📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফেরআউনের প্রভুত্ব ও খোদায়ির দাবি

📄 ফেরআউনের প্রভুত্ব ও খোদায়ির দাবি


হযরত মুসা আ.-কে পরাভূত করার জন্য যখন ফেরআউন ও তার সভাসদবর্গের কোনো চক্রান্ত ও প্রতারণা এবং ক্রোধ ও হিংসা কোনো কাজে এলো না এবং তাঁকে হত্যা করার সংকল্প করা সত্ত্বেও হত্যা করার সাহস হলো না, তখন ফেরআউন নিজের মনের ঝাল মেটাবার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করলো যে, সে একদিকে মুসা আ.-কে অপমান ও অপদস্থ করার পেছনে লেগে গেলো এবং অপরদিকে এই ঘোষণা জারি করলো যে, তোমাদের সর্বোচ্চ খোদা ও মাবুদ আমি ছাড়া কেউ নেই। মুসা অদৃশ্য খোদাকে প্রতিপালক বলে থাকে আর আমি বিপুল প্রতাপ এবং প্রচণ্ড জাঁকজমক ও অহমিকার সঙ্গে তোমাদের সামনে বিদ্যমান।
মুসা আ.-এর সুস্পষ্ট প্রমাণ ও নিদর্শনসমূহ দেখে মিসরীয়দের অন্তরে যা-কিছু প্রভাব ও ক্রিয়া হয়েছিলো, ফেরআউনের এই ঘোষণার পর থেকে তা ধীরে ধীরে লোপ পেতে লাগলো এবং তা পার্থিব প্রতাপ ও প্রতিপত্তি এবং মান-মর্যাদার লোভের নিচে চাপা পড়ে গেলো। এইভাবে মিসরীয়রা সবাই পুনরায় হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের বিরোধিতায় ফেরআউনের সঙ্গী হয়ে গেলো।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদ বর্ণনা করেছে এভাবে-
وَنَادَى فِرْعَوْنُ فِي قَوْمِهِ قَالَ يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ )) أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِنْ هَذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ وَلَا يَكَادُ يُبِينُ () فَلَوْلًا أُلْقِيَ عَلَيْهِ أَسْوِرَةٌ مِنْ ذَهَبٍ أَوْ جَاءَ مَعَهُ الْمَلَائِكَةُ مُقْتَرِنِينَ () فَاسْتَخَفْ قَوْمَهُ فَأَطَاعُوهُ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فاسقينَ (سورة الزخرف)
'ফেরআউন তার সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বলে ঘোষণা করলো, "হে আমার সম্প্রদায়, মিসর রাজ্য কি আমার নয়? আর এই নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত; তোমরা কি তা (এসব প্রতাপ ও প্রতিপত্তি) দেখো না? আমি তো শ্রেষ্ঠ এই ব্যক্তি থেকে, যে হীন এবং স্পষ্ট (ও বিশুদ্ধ) কথা বলতে অক্ষম! (যদি মুসা আল্লাহর কাছে সম্মানিত ও মর্যাদাবানই হয়ে থাকে তবে) মুসাকে কেনো দেয়া হলো না স্বর্ণ-বলয় অথবা কেনো তার সঙ্গে এলো না ফেরেশতাগণ দলবদ্ধভাবে?" এইভাবে সে তার সম্প্রদায়কে হতবুদ্ধি করে দিলো, ফলে তারা তার কথা মেনে নিলো। তারা তো ছিলো এক সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।' [সুরা যুখরুফ: আয়াত ৫২-৫৪]
ফেরআউন এখানে দুটি বিষয়কে উন্নত ও মর্যাদাশীল হওয়ার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। সাধারণত পার্থিব জগৎকে জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য মনে করে থাকে তাদের অবস্থা এমনই হয়ে থাকে। একটি হলো ধন-সম্পদ, আরেকটি হলো দুনিয়ার মান-মর্যাদা ও জাঁকজমক। এই এ-দুটি বিষয়ই ফেরআউনের কাছে বিপুল পরিমাণে ছিলো আর হযরত মুসা আ.-এর কাছে ছিলো না।
হযরত শাহ আবদুল কাদির দেহলবি (নাওওয়ারাল্লাহু মারাকাদাহু) এই দুটি কথাকে তাঁর বিখ্যাত তাফসির মুযিহুল কুরআন-এ বর্ণনা করেছেন এভাবে-
"সে নিজে মণিমুক্তা-খচিত কঙ্কন পরতো। আর যে-সভাসদ ও আমিরের প্রতি সে সন্তুষ্ট হতো তাকে সে স্বর্ণের কঙ্কন পরাতো। আর সেনাদল তাদের সামনে সারিবদ্ধ হয়ে দণ্ডায়মান থাকতো।"⁷²
এ-কারণেই সে এই দুটি বিষয়ের উল্লেখ করেছে যে, মুসার খোদা যদি আমার থেকে ভিন্ন অন্যকোনো সত্তা হয়ে থাকে, তবে সে মুসার ওপর আসমান থেকে কেনো স্বর্ণের কঙ্কন বর্ষণ করে না? আর কেনো তার মজলিসে ফেরেশতারা সারিবদ্ধ হয়ে দণ্ডায়মান থাকে না? যেহেতু ফেরআউনের সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে ধর্মীয় ও পার্থিব মান-মর্যাদার মাপকাঠি ছিলো এগুলোই, তাই ফেরআউনের কৌশল তাদের ওপর কার্যকরী হয়ে গেলো। ফলে তারা ঐকমত্যের সঙ্গে পুনরায় ফেরআউনের আনুগত্যের ঘোষণা করে দিলো। এই হতভাগারা এতটুকু বুঝলো না যে, আল্লাহ তাআলার দরবারে সম্মানের মাপকাঠি হলো সততা, পবিত্রতা ও কনিষ্ঠতা এবং আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতামূলক ইবাদত; দুনিয়ার ধন-শ্বর্য, মান-মর্যাদা ও জাঁকজমক নয়। অবশ্য যে-ব্যক্তি মৌলিক সম্মান লাভ করে, তারপর আল্লাহ তাআলা এসব বস্তুও তার পদতলে বিছিয়ে দেন। যারা কেবল পার্থিব মর্যাদা ও মাহাত্ম্যে গর্বিত, তারা চিরস্থায়ী পেরেশানি ও লাঞ্ছনা ছাড়া কিছুই লাভ করতে পারে না। অবশেষে এই অবস্থাই ঘটেছিলো হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের এবং ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের।
এই মর্মে কুরআন মাজিদ বলছে-
فَلَمَّا آسَفُونَا انْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَأَغْرَقْنَاهُمْ أَجْمَعِينَ () فَجَعَلْنَاهُمْ سَلَفًا وَمَثَلًا لِلْآخِرِينَ (سورة الزخرف)
যখন তারা আমাকে ক্রোধান্বিত করলো, আমি তাদেরকে (তাদের দুষ্কৃতিরসমূহের) শাস্তি দিলাম এবং নিমজ্জিত করলাম তাদের সবাইকে। তারপর পরবর্তীদের জন্য আমি তাদেরকে করে রাখলাম অতীত ইতিহাস ও দৃষ্টান্ত।' [সুরা যুখরুফ: আয়াত ৫৫-৫৬]
ثُمَّ أَدْبَرَ يَسْعَى ( فَحَشَرَ فَنَادَى (( فَقَالَ أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى )) فَأَخَذَهُ اللَّهُ نَكَالَ الْآخِرَةِ وَالْأُولَى (( إِنْ فِي ذَلِكَ لَعِبْرَةً لِمَنْ يَخْشَى (سورة النازعات)
'এরপর সে পেছনে ফিরে প্রতিবিধানে সচেষ্ট হলো। সে (তার সম্প্রদায়ের) সবাইকে সমবেত করলো এবং উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করলো, আর বললো, "আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপালক।" এরপর আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন শাস্তিতে পাকড়াও করলেন। যে ভয় করে তার জন্য অবশ্যই এতে শিক্ষা রয়েছে।' [সুরা নাযি'আত: আয়াত ২২-২৬]

টিকাঃ
⁷² মুযিহুল কুরআন, হযরত শাহ আবদুল কাদির দেহলবি রহ., সুরা যুখরুফ।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মিসরীয়দের ওপর আল্লাহর শাস্তি

📄 মিসরীয়দের ওপর আল্লাহর শাস্তি


মোটকথা, হযরত মুসা আ.-এর ওয়াজ ও নসিহত এবং তাবলিগ ও দাওয়াতের কোনো ক্রিয়াই হলো ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের ওপর। আর অল্প কয়েকজন ছাড়া সাধারণ মিসরবাসীরা সবাই তাদের অনুসরণ করলো। কেবল তা-ই নয়, ফেরআউনের নির্দেশে বনি ইসরাইলের নবজাত পুত্রসন্তানদেরকে খুন করে ফেলতে লাগলো। হযরত মুসা আ.-কে অপমান ও অপদস্থ করা হতে লাগলো। আর ফেরআউন তার প্রভুত্ব ও খোদায়ির প্রচার জোরেশোরে শুরু করে দিলো। তখন মুসা আ.-এর প্রতি ওহি এলো যে, তুমি ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়কে জানিয়ে দাও, যদি তোমাদের নীতি এমনই থাকে, তবে অচিরেই তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসবে।
যখন তারা এ-কথার প্রতিও মনোযোগ দিলো না তখন তাদের ওপর একাদিক্রমে আল্লাহর আযাব আসতে লাগলো। তা দেখে ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় এই পন্থা অবলম্বন করলো যে, যখন আল্লাহ তাআলার আযাব কোনো এক আকৃতিতে প্রকাশ পেতো তখন ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় মুসা আ.-এর দরবারে ওয়াদা করতো যে, আচ্ছা, আমরা ঈমান আনবো। তুমি তোমার খোদার দরবারে দোয়া করে এই আযাব দূর করে দাও। যখন সেই আযাব দূর হয়ে যেতো, তারা আবারো নাফরমানি ও অবাধ্যতায় মত্ত হয়ে যেতো। এরপর আল্লাহর আযাব যখন অন্য এক আকৃতিতে আসতো, তখন তারা বলতো, আচ্ছা, আমরা বনি ইসরাইলকে স্বাধীন করে দেবো এবং তাদেরকে তোমার সঙ্গে রওয়ানা করিয়ে দেবো। দোয়া করো, যেনো আমাদের ওপর থেকে এই আযাব দূরীভূত হয়ে যায়। হযরত মুসা আ.-এর দোয়ায় তারা পুনরায় শাস্তি থেকে অব্যাহতি লাভ করতো এবং আযাব দূর হয়ে যেতো। তখন আবারো তারা আগেই মতোই কোমর বেঁধে বিরুদ্ধাচরণ ও নাফরমানিতে লেগে যেতো। এইভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন নিদর্শন প্রকাশ পেলো এবং ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়কে বার বার অবকাশ দেয়া হলো। কিন্তু যখন তারা এটিকেও বিদ্রূপ ও ঠাট্টা এবং মজার বিষয় বানিয়ে নিলো, তখন আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ আযাব এলো এবং ফেরআউন এবং তার উদ্ধত নেতৃবৃন্দ ও সভাসদবর্গের সবাইকে সমুদ্রে নিমজ্জিত করে দেয়া হলো।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আল্লাহর নিদর্শনসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

📄 আল্লাহর নিদর্শনসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা


হযরত মুসা আ.কে বহু নিদর্শন (মুজেযা) দেয়া হয়েছিলো। সুরা বাকারা, সুরা আ'রাফ, সুরা নামল, সুরা কাসাস, সুরা বনি ইসরাইল, সুরা তোয়া- হা, সুরা যুখরুফ, সুরা মুমিন, সুরা কামার ও সুরা নাযিয়াতের বিভিন্ন বর্ণনাশৈলীতে সেসব নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে। যেমন: সুরা বনি ইসরাইলে বলা হয়েছে—
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ فَاسْأَلُ بَنِي إِسْرَائِيلَ إِذْ جَاءَهُمْ فَقَالَ لَهُ فِرْعَوْنُ إِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا مُوسَى مَسْحُورًا )) قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُورًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'তুমি বনি ইসরাইলকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমি মুসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম; যখন সে তাদের কাছে এসেছিলো, ফেরআউন তাকে বলেছিলো, “হে মুসা, আমি মনে করি তুমি তো জাদুগ্রস্ত।" মুসা বলেছিলো, "তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, এইসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন—প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। হে ফেরআউন, আমি তো দেখছি (এসব নিদর্শন অস্বীকার করার কারণে) তোমার ধ্বংস আসন্ন।"' [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০১-১০২]
সুরা তোয়া-হা, সুরা নামল, সুরা নাযিআতে সংখ্যার কথা না বলে কেবল 'নিদর্শনসমূহ' কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কোনো স্থানে 'স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ' (آيات بينات), কোনো স্থানে 'বিস্তারিত নিদর্শনসমূহ' (أيات مفصلات), কোনো স্থানে 'শ্রেষ্ঠ নিদর্শনসমূহ' (الآيات الكبرى) এবং কোনো স্থানে শুধু 'আমার নিদর্শনসমূহ' (آياتي) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর এই বিস্তারিত ও মোটামুটি বিবরণ ছাড়াও উপরিউক্ত সুরা সমূহে পৃথক পৃথক নিদর্শন ও মুজেযাসমূহের উল্লেখ রয়েছে। যদি এর সবগুলোকে একস্থানে একত্র করা হয়, তবে নিম্নবর্ণিত তালিকাটি সাজানো যায়।
১. লাঠি, যা নিক্ষেপ করলে সাপ হয়ে যেতো; ২. শুভ্র হাত, যা জামার ভেতর থেকে বের করে আনলে উজ্জ্বল দেখাতো; ৩. দুর্ভিক্ষ; ৪. শস্যহানি; ৫. ঝড়-তুফান; ৬. পঙ্গপাল; ৭. উকুন; ৮. ব্যাঙ; ৯. রক্ত⁷⁴; ১০. সমুদ্র-বিদারণ, অর্থাৎ লোহিত সাগর খণ্ডিত হয়ে শুকনো রাস্তা বের হওয়া; ১১. মান্না ⁷⁵ ও সালওয়া⁷⁶; ১২. গামাস বা মেঘের ছায়া; ১৩. লাঠির আঘাতে পাথর থেকে ঝরনা প্রবাহিত হওয়া; ১৪. তুর পাহাড় সমূলে উৎপাটিত হয়ে মাথার ওপর আসা; ১৫. তাওরাত নাযিল হওয়া।
উপরিউক্ত বিভিন্ন প্রকারের বিবরণ ও বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে মুফাস্সিরগণ এ-ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে যে, কোন্ পন্থা অবলম্বন করলে تسع آيات বা নয়টি নিদর্শনও নির্ধারিত হয় এবং অন্যান্য নিদর্শন ও মুজেযার বিবরণও শুদ্ধ নিয়মে থেকে যায়। কাজি নাসিরুদ্দিন বায়যাবি এবং অন্য কতিপয় মুফাস্সির এই ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন যে, সুরা বনি ইসরাইলের মধ্যে যে-নয়টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা ওইসব নিদর্শন উদ্দেশ্য নয় যা ফেরআউন ও কওমের বিরুদ্ধে তিরস্কার, শাস্তি ও উপদেশের জন্য পাঠানো হয়েছিলো। বরং এই নয়টি নিদর্শন দ্বারা ওইসব আহকাম উদ্দেশ্য যা লোহিত সাগর পার হওয়ার পর বনি ইসরাইলকে প্রদান করা হয়েছিলো। তাঁরা তাদের এই ব্যাখ্যার সমর্থনে হযরত সাফওয়ান বিন আস্সাল রা. থেকে বর্ণিত হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। হাদিসটির সারমর্ম এই একবার দুজন ইহুদি পরস্পর পরামর্শ করলো যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের দাবির সত্যতা পরীক্ষা করে দেখা হোক। পরামর্শের পর তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে যে-নয়টি নিদর্শন দান করেছিলেন তা ব্যাখ্যা করুন।” রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সেই নয়টি নিদর্শন (আহকাম) হলো এই : ১. তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শিরক করো না; ২. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করো না, যা আল্লাহপাক নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন; ৩. চুরি করো না; ৪. ব্যভিচার করো না; ৫. জাদুকর্ম করো না; ৬. সুদ খেয়ো না; ৭. নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য শাসকের কাছে ধন্না দিয়ো না; ৮. কোনো সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ দিয়ো না; ৯. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করো না। আর হে ইহুদি সম্প্রদায়, বিশেষ করে তোমরা শনিবারের বাধ্যবধকতা লঙ্ঘন করো না।" [দালাইলুন নবুওয়াহ ও সুনানে তিরমিযিতে বর্ণিত রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, নবম হুকুমটি কি এটিই ছিলো না অন্যকিছু এ-ব্যাপারে রাবি শু'বা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।]⁷⁷
এই মুফাস্সিরগণের উল্লিখিত ব্যাখ্যা সঠিক নয় এ-কারণে যে, সুরা বনি ইসরাইলে নয়টি নিদর্শনের উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে ফেরআউন ও হযরত মুসা আ.-এর মোকাবিলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফেরআউন এসব নিদর্শন দেখে বলে, হে মুসা, এগুলো হলো জাদুর ইন্দ্রজাল এবং মুসা আ. বলেন, হে ফেরআউন, এগুলো আল্লাহ তাআলার নিদর্শন। আর তুমি এগুলো অবিশ্বাস করে ধ্বংসে পতিত হচ্ছো। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে নয়টি নিদর্শন দ্বারা নয়টি আহকাম উদ্দেশ্য করা কেমন করে সঠিক ও শুদ্ধ হতে পারে? কেননা, উল্লিখিত মুফাস্সিরগণের মতেও এই আহকামগুলো ফেরআউনের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার পরেই নাযিল হয়েছিলো (তাই তা ফেরআউনের সময়কার হতে পারে না, অথচ সুরা বনি ইসরাইলে ফেরআউনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে)। বস্তুত, এই প্রশ্নটিই উত্থাপিত হয় সুনানে তিরমিযিতে বর্ণিত হাদিসের ওপরও। তা ছাড়া এ-কথাটিও সন্দেহমুক্ত নয় যে, কুরআন মাজিদের আলোচ্য আয়াতগুলোর মধ্যে তো নয়টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আর সাফওয়ান বিন আস্সাল রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে দশটি আহকামের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং সংখ্যায় ব্যতিক্রম ঘটেছে। তারপর দশটি আহকামের নয়টিকে নিদর্শন বলে ব্যাখ্যা করা কেমন করে শুদ্ধ হতে পারে?
উল্লিখিত দুটি সন্দেহ ছাড়া সাফওয়ান রা.-এর হাদিসের ওপর ভিত্তি করে এই নয়টি নিদর্শনকে নয়টি আহকাম বলে ব্যাখ্যা করার ওপর যে জটিলতা অবধারিত হয় তা এই যে, সুরা নামলের মধ্যে নয়টি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করে শুভ্রোজ্জ্বল হাতকে এই নয়টি নিদর্শনের একটি বলা হয়েছে। পরিষ্কারভাবে এটাও বলা হয়েছে যে, ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের জন্য এই নিদর্শন বা মুজেযাগুলো প্রেরণ করা হয়েছে। যেমন: সুরা নামলে বর্ণিত আছে—
وَأَدْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ آيَاتٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ
'এবং তোমার হাত তোমার বগলে রাখো, তা বের হয়ে আসবে শুভ্র-নির্মল অবস্থায়। তা (এই নিদর্শন) ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। তারা তো সত্যত্যাগী (ও পাপিষ্ঠ) সম্প্রদায়।' [সুরা নামল: আয়াত ১২]
অতএব, কুরআন মাজিদে পরিষ্কার বর্ণনার পর হাদিসটিও ত্রুটিমুক্ত থাকলো না (কারণ, তাতে নয়টি নিদর্শনকে নয়টি আহকাম বলা হয়েছে) এবং মুফাস্সিরিনের এই উক্তিও শুদ্ধ হতে পারে না। এ-কারণেই হাফেযে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির এই হাদিসটি সম্পর্কে বলেছেন—
فهذا حديث رواه هكذا الترمذي والنسائي وابن ماجه وابن جرير في تفسيره من طرق عن شعبة بن الحجاج به وقال الترمذي حسن صحيح. وهو حديث مشكل وعبد الله بن سلمة في حفظه شئ وقد تكلموا فيه ولعله اشتبه عليه التسع الآيات بالعشر الكلمات فإنها وصايا في التوراة لا تعلق لها بقيام الحجة على فرعون والله أعلم.
ولهذا قال موسى لفرعون: ( لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أُنزِلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ ) أي: حججًا وأدلة على صدق ما جنتك به ( وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فَرْعَوْنُ مَثْبُورًا ) أي: هالكًا.
এই হাদিসটিকে একইভাবে তিরমিযি, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ এবং ইবনে জারির তাঁদের তাফসিরসমূহে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে শু'বা বিন আল-হাজ্জাজ থেকে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে حسن (হাসান সহিহ) বলেছেন। কিন্তু এটি একটি জটিলতাপূর্ণ হাদিস।
আর রাবি আবদুল্লাহ বিন সালামার স্মরণশক্তিতে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। মুহাদ্দিসগণ তাঁর সম্পর্কে সমালোচনা করেছেন। সম্ভবত (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বর্ণিত) দশটি আহকামকে নয়টি নিদর্শন বলে তাঁর সন্দেহ হয়ে গিয়েছিলো (ফলে তিনি একটিকে অন্যটির সঙ্গে যুক্ত করে বর্ণনা করেছেন)। আর তা হলো দশটি নির্দেশ যা তাওরাতে বর্ণিত হয়েছে। ফেরআউনের ওপর দলিল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে এগুলোর (দশটি নির্দেশ বা আহকাম) কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
এ-কারণে মুসা আ. ফেরআউনকে বলেছিলেন, "তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, এইসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন-প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ।" অর্থাৎ যে-সত্যের পয়গাম নিয়ে আমি এসেছি, তার সত্যায়নের জন্য প্রমাণ ও দলিল বানিয়ে পাঠিয়েছেন। "আর হে ফেরআউন, আমি তো দেখছি (এসব নিদর্শন অস্বীকার করার কারণে) তোমার ধ্বংস আসন্ন।"⁷⁹ অর্থাৎ তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
মোটকথা, কাযি বায়যাবি রহ. এবং অন্য মুফাস্সিরগণের উল্লিখিত ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবেই সন্দেহযুক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত ব্যাখ্যার বিপরীত নয়টি নিদর্শনের নির্দিষ্টকরণে সেই নিদর্শনগুলোকেই গণনা করেছেন যা উপদেশ ও জ্ঞান লাভ এবং বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলায় হযরত মুসা আ.-এর সত্যতা প্রমাণের জন্য দান করা হয়েছিলো। কিন্তু তাঁদের বক্তব্যগুলোর বিভিন্ন ধরনের এবং সেগুলোতে যথেষ্ট বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান। কেননা, তাতে লোহিত সাগর অতিক্রম করার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয় সময়ের নিদর্শগুলোকে সংমিশ্রিত করে ফেলা হয়েছে। অবশ্য এই বক্তব্যগুলোর মধ্যে প্রণিধান পাওয়ার যোগ্য হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর এই বক্তব্য যে, নয়টি নিদর্শন দ্বারা নিম্নিলিখিত মুজেযাগুলো উদ্দেশ্য: ১. লাঠি; ২. শুভ্র হাত; ৩. দুর্ভিক্ষ; ৪. শস্যহানি; ৫. ঝড়-তুফান; ৬. পঙ্গপাল; ৭. উকুন; ৮. ব্যাঙ; ৯. রক্ত। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ছাড়াও মুজাহিদ, ইকরামা, শা'বি এবং কাতাদা রহ.-ও এই মতেরই সমর্থন করেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর ব্যাখ্যার সারমর্ম এই যে, হযরত মুসা আ.-কে যতগুলো মুজেযা দান করা হয়েছে তার কতিপয় লোহিত সাগর অতিক্রম করার পূর্ব-সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর কতিপয় লোহিত সাগর অতিক্রম করার পরের সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রথমগুলোর সম্পর্ক ওইসব ঘটনাবলির সঙ্গে যা হযরত মুসা আ. এবং ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটেছিলো এবং সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ের কারণ হয়েছিলো। এই অংশে আছে নয়টি মুজেযা, তার মধ্যে লাঠি ও শুভ্রোজ্জ্বল হাত সর্বশ্রেষ্ঠ মুজেযা।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَأَرَاهُ الْآيَةَ الْكُبْرَى
"এরপর মুসা ফেরআউনকে দেখালো এক বড় নিদর্শন (অর্থাৎ লাঠির নিদর্শন)।” [সুরা নাযিআত: আয়াত ২০]
وَأَدْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ آيَاتٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ (سورة النمل)
“(হে মুসা,) এবং তোমার হাত তোমার বগলে (তোমার জামার বুকের অংশের উন্মুক্ত স্থানে) রাখো, তা বের হয়ে আসবে শুভ্র নির্মল অবস্থায়। তা ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। তারা তো সত্যত্যাগী (ও নাফরমান) সম্প্রদায়।" [সুরা নামল: আয়াত ১২]
অবশিষ্ট সাতটি হলো শাস্তিমূলক নিদর্শন যা ফেরআউন, তার দায় এবং মিসরবাসীর জীবন দুবিষহ করে তুলেছিলো। যেমন : মান মাজিদে উল্লেখ করা হয়েছে—
وَلَقَدْ أَخَذْنَا آلَ فِرْعَوْنَ بِالسِّنِينَ وَنَقْصٍ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَذَكَّرُونَ )) جَاءَتْهُمُ الْحَسَنَةُ قَالُوا لَنَا هَذه وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَطَّيَّرُوا بِمُوسَى وَمَنْ مَعَهُ أَلَا طَائِرُهُمْ عِنْدَ الله وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ () وَقَالُوا مَهْمَا تَأْتِنَا بِهِ مِن لِتَسْحَرَنَا بِهَا فَمَا نَحْنُ لَكَ بِمُؤْمِنِينَ )) فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالْجَرَادَ وَا وَالصَّفَادِعَ وَالدَّمَ آيَاتِ مُفَصَّلَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ ) (الأعراف)
। ফেরআউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ক্ষতির দ্বারা ভ্রান্ত করেছি, যাতে তারা অনুধাবন করে। যখন তাদের কোনো কল্যাণ ' ; তারা বলতো, "এটা আমাদের প্রাপ্য।" আর যখন কোনো গ্যাণ হতো তখন তারা মুসা ও তার সঙ্গীদেরকে অলক্ষুণে গণ্য করতো, তাদের অকল্যাণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন; কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। তারা বললো, "আমাদেরকে জাদু করার জন্য তুমি যে-না নিদর্শন আমাদের কাছে পেশ করো না কেনো আমরা তোমাকে স্ত করবো না।" এরপর আমি তাদেরকে প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ও রক্ত দ্বারা ক্লিষ্ট করি। এগুলো স্পষ্ট নির্দশন; কিন্তু তারা দাম্ভিকই গেলো। আর তারা ছিলো এক অপরাধী সম্প্রদায়।' [সুরা আ'রাফ : ১৩০-১৩৩]
স্পষ্ট নিদর্শনগুলোর দ্বিতীয় অংশের সম্পর্ক হযরত মুসা আ. এবং ইসরাইলের মধ্যকার ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত। তার মধ্যে কোনো কোনোটি মুজেযা বনি ইসরাইলকে ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং আ.-এর নবুওতের সত্যতাকে সুদৃঢ় করার জন্য, যেমন: মান্না ও সালওয়া নাযিল হওয়া, মেঘ দ্বারা ছায়া প্রদান, লাঠির আঘাতে পাথর : বারোটি ঝরনা প্রবাহিত হওয়া। আর কোনো কোনোটি বনি ইসরাইলের অবাধ্যাচরণের কারণে তাদের ভীতি প্রদর্শনের জন্য, যেমন : পাহাড়ের অংশবিশেষকে তার স্থান থেকে উঠিয়ে এনে বনি ইসরাইলের মাথার ওপর ধরে রাখা।
ান মাজিদে বর্ণিত আছে—
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ ))
'আমি মেঘ দ্বারা তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করলাম এবং তোমাদের কাছে মান্না ও সালওয়া (হালুয়া ও বটেরের ভাজা গোশত) প্রেরণ করলাম। বলেছিলাম, "তোমাদেরকে ভালো যা দান করেছি তা থেকে আহার করো।" তারা আমার প্রতি কোনো জুলুম করে নি; বরং তারা তাদের প্রতিই জুলুম করেছে। [সুরা বাকারা: আয়াত ৫৭]
وَإِذِ اسْتَسْقَى مُوسَى لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَالْفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ كُلُوا وَاشْرَبُوا مِنْ رِزْقِ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
'স্মরণ করো, যখন মুসা তার সম্প্রদায়ের জন্য পানি প্রার্থনা করলো, আমি বললাম, "তুমি লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করো। ফলে তা থেকে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পান-স্থান চিনে নিলো। বললাম, "আল্লাহ-প্রদত্ত জীবিকা থেকে তোমরা পানাহার করো এবং দুষ্কৃতিকারীরূপে পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে বেড়িও না।"' (সুরা বাকারা : আয়াত ৬০]
আর উভয় প্রকারের নিদর্শনগুলোর জন্য পার্থক্যনিরূপণকারী সীমারেখারূপে সেই নিদর্শনটি রয়েছে যা 'সমুদ্র-বিদারণ' অর্থাৎ লোহিত সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করে শুকনো পথ বের করে আনা নামে আখ্যায়িত। বস্তুত, তা ছিলো অত্যাচার ও উৎপীড়নের অবসান এবং উৎপীড়িত ও নির্যাতিত জীবনের সাহায্য ও রক্ষার জন্য একটি মীমাংসাকারী নিদর্শন। অথবা বলা যায়, লোহিত সাগর অতিক্রম করার পূর্ববর্তী ঘটনাবলির পরিণতি এবং পরবর্তী ঘটনাবলির উজ্জ্বল শুরুর জন্য তা ছিলো স্পষ্ট সীমা নিরূপণকারীর মর্যাদার অধিকারী। সুরা আ'রাফ, সুরা বনি ইসরাইল, সুরা তোয়া-হা, সুরা শুআরা, সুরা কাসাস, সুরা যুখরুফ, সুরা দুখান ও সুরা আয-যারিয়াতে এই বিষয়টিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এই যাবতীয় নিদর্শন ও মুজেযা এমন একটি মহান ও উচ্চ মর্যাদাশীল নিদর্শনের পূর্বাভাস ও সূচনা ছিলো, যা এই পুরো ইতিহাসের আসল উদ্দেশ্য ও ভিত্তিমূল। তা হলো তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার নিদর্শন। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ চয় আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম; তাতে ছিলো পথনির্দেশ ও বা।' [সুরা মায়িদা: আয়াত ৪৪]
কথা, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর উল্লিখিত হাদিসটি বিষয়ের জন্য একটি মীমাংসাকারী বাণী। এ-কারণেই হাফেয মুদ্দিন বিন কাসির এ-প্রসঙ্গে বলেছেন—
وهذا القول ظاهر جلي حسن قوي.
বক্তব্যটি সুষ্পষ্ট, পরিষ্কার, উত্তম এবং শক্তিশালী।⁸⁰ হোক। ফেরআউনের অবিরাম অবাধ্যাচরণ, অত্যাচার ও উৎপীড়ন, চ্যর সঙ্গে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং নাফরমানির কারণে আল্লাহ তাআলার থেকে মিসরবাসীর ওপর বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাত্মক শাস্তি আসছিলো : বিরতি দিয়ে দিয়ে ওইসব নিদর্শন ও মুজেযা প্রকাশ পাচ্ছিলো।
টি শাস্তি এলে সবাই হা-হুতাশ শুরু করতো এবং হযরত মুসা আ.-বলতো, যদি তুমি এবার তোমার খোদার কাছে প্রার্থনা করে এই বিকে দূর করে দাও, তবে আমরা সবাই ঈমান আনবো। এরপর । শাস্তি দূরীভূত হতো, তখন পুনরায় তারা আবাধ্যাচরণ ও আত্যাচার করে দিতো। অবশেষে দ্বিতীয়বার আযাব এসে পড়তো। তখন ার সেই পূর্বের অবস্থাই ঘটতো।
ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ একটু আগে সুরা আ'রাফের আয়াতগুলোতে হয়েছে।
আয়াতগুলোতে বর্ণিত নিদর্শনসমূহের মধ্যে 'উকুন' ও 'ব্যাঙ' র্কে জীবনচরিতকারগণ এই দুটি বস্তুর অবস্থা এমন ছিলো যে, আউন ও তার সম্প্রদায়ের পানাহারের বস্তুসমূহ এবং ব্যবহারের দ্রব্যগুলোর মধ্যে এমন কোনোটা ছিলো না যাতে উকুন ও ব্যাঙের অস্তিত্ব দেখা যেতো না। এমনকি ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো এবং তারা ভগ্নহৃদয় হয়ে গেলো। আর রক্ত সম্পর্কে লিখেছেন যে, নীলনদের পানি লোহিত বর্ণ ধারণ করেছিলো। পানির স্বাদ পানিকে পান করার অযোগ্য করে তুলেছিলো। পানির মাছগুলো মরে গিয়েছিলো। তাওরাতের বর্ণনা থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়। এ-বিষয়ে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করছে—
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ فَاسْأَلُ بَنِي إِسْرَائِيلَ إِذْ جَاءَهُمْ فَقَالَ لَهُ فَرْعَوْنُ إِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا مُوسَى مَسْحُورًا () قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُورًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'তুমি বনি ইসরাইলকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমি মুসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম; যখন সে তাদের কাছে এসেছিলো, ফেরআউন তাকে বলেছিলো, “হে মুসা, আমি মনে করি তুমি তো জাদুগ্রস্ত।" মুসা বলেছিলো, "তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, এইসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালকই অবতীর্ণ করেছেন—প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ। হে ফেরআউন, আমি তো দেখছি (এসব নিদর্শন অস্বীকার করার কারণে) তোমার ধ্বংস আসন্ন।"' (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০১-১০২)
وَلَقَدْ أَرَيْنَاهُ آيَاتِنَا كُلُّهَا فَكَذَّبَ وَأَبَى (طه)
'আমি তো তাকে (ফেরআউনকে) আমার সমস্ত নিদর্শন দেখিয়েছিলাম; কিন্তু সে মিথ্যা আরোপ করেছে ও অমান্য করেছে।' (সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৫৬]
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ آيَاتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ () وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ (سورة النمل)
'এরপর যখন তাদের কাছে আমার স্পষ্ট নিদর্শন এলো, তারা বললো, "এ তো সুস্পষ্ট জাদু।" তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করলো, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিলো। দেখো, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিলো।' [সুরা নামল: আয়াত ১৩-১৪]
فَلَمَّا جَاءَهُمْ مُوسَى بِآيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوا مَا هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُفْتَرَى وَمَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ () وَقَالَ مُوسَى رَبِّي أَعْلَمُ بِمَنْ جَاءَ بِالْهُدَى مِنْ عِنْدِهِ وَمَنْ تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ (سورة القصص)
'মুসা যখন তাদের কাছে আমার স্পষ্ট নিদর্শনগুলো নিয়ে এলো, তারা বললো, "এ তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র! আমাদের পূর্বপুরুষদের কালে কখনো এমন কথা শুনি নি।" মুসা বললো, "আমাদের প্রতিপালক সম্যক অবগত, কে তার তাঁর কাছ থেকে পথনির্দেশ এনেছে এবং আখেরাতে কার পরিণাম শুভ হবে। জালিমরা কখনো সফলকাম হবে না।"' [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৬-৩৭]
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ فَقَالَ إِنِّي رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ () فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِآيَاتِنَا إِذَا هُمْ مِنْهَا يَضْحَكُونَ () وَمَا نُرِيهِمْ مِنْ آيَةٍ إِلَّا هِيَ أَكْبَرُ مِنْ أُخْتِهَا وَأَخَذْنَاهُمْ بِالْعَذَابِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ () وَقَالُوا يَا أَيُّهَ السَّاحِرُ ادْعُ لَنَا رَبُّكَ بِمَا عَهِدَ عِنْدَكَ إِنَّنَا لَمُهْتَدُونَ () فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُمُ الْعَذَابَ إِذَا هُمْ يَنْكُثُونَ (سورة الزخرف)
'আমি মুসাকে আমার নিদর্শনসহ ফেরআউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিলো, "আমি তো জগৎসমূহের প্রতিপালকের প্রেরিত (রাসুল)।" সে তাদের কাছে আমার নিদর্শনসহ আসামাত্র তারা তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে লাগলো। আমি তাদেরকে এমন কোনো নিদর্শন দেখাই নি, যা তার অনুরূপ নিদর্শন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নয়। আমি তাদেরকে (পার্থিব) শাস্তি দিলাম যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। তারা বলেছিলো, "হে জাদুকর, তোমার প্রতিপালকের কাছে তুমি আমাদের জন্য (নবুওতের পদের ভিত্তিতে) তা প্রার্থনা করো যা তিনি তোমার সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন, (যেনো এই বিপদ দূর হয়ে যায়) তাহলে অবশ্যই আমরা সৎপথ অবলম্বন করবো।" এরপর যখন আমি তাদের থেকে শাস্তি বিদূরিত করলাম, তখনই তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বসলো।' [সুরা যুখরুফ: আয়াত ৪৬-৫০]
وَلَقَدْ جَاءَ آلَ فِرْعَوْنَ النُّذُرُ () كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا كُلَّهَا فَأَخَذْنَاهُمْ أَخَذَ عَزِيزٍ مُقْتَدِرٍ 'ফেরআউনের সম্প্রদায়ের কাছেও এসেছিলো সতর্কবাণী; কিন্তু তারা আমার সব নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করলো, এরপর পরক্রমশালী ও শক্তিমানরূপে আমি তাদেরকে সুকঠিন শাস্তি দিলাম'। [সূরা কামার: আয়াত ৪১-৪২]
فَأَرَاهُ الْآيَةَ الْكُبْرَى () فَكَذَّبَ وَعَصَى 'মুসা তাকে (ফেরআউনকে) বড় নিদর্শন দেখালো। তখন সে (মুসাকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো এবং অবাধ্যাচরণ করলো।' [সূরা নাযিআত: আয়াত ২০-২১]

টিকাঃ
⁷³ ব্যাঙ ও উকুনের শাস্তির অবস্থা প্রসঙ্গে মুফাস্সিরগণ বলেন, সব ধরনের পাত্র, পানাহার, বিশ্রাম ও ঘুমানোর এমন কোনো বস্তু বা এমন কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিলো না যেখানে উকুন ও ব্যাঙ কিলবিল করতো না। উকুন ও ব্যাঙ সবকিছু নষ্ট ও বরবাদ করে দিয়েছিলো।
⁷⁴ রক্তের শাস্তির অবস্থা প্রসঙ্গে মুফাস্সিরগণ বলেন, লোহিত সাগর ও দেশের সব কূপের পানি রক্তমিশ্রিত হয়ে পড়েছিলো। ফলে কোনোভাবেই পানি করা যেতো না।
⁷⁵ মান্ন একপ্রকার সুস্বাদু খাদ্য, শিশির বিন্দুর মতো গাছের পাতায় ও ঘাসের ওপর জমে থাকতো।
⁷⁶ সালওয়া একপ্রকার পাখির গোশত। আল্লাহ তাআলা উভয় প্রকার খাদ্য বনি ইসরাইলের জন্য তীহ প্রান্তরে প্রেরণ করেছিলেন।
⁷⁷ মূল হাদিস:
عَنْ صَفْوَانَ بْنِ عَسَّالِ { أَنْ يَهُودِيًا قَالَ لصاحبه تَعَالَ حتى نسألَ هَذَا النَّبِيُّ فَقَالَ الْآخَرُ : لَا تَقُلْ هَذَا النَّبِيَّ فَإِنَّهُ إِنْ سَمِعَهَا صَارَتْ لَهُ أَرْبَعَةُ أَعْيُنِ فَأَتَاهُ فَسَأَلَهُ عَنْ هذه الآية { وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى تِسْعَ آيات بينات } فَقَالَ لَا تُشْرِكُوا بِالله شَيْئًا وَلَا تَقْتُلُوا النفس التي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَزْنُوا وَلَا تَسْحَرُوا وَلَا تَأْكُلُوا الرِّبَا وَلَا تَمْشُوا بريء إلى ذِي سُلْطَانِ لِيَقْتُلَهُ وَلَا تَقْذِفُوا الْمُحْصَنَةَ أَوْ تَفِرُّوا مِنْ الرَّحْفَ وَعَلَيْكُمْ خاصةً الْيَهُودَ أَنْ لَا تَعْدُوا فِي السَّبْت
[দেখুন: সুনানে তিরমিযি: তাফসির অধ্যায়, হাদিস ৩১৪৪; দালাইলুন নবুওয়াহ, ইমাম আবু বকর আল-বায়হাকি: হাদিস ২৫২৭: মুশকিলুল আসার, ইমাম আবু জাফর আত- তাহাবি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫। উদ্ধৃত ভাষ্য মুশলিকুল আসার থেকে গৃহীত।।
⁷⁸ তাওরাতেও এই নিদর্শনগুলোর উল্লেখ রয়েছে: তিনি সেই ফলকগুলোর ওপর প্রতিশ্রুতির কথামালা অর্থাৎ বর্ণিত আহকামগুলো লিখেছিলেন। - আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩৪, আয়াত ২৮।
⁷⁹ সূরা বনি ইসরাইল: আয়াত ১০২।
⁸⁰ তাফসিরে ইবনে কাসির, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১১; সুরা বনি ইসরাইলের আয়াত ১০১-এর তাফসির।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বনি ইসরাইলের মিসর ত্যাগ এবং ফেরআউনের পশ্চাদ্ধাবন

📄 বনি ইসরাইলের মিসর ত্যাগ এবং ফেরআউনের পশ্চাদ্ধাবন


বিষয়টি যখন এ-পর্যন্ত গড়ালো তখন আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে নির্দেশ দিলেন, এখন সময় এসে গেছে, বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে বাপ-দাদার দেশে নিয়ে যাও।
মিসর থেকে ফিলিস্তিন বা কিনআন ভূমির দিকে যাওয়ার দুটি রাস্তা ছিলো। একটি পথ ছিলো সরাসরি স্থলভাগের ওপর দিয়ে, এটি ছিলো নিকটবর্তী পথ। আর দ্বিতীয়টি ছিলো লোহিত সাগরের পথ। অর্থাৎ, লোহিত সাগর অতিক্রম করে 'সুর' এবং 'তীহ' বা 'সাইনা' প্রান্তরের পথ এবং এটি দূরবর্তী পথ। কিন্তু আল্লাহ তাআলার হেকমতের চাহিদা হলো এই যে, স্থলভাগের সরাসরি নিকটবর্তী পথটি ছেড়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করে দূরবর্তী পথ দিয়ে যাওয়া হোক।
বর্ণিত ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে, এই সঠিক পথটিকে আল্লাহ তাআলা এইজন্য প্রাধান্য দিয়েছে যে, স্থলভাগের পথটিকে অতিক্রম করার সময় ফেরআউন এবং তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে পড়তো। কেননা, ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় বনি ইসরাইলিদেরকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলো। যদি সমুদ্রের মুজেযাটি না ঘটতো, তবে ফেরআউন বনি ইসরাইলিদেরকে মিসরে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হতো। আর কয়েক শতাব্দীর দাসত্ব বনি ইসরাইলিদেরকে কাপুরুষ ও দুর্বলচিত্ত বানিয়ে দিয়েছিলো। তারা ভয় ও আতঙ্কের কারণে কোনোক্রমে ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতো না। তাওরাতের বর্ণনা থেকে এই ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়: "আর ফেরআউন যখন তাদেরকে মিসর থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করলো, তখন আল্লাহ তাদেরকে ফিলিস্তিনের পথে নিলেন না, যদিও এ-পথই ছিলো নিকটবর্তী। কেননা, আল্লাহ তাআলার এমন ইচ্ছা ছিলো না যে, তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখে পস্তাতে থাকে এবং ফেরআউনের সঙ্গে মিসরে ফিরে যায়। বরং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে লোহিত সাগর ও সাইনা প্রান্তরের ঘোরা পথ দিয়ে নিয়ে গেলেন।"⁸¹
তা ছাড়া ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়কে মহান মুজেযার মাধ্যমে অত্যাচারী ও প্রবল প্রতাপশালী শক্তির কবল থেকে নির্যাতিত ও নিপীড়িত সম্প্রদায়কে মুক্তি প্রদানের উদ্দেশে অসাধারণ ঘটনা প্রকাশ করাও ছিলো উদ্দেশ্য। এ-কারণেই এই পথটিকে যথাযথ মনে করা হয়েছে।
মোটকথা, হযরত মুসা ও হারুন আ. বনি ইসরাইলকে নিয়ে রাতের বেলাতেই লোহিত সাগরের পথ ধরলেন। রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তারা মিসরীয় রমণীদের অলঙ্কার ও মূল্যবান কাপড়সমূহও—যা এক উৎসব উপলক্ষ্যে বনি ইসরাইলিরা ফেরআউনের সম্প্রদায় থেকে ধার নিয়েছিলো—ফেরত দিতে সক্ষম হয় নি। এই আশঙ্কায় যে, ফেরআউনের সম্প্রদায় হয়তো আসল ব্যাপার টের পেয়ে যাবে।
এদিকে গুপ্তচরেরা ফেরআউনকে জানালো যে, বনি ইসরাইলিরা মিসর থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য শহর থেকে বের হয়ে গেছে। ফেরআউন তখনই এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে রাআ'মসিস থেকে বের হলো এবং বনি ইসরাইলিদের পশ্চাদ্ধাবন করলো। ভোর হওয়ার একটু আগে সে তাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেলো।
তাওরাতের ভাষ্য অনুসারে শিশু ও গবাদি পশু ব্যতীত বনি ইসরাইলের সদস্যের সংখ্যা ছিলো ছয় লাখ। ভোর হওয়ার সময় যখন তারা পেছনের দিকে ফিরে তাকালো, দেখতে পেলো ফেরআউন সেনাবহিনীসহ তাদের মাথার ওপর উপস্থিত। তারা ঘাবড়ে গিয়ে মুসা আ.-কে বললো:
"মিসরে কি কবরের জায়গা ছিলো না যে তুমি আমাদের মারার জন্য এই প্রান্তরে নিয়ে এসেছো? তুমি আমাদের সঙ্গে এটা কী করলে যে আমাদেরকে মিসর থেকে বের করে আনলে? মিসরে থাকাকালে আমরা কি তোমাকে বলতাম না যে আমাদেরকে এখানেই থাকতে দাও, আমরা মিসরীয়দের সেবাই করতে থাকি? আমাদের জন্য প্রান্তরে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে মিসরীয়দের সেবা করাই উত্তম হতো। "⁸²

টিকাঃ
৮১ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৩, আয়াত ১৭-১৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00