📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হামান

📄 হামান


وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ () أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا وَكَذَلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوءُ عَمَلِهِ وَصُدٌ عَنِ السَّبِيلِ وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ إِلَّا فِي تَبَابٍ (سورة مؤمن)
"ফেরআউন বললো, "হে হামান, তুমি আমার জন্য নির্মাণ করো এক সুউচ্চ প্রাসাদ, যাতে আমি পাই অবলম্বন-অবলম্বন আসমানে আরোহণের, যেনো আমি দেখতে পাই মুসার ইলাহকে; তবে আমি তো তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি।" এভাবে ফেরআউনের কাছে শোভনীয় করা হয়েছিলো তার মন্দকাজকে এবং তাকে (খারাপ কাজের ওপর হঠকারিতা করার কারণে) নিবৃত্ত করা হয়েছিলো সরল পথ থেকে এবং ফেরআউনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছিলো সম্পূর্ণরূপে।' [সুরা মুমিন: আয়াত ৩৬- ৩৭]
হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. তাঁর মুযিহুল কুরআন-এ বলেন, ফেরআউনের مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرِي 'আমি ব্যতীত তোমাদের অন্যকোনো ইলাহ আছে বলে জানি না' থেকে বুঝা যায় ফেরআউন নাস্তিক ছিলো। তাফসির ও ইতিহাসের কিতাবে প্রাচীন মিসরের যেসব ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ উদ্ধৃত করা হয়েছে, তা থেকেও এই সন্ধানই পাওয়া যায় যে, মিসরবাসীরা দেব-দেবীর পূজক ছিলো। তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা ছিলো 'আমিনরা' অর্থাৎ সূর্যদেবতা। তারা কোনো অর্থেই এক খোদা বা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিলো না; তারা বরং গোটা বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্ম ও তাদের সব ধরনের চাল-চলন ও কার্যাবলির সম্পর্ক গ্রহ ও নক্ষত্ররাশি এবং সেই দেবতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করতো। খুব সম্ভব ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ভারতের জৈন মতাদর্শের কাছাকাছি ছিলো। কেননা, জৈনরা খোদা বিশ্বাস করে না; কিন্তু দেব- দেবীর পূজা করে।
হামান সম্পর্কে কুরআন মাজিদ পরিষ্কার কোনো বর্ণনা দেয় নি যে, এটা কি কোনো ব্যক্তির নাম না পদের নাম। আর হামান ব্যক্তিবিশেষের নাম হয়ে থাকলে ফেরআউনের দরবারে তার কী পদ ছিলো। কুরআন এ- বিষয়েও আলোকপাত করে নি যে, ফেরআউনের নির্দেশ অনুসারে হামান উচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলো কি-না আর ফেরআউন তার ওপর আরোহণ করে কী করেছিলো। কেননা, এ-বিষয়গুলো পবিত্র কুরআনের মৌলিক উদ্দেশ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ছিলো না। তাওরাতও এ-বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত দেয় নি, এমনকি তাওরাতে ফেরআউনের প্রাসাদ নির্মাণের আদেশেরও উল্লেখ করা হয় নি। অবশ্য মুফাস্সিরগণ এই কাহিনি উদ্ধৃত করেছেন যে, হামান অতি উচ্চ এক মিনারা নির্মাণ করে (ফরআউনকে জানালো। ফেরআউন তীর-ধনুক নিয়ে মিনারায় আরোহণ করলো এবং আকাশের দিকে লক্ষ করে তীর ছুড়লো। আল্লাহ তাআলার কুদরতের ফয়সালা অনুযায়ী সেই তীরটির অগ্রভাগ রক্তমাখা হয়ে এলো। ফেরআউন তা দেখে গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে মিসরবাসীকে বললো, নাও, এখন আমি মুসার খোদারও কর্ম খতম করে দিয়েছি। এই কাহিনির সত্যতা আল্লাহপাকই ভালো জানেন।
ফেরআউন তার পারিষদবর্গ, সাধারণ কিবতি সম্প্রদায় এবং হামানের কাছে হযরত মুসা আ.-এর মোকাবিলায় নিজের পরাজয় ঢেকে রাখার জন্য যদিও উপরিউক্ত পন্থা অবলম্বন করেছিলো, কিন্তু সে নিজেও বুঝতো যে তা প্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। এতে সাধারণ মানুষের অন্তরে সান্ত্বনা আসতে পারে না। খুব সম্ভব বহু সংখ্যক মিসরীয় এসব ব্যাপার বুঝতো। তারপরও সভাসদবৃন্দ, বিশিষ্ট ও সাধারণ মানুষের এমন একজন বিবেচনাবোধসম্পন্ন লোকও ছিলো না যে সাহসও সত্যকে গ্রহণের সঙ্গে এই সত্যের ঘোষণা করে দেয় এবং হেদায়েত ও নসিহত কবুলের দ্বার উন্মোচিত করে দেয়।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফেরআউনের দরবারে মুজেযা প্রকাশ

📄 ফেরআউনের দরবারে মুজেযা প্রকাশ


মোটকথা, ফেরআউনের ভীতি ও উদ্বেগ বৃদ্ধিই পেতে থাকলো। সত্য ও মিথ্যার এই টানা-হেঁচড়ার মধ্যে সে ভীষণ বিপদ দেখছিলো। সুতরাং সে ব্যাপারটিকে এখানেই সমাপ্ত করে দিলো না; বরং এটাই জরুরি মনে করলো যে, সে তার প্রতাপ-প্রতিপত্তি, শক্তিমত্তা ও ক্রোধের প্রকাশ হযরত মুসা ও হারুন আ.-এর ওপরও বিস্তার করবে এবং এইভাবে তাঁদেরকে ভীত ও শঙ্কিত করে সত্যের পয়গাম পৌঁছানোর দায়িত্ব থেকে নিবৃত্ত রাখবে। তাই সে বললো, "হে মুসা, যদি তুমি আমাকে ব্যতীত আর কাউকে মাবুদ সাব্যস্ত করো তবে আমি তোমাকে কারাগারে বন্দি করে রাখবো।” হযরত মুসা আ. বললেন, "আমি তো তোমার কাছে এক অদ্বিতীয় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দশন নিয়ে এসেছি, আমি কী করে এই ভুল পথ অবলম্বন করবো।" ফেরআউন বললো, "যদি বাস্ত বিকই তুমি তোমার ব্যাপারে সত্য হয়ে থাকো, তবে কোনো নিদর্শন দেখাও।"
এই ঘটনা কুরআন মাজিদ নিম্নলিখিত আয়াতগুলোতে প্রকাশ করছে—
قَالَ لَئِنِ اتَّخَذْتَ إِلَهَا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ () قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُبِينٍ () قَالَ فَأْتِ بِهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ (سورة الشعراء)
'ফেরআউন বললো, "যদি তুমি আমার পরিবর্তে অন্যকে ইলাহরূপে গ্রহণ করো আমি তোমাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করবো।" মুসা বললো, "আমি যদি তোমার কাছে কোনো স্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে আসি, তবুও?” ফেরআউন বললো, "তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে তা উপস্থিত করো।"' [সুরা শুআরা: আয়াত ২৯-৩১]
قَالَ إِنْ كُنْتَ جِئْتَ بِآيَة فَأْتِ بِهَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ
'ফেরআউন বললো, "যদি তুমি কোনো নিদর্শন এনে থাকো, তবে তুমি সত্যবাদী হলে তা উপস্থিত করো।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১০৬]
হযরত মুসা আ. সামনে এগিয়ে গেলেন এবং জনাকীর্ণ দরবারে ফেরআউনের সামনে তাঁর লাঠিটি মাটিতে ফেলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তা এক বিরাটাকার অজগরের রূপ ধারণ করলো। তা সত্যিকারের অজগরই ছিলো; কোনো ধরনের দৃষ্টিবিভ্রম ছিলো না। তারপর মুসা আ. তাঁর হাতকে জামার ভেতরে নিয়ে গিয়ে আবার বের করে আনলেন। তৎক্ষণাৎ হাতটি একটি উজ্জ্বল তারকার মতো দীপ্তিমান দেখা যেতে লাগলো। এটা ছিলো দ্বিতীয় মুজেযা বা দ্বিতীয় নিদর্শন।
ফেরআউনের পারিষদবর্গ যখন তাদের বাদশাহ ও নিজেদের সম্প্রদায়কে একজন ইসরাইলির হাতে এভাবে পরাজয় বরণ করতে দেখলো, বিচলিত হয়ে উঠলো এবং বলতে লাগলো, নিশ্চয় এই ব্যক্তি অতি বড় বিচক্ষণ জাদুকর। সে তার এসব কলাকৌশল এজন্য দেখাচ্ছে যে, সে তোমাদের ওপর জয়ী হয়ে তোমাদের দেশ মিসর থেকে তোমাদেরকে বের করে দেবে। সুতরাং আমাদের ভেবে দেখা দরকার এই ব্যক্তির ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। অবশেষে ফেরআউন ও ফেরআউনের পারিষদবর্গ পারস্পরিক পরামর্শক্রমে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, আপাতত মুসা ও হারুনকে অবকাশ দেয়া হোক। ইতোমধ্যে তোমরা গোটা রাজ্যের সব বিচক্ষণ ও সুদক্ষ জাদুকরকে রাজধানীতে সমবেত করো। তারপর মুসার সঙ্গে জাদুবিদ্যার প্রতিযোগিতা করা হোক। নিঃসন্দেহে এই ব্যক্তি পরাজয় বরণ করবে এবং তাঁর যাবতীয় আশা-অভিলাষ মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।
ফেরআউন তখন মুসা আ.-কে বললো, আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারছি, তুমি তোমার কলাকৌশল প্রয়োগ করে আমাদেরকে মিসরের ভূমি থেকে বহিষ্কার করতে চাচ্ছো। সুতরাং, এখন তোমার চিকিৎসা এটা ছাড়া আর কিছুই নয় যে, দেশের বড় বড় সুদক্ষ জাদুকরকে একত্র করে তোমাকে পরাজিত করা হবে। এখন আমাদের ও তোমার মধ্যে প্রতিযোগিতার দিন নির্ধারিত হওয়া উচিত। এরপর আমরাও সেই নির্ধারিত দিনের ব্যতিক্রম করবো এবং তুমিও তোমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে না। হযরত মুসা আ. বললেন, আমি এই প্রতিযোগিতার জন্য তোমাদের يَوْمُ الزِّينَة অর্থাৎ উৎসবের দিনকেই সবচেয়ে ভালো দিন মনে করি। সেদিন সূর্যোদয়ের একটু পরেই আমাদের সবাইকে মাঠে সমবেত হওয়া উচিত।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বিবৃত হয়েছে এভাবে-
فَأَلْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُبِينٌ () وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّاظِرِينَ () قَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمٍ فِرْعَوْنَ إِنَّ هَذَا لَسَاحِرٌ عَلِيمٌ () يُرِيدُ أَنْ يُخْرِجَكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ فَمَاذَا تَأْمُرُونَ () قَالُوا أَرْجِهْ وَأَخَاهُ وَأَرْسِلْ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ () يَأْتُوكَ بِكُلِّ ساحِرٍ عَلِيمٍ
'এরপর মুসা তার লাঠি নিক্ষেপ করলো এবং তৎক্ষণাৎ তা এক সাক্ষাৎ অজগর হলো। এবং সে তার হাত (বগলে স্থাপন করে) বের করলো আর তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র-উজ্জ্বল প্রতিভাত হলো। ফেরআউনের সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বললো, "এ তো এক সুদক্ষ জাদুকর, এ তোমাদেরকে তোমাদের (মিসর) দেশ থেকে বহিষ্কৃত করতে চায়, এখন তোমরা কী পরামর্শ দাও?” তারা বললো, "তাকে ও তার ভাইকে কিঞ্চিৎ অবকাশ দাও এবং নগরে নগরে সংগ্রাহকদের পাঠাও, যেনো তারা তোমার কাছে প্রতিটি সুদক্ষ জাদুকর উপস্থিত করে।" (সুরা আ'রাফ: আয়াত ১০৭-১১২।
ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ مُوسَى وَهَارُونَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ بِآيَاتِنَا فَاسْتَكْبَرُوا وَكَانُوا قَوْمًا مُجْرِمِينَ )) فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا إِنْ هَذَا لَسِحْرٌ مُبِينٌ () قَالَ مُوسَى أَتَقُولُونَ لِلْحَقِّ لَمَّا جَاءَكُمْ أَسِحْرٌ هَذَا وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُونَ )) قَالُوا أَجِئْتَنَا لتَلْفِتَنَا عَمَّا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا وَتَكُونَ لَكُمَا الْكِبْرِيَاءُ فِي الْأَرْضِ وَمَا نَحْنُ لَكُمَا بِمُؤْمِنِينَ () وَقَالَ فِرْعَوْنُ ائْتُونِي بِكُلِّ سَاحِرٍ عَلِيمٍ (سورة يونس)
'পরে আমার নিদর্শনসহ মুসা ও হারুনকে ফেরআউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে প্রেরণ করি। কিন্তু তারা অহঙ্কার করে এবং তারা ছিলো অপরাধী সম্প্রদায়। এরপর যখন তাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে সত্য এলো তখন তারা বললো, "এটা তো নিশ্চয়ই স্পষ্ট জাদু।” মুসা বললো, "সত্য যখন তোমাদের কাছে এলো তখন তোমরা তার সম্পর্কে এমন কথা বলছো? এটা কি জাদু? জাদুকরেরা তো সফলকাম হয় না।" তারা বললো, "আমরা আমাদের পিতৃপুরুষগণকে যার ওপর পেয়েছি তুমি কি তা থেকে আমাদেরকে বিচ্যুত করার জন্য আমাদের কাছে এসেছো এবং যাতে দেশে তোমাদের দুইজনের প্রতিপত্তি হয়, এইজন্য? আমরা তোমাদের প্রতি বিশ্বাসী নই।" ফেরআউন বললো, "তোমরা আমার কাছে সব সুদক্ষ (ও বিচক্ষণ) জাদুরকরকে নিয়ে এসো।” [সুরা ইউনুস: আয়াত ৭৫-৭৯)
قَالَ أَجِئْتَنَا لِتُخْرِجَنَا مِنْ أَرْضِنَا بِسِحْرِكَ يَا مُوسَى () فَلَنَأْتِيَنَّكَ بِسِحْرِ مِثْلِهِ فَاجْعَلْ بَيْنَنَا وَبَيْنَكَ مَوْعِدًا لَا تُخْلِفُهُ نَحْنُ وَلَا أَنْتَ مَكَانًا سُوَى () قَالَ مَوْعِدُكُمْ يَوْمُ الزِّينَةِ وَأَنْ يُحْشَرَ النَّاسُ ضُحَى (سورة طه)
'সে বললো, “হে মুসা, তুমি কি আমাদের কাছে এসেছো তোমার জাদু দ্বারা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করে দেয়ার জন্য? আমরাও অবশ্যই তোমার কাছে উপস্থিত করবো তার অনুরূপ জাদু। সুতরাং তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে (প্রতিযোগিতার জন্য) নির্ধারণ করো এক নির্দিষ্ট সময় এক মধ্যবর্তী স্থানে, যার ব্যক্তিক্রম আমরাও করবো না এবং তুমিও করবে না।" মুসা বললো, "তোমাদের নির্ধারিত সময় উৎসবের দিন এবং যেদিন পূর্বাহ্নে জনগণকে সমবেত করা হবে।" [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৫৭-৫৯]
মোটকথা, হযরত মুসা ও ফেরআউনের মধ্যে প্রতিযোগিতার দিন হিসেবে উৎসবের দিনটি নির্ধারিত হলো। ফেরআউন তখনই তার কর্মচারীদের নামে নির্দেশ জারি করে দিলো যে, এই রাজ্যে যেখানে যত বচক্ষণ ও দক্ষ এবং বিখ্যাত জাদুকর রয়েছে, তাদেরকে অতি শিগগিরই রাজধানীর উদ্দেশে পাঠিয়ে দাও।
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, يَوْم الزينة বা উৎসবের দিন বলতে মিসরীয়দের সেই উৎসবের দিনটিই উদ্দেশ্য যা ওয়াফাউন নীল ( وفاء النيل) নামে প্রসিদ্ধ। কেননা, তাদের উৎসবের দিনগুলোর মধ্যে এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের দিন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মুজেযা ও سحر (জাদু)-র মধ্যে পার্থক্য

📄 মুজেযা ও سحر (জাদু)-র মধ্যে পার্থক্য


ইসলামের আলেমগণের মধ্যে আবহমান কাল থেকে এ-বিষয়টি একটি মতামতের যুদ্ধক্ষেত্র ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে চলে আসছে যে, জাদু এবং মুজেযার মধ্যে পার্থক্য কী। একজন লোক কেমন করে স্থির করবে যে, এটা নবী ও রাসুলের মুজেযা না-কি জাদুকরের জাদু। এ-প্রসঙ্গে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ইলমি দলিল ও প্রমাণসমূহ উদ্ধৃত করা হয়েছে তা জানার জন্য আকায়িদ শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ পাঠ করা আবশ্যক। বিশেষ করে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ.-এর كتاب النبوات (কিতাবুন নবুওয়াত) এবং শায়খ মুহাম্মদ সাফারিনি রহ.-এর شرح عقيدة سفاريني (শারহু আকিদা সাফারিনি)-এর পাঠ প্রণিধানযোগ্য। অবশ্য এখানে একটি সহজবোধ্য প্রমাণ পেশ করে দেয়া সঙ্গত মনে হচ্ছে।
নবী ও রাসুলগণের প্রকৃত মুজেযা তাঁদের সেই শিক্ষা, যা সত্যপথ থেকে ভ্রষ্ট মানুষ এবং বিপথগামী সম্প্রদায়গুলোর হেদায়েতের জন্য অত্যন্ত হিতকর এবং যা নবী-রাসুলগণ ধর্মীয় ও পার্থিব কল্যাণ ও সফলতা লাভের জন্য অনুপম বিধান আকারে পেশ করে থাকেন। অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব। কিন্তু যেভাবে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ আল্লাহর নবীর উপস্থাপিত জ্ঞান ও হেকমত এবং তাঁর বর্ণিত হেদায়েত ও নসিহতের সত্যতা ও পূর্ণতাকে যাচাই করে থাকেন, তেমনি দুনিয়ার সাধারণ মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতিও এ-বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, তারা সত্যতা ও সততা পরখ করার জন্যও এমন কিছু বিষয়ের আকাঙ্ক্ষী হয়, যা সত্য আনয়নকারীর আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং যার মোকাবিলা করতে দুনিয়ার যাবতীয় শক্তি অক্ষম হয়ে যায়। কেননা, সাধারণ মানুষের জ্ঞান সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য একেই মাপকাঠি সাব্যস্ত করে।
অতএব, আল্লাহ তাআলার এই নিয়ম প্রচলিত আছে যে, তিনি নবী ও রাসুলগণকে সত্য ধর্মের শিক্ষা ও পয়গাম প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে একটি বা একাধিক নিদর্শনও দান করে থাকেন। আর নবী-রাসুলগণ যখন নবুওতের দাবির সঙ্গে সঙ্গে কোনো কারণ ও উপকরণ ছাড়াই এমন কোনো নিদর্শন প্রকাশ করেন, দুনিয়ার কোনো শক্তিই যার মোকাবিলা করতে পারে না, তখন তার নাম হয় মুজেযা।
আর এই একই এটাও আল্লাহ তাআলার নিয়ম যে, কোনো নবী ও রাসুলকে যে-মুজেযা প্রদান করা হয়, তা ওই জাতীয়ই হয়ে থাকে, যে-বিষয়ে সেই কওমের যাদেরকে নবী ও রাসুল প্রথম সম্বোধন করে হেদায়েতের বাণী শুনিয়েছেন তাদের পূর্ণ অভিজ্ঞতা থাকে এবং সে-বিষয়ের যাবতীয় সূক্ষ্ম তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত থাকে। তাদের জন্য এটা হৃদয়ঙ্গম করতে সহজ হয় যে, নবী ও রাসুলের এই মুজেযা মানবিক শক্তির চেয়ে অনেক উচ্চতর শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যদি একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, তবে তারা তা বিনা দ্বিধায় স্বীকার করে নেয় যে-
این سعادت بزور بازو نیست تا نه بخشه خدا نے بخشنده
"এই সৌভাগ্য বাহুবলে অর্জিত হবে না, যে-পর্যন্ত না মহান দাতা আল্লাহ তাআলা দান করেন।"
এভাবে প্রতিটি মানুষের ওপর আল্লাহ তাআলার প্রমাণ পূর্ণ হয়ে যায়। অতএব, মুজেযা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলারই কর্ম, যা একজন সত্য নবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য কোনো কারণ ও উপকরণ ব্যতীত অস্তিত্ব লাভ করে থাকে। তার ভিত্তি কোনো নিয়ম-কানুনের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। একটি বিদ্যা বা কৌশলের মতো তা শিখে নেয়া যেতে পারে না। নবী-রাসুলও তা সবসময় করে দেখাতে সক্ষম হন না, যতক্ষণ না সত্যের বিরোধীদের সামনে চ্যালেঞ্জস্বরূপ তা প্রদর্শন করার প্রয়োজন হয়। সুতরাং, যখন সেই গুরুত্বপূর্ণ সময় এসে পড়ে এবং নবী ও রাসুল আল্লাহপাকের প্রতি রুজু হন, তখন আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে তা করে দেখানোর জন্য শক্তি প্রদান করা হয়। পক্ষান্তরে সেহর (জাদু) তার বিপরীত। তা একটি বিদ্যা ও কলা-কৌশলমাত্র। প্রতিটি দক্ষ জাদুকর নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে জাদুকে সবসময়ই কাজে লাগাতে পারে। এর কারণ ও উপকরণ যদিও সাধারণ দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়, কিন্তু এ-ব্যাপারে সব অভিজ্ঞ লোক তা অবগত থাকে। এ-কারণেই জাদু অন্যান্য বিদ্যা ও শাস্ত্রের মতো একটি সংকলিত ও সুবিন্যস্ত বিষয়। মিসরীয়, চৈনিক ও ভারতীয়রা জাদুকে উৎকর্ষমণ্ডিত ও চালু করেছে এবং এটিকে পূর্ণতার সীমায় পৌঁছে দিয়েছে।
এই হলো বিষয়টি ইলমি ও জ্ঞানগত দিক, যার দ্বারা মুজেযা ও জাদুর সীমারেখা সম্পূর্ণরূপে পৃথক ও আলাদা হয়ে যায়। বাকি থাকলো অনুভূতি ও চাক্ষুষ দর্শনের ব্যাপারটি। এ-ক্ষেত্রে মুজেযা ও জাদুর মধ্যে পার্থক্য এই যে, জাদুকরের সাধারণ জীবন ভয়-ভীতি, কষ্ট ও যন্ত্রণা প্রদান এবং অসৎ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। এ-কারণে মানুষ জাদুকরকে ভয় করে। জাদুকরের সামনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে নবী ও রাসুলের গোটা জীবনটাই সত্যতা ও সততা, আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবজাতির প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা, খোদাভীতি ও পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে এবং তাঁদের চরিত্র পবিত্র, নিষ্কলুষ, পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল হয়ে থাকে। তিনি মুজেযাকে পেশা বানিয়ে নেন না; বরং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সততা ও সত্যের সংরক্ষণে তা প্রদর্শন করে থাকেন।
আর তিনি এমন সময় মুজেযা প্রদর্শন করে থাকেন, যখন তাঁর শত্রুরাও তাঁর পবিত্রতা, সততা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতার স্বীকৃতি আগে থেকেই দিয়ে থাকে। কিন্তু তারা সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগকে হয়তো সন্দেহের চোখে দেখে অথবা অবিশ্বাসের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। এরপর তারা নবীর মুজেযা দাবি করে। তা ছাড়া কখনো যদি মুজেযা ও জাদুর প্রতিযোগিতা এসে পড়ে, তখন মুজেযাই জয়ী হয় এবং উচ্চ থেকে উচ্চস্তরের জাদুও পরজিত ও অক্ষম হয়ে পড়ে; কিন্তু এর বিপরীত ঘটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। যেমন: জাদুকর ও আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রতিযোগিতার ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করছে।
মোটকথা, হযরত মুসা আ.-কে লাঠি ও শুভ্রোজ্জ্বল হাতের মুজেযা দান করা হয়েছিলো এইজন্য যে, তাঁর যুগে মিসর ছিলো জাদুর কেন্দ্রস্থল, আর যাদুবিদ্যাও ছিলো তার পূর্ণ যৌবনে। আর মিসরীয়রা একে গোটা পৃথিবীর মোকাবিলায় পূর্ণতার উচ্চস্তরে পৌঁছে দিয়েছিলো।
অতএব, আল্লাহ তাআলার চিরকালীন নিয়মের চাহিদা মোতাবেক হযরত মুসা আ.-কে এমন মুজেযা প্রদান করা হয়েছিলো, যা তারই জাতীয় কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। যেনো তাদের অবিশ্বাসের ওপর হঠকারিতা সীমা অতিক্রম করলে এবং শত্রু ও বিপক্ষ দল তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপকারী জাদু দ্বারা তাঁর সঙ্গে মোকাবিলা করতে অগ্রসর হলে আল্লাহ তাআলার মুজেযা ও নিদর্শন বিপক্ষ ও বিরোধী দলকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে, মুসার কাছে যে-শক্তি রয়েছে তা মানুষের কলাকৌশল ও বিস্ময়কর কার্যাবলির চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে এবং মানবিক ক্ষমতার বাইরে।
এভাবে সাধারণ ও বিশিষ্ট সর্বস্তরের মানুষের বিশ্বাস হয়ে যায় যে, এগুলো সত্য মুজেযা এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সংঘটিত। তাদের মুখ তা স্বীকার করুক বা না করুক, জনসমাবেশে তাদের অক্ষমতা ও অপারগতা তাদের অন্তরসমূহের স্বীকৃতির সাক্ষ বহন করে।

টিকাঃ
⁶⁵ ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, শিহাবুদ্দিন আবুল ফযল আহমদ বিন আলি বিন হাজার আল-আসকালানি রহ., দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00