📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আল্লাহর নিদর্শনসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

📄 আল্লাহর নিদর্শনসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা


হযরত মুসা আ.কে বহু নিদর্শন (মুজেযা) দেয়া হয়েছিলো। সুরা বাকারা, সুরা আ'রাফ, সুরা নামল, সুরা কাসাস, সুরা বনি ইসরাইল, সুরা তোয়া- হা, সুরা যুখরুফ, সুরা মুমিন, সুরা কামার ও সুরা নাযিয়াতের বিভিন্ন বর্ণনাশৈলীতে সেসব নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে। যেমন: সুরা বনি ইসরাইলে বলা হয়েছে—
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ فَاسْأَلُ بَنِي إِسْرَائِيلَ إِذْ جَاءَهُمْ فَقَالَ لَهُ فِرْعَوْنُ إِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا مُوسَى مَسْحُورًا )) قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُورًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'তুমি বনি ইসরাইলকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমি মুসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম; যখন সে তাদের কাছে এসেছিলো, ফেরআউন তাকে বলেছিলো, “হে মুসা, আমি মনে করি তুমি তো জাদুগ্রস্ত।" মুসা বলেছিলো, "তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, এইসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন—প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। হে ফেরআউন, আমি তো দেখছি (এসব নিদর্শন অস্বীকার করার কারণে) তোমার ধ্বংস আসন্ন।"' [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০১-১০২]
সুরা তোয়া-হা, সুরা নামল, সুরা নাযিআতে সংখ্যার কথা না বলে কেবল 'নিদর্শনসমূহ' কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কোনো স্থানে 'স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ' (آيات بينات), কোনো স্থানে 'বিস্তারিত নিদর্শনসমূহ' (أيات مفصلات), কোনো স্থানে 'শ্রেষ্ঠ নিদর্শনসমূহ' (الآيات الكبرى) এবং কোনো স্থানে শুধু 'আমার নিদর্শনসমূহ' (آياتي) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর এই বিস্তারিত ও মোটামুটি বিবরণ ছাড়াও উপরিউক্ত সুরা সমূহে পৃথক পৃথক নিদর্শন ও মুজেযাসমূহের উল্লেখ রয়েছে। যদি এর সবগুলোকে একস্থানে একত্র করা হয়, তবে নিম্নবর্ণিত তালিকাটি সাজানো যায়।
১. লাঠি, যা নিক্ষেপ করলে সাপ হয়ে যেতো; ২. শুভ্র হাত, যা জামার ভেতর থেকে বের করে আনলে উজ্জ্বল দেখাতো; ৩. দুর্ভিক্ষ; ৪. শস্যহানি; ৫. ঝড়-তুফান; ৬. পঙ্গপাল; ৭. উকুন; ৮. ব্যাঙ; ৯. রক্ত⁷⁴; ১০. সমুদ্র-বিদারণ, অর্থাৎ লোহিত সাগর খণ্ডিত হয়ে শুকনো রাস্তা বের হওয়া; ১১. মান্না ⁷⁵ ও সালওয়া⁷⁶; ১২. গামাস বা মেঘের ছায়া; ১৩. লাঠির আঘাতে পাথর থেকে ঝরনা প্রবাহিত হওয়া; ১৪. তুর পাহাড় সমূলে উৎপাটিত হয়ে মাথার ওপর আসা; ১৫. তাওরাত নাযিল হওয়া।
উপরিউক্ত বিভিন্ন প্রকারের বিবরণ ও বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে মুফাস্সিরগণ এ-ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে যে, কোন্ পন্থা অবলম্বন করলে تسع آيات বা নয়টি নিদর্শনও নির্ধারিত হয় এবং অন্যান্য নিদর্শন ও মুজেযার বিবরণও শুদ্ধ নিয়মে থেকে যায়। কাজি নাসিরুদ্দিন বায়যাবি এবং অন্য কতিপয় মুফাস্সির এই ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন যে, সুরা বনি ইসরাইলের মধ্যে যে-নয়টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা ওইসব নিদর্শন উদ্দেশ্য নয় যা ফেরআউন ও কওমের বিরুদ্ধে তিরস্কার, শাস্তি ও উপদেশের জন্য পাঠানো হয়েছিলো। বরং এই নয়টি নিদর্শন দ্বারা ওইসব আহকাম উদ্দেশ্য যা লোহিত সাগর পার হওয়ার পর বনি ইসরাইলকে প্রদান করা হয়েছিলো। তাঁরা তাদের এই ব্যাখ্যার সমর্থনে হযরত সাফওয়ান বিন আস্সাল রা. থেকে বর্ণিত হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। হাদিসটির সারমর্ম এই একবার দুজন ইহুদি পরস্পর পরামর্শ করলো যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের দাবির সত্যতা পরীক্ষা করে দেখা হোক। পরামর্শের পর তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে যে-নয়টি নিদর্শন দান করেছিলেন তা ব্যাখ্যা করুন।” রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সেই নয়টি নিদর্শন (আহকাম) হলো এই : ১. তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শিরক করো না; ২. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করো না, যা আল্লাহপাক নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন; ৩. চুরি করো না; ৪. ব্যভিচার করো না; ৫. জাদুকর্ম করো না; ৬. সুদ খেয়ো না; ৭. নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য শাসকের কাছে ধন্না দিয়ো না; ৮. কোনো সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ দিয়ো না; ৯. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করো না। আর হে ইহুদি সম্প্রদায়, বিশেষ করে তোমরা শনিবারের বাধ্যবধকতা লঙ্ঘন করো না।" [দালাইলুন নবুওয়াহ ও সুনানে তিরমিযিতে বর্ণিত রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, নবম হুকুমটি কি এটিই ছিলো না অন্যকিছু এ-ব্যাপারে রাবি শু'বা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।]⁷⁷
এই মুফাস্সিরগণের উল্লিখিত ব্যাখ্যা সঠিক নয় এ-কারণে যে, সুরা বনি ইসরাইলে নয়টি নিদর্শনের উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে ফেরআউন ও হযরত মুসা আ.-এর মোকাবিলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফেরআউন এসব নিদর্শন দেখে বলে, হে মুসা, এগুলো হলো জাদুর ইন্দ্রজাল এবং মুসা আ. বলেন, হে ফেরআউন, এগুলো আল্লাহ তাআলার নিদর্শন। আর তুমি এগুলো অবিশ্বাস করে ধ্বংসে পতিত হচ্ছো। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে নয়টি নিদর্শন দ্বারা নয়টি আহকাম উদ্দেশ্য করা কেমন করে সঠিক ও শুদ্ধ হতে পারে? কেননা, উল্লিখিত মুফাস্সিরগণের মতেও এই আহকামগুলো ফেরআউনের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পরেই নাযিল হয়েছিলো (তাই তা ফেরআউনের সময়কার হতে পারে না, অথচ সুরা বনি ইসরাইলে ফেরআউনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে)। বস্তুত, এই প্রশ্নটিই উত্থাপিত হয় সুনানে তিরমিযিতে বর্ণিত হাদিসের ওপরও। তা ছাড়া এ-কথাটিও সন্দেহমুক্ত নয় যে, কুরআন মাজিদের আলোচ্য আয়াতগুলোর মধ্যে তো নয়টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আর সাফওয়ান বিন আস্সাল রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে দশটি আহকামের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং সংখ্যায় ব্যতিক্রম ঘটেছে। তারপর দশটি আহকামের নয়টিকে নিদর্শন বলে ব্যাখ্যা করা কেমন করে শুদ্ধ হতে পারে?
উল্লিখিত দুটি সন্দেহ ছাড়া সাফওয়ান রা.-এর হাদিসের ওপর ভিত্তি করে এই নয়টি নিদর্শনকে নয়টি আহকাম বলে ব্যাখ্যা করার ওপর যে জটিলতা অবধারিত হয় তা এই যে, সুরা নামলের মধ্যে নয়টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করে শুভ্রোজ্জ্বল হাতকে এই নয়টি নিদর্শনের একটি বলা হয়েছে। পরিষ্কারভাবে এটাও বলা হয়েছে যে, ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের জন্য এই নিদর্শন বা মুজেযাগুলো প্রেরণ করা হয়েছে। যেমন: সুরা নামলে বর্ণিত আছে—
وَأَدْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ آيَاتٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ
'এবং তোমার হাত তোমার বগলে রাখো, তা বের হয়ে আসবে শুভ্র-নির্মল অবস্থায়। তা (এই নিদর্শন) ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। তারা তো সত্যত্যাগী (ও পাপিষ্ঠ) সম্প্রদায়।' [সুরা নামল: আয়াত ১২]
অতএব, কুরআন মাজিদে পরিষ্কার বর্ণনার পর হাদিসটিও ত্রুটিমুক্ত থাকলো না (কারণ, তাতে নয়টি নিদর্শনকে নয়টি আহকাম বলা হয়েছে) এবং মুফাস্সিরিনের এই উক্তিও শুদ্ধ হতে পারে না। এ-কারণেই হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এই হাদিসটি সম্পর্কে বলেছেন—
فهذا حديث رواه هكذا الترمذي والنسائي وابن ماجه وابن جرير في تفسيره من طرق عن شعبة بن الحجاج به وقال الترمذي حسن صحيح. وهو حديث مشكل وعبد الله بن سلمة في حفظه شئ وقد تكلموا فيه ولعله اشتبه عليه التسع الآيات بالعشر الكلمات فإنها وصايا في التوراة لا تعلق لها بقيام الحجة على فرعون والله أعلم.
ولهذا قال موسى لفرعون: ( لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أُنزِلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ ) أي: حججًا وأدلة على صدق ما جنتك به ( وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فَرْعَوْنُ مَثْبُورًا ) أي: هالكًا.
এই হাদিসটিকে একইভাবে তিরমিযি, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ এবং ইবনে জারির তাঁদের তাফসিরসমূহে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে শু'বা বিন আল-হাজ্জাজ থেকে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে حسن (হাসান সহিহ) বলেছেন। কিন্তু এটি একটি জটিলতাপূর্ণ হাদিস।
আর রাবি আবদুল্লাহ বিন সালামার স্মরণশক্তিতে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। মুহাদ্দিসগণ তাঁর সম্পর্কে সমালোচনা করেছেন। সম্ভবত (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বর্ণিত) দশটি আহকামকে নয়টি নিদর্শন বলে তাঁর সন্দেহ হয়ে গিয়েছিলো (ফলে তিনি একটিকে অন্যটির সঙ্গে যুক্ত করে বর্ণনা করেছেন)। আর তা হলো দশটি নির্দেশ যা তাওরাতে বর্ণিত হয়েছে। ফেরআউনের ওপর দলিল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে এগুলোর (দশটি নির্দেশ বা আহকাম) কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
এ-কারণে মুসা আ. ফেরআউনকে বলেছিলেন, "তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, এইসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন-প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ।" অর্থাৎ যে-সত্যের পয়গাম নিয়ে আমি এসেছি, তার সত্যায়নের জন্য প্রমাণ ও দলিল বানিয়ে পাঠিয়েছেন। "আর হে ফেরআউন, আমি তো দেখছি (এসব নিদর্শন অস্বীকার করার কারণে) তোমার ধ্বংস আসন্ন।"⁷⁹ অর্থাৎ তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
মোটকথা, কাযি বায়যাবি রহ. এবং অন্য মুফাস্সিরগণের উল্লিখিত ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবেই সন্দেহযুক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত ব্যাখ্যার বিপরীত নয়টি নিদর্শনের নির্দিষ্টকরণে সেই নিদর্শনগুলোকেই গণনা করেছেন যা উপদেশ ও জ্ঞান লাভ এবং বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলায় হযরত মুসা আ.-এর সত্যতা প্রমাণের জন্য দান করা হয়েছিলো। কিন্তু তাঁদের বক্তব্যগুলোর বিভিন্ন ধরনের এবং সেগুলোতে যথেষ্ট বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান। কেননা, তাতে লোহিত সাগর অতিক্রম করার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয় সময়ের নিদর্শগুলোকে সংমিশ্রিত করে ফেলা হয়েছে। অবশ্য এই বক্তব্যগুলোর মধ্যে প্রণিধান পাওয়ার যোগ্য হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর এই বক্তব্য যে, নয়টি নিদর্শন দ্বারা নিম্নিলিখিত মুজেযাগুলো উদ্দেশ্য: ১. লাঠি; ২. শুভ্র হাত; ৩. দুর্ভিক্ষ; ৪. শস্যহানি; ৫. ঝড়-তুফান; ৬. পঙ্গপাল; ৭. উকুন; ৮. ব্যাঙ; ৯. রক্ত। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ছাড়াও মুজাহিদ, ইকরামা, শা'বি এবং কাতাদা রহ.-ও এই মতেরই সমর্থন করেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর ব্যাখ্যার সারমর্ম এই যে, হযরত মুসা আ.-কে যতগুলো মুজেযা দান করা হয়েছে তার কতিপয় লোহিত সাগর অতিক্রম করার পূর্ব-সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর কতিপয় লোহিত সাগর অতিক্রম করার পরের সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রথমগুলোর সম্পর্ক ওইসব ঘটনাবলির সঙ্গে যা হযরত মুসা আ. এবং ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটেছিলো এবং সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ের কারণ হয়েছিলো। এই অংশে আছে নয়টি মুজেযা, তার মধ্যে লাঠি ও শুভ্রোজ্জ্বল হাত সর্বশ্রেষ্ঠ মুজেযা।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَأَرَاهُ الْآيَةَ الْكُبْرَى
"এরপর মুসা ফেরআউনকে দেখালো এক বড় নিদর্শন (অর্থাৎ লাঠির নিদর্শন)।” [সুরা নাযিআত: আয়াত ২০]
وَأَدْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ آيَاتٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ (سورة النمل)
“(হে মুসা,) এবং তোমার হাত তোমার বগলে (তোমার জামার বুকের অংশের উন্মুক্ত স্থানে) রাখো, তা বের হয়ে আসবে শুভ্র নির্মল অবস্থায়। তা ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। তারা তো সত্যত্যাগী (ও নাফরমান) সম্প্রদায়।" [সুরা নামল: আয়াত ১২]
অবশিষ্ট সাতটি হলো শাস্তিমূলক নিদর্শন যা ফেরআউন, তার দায় এবং মিসরবাসীর জীবন দুবিষহ করে তুলেছিলো। যেমন : মান মাজিদে উল্লেখ করা হয়েছে—
وَلَقَدْ أَخَذْنَا آلَ فِرْعَوْنَ بِالسِّنِينَ وَنَقْصٍ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَذَكَّرُونَ )) جَاءَتْهُمُ الْحَسَنَةُ قَالُوا لَنَا هَذه وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَطَّيَّرُوا بِمُوسَى وَمَنْ مَعَهُ أَلَا طَائِرُهُمْ عِنْدَ الله وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ () وَقَالُوا مَهْمَا تَأْتِنَا بِهِ مِن لِتَسْحَرَنَا بِهَا فَمَا نَحْنُ لَكَ بِمُؤْمِنِينَ )) فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالْجَرَادَ وَا وَالصَّفَادِعَ وَالدَّمَ آيَاتِ مُفَصَّلَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ ) (الأعراف)
। ফেরআউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ক্ষতির দ্বারা ভ্রান্ত করেছি, যাতে তারা অনুধাবন করে। যখন তাদের কোনো কল্যাণ ' ; তারা বলতো, "এটা আমাদের প্রাপ্য।" আর যখন কোনো গ্যাণ হতো তখন তারা মুসা ও তার সঙ্গীদেরকে অলক্ষুণে গণ্য করতো, তাদের অকল্যাণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন; কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। তারা বললো, "আমাদেরকে জাদু করার জন্য তুমি যে-না নিদর্শন আমাদের কাছে পেশ করো না কেনো আমরা তোমাকে স্ত করবো না।" এরপর আমি তাদেরকে প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ও রক্ত দ্বারা ক্লিষ্ট করি। এগুলো স্পষ্ট নির্দশন; কিন্তু তারা দাম্ভিকই গেলো। আর তারা ছিলো এক অপরাধী সম্প্রদায়।' [সুরা আ'রাফ : ১৩০-১৩৩]
স্পষ্ট নিদর্শনগুলোর দ্বিতীয় অংশের সম্পর্ক হযরত মুসা আ. এবং ইসরাইলের মধ্যকার ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত। তার মধ্যে কোনো কোনোটি মুজেযা বনি ইসরাইলকে ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং আ.-এর নবুওতের সত্যতাকে সুদৃঢ় করার জন্য, যেমন: মান্না ও সালওয়া নাযিল হওয়া, মেঘ দ্বারা ছায়া প্রদান, লাঠির আঘাতে পাথর : বারোটি ঝরনা প্রবাহিত হওয়া। আর কোনো কোনোটি বনি ইসরাইলের অবাধ্যাচরণের কারণে তাদের ভীতি প্রদর্শনের জন্য, যেমন : পাহাড়ের অংশবিশেষকে তার স্থান থেকে উঠিয়ে এনে বনি ইসরাইলের মাথার ওপর ধরে রাখা।
ান মাজিদে বর্ণিত আছে—
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ ))
'আমি মেঘ দ্বারা তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করলাম এবং তোমাদের কাছে মান্না ও সালওয়া (হালুয়া ও বটেরের ভাজা গোশত) প্রেরণ করলাম। বলেছিলাম, "তোমাদেরকে ভালো যা দান করেছি তা থেকে আহার করো।" তারা আমার প্রতি কোনো জুলুম করে নি; বরং তারা তাদের প্রতিই জুলুম করেছে। [সুরা বাকারা: আয়াত ৫৭]
وَإِذِ اسْتَسْقَى مُوسَى لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَالْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ كُلُوا وَاشْرَبُوا مِنْ رِزْقِ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
'স্মরণ করো, যখন মুসা তার সম্প্রদায়ের জন্য পানি প্রার্থনা করলো, আমি বললাম, "তুমি লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করো। ফলে তা থেকে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পান-স্থান চিনে নিলো। বললাম, "আল্লাহ-প্রদত্ত জীবিকা থেকে তোমরা পানাহার করো এবং দুষ্কৃতিকারীরূপে পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে বেড়িও না।"' (সুরা বাকারা : আয়াত ৬০]
আর উভয় প্রকারের নিদর্শনগুলোর জন্য পার্থক্যনিরূপণকারী সীমারেখারূপে সেই নিদর্শনটি রয়েছে যা 'সমুদ্র-বিদারণ' অর্থাৎ লোহিত সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করে শুকনো পথ বের করে আনা নামে আখ্যায়িত। বস্তুত, তা ছিলো অত্যাচার ও উৎপীড়নের অবসান এবং উৎপীড়িত ও নির্যাতিত জীবনের সাহায্য ও রক্ষার জন্য একটি মীমাংসাকারী নিদর্শন। অথবা বলা যায়, লোহিত সাগর অতিক্রম করার পূর্ববর্তী ঘটনাবলির পরিণতি এবং পরবর্তী ঘটনাবলির উজ্জ্বল শুরুর জন্য তা ছিলো স্পষ্ট সীমা নিরূপণকারীর মর্যাদার অধিকারী। সুরা আ'রাফ, সুরা বনি ইসরাইল, সুরা তোয়া-হা, সুরা শুআরা, সুরা কাসাস, সুরা যুখরুফ, সুরা দুখান ও সুরা আয-যারিয়াতে এই বিষয়টিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এই যাবতীয় নিদর্শন ও মুজেযা এমন একটি মহান ও উচ্চ মর্যাদাশীল নিদর্শনের পূর্বাভাস ও সূচনা ছিলো, যা এই পুরো ইতিহাসের আসল উদ্দেশ্য ও ভিত্তিমূল। তা হলো তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার নিদর্শন। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ চয় আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম; তাতে ছিলো পথনির্দেশ ও বা।' [সুরা মায়িদা: আয়াত ৪৪]
কথা, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর উল্লিখিত হাদিসটি বিষয়ের জন্য একটি মীমাংসাকারী বাণী। এ-কারণেই হাফেয মুদ্দিন বিন কাসির এ-প্রসঙ্গে বলেছেন—
وهذا القول ظاهر جلي حسن قوي.
বক্তব্যটি সুষ্পষ্ট, পরিষ্কার, উত্তম এবং শক্তিশালী।⁸⁰ হোক। ফেরআউনের অবিরাম অবাধ্যাচরণ, অত্যাচার ও উৎপীড়ন, চ্যর সঙ্গে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং নাফরমানির কারণে আল্লাহ তাআলার থেকে মিসরবাসীর ওপর বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাত্মক শাস্তি আসছিলো : বিরতি দিয়ে দিয়ে ওইসব নিদর্শন ও মুজেযা প্রকাশ পাচ্ছিলো।
টি শাস্তি এলে সবাই হা-হুতাশ শুরু করতো এবং হযরত মুসা আ.-বলতো, যদি তুমি এবার তোমার খোদার কাছে প্রার্থনা করে এই বিকে দূর করে দাও, তবে আমরা সবাই ঈমান আনবো। এরপর । শাস্তি দূরীভূত হতো, তখন পুনরায় তারা আবাধ্যাচরণ ও আত্যাচার করে দিতো। অবশেষে দ্বিতীয়বার আযাব এসে পড়তো। তখন ার সেই পূর্বের অবস্থাই ঘটতো।
ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ একটু আগে সুরা আ'রাফের আয়াতগুলোতে হয়েছে।
আয়াতগুলোতে বর্ণিত নিদর্শনসমূহের মধ্যে 'উকুন' ও 'ব্যাঙ' র্কে জীবনচরিতকারগণ এই দুটি বস্তুর অবস্থা এমন ছিলো যে, আউন ও তার সম্প্রদায়ের পানাহারের বস্তুসমূহ এবং ব্যবহারের দ্রব্যগুলোর মধ্যে এমন কোনোটা ছিলো না যাতে উকুন ও ব্যাঙের অস্তিত্ব দেখা যেতো না। এমনকি ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো এবং তারা ভগ্নহৃদয় হয়ে গেলো। আর রক্ত সম্পর্কে লিখেছেন যে, নীলনদের পানি লোহিত বর্ণ ধারণ করেছিলো। পানির স্বাদ পানিকে পান করার অযোগ্য করে তুলেছিলো। পানির মাছগুলো মরে গিয়েছিলো। তাওরাতের বর্ণনা থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়। এ-বিষয়ে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করছে—
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ فَاسْأَلُ بَنِي إِسْرَائِيلَ إِذْ جَاءَهُمْ فَقَالَ لَهُ فَرْعَوْنُ إِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا مُوسَى مَسْحُورًا () قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُورًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'তুমি বনি ইসরাইলকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমি মুসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম; যখন সে তাদের কাছে এসেছিলো, ফেরআউন তাকে বলেছিলো, “হে মুসা, আমি মনে করি তুমি তো জাদুগ্রস্ত।" মুসা বলেছিলো, "তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, এইসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন—প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। হে ফেরআউন, আমি তো দেখছি (এসব নিদর্শন অস্বীকার করার কারণে) তোমার ধ্বংস আসন্ন।"' (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০১-১০২)
وَلَقَدْ أَرَيْنَاهُ آيَاتِنَا كُلُّهَا فَكَذَّبَ وَأَبَى (طه)
'আমি তো তাকে (ফেরআউনকে) আমার সমস্ত নিদর্শন দেখিয়েছিলাম; কিন্তু সে মিথ্যা আরোপ করেছে ও অমান্য করেছে।' (সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৫৬]
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ آيَاتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ () وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ (سورة النمل)
'এরপর যখন তাদের কাছে আমার স্পষ্ট নিদর্শন এলো, তারা বললো, "এ তো সুস্পষ্ট জাদু।" তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করলো, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিলো। দেখো, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিলো।' [সুরা নামল: আয়াত ১৩-১৪]
فَلَمَّا جَاءَهُمْ مُوسَى بِآيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوا مَا هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُفْتَرَى وَمَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ () وَقَالَ مُوسَى رَبِّي أَعْلَمُ بِمَنْ جَاءَ بِالْهُدَى مِنْ عِنْدِهِ وَمَنْ تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ (سورة القصص)
'মুসা যখন তাদের কাছে আমার স্পষ্ট নিদর্শনগুলো নিয়ে এলো, তারা বললো, "এ তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র! আমাদের পূর্বপুরুষদের কালে কখনো এমন কথা শুনি নি।" মুসা বললো, "আমাদের প্রতিপালক সম্যক অবগত, কে তার তাঁর কাছ থেকে পথনির্দেশ এনেছে এবং আখেরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। জালিমরা কখনো সফলকাম হবে না।"' [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৬-৩৭]
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ فَقَالَ إِنِّي رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ () فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِآيَاتِنَا إِذَا هُمْ مِنْهَا يَضْحَكُونَ () وَمَا نُرِيهِمْ مِنْ آيَةٍ إِلَّا هِيَ أَكْبَرُ مِنْ أُخْتِهَا وَأَخَذْنَاهُمْ بِالْعَذَابِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ () وَقَالُوا يَا أَيُّهَ السَّاحِرُ ادْعُ لَنَا رَبُّكَ بِمَا عَهِدَ عِنْدَكَ إِنَّنَا لَمُهْتَدُونَ () فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُمُ الْعَذَابَ إِذَا هُمْ يَنْكُثُونَ (سورة الزخرف)
'আমি মুসাকে আমার নিদর্শনসহ ফেরআউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিলো, "আমি তো জগৎসমূহের প্রতিপালকের প্রেরিত (রাসুল)।" সে তাদের কাছে আমার নিদর্শনসহ আসামাত্র তারা তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে লাগলো। আমি তাদেরকে এমন কোনো নিদর্শন দেখাই নি, যা তার অনুরূপ নিদর্শন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নয়। আমি তাদেরকে (পার্থিব) শাস্তি দিলাম যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। তারা বলেছিলো, "হে জাদুকর, তোমার প্রতিপালকের কাছে তুমি আমাদের জন্য (নবুওতের পদের ভিত্তিতে) তা প্রার্থনা করো যা তিনি তোমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন, (যেনো এই বিপদ দূর হয়ে যায়) তাহলে অবশ্যই আমরা সৎপথ অবলম্বন করবো।" এরপর যখন আমি তাদের থেকে শাস্তি বিদূরিত করলাম, তখনই তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বসলো।' [সুরা যুখরুফ: আয়াত ৪৬-৫০]
وَلَقَدْ جَاءَ آلَ فِرْعَوْنَ النُّذُرُ () كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا كُلَّهَا فَأَخَذْنَاهُمْ أَخَذَ عَزِيزٍ مُقْتَدِرٍ 'ফেরআউনের সম্প্রদায়ের কাছেও এসেছিলো সতর্কবাণী; কিন্তু তারা আমার সব নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করলো, এরপর পরক্রমশালী ও শক্তিমানরূপে আমি তাদেরকে সুকঠিন শাস্তি দিলাম'। [সূরা কামার: আয়াত ৪১-৪২]
فَأَرَاهُ الْآيَةَ الْكُبْرَى () فَكَذَّبَ وَعَصَى 'মুসা তাকে (ফেরআউনকে) বড় নিদর্শন দেখালো। তখন সে (মুসাকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো এবং অবাধ্যাচরণ করলো।' [সূরা নাযিআত: আয়াত ২০-২১]

টিকাঃ
⁷³ ব্যাঙ ও উকুনের শাস্তির অবস্থা প্রসঙ্গে মুফাস্সিরগণ বলেন, সব ধরনের পাত্র, পানাহার, বিশ্রাম ও ঘুমানোর এমন কোনো বস্তু বা এমন কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিলো না যেখানে উকুন ও ব্যাঙ কিলবিল করতো না। উকুন ও ব্যাঙ সবকিছু নষ্ট ও বরবাদ করে দিয়েছিলো।
⁷⁴ রক্তের শাস্তির অবস্থা প্রসঙ্গে মুফাস্সিরগণ বলেন, লোহিত সাগর ও দেশের সব কূপের পানি রক্তমিশ্রিত হয়ে পড়েছিলো। ফলে কোনোভাবেই পানি করা যেতো না।
⁷⁵ মান্ন একপ্রকার সুস্বাদু খাদ্য, শিশির বিন্দুর মতো গাছের পাতায় ও ঘাসের ওপর জমে থাকতো।
⁷⁶ সালওয়া একপ্রকার পাখির গোশত। আল্লাহ তাআলা উভয় প্রকার খাদ্য বনি ইসরাইলের জন্য তীহ প্রান্তরে প্রেরণ করেছিলেন।
⁷⁷ মূল হাদিস:
عَنْ صَفْوَانَ بْنِ عَسَّالِ { أَنْ يَهُودِيًا قَالَ لصاحبه تَعَالَ حتى نسألَ هَذَا النَّبِيُّ فَقَالَ الْآخَرُ : لَا تَقُلْ هَذَا النَّبِيَّ فَإِنَّهُ إِنْ سَمِعَهَا صَارَتْ لَهُ أَرْبَعَةُ أَعْيُنِ فَأَتَاهُ فَسَأَلَهُ عَنْ هذه الآية { وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيات بينات } فَقَالَ لَا تُشْرِكُوا بِالله شَيْئًا وَلَا تَقْتُلُوا النفس التي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَزْنُوا وَلَا تَسْحَرُوا وَلَا تَأْكُلُوا الرِّبَا وَلَا تَمْشُوا بريء إلى ذِي سُلْطَانِ لِيَقْتُلَهُ وَلَا تَقْذِفُوا الْمُحْصَنَةَ أَوْ تَفِرُّوا مِنْ الرَّحْفَ وَعَلَيْكُمْ خاصةً الْيَهُودَ أَنْ لَا تَعْدُوا فِي السَّبْت
[দেখুন: সুনানে তিরমিযি: তাফসির অধ্যায়, হাদিস ৩১৪৪; দালাইলুন নবুওয়াহ, ইমাম আবু বকর আল-বায়হাকি: হাদিস ২৫২৭: মুশকিলুল আসার, ইমাম আবু জাফর আত- তাহাবি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫। উদ্ধৃত ভাষ্য মুশলিকুল আসার থেকে গৃহীত।।
⁷⁸ তাওরাতেও এই নিদর্শনগুলোর উল্লেখ রয়েছে: তিনি সেই ফলকগুলোর ওপর প্রতিশ্রুতির কথামালা অর্থাৎ বর্ণিত আহকামগুলো লিখেছিলেন। - আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩৪, আয়াত ২৮।
⁷⁹ সূরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০২।
⁸⁰ তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১১; সুরা বনি ইসরাইলের আয়াত ১০১-এর তাফসির।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বনি ইসরাইলের মিসর ত্যাগ এবং ফেরআউনের পশ্চাদ্ধাবন

📄 বনি ইসরাইলের মিসর ত্যাগ এবং ফেরআউনের পশ্চাদ্ধাবন


বিষয়টি যখন এ-পর্যন্ত গড়ালো তখন আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে নির্দেশ দিলেন, এখন সময় এসে গেছে, বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে বাপ-দাদার দেশে নিয়ে যাও।
মিসর থেকে ফিলিস্তিন বা কিনআন ভূমির দিকে যাওয়ার দুটি রাস্তা ছিলো। একটি পথ ছিলো সরাসরি স্থলভাগের ওপর দিয়ে, এটি ছিলো নিকটবর্তী পথ। আর দ্বিতীয়টি ছিলো লোহিত সাগরের পথ। অর্থাৎ, লোহিত সাগর অতিক্রম করে 'সুর' এবং 'তীহ' বা 'সাইনা' প্রান্তরের পথ এবং এটি দূরবর্তী পথ। কিন্তু আল্লাহ তাআলার হেকমতের চাহিদা হলো এই যে, স্থলভাগের সরাসরি নিকটবর্তী পথটি ছেড়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করে দূরবর্তী পথ দিয়ে যাওয়া হোক।
বর্ণিত ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, এই সঠিক পথটিকে আল্লাহ তাআলা এইজন্য প্রাধান্য দিয়েছে যে, স্থলভাগের পথটিকে অতিক্রম করার সময় ফেরআউন এবং তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে পড়তো। কেননা, ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় বনি ইসরাইলিদেরকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলো। যদি সমুদ্রের মুজেযাটি না ঘটতো, তবে ফেরআউন বনি ইসরাইলিদেরকে মিসরে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হতো। আর কয়েক শতাব্দীর দাসত্ব বনি ইসরাইলিদেরকে কাপুরুষ ও দুর্বলচিত্ত বানিয়ে দিয়েছিলো। তারা ভয় ও আতঙ্কের কারণে কোনোক্রমে ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতো না। তাওরাতের বর্ণনা থেকে এই ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়: "আর ফেরআউন যখন তাদেরকে মিসর থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করলো, তখন আল্লাহ তাদেরকে ফিলিস্তিনের পথে নিলেন না, যদিও এ-পথই ছিলো নিকটবর্তী। কেননা, আল্লাহ তাআলার এমন ইচ্ছা ছিলো না যে, তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখে পস্তাতে থাকে এবং ফেরআউনের সঙ্গে মিসরে ফিরে যায়। বরং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে লোহিত সাগর ও সাইনা প্রান্তরের ঘোরা পথ দিয়ে নিয়ে গেলেন।"⁸¹
তা ছাড়া ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়কে মহান মুজেযার মাধ্যমে অত্যাচারী ও প্রবল প্রতাপশালী শক্তির কবল থেকে নির্যাতিত ও নিপীড়িত সম্প্রদায়কে মুক্তি প্রদানের উদ্দেশে অসাধারণ ঘটনা প্রকাশ করাও ছিলো উদ্দেশ্য। এ-কারণেই এই পথটিকে যথাযথ মনে করা হয়েছে।
মোটকথা, হযরত মুসা ও হারুন আ. বনি ইসরাইলকে নিয়ে রাতের বেলাতেই লোহিত সাগরের পথ ধরলেন। রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তারা মিসরীয় রমণীদের অলঙ্কার ও মূল্যবান কাপড়সমূহও—যা এক উৎসব উপলক্ষ্যে বনি ইসরাইলিরা ফেরআউনের সম্প্রদায় থেকে ধার নিয়েছিলো—ফেরত দিতে সক্ষম হয় নি। এই আশঙ্কায় যে, ফেরআউনের সম্প্রদায় হয়তো আসল ব্যাপার টের পেয়ে যাবে।
এদিকে গুপ্তচরেরা ফেরআউনকে জানালো যে, বনি ইসরাইলিরা মিসর থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য শহর থেকে বের হয়ে গেছে। ফেরআউন তখনই এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে রাআ'মসিস থেকে বের হলো এবং বনি ইসরাইলিদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। ভোর হওয়ার একটু আগে সে তাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেলো।
তাওরাতের ভাষ্য অনুসারে শিশু ও গবাদি পশু ব্যতীত বনি ইসরাইলের সদস্যের সংখ্যা ছিলো ছয় লাখ। ভোর হওয়ার সময় যখন তারা পেছনের দিকে ফিরে তাকালো, দেখতে পেলো ফেরআউন সেনাবহিনীসহ তাদের মাথার ওপর উপস্থিত। তারা ঘাবড়ে গিয়ে মুসা আ.-কে বললো:
"মিসরে কি কবরের জায়গা ছিলো না যে তুমি আমাদের মারার জন্য এই প্রান্তরে নিয়ে এসেছো? তুমি আমাদের সঙ্গে এটা কী করলে যে আমাদেরকে মিসর থেকে বের করে আনলে? মিসরে থাকাকালে আমরা কি তোমাকে বলতাম না যে আমাদেরকে এখানেই থাকতে দাও, আমরা মিসরীয়দের সেবাই করতে থাকি? আমাদের জন্য প্রান্তরে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে মিসরীয়দের সেবা করাই উত্তম হতো। "⁸²

টিকাঃ
৮১ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৩, আয়াত ১৭-১৮।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফেরআউনের নিমজ্জন

📄 ফেরআউনের নিমজ্জন


হযরত মুসা আ. তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদান করে বললেন, ভয় করো না। আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি সত্য। তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে মুক্ত করবেন। অবশেষে তোমরাই সফলকাম হবে। এরপর হযরত মুসা আ. আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দোয়া করলেন। আল্লাহর ওহি মুসা আ.-কে নির্দেশ দিলো, তোমা লাঠি দ্বারা সমুদ্রের পানির ওপর আঘাত করো। তাহলে সমুদ্রের মধ্যস্থলে শুকনো পথ বের হবে। যখন মুসা আ. লোহিত সাগরের বুকে তাঁর লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে পানি দুই ভাগ হয়ে দুই পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেলো। মধ্যস্থলে রাস্তা প্রকাশিত হলো। মুসা আ.-এর আদেশে বনি ইসরাইলিরা তাতে নেমে পড়লো। শুকনো পথের মতো তার উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে সাগরের অপর পারে চলে গেলো। ফেরআউন এই দৃশ্য দেখে তার সম্প্রদায়কে বললো, এ তো আমারই মহিমা যে, তোমার বনি ইসরাইলকে গিয়েই ধরে ফেলবে। সুতরাং, তোমরা এগিয়ে চলো। ফেরআউন ও তার সেনাবাহিনী বনি ইসরাইলের পিছে পিছে সে-পথেই নেমে পড়লো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অপার মহিমা দেখুন, বনি ইসরাইলিরা সবাই যখন নিরাপদে অপর পারে গিয়ে পৌছে গেলো, তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সাগরের পানি পুনরায় তার আসল অবস্থায় ফিরে এলো। এদিকে ফেরআউন ও তার গোটা সেনাবাহিনী, যারা তখনো মধ্য-সাগরে ছিলো, পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেলো।
ফেরআউন যখন ডুবতে লাগলো এবং আযাবের ফেরেশতাদেরকে চোখের সামনে দেখতে লাগলো, তখন ডেকে ডেকে বলতে লাগলো, "আমি সেই 'ওয়াহদাহু লা-শারিকা লাহু' একক সত্তার প্রতি ঈমান আনছি, যাঁর ওপর বনি ইসরাইল ঈমান এনেছে আর আমি আল্লাহর একান্ত অনুগত বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত।" কিন্তু এই ঈমান যেহেতু প্রকৃত ঈমান ছিলো না; বরং আগের সময়ের মতো প্রতারণা ও ধোঁকা দিয়ে মুক্তিলাভের জন্য একটি অস্থিরতাসূচক উক্তি ছিলো।
اٰلْـٰٔنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِيْنَۙ (سورة يونس)
‘এখন! (এখন এ-কথা বলছো!) ইতোপূর্বে তো তুমি অমান্য করেছো এবং তুমি অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।’ [সুরা ইউনুস: আয়াত ৯১]
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা বেশ ভালোভাবেই জানেন যে, তুমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং ফেতনা-ফাসাদ বিস্তারকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
প্রকৃতপক্ষে ফেরআউনের এই সম্বোধন ছিলেন তেমনই এক প্রকারের সম্বোধন যা ঈমান আনা ও দৃঢ় বিশ্বাস লাভের উদ্দেশ্যে নয়; বরং এই সম্বোধন তা-ই যা আল্লাহ আযাব স্বচক্ষে দেখার পর বাধ্যতামূলক ও স্বাধীন ইচ্ছাহীন অবস্থায় মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। বস্তুত, সচক্ষে আযাব দেখার পর ফেরআউনের এই ঈমান আনার ঘোষণা হযরত মুসা আ.-এর সেই দোয়ারই ফল ছিলো যা পঠকগণ পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে পাঠ করেছেন-
فَلَا يُؤْمِنُوْا حَتّٰى يَرَوُا الْعَذَابَ الْاَلِيْمَۙ () قَالَ قَدْ اُجِيْبَتْ دَّعْوَتُكُمَا ۖ
‘তারা তো (নিজেদের চোখে) মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ঈমান আনবে না। তিনি বললেন, "তোমাদের দুইজনের দোয়া কবুল করা হলো।"’ [সুরা ইউনুস: আয়াত ৮৮-৮৯]
এখানে ফেরআউনের সম্বোধনের উত্তরে আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে আরো একটি জবাব এই দেয়া হয়েছিলো যে-
فَالْيَوْمَ نُنَجِّيْكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُوْنَ لِمَنْ خَلْفَكَ اٰيَةً ۭ وَاِنَّ كَثِيْرًا مِّنَ النَّاسِ عَنْ اٰيٰتِنَا لَغٰفِلُوْنَ۠
আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করবো, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্পর্কে গাফেল।' (সুরা ইউনুস: আয়াত ৯২)
মতএব, যদি প্রাচীনকালের মিসরীয় শিলালপির বিষয়বস্তু বিশুদ্ধ হয়ে থাকে যে, মিনফাতাহ (দ্বিতীয় রিমসিস)-ই মুসা আ.-এর যুগে ফেরআউন ছিলো, তবে তো নিঃসন্দেহে আজ পর্যন্ত তার লাশ সংরক্ষিত আছে। কিছুক্ষণ সমুদ্রে নিমজ্জিত থাকার ফলে মাছ তার নাক খেয়ে ফেলেছিলো। এবং আজো তা মিসরীয় প্রত্নতত্ত্বের (Egyptology) জাদুঘরে সাধারণ ও বিশিষ্ট সর্বস্তরের দর্শকের জন্য বিনোদনের বস্তু হয়ে আছে।
আর যদি মেনে নেয়া হয় যে, এই লাশটি সেই ফেরআউনের নয়, তবুও আয়াতটি ভাবার্থ নিজের স্থানে সঠিক রয়েছে। কারণ, তাওরাতে স্পষ্ট বর্ণিত আছে যে, বনি ইসরাইলিরা স্বচক্ষে দেখেছিলো যে, সাগরে নিমজ্জিত মিসরীয়দের লাশ সাগরের তীরে পড়েছিলো: "আর ইসরাইলিরা মিসরীয়দেরকে সমুদ্রের তীরে মরে পড়ে থাকতে দেখেছিল।"⁸³

টিকাঃ
⁸² তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১১-১২।
⁸³ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ৩১।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সমুদ্র-বিদারণ

📄 সমুদ্র-বিদারণ


কুরআন মাজিদ মিসর থেকে বনি ইসরাইলের যাত্রা, সমুদ্রে ফেরআউনের নিমজ্জিত হওয়া এবং বনি ইসরাইলের মুক্তিলাভের ঘটনাগুলোকে খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করেছে; বরং ঘটনাগুলোর একান্ত জরুরি অংশগুলোই আলোচনা করেছে। অবশ্য ঘটনাবলি-সম্পর্কিত উপদেশ, জ্ঞানলাভ ও নসিহতের বিষয়গুলোকে একটু বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। যেমন: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَقَدْ أَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي فَاضْرِبْ لَهُمْ طَرِيقًا فِي الْبَحْرِ يَبَسًا لَا تَخَافُ دَرَكًا وَلَا تَخْشَى ( فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ بِجُنُودِهِ فَغَشِيَهُمْ مِنَ الْيَمِّ مَا غَشِيَهُمْ () وَأَضَلُّ فَرْعَوْنُ قَوْمَهُ وَمَا هَدَى (سورة طه)
'আমি অবশ্যই মুসার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছিলাম এই মর্মে যে, "আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলা (মিসর থেকে) বের হয়ে যাও এবং তাদের জন্য সাগরের মধ্য দিয়ে একটি শুকনো পথ তৈরি করো। পেছন থেকে এসে তোমাকে ধরে ফেলা হবে এই আশঙ্কা করো না এবং ভয়ও করো না।" এরপর (যখন মুসা আ. তাঁর বনি ইসরাইলকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন তখন) ফেরআউন তার সৈন্যবাহিনীসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো, তারপর সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করলো। (অর্থাৎ তাদের ওপর যা ঘটার ছিলো ঘটে গেলো।) আর ফেরআউন তার সম্প্রদায়কে (নাজাত ও মুক্তি থেকে) পথভ্রষ্ট করেছিলো এবং সৎপথ দেখায় নি।' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৭৭-৭৯]
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ () فَأَرْسَلَ فِرْعَوْنُ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ )) إِنْ هَؤُلَاءِ لَشِرْذِمَةٌ قَلِيلُونَ )) وَإِنَّهُمْ لَنَا لَغَائِظُونَ )) وَإِنَّا لَجَمِيعٌ حَاذِرُونَ () فَأَخْرَجْنَاهُمْ مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ () وَكُنُورٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ () كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا بَنِي إِسْرَائِيلَ (( فَأَتْبَعُوهُمْ مُشْرِقِينَ () فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ () قَالَ كَلَّا إِنْ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ () فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَالفَلَقَ فَكَانَ كُلِّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ () وَأَزْلَفْنَا ثُمَّ الْآخَرِينَ () وَأَنْجَيْنَا مُوسَى وَمَنْ مَعَهُ أَجْمَعِينَ () ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ () إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ () وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (سورة الشعراء)
'আমি মুসার প্রতি ওহি প্রেরণ করেছিলাম এই মর্মে, "আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলা বের হও, তোমাদের তো পশ্চাদ্ধাবন করা হবে। (ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করবে।) তারপর ফেরআউন শহরে শহরে লোক সংগ্রহকারী পাঠালো (যেনো কিবতিদেরকে বনি ইসরাইলের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য ডেকে একত্র করা হয় এবং তাদেরকে উত্তেজিত করা হলো) এই বলে, 'এরা (বনি ইসরাইল) তো ক্ষুদ্র একটি দল, এরা তো আমাদের ক্রোধ উদ্রেক করেছে; (আমাদের অন্তর্দাহ সৃষ্টি করেছে) এবং আমরা তো সবাই সবসময় শঙ্কিত।” (অথবা আমরা সবসময় সতর্ক আছি। মোটকথা, কিবতিরা দলে দলে এসে ফেরআউনের সঙ্গে যোগদান করলো এবং সবাই মিলে রাতের বেলাতেই পলায়নপর বনি ইসরাইলিদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। আল্লাহ বলেন,) পরিণামে আমি ফেরআউনের গোষ্ঠীকে বহিষ্কৃত করলাম তাদের উদ্যানরাজি ও প্রস্রবণ থেকে এবং ধন-ভাণ্ডার ও সুরম্য সৌধমালা থেকে। এমনই ঘটেছিলো (এভাবে কিবতিরা ঘর-বাড়ি, বাগ-বাগিচা, ফসলি ভূমি, ধন-ভাণ্ডার ইত্যাদি পেছনে ফেলে বনি ইসরাইলের পশ্চাদ্ধাবন করলো। তাদের ভাগ্যে আর ফিরে আসা হলো না। যেনো এটা আল্লাহ তাআলারই সিদ্ধান্ত ছিলো।) এবং বনি ইসরাইলকে করেছিলাম এই সমুদয়ের অধিকারী। তারা সূর্যোদয়ের সময় তাদের পেছনে এসে পড়লো। তারপর যখন দুই দল পরস্পরকে দেখলো, তখন মুসার সঙ্গীরা বললো, "আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।" মুসা বললো, "কখনোই নয়! আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক; সত্বর তিনি আমাকে পথনির্দেশ করবেন।” তখন আমি মুসার প্রতি ওহি প্রেরণ করলাম, "তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো। ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ পাহাড়ের মতো হয়ে গেলো; আমি ওখানে উপনীত করলাম অপর দলটিকে, এবং আমি উদ্ধার করলাম মুসা ও তার সঙ্গী সবাইকে, তারপর নিমজ্জিত করলাম অপর দলটিকে। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।' [সুরা শুআরা আয়াত ৫২-৬৮।
فَالْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَأَغْرَقْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ () وَأَوْرَثْنَا الْقَوْمَ الَّذِينَ كَانُوا يُسْتَضْعَفُونَ مَشَارِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ الْحُسْنَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ بِمَا صَبَرُوا وَدَمَّرْنَا مَا كَانَ يَصْنَعُ فِرْعَوْنُ وَقَوْمُهُ وَمَا كَانُوا يَعْرِشُونَ (سورة الأعراف)
'সুতরাং আমি তাদেরকে (তাদের মন্দ কাজের কারণে) শাস্তি দিয়েছি এবং তাদেরকে (সেই অপরাধের প্রতিফলস্বরূপ) অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছি। কারণ তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করতো। যে- সম্প্রদায়কে দুর্বল গণ্য করা হতো তাদেরকে আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি; এবং বনি ইসরাইল সম্পর্কে (হে নবী) তোমার প্রতিপালকের শুভ বাণী সত্যে পরিণত হলো, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলো, আর ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যেসব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিলো (শক্তি ও মর্যাদার জন্য যা-কিছু তারা করেছিলো) তা ধ্বংস করেছি।' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৩৬-১৩৭]
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ )) الآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ )) فَالْيَوْمَ تُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنْ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ (سورة يونس)
'আমি বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার করালাম এবং ফেরআউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্যসহ সীমালঙ্ঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। অবশেষে যখন সে নিমজ্জমান হলো তখন বললো, "আমি বিশ্বাস করলাম বনি ইসরাইল যাতে বিশ্বাস করে। নিশ্চয় তিনি ব্যতীত অন্যকোনো ইলাহ নেই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।” (আল্লাহ তাআলা বললেন,) "এখন! (এখন এ-কথা বলছো!) ইতোপূর্বে তো তুমি অমান্য করেছো এবং তুমি অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করবো, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য (আল্লাহ তাআলার কুদরতের একটি) নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্পর্কে গাফেল।' [সুরা ইউনুস: আয়াত ৯০-৯২]
وَاسْتَكْبَرَ هُوَ وَجُنُودُهُ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ () فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ (سورة القصص)
'ফেরআউন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহঙ্কার করেছিলো এবং তারা মনে করেছিলো যে, তারা আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে না। সুতরাং আমি তাকে ও তার বাহিনীকে ধরলাম এবং তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম। দেখো, জালিমদের পরিণام কেমন (ভীষণ ও ভয়ঙ্কর) হয়ে থাকে!' [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৯-৪০]
وَلَقَدْ فَتَنَّا قَبْلَهُمْ قَوْمَ فِرْعَوْنَ وَجَاءَهُمْ رَسُولٌ كَرِيمٌ () أَنْ أَدُّوا إِلَيَّ عِبَادَ اللَّهِ إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ () وَأَنْ لَا تَعْلُوا عَلَى اللَّهِ إِنِّي آتِيكُمْ بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ () وَإِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ أَنْ تَرْجُمُونِ () وَإِنْ لَمْ تُؤْمِنُوا لِي فَاعْتَزِلُونِ () فَدَعَا رَبَّهُ أَنْ هَؤُلَاءِ قَوْمٌ مُجْرِمُونَ )) فَأَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلًا إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ () وَاتْرُكِ الْبَحْرَ رَهْوًا إِنَّهُمْ جُنْدٌ مُغْرَقُونَ (( كَمْ تَرَكُوا مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ () وَزُرُوعٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ () وَنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَاكِهِينَ )) كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا قَوْمًا آخَرِينَ () فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ () وَلَقَدْ نَجَّيْنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنَ الْعَذَابِ الْمُهِينِ () مِنْ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ كَانَ عَالِيًا مِنَ الْمُسْرِفِينَ (سورة الدخان)
'এদের পূর্বে আমি ফেরআউনের সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করেছিলাম এবং তাদের কাছেও এসেছিলো এক সম্মানিত রাসুল। সে বলেছিলো, "আল্লাহর বান্দাদেরকে আমার কাছে প্রত্যর্পণ করো। আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসুল। এবং তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করো না, আমি তোমাদের কাছে উপস্থিত করছি স্পষ্ট প্রমাণ। তোমরা যাতে আমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে না পারো, তার জন্য আমি আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালকের শরণ নিচ্ছি। যদি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস স্থাপন না করো, তবে তোমার আমার থেকে দূরে থাকো।" এরপর মুসা তার প্রতিপালকের কাছে নিবেদন করলো, "এরা তো এক অপরাধী সম্প্রদায়।” আমি বলেছিলাম, "তুমি আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলা (মিসর থেকে) বের হয়ে পড়ো, তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে। (ফেরআউন ও তার বাহিনী তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করবে।) সমুদ্রকে স্থির থাকতে দাও,⁸⁴ তারা এমন এক বাহিনী যারা নিমজ্জিত হবে।" তারা (মিসর থেকে বের হওয়ার সময়) পেছনে রেখে গিয়েছিলো কত উদ্যান ও প্রস্রবণ; কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য প্রাসাদ, কত বিলাস উপকরণ, সেগুলোতে তারা আনন্দ পেত। এমনটাই ঘটেছিলো এবং আমি এই সমুদয়ের উত্তরাধিকারী করেছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে। আকাশ এবং পৃথিবী কেউ-ই তাদের জন্য চোখের পানি ফেলে নি এবং তাদেরকে অবকাশও দেয় হয় নি। আমি তো উদ্ধার করেছিলাম বনি ইসরাইলকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি থেকে ফেরআউনের; সে তো ছিলো পরাক্রান্ত সীমালঙ্ঘনকারীদের মধ্যে।' [সুরা দুখান: আয়াত ১৭-৩১]
فَأَرَادَ أَنْ يَسْتَفِزَّهُمْ مِنَ الْأَرْضِ فَأَغْرَقْنَاهُ وَمَنْ مَعَهُ جَمِيعًا () وَقُلْنَا مِنْ بَعْدِهِ لَبَنِي إِسْرَائِيلَ اسْكُنُوا الْأَرْضَ فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الْآخِرَةِ جِئْنَا بِكُمْ لَفِيفًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'এরপর ফেরআউন তাদেরকে দেশ থেকে উচ্ছেদ করার সংকল্প করলো; তখন আমি ফেরআউন ও তার সঙ্গীগণ সবাইকে নিমজ্জিত করলাম। এরপর আমি বনি ইসরাইলকে বললাম, "তোমরা ভূপৃষ্ঠে বসবাস করো এবং যখন কেয়ামতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে তখন তোমাদের সবাইকে আমি একত্র করে উপস্থিত করবো।"' [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০৩-১০৪]
وَفِي مُوسَى إِذْ أَرْسَلْنَاهُ إِلَى فِرْعَوْنَ بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ () فَتَوَلَّى بِرُكْنِهِ وَقَالَ سَاحِرٌ أَوْ mَجْنُونٌ () فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ وَهُوَ مُلِيمٌ (سورة الذاريات)
'এবং আমি নিদর্শন রেখেছি মুসার বৃত্তান্তে, যখন আমি তাকে স্পষ্ট প্রমাণসহ ফেরআউনের কাছে প্রেরণ করেছিলাম, তখন সে ক্ষমতার দম্ভে মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং বললো, "এই ব্যক্তি হয় এক জাদুকর, না হয় এক উন্মাদ।" সুতরাং আমি তাকে এবং তার দলবলকে শাস্তি দিলাম এবং তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম, সে তো ছিলো তিরস্কারযোগ্য।' [সুরা যারিয়াত: আয়াত ৩৮-৪০]
অবশ্য তাওরাত উপরে বর্ণিত ঘটনাবলি ছাড়াও আরো অনেক কিছু বিস্ত ারিত বিবরণসহ উল্লেখ করেছে। বনি ইসরাইলের যাত্রা করা এবং তাদের বিশ্রাম গ্রহণের বহু স্থানের নামও উল্লেখ করেছে। দুনিয়াবাসী তার কিছুই জানে না।
তাওরাতের বর্ণনার সারমর্ম এই: "ফেরআউন এবং তার সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহ তাআলার প্রেরিত শান্তি র ধারা শুরু হয়ে গেলো এবং হযরত মুসা আ.-এর কথা অনুসারে একের পর এক নিদর্শন প্রকাশ পেতে লাগলো। তখন ফেরআউন হযরত মুসা আ.-কে ডেকে বললো, বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে নিয়ে যাও। কিন্তু তাদের চতুষ্পদ ও গৃহপালিত পশুগুলোকে এখানেই ছেড়ে যেতে হবে। হযরত মুসা আ. এই শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, এই পশুগুলোকে রেখে দেয়ার অধিকার তোমার নেই। ফেরআউন তখন ক্রোধান্বিত হয়ে বললো, তবে বনি ইসরাইলিরাও মিসর থেকে বের হতে পারবে না। আর এরপর থেকে তুমি কখনো আমার সামনে এসো না। অন্যথায় তুমি আমার হাতে মারা যাবে। হযরত মুসা আ. বললেন, হ্যাঁ, এ তুমি ঠিকই বলেছো। এখন থেকে আমি কখনো আর তোমার সামনে আসবো না। আমার খোদার মীমাংসাও এটাই। আর তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন যে, তোমার এবং তোমার সম্প্রদায়ের ওপর এমন কঠিন বিপদ আসবে যে, তোমার এবং কোনো মিসরবাসীর প্রথম সন্তান জীবিত থাকবে না।
হযরত মুসা আ. ফেরআউনের সঙ্গে এমন কথোপকথনের পর তার দরবার থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি বনি ইসরাইলের উদ্দেশে বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ফেরআউনের হৃদয় কঠিন হয়ে পড়েছে। সে এখন তোমাদেরকে মিসর থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত যেতে দেবে না, যতক্ষণ আরো অধিক নিদর্শন না দেখে ছাড়ে। যার ফলে সমগ্র মিসরবাসীর মধ্যে ক্রন্দন ও বিলাপ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু তোমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। কেননা, মিসর থেকে বের হওয়ার সময় চলে এসেছে। আর আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মাধ্যমে বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের হওয়ার পূর্বে কুরবানি ও ঈদ উৎসব উদ্যাপনের আদেশ করলেন এবং তার শর্ত ও নিয়মও বলে দিলেন। মুসা আ. তাদেরকে এটাও বললেন, তোমরা তোমাদের নারীদেরকে বলো, তারা যেনো মিসরীয় নারীদের কাছে গিয়ে ঈদ উৎসবের জন্য তাদের কাছ থেকে তাদের স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কার এবং মূল্যবান কাপড়-চোপড় ধার চেয়ে আনে। মিসরীয় রমণীরা অবশেষে তাদেরকে অলঙ্কারসমূহ প্রদান করে। এরপর আল্লাহ তাআলার কাজ এমন হলো যে, এক রাতে ফেরআউন থেকে শুরু করে সাধারণ মিসরবাসী সবার প্রথম সন্তান মরে গেলো এবং সব পরিবারে কান্না ও বিলাপের রোল পড়ে গেলো। এই ঘটনা দেখে মিসরবাসীরা ফেরআউনের কাছে দৌড়ে গেলো। তারা ফেরআউনকে বাধ্য করলো যে, এই মুহূর্তে বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে দাও। যাতে এই অমঙ্গলজনক দুর্বিপাক এখন থেকে দূরীভূত হয়ে যায়। এদের কারণেই আমাদের ওপর এসব বিপদ আসছে।
তখন ফেরআউন হযরত মুসা আ.-কে বললো, এই মুহূর্তে তোমরা এই দেশ থেকে বের হয়ে যাও। তোমাদের চতুষ্পদ জন্তু, গৃহপালিত পশু এবং যাবতীয় আসবাবপত্র সঙ্গে করে নিয়ে যাও। বনি ইসরাইলিরা তখন রাআ'মসিস (উৎসবের শহর) ত্যাগ করে বেরিয়ে এলো। তখন তাদের শিশু ও গৃহপালিত পশু ছাড়া ছয় লাখ লোক ছিলো। যখন তার বের হয়ে এলো, তখন মিসরীয়দের অলঙ্কারগুলোও ফেরত দিতে পারলো না এবং মিসরীয়রাও তা দাবি করলো না।
বনি ইসরাইল যখন অরণ্যের পথ ধরার পর ফেরআউন ও সভাসদবর্গ তাদের সিদ্ধান্তের জন্য ভীষণভাবে আফসোস করতে লাগলো। তারা পারস্পরিক বলাবলি করতে লাগলো, আমরা অযথাই এমন ভালো ভালো চাকর-গোলাম ও দাস-দাসী হাতছাড়া করলাম। ফেরআউন তখন নির্দেশ দিলো, এই মুহূতেই সরদারদেরকে, মিসরীয় যুবকদেরকে এবং সেনাবাহিনীকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলো। মোটকথা, ফেরআউন প্রতাপ ও প্রতিপত্তির সঙ্গে বীরবিক্রমে রথে আরোহণ করে বের হয়ে পড়লো এবং বনি ইসরাইলিদের পশ্চাদ্ধাবন করলো।
বনি ইসরাইল 'রাআ'মাসিস' থেকে 'সিকাত', 'সিকাত' থেকে 'আইতাম', 'আইতাম' থেকে মোড় ঘুরে 'আহদাল' এবং লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী 'ফি-হাইখারুত'-এর নিকটবর্তী 'লাআলে-সাফওয়ান'-এর সামনে তাঁবু ফেলেছিলো। বনি ইসরাইলের এই পূর্ণ সফরে আল্লাহ তাআলা তাদের সঙ্গে থাকলেন এবং তিনি নুরের স্তম্ভের আলো দ্বারা রাতের বেলাতেও তাদেরকে পথপ্রদর্শন করতেন এবং দিনের বেলা তাদের সামনে সামনে থাকতেন। মোটকথা, ভোরের আলো প্রকাশ পেতেই ফেরআউন ও তার বাহিনি লোহিত সাগরের তীরে এসে বনি ইসরাইলের নাগাল পেলো।
বনি ইসরাইল পেছনের দিকে তাকিয়েই দেখলো যে, ফেরআউন তার সেনাবাহিনীসহ তাদের কাছে এসে পৌঁছে গেছে। তখন তারা ভগ্নহৃদয় ও ভীত হয়ে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে বিতণ্ডা শুরু করে দিলো। মুসা আ. তাদেরকে অনেক সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তোমাদের শত্রুর দল ধ্বংস হবে এবং তোমরা নিরাপত্তা ও শান্তির সঙ্গে মুক্তি পাবে। এরপর তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে মুনাজাত করতে লাগলেন।
আল্লাহ তাআলা মুসাকে বললেন, তুমি আমার কাছে ফরিয়াদ কেনো করছো? বনি ইসরাইলকে বলো, তারা সামনের দিকে অগ্রসর হোক আর তুমি তোমার লাঠি উঠিয়ে তোমার হাত সমুদ্রের ওপর বাড়াও এবং সমুদ্রকে দুই অংশে ভাগ করে দাও। তখন বনি ইসরাইল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে শুকনো ভূমির ওপর হেঁটে অপর পারে চলে যাবে। এরপর হযরত মুসা আ. নিজে সমুদ্রের ওপর হাত বাড়ালেন। আল্লাহ তাআলার সারা রাতব্যাপী পুবালি বায়ু চালালেন এবং সমুদ্রের পানি দুই দিকে সরিয়ে দিয়ে তাকে শুকনো জমিনে পরিণত করে দিলেন। পানি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো এবং বনি ইসরাইল সমুদ্র-গর্ভ দিয়ে শুকনো জমিনের ওপর হেঁটে পার হয়ে গেলো।
আল্লাহ তাআলার সমুদ্রের মধ্যস্থলে মিসরীয়দেরকে ডুবিয়ে দিলেন। পানি ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের ওপর নিজের স্থানে ফিরে এলো এবং তাদের রথসমূহকে, আরোহীদেরকে এবং ফেরআউনের গোটা সেনাবাহিনীকে-যারা বনি ইসরাইলের পশ্চাদ্ধাবন করেছিলো-সমুদ্রে নিমজ্জিত করে দিলো। তাদের একজনকেও অবশিষ্ট রাখলো না। অথচ বনি ইসরাইলিরা সমুদ্রের মধ্যভাগে শুকনো জমিনের ওপর দিয়ে হেঁটে সমুদ্র পার হয়ে গেলো। পানি তাদের ডানদিকে ও বামদিকে প্রাচীরের মতো দণ্ডায়মান থাকলো। আর আল্লাহ তাআলা মিসরীয়দের ওপর তাঁর যে-মহাশক্তি প্রকাশ করলেন, বনি ইসরাইল তা দেখলো এবং তারা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করলো এবং তাঁর ওপর ও তাঁর বান্দা মুসার ওপর ঈমান আনলো।"⁸⁵
তাওরাতের এসব বিস্তারিত বিবরণে যদিও ভালো-মন্দ ও জানাশোনার বাইরে অনেক কথা রয়েছে, কিন্তু এ-সম্পর্কে কুরআন মাজিদ এবং তাওরাতের মূল উদ্দেশ্য একই। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ফেরআউন ও তার নিষ্ঠুর অত্যাচার ও উৎপীড়ন থেকে মুসা আ. এবং বনি ইসরাইলকে এক বিরাট মুজেযা মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছেন। কুরআন মাজিদ বলে, এই মুজেযাটি এভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো যে, আল্লাহর নির্দেশে মুসা আ. লোহিত সাগরের ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন, ফলে সাগরের পানি মধ্যস্থলে শুকনো করে দিয়ে দুই দিকে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেলো।
فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقِ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ
'তারপর আমি মুসার প্রতি ওহি করলাম, "তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করো।" ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড়ের মতো হয়ে গেলো।' [সুরা শুআরা : আয়াত ৬৩]
وَإِذْ فَرَقْنَا بِكُمُ الْبَحْرَ فَأَنْجَيْنَاكُمْ وَأَغْرَقْنَا آلَ فِرْعَوْنَ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ
'যখন তোমাদের জন্য সাগরকে বিভক্ত করেছিলাম এবং তোমাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম ও ফেরআউনের সম্প্রদায়কে নিমজ্জিত করেছিলাম আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।' [সুরা বাকারা: আয়াত ৫০]
তাওরাত এই বক্তব্যেরও সমর্থন করছে। তাওরাতে উল্লেখ আছে: "তুমি তোমার লাঠি উথোলন করো, তোমার হাতকে সমুদ্রের ওপর বাড়াও এবং তাকে দুই ভাগে বিভক্ত করো। ... আর পানি তাদের ডানে ও বামে দেয়ালের মতো থাকলো।"
অবশ্য তাওরাতে এই কথাটুকু অতিরিক্ত বাড়ানো হয়েছে যে, "সারারাত পুবালি ঝড়ো হাওয়া চালিয়ে এবং সমুদ্রকে পেছনের দিকে সরিয়ে তাকে শুষ্ক জমিনে পরিণত করা হলো।" অতএব, তাওরাতের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এবং বিভিন্ন বছরের বিভিন্ন রকমের অনুবাদের প্রতি লক্ষ করলে কুরআন মাজিদের বর্ণনাকেই নির্ভরযোগ্য ধরা হবে। কেননা, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাই এ-কথায় একমত যে, পবিত্র কুরআন সব ধরনের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে সুরক্ষিত রয়েছে। এই মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ
'কোনো মিথ্যা তাতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না-সামনে থেকেও না, পেছন থেকেও না। তা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।' [সুরা হা-মীম আস-সাজদা: আয়াত ৪২]
তা ছাড়া তাওরাতের উল্লিখিত সংযোজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য সাধনের উত্তম উপায় এটাও হতে পারে যে, হযরত মুসা আ. হাত বাড়িয়ে লাঠি চালানোর ফলে প্রথমে সাগর দুই ভাগে বিভক্ত হলে গেলো। এরপর যখন লাখ লাখ মানুষ তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে শুরু করলো, তখন জমিনের আদ্রতাকে শুষ্ক করার জন্য অনবরত পুবালি ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকলো। জমিন শুকিয়ে গেলে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত এবং মানুষ থেকে পশু পর্যন্ত কারো পথ অতিক্রমে কোনো ধরনের অসুবিধা ও কষ্ট হলো না।
দুর্ভাগ্যবশত মুসলমানের মধ্যে কিছু মানুষ এমনও আছে যারা 'জ্ঞান'-এর নামে ধর্মের প্রতিটি বিষয়কে 'মাদ্দিয়াত' বা বস্তুবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ দেখতে চায় এবং এই কারণে তারা আল্লাহ প্রদত্ত মুজেযাগুলোকে যা নবী ও রাসুলগণের সত্যতার সমর্থনে ও প্রমাণে প্রকাশিত হয়— অস্বীকার করে থাকে। মুজেযা অস্বীকার করার অর্থ তা-ই যা পেছনের পাতাগুলোতে মুজেযার আলোচনা প্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ, তারা আল্লাহ তাআলার কোনো কাজকেই কোনো অবস্থাতেই এই অনুভূতিগ্রাহ্য ও জড়বস্তুর দুনিয়ার কারণ ও উপকরণ থেকে মুক্ত বলে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। কারণ, তাদের এই নাস্তিকতা ও খোদাদ্রোহিতার ভিত্তি প্রকৃতপক্ষে পাশ্চাত্যের নাস্তিকতা ও খোদাদ্রোহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর তাদের মন ও মস্তিষ্ক পাশ্চাত্যেরই প্রভাবে প্রভাবিত ও বশীভূত। এর অনিবার্য ফল বস্তুবাদের ওপর বিশ্বাস ও নির্ভর ব্যতীত আর কিছুই হতে পারে না।
অন্য ক্ষেত্রগুলোর মতো এই ক্ষেত্রেও তারা চেষ্টা করেছে যে, কী প্রকারে ফেরআউনের নিমজ্জনের বিষয়টিও রুহানি মুজেযা থেকে বের হয়ে জড় কারণ ও উপকরণের অধীন চলে আসে। ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের পার্থিব উন্নতির জন্য কর্মশীল ব্যক্তিত্ব মরহুম স্যার সৈয়দ আহমদ খানও আরবি ভাষার বিদ্যা ও ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও উপরিউক্ত বিশ্বাসকে প্রচলিত করার ক্ষেত্রে অগ্রপথিক ছিলেন। খুব সম্ভব তিনি ইউরোপের বর্তমান জীবনব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামের ঐক্য সাধন করতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু বস্তুবাদের এই খোলস ইসলামের দেহাবয়বের সঙ্গে খাপ খায় নি। ফলে তিনি খোলসের সংশোধনের পরিবর্তে ইসলামেরই চিত্র ও দেহাবয়বের সংশোধন শুরু করে দিলেন। অবশ্য তিনি এতে কৃতকার্য হতে পারেন নি।
নিঃসন্দেহে ইসলাম এমন একটি রুহানি ধর্ম যা রুহানিয়্যাত বা আধ্যাত্মিক চেতনার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পার্থিব জীবনেও মানুষের উন্নতি, সফলতা এবং কল্যাণ নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব বহন করে। এ-কারণেই প্রত্যেক যুগেই ইসলামের কোলে নানাবিধ বিদ্যার প্রতিপালন ও উন্নতি ঘটেছে। আর জ্ঞান ও বিজ্ঞান সবসময় ইসলামের অনুগ্রহের ছায়াতলে ক্রমবিকাশ ও উৎকর্ষ লাভ করেছে। কিন্তু বস্তুবাদী বিদ্যাসমূহের সীমা বস্তুবাদ, চাক্ষুষ দর্শনযোগ্য ও অনুভূতিগ্রাহ্য বিষয় থেকে এক বিন্দুও সামনে অগ্রসর হতে পারে নি। আর আজকের বিজ্ঞান এবং অতীতের দর্শন উভয়টিই এ-কথা স্বীকার করে যে, আমাদের সীমা অনুভূতিগ্রাহ্য পদার্থের ওপারে আর নেই। অর্থাৎ অনুভবযোগ্য বিষয় ও জড়পদার্থের দেয়ালের পেছনে কী আছে, তারা সে সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতা তো প্রকাশ করছে; কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে না।
ইসলামের দাবি এই যে, অতীত ও বর্তমান কালে বিদ্যাসমূহ যখন থিওরি ও চিন্তাধারা থেকে অগ্রসর হয়ে অনুভূতিগ্রাহ্যতা ও চাক্ষুষ দর্শনের সীমা পর্যন্ত পৌছেছে, তখন তাদের একটি বিষয়ও এমন পাওয়া যায় নি যা ইসলামের মূলনীতির বিরোধী অথবা ইসলামে তার অস্বীকৃতি পাওয়া যায়। তবে এমতাবস্থায়, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে যে-পর্যন্ত বিদ্যার থিওরি ও চিন্তাধারায় পরিবর্তন ঘটতে থাকবে এবং বিদ্যাগত অনুসন্ধান ও গবেষণা এক স্থান ত্যাগ করে ভিন্ন অবস্থান নির্মাণ করবে, তখন ইসলামকে সেগুলোর সাদৃশ ও অনুরূপ করার চেষ্টা বৃথা। কারণ, চাক্ষুষ দর্শনের সীমায় পৌঁছার পর নিঃসন্দেহে তাদের মীমাংসা কুরআনের মীমাংসার চেয়ে এক ইঞ্চিও অগ্রসর হতে পারবে না।
অবশ্য ইসলাম বা সত্যধর্ম এমন কতগুলো বিষয়কেও স্বীকার করে যা বস্তুবাদী দুনিয়ার ওপারের জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন: আখেরাত, হাশর-নাশর, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, ওহি, নবুওত ও মজেযা। কিন্তু এই স্বীকৃতি এই শর্তের সঙ্গে যে, এগুলোর মধ্যে কোনো বিষয়ই জ্ঞানের বিরোধী অর্থাৎ জ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। তারপরও জ্ঞানের পক্ষে সেগুলোর রহস্য ও মূলতত্ত্বের উপলব্ধি শুধু এই পরিমাণই হতে পারে, ধর্ম নিজের ধ্রুব জ্ঞান (আল্লাহর ওহি)-এর দ্বারা যে-পরিমাণ তা বিবৃত করেছে। আর এই বিষয়গুলোকে উপলব্ধি করার জন্য ওহি ব্যতীত জ্ঞানের কাছে অন্যকোনো উপায় নেই।
যাইহোক। সৈয়দ আহমদ সাহেব তাফসিরে আহমদিতে এই জায়গাটুকুর তাফসির করেছেন এমন সমুদ্রে বনি ইসরাইলের নিমজ্জিত হওয়া এবং বনি ইসরাইলিদের রক্ষা পাওয়া 'মুজেযা' ছিলো না; বরং তা সাধারণ পার্থিব কারণ ও উপকরণের ধারাবাহিকতায় সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাপার। অর্থাৎ, এই অবস্থা ঘটেছিলো যে, যখন বনি ইসরাইল লোহিত সাগর অতিক্রম করেছিলো তখন তার পানি সঙ্কুচিত হয়ে ছিলো এবং পেছনে সরে গিয়ে ভাটার রূপ ধারণ করেছিলো। ফেরআউন যখন এমন সহজভাবে বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার হয়ে চলে যেতে দেখলো, তখন সেও তার সেনাবাহিনীকে সমুদ্রে প্রবেশ করার জন্য নির্দেশ দিলো। কিন্তু ততক্ষণে বনি ইসরাইল পার হয়ে গিয়েছিলো এবং ফেরআউনের সেনাবাহিনী তখনো সমুদ্রের শুকনো স্থান অতিক্রম করছিলো। ঠিক এ-সময় সাগরের জোয়ার আসার সময় হলে গেলো। ফেরআউন ও তার লোকজন ও সেনাবাহিনী এতটুকু অবকাশও পেলো না যে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে অথবা পেছনের দিকে সরে আসবে। ফলে সবার সলিলসমাধি ঘটলো।
সৈয়দ আহমদ সাহেব তাঁর এই ধারণা অনুসারে বনি ইসরাইলের সমুদ্র পার হওয়া সম্পর্কে একটি মানচিত্রও দিয়েছেন। তাতে তিনি এ-বিষয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, বনি ইসরাইল লোহিত সাগরের উত্তর দিকের মুখের দিকে গমন করে সাগর পার হয়েছিলো।
কিন্তু আফসোসের সঙ্গে বলতে হয় যে, কুরআন মাজিদের বর্ণনা চরমভাবে তা অস্বীকার করছে এবং সৈয়দ আহমদ সাহেবের কথাকে কোনোভাবেই খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না।
অবশ্য যে-জায়গা দিয়ে বনি ইসরাইল লোহিত সাগর অতিক্রম করেছিলো, বিশেষভাবে সেই জায়গাটুকু নির্দিষ্ট করা অসম্ভব। কেননা, এ-প্রসঙ্গে তাওরাতই অতীতযুগের ইতিহাসের প্রাচীন ভাণ্ডার। কিন্তু তাওরাতে বর্ণিত স্থানগুলো বর্তমান যুগের মানুষের কাছে কতগুলো অজ্ঞাত নাম ছাড়া কিছু নয়।
অবশ্য কুরআন মাজিদ ও তাওরাতের যৌথ বর্ণনা ও আয়াতগুলো থেকে এটা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে যে, বনি ইসরাইল লোহিত সাগরের কোন্ পাশ ও মুখ দিয়ে অথবা মধ্যস্থলের কোন্ অংশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলো।
এটা বোঝার জন্য নিম্নে অঙ্কিত মানচিত্রটির সেই অংশের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন যেখানে লোহিত সাগর—বাহরে কুলযুম বা Red Sea অঙ্কিত রয়েছে। লোহিত সাগর প্রকৃতপক্ষে আরব সাগরের একটি শাখা। এর পূর্ব দিকে আরব দেশ এবং পশ্চিম দিকে মিসর অবস্থিত। উত্তর দিকে এর দুটি শাখা বেরিয়ে গেছে। একটি শাখা (আকাবা উপসাগর) সাইনা উপদ্বীপের পূর্বদিকে এবং দ্বিতীয় শাখা (সুয়েজ উপসাগর) সাইনার পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এই দ্বিতীয় শাখাটি (পশ্চিম শাখা) প্রথম শাখা (পূর্ব শাখা) থেকে বড় এবং তা উত্তর দিকে বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে। বনি ইসরাইল এরই মধ্যাংশ দিয়ে সাগর অতিক্রম করেছে। এই শাখাটির উত্তর দিকে মোহনার সামনে অন্য একটি সাগর অবস্থিত। তা হলো বাহরে রুম বা ভূমধ্য সাগর (the Mediterranean Sea)। ভূমধ্য সাগর এবং লোহিত সাগরের এই উত্তর দিকের মোহনার মধ্যস্থলে সামান্য একটু শুকনো জমিনের অংশ রয়েছে। এটাই সেই পথ, যে-পথে মিসর থেকে ফিলিস্তিন ও কিনআনগামী যাত্রীদেরকে লোহিত সাগর পার হওয়ার প্রয়োজন পড়তো না এবং সেকালে এই পথটিকে নিকটবর্তী পথ বলে মনে করা হতো। আর বনি ইসরাইলিরা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় এই পথ অবলম্বন করে নি। বর্তমানে সেই শুষ্ক ভূমিটুকু খনন করে লোহিত সাগরকে ভূমধ্য সাগরের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। এই খণ্ডটুকুর নাম সুয়েজ প্রণালি। আর লোহিত সাগরের উত্তর দিকের মোহনায় সুয়েজ নামে একটি শহর রয়েছে। এটি মিসরের বন্দর এলাকা বলে গণ্য হয়।
তারপর কুরআন মাজিদের সুরা বাকারা ও সূরা শুআরার যে-আয়াতগুলো এ-ব্যাপারে বিবরণ পেশ করলে সে-আয়াতগুলোর প্রতি আর একবার গভীর মনোযোগ দেয়া উচিত। এ-আয়াতগুলোতে পরিষ্কারভাবে দুটি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। একটি হলো فلق یا فرق بحر অর্থাৎ সমুদ্র খণ্ডিত হওয়া বা তাকে খণ্ডিত করে দেয়া। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো উভয় পাশে পানির পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং মধ্যস্থলে রাস্তা সৃষ্টি হওয়া। যেমন কুরআন মাজিদ বলছে-
فَالفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقِ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ
'ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ পাহাড়ের মতো হয়ে গেলো।'
এখানে فرق শব্দের অর্থ দ্বিখণ্ডিত করে পৃথক করা। বিশেষ করে فرق-এর সম্পর্ক যদি بحر অর্থাৎ সমুদ্রের সঙ্গে হয়, তখন খণ্ডিত করে ভিন্ন ভিন্ন দুই অংশে বিভক্ত করে দেয়াই অর্থ হবে। যেমন: অভিধানে আছে فرق البحر অর্থ شقه অর্থাৎ, সমুদ্রকে পৃথক পৃথক দুইভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। আর মাথার সিঁথিকে فرق বলা হয় এইজন্য যে, তা মাথার চুলগুলোকে দুইভাগে বিভক্ত করে মধ্যস্থল প্রকাশ করে।
আর فلق সম্পর্কে অভিধানে উল্লেখ আছে যে, فلق الشيء অর্থ شقه অর্থাৎ, বস্তুটিকে বিদীর্ণ করেছে বা ফাটিয়েছে বা দ্বিখণ্ডিত করেছে বা ভেঙে ফেলেছে। فلق-এর আরেক অর্থ প্রভাব উদ্ভাসিত করেছে। আর انفلق অর্থ انشق অর্থাৎ, বস্তুটি ফেটে গেছে, বিদীর্ণ হয়েছে, দ্বিখণ্ডিত হয়েছে বা ভেঙে গেছে।- فلق الشيء فانفلق 'সে বস্তুটিকে দ্বিখণ্ডিত/বিদীর্ণ করেছে ফলে তা দ্বিখণ্ডিত/বিদীর্ণ হয়েছে।' এ-কারণে পাথরের মধ্যকার ফাটলকে فلق বলা হয়। এভাবে বিরাট পাহাড়কে طود বলা হয়। যেমন: ة طود الجبل العظيم - الطود بعد الجبل অর্থাৎ বিরাট পাহাড়।
আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণের পর উল্লিখিত দুটি আয়াতের পরিষ্কার অর্থ হলো এই যে, সাগরের পানি সুনিশ্চিতভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিলো এবং ফাঁকা জায়গায়র উভয় পাশে পানি দুটি বিরাট দণ্ডায়মান পাহাড়ের মতো হয়ে গিয়েছিলো এবং মধ্যস্থলে রাস্তা সৃষ্টি হয়েছিলো। এটা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন বনি ইসরাইল সাগরের এমন অংশ দিয়ে পার হয়ে থাকবে যা মোহনা ও তীরের সামনে অংশ হবে না; বরং পানির এমন অংশ হবে যা মধ্যখানে ফেটে গিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে। অন্য শব্দে এভাবে বলা যেতে পারে যে, কুরআন মাজিদ পরিষ্কার ভাষায় এটা ঘোষণা করছে যে, বনি ইসরাইল স্থলভাগের পথ দিয়ে এসে লোহিত সাগরের মোহনা বা তার কিনারা দিয়ে সাগর অতিক্রম করে নি; বরং সাগরের মধ্যভাগের কোনো অংশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলো এবং সাইনা প্রান্তরে পৌঁছেছিলো। বলাবাহুল্য, জোয়ার-ভাটা সাগরের দৈর্ঘ্যের অংশে মোহনার দিকে হয়ে থাকে। সাগরের প্রস্থের দিক দিয়ে কখনো এমন হয় না যে, পানি দুই দিকে কুঞ্চিত হয়ে যায় এবং মধ্যভাগে শুষ্ক রাস্তা সৃষ্টি হয়। সুতরাং আল্লহ তাআলার এই মহান মুজেযাকে অবিশ্বাস করে একে দৈনন্দিন বস্তুবাদী কারণ ও উপকরণের আওতায় আনার চেষ্টা করা কুরআনের বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং কুরআনকে বিকৃত করারই শামিল।
তা ছাড়া বনি ইসরাইলিদের এই সাগর অতিক্রম করার ঘটনায় তাওরাত লোহিত সাগরের পুব পাশের ও পশ্চিম পাশের যেসব স্থানের নাম উল্লেখ করেছে এবং সাগর অতিক্রম করা সম্পর্কে যেসব বিবরণ দিয়েছে, তা থেকেও এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বনি ইসরাইলের এই সাগর-অতিক্রম না থাকতো, তারপরও আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ওহির মীমাংসাই একটি বাকশীল মীমাংসা। আর মুমিনগণের ঈমান বাতিল ব্যাখ্যাসমূহ থেকে ভিন্ন মূলতত্ত্বের সঙ্গেই দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত রয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ও চূড়ান্ত আকিদা এই যে, মুসা আ.-এর নবুওতের সত্যতা প্রমাণের জন্য একটি মহান মুজেযা ছিলো। এই মুজেযা এক নিমিষের মধ্যে যাবতীয় বস্তুবাদী হুমকি-ধমকি ও উপকরণের অহমিকাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে এবং উৎপীড়িত সম্প্রদায়কে অত্যাচারী সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছে।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَنْجَيْنَا مُوسَى وَمَنْ مَعَهُ أَجْمَعِينَ )) ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ () إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (( وَإِنْ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (سورة الشعراء)
'এবং আমি উদ্ধার করলাম মুসা ও তার সঙ্গী সবাইকে, তারপর নিমজ্জিত করলাম অপর দলটিকে (মুসা আ.-এর শত্রুদেরকে)। এতে অবশ্যই (আল্লাহ তাআলার) নিদর্শন (মুজেযা) রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।' (সূরা শুআরা: আয়াত ৬৫-৬৮]
ঘটনার এসব বিস্তারিত আলোচনার পর গ্রন্থিত মানচিত্রটিকে সামনে রাখলে বর্ণিত তথ্যসমূহ সুন্দরভাবে স্পষ্ট হতে পারে। আর মুজেযা অস্বীকারকারীগণ এই ঘটনার মূল সত্যের পর পর্দা ফেলে তাকে আচ্ছাদিত করার জন্য যে-বাতিল ব্যাখ্যাসমূহ প্রদান করেছেন তার স্বরূপ উত্তমরূপেই উদ্‌ঘাটিত হয়ে যাচ্ছে।

টিকাঃ
৮৪ হযরত মুসা আ. যখন বনি ইসরাইলসহ সমুদ্র অতিক্রম করছিলেন তখন তাদের জন্য সমুদ্রকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিলো। -২: ৫০ তাদের সমুদ্র অতিক্রম করার পর মুসা আ.-কে বলা হয়েছিলো, সমুদ্রকে সেই অবস্থায় থাকতে দাও, যাতে ফেরআউন ও তার বাহিনী তাতে প্রবেশ করে।-৭: ১৩৬
৮৫ তাওরাত : আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১৫-৩১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00