📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বনি ইসরাইলের মিসর ত্যাগ এবং ফেরআউনের পশ্চাদ্ধাবন

📄 বনি ইসরাইলের মিসর ত্যাগ এবং ফেরআউনের পশ্চাদ্ধাবন


বিষয়টি যখন এ-পর্যন্ত গড়ালো তখন আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে নির্দেশ দিলেন, এখন সময় এসে গেছে, বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে বাপ-দাদার দেশে নিয়ে যাও।
মিসর থেকে ফিলিস্তিন বা কিনআন ভূমির দিকে যাওয়ার দুটি রাস্তা ছিলো। একটি পথ ছিলো সরাসরি স্থলভাগের ওপর দিয়ে, এটি ছিলো নিকটবর্তী পথ। আর দ্বিতীয়টি ছিলো লোহিত সাগরের পথ। অর্থাৎ, লোহিত সাগর অতিক্রম করে 'সুর' এবং 'তীহ' বা 'সাইনা' প্রান্তরের পথ এবং এটি দূরবর্তী পথ। কিন্তু আল্লাহ তাআলার হেকমতের চাহিদা হলো এই যে, স্থলভাগের সরাসরি নিকটবর্তী পথটি ছেড়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করে দূরবর্তী পথ দিয়ে যাওয়া হোক।
বর্ণিত ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, এই সঠিক পথটিকে আল্লাহ তাআলা এইজন্য প্রাধান্য দিয়েছে যে, স্থলভাগের পথটিকে অতিক্রম করার সময় ফেরআউন এবং তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে পড়তো। কেননা, ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় বনি ইসরাইলিদেরকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলো। যদি সমুদ্রের মুজেযাটি না ঘটতো, তবে ফেরআউন বনি ইসরাইলিদেরকে মিসরে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হতো। আর কয়েক শতাব্দীর দাসত্ব বনি ইসরাইলিদেরকে কাপুরুষ ও দুর্বলচিত্ত বানিয়ে দিয়েছিলো। তারা ভয় ও আতঙ্কের কারণে কোনোক্রমে ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতো না। তাওরাতের বর্ণনা থেকে এই ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়: "আর ফেরআউন যখন তাদেরকে মিসর থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করলো, তখন আল্লাহ তাদেরকে ফিলিস্তিনের পথে নিলেন না, যদিও এ-পথই ছিলো নিকটবর্তী। কেননা, আল্লাহ তাআলার এমন ইচ্ছা ছিলো না যে, তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখে পস্তাতে থাকে এবং ফেরআউনের সঙ্গে মিসরে ফিরে যায়। বরং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে লোহিত সাগর ও সাইনা প্রান্তরের ঘোরা পথ দিয়ে নিয়ে গেলেন।"⁸¹
তা ছাড়া ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়কে মহান মুজেযার মাধ্যমে অত্যাচারী ও প্রবল প্রতাপশালী শক্তির কবল থেকে নির্যাতিত ও নিপীড়িত সম্প্রদায়কে মুক্তি প্রদানের উদ্দেশে অসাধারণ ঘটনা প্রকাশ করাও ছিলো উদ্দেশ্য। এ-কারণেই এই পথটিকে যথাযথ মনে করা হয়েছে।
মোটকথা, হযরত মুসা ও হারুন আ. বনি ইসরাইলকে নিয়ে রাতের বেলাতেই লোহিত সাগরের পথ ধরলেন। রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তারা মিসরীয় রমণীদের অলঙ্কার ও মূল্যবান কাপড়সমূহও—যা এক উৎসব উপলক্ষ্যে বনি ইসরাইলিরা ফেরআউনের সম্প্রদায় থেকে ধার নিয়েছিলো—ফেরত দিতে সক্ষম হয় নি। এই আশঙ্কায় যে, ফেরআউনের সম্প্রদায় হয়তো আসল ব্যাপার টের পেয়ে যাবে।
এদিকে গুপ্তচরেরা ফেরআউনকে জানালো যে, বনি ইসরাইলিরা মিসর থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য শহর থেকে বের হয়ে গেছে। ফেরআউন তখনই এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে রাআ'মসিস থেকে বের হলো এবং বনি ইসরাইলিদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। ভোর হওয়ার একটু আগে সে তাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেলো।
তাওরাতের ভাষ্য অনুসারে শিশু ও গবাদি পশু ব্যতীত বনি ইসরাইলের সদস্যের সংখ্যা ছিলো ছয় লাখ। ভোর হওয়ার সময় যখন তারা পেছনের দিকে ফিরে তাকালো, দেখতে পেলো ফেরআউন সেনাবহিনীসহ তাদের মাথার ওপর উপস্থিত। তারা ঘাবড়ে গিয়ে মুসা আ.-কে বললো:
"মিসরে কি কবরের জায়গা ছিলো না যে তুমি আমাদের মারার জন্য এই প্রান্তরে নিয়ে এসেছো? তুমি আমাদের সঙ্গে এটা কী করলে যে আমাদেরকে মিসর থেকে বের করে আনলে? মিসরে থাকাকালে আমরা কি তোমাকে বলতাম না যে আমাদেরকে এখানেই থাকতে দাও, আমরা মিসরীয়দের সেবাই করতে থাকি? আমাদের জন্য প্রান্তরে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে মিসরীয়দের সেবা করাই উত্তম হতো। "⁸²

টিকাঃ
৮১ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৩, আয়াত ১৭-১৮।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফেরআউনের নিমজ্জন

📄 ফেরআউনের নিমজ্জন


হযরত মুসা আ. তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদান করে বললেন, ভয় করো না। আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি সত্য। তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে মুক্ত করবেন। অবশেষে তোমরাই সফলকাম হবে। এরপর হযরত মুসা আ. আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দোয়া করলেন। আল্লাহর ওহি মুসা আ.-কে নির্দেশ দিলো, তোমা লাঠি দ্বারা সমুদ্রের পানির ওপর আঘাত করো। তাহলে সমুদ্রের মধ্যস্থলে শুকনো পথ বের হবে। যখন মুসা আ. লোহিত সাগরের বুকে তাঁর লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে পানি দুই ভাগ হয়ে দুই পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেলো। মধ্যস্থলে রাস্তা প্রকাশিত হলো। মুসা আ.-এর আদেশে বনি ইসরাইলিরা তাতে নেমে পড়লো। শুকনো পথের মতো তার উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে সাগরের অপর পারে চলে গেলো। ফেরআউন এই দৃশ্য দেখে তার সম্প্রদায়কে বললো, এ তো আমারই মহিমা যে, তোমার বনি ইসরাইলকে গিয়েই ধরে ফেলবে। সুতরাং, তোমরা এগিয়ে চলো। ফেরআউন ও তার সেনাবাহিনী বনি ইসরাইলের পিছে পিছে সে-পথেই নেমে পড়লো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অপার মহিমা দেখুন, বনি ইসরাইলিরা সবাই যখন নিরাপদে অপর পারে গিয়ে পৌছে গেলো, তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সাগরের পানি পুনরায় তার আসল অবস্থায় ফিরে এলো। এদিকে ফেরআউন ও তার গোটা সেনাবাহিনী, যারা তখনো মধ্য-সাগরে ছিলো, পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেলো।
ফেরআউন যখন ডুবতে লাগলো এবং আযাবের ফেরেশতাদেরকে চোখের সামনে দেখতে লাগলো, তখন ডেকে ডেকে বলতে লাগলো, "আমি সেই 'ওয়াহদাহু লা-শারিকা লাহু' একক সত্তার প্রতি ঈমান আনছি, যাঁর ওপর বনি ইসরাইল ঈমান এনেছে আর আমি আল্লাহর একান্ত অনুগত বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত।" কিন্তু এই ঈমান যেহেতু প্রকৃত ঈমান ছিলো না; বরং আগের সময়ের মতো প্রতারণা ও ধোঁকা দিয়ে মুক্তিলাভের জন্য একটি অস্থিরতাসূচক উক্তি ছিলো।
اٰلْـٰٔنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِيْنَۙ (سورة يونس)
‘এখন! (এখন এ-কথা বলছো!) ইতোপূর্বে তো তুমি অমান্য করেছো এবং তুমি অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।’ [সুরা ইউনুস: আয়াত ৯১]
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা বেশ ভালোভাবেই জানেন যে, তুমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং ফেতনা-ফাসাদ বিস্তারকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
প্রকৃতপক্ষে ফেরআউনের এই সম্বোধন ছিলেন তেমনই এক প্রকারের সম্বোধন যা ঈমান আনা ও দৃঢ় বিশ্বাস লাভের উদ্দেশ্যে নয়; বরং এই সম্বোধন তা-ই যা আল্লাহ আযাব স্বচক্ষে দেখার পর বাধ্যতামূলক ও স্বাধীন ইচ্ছাহীন অবস্থায় মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। বস্তুত, সচক্ষে আযাব দেখার পর ফেরআউনের এই ঈমান আনার ঘোষণা হযরত মুসা আ.-এর সেই দোয়ারই ফল ছিলো যা পঠকগণ পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে পাঠ করেছেন-
فَلَا يُؤْمِنُوْا حَتّٰى يَرَوُا الْعَذَابَ الْاَلِيْمَۙ () قَالَ قَدْ اُجِيْبَتْ دَّعْوَتُكُمَا ۖ
‘তারা তো (নিজেদের চোখে) মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ঈমান আনবে না। তিনি বললেন, "তোমাদের দুইজনের দোয়া কবুল করা হলো।"’ [সুরা ইউনুস: আয়াত ৮৮-৮৯]
এখানে ফেরআউনের সম্বোধনের উত্তরে আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে আরো একটি জবাব এই দেয়া হয়েছিলো যে-
فَالْيَوْمَ نُنَجِّيْكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُوْنَ لِمَنْ خَلْفَكَ اٰيَةً ۭ وَاِنَّ كَثِيْرًا مِّنَ النَّاسِ عَنْ اٰيٰتِنَا لَغٰفِلُوْنَ۠
আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করবো, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্পর্কে গাফেল।' (সুরা ইউনুস: আয়াত ৯২)
মতএব, যদি প্রাচীনকালের মিসরীয় শিলালপির বিষয়বস্তু বিশুদ্ধ হয়ে থাকে যে, মিনফাতাহ (দ্বিতীয় রিমসিস)-ই মুসা আ.-এর যুগে ফেরআউন ছিলো, তবে তো নিঃসন্দেহে আজ পর্যন্ত তার লাশ সংরক্ষিত আছে। কিছুক্ষণ সমুদ্রে নিমজ্জিত থাকার ফলে মাছ তার নাক খেয়ে ফেলেছিলো। এবং আজো তা মিসরীয় প্রত্নতত্ত্বের (Egyptology) জাদুঘরে সাধারণ ও বিশিষ্ট সর্বস্তরের দর্শকের জন্য বিনোদনের বস্তু হয়ে আছে।
আর যদি মেনে নেয়া হয় যে, এই লাশটি সেই ফেরআউনের নয়, তবুও আয়াতটি ভাবার্থ নিজের স্থানে সঠিক রয়েছে। কারণ, তাওরাতে স্পষ্ট বর্ণিত আছে যে, বনি ইসরাইলিরা স্বচক্ষে দেখেছিলো যে, সাগরে নিমজ্জিত মিসরীয়দের লাশ সাগরের তীরে পড়েছিলো: "আর ইসরাইলিরা মিসরীয়দেরকে সমুদ্রের তীরে মরে পড়ে থাকতে দেখেছিল।"⁸³

টিকাঃ
⁸² তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১১-১২।
⁸³ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ৩১।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সমুদ্র-বিদারণ

📄 সমুদ্র-বিদারণ


কুরআন মাজিদ মিসর থেকে বনি ইসরাইলের যাত্রা, সমুদ্রে ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়া এবং বনি ইসরাইলের মুক্তিলাভের ঘটনাগুলোকে খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করেছে; বরং ঘটনাগুলোর একান্ত জরুরি অংশগুলোই আলোচনা করেছে। অবশ্য ঘটনাবলি-সম্পর্কিত উপদেশ, জ্ঞানলাভ ও নসিহতের বিষয়গুলোকে একটু বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। যেমন: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَقَدْ أَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي فَاضْرِبْ لَهُمْ طَرِيقًا فِي الْبَحْرِ يَبَسًا لَا تَخَافُ دَرَكًا وَلَا تَخْشَى ( فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ بِجُنُودِهِ فَغَشِيَهُمْ مِنَ الْيَمِّ مَا غَشِيَهُمْ () وَأَضَلُّ فَرْعَوْنُ قَوْمَهُ وَمَا هَدَى (سورة طه)
'আমি অবশ্যই মুসার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছিলাম এই মর্মে যে, "আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলা (মিসর থেকে) বের হয়ে যাও এবং তাদের জন্য সাগরের মধ্য দিয়ে একটি শুকনো পথ তৈরি করো। পেছন থেকে এসে তোমাকে ধরে ফেলা হবে এই আশঙ্কা করো না এবং ভয়ও করো না।" এরপর (যখন মুসা আ. তাঁর বনি ইসরাইলকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন তখন) ফেরআউন তার সৈন্যবাহিনীসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো, তারপর সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করলো। (অর্থাৎ তাদের ওপর যা ঘটার ছিলো ঘটে গেলো।) আর ফেরআউন তার সম্প্রদায়কে (নাজাত ও মুক্তি থেকে) পথভ্রষ্ট করেছিলো এবং সৎপথ দেখায় নি।' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৭৭-৭৯]
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ () فَأَرْسَلَ فِرْعَوْنُ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ )) إِنْ هَؤُلَاءِ لَشِرْذِمَةٌ قَلِيلُونَ )) وَإِنَّهُمْ لَنَا لَغَائِظُونَ )) وَإِنَّا لَجَمِيعٌ حَاذِرُونَ () فَأَخْرَجْنَاهُمْ مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ () وَكُنُورٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ () كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا بَنِي إِسْرَائِيلَ (( فَأَتْبَعُوهُمْ مُشْرِقِينَ () فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ () قَالَ كَلَّا إِنْ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ () فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَالفَلَقَ فَكَانَ كُلِّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ () وَأَزْلَفْنَا ثُمَّ الْآخَرِينَ () وَأَنْجَيْنَا مُوسَى وَمَنْ مَعَهُ أَجْمَعِينَ () ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ () إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ () وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (سورة الشعراء)
'আমি মুসার প্রতি ওহি প্রেরণ করেছিলাম এই মর্মে, "আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলা বের হও, তোমাদের তো পশ্চাদ্ধাবন করা হবে। (ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করবে।) তারপর ফেরআউন শহরে শহরে লোক সংগ্রহকারী পাঠালো (যেনো কিবতিদেরকে বনি ইসরাইলের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য ডেকে একত্র করা হয় এবং তাদেরকে উত্তেজিত করা হলো) এই বলে, 'এরা (বনি ইসরাইল) তো ক্ষুদ্র একটি দল, এরা তো আমাদের ক্রোধ উদ্রেক করেছে; (আমাদের অন্তর্দাহ সৃষ্টি করেছে) এবং আমরা তো সবাই সবসময় শঙ্কিত।” (অথবা আমরা সবসময় সতর্ক আছি। মোটকথা, কিবতিরা দলে দলে এসে ফেরআউনের সঙ্গে যোগদান করলো এবং সবাই মিলে রাতের বেলাতেই পলায়নপর বনি ইসরাইলিদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। আল্লাহ বলেন,) পরিণামে আমি ফেরআউনের গোষ্ঠীকে বহিষ্কৃত করলাম তাদের উদ্যানরাজি ও প্রস্রবণ থেকে এবং ধন-ভাণ্ডার ও সুরম্য সৌধমালা থেকে। এমনই ঘটেছিলো (এভাবে কিবতিরা ঘর-বাড়ি, বাগ-বাগিচা, ফসলি ভূমি, ধন-ভাণ্ডার ইত্যাদি পেছনে ফেলে বনি ইসরাইলের পশ্চাদ্ধাবন করলো। তাদের ভাগ্যে আর ফিরে আসা হলো না। যেনো এটা আল্লাহ তাআলারই সিদ্ধান্ত ছিলো।) এবং বনি ইসরাইলকে করেছিলাম এই সমুদয়ের অধিকারী। তারা সূর্যোদয়ের সময় তাদের পেছনে এসে পড়লো। তারপর যখন দুই দল পরস্পরকে দেখলো, তখন মুসার সঙ্গীরা বললো, "আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।" মুসা বললো, "কখনোই নয়! আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক; সত্বর তিনি আমাকে পথনির্দেশ করবেন।” তখন আমি মুসার প্রতি ওহি প্রেরণ করলাম, "তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো। ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ পাহাড়ের মতো হয়ে গেলো; আমি ওখানে উপনীত করলাম অপর দলটিকে, এবং আমি উদ্ধার করলাম মুসা ও তার সঙ্গী সবাইকে, তারপর নিমজ্জিত করলাম অপর দলটিকে। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।' [সুরা শুআরা আয়াত ৫২-৬৮।
فَالْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَأَغْرَقْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ () وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِينَ كَانُوا يُسْتَضْعَفُونَ مَشَارِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ الْحُسْنَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ بِمَا صَبَرُوا وَدَمَّرْنَا مَا كَانَ يَصْنَعُ فِرْعَوْنُ وَقَوْمُهُ وَمَا كَانُوا يَعْرِشُونَ (سورة الأعراف)
'সুতরাং আমি তাদেরকে (তাদের মন্দ কাজের কারণে) শাস্তি দিয়েছি এবং তাদেরকে (সেই অপরাধের প্রতিফলস্বরূপ) অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছি। কারণ তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করতো। যে- সম্প্রদায়কে দুর্বল গণ্য করা হতো তাদেরকে আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি; এবং বনি ইসরাইল সম্পর্কে (হে নবী) তোমার প্রতিপালকের শুভ বাণী সত্যে পরিণত হলো, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলো, আর ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যেসব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিলো (শক্তি ও মর্যাদার জন্য যা-কিছু তারা করেছিলো) তা ধ্বংস করেছি।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৩৬-১৩৭]
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ )) الآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ )) فَالْيَوْمَ تُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنْ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ (سورة يونس)
'আমি বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার করালাম এবং ফেরআউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্যসহ সীমালঙ্ঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। অবশেষে যখন সে নিমজ্জমান হলো তখন বললো, "আমি বিশ্বাস করলাম বনি ইসরাইল যাতে বিশ্বাস করে। নিশ্চয় তিনি ব্যতীত অন্যকোনো ইলাহ নেই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।” (আল্লাহ তাআলা বললেন,) "এখন! (এখন এ-কথা বলছো!) ইতোপূর্বে তো তুমি অমান্য করেছো এবং তুমি অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করবো, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য (আল্লাহ তাআলার কুদরতের একটি) নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্পর্কে গাফেল।' [সুরা ইউনুস: আয়াত ৯০-৯২]
وَاسْتَكْبَرَ هُوَ وَجُنُودُهُ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ () فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ (سورة القصص)
'ফেরআউন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহঙ্কার করেছিলো এবং তারা মনে করেছিলো যে, তারা আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে না। সুতরাং আমি তাকে ও তার বাহিনীকে ধরলাম এবং তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম। দেখো, জালিমদের পরিণام কেমন (ভীষণ ও ভয়ঙ্কর) হয়ে থাকে!' [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৯-৪০]
وَلَقَدْ فَتَنَّا قَبْلَهُمْ قَوْمَ فِرْعَوْنَ وَجَاءَهُمْ رَسُولٌ كَرِيمٌ () أَنْ أَدُّوا إِلَيَّ عِبَادَ اللَّهِ إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ () وَأَنْ لَا تَعْلُوا عَلَى اللَّهِ إِنِّي آتِيكُمْ بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ () وَإِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ أَنْ تَرْجُمُونِ () وَإِنْ لَمْ تُؤْمِنُوا لِي فَاعْتَزِلُونِ () فَدَعَا رَبَّهُ أَنْ هَؤُلَاءِ قَوْمٌ مُجْرِمُونَ )) فَأَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلًا إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ () وَاتْرُكِ الْبَحْرَ رَهْوًا إِنَّهُمْ جُنْدٌ مُغْرَقُونَ (( كَمْ تَرَكُوا مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ () وَزُرُوعٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ () وَنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَاكِهِينَ )) كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا قَوْمًا آخَرِينَ () فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ () وَلَقَدْ نَجَّيْنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنَ الْعَذَابِ الْمُهِينِ () مِنْ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ كَانَ عَالِيًا مِنَ الْمُسْرِفِينَ (سورة الدخان)
'এদের পূর্বে আমি ফেরআউনের সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করেছিলাম এবং তাদের কাছেও এসেছিলো এক সম্মানিত রাসুল। সে বলেছিলো, "আল্লাহর বান্দাদেরকে আমার কাছে প্রত্যর্পণ করো। আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসুল। এবং তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করো না, আমি তোমাদের কাছে উপস্থিত করছি স্পষ্ট প্রমাণ। তোমরা যাতে আমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে না পারো, তার জন্য আমি আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালকের শরণ নিচ্ছি। যদি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস স্থাপন না করো, তবে তোমার আমার থেকে দূরে থাকো।" এরপর মুসা তার প্রতিপালকের কাছে নিবেদন করলো, "এরা তো এক অপরাধী সম্প্রদায়।” আমি বলেছিলাম, "তুমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলা (মিসর থেকে) বের হয়ে পড়ো, তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে। (ফেরআউন ও তার বাহিনী তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করবে।) সমুদ্রকে স্থির থাকতে দাও,⁸⁴ তারা এমন এক বাহিনী যারা নিমজ্জিত হবে।" তারা (মিসর থেকে বের হওয়ার সময়) পেছনে রেখে গিয়েছিলো কত উদ্যান ও প্রস্রবণ; কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য প্রাসাদ, কত বিলাস উপকরণ, সেগুলোতে তারা আনন্দ পেত। এমনটাই ঘটেছিলো এবং আমি এই সমুদয়ের উত্তরাধিকারী করেছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে। আকাশ এবং পৃথিবী কেউ-ই তাদের জন্য চোখের পানি ফেলে নি এবং তাদেরকে অবকাশও দেয় হয় নি। আমি তো উদ্ধার করেছিলাম বনি ইসরাইলকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি থেকে ফেরআউনের; সে তো ছিলো পরাক্রান্ত সীমালঙ্ঘনকারীদের মধ্যে।' [সুরা দুখান: আয়াত ১৭-৩১]
فَأَرَادَ أَنْ يَسْتَفِزَّهُمْ مِنَ الْأَرْضِ فَأَغْرَقْنَاهُ وَمَنْ مَعَهُ جَمِيعًا () وَقُلْنَا مِنْ بَعْدِهِ لَبَنِي إِسْرَائِيلَ اسْكُنُوا الْأَرْضَ فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الْآخِرَةِ جِئْنَا بِكُمْ لَفِيفًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'এরপর ফেরআউন তাদেরকে দেশ থেকে উচ্ছেদ করার সংকল্প করলো; তখন আমি ফেরআউন ও তার সঙ্গীগণ সবাইকে নিমজ্জিত করলাম। এরপর আমি বনি ইসরাইলকে বললাম, "তোমরা ভূপৃষ্ঠে বসবাস করো এবং যখন কেয়ামতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে তখন তোমাদের সবাইকে আমি একত্র করে উপস্থিত করবো।"' [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০৩-১০৪]
وَفِي مُوسَى إِذْ أَرْسَلْنَاهُ إِلَى فِرْعَوْنَ بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ () فَتَوَلَّى بِرُكْنِهِ وَقَالَ سَاحِرٌ أَوْ mَجْنُونٌ () فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ وَهُوَ مُلِيمٌ (سورة الذاريات)
'এবং আমি নিদর্শন রেখেছি মুসার বৃত্তান্তে, যখন আমি তাকে স্পষ্ট প্রমাণসহ ফেরআউনের কাছে প্রেরণ করেছিলাম, তখন সে ক্ষমতার দম্ভে মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং বললো, "এই ব্যক্তি হয় এক জাদুকর, না হয় এক উন্মাদ।" সুতরাং আমি তাকে এবং তার দলবলকে শাস্তি দিলাম এবং তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম, সে তো ছিলো তিরস্কারযোগ্য।' [সুরা যারিয়াত: আয়াত ৩৮-৪০]
অবশ্য তাওরাত উপরে বর্ণিত ঘটনাবলি ছাড়াও আরো অনেক কিছু বিস্ত ারিত বিবরণসহ উল্লেখ করেছে। বনি ইসরাইলের যাত্রা করা এবং তাদের বিশ্রাম গ্রহণের বহু স্থানের নামও উল্লেখ করেছে। দুনিয়াবাসী তার কিছুই জানে না।
তাওরাতের বর্ণনার সারমর্ম এই: "ফেরআউন এবং তার সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহ তাআলার প্রেরিত শান্তি র ধারা শুরু হয়ে গেলো এবং হযরত মুসা আ.-এর কথা অনুসারে একের পর এক নিদর্শন প্রকাশ পেতে লাগলো। তখন ফেরআউন হযরত মুসা আ.-কে ডেকে বললো, বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে নিয়ে যাও। কিন্তু তাদের চতুষ্পদ ও গৃহপালিত পশুগুলোকে এখানেই ছেড়ে যেতে হবে। হযরত মুসা আ. এই শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, এই পশুগুলোকে রেখে দেয়ার অধিকার তোমার নেই। ফেরআউন তখন ক্রোধান্বিত হয়ে বললো, তবে বনি ইসরাইলিরাও মিসর থেকে বের হতে পারবে না। আর এরপর থেকে তুমি কখনো আমার সামনে এসো না। অন্যথায় তুমি আমার হাতে মারা যাবে। হযরত মুসা আ. বললেন, হ্যাঁ, এ তুমি ঠিকই বলেছো। এখন থেকে আমি কখনো আর তোমার সামনে আসবো না। আমার খোদার মীমাংসাও এটাই। আর তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন যে, তোমার এবং তোমার সম্প্রদায়ের ওপর এমন কঠিন বিপদ আসবে যে, তোমার এবং কোনো মিসরবাসীর প্রথম সন্তান জীবিত থাকবে না।
হযরত মুসা আ. ফেরআউনের সঙ্গে এমন কথোপকথনের পর তার দরবার থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি বনি ইসরাইলের উদ্দেশে বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ফেরআউনের হৃদয় কঠিন হয়ে পড়েছে। সে এখন তোমাদেরকে মিসর থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত যেতে দেবে না, যতক্ষণ আরো অধিক নিদর্শন না দেখে ছাড়ে। যার ফলে সমগ্র মিসরবাসীর মধ্যে ক্রন্দন ও বিলাপ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু তোমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। কেননা, মিসর থেকে বের হওয়ার সময় চলে এসেছে। আর আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মাধ্যমে বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের হওয়ার পূর্বে কুরবানি ও ঈদ উৎসব উদ্যাপনের আদেশ করলেন এবং তার শর্ত ও নিয়মও বলে দিলেন। মুসা আ. তাদেরকে এটাও বললেন, তোমরা তোমাদের নারীদেরকে বলো, তারা যেনো মিসরীয় নারীদের কাছে গিয়ে ঈদ উৎসবের জন্য তাদের কাছ থেকে তাদের স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কার এবং মূল্যবান কাপড়-চোপড় ধার চেয়ে আনে। মিসরীয় রমণীরা অবশেষে তাদেরকে অলঙ্কারসমূহ প্রদান করে। এরপর আল্লাহ তাআলার কাজ এমন হলো যে, এক রাতে ফেরআউন থেকে শুরু করে সাধারণ মিসরবাসী সবার প্রথম সন্তান মরে গেলো এবং সব পরিবারে কান্না ও বিলাপের রোল পড়ে গেলো। এই ঘটনা দেখে মিসরবাসীরা ফেরআউনের কাছে দৌড়ে গেলো। তারা ফেরআউনকে বাধ্য করলো যে, এই মুহূর্তে বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে দাও। যাতে এই অমঙ্গলজনক দুর্বিপাক এখন থেকে দূরীভূত হয়ে যায়। এদের কারণেই আমাদের ওপর এসব বিপদ আসছে।
তখন ফেরআউন হযরত মুসা আ.-কে বললো, এই মুহূর্তে তোমরা এই দেশ থেকে বের হয়ে যাও। তোমাদের চতুষ্পদ জন্তু, গৃহপালিত পশু এবং যাবতীয় আসবাবপত্র সঙ্গে করে নিয়ে যাও। বনি ইসরাইলিরা তখন রাআ'মসিস (উৎসবের শহর) ত্যাগ করে বেরিয়ে এলো। তখন তাদের শিশু ও গৃহপালিত পশু ছাড়া ছয় লাখ লোক ছিলো। যখন তার বের হয়ে এলো, তখন মিসরীয়দের অলঙ্কারগুলোও ফেরত দিতে পারলো না এবং মিসরীয়রাও তা দাবি করলো না।
বনি ইসরাইল যখন অরণ্যের পথ ধরার পর ফেরআউন ও সভাসদবর্গ তাদের সিদ্ধান্তের জন্য ভীষণভাবে আফসোস করতে লাগলো। তারা পারস্পরিক বলাবলি করতে লাগলো, আমরা অযথাই এমন ভালো ভালো চাকর-গোলাম ও দাস-দাসী হাতছাড়া করলাম। ফেরআউন তখন নির্দেশ দিলো, এই মুহূতেই সরদারদেরকে, মিসরীয় যুবকদেরকে এবং সেনাবাহিনীকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলো। মোটকথা, ফেরআউন প্রতাপ ও প্রতিপত্তির সঙ্গে বীরবিক্রমে রথে আরোহণ করে বের হয়ে পড়লো এবং বনি ইসরাইলিদের পশ্চাদ্ধাবন করলো।
বনি ইসরাইল 'রাআ'মাসিস' থেকে 'সিকাত', 'সিকাত' থেকে 'আইতাম', 'আইতাম' থেকে মোড় ঘুরে 'আহদাল' এবং লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী 'ফি-হাইখারুত'-এর নিকটবর্তী 'লাআলে-সাফওয়ান'-এর সামনে তাঁবু ফেলেছিলো। বনি ইসরাইলের এই পূর্ণ সফরে আল্লাহ তাআলা তাদের সঙ্গে থাকলেন এবং তিনি নুরের স্তম্ভের আলো দ্বারা রাতের বেলাতেও তাদেরকে পথপ্রদর্শন করতেন এবং দিনের বেলা তাদের সামনে সামনে থাকতেন। মোটকথা, ভোরের আলো প্রকাশ পেতেই ফেরআউন ও তার বাহিনি লোহিত সাগরের তীরে এসে বনি ইসরাইলের নাগাল পেলো।
বনি ইসরাইল পেছনের দিকে তাকিয়েই দেখলো যে, ফেরআউন তার সেনাবাহিনীসহ তাদের কাছে এসে পৌঁছে গেছে। তখন তারা ভগ্নহৃদয় ও ভীত হয়ে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে বিতণ্ডা শুরু করে দিলো। মুসা আ. তাদেরকে অনেক সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তোমাদের শত্রুর দল ধ্বংস হবে এবং তোমরা নিরাপত্তা ও শান্তির সঙ্গে মুক্তি পাবে। এরপর তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে মুনাজাত করতে লাগলেন।
আল্লাহ তাআলা মুসাকে বললেন, তুমি আমার কাছে ফরিয়াদ কেনো করছো? বনি ইসরাইলকে বলো, তারা সামনের দিকে অগ্রসর হোক আর তুমি তোমার লাঠি উঠিয়ে তোমার হাত সমুদ্রের ওপর বাড়াও এবং সমুদ্রকে দুই অংশে ভাগ করে দাও। তখন বনি ইসরাইল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে শুকনো ভূমির ওপর হেঁটে অপর পারে চলে যাবে। এরপর হযরত মুসা আ. নিজে সমুদ্রের ওপর হাত বাড়ালেন। আল্লাহ তাআলার সারা রাতব্যাপী পুবালি বায়ু চালালেন এবং সমুদ্রের পানি দুই দিকে সরিয়ে দিয়ে তাকে শুকনো জমিনে পরিণত করে দিলেন। পানি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো এবং বনি ইসরাইল সমুদ্র-গর্ভ দিয়ে শুকনো জমিনের ওপর হেঁটে পার হয়ে গেলো।
আল্লাহ তাআলার সমুদ্রের মধ্যস্থলে মিসরীয়দেরকে ডুবিয়ে দিলেন। পানি ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের ওপর নিজের স্থানে ফিরে এলো এবং তাদের রথসমূহকে, আরোহীদেরকে এবং ফেরআউনের গোটা সেনাবাহিনীকে-যারা বনি ইসরাইলের পশ্চাদ্ধাবন করেছিলো-সমুদ্রে নিমজ্জিত করে দিলো। তাদের একজনকেও অবশিষ্ট রাখলো না। অথচ বনি ইসরাইলিরা সমুদ্রের মধ্যভাগে শুকনো জমিনের ওপর দিয়ে হেঁটে সমুদ্র পার হয়ে গেলো। পানি তাদের ডানদিকে ও বামদিকে প্রাচীরের মতো দণ্ডায়মান থাকলো। আর আল্লাহ তাআলা মিসরীয়দের ওপর তাঁর যে-মহাশক্তি প্রকাশ করলেন, বনি ইসরাইল তা দেখলো এবং তারা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করলো এবং তাঁর ওপর ও তাঁর বান্দা মুসার ওপর ঈমান আনলো।"⁸⁵
তাওরাতের এসব বিস্তারিত বিবরণে যদিও ভালো-মন্দ ও জানাশোনার বাইরে অনেক কথা রয়েছে, কিন্তু এ-সম্পর্কে কুরআন মাজিদ এবং তাওরাতের মূল উদ্দেশ্য একই। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ফেরআউন ও তার নিষ্ঠুর অত্যাচার ও উৎপীড়ন থেকে মুসা আ. এবং বনি ইসরাইলকে এক বিরাট মুজেযা মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছেন। কুরআন মাজিদ বলে, এই মুজেযাটি এভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো যে, আল্লাহর নির্দেশে মুসা আ. লোহিত সাগরের ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন, ফলে সাগরের পানি মধ্যস্থলে শুকনো করে দিয়ে দুই দিকে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেলো।
فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقِ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ
'তারপর আমি মুসার প্রতি ওহি করলাম, "তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো।" ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড়ের মতো হয়ে গেলো।' [সুরা শুআরা : আয়াত ৬৩]
وَإِذْ فَرَقْنَا بِكُمُ الْبَحْرَ فَأَنْجَيْنَاكُمْ وَأَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ
'যখন তোমাদের জন্য সাগরকে বিভক্ত করেছিলাম এবং তোমাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম ও ফেরআউনের সম্প্রদায়কে নিমজ্জিত করেছিলাম আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৫০]
তাওরাত এই বক্তব্যেরও সমর্থন করছে। তাওরাতে উল্লেখ আছে: "তুমি তোমার লাঠি উথোলন করো, তোমার হাতকে সমুদ্রের ওপর বাড়াও এবং তাকে দুই ভাগে বিভক্ত করো। ... আর পানি তাদের ডানে ও বামে দেয়ালের মতো থাকলো।"
অবশ্য তাওরাতে এই কথাটুকু অতিরিক্ত বাড়ানো হয়েছে যে, "সারারাত পুবালি ঝড়ো হাওয়া চালিয়ে এবং সমুদ্রকে পেছনের দিকে সরিয়ে তাকে শুষ্ক জমিনে পরিণত করা হলো।" অতএব, তাওরাতের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এবং বিভিন্ন বছরের বিভিন্ন রকমের অনুবাদের প্রতি লক্ষ করলে কুরআন মাজিদের বর্ণনাকেই নির্ভরযোগ্য ধরা হবে। কেননা, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই এ-কথায় একমত যে, পবিত্র কুরআন সব ধরনের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে সুরক্ষিত রয়েছে। এই মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ
'কোনো মিথ্যা তাতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না-সামনে থেকেও না, পেছন থেকেও না। তা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।' [সুরা হা-মীম আস-সাজদা: আয়াত ৪২]
তা ছাড়া তাওরাতের উল্লিখিত সংযোজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য সাধনের উত্তম উপায় এটাও হতে পারে যে, হযরত মুসা আ. হাত বাড়িয়ে লাঠি চালানোর ফলে প্রথমে সাগর দুই ভাগে বিভক্ত হলে গেলো। এরপর যখন লাখ লাখ মানুষ তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে শুরু করলো, তখন জমিনের আদ্রতাকে শুষ্ক করার জন্য অনবরত পুবালি ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকলো। জমিন শুকিয়ে গেলে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত এবং মানুষ থেকে পশু পর্যন্ত কারো পথ অতিক্রমে কোনো ধরনের অসুবিধা ও কষ্ট হলো না।
দুর্ভাগ্যবশত মুসলমানের মধ্যে কিছু মানুষ এমনও আছে যারা 'জ্ঞান'-এর নামে ধর্মের প্রতিটি বিষয়কে 'মাদ্দিয়াত' বা বস্তুবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ দেখতে চায় এবং এই কারণে তারা আল্লাহ প্রদত্ত মুজেযাগুলোকে যা নবী ও রাসুলগণের সত্যতার সমর্থনে ও প্রমাণে প্রকাশিত হয়— অস্বীকার করে থাকে। মুজেযা অস্বীকার করার অর্থ তা-ই যা পেছনের পাতাগুলোতে মুজেযার আলোচনা প্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ, তারা আল্লাহ তাআলার কোনো কাজকেই কোনো অবস্থাতেই এই অনুভূতিগ্রাহ্য ও জড়বস্তুর দুনিয়ার কারণ ও উপকরণ থেকে মুক্ত বলে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। কারণ, তাদের এই নাস্তিকতা ও খোদাদ্রোহিতার ভিত্তি প্রকৃতপক্ষে পাশ্চাত্যের নাস্তিকতা ও খোদাদ্রোহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর তাদের মন ও মস্তিষ্ক পাশ্চাত্যেরই প্রভাবে প্রভাবিত ও বশীভূত। এর অনিবার্য ফল বস্তুবাদের ওপর বিশ্বাস ও নির্ভর ব্যতীত আর কিছুই হতে পারে না।
অন্য ক্ষেত্রগুলোর মতো এই ক্ষেত্রেও তারা চেষ্টা করেছে যে, কী প্রকারে ফেরআউনের নিমজ্জনের বিষয়টিও রুহানি মুজেযা থেকে বের হয়ে জড় কারণ ও উপকরণের অধীন চলে আসে। ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের পার্থিব উন্নতির জন্য কর্মশীল ব্যক্তিত্ব মরহুম স্যার সৈয়দ আহমদ খানও আরবি ভাষার বিদ্যা ও ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও উপরিউক্ত বিশ্বাসকে প্রচলিত করার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক ছিলেন। খুব সম্ভব তিনি ইউরোপের বর্তমান জীবনব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামের ঐক্য সাধন করতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু বস্তুবাদের এই খোলস ইসলামের দেহাবয়বের সঙ্গে খাপ খায় নি। ফলে তিনি খোলসের সংশোধনের পরিবর্তে ইসলামেরই চিত্র ও দেহাবয়বের সংশোধন শুরু করে দিলেন। অবশ্য তিনি এতে কৃতকার্য হতে পারেন নি।
নিঃসন্দেহে ইসলাম এমন একটি রুহানি ধর্ম যা রুহানিয়্যাত বা আধ্যাত্মিক চেতনার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পার্থিব জীবনেও মানুষের উন্নতি, সফলতা এবং কল্যাণ নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব বহন করে। এ-কারণেই প্রত্যেক যুগেই ইসলামের কোলে নানাবিধ বিদ্যার প্রতিপালন ও উন্নতি ঘটেছে। আর জ্ঞান ও বিজ্ঞান সবসময় ইসলামের অনুগ্রহের ছায়াতলে ক্রমবিকাশ ও উৎকর্ষ লাভ করেছে। কিন্তু বস্তুবাদী বিদ্যাসমূহের সীমা বস্তুবাদ, চাক্ষুষ দর্শনযোগ্য ও অনুভূতিগ্রাহ্য বিষয় থেকে এক বিন্দুও সামনে অগ্রসর হতে পারে নি। আর আজকের বিজ্ঞান এবং অতীতের দর্শন উভয়টিই এ-কথা স্বীকার করে যে, আমাদের সীমা অনুভূতিগ্রাহ্য পদার্থের ওপারে আর নেই। অর্থাৎ অনুভবযোগ্য বিষয় ও জড়পদার্থের দেয়ালের পেছনে কী আছে, তারা সে সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতা তো প্রকাশ করছে; কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে না।
ইসলামের দাবি এই যে, অতীত ও বর্তমান কালে বিদ্যাসমূহ যখন থিওরি ও চিন্তাধারা থেকে অগ্রসর হয়ে অনুভূতিগ্রাহ্যতা ও চাক্ষুষ দর্শনের সীমা পর্যন্ত পৌছেছে, তখন তাদের একটি বিষয়ও এমন পাওয়া যায় নি যা ইসলামের মূলনীতির বিরোধী অথবা ইসলামে তার অস্বীকৃতি পাওয়া যায়। তবে এমতাবস্থায়, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে যে-পর্যন্ত বিদ্যার থিওরি ও চিন্তাধারায় পরিবর্তন ঘটতে থাকবে এবং বিদ্যাগত অনুসন্ধান ও গবেষণা এক স্থান ত্যাগ করে ভিন্ন অবস্থান নির্মাণ করবে, তখন ইসলামকে সেগুলোর সাদৃশ ও অনুরূপ করার চেষ্টা বৃথা। কারণ, চাক্ষুষ দর্শনের সীমায় পৌঁছার পর নিঃসন্দেহে তাদের মীমাংসা কুরআনের মীমাংসার চেয়ে এক ইঞ্চিও অগ্রসর হতে পারবে না।
অবশ্য ইসলাম বা সত্যধর্ম এমন কতগুলো বিষয়কেও স্বীকার করে যা বস্তুবাদী দুনিয়ার ওপারের জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন: আখেরাত, হাশর-নাশর, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, ওহি, নবুওত ও মজেযা। কিন্তু এই স্বীকৃতি এই শর্তের সঙ্গে যে, এগুলোর মধ্যে কোনো বিষয়ই জ্ঞানের বিরোধী অর্থাৎ জ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। তারপরও জ্ঞানের পক্ষে সেগুলোর রহস্য ও মূলতত্ত্বের উপলব্ধি শুধু এই পরিমাণই হতে পারে, ধর্ম নিজের ধ্রুব জ্ঞান (আল্লাহর ওহি)-এর দ্বারা যে-পরিমাণ তা বিবৃত করেছে। আর এই বিষয়গুলোকে উপলব্ধি করার জন্য ওহি ব্যতীত জ্ঞানের কাছে অন্যকোনো উপায় নেই।
যাইহোক। সৈয়দ আহমদ সাহেব তাফসিরে আহমদিতে এই জায়গাটুকুর তাফসির করেছেন এমন সমুদ্রে বনি ইসরাইলের নিমজ্জিত হওয়া এবং বনি ইসরাইলিদের রক্ষা পাওয়া 'মুজেযা' ছিলো না; বরং তা সাধারণ পার্থিব কারণ ও উপকরণের ধারাবাহিকতায় সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাপার। অর্থাৎ, এই অবস্থা ঘটেছিলো যে, যখন বনি ইসরাইল লোহিত সাগর অতিক্রম করেছিলো তখন তার পানি সঙ্কুচিত হয়ে ছিলো এবং পেছনে সরে গিয়ে ভাটার রূপ ধারণ করেছিলো। ফেরআউন যখন এমন সহজভাবে বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার হয়ে চলে যেতে দেখলো, তখন সেও তার সেনাবাহিনীকে সমুদ্রে প্রবেশ করার জন্য নির্দেশ দিলো। কিন্তু ততক্ষণে বনি ইসরাইল পার হয়ে গিয়েছিলো এবং ফেরআউনের সেনাবাহিনী তখনো সমুদ্রের শুকনো স্থান অতিক্রম করছিলো। ঠিক এ-সময় সাগরের জোয়ার আসার সময় হলে গেলো। ফেরআউন ও তার লোকজন ও সেনাবাহিনী এতটুকু অবকাশও পেলো না যে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে অথবা পেছনের দিকে সরে আসবে। ফলে সবার সলিলসমাধি ঘটলো।
সৈয়দ আহমদ সাহেব তাঁর এই ধারণা অনুসারে বনি ইসরাইলের সমুদ্র পার হওয়া সম্পর্কে একটি মানচিত্রও দিয়েছেন। তাতে তিনি এ-বিষয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, বনি ইসরাইল লোহিত সাগরের উত্তর দিকের মুখের দিকে গমন করে সাগর পার হয়েছিলো।
কিন্তু আফসোসের সঙ্গে বলতে হয় যে, কুরআন মাজিদের বর্ণনা চরমভাবে তা অস্বীকার করছে এবং সৈয়দ আহমদ সাহেবের কথাকে কোনোভাবেই খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না।
অবশ্য যে-জায়গা দিয়ে বনি ইসরাইল লোহিত সাগর অতিক্রম করেছিলো, বিশেষভাবে সেই জায়গাটুকু নির্দিষ্ট করা অসম্ভব। কেননা, এ-প্রসঙ্গে তাওরাতই অতীতযুগের ইতিহাসের প্রাচীন ভাণ্ডার। কিন্তু তাওরাতে বর্ণিত স্থানগুলো বর্তমান যুগের মানুষের কাছে কতগুলো অজ্ঞাত নাম ছাড়া কিছু নয়।
অবশ্য কুরআন মাজিদ ও তাওরাতের যৌথ বর্ণনা ও আয়াতগুলো থেকে এটা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে যে, বনি ইসরাইল লোহিত সাগরের কোন্ পাশ ও মুখ দিয়ে অথবা মধ্যস্থলের কোন্ অংশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলো।
এটা বোঝার জন্য নিম্নে অঙ্কিত মানচিত্রটির সেই অংশের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন যেখানে লোহিত সাগর—বাহরে কুলযুম বা Red Sea অঙ্কিত রয়েছে। লোহিত সাগর প্রকৃতপক্ষে আরব সাগরের একটি শাখা। এর পূর্ব দিকে আরব দেশ এবং পশ্চিম দিকে মিসর অবস্থিত। উত্তর দিকে এর দুটি শাখা বেরিয়ে গেছে। একটি শাখা (আকাবা উপসাগর) সাইনা উপদ্বীপের পূর্বদিকে এবং দ্বিতীয় শাখা (সুয়েজ উপসাগর) সাইনার পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এই দ্বিতীয় শাখাটি (পশ্চিম শাখা) প্রথম শাখা (পূর্ব শাখা) থেকে বড় এবং তা উত্তর দিকে বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে। বনি ইসরাইল এরই মধ্যাংশ দিয়ে সাগর অতিক্রম করেছে। এই শাখাটির উত্তর দিকে মোহনার সামনে অন্য একটি সাগর অবস্থিত। তা হলো বাহরে রুম বা ভূমধ্য সাগর (the Mediterranean Sea)। ভূমধ্য সাগর এবং লোহিত সাগরের এই উত্তর দিকের মোহনার মধ্যস্থলে সামান্য একটু শুকনো জমিনের অংশ রয়েছে। এটাই সেই পথ, যে-পথে মিসর থেকে ফিলিস্তিন ও কিনআনগামী যাত্রীদেরকে লোহিত সাগর পার হওয়ার প্রয়োজন পড়তো না এবং সেকালে এই পথটিকে নিকটবর্তী পথ বলে মনে করা হতো। আর বনি ইসরাইলিরা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় এই পথ অবলম্বন করে নি। বর্তমানে সেই শুষ্ক ভূমিটুকু খনন করে লোহিত সাগরকে ভূমধ্য সাগরের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। এই খণ্ডটুকুর নাম সুয়েজ প্রণালি। আর লোহিত সাগরের উত্তর দিকের মোহনায় সুয়েজ নামে একটি শহর রয়েছে। এটি মিসরের বন্দর এলাকা বলে গণ্য হয়।
তারপর কুরআন মাজিদের সুরা বাকারা ও সূরা শুআরার যে-আয়াতগুলো এ-ব্যাপারে বিবরণ পেশ করলে সে-আয়াতগুলোর প্রতি আর একবার গভীর মনোযোগ দেয়া উচিত। এ-আয়াতগুলোতে পরিষ্কারভাবে দুটি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। একটি হলো فلق یا فرق بحر অর্থাৎ সমুদ্র খণ্ডিত হওয়া বা তাকে খণ্ডিত করে দেয়া। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো উভয় পাশে পানির পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং মধ্যস্থলে রাস্তা সৃষ্টি হওয়া। যেমন কুরআন মাজিদ বলছে-
فَالفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقِ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ
'ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ পাহাড়ের মতো হয়ে গেলো।'
এখানে فرق শব্দের অর্থ দ্বিখণ্ডিত করে পৃথক করা। বিশেষ করে فرق-এর সম্পর্ক যদি بحر অর্থাৎ সমুদ্রের সঙ্গে হয়, তখন খণ্ডিত করে ভিন্ন ভিন্ন দুই অংশে বিভক্ত করে দেয়াই অর্থ হবে। যেমন: অভিধানে আছে فرق البحر অর্থ شقه অর্থাৎ, সমুদ্রকে পৃথক পৃথক দুইভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। আর মাথার সিঁথিকে فرق বলা হয় এইজন্য যে, তা মাথার চুলগুলোকে দুইভাগে বিভক্ত করে মধ্যস্থল প্রকাশ করে।
আর فلق সম্পর্কে অভিধানে উল্লেখ আছে যে, فلق الشيء অর্থ شقه অর্থাৎ, বস্তুটিকে বিদীর্ণ করেছে বা ফাটিয়েছে বা দ্বিখণ্ডিত করেছে বা ভেঙে ফেলেছে। فلق-এর আরেক অর্থ প্রভাব উদ্ভাসিত করেছে। আর انفلق অর্থ انشق অর্থাৎ, বস্তুটি ফেটে গেছে, বিদীর্ণ হয়েছে, দ্বিখণ্ডিত হয়েছে বা ভেঙে গেছে।- فلق الشيء فانفلق 'সে বস্তুটিকে দ্বিখণ্ডিত/বিদীর্ণ করেছে ফলে তা দ্বিখণ্ডিত/বিদীর্ণ হয়েছে।' এ-কারণে পাথরের মধ্যকার ফাটলকে فلق বলা হয়। এভাবে বিরাট পাহাড়কে طود বলা হয়। যেমন: ة طود الجبل العظيم - الطود بعد الجبل অর্থাৎ বিরাট পাহাড়।
আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণের পর উল্লিখিত দুটি আয়াতের পরিষ্কার অর্থ হলো এই যে, সাগরের পানি সুনিশ্চিতভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিলো এবং ফাঁকা জায়গায়র উভয় পাশে পানি দুটি বিরাট দণ্ডায়মান পাহাড়ের মতো হয়ে গিয়েছিলো এবং মধ্যস্থলে রাস্তা সৃষ্টি হয়েছিলো। এটা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন বনি ইসরাইল সাগরের এমন অংশ দিয়ে পার হয়ে থাকবে যা মোহনা ও তীরের সামনে অংশ হবে না; বরং পানির এমন অংশ হবে যা মধ্যখানে ফেটে গিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে। অন্য শব্দে এভাবে বলা যেতে পারে যে, কুরআন মাজিদ পরিষ্কার ভাষায় এটা ঘোষণা করছে যে, বনি ইসরাইল স্থলভাগের পথ দিয়ে এসে লোহিত সাগরের মোহনা বা তার কিনারা দিয়ে সাগর অতিক্রম করে নি; বরং সাগরের মধ্যভাগের কোনো অংশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলো এবং সাইনা প্রান্তরে পৌঁছেছিলো। বলাবাহুল্য, জোয়ার-ভাটা সাগরের দৈর্ঘ্যের অংশে মোহনার দিকে হয়ে থাকে। সাগরের প্রস্থের দিক দিয়ে কখনো এমন হয় না যে, পানি দুই দিকে কুঞ্চিত হয়ে যায় এবং মধ্যভাগে শুষ্ক রাস্তা সৃষ্টি হয়। সুতরাং আল্লহ তাআলার এই মহান মুজেযাকে অবিশ্বাস করে একে দৈনন্দিন বস্তুবাদী কারণ ও উপকরণের আওতায় আনার চেষ্টা করা কুরআনের বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং কুরআনকে বিকৃত করারই শামিল।
তা ছাড়া বনি ইসরাইলিদের এই সাগর অতিক্রম করার ঘটনায় তাওরাত লোহিত সাগরের পুব পাশের ও পশ্চিম পাশের যেসব স্থানের নাম উল্লেখ করেছে এবং সাগর অতিক্রম করা সম্পর্কে যেসব বিবরণ দিয়েছে, তা থেকেও এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বনি ইসরাইলের এই সাগর-অতিক্রম না থাকতো, তারপরও আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ওহির মীমাংসাই একটি বাকশীল মীমাংসা। আর মুমিনগণের ঈমান বাতিল ব্যাখ্যাসমূহ থেকে ভিন্ন মূলতত্ত্বের সঙ্গেই দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত রয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ও চূড়ান্ত আকিদা এই যে, মুসা আ.-এর নবুওতের সত্যতা প্রমাণের জন্য একটি মহান মুজেযা ছিলো। এই মুজেযা এক নিমিষের মধ্যে যাবতীয় বস্তুবাদী হুমকি-ধমকি ও উপকরণের অহমিকাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে এবং উৎপীড়িত সম্প্রদায়কে অত্যাচারী সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছে।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَنْجَيْنَا مُوسَى وَمَنْ مَعَهُ أَجْمَعِينَ )) ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ () إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (( وَإِنْ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (سورة الشعراء)
'এবং আমি উদ্ধার করলাম মুসা ও তার সঙ্গী সবাইকে, তারপর নিমজ্জিত করলাম অপর দলটিকে (মুসা আ.-এর শত্রুদেরকে)। এতে অবশ্যই (আল্লাহ তাআলার) নিদর্শন (মুজেযা) রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।' (সূরা শুআরা: আয়াত ৬৫-৬৮]
ঘটনার এসব বিস্তারিত আলোচনার পর গ্রন্থিত মানচিত্রটিকে সামনে রাখলে বর্ণিত তথ্যসমূহ সুন্দরভাবে স্পষ্ট হতে পারে। আর মুজেযা অস্বীকারকারীগণ এই ঘটনার মূল সত্যের পর পর্দা ফেলে তাকে আচ্ছাদিত করার জন্য যে-বাতিল ব্যাখ্যাসমূহ প্রদান করেছেন তার স্বরূপ উত্তমরূপেই উদ্‌ঘাটিত হয়ে যাচ্ছে।

টিকাঃ
৮৪ হযরত মুসা আ. যখন বনি ইসরাইলসহ সমুদ্র অতিক্রম করছিলেন তখন তাদের জন্য সমুদ্রকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিলো। -২: ৫০ তাদের সমুদ্র অতিক্রম করার পর মুসা আ.-কে বলা হয়েছিলো, সমুদ্রকে সেই অবস্থায় থাকতে দাও, যাতে ফেরআউন ও তার বাহিনী তাতে প্রবেশ করে।-৭: ১৩৬
৮৫ তাওরাত : আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১৫-৩১।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফেরাউন, ফেরআউনের সম্প্রদায় এবং কেয়ামতের আযাব

📄 ফেরাউন, ফেরআউনের সম্প্রদায় এবং কেয়ামতের আযাব


হযরত মুসা আ. ও ফেরআউনের মধ্যকার এই ঘটনা কোনো মামুলি বা সাধারণ ঘটনা নয়; বরং তা সত্য-মিথ্যার লড়াইগুলোর মধ্যে একটি মহান লড়াই। একদিকে অহঙ্কার ও গর্ব, উৎপীড়ন ও অত্যাচার, প্রতাপ ও অহমিকার লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হওয়া আর অপর দিকে নিপীড়নগ্রস্ততা, আল্লাহর ইবাদত এবং ধৈর্য ও দৃঢ় সংকল্পের জয় ও সফলতার বিচিত্র চিত্র। এ-কারণে আল্লাহ তাআলা ফেরআউন ও ফেরআউনের সম্প্রদায়কে পার্থিবভাবে ধ্বংসের পর উপদেশ ও জ্ঞান লাভের জন্য এ- কথার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করলেন যে, এই জাতীয় লোকদের জন্য পরকালের অনন্ত জীবনে কেমন মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে এবং আল্লাহর লানতের কেমন শিক্ষামূলক উপকরণ প্রস্তুত রয়েছে। যাতে সুস্থবিবেক, সচ্চরিত্র ও পুণ্যবান মানুষেরা তা অনুধাবন করেন এবং অসৎ কাজ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখেন এবং অন্য লোকদেরকেও পাপ থেকে রক্ষিত থাকার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন।
এই প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ () إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ فَاتَّبَعُوا أَمْرَ فِرْعَوْنَ وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيدٍ () يَقْدُمُ قَوْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَوْرَدَهُمُ النَّارَ وَبِئْسَ الْوِرْدُ الْمَوْرُودُ () وَأُتْبِعُوا فِي هَذِهِ لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ بِئْسَ الرِّفْدُ الْمَرْفُودُ (سورة هود)
'আমি তো মুসাকে আমার নিদর্শনাবলি ও স্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠিয়েছিলাম, ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে। কিন্তু তারা ফেরআউনের কার্যকলাপের অনুসরণ করতো এবং ফেরআউনের কার্যকলাপ ভালো ছিলো না। সে কেয়ামতের দিনে তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে (যেভাবে দুনিয়াতে পথভ্রষ্টতায় আগে আগে ছিলো) এবং সে তাদেরকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করবে। (দেখো) যেখানে তাদের প্রবেশ করানো হবে তা কত নিকৃষ্ট স্থান! এই দুনিয়ায় তাদেরকে করা হয়েছিলো অভিশাপগ্রস্ত (ফলে তাদের আলোচনা কখনো পছন্দনীয়রূপে হবে না) এবং অভিশাপগ্রস্ত হবে তারা কেয়ামতের দিনেও (কেননা, তারা তখন চিরকালীন শাস্তি ভোগ করার উপযোগী হবে)। কত নিকৃষ্ট সে পুরস্কার যা তাদেরকে দেয়া হবে।' [সুরা হুদ: আয়াত ৯৬-৯৯]
وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يُنْصَرُونَ () وَأَتْبَعْنَاهُمْ فِي هَذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ هُمْ مِنَ الْمَقْبُوحِينَ (سورة القصص)
'তাদেরকে আমি নেতা (অগ্রনায়ক/অগ্রপথিক) করেছিলাম; তারা লোকদেরকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করতো; কিয়ামতের দিন তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। এই পৃথিবীতে আমি তাদের পেছনে লাগিয়ে দিয়েছি অভিসম্পাত এবং কেয়ামতের দিন তারা হবে ঘৃণিত (দুর্দশাগ্রস্ত)।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৪১-৪২]
فَوَقَاهُ اللَّهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ () النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدُّ الْعَذَابِ (سورة مؤمن)
'এরপর আল্লাহ তাকে⁸⁶ তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং কঠিন শাস্তি পরিবেষ্টন করলো ফেরআউনের সম্প্রদায়কে। তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে (বারযাখে) সকাল সন্ধ্যায় এবং যেদিন কিয়ামত ঘটবে সেদিন বলা হবে "ফেরআউনের সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ করো কঠিন শাস্তিতে।"⁸⁷' [সুরা মুমিন: আয়াত ৪৫-৪৬]
إِن شَجَرَتَ الزَّقُومِ ( طَعَامُ الْأَثِيمِ (( كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ () كَفَلْيِ الْحَمِيمِ () خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ () ثُمَّ صُبُوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ ) ذُفَ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ ( إِنَّ هَذَا مَا كُنتُمْ بِهِ تَمْتَرُونَ (سورة الدخان)
'নিশ্চয়ই যাক্কুম বৃক্ষ হবে-পাপীর খাদ্য। গলিত তামার মতো, তাদের ফেটে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মতো। ওকে⁸⁸ ধরো এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে, এরপর তার মাথার ওপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও-এবং (বলা হবে,) "আস্বাদ গ্রহণ কর, তুই তো ছিলি সম্মানিত, অভিজাত! এটা তো তা-ই, যে-বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতে (ধোঁকায় পতিত ছিলে)।"' [সুরা দুখান: আয়াত ৪৩-৫০]

টিকাঃ
⁸⁶ হযরত মুসা আ.-কে, ভিন্নমতে ফেরআউনের সম্প্রদায়ের যে-লোকটি ঈমান এনেছিলেন তাঁকে।
⁸⁷ এই আয়াতে কবরের আযাবের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।
⁸⁸ জাহান্নামের প্রহরী ফেরেশতাদেরকে এই নির্দেশ দেয়া হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00