্বভাবের জাতির ওপর তারও যথেষ্ট ক্রিয়া হলো না এবং তারা তাদের বিচিত্র স্বভাবের এক নতুন পরিচয় উপস্থাপন করলো। একদিন তারা সবাই একত্র হয়ে বললো, হে মুসা, আমরা প্রতিদিন একই ধরনের খাদ্য খেতে খেতে এখন বিরক্ত হয়ে পড়েছি। আমাদের এই মান্না ও সালওয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি তোমার রবের কাছে দোয়া করো, যেনো তিনি ভূমি থেকে আমাদের জন্য শাক-সবজি, ক্ষীরা, কাঁকুড়, গম, রসুন, মসুর ও পেঁয়াজ ইত্যাদি দ্রব্য উৎপন্ন করে দেন, যাতে আমরা পেট ভরে খেতে পারি।
হযরত মুসা আ. তাদের এই ধরনের আচরণে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। তাদের বললেন, তোমরাও কেমন আশ্চর্য ধরনের নির্বোধ! একটি উত্তম খাদ্য ত্যাগ করে সাধারণ ও নিম্নমানের বস্তুর প্রার্থী হচ্ছো? এভাবে তোমরা আল্লাহ তাআলার নেয়ামতের নিমকহারামি করছো, তার অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছো, তাঁর নেয়ামতকে অস্বীকার করছো? আচ্ছা, যদি বাস্তবিকই তোমরা এসব নেয়ামত অপছন্দ করে থাকো, আর যেসব বস্তুর নাম তোমরা উল্লেখ করলে সেগুলোর জন্যই যদি তোমরা বাড়াবাড়ি করো, তবে তা মুজেযা বা নিদর্শনের মতো আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে তলব করার প্রয়োজন নেই। যাও, তোমরা কোনো এক জনপদের দিকে চলে যাও। ওখানে সব জায়গাতেই তোমরা এসব বস্তু প্রচুর পরিমাণে পাবে।
ঘটনার এই অংশটুকু কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ تَصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجُ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَعْلِهَا وَقِتَانِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بالذي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنْ لَكُمْ مَا سَأَلْتُمْ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذُّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ الله ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (سورة البقرة)
'যখন তোমরা বলেছিলে, "হে মুসা, আমরা একই রকম খাদ্যে কখনো ধৈর্য ধারণ করবো না। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করো, তিনি যেনো ভূমিজাত দ্রব্য-শাক-সবজি, কাঁকুড়, গম (বা রসুন) মসুর ও পেঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপন্ন করেন।" মুসা বললো, "তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতর বস্তুর সঙ্গে বদল করতে চাও? তবে কোনো নগরে অবতরণ করো। তোমরা যা চাও তা ওখানে আছে।" তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যগ্রস্ত হলো এবং তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো। তা এইজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াতকে⁹¹ অস্বীকার করতো এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতো। অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন করার জন্যই তাদের এই পরিণতি হয়েছিলো।' [সুরা বাকারা : আয়াত ৬১]
টিকাঃ
⁹⁰ তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ., প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৫-৯৬।
⁹¹ আল্লাহর আহকাম অথবা মুসা আ.-এর মুজেযাগুলোকে অস্বীকার করতো।
📄 তুর পাহাড়ের ওপর ইতিকাফ
হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ছিলো যে, বনি ইসরাইলিরা যখন মিসরীয় শাসনের দাসত্ব থেকে স্বাধীন হয়ে যাবে তখন তাঁকে শরিয়ত প্রদান করা হবে। এখন সেই সময় এসে পড়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছে। সুতরাং হযরত মুসা আ. আল্লাহ তাআলার ওহির ইঙ্গিতে তুর পাহাড়ে গিয়ে উপনীত হলেন এবং ওখানে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার জন্য ইতিকাফ করলেন। এই ইতিকাফের মেয়াদ ছিলো তিরিশ দিন বা একমাস। পরে তিনি আরো দশ দিন বাড়িয়ে চল্লিশ দিন পূর্ণ করেন।
তাফসিরে রুহুল মাআনিতে এ-বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে—
وأخرج الديلمي عن ابن عباس يرفعه فَلَمَّا أَتَى رَبَّهُ أَرَادَ أَنْ يُكَلِّمَهُ فِي ثَلَاثِينَ وَقَدْ صَامَهُنَّ : لَيْلَهُنَّ وَنَهَارَهُنَّ ، كَرِهَ أَنْ يُكَلِّمَ رَبَّهُ وَيَخْرُجَ مِنْ فَمِهِ رِيحَ فَمِ الصَّائِمِ ، فَتَنَاوَلَ مُوسَى شَيْئًا مِنْ نَبَاتِ الْأَرْضِ فَمَضَغَهُ ، فَقَالَ لَهُ رَبُّهُ حِينَ أَتَاهُ : أَفَطَرْتَ ؟ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالَّذِي كَانَ ، قَالَ : رَبِّ كَرِهْتُ أَنْ أُكَلِّمَكَ إِلَّا وَفَمِي طَيّبُ الرِّيحِ ، قَالَ : أَوَمَا عَلِمْتَ يَا مُوسَى أَنْ رِيحَ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدِي مِنْ ريحِ الْمِسْكِ ؟ ارْجِعْ حَتَّى تَصُومَ عَشْرًا ، ثُمَّ ائْتِنِي ، فَفَعَلَ مُوسَى مَا أُمِرَ بِهِ
"দাইলামি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং এটি মারফু বলেছেন: হযরত মুসা আ. যখন তাঁর প্রতিপালকের কাছে এলেন, তিরিশ দিনব্যাপী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। তিনি এই তিরিশ দিন অনবরত রোযা রেখেছেন। ফলে মুসা আ. অনুভব করলেন যে, তাঁর মুখ থেকে রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধের মতো দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। তাই এ-অবস্থায় তিনি রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে কথা বলতে অপছন্দ করলেন। মুসা আ. জমিনের গাছ থেকে একটি অংশ নিলেন এবং তা দিয়ে দাঁত মর্দন করলেন। তিনি তাঁর রবের কাছে যাওয়ার পর তাঁর রব তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রোযা ভেঙে দিয়েছো? যা হয়েছে সে-সম্পর্কে আল্লাহপাক অবহিতই ছিলেন। মুসা আ. বললেন, হে আমার রব, আমার মুখ সুগন্ধময় না করে আপনার সঙ্গে কথা বলতে অপছন্দ করেছি। আল্লাহ বললেন, হে মুসা, তুমি কি জানো না রোযাদারের মুখের গন্ধ আমার কাছে মেসকের ঘ্রাণের চেয়েও উত্তম? তুমি ফিরে যাও এবং আরো দশ দিন রোযা রাখো। তারপর আমার কাছে এসো। মুসা আ. যে-বিষয়ে আদিষ্ট হলেন, তখন তা-ই করলেন। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হলো।"⁹²
কিন্তু কুরআন মাজিদে শুধু এতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সময়সীমা প্রথমে তিরিশ দিন ছিলো। এরপর দশ দিন বাড়িয়ে চল্লিশ দিন করা হলো। কিন্তু তার কারণ বর্ণনা করা হয় নি।
ঘটনার এই অংশটুকু কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
وَوَاعَدْنَا مُوسَى ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً (سورة الأعراف)
'স্মরণ করো, মুসার জন্য আমি তিরিশ রাত নির্ধারিত করি (অর্থাৎ, পূর্ণ একমাস তুর পাহাড়ে ইতিকাফে থেকে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে থাকো। তারপর তোমাকে শরিয়ত প্রদান করা হবে। মুসা আ. এই মুদ্দত শেষ করলেন) এবং আরো দশ দ্বারা তা পূর্ণ করি। এইভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাতে পূর্ণ হয়।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪২]
হযরত মুসা আ. যখন তুর পাহাড়ের ওপর প্রতিশ্রুত ইতিকাফের মুদ্দত পালন করতে গেলেন তখন তার সহোদর বড়ভাই হারুন আ.-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে গেলেন এ-ব্যাপারে যে, তিনি বনি ইসরাইলকে সত্যপথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং প্রতিটি ব্যাপারে তাদের দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।
১-বিষয়টি কুরআন মাজিদ বর্ণনা করছে এভাবে—
وَقَالَ مُوسَى لِأَخِيهِ هَارُونَ اخْلُفْنِي فِي قَوْمِي وَأَصْلِحْ وَلَا تَتَّبِعْ سَبِيلَ الْمُفْسِدِي (سورة الأعراف)
এবং মুসা তার ভাই হারুনকে বললো, "আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন এবং বপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না।" [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪২]
টিকাঃ
⁹² রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম ওয়াস সাবয়িল মাসানি, আবুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি, সুরা আ'রাফ, আয়াত ১৪২। কিন্তু হাদিসের বর্ণনাকারীদের নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাদের কাছে দাইলামি নির্ভরযোগ্য নন।—গ্রন্থকার।
⁹³ আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য সুফিয়ানে কেরামের চিল্লা পালন করার নিয়ম খুব সম্ভব এই ঘটনা থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত, কোনো কাজে আল্লাহ পক্ষ থেকে দৃঢ়তা লাভের জন্য সাধারণত এই চিল্লা পালন করা কল্যাণকর।
⁹⁴ হযরত মুসা আ.-কে তাওরাত প্রাপ্তির জন্য প্রথমে তিরিশ দিন, আরও পরে দশ দিন বৃদ্ধি করে মোট চল্লিশ দিন সিয়ামসহ ইতিকাফের মতো একই স্থানে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় থাকতে হয়েছিলো।
📄 পবিত্র সত্তার তাজাল্লি
ইতিকাফের মুদ্দত পূর্ণ হয়ে গেলো এবং আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা মা.-কে পারস্পরিক কথোপকথনের মর্যাদা দান করলেন। হযরত মুসা আ. চরম আনন্দানুভূতি ও প্রফুল্ল চিত্ততার সঙ্গে আরজ করলেন, “হে আল্লাহপাক, আপনি যখন আমাকে আপনার বাণী শ্রবণের স্বাদ উপভোগ করালেন, তখন আর আপনাকে স্বচক্ষে দর্শনের এবং আপনার দিদার লাভের স্বাদ থেকে কেনো বঞ্চিত থাকবো? এটিও দান করে আমাকে সৌভাগ্যবান করুন।" আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে জবাব এলো, "হে মুসা, তুমি 'যাতে পাক'কে (পবিত্র সত্তাকে) দর্শন করতে সক্ষম হবে না। আচ্ছা, তবে দেখো, এই পাহাড়ের ওপর আমি আমার সত্তার নুরের তাজাল্লি প্রকাশ করবো, যদি তুমি এই তাজ্জালিকে সহ্য করে নিতে পারো, এরপর তাহলে তুমি আবেদন করো (স্বচক্ষে আমার দর্শন লাভের আবেদন করো)।" এরপর তুর পাহাড়ের অংশবিশেষের ওপর আল্লাহ তাআলার নুরের তাজাল্লি প্রকাশিত হলো। এতে পাহাড়ের ওই অংশটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো। হযরত মুসা আ. তা দর্শনে অপারগ ও সংজ্ঞাহারা হয়ে পড়লেন।
মুসা আ. যখন পুনরায় সংজ্ঞা ফিরে পেলেন, তিনি মহান আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও স্তুতিবাণী বর্ণনা করতে লাগলেন। তাঁর আবেদন প্রত্যাহার করে নিলেন এবং বললেন, "আমি স্বীকার করছি এবং এ-কথার ওপর ঈমান আনছি যে, আপনার সৌন্দর্যের তাজাল্লি, মারেফাত ও সত্য প্রকাশে কোনো ত্রুটি নেই। ত্রুটি কেবল আমার সত্তার অপারগতার এবং নিরুপায়তার।" এই ঘটনা কুরআন মাজিদে নিম্নলিখিত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে—
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَنْ تَرَانِي وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرْ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكَّا وَخَرٌ مُوسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ (سورة الأعراف)
'মুসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন তখন সে বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখবো।" তিনি বললেন, "তুমি কখনোই আমাকে দেখতে পাবে না।"⁹⁵ তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ করো, তা (আল্লাহ তাআলার জ্যোতি সহ্য করতে পারলে এবং) স্বস্থানে স্থির থাকলে তবে তুমি আমাকে দেখবে।' যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলো এবং মুসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো। যখন সে জ্ঞান ফিরে ফেলো তখন বললো, "মহামহিম তুমি, আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম।" [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৩]
টিকাঃ
⁹⁵ দুনিয়াতে দেখবে না, পরকালে জান্নাতে প্রবেশের পর সকল জান্নাতবাসী আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করবে।
📄 তাওরাত নাযিল হওয়া
এই রহস্য উন্মোচিত হওয়ার পর হযরত মুসা আ.-কে তাওরাত প্রদান করা হলো। আল্লাহ রাব্বুল আলামি মুসা আ.-কে নির্দেশ দিলেন, এই কিতাবের বিধি-বিধানের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থেকো। তোমার সম্প্রদায় বনি ইসরাইলকে বলো, তারা যেনো এই কিতাবের ওপর এমনভাবে আমল করে যাতে, যে-নেক আমল যত অধিক আল্লাহর নৈকট্যলাভের কারণ হয়, তাকে অন্যান্য আমলের ওপর প্রাধান্য দান করে। এই কিতাবে আমি তোমাদের জন্য যাবতীয় ধর্মীয় ও পার্থিব কল্যাণকর বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি। আর হালাল ও হারাম এবং প্রশংসনীয় গুণাবলি ও নিন্দনীয় দোষাবলি—মোটকথা যাবতীয় নির্দেশ ও নিষেধকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছি এবং এটাই আমার শরিয়ত।
এই মর্মে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করছে—
قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَاتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُنْ مِنَ الشَّاكِرِينَ () وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْعِظَةً وَتَفْصِيلًا لِكُلِّ شَيْءٍ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍ وَأْمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا بِأَحْسَنِهَا سَأُرِيكُمْ دَارَ الْفَاسِقِينَ (سورة الأعراف)
'তিনি (আল্লাহ তাআলা) বললেন, “হে মুসা, আমি তোমাকে আমার রিসালাত (রাসুলের মর্যাদা ও দায়িত্ব) ও আমার বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি; সুতরাং আমি যা (তাওরাত কিতাব) দিলাম তা গ্রহণ করো এবং কৃতজ্ঞ হও।" আমি তার (মুসার) জন্য (তাওরাতের) ফলকগুলোতে সর্ববিষয়ে উপদেশ এবং সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছি; সুতরাং সেগুলো শক্তভাবে ধরো এবং তোমার সম্প্রদায় সেগুলোর যা উত্তম তা গ্রহণ করতে নির্দেশ দাও।⁹⁶ আমি শিগগিরই সত্যাত্যাগীদের (নাফরমান লোকদের) বাসস্থান তোমাদেরকে দেখাবো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৪-১৪৫]
এখানে দুটি বিষয় মনোযোগ প্রদানের যোগ্য:
১. উলামায়ে ইসলাম (ইসলামের মনীষী ও তত্ত্বজ্ঞানীবৃন্দ) বলেন, তুর পাহাড়ের এই ঘটনায় যে-আহকামগুলো নাযিল হয়ে তা তাওরাত। আর উলামায়ে নাসারার (খ্রিস্টান ধর্মজ্ঞানী) বর্তমান সম্প্রদায় বলেন, এই ঘটনার আহকামগুলোর উদ্দেশ্য ওই দশটি আহকাম যা হযরত মুসা আ.-এর ধর্মে 'শরিয়ত বা আহকামে আহ্দ' নামে অভিহিত। অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারো ইবাদত করো না; ব্যভিচার করো না; চুরি করো না ইত্যাদি। আর সমসাময়িক কোনো কোনো মুফাস্স্সিরও আলোচ্য আয়াতটির লক্ষ্যস্থল আহকামে আহ্দকেই সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় অভিমতটি কুরআন মাজিদ ও তাওরাত উভয়ের সাক্ষ্য থেকেই ভুল প্রমাণিত হয় এবং প্রথম অভিমতই শুদ্ধ ও সঠিক। কেননা, কুরআন মাজিদ সুরা বাকারায় হযরত মুসা আ.-এর ইতিকাফের মুদ্দতের উল্লেখ করে যখন আহকামগুলোর আলোচনা করেছে তখন সেগুলোকে কিতাব ও ফুরকান বলেছে। আর কুরআন মাজিদে এই দুটি বিশেষণ তাওরাতের জন্য বলা হয়েছে; 'আহকামে আহ্দ'-এর জন্য বলা হয় নি। যেমন: কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে-
وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ () ثُمَّ عَفَوْنَا عَنْكُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (( وَإِذْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَالْفُرْقَانَ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ (سورة البقرة)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা) যখন মুসার জন্য চল্লিশ রাত⁹⁷ নির্ধারিত করেছিলাম, তাঁর প্রস্থানের পর তোমরা গো-বৎসকে⁹⁸ উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে; আর তোমরা তো জালিম। এরপরও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো। এবং স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা) যখন আমি মুসাকে কিতাব ও ফুরকান দান করেছিলাম যাতে তোমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হও।' (সুরা বাকারা: ৫১-৫৩)
কুরআন মাজিদের অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ مِنْ بَعْدِ مَا أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ الْأُولَى بَصَائِرَ لِلْנَّاسِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّרُونَ (sورة القصص)
'আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পর মুসাকে দিয়েছিলাম কিতাব, মানবজাতির জন্য জ্ঞানবর্তিকা, পথনির্দেশ ও অনুগ্রহরস্বরূপ, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৪৩]
আর তাওরাত (বর্তমান যুগের বাইবেল)-এর 'সিফরে খুরুজ' (নিষ্ক্রমণ- পুস্তক); 'সিফরে ইসতিসনা' (ব্যতিক্রম-পুস্তক) ও 'কিতাবে ইয়াসু' (ইয়াসু অধ্যায়)-এ উল্লেখিত হযরত মুসা আ.-এর ইতিকাফের মুদ্দতের পর যদিও 'আহকামে আহ্দ' বা 'শরিয়ত' শব্দ পাওয়া যায়, কিন্তু মাওলানা রহমতুল্লাহ কিরানবি রহ. তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'ইযহারুল হক'-এ আরবি, ফার্সি, উর্দু এবং প্রাচীনকালের তরজমার উদ্ধৃতি দিয়ে এ-কথা প্রমাণ করেছেন যে, তাওরাতের ওইসব নুসখা বা প্রতিলিপিতে 'আহকামে আহ্দ' ও 'শরিয়ত' শব্দ দুটির স্থরে 'তাওরাত' লিখিত পাওয়া যায়। যেমন: মাওলানা আবদুল হক রহ.-ও তাঁর তাফসিরগ্রন্থ 'তাফসিরে হক্কানি'তে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে উর্দু ও ফার্সি ভাষায় মুদ্রিত বাইবেল থেকে নিম্নবর্ণিত তথ্যপ্রমাণ উদ্ধৃত করেছেন: ১। "আর ওই ফলকগুলোর ওপর এই তাওরাতের সমস্ত কথা স্পষ্ট অক্ষরে লিখো।” [ইসতিসনা-পুস্তক, অনুচ্ছেদ ২৭, আয়াত ২৮] এখানে তাওরাত শব্দটির উল্লেখ আছে। ২। "বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-এর নির্দেশ অনুসারে জবাই করার একটি স্থান নির্মাণ করলো এবং তার পাথরগুলোর ওপর তাওরাত লিখে দিলো।” [ইয়াসু অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৮, আয়াত ১৫, ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত। এখানেও তাওরাত শব্দটির উল্লেখ আছে।
এসব তথ্যপ্রমাণ থেকে এ-কথা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, হযরত মুসা আ.-কে তুর পাহাড়ে ইতিকাফের মুদ্দতের পর যে-কাষ্ঠফলক প্রদান করা হয়েছিলো, তা তাওরাতেরই ছিলো, 'আহকামে আহ্দ'-এর নয়। আর তাওরাতের ইংরেজি অনুবাদে Law এবং আরবি ও উর্দু অনুবাদের নুসখাগুলোতে 'শরিয়ত' শব্দকে মেনে নিলেও এই শব্দগুলোও তাদের অর্থের ব্যাপকতায় তাওরাতকে বুঝাতে পারে। বস্তুত, তাওরাত, শরিয়ত, বিধান-এই শব্দ তিনটির লক্ষ্যস্থল একই বস্তু। আর প্রাচীন খ্রিস্টান দুনিয়ায় এই অর্থই গ্রহণ করা হতো; 'আহকামে আহ্দ' তারই একটি অংশ এবং এটিকে স্বতন্ত্র সাব্যস্ত বহু পরবর্তীকালের উদ্ভাবন।
সুরা আ'রাফের উপরিউক্ত আয়াতে এই বাক্যটি রয়েছে-
سَأُرِيكُمْ دَارَ الْفَاسِقِينَ 'অচিরেই আমি তোমাদেরকে সত্যত্যাগীদের (নাফরমান লোকদের) আবাসস্থল দেখাবো।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৫]
এখানে বিবেচ্য বিষয় এই যে, এই আয়াতে আবাসস্থল দ্বারা কোন্ স্থান উদ্দেশ্য। বর্ণনাকারীরা ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে বিভিন্ন জবাব দিয়েছেন: এই আবাসস্থল দ্বারা উদ্দেশ্য 'আদ' ও সামুদ' সম্প্রদায় দুটির (বসতভূমির) ধ্বংসাবশেষ; ২. মিসর ভূমি, অর্থাৎ, বনি ইসরাইল পুনরায় তাতে প্রবেশ করবে; ৩. কাতাদা রহ. বলেন, এর দ্বারা শামদেশের পবিত্র ভূমি উদ্দেশ্য। শামদেশে তখন আমালিকা সম্প্রদায়ের দুর্দান্ত রাজাদের শাসন ছিলো। আর এখানেই বনি ইসরাইলের প্রবেশ করার কথা ছিলো। ¹⁰⁰
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি কাতাদা রহ.-এর বর্ণিত মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর আমার (গ্রন্থকার) মতে এটিই বিশুদ্ধ মত। তবে এই কথা হলো এই যে, হযরত মুসা আ. এবং বনি ইসরাইলের বৃদ্ধরা শামদেশের আবাসভূমিগুলোতে প্রবেশ করতে পারেন নি। কেননা, এই পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের পূর্বেই হযরত মুসা আ.-এর ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছিলো। সামনে বর্ণিত বিস্তারিত বিবরণ অনুসারে, একইভাবে বনি ইসরাইলের বৃদ্ধদের ওপর পবিত্র শামদেশের ভূমিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। সুতরাং, আয়াতটির অর্থ হয়তো এই দাঁড়াবে যে, বনি ইসরাইলের যুবকদের—যারা সংখ্যায় অন্য সবার চেয়ে বেশি ছিলো—প্রবেশকেই সকলের প্রবেশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ-জাতীয় অর্থগ্রহণ আরবদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। অথবা, আয়াতটির উদ্দেশ্য এই যে, হযরত মুসা আ. ইউশা বিন নুন ও কালিব বিন ইউকান্নাহ এবং বনি ইসরাইলের অন্য কতিপয় বীরবাহাদুরকে পবিত্র ভূমিতে পাঠিয়েছিলেন। তা এইজন্য যে, তাঁরা ওখানে গিয়ে ওখানকার বিস্তারিত অবস্থা জেনে আসবেন যে, তাঁরা কীভাবে শত্রুকে পরাজিত করে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারেন। তাঁরা ফিরে এসে সব অবস্থা হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের কাছে বর্ণনা করলেন। এই কয়েকজনের পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করা, পর্যবেক্ষণ করা এবং তারপর সবাইকে ওখানকার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা—আয়াতে যেনো এরই দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কাতাদাহ রহ.-এর বক্তব্যের মোকাবিলায় দ্বিতীয় উক্তিটি এ-কারণে দুর্বল যে, এই ঘটনার পর বনি ইসরাইলের গোটা জাতি কখনো একত্র হয়ে মিসরে প্রবেশ করে নি। আর প্রথম উক্তিটি এ-কারণে গ্রহণযোগ্য নয় যে, সামুদ সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষগুলো অবশ্যই সাইনা প্রান্তরের নিকটবর্তীই ছিলো; কিন্তু আদ সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষগুলো আরব দেশের পশ্চিমাংশে সাইনা প্রান্তর থেকে কয়েক মাসের দূরত্বে অবস্থিত ছিলো। সুতরাং, এ থেকে এমন কোনো কারণ আমাদের বোধগম্য হয় না, যার ফলে বনি ইসরাইলকে কেবল বিলুপ্তপ্রায় চিহ্নসমূহ এবং ধ্বংসাবশেষগুলো দেখানোর জন্য পাঠানো হয়েছিলো। আর এর জন্য আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি এত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হতো না। এখানে আরেকটি অভিমত এটিও আছে যে, 'সত্যত্যাগী লোকদের আবাসস্থল' বলে 'জাহান্নাম' উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আর কথাটি কাফেরদেরকে ভয় প্রদর্শনের জন্য বলা হয়েছে।
যাইহোক। হযরত মুসা আ.-কে তাওরাত প্রদান করা হলো। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলে দেয়া হলো, আমার বিধান এই-হেদায়েত আসার পর এবং তার সত্যতার পক্ষে উজ্জ্বল প্রমাণসমূহ উপস্থিত হওয়ার পরও যখন কোনো সম্প্রদায় তাদের বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না, বিপথগামিতা এবং পিতৃপুরুষদের অসৎ প্রথা ও কুসংস্কারের ওপরই প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তার ওপর বাড়াবাড়িই করতে থাকে, তবে আমিও তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতার ওপরই ছেড়ে রাখি এবং আমার সত্যের পয়গামে তাদের জন্য কোনো অংশই অবশিষ্ট থাকে না। কেননা, তারা নিজেদের অবাধ্যতামূলক নাফরমানির কারণে সত্য গ্রহণের যোগ্যতাকেই বিনষ্ট করে দেয়।
কুরআন মাজিদে এই মর্মার্থকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-
سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِنْ يَرَوْا كُلِّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الْغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ () وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَلِقَاءِ الْآخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (سورة الأعراف)
'পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে দম্ভ করে বেড়ায় তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শন থেকে (অন্যদিকে) ফিরিয়ে দেবো; তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও বিশ্বাস করবে না, তারা সৎপথ দেখলেও তাকে পথ বলে গ্রহণ করবে না; কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে তাকে তারা পথ হিসেবে গ্রহণ করবে। তা এইজন্য যে, তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করেছে এবং সে-সম্পর্কে তারা ছিলো গাফিল। যারা আমার নিদর্শন ও আখেরাতের সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়। তারা যা করে সে-অনুযায়ীই তাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৪৬-১৪৭]
টিকাঃ
⁹⁶ তাওরাতে যে-নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা-ই উত্তম এবং যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা-ই মন্দ। প্রদত্ত বিধানাবলির মধ্যে কিছু অতি উচ্চ পর্যায়ের, এগুলোকে পালন করা عزيمة অর্থাৎ অতি উচ্চমানের নিষ্ঠা আর সাধারণ বিধানের অনুসরণ رخصة অর্থাৎ নিচু স্তরের নিষ্ঠা, যাকে জায়েয বলা যায়।
⁹⁷ হযরত মুসা আ. আল্লাহর নির্দেশে তুর পাহাড়ে চল্লিশ দিন ও চল্লিশ রাত ইবাদতে মশগুল থাকার পর প্রতিশ্রুত তাওরাত কিতাব লাভ করেছিলেন।
⁹⁸ সামিরি নামক এক ব্যক্তি গো-বৎসের একটি প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছিলো। তার প্ররোচনায় কিছু সংখ্যক বনি ইসরাইল এই গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলো।
¹⁰⁰ রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআনিল আযিম ওয়াস সাবয়িল মাসানি, আবুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩, সুরা আ'রাফ।