📄 হযরত মুসা আ. ও জাদুকরদের প্রতিযোগিতা
যাইহোক। উৎসবের দিন এসে পৌছালো। উৎসবের ময়দানে সম্পূর্ণ রাজকীয় জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে ফেরআউন তার সিংহাসনে সমাসীন। সভাসদবর্গও তাদের মর্যাদা অনুসারে নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট। লাখ লাখ মানুষ সত্য ও মিথ্যার লড়াই প্রত্যক্ষ করার জন্য উপস্থিত। একদিকে মিসরের বিখ্যাত ও বিচক্ষণ জাদুকরের দল তাদের জাদুর সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে দণ্ডায়মান, অপরদিকে আল্লাহর রাসুল, সত্যের পয়গামবাহী এবং সত্য ও সতার প্রতীক হযরত মুসা ও হারুন আ. প্রস্তুত। ফেরআউন বেশ উল্লাস বোধ করছে। কেননা, সে এই বিশ্বাসে বিভোর রয়েছে যে, মিসরের জাদুকরেরা এক নিমিষেই এই দুই ব্যক্তিকে পরাজিত করে ছাড়বে। সে জাদুকরদেরকে উৎসাহ প্রদান করছে এবং বলছে, তোমরা মুসাকে পরাজিত করে দিতে পারলে তোমাদেরকে শুধু বিপুল পরিমাণে পুরস্কারই প্রদান করা হবে না; বরং আমার রাজদরবারে তোমাদের জন্য বিশিষ্ট স্থান নির্ধারিত করে দেয়া হবে। জাদুকরেরাও তাদের সফলতা লাভে পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে ফেরআউন থেকে মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করছে এবং তারা ভবিষ্যতের কল্পনায় খুবই উল্লসিত ও উচ্ছ্বসিত।
কুরআন মাজিদ ঘটনার এই অংশ বর্ণনা করছে এভাবে—
وَجَاءَ السَّحَرَةُ فِرْعَوْنَ قَالُوا إِنَّ لَنَا لَأَجْرًا إِنْ كُنَّا نَحْنُ الْغَالِبِينَ () قَالَ نَعَمْ وَإِنَّكُمْ لَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ (سورة الأعراف)
'জাদুকরেরা ফেরআউনের কাছে এসে বললো, "আমরা যদি বিজয়ী হই তবে আমাদের জন্য পুরস্কার (ও সম্মান) থাকবে তো?' সে বললো, "হ্যাঁ, এবং অবশ্যই তোমরা আমার (রাজদরবারে) সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১১৩-১১৪]
فَجُمِعَ السَّحَرَةُ لِمِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ )) وَقِيلَ لِلَّاسِ هَلْ أَنْتُمْ مُجْتَمِعُونَ () لَعَلْنَا تتَّبِعُ السَّحَرَةَ إِنْ كَانُوا هُمُ الْغَالِبِينَ () فَلَمَّا جَاءَ السَّحَرَةُ قَالُوا لِفِرْعَوْنَ أَئِنَّ لَنَا لَأَجْرًا إِنْ كُنَّا نَحْنُ الْغَالِبِينَ () قَالَ نَعَمْ وَإِنَّكُمْ إِذًا لَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ (سورة الشعراء)
'এরপর এক নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট সময়ে জাদরকদেরকে একত্র করা হলো, এবং লোকদেরকে বলা হলো, "তোমরাও সমবেত হচ্ছো কি?" (অর্থাৎ তোমরাও সমবেত হও) যেনো আমরা জাদুকরদের অনুসরণ করতে পারি, যদি তারা বিজয়ী হয়।" এরপর জাদুকরেরা ফেরআউনের কাছে এসে বললো, "আমরা যদি বিজয়ী হই তবে আমাদের জন্য পুরস্কার থাকবে তো?' ফেরআউন বললো, "হ্যাঁ, এবং অবশ্যই তোমরা তখন আমার ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সুরা শুআরা: আয়াত ৩৮-৪২]
জাদুকরেরা ফেরআউনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে মুসা আ.-এর দিকে ফিরলো। কিন্তু একে অপরকে চ্যালেঞ্জ করার আগেই মুসা আ. দীন প্রচারের কর্তব্য পালনে উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করে বললেন, "তোমার এই অবস্থার আমার খুবই আফসোস হচ্ছে। তোমরা এ কী করছো? তোমরা আমাকে জাদুকর হিসেবে আখ্যায়িত করো আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যা দোষারোপ করো না। আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, তোমাদের এই মিথ্যারোপের শাস্তি হিসেবে তিনি তোমাদেরকে না সমূলে উৎপাটিত করে ফেলেন। কেননা, যে-কেউই মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছে সে বিফলই থেকে গেছে।" লোকেরা মুসা আ.-এর কথা শুনে পরস্পর তর্কবিতর্ক শুরু করে দিলো এবং কানঘুষা করতে লাগলো। সভাসদরাও এই অবস্থা দেখে জাদুকরদেরকে বললো, এরা দুই ভাই নিঃসন্দেহে জাদুকর। তারা তাদের জাদুবলে তোমাদেরকে তোমাদের ওপর জয়ী হতে চায় এবং তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করে দিতে চায়। তোমরা তোমাদের কাজ শুরু করে দাও। সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে দৃঢ়পদে মুসার মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যাও। আজ যে-পক্ষই জয়লাভ করবে, সে-পক্ষই সফলকাম বলে বিবেচিত হবে।
ঘটনার এই অংশ কুরআন বর্ণনা করেছে এভাবে-
قَالَ لَهُمْ مُوسَى وَيْلَكُمْ لَا تَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ كَذِبًا فَيُسْحَتَكُمْ بِعَذَابٍ وَقَدْ خَابَ مَنِ افْتَرَى () فَتَنَازَعُوا أَمْرَهُمْ بَيْنَهُمْ وَأَسَرُّوا النَّجْوَى () قَالُوا إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ يُرِيدَانِ أَنْ يُخْرِجَاكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِمَا وَيَذْهَبَا بِطَرِيقَتِكُمُ الْمُثْلَى () فَأَجْمِعُوا كَيْدَكُمْ ثُمَّ انتُوا صَفًّا وَقَدْ أَفْلَحَ الْيَوْمَ مَنِ اسْتَعْلَى (سورة طه)
'মুসা তাদেরকে বললো, "দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না। করলে, তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে সমূলে ধ্বংস করে দেবেন। যে মিথ্যা রচনা করেছে সে ব্যর্থ হয়েছে।" তাদের নিজেদের মধ্যে নিজেদের কর্ম সম্পর্কে বিতর্ক করলো এবং তারা গোপনে পরামর্শ করলো (তর্ক-বিতর্ক ও চুপে চুপে কানাঘুষা করলো)। তারা বললো, "এই দুইজন অবশ্যই জাদুকর, তারা চায় তাদের জাদু দ্বারা তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট জীবন ব্যবস্থা ধ্বংস করতে। অতএব তোমরা তোমাদের জাদুক্রিয়া সংহত করো। তারপর সারিবদ্ধ হয়ে উপস্থিত হও এবং যে আজ জয়ী হবে সে-ই সফল (প্রমাণিত) হবে।"' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৬১-৬৪]
জাদুকরেরা এগিয়ে গিয়ে মুসা আ.-কে বললো, তোমার কাহিনি এখন বাদ দাও। বলো, প্রতিযোগিতা তোমার পক্ষ থেকে শুরু হবে না-কি দের পক্ষ থেকে। হযরত মুসা আ. দেখলেন তাঁর সতর্কীকরণের না ক্রিয়াই তাদের ওপর হলো না। তাই তিনি বললেন, ঠিক আছে, রাই শুরু করো এবং জাদুবিদ্যায় তোমাদের দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পেশ করো। তখনই জাদুকরেরা তাদের রশি, বাণ ওগুলোকে মাটির ওপর ছেড়ে দিলো। সেগুলো সাপ ও অজগরে ান্তরিত হয়ে দৌড়াচ্ছে দৃষ্টিগোচর হলো। হযরত মুসা আ. তা দেখে মনে ভয় ও আশঙ্কা বোধ করলেন। তা এ-কারণে যে, যদি করা এই প্রদর্শনী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং জাদুকরদের কে সত্য বিষয় মনে করে। কেননা, এমনটা ঘটলে তো এই প্রভাবিত । তাদের সত্য গ্রহণ করার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। তখন হ তাআলা তাঁকে নিশ্চিন্ত করে দিলেন এবং ওহি দ্বারা জানিয়ে ন যে, মুসা, ভয় করো না। আমার প্রতিশ্রুতি এই যে, তুমিই জয়ী । তোমার লাঠিকে মাটির ওপর ফেলে দাও। মুসা আ. তাঁর লাঠিকে : ওপর ফেললেন। তৎক্ষণাৎ তা বিশাল অজগরে পরিণত হয়ে চরদের যাবতীয় ভেলকিবাজি গিলে ফেললো এবং কিছুক্ষণের ই গোটা ময়দান পরিষ্কার হয়ে গেলো। এভাবে জাদুকরেরা তাদের । প্রদর্শনীতে অকৃতকার্য ও ব্যর্থ হয়ে গেলো।
ান মাজিদ ঘটনার এই অংশকে বিবৃত করেছে এভাবে-
قَالُوا يَا مُوسَى إِمَّا أَنْ تُلْقِيَ وَإِمَّا أَنْ تَكُونَ أَوَّلَ مَنْ أَلْقَى () قَالَ بَلْ أَلْقُوا جِبَالُهُمْ وَعَصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى () فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ مُوسَى () قُلْنَا لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى () وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا . إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى (سورة طه)
বললো, “হে মুসা, হয় তুমি নিক্ষেপ করো অথবা প্রথমে আমরাই প করি।" মুসা বললো, "বরং তোমরাই নিক্ষেপ করো।" তাদের প্রভাবে অকস্মাৎ মুসার মনে হলো তাদের দড়ি ও লাঠিগুলোর ছুটি করছে। মুসা তার অন্তরে কিছুটা ভীতি অনুভব করলো (যে, দৃশ্য দেখে জনসাধারণ প্রভাবিত না হয়ে পড়ে)। আমি বললাম, ভয় করো না, তুমিই প্রবল (তুমিই বিজয়ী হবে)। তোমার ডান যা আছে তা নিক্ষেপ করো (মাটিতে)। তা তারা যা করেছে (কলাকৌশলের সাপগুলো) সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তা তো কেবল জাদুকরের কৌশল। জাদুকর যেখানেই থাকুক, সফল হবে না।” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৬৯-৬৫]
قَالُوا يَا مُوسَى إِمَّا أَنْ تُلْقِيَ وَإِمَّا أَنْ تَكُونَ نَحْنُ الْمُلْقِينَ () قَالَ أَلْقُوا فَلَمَّا أَلْقَوْا سَحَرُوا أَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوهُمْ وَجَاءُوا بِسِحْرٍ عَظِيمٍ () وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفْ مَا يَأْفِكُونَ () فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ () فَغْلِبُوا هُنَالِكَ وَانْقَلَبُوا صَاغِرِينَ () وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ (سورة الأعراف)
‘তারা বললো, “হে মুসা, তুমিই কি নিক্ষেপ করবে, না আমরাই নিক্ষেপ করবো।" সে বললো, “তোমরাই (আগে) নিক্ষেপ করো।" যখন তারা নিক্ষেপ করলো (জাদুকরেরা রশি ও লাঠি নিক্ষেপ করলো) তখন লোকদের চোখে জাদু করলো (দৃষ্টি-বিভ্রম ঘটালো), তাদেরকে আতঙ্কিত করলো এবং তারা এক বড় রকমের জাদু দেখালো। আমি মুসার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, "তুমিও তোমার লাঠি নিক্ষেপ করো।" সহসা তা তাদের অলীক সৃষ্টিগুলোকে গ্রাস করতে লাগলো; ফলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং তারা যা করছিলো তা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। সেখানে তারা পরাভূত হলো ও লাঞ্ছিত হলো। এবং জাদুকরেরা সিজদায় নিক্ষিপ্ত হলো।' [সুরা আ’রাফ: আয়াত ১১৫-১২০]
فَلَمَّا جَاءَ السَّحَرَةُ قَالَ لَهُمْ مُوسَى أَلْقُوا مَا أَنْتُمْ مُلْقُونَ () فَلَمَّا أَلْقَوْا قَالَ مُوسَى مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرُ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ () وَيُحِقُ اللَّهُ الْحَقِّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ (سورة يونس)
'এরপর যখন জাদুকরেরা এলো, তখন তাদেরকে মুসা বললো, “তোমাদের যা নিক্ষেপ করার নিক্ষেপ করো।" যখন তারা নিক্ষেপ করলো তখন মুসা বললো, “তোমরা যা এনেছো তা জাদু, নিশ্চয় আল্লাহ সেটাকে অসার করে দেবেন। আল্লাহ অবশ্যই অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কর্ম সফল করেন না।" অপরাধীরা অপ্রীতিকর মনে করলেও আল্লাহ তার বাণী অনুযায়ী সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।' [সুরা ইউনুস: আয়াত ৮০-৮২]
জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ও বিচক্ষণ জাদুকরেরা যখন মুসা আ.-এর লাঠির এই অলৌকিক ব্যাপার দেখলো, তারা প্রকৃত অবস্থা বুঝে গেলো। যে-সত্যকে এতক্ষণ পর্যন্ত ফেরআউন ও তার সভাসদবর্গ গোপন রাখতে চেষ্টা করেছিলো, তারা তা আর গোপন রাখতে পারলো না। জাদুকরেরা সমাবেশের সামনেই স্বীকার করে নিলো যে, মুসা আ. এই কাজ জাদুর অনেক ঊর্ধ্বে, তা আল্লাহ প্রদত্ত মুজেযা। তার সঙ্গে জাদুর কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই। তারা তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে সিজদায় লুটিয়ে পড়লো এবং ঘোষণা করে দিলো, আমরা মুসা ও হারুনের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম। কেননা, তিনিই রাব্বুল আলামিন।
এই বিষয়টি কুরআন মাজিদ ব্যক্ত করেছে এভাবে-
فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَى 'এরপর জাদুকরেরা সিজদায় নিক্ষিপ্ত হলো (মুজেযা দর্শনে জাদুকরেরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে সিজদায় পতিত হলো)। তারা বললো, আমরা হারুন ও মুসার প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনলাম।' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৭০]
وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ () قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ () رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ
'এবং জাদুকরেরা সিজদায় নিক্ষিপ্ত হলো। তারা বললো, "আমরা ঈমান আনলাম জগৎসমূহের প্রতিপালকের প্রতি—যিনি মুসা ও হারুনেরও প্রতিপালক।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১২০-১২২]
ফেরআউন দেখলো যে, তার সমস্ত প্রতারণার জাল ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে এবং মুসাকে পরাভূত করার যে-শেষ নির্ভরটুকু ছিলো, সেটাও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়েছে। এখন এমন না হয় যে, মিসরবাসীরাও তার হাতছাড়া হয়ে যায় এবং মুসা তার উদ্দেশে সফল হয়ে যায়। সুতরাং সে প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করলো এবং জাদুকরদেরকে বললো, মনে হয় মুসা তোমাদের সবার গুরু এবং তোমরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে রেখেছিলে। তাই তো তোমরা আমার প্রজা হয়ে আমার অনুমতি ছাড়াই মুসার প্রতিপালকের ওপর ঈমান আনার ঘোষণা দিয়ে দিলে। আচ্ছা, আমি তোমাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করবো, যাতে ভবিষ্যতে কারো এমন বিশ্বাসঘাতকতা করার দুঃসাহস না হয়। প্রথমে তোমাদের ডান হাত ও বাম অথবা বাম হাত ও ডান পা কেটে ফেলবো। তারপর তোমাদেরকে শূলে চড়াবো।
এই ঘটনা পবিত্র কুরআন বিবৃত করেছে এভাবে—
قَالَ آمَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ فَلَأُقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ مِنْ خِلَافٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ وَلَتَعْلَمُنْ أَيُّنَا أَشَدُّ عَذَابًا وَأَبْقَى
'ফেরআউন বললো, কী, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা মুসার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে? দেখছি, সে তো তোমাদরে প্রধান (গুরু ও সরদার); সে তোমাদেরকে জাদু শিক্ষা দিয়েছে। সুতরাং আমি তো তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কাটবোই এবং আমি তোমাদের খেজুর বৃক্ষের কাণ্ডে শূলবিদ্ধ করবোই এবং তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কার শাস্তি কঠোরতর ও অধিক স্থায়ী।"' (সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৭১।
قَالَ فِرْعَوْنُ آمَنْتُمْ بِهِ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنْ هَذَا لَمَكْرٌ مَكَرْتُمُوهُ فِي الْمَدِينَةِ لِتُخْرِجُوا مِنْهَا أَهْلَهَا فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ (سورة الأعراف)
'ফেরআউন বললো, "কী, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা তাতে (মুসার প্রতিপালকের ওপর) বিশ্বাস স্থাপন করলে? এটা তো এক চক্রান্ত। তোমরা জেনে-শুনে এই চক্রান্ত করেছো নগরবাসীদেরকে নগর থেকে বহিষ্কার করার জন্য। আচ্ছা, তোমরা শিগগিরই এর পরিণাম জানবে।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ২০]
কিন্তু সত্যিকারের ঈমান যখন কারো ভাগ্যে হয়, তা এক মুহূর্তের জন্যও হোক না কেনো, এমন অসাধারণ আধ্যাত্মিক শক্তি ও রুহানি ফয়েজ সৃষ্টি করে দেয়, বিশ্বজগতের কোনো বড় থেকে বড় শক্তি তাকে প্রভাবিত ও ভীত করতে পারে না। দেখুন, এই জাদুকরেরাই, যারা একটু আগেও ফেরআউনের কাছে পুরস্কার ও মান-মর্যাদার আবদার ও আবেদন পেশ করছিলেন, তাঁরাই ঈমান আনার সঙ্গে সঙ্গে এমন নির্ভীক ও পরোয়াহীন হয়ে পড়লেন যে, তাঁদের সামনে কঠিন থেকে কঠিন বিপদ এবং যন্ত্রণাদায়কের চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিও তুচ্ছ ব্যাপার হয়ে গেলো। কোনো ভয়ই তাঁদের দৃঢ় ঈমানকে টলাতে পারলো না। তাঁরা ফেরআউনের সামনেই বিনা দ্বিধায় ইসলামের ঘোষণা করে দিলেন। তারা যখন ফেরআউনের এই অত্যাচারমূলক হুমকি শুনলেন, তখনই বলতে শুরু করলেন—
قَالُوا لَنْ نُؤْثِرَكَ عَلَى مَا جَاءَنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالَّذِي فَطَرَنَا فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاءَةَ الدُّنْيَا ۞ إِنَّا آمَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْفِرَ لَنَا خَطَايَانَا وَمَا أَكْرَهْتَنَا عَلَيْهِ مِنَ السِّحْرِ وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى (سورة طه)
‘তারা (জাদুকরেরা) বললো, “আমাদের কাছে যে-স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার ওপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার ওপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দেবো না। সুতরাং তুমি করো যা তুমি করতে চাও। তুমি তো কেবল এই পার্থিব জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারো। আমরা নিশ্চয়ই আমাদের প্রতি ঈমান এনেছি যাতে তিনি ক্ষমা করেন আমাদের (অতীত জীবনের) অপরাধ এবং তুমি আমাদেরকে যে-জাদু করতে বাধ্য করেছো তা। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী।” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৭২-৭৩]
قَالُوا لَا ضَيْرَ إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنْقَلِبُونَ ۞ إِنَّا نَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لَنَا رَبُّنَا خَطَايَانَا أَنْ كُنَّا أَوَّلَ الْمُؤْمِنِينَ (سورة الشعراء)
‘তারা বললো, “(তোমার এই শাস্তিতে আমাদের) কোনো ক্ষতি নেই, আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করবো। আমরা আশা করি যে, আমাদের প্রতিপালক আমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন, কারণ আমরা মুমিনদের মধ্যে অগ্রণী।” [সুরা শুআরা: আয়াত ৫০-৫১]
মোটকথা, সত্য ও মিথ্যার এই প্রতিযোগিতায় ফেরআউন এবং তার সভাসদবৃন্দকে চরম পরাজয় বরণ করতে হলো। তারা সাধারণ প্রজাবৃন্দের সামনে অপদস্থ হলে। হযরত মুসা আ.-কে আল্লাহ তাআলা যে-প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পূর্ণ হলো। তাঁরই মাথার ওপর বহাল থাকলো সফলতার মুকুট।
এই অবস্থা দেখে জাদুকরেরা ছাড়াও বনি ইসরাইলি যুবকদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র দল মুসলমান হয়ে গেলো; কিন্তু তারা ফেরআউনের অত্যাচার ও উৎপীড়নের ভয়ে ইসলামের কথা প্রকাশ করতে পারলো না। কেননা, ফেরআউন মুসলমানদের ওপর সাধারণভাবে উৎপীড়ন ও নির্যাতন তো চালাতোই, এখন পরাজয়ের অপমান তাকে আরো ক্রোধান্বিত করে তুলেছিলো।
হযরত মুসা আ. তাদেরকে দীক্ষা দিলেন যে, এখন মুমিন হওয়ার পর তোমাদের নির্ভর শুধু আল্লাহ তাআলার ওপরই হওয়া উচিত। মুমিনের দলটি তা মেনে নিলো। তাঁরা আল্লাহ তাআলার দরবারে কাকুতি-মিনতি করে রহমত ও মাগফেরাতের প্রার্থনা করতে লাগলেন। জালিমদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন থেকে রক্ষিত থাকার জন্য আবেদন-নিবেদন করতে লাগলেন।
ঘটনার এই অংশ পবিত্র কুরআনে বিবৃত হয়েছে এভাবে-
فَمَا آمَنَ لِمُوسَى إِلَّا ذُرِّيَّةٌ مِنْ قَوْمِهِ عَلَى خَوْفٍ مِنْ فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِمْ أَنْ يَفْتَتِهُمْ وَإِنَّ فِرْعَوْنَ لَعَالَ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الْمُسْرِفِينَ (( وَقَالَ مُوسَى يَا قَوْمِ إِنْ كُنتُمْ آمَنتُمْ بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنتُمْ مُسْلِمِينَ (( فَقَالُوا عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبُّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةٌ لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ (( وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ (سورة يونس)
'ফেরআউন ও তার পারিষদবর্গ নির্যাতন করবে এই আশঙ্কায় মুসার (বনি ইসরাইলের) সম্প্রদায়ের একদল ব্যতীত⁶⁶ আর কেউ তার প্রতি ঈমান আনে নি। বস্তুত, ফেরআউন ছিলো দেশে পরাক্রমশালী এবং সে অবশ্যই সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। মুসা বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমরা আল্লাহতে ঈমান এনে থাকো, যদি তোমরা আত্মসমর্পণকারী হও, তবে তোমরা তাঁরই ওপর নির্ভর করো (তোমাদের মনে ফেরআউনের ভয়ের স্থান দিয়ো না)।" তখন তারা বললো, "আমরা আল্লাহর ওপর নির্ভর করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে জালিম সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র করো না; এবং আমাদেরকে তোমার অনুগ্রহে কাফের সম্প্রদায় থেকে রক্ষা করো।" [সুরা ইউনুস : আয়াত ৮৩-৮৬]
মোটকথা, ফেরআউন মুসা আ. আধ্যাত্মিক শক্তির এই প্রকাশ দেখে অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। যদিও সে জাদুকরদের ওপর তার চরম ক্ষোভ ও ক্রোধ ঝাড়তে লাগলো, কিন্তু সে-মুহূর্তে হযরত মুসা আ.-কে কিছু বলার সাহস পেলো না। তার সভাসদবৃন্দ ও রাজকর্মচারীরা এই দাবি জানালো যে, আপনি মুসাকে হত্যা করে ফেলেন না কেনো? তাকে ও তার সম্প্রদায়কে কি এই সুযোগ দেয়া হচ্ছে যে, তারা মিসরে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়াবে এবং আপনাকে ও আপনার দেবতাগণকে পদাঘাত করতে থাকবে? ফেরআউন বললো, তোমরা ঘাবড়াচ্ছো কেনো? আমি বনি ইসরাইলের শক্তি বৃদ্ধি পেতে দেবো না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যই তাদের রাখবো না। এখনই এই নির্দেশ জারি করে দিচ্ছি—তাদের নবজাত পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলো এবং কন্যাদেরকে তাদের থেকে সেবা গ্রহণের জন্য জীবিত থাকতে দাও।
কুরআন মাজিদ ঘটনার এই অংশটুকু বিবৃত করেছে এভাবে—
وَقَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِ فِرْعَوْنَ أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَآلِهَتَكَ قَالَ سَنُقَتِّلُ أَبْنَاءَهُمْ وَنَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قَاهِرُونَ (سورة الأعراف)
'ফেরআউনের সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বললো, "আপনি কি মুসাকে ও তার সম্প্রদায়কে (মিসর) রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে এবং আপনাকে ও আপনার দেবতাগণকে বর্জন করতে দেবেন?” সে বললো, "আমরা তাদের (নবজাত) পুত্রদেরকে হত্যা করবো এবং তাদের নারীদেরকে (বাঁদি বানানোর জন্য) জীবিত রাখবো আর আমরা তো তাদের ওপর প্রবল (তারা আমাদের হাতে সম্পূর্ণ নিঃসহায় ও অক্ষম)।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১২৭]
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ () إِلَى فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَاحِرٌ كَذَّابٌ ( فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْحَقِّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا اقْتُلُوا أَبْنَاءَ الَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ وَاسْتَحْيُوا نِسَاءَهُمْ وَمَا كَيْدُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ (سورة مؤمن)
'আমি আমার নিদর্শন ও স্পষ্ট প্রমাণসহ মুসাকে প্রেরণ করেছিলাম, ফেরআউন, হামান ও কারুনের কাছে। কিন্তু তারা বলেছিলো, "এই লোকটা তো এক জাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী।" এরপর মুসা আমার কাছ থেকে সত্য নিয়ে তাদের কাছে উপস্থিত তারা (ফেরআউন, হামান ও কারুন) বললো, "মুসার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে, তাদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করো এবং তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখো।” কিন্তু কাফেরদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই।' [সুরা মুমিন: আয়াত ২৩-২৫]
টিকাঃ
⁶⁶ হযরত মুসা আ.-এর প্রতি প্রথম দিকে বনি ইসরাইলের কিছু সংখ্যক যুবক ঈমান এনেছিলো।