📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন

📄 আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন


হযরত মুসা আ. ওয়াদিয়ে মুকাদ্দাস বা পবিত্র উপত্যকায় আল্লাহ তাআলার কাছে আরজ করেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমার জিহ্বায় যে- জড়তা রয়েছে তা দূর করে দিন। আর আমার হারুন আমার চেয়ে বিশুদ্ধ ও মার্জিতভাষী।” মুফাস্সিরগণ 'জিহ্বার জড়তা' সম্পর্কে একটি ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন। তার সারমর্ম این হযরত মুসা আ. শৈশবকালে একবার ফেরআউনের কোলে বসেছিলেন। ফেরআউনের দাড়ি হিরা- জহরত ও মণি-মাণিক্য দিয়ে সাজানো ছিলো। শিশুদের অভ্যাসমতো মুসা আ. ফেরআউনের দাড়ি ধরে নাড়াচাড় করছিলেন। ফলে উজ্জ্বল মুক্তগুলোর সঙ্গে দাড়ির কয়েকটি চুলও ছিঁড়ে এসেছিলো। ফেরআউন এতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে মুসা আ.-কে হত্যা করতে চাইলো। ফেরআউনের স্ত্রী আসিয়া স্বামীর এই অবস্থা দেখে কাকুতি-মিনতির সঙ্গে আবেদন করলেন, এ তো শিশু, একে হত্যা করো না। এই শিশু সম্মানের কী বোঝে? এর কাছে খেজুর ও আগুনের জ্বলন্ত কয়লা উভয়ই সমান। রাজহট্ (রাজাদের জেদ অটল থাকে) বলে একটি অতি পুরনো প্রবাদ বাক্য আছে। ফেরআউন বললো, আমি এখনই এর পরীক্ষা করে দেখছি। যদি সে আগুনের কয়লা দেখে হাত গুটিয়ে নেয় তবে আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করে ফেলবো। আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে কাজে লাগাবেন। তাই তাঁকে রক্ষা করার দায়িত্বগ্রহণেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফেরআউন যখন কয়েকটি খেজুরের বিচি এবং জ্বলন্ত আগুনের লাল কয়লা এনে মুসা আ.-এর সামনে রাখলো, তিনি হাত বাড়িয়ে একটি লাল কয়লা তুলে নিয়ে মুখে পুরে ফেললেন। মাত্র এক সেকেন্ডের কাজ। যা হওয়ার তা হয়ে গেলো। তাঁর জিহ্বায় দাগ পড়ে গেলো এবং জিহ্বা মোটা হয়ে গেলো। তখন থেকেই মুসা আ. জিহ্বায় তোতলামি এসে গেলো এবং অনর্গল কথা বলার মধ্যে বাধার সৃষ্টি হতে লাগলো। তাই মুসা আ. ওয়াদিয়ে মুকাদ্দাসে আল্লাহ তাআলার কাছে এই জড়তার কথা উল্লেখ করলেন। ⁴²
কিন্তু সাধারণ মুফাস্স্সিরগণের বর্ণিত এই ঘটনা থেকে ভিন্ন আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার তাঁর অনুমানভিত্তিক স্বতন্ত্র মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমি এই ঘটনাকে সঠিক মনে করি না। আমার ধারণা, মুসা আ.-এর অস্পষ্ট বয়ান ও কথাবার্তায় জড়তা ও বাধা সৃষ্টি হওয়া নিম্নবর্ণিত দুটি কারণের কোনো একটি কারণে হতে পারে:
এক. কুরআন মাজিদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসা আ.-কে যখন নীল নদ থেকে উঠিয়ে রাজাপ্রাসাদে আনা হলো তখন তাঁকে দুধ পান করানোর জন্য ধাত্রীর চিন্তাভাবনা করা হলো। শহরের কয়েকজন বুড়ি ধাত্রী এলো; কিন্তু মুসা আ. কারো স্তনে মুখ লাগালেন না। সুতরাং এই ধাত্রী নির্ধারণের ঘটনায় নিশ্চয়ই কিছু সময় লেগে থাকবে এবং মুসা আ. এ-সময় স্তনদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অভিজ্ঞতার দ্বারা জানা গেছে যে, এমন অবস্থায় শিশুর জিহ্বা মোটা হয়ে যায় এবং কথা বলতে জড়তার রোগ সৃষ্টি হয়। হযরত মুসা আ.-এর ক্ষেত্রে এই অবস্থাই ঘটে থাকবে।
দুই. হযরত মুসা আ. যৌবনের প্রাথমিক অবস্থায়ই মাদয়ানে চলে গিয়েছিলেন এবং এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত ওখানে অবস্থান করেছিলেন। মাআলমিত তানযিল ও তাওরাতের রেওয়ায়েতগুলোক বিশুদ্ধ মেনে নিলে মাদয়ানে হযরত মুসা আ.-এর অবস্থানকাল বিশ বছর বা তারও চেয়ে বেশি হয়। এ-পরিস্থিতিতে এটা স্বাভাবিক কথা যে, তিনি মিসরীয় ভাষার সঙ্গে একটি সীমা পর্যন্ত অপরিচিত ও অনভিজ্ঞ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি মিসরীয় ভাষায় বাক্যালাপ ও বক্তৃতা করার স্থায়ী শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এ-অবস্থাকে তিনি 'জিহ্বার জড়তা' বলেছেন। পক্ষান্তরে হারুন আ. সম্পর্কে বলেছেন, هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا 'আমার ভাই হারুন আমার অপেক্ষা বাগ্মী। '⁴³ কেননা, হারুন আ. সবসময় মিসরেই ছিলেন। তাঁর জবান মিসরীয় ভাষায় খুব চালু ছিলো।
এই দ্বিতীয় কারণটিতে অবশ্য এ-ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, এই কারণটিকে যদি মেনে নেয়া হয়, তবে মুসা আ. হারুন আ.-এর সঙ্গে অনর্গলভাবে কথা বলতে কীভাবে সক্ষম হয়েছিলেন, যখন হারুন আ. কখনো মিসরের বাইরে গমন করেন নি? তিনি কেবল মিসরীয় ভাষাতেই কথা বলতে পারতেন। এই প্রশ্নের জবাব এই যে, হযরত হারুন আ. মিসরীয় ও ইবরানি উভয় ভাষাতেই খুব শিক্ষিত ও পারদর্শী ছিলেন।
মিসরীয় ভাষা তাঁর দেশীয় ভাষা আর ইবরানি ছিলো তাঁর মাতৃভাষা। বহু শতাব্দী অতীত হওয়ার পরও বনি ইসরাইল ইবরানি ভাষা ভোলে নি, সংরক্ষিত রেখেছিলো। নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক কথাবার্তা ও লেখাপড়ায় ইবরানি ভাষাই ব্যবহার করতো। আর ইবরানি ও মাদয়ানি ভাষায় তেমন বেশি কোনো পার্থক্যও নেই। কারণ, দুটি ভাষাই তাঁদের ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ হযরত ইবরাহিম আ.-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলো।
এই দুটি কারণ উল্লেখ করার পর আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, আমার মনের ঝোঁক প্রথম কারণটিকে দিকে। প্রথম কারণটিকেই আমি প্রবল বলে মনে করি। ⁴⁴
কিন্তু আমার (গ্রন্থকার) কাছে তো প্রথম কারণটি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না। কারণ, ধাত্রী অনুসন্ধানের কাজটির কথা কুরআন মাজিদে ও সহিহ হাদিসসমূহে তো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে। আর তার যে-ব্যাখ্যা তাওরাত ও ঐতিহাসিক রেওয়ায়েতসমূহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ধাত্রী খোঁজার বিষয়টি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমাধান হয়ে গিয়েছিলো; মুসা আ.-এর মাকে আনা হয়েছিলো তাঁকে দুধ পান করানোর জন্য। আর বাদশাহর আদেশ জারি হওয়ার পর একটি শিশুকে দুধ পান করানোর ব্যাপারে কেমন করে কয়েকদিন বিলম্ব হতে পারে?
দ্বিতীয় কারণটিও বেশি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এই কারণের ব্যাখ্যা অনুসারে হযরত হারুন আ.-এর সম্পর্কে তো هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا 'আমার ভাই হারুন আমার অপেক্ষা বাগ্মী' কথাটি বুঝে আসতে পারে; কিন্তু মিসরীয় ভাষা ভুলে যাওয়াকে عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي 'আমার জিহ্বার জড়তা' বলা কোনোভাবেই ঠিক নয়। যদি তা ঠিকই হয়, তবে তাঁর দোয়া তো আল্লাহ তাআলা কবুল করেছেন, এরপর আর ভুলে যাওয়ার অর্থ কী?
বরং পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন কথা এই যে, হযরত মুসা আ. এ-অবস্থায়ই জন্মগ্রহণ করেছিলেন যে, তাঁর জিহ্বায় তোতলামি ছিলো এবং কথাবার্তা বলতে জড়তার সৃষ্টি হতো। আর হযরত হারুন আ. বাগ্মী ও বিশুদ্ধভাষী ছিলেন। এজন্য হযরত মুসা আ. নিজের জন্য শুধু এতটুকু দোয়া করলেন যে, জিহ্বার এই জড়তা এবং তার তোতলামি যেনো এত কঠিন না থাকে। যাতে কথা বলতে অপারগ হয়ে পড়তে হয়। যদি জন্মগত জড়তা দূর না-ই হয়, তবে অন্তত এতটুকু আকাঙ্ক্ষা যে, শোতৃমণ্ডলী যেনো আমার কথা ভালোভাবে বুঝতে পারে। আর বিশুদ্ধ ভাষা ও চালু কথার জন্য আমার আশা এই যে, আমার ভাই হারুনকে আমার বাহুশক্তি অর্থাৎ আমার সহায় করে দিন। তিনি এমনিতেই আমার হাত ও বাহুতুল্য। আল্লাহ তাআলার দরবারে মুসা আ.-এর দুটি দোয়াই কবুল হয়ে গেলো। কোনো কোনো মুফাস্সির يَفْقَهُوا قَوْلي যাতে তারা (লোকেরা) আমার কথা বুঝতে পারে' বাক্যে আরো একটি সূক্ষ্ম তর্ক উপস্থিত করে বলেছেন যে, হযরত মুসা আ. এই দোয়া করলেন যে, তাঁর জিহ্বার জড়তা এই সীমা পর্যন্ত দূর করে দেয়া হোক, তিনি যে-কওমের সত্য প্রচার করতে যাচ্ছেন, তারা যেনো তাঁর কথাবার্তা বুঝতে পারে।
কাজেই নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই তাঁর দোয়া কবুল হয়েছিলো এবং তাঁর মুখে কিছু তোতলামি ও জড়তা এর পরেই থেকে গিয়েছিলো। মুসা আ. শর্ত লাগিয়ে নিজেই দোয়ার গণ্ডিকে সংকীর্ণ করে দিলেন। অন্যথায় তিনিও বিশুদ্ধ ভাষা ও বাগ্মিতায় অনন্য হয়ে যেতেন।
আমার (গ্রন্থকার) ধারণায় এখানে এই সূক্ষ্ম তর্ক উত্থাপনের কোনোই প্রয়োজন নেই। কেননা, যেখানে এবং যে-সময়ে হযরত মুসা আ. আল্লাহর দরবারে এই দোয়া করেছিলেন, এসব সূক্ষ্ম তর্ক উত্থাপনকারীরা তার মাহাত্ম্য ও বরকতকে ভুলে গেছেন এবং গভীরভাবে এ-কথা চিন্তা করেন নি যে, মুসা আ.-কে নবুওতের পদ দ্বারা সম্মানিত করা হচ্ছে।
আল্লাহ তাআলার চূড়ান্ত পর্যায়ের দয়া ও অনুগ্রহের বারি তাঁর ওপর বর্ষণ করা হচ্ছে। রহমতের কোল তখন উন্মুক্ত। এ-অবস্থায় মুসা আ. তাঁর কর্তব্য ও দায়িত্বের গুরুত্ব অনুভব করে কাজ সহজ হওয়ার জন্য দোয়া করছেন এবং আকাঙ্ক্ষা করছেন। আল্লাহ তাআলা নিজেই হযরত মুসা আ.-এর কঠিন বিষয়গুলো এবং দায়িত্বের জটিলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত রয়েছেন, তবে কি এ-সময় আল্লাহর অসীম রহমতের চাহিদা এই হতে পারে যে, তিনি দানের ও বখশিশের ক্ষেত্রে সীমাহীন দানের পরিবর্তে ক্রয়-বিক্রয়ের মাপ ও মূল্যের বিনিময়ে সওদা প্রদানের মতো লেনদেনের কারবার করবেন? না-কি প্রকৃত অবস্থার প্রতি লক্ষ করে মুসা আ.-এর দোয়ার শব্দগুলোর শাব্দিক অর্থ বিচার না করে তিনি সবকিছুই দান করবেন যা মুসা আ.-এর যাবতীয় জটিলতার সমাপ্তি ঘটিয়ে তাঁর সহায়তাকারী সাব্যস্ত হতে পারে? নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তা-ই করেছেন।
অবশ্য মুসা আ.-এর দোয়ায় এভাবে কথা বলার মধ্যে একটি রহস্য ছিলো। যা তিনি এবং তাঁর প্রতিপালক উভয়েই বুঝতেন। মুসা আ.-এর আকাঙ্ক্ষা ছিলো যে, তাঁর মহান গুরুত্বপূর্ণ খেদমতে তাঁর ভাই হারুন আ. যেনো অবশ্যই শরিক থাকেন। কেননা, তিনি তাঁর ভাইও হন, আবার স্বভাবগতভাবেই বিশুদ্ধ ভাষা ও অনর্গল কথা বলার ক্ষমতারও অধিকারী। এ-কারণে মুসা আ. এর চেয়ে অধিক কিছুর প্রার্থী হন নি যাতে তাঁর কথা বলার জড়তা ও কষ্ট দূর হয়ে যায়। তাঁর বাসনা ছিলো, তাঁর ভাই হারুন আ.-ও কোনোভাবে নবুওতের দৌলত লাভ করেন।
সুতরাং তাঁর সুপারিশের জন্য দোয়ার বর্ণনায় 'বিশুদ্ধভাষী' হওয়ার গুণটিই আল্লাহ তাআলার দরবারে পেশ করেছিলেন। বিষয় এই নয় যে, তিনি দোয়ার মধ্যে শব্দপ্রয়োগে কার্পণ্য করেছিলেন। কাজেই আল্লাহ তাআলা কম দেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর শব্দগুলোর শাব্দিক অর্থই ধরেছেন। এবং সে-পরিমাণই দান করেছেন যে-পরিমাণ দোয়ার শব্দগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে নিম্নরূপে বর্ণিত হয়েছে-
وَهَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ مُوسَى () إِذْ رَأَى نَارًا فَقَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آنَسْتُ نَارًا لَعَلِّي آتِيكُمْ مِنْهَا بِقَبَسٍ أَوْ أَجِدُ عَلَى النَّارِ هُدًى () فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ يَا مُوسَى () إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدِّسِ طُوًى () وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى () إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي () إِنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى () فَلَا يَصُدَّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لَا يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى (سورة طه)
‘(হে মুহাম্মদ,) মুসার বৃত্তান্ত তোমার কাছে পৌঁছেছে কি? সে যখন (দূর থেকে) আগুন দেখলো, তখন তার পরিবারবর্গকে বললো, “তোমরা এখানে থাকো, আমি আগুন দেখেছি। সম্ভবত আমি তোমাদের জন্য তা থেকে কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে পারবো অথবা আমি (অন্তত) আগুনের কাছে কোনো পথনির্দেশ পাবো।” এরপর যখন সে আগুনের কাছে এলো, তখন আহ্বান করে বলা হলো, (একটি আওয়াজ হলো) “হে মুসা আমিই তোমার প্রতিপালক, অতএব তোমার পাদুকা খুলে ফেলো, কারণ তুমি পবিত্র 'তুওয়া' উপত্যকায় রয়েছো। এবং আমি তোমাকে (আমার নবুওত ও রিসালাতের কর্মের জন্য) মনোনীত করেছি। সুতরাং যা ওহি প্রেরণ করা হচ্ছে তুমি তা মনোযোগের সঙ্গে শোনো। আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে সালাম কায়েক করো। কেয়ামত অবশ্যম্ভাবী, আমি তা (কেয়ামতের সঙ্কটমুহূর্ত) গোপনীয় রাখতে চাই, যাতে (প্রত্যেকে মানুষের ঈমান ও আমলের পরীক্ষা হয়ে যায়) প্রত্যেকেই নিজ কর্ম অনুযায়ী ফল লাভ করতে পারে। সুতরাং যে-ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে না ও নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, যে যেনো তোমাকে তাতে বিশ্বাস স্থাপনে নিবৃত্ত না করে, নিবৃত্ত হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।" (সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৯-১৬]
إِذْ قَالَ مُوسَى لِأَهْلِهِ إِنِّي آنَسْتُ نَارًا سَآتِيكُمْ مِنْهَا بِخَبَرٍ أَوْ آتِيكُمْ بِشِهَابٍ قَبَسٍ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ () فَلَمَّا جَاءَهَا نُودِيَ أَنْ بُورِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا وَسُبْحَانَ اللهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ () يَا مُوسَى إِنَّهُ أَنَا اللهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (سورة النمل)
'স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন মুসা তার পরিবারবর্গকে বলেছিলো, "আমি আগুন দেখেছি, সত্বর আমি ওখান থেকে তোমাদের জন্য কোনো খবর আনবো অথবা তোমাদের জন্য আনবো জ্বলন্ত অঙ্গার, যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পারো। এরপর যখন সে তার কাছে এলো, তখন ঘোষিত হলো, "ধন্য, যারা আছে এই আলোর⁴⁶ মধ্যে এবং যারা আছে তার চারপাশে, জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত। হে মুসা, আমি তো আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সুরা নামল: আয়াত ৭-৯]
وَمَا تِلْكَ بَيَمِينِكَ يَا مُوسَى () قَالَ هِيَ عَصَايَ أَتَوَكَّا عَلَيْهَا وَأَهُشُ بِهَا عَلَى غَنَمِي وَلِي فِيهَا مَارِبُ أُخْرَى () قَالَ أَلْقِهَا يَا مُوسَى () فَأَلْقَاهَا فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَى () قَالَ خُذْهَا وَلَا تَخَفْ سَنُعِيدُهَا سِيرَتَهَا الْأُولَى () وَاضْمُمْ يَدَكَ إِلَى جَنَاحَكَ تَخْرُجْ بيْضَاء مِنْ غَيْرِ سُوء آيَةً أُخْرَى () لِنُرِيَكَ مِنْ آيَاتِنَا الْكُبْرَى (سورة طه)
(এবং আল্লাহ বললেন,) "হে মুসা, তোমার ডান হাতে ওটা কী? মুসা বললো "এটা আমার লাঠি; আমি এতে ভর দিই এবং এর দ্বারা আঘাত করে আমি আমার মেষপালের জন্য গাছের পাতা পেলে থাকি।" তখন তিনি (আল্লাহপাক) বললেন, "হে মুসা, তুমি তা (লাঠি) নিক্ষেপ করো।" তখন সে তা নিক্ষেপ করলো, সঙ্গে সঙ্গে তা (অজগর) সাপ হয়ে ছুটতে শুরু করলো। আল্লাহ বললেন, "তুমি ওটাকে ধরো এবং ভয় করো না, আমি ওটাকে তার পূর্বরূপে (আসল আকৃতিতে) ফিরিয়ে দেবো। এবং তোমার হাত তোমার বগলে রাখো, তা বের হয়ে আসবে নির্মল উজ্জ্বল (রোগ-ব্যাধি যেমন শ্বেত-কুষ্ঠ ইত্যাদি থেকে মুক্ত) অপর এক দর্শনস্বরূপ। তা (এই দুই নিদর্শন দেয়া হলো) এইজন্য যে, আমি তোমাকে (চাক্ষুষভাবে) দেখাবো আমার মহানিদর্শনগুলোর কিছু।" [সুরা ত্বাহা: আয়াত ১৭-২৩]
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ وَلَكِنَّا أَنشَأْنَا قُرُونًا فَتَطَاوَلَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَلَكِنَّا كُنَّا مُرْسَلِينَ () وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا و رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَا أَتَاهُمُ مِنْ نَذِيرٍ مِنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ () (القصص)
(মুহাম্মদ,) মুসাকে আমি যখন বিধান দিয়েছিলাম তখন তুমি পশ্চিম⁴⁷ পার্শ্বে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। বস্তুত আমি কত মানবগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটিয়েছিলাম; এরপর তাদের বহু যুগ বাহিত হয়ে গেছে। তুমি তো মাদয়ানবাসীদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলে তাদের কাছে আমার আয়াত আবৃত্তি করার জন্য। আমিই তো ছিলাম রসূল প্রেরণকারী। মুসাকে যখন আমি আহ্বান করেছিলাম তখন তুমি পাহাড়ের পাশে উপস্থিত ছিলে না। বস্তুত তা⁴⁸ তোমার পালকের পক্ষ থেকে দয়াস্বরূপ, যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারো, যাদের কাছে তোমার পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেন নি, যেনো তারা উপদেশ গ্রহণ করে।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৪৪-৪৬]
هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ مُوسَى ( إِذْ نَادَاهُ رَبُّهُ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى () اذْهَبْ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى () فَقُلْ هَلْ لَكَ إِلَى أَنْ تَزَكَّى () وَأَهْدِيَكَ إِلَى رَبِّكَ فَتَخْشَى (سورة النازعات)
'তোমার কাছে মুসার বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি? যখন তার প্রতিপালক পবিত্র উপত্যকা তুওয়ায় তাকে আহ্বান করে বলেছিলেন, "ফেরআউনের কাছে যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে, এবং বলো, তোমার কি আগ্রহ আছে যে, তুমি পবিত্র হও—আর আমি তোমাকে তোমার প্রতিপালকের দিকে পথপ্রদর্শন করি যাতে তুমি তাঁকে ভয় করো?"' [সুরা নাযি'আত: আয়াত ১৫-১৯]
اذْهَبْ إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى () قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي () وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي () وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي () يَفْقَهُوا قَوْلِي () وَاجْعَلْ لِي وَزِيرًا مِنْ أَهْلِي () هَارُونَ أَخِي () اشْدُدْ بِهِ أَزْرِي () وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي () كَيْ نُسَبِّحَكَ كَثِيرًا () وَنَذْكُرَكَ كَثِيرًا () إِنَّكَ كُنْتَ بِنَا بَصِيرًا () قَالَ قَدْ أُوتِيتَ سُؤْلَكَ يَا مُوسَى (سورة طه)
'(আদেশ হলো, হে মুসা,) তুমি (মিশরের বাদশাহ) ফেরআউনের কাছে যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। মুসা বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও (যেনো বড় থেকে বড় বোঝা বহন কারার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই)। এবং আমার কর্ম সহজ করে দাও (যেনো পথের কোনো কষ্টই আমার ওপর প্রবল ও কঠোর না হয়)। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও (যাতে কথাবার্তা ও ওয়াজ-নসিহত পূর্ণরূপে চালু হয়ে যায় এবং)—যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। আমার জন্য আমার স্বজনবর্গের মধ্য থেকে একজন সাহায্যকারী বানিয়ে দাও; আমার ভাই হারুনকে; তার মাধ্যমে আমার শক্তি দৃঢ় করো এবং তাকে আমার কাছে অংশী করো, যাতে আমরা (একনিষ্ঠভাবে) তোমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি প্রচুর। এবং তোমাকে স্মরণ করতে পারি অধিক। তুমি তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা (তুমি কোনো অবস্থাতেই আমাদের থেকে গাফেল নও)।" তিনি বললেন, “হে মুসা, তুমি যা চেয়েছে তা তোমাকে দেয়া হলো।"' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ২৪-৩৬]
اذْهَبْ أَنْتَ وَأَخُوكَ بِآيَاتِي وَلَا تَنيَا فِي ذِكْرِي () اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى () فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيْنَا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى () قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى () قَالَ لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ( فَأْتِيَاهُ فَقُولَا إِنَّا رَسُولًا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى (سورة طه)
"তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনসহ (মুসা আ.-কে প্রদত্ত মুজিযাসহ) ফেরআউনের কাছে যাও, এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য করো না। তোমরা উভয়ে (মুসা ও হারুন) ফেরআউনের কাছে যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তার সঙ্গে নম্র কথা বলবে, (তোমরা কি জানো?) হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা (পরিণামকে) ভয় করবে।" তারা বললো, "হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আশঙ্কা করি সে আমার ওপর বাড়াবাড়ি করবে অথবা অন্যায় আচরণে সীমালঙ্ঘন করবে।” তিনি বললেন, "তোমরা ভয় করো না। আমি তো তোমাদের সঙ্গে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি। সুতরাং তোমরা তার কাছে (বিনা দ্বিধায়) যাও এবং বলো, 'আমরা তোমার প্রতিপালকের রাসুল, সুতরাং আমাদের সঙ্গে বনি ইসরাইলকে যেতে দাও (তাদের মুক্ত ও স্বাধীন করে দাও) এবং তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না। আমরা তো তোমার কাছে আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নিদর্শন এনেছি এবং তাদের প্রতি শান্তি যারা অনুসরণ করে সৎপথ।"' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৪২-৪৭]
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَجَعَلْنَا مَعَهُ أَخَاهُ هَارُونَ وَزِيرًا () فَقُلْنَا اذْهَبَا إِلَى الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا فَدَمَّرْنَاهُمْ تَدْمِيرًا (سورة الفرقان)
'আমি তো মুসাকে কিতাব (তাওরাত) দিয়েছিলাম এবং তার সঙ্গে তার ভাই হারুনকে সাহায্যকারী করেছিলাম, এবং বলেছিলাম, "তোমরা সেই সম্প্রদায়ের কাছে যাও যারা আমার নিদর্শনাবলিকে অস্বীকার করেছে।" তখন আমি তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলাম।' [সুরা ফুরকান : আয়াত ৩৫-৩৬]
وَإِذْ نَادَى رَبُّكَ مُوسَى أَنِ انْتِ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ () قَوْمَ فِرْعَوْنَ أَلَا يَتَّقُونَ () قَالَ رَبِّ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونَ () وَيَضِيقُ صَدْرِي وَلَا يَنْطَلِقُ لِسَانِي فَأَرْسِلْ إِلَى هَارُونَ () وَلَهُمْ عَلَيَّ ذَنْبٌ فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونَ () قَالَ كَلَّا فَاذْهَبَا بِآيَاتِنَا إِنَّا مَعَكُمْ مُسْتَمِعُونَ () فَأْتِيَا فَرْعَوْنَ فَقُولَا إِنَّا رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ (سورة الشعراء)
'স্মরণ করো, যখন তোমার प्रतिपालक मुसाके ডেকে বললেন, "তুমি জালিম (ও পাপিষ্ঠ) সম্প্রদায়ের কাছে যাও, ফেরআউনের সম্প্রদায়ের কাছে; তারা কি ভয় করে না?" তখন সে বলেছিলো, “হে আমার প্রতিপালক, আমি আশঙ্কা করি যে, তারা আমাকে অস্বীকার করবে, এবং আমার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে, আর আমার জিহ্বা তো সাবলীল নয়। সুতরাং হারুনের প্রতিও প্রত্যাদেশ পাঠাও। আমার বিরুদ্ধে তো তাদের এক অভিযোগ আছে, আমি আশঙ্কা করি তারা আমাকে হত্যা করবে।" আল্লাহ বললেন, 'না, কখনোই নয়, সুতরাং তোমরা উভয়ে আমার নিদর্শনসহ যাও, আমি তো তোমাদের সঙ্গে আছি, শ্রবণকারী। অতএব, তোমরা উভয়ে ফেরআউনের কাছে যাও এবং বলো, আমরা তো জগৎসমূহের প্রতিপালকের রাসুল।" [সুরা শুআরা: আয়াত ১০-১৬]
وَأَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَا مُوسَى لَا تَخَفْ إِنِّي لَا يَخَافُ لَدَيَّ الْمُرْسَلُونَ () إِلَّا مَنْ ظَلَمَ ثُمَّ بَدَّلَ حُسْنًا بَعْدَ سُوءٍ فَإِنِّي غَفُورٌ رَحِيمٌ () وَأَدْخِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ آيَاتِ إِلَى فَرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ (سورة النمل)
"তুমি তোমার লাঠি (মাটিতে) নিক্ষেপ করো।" এরপর সে যখন ওটাকে সাপের মতো (ফণা তুলে) ছোটাছুটি করতে দেখলো তখন সে পেছনের দিকে ছুটতে লাগলো এবং ফিরেও তাকালো না। বলা হলো, "হে মুসা, ভীত হয়ো না, নিশ্চয় আমি এমন, আমার সান্নিধ্যে রাসুলগণ ভয় পায় না; তবে যারা জুলুম করার পর মন্দকাজের পরিবর্তে সৎকর্ম করে, তাদের প্রতি আমি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এবং তোমার হাত তোমার বগলে (তোমার জামার বুকের অংশের উন্মুক্ত স্থানে) রাখো, তা বের হয়ে আসবে শুভ্র নির্মল অবস্থায়। তা ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্তর্গত। তারা তো সত্যত্যাগী (ও নাফরমান) সম্প্রদায়।" [সুরা নামল: আয়াত ১০-১২]
فلما قَضَى مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ آنَسَ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ نَارًا قَالَ لِأَهْلِهِ امكنوا إِنِّي آنَسْتُ نَارًا لَعَلِّي آتِيكُمْ مِنْهَا بِخَيْرٍ أَوْ جَذْوَةٍ مِنَ النَّارِ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ () فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ مِنْ شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي الْبُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يَا مُوسَى إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ) وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَرُ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَا مُوسَى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ )) اسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجُ بَيْضَاء مِنْ غَيْرِ سُوءٍ وَاصْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْب فَذَانَكَ بُرْهَانَان مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَيْهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ )) قَالَ رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونَ )) وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ () قَالَ سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطَانًا فَلَا يَصِلُونَ إِلَيْكُمَا بِآيَاتِنَا أَنْتُمَا وَمَنِ اتَّبَعَكُمَا الْغَالِبُونَ (سورة القصص)
মুসা যখন তার মেয়াদ পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করলো, তখন সে তুর পর্বতের দিকে আগুন দেখতে পেলো। সে তার পরিবারবর্গকে বললো, "তোমরা অপেক্ষা করো, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবত আমি ওখান থেকে তোমাদের জন্য খবর আনতে পারি অথবা একখণ্ড জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে পারি যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পারো। যখন মুসা আগুনের কাছে পৌছলো তখন উপত্যকার দক্ষিণ পাশে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক থেকে (যে-বৃক্ষে আগুন দেখা গিয়েছিলো) তাকে আহ্বান করে বলা হলো, "হে মুসা, আমিই আল্লাহ, জগৎসমূহের প্রতিপালক।" আরও বলা হলো, "তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ করো।" এরপর যখন সে তাকে সাপের মতো (ফনা তুলে) ছোটাছুটি করতে দেখলো তখন পেছনের দিকে ছুটতে লাগলো এবং ফিরে তাকালো না। তাকে বলা হলো, "হে মুসা, সামনে আসো, ভয় করো না, তুমি তো নিরাপদ। তোমার হাত তোমার বগলে রাখো, তা বের হয়ে আসবে শুভ্র- সমুজ্জ্বল নির্মল হয়ে। ভয় দূর করার জন্য তোমার হাত দুটি নিজের (বুকের) দিকে চেপে ধরো। এই দুটি তোমার প্রতিপালকের প্রদত্ত প্রমাণ, ফেরআউন ও তার পারিষদবর্গের জন্য। তারা তো সত্যত্যাগী (ও নাফরমান) সম্প্রদায়।" মুসা বললো, হে আমার প্রতিপালক, আমি তো তাদের একজনকে হত্যা করেছি। ফলে আমি আশঙ্কা করছি তারা আমাকে হত্যা করবে। আর আমার ভাই হারুন আমার থেকে বাগ্মী; সুতরাং তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ করো, সে আমাকে সমর্থন করবে। আমি আশঙ্কা করি তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।” আল্লাহ বললেন, "আমি তোমার ভাইয়ের দ্বারা তোমার বাহু শক্তিশালী করবো এবং তোমাদের উভয়কে প্রাদান্য দান করবো। তারা তোমার কাছে (ক্ষতি করার উদ্দেশে) পৌঁছতে পারবে না। তোমরা এবং তোমাদের অনুসারীরা আমার নিদর্শনের মাধ্যমে প্রবল (ও বিজয়ী) হবে।" [সুরা কাসাস: আয়াত ২৯-৩৫]
وَآتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَجَعَلْنَاهُ هُدًى لِبَنِي إِسْرَائِيلَ أَلَّا تَتَّخِذُوا مِنْ دُونِي وَكِيلًا () ذُرِّيَّةَ مَنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا (سورة بَنِي إِسْرَائِيلَ)
'আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বনি ইসরাইলের পথনির্দেশক। আমি আদেশ করেছিলাম, তোমরা আমাকে ব্যতীত অন্য কাউকেও কর্মবিধায়করূপে গ্রহণ করো না। হে তাদের বংশধর, যাদেরকে আমি নুহের সঙ্গে (নৌকায়) আরোহণ করিয়েছিলাম; সে তো ছিলো পরম কৃতজ্ঞ বান্দা।' [সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২-৩]
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ فَلَا تَكُنْ فِي مرية من لقائهِ وَجَعَلْنَاهُ هُدًى لِبَنِي إِسْرَائِيلَ () وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ () إِنَّ رَبِّكَ هُوَ يَفْصِلُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فيه يختلفُونَ (سورة السجدة)
'আমি তো মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম, সুতরাং তুমি তার সাক্ষাৎ⁴⁹ সম্পর্কে সন্দেহ করো না, আমি একে (কিতাবকে) বনি ইসরাইলের জন্য পথনির্দেশক করেছিলাম। আর আমি তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করতো, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলো। আর তারা ছিলো আমার নিদর্শনাবলিতে দৃঢ় বিশ্বাসী। তারা যে-বিষয়ে মতবিরোধ করছে, তোমার প্রতিপালকই কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে তার ফয়সালা করে দেবেন।' [সুরা আস-সাজদা: আয়াত ২৩-২৫]
এই আয়াতগুলোতে হযরত মুসা আ.-এর লাঠিটি মুজেযা হওয়ার বিষয়টি বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুরা তোয়া-হায় বলা হয়েছে, هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَى 'তা সাপ হয়ে ছোটাছুটি করছে'। সুরা নামল ও সুরা কাসাসে বলা হয়েছে كَأَنَّهَا جَانٌ 'যেনো তা সাদা বর্ণের সাপ'। (আর দ্রুত গতি হিসেবে সাদা পাতলা সাপই দ্রুত গতিশীল ছিলো।) আর সুরা শুআরায় বলা হয়েছে, هِيَ ثُعْبَانٌ مُبِينٌ 'তা স্পষ্ট বিরাট অজগর'। মুফাস্সিসরগণ বলেন, শব্দ হিসেবে যদিও মুসা আ.-এর লাঠিটির রূপ বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু অর্থের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রকার নয়; একই মূল বস্তুর বিভিন্ন অবস্থা দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, জাত হিসেবে তো তা সাপই ছিলো এবং দ্রুত গতি হিসেবে তা ছিলো حَانٌ অর্থাৎ দ্রুত গতিশীল সাপ আর বিরাটাকার হিসেবে ছিলো ثُعْبَانٌ অর্থাৎ অজগর।
আর সুরা কাসাসে মুসা আ.-এর উভয় মুজেযা বর্ণনা করে বলা হয়েছে—
وَاضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ 'ভয় দূর করার জন্য তোমার হাত দুটি নিজের (বুকের) দিকে চেপে ধরো।'
এই আয়াতে কীরকম ভয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে? এ-সম্পর্কে হযরত শাহ সাহেব দেহলবি রহ. বলেন, ভয় দূর করার জন্য বাহু দুটি মিলিত করো। অর্থাৎ, সাপের ভয় দূর হয়ে যাক।⁵⁰
আর কোনো কোনো আলেম বলেন, এই ভয়ের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ফেরআউনের দরবারের ভয়। অর্থাৎ, ফেরআউনের সামনে এসে যদি কোনো সময় ভয় অনুভব করো, তবে হে মুসা, তোমার বাহুকে তোমার শরীরের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ো। তৎক্ষণাৎ ভয় দূর হয়ে যাবে এবং অন্তরে স্বস্তি ও প্রশান্তির অবস্থা সৃষ্টি হবে। এটি উল্লিখিত দুটি নিদর্শন ছাড়া তৃতীয় কোনো নিদর্শন ছিলো না। এ-আয়াতে ভয় দূর করার একটি প্রাকৃতিক উপায় বলে দেয়া হয়েছে, যা এ-ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত উপকারী প্রমাণিত হয়ে থাকে। আর যখন তা আল্লাহ তাআলাই শিখিয়ে দিয়েছিলেন, সুতরাং তা কার্যকরী হওয়া সম্পর্কে মুসা আ.-এর মনে সন্দেহ অবশিষ্ট থাকার অবকাশই ছিলো না। ⁵¹
আমাদের মতে আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্ক হযরত শাহ সাহেব দেহলবি রহ.-এর ব্যাখ্যারই সমর্থন করছে। আর আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরির ব্যাখ্যা কিছুটা দূরের বলে মনে হয়।

টিকাঃ
⁴² আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির আল-কুরাশি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৯।
⁴³ সুরা কাসাস: আয়াত ৩৪
⁴⁴ কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ২০৮-২০৯।
⁴⁶ মুসা আ.-এর কাছে আগুন মনে হলেও তা ছিলো নুর, যা আল্লাহর তাজাল্লি।
⁴⁷ তুর পাহাড় বা 'তুওয়া' উপত্যকার প্রান্তে।
⁴⁸ অর্থাৎ ওহি, যা আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে করে তাকে এমনসব বিষয়ের সংবাদ প্রদান করেছেন যা তিনি জানতেন না।
⁴⁹ মিরাজে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে মুসা আ.-এর সাক্ষাৎ সম্পর্কে অথবা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্পর্কে অথবা মুসা আ.-এর কিতাব প্রাপ্তি সম্পর্কে।
⁵⁰ মুযিহুল কুরআন।
⁵¹ কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার, পৃষ্ঠা ২১২।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফেরআউনের দরবারে সত্যের দাওয়াত

📄 ফেরআউনের দরবারে সত্যের দাওয়াত


যাইহোক। হযরত মুসা আ. ও হারুন আ.-এর মধ্যে যখন পরস্পর সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের পর্ব শেষ হলো। তখন তাঁরা দুজনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, আল্লাহর আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে ফেরআউনের কাছে যাওয়া এবং তাকে আল্লাহর পয়গাম পৌছে দেয়া উচিত।
কতিপয় মুফাস্স্সির লিখেছেন, যখন দুই ভাই ফেরআউনের দরবারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন তাঁদের মা ভালোবাসার আতিশয্যের কারণে তাঁদের যেতে বারণ করতে চাইলেন এবং তাঁদেরকে বললেন, তোমরা এমন ব্যক্তির কাছে যেতে চাচ্ছো, যে রাজসিংহাসন ও রাজমুকুটেরও মালিক আবার জালিম ও অহঙ্কারীও। তোমরা ওখানে যেয়ো না। তোমাদের ওখানে যাওয়া বিফল হবে। কিন্তু মুসা আ. ও হারুন আ. দু-ভাই-ই মাকে বুঝালেন যে, আল্লাহর হুকুম সবসময় অনঢ়, তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করা যায় না। তিনি আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, আমরা সফল হবো।
মোটকথা, উভয় ভাই আল্লাহ তাআলার সত্য নবী ও রাসুল, ফেরআউনের দরবারে পৌঁছলেন। নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্ত মনে তাঁরা ভেতরে প্রবেশ করলেন। ফেরআউনের সিংহাসনের কাছে গিয়ে মুসা ও হারুন আ. তাঁদের আগমনের কারণ বর্ণনা করলেন। যখন কথোপকথন শুরু হলো, তখন তারা বললেন:
'হে ফেরআউন, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর নবী ও রাসুল নিযুক্ত করে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। আমরা তোমার কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাই। একটি এই যে, আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করো এবং কাউকেও তাঁর শরিক ও সমকক্ষ সাব্যস্ত করো না। দ্বিতীয় বিষয় হলো, জুলুম ও অত্যাচার থেকে নিবৃত্ত হও এবং বনি ইসরাইলকে তোমার দাসত্ব থেকে মুক্ত ও স্বাধীন করে দাও। আমরা যা-কিছু তোমাকে বলছি, দৃঢ় বিশ্বাস করো যে, আমরা বানোয়াট ও কৃত্রিম কিছু বলছি না। আমাদের এমন দুঃসাহসও হতে পারে না যে, আমরা আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলবো। আমাদের সত্য প্রমাণের জন্য যেমন আমাদের এই শিক্ষা সাক্ষী রয়েছে তেমনি আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুটি নিদর্শনও (মুজেযা) দান করেছেন। সুতরাং তোমার জন্য এটাই সঙ্গত হবে যে, আল্লাহর এই পয়গামকে কবুল করে নাও এবং বনি ইসরাইলকে মুক্তি দাও। আমরা তাদেরকে নবীগণের দেশে নিয়ে যাবো যেখানে তারা একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইবাদত করবে। তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা করবে না। কেননা, এটাই একমাত্র সত্যপথ এবং তাদের পূর্বপুরুষগণের রীতিনীতি।
এই ঘটনা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَقَالَ مُوسَى يَا فِرْعَوْنُ إِنِّي رَسُولٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ () حَقِيقٌ عَلَى أَنْ لَا أَقُولَ عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقِّ قَدْ جِئْتُكُمْ بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَأَرْسِلْ مَعِيَ بَنِي إِسْرَائِيلَ (سورة الأعراف)
'এবং মুসা বললো, "হে ফেরআউন, আমি তো জগৎসমূহের প্রতিপালকের কাছ থেকে প্রেরিত। এটা স্থির নিশ্চিত যে, আমি আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ব্যতীত বলবো না। (আমার জন্য এটা কখনোই শোভনীয় নয় যে, আমি আল্লাহ তাআলার সম্পর্কে সত্য ব্যতীত অন্যকিছু বলি।) আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ এনেছি, সুতরাং বনি ইসরাইলকে তুমি আমার সঙ্গে যেতে দাও।"' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১০৪-১০৫]
ফেরআউন তাঁদের কথা শুনে বললো, হে মুসা, আজ তুমি নবী সেজে আমার সামনে এসে বনি ইসরাইলের মুক্তি দাবি করছো। সেই দিনগুলো কি ভুলে গেলে যখন তুমি আমার গৃহে লালিত পালিত হয়েছিলে এবং শৈশবের জীবন অতিবাহিত করেছিলেন? আর এ-কথাও কি তুমি ভুলে গেলে যে, তুমি একজন মিসরীয় লোককে হত্যা করে এখান থেকে পলায়ন করেছিলে?

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 তাআলার প্রভুত্ব সম্পর্কে মুসা আ. ও ফেরআউনের বিতর্ক

📄 তাআলার প্রভুত্ব সম্পর্কে মুসা আ. ও ফেরআউনের বিতর্ক


সত্যের বিরোধিতা ও মিথ্যা প্রতিপাদন করবে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আল্লাহর আযাবের যোগ্য বলে সাব্যস্ত হবে।
إِنَّا قَدْ أُوحِيَ إِلَيْنَا أَنَّ الْعَذَابَ عَلَى مَنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى
'আমাদের কাছে ওহি প্রেরণ করা হয়েছে যে, শাস্তি তো তার জন্য যে মিথ্যা আরোপ করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়।' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৪৮।
ফেরআউন আবারো সেই একই প্রশ্নের পুনারবৃত্তি করলো—হে মুসা, তোমাদের উভয়ের রব কে? হযরত মুসা আ. ফেরআউনের এই প্রশ্নের জবাব এমন কথা বললেন যার কোনো উত্তর নেই। ফেরআউন হতভম্ব হয়ে থাকলো এবং দিক বদলে অন্যদিকে মোড় নেয়ার জন্য এমনভাবে চেষ্টা করতে লাগলো যেমন বাতিলপন্থী বিতর্ককারীরা করে থাকে। তাদের রীতি এই যে, সঠিক উত্তর দিতে না পারলে এবং প্রকৃত অবস্থা সামনে এসে পড়লে তখন সেটাকে দমিয়ে দেয়ার জন্য বক্রতা অবলম্বন করে এবং কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে থাকে।
যাইহোক। মুসা আ. বললেন, আমার প্রতিপালক তো সেই একই প্রতিপালক, যিনি দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুকে অস্তিত্ব দান করেছেন। তারপর সব ধরনের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা (যথা: পঞ্চ ইন্দ্রিয়, জ্ঞানশক্তি ইত্যাদি) প্রদান করেছেন এবং তাদের জন্য জীবনের যাবতীয় কর্মের দ্বার উন্মোচিত করে দিয়েছেন। প্রত্যেক বস্তু দেহ ও অস্তিত্বের নেয়ামত দান করেছেন। তারপর সবাইকে পূর্ণতা লাভের পথে চলার জন্য পথপ্রদর্শন করেছেন। তখন ফেরআউন নিরুত্তর হয়ে কথার মোড় এইভাবে ঘুরিয়ে দিলো যে, فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى 'তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কেমন হয়েছে?' তার উদ্দেশ্য ছিলো এই যে, যদি তোমার কথা সঠিক হয়, তবে আমার পূর্বে যারা অতীত হয়ে গেছে, যেমন আমাদের পূর্বপুরুষগণ, তাদের আকিদা তোমার আকিদার অনুকূলে ছিলো না, তাদের সবাই কি শাস্তিতে আক্রান্ত হবে? হযরত মুসা আ. ফেরআউনের বাঁকা আলোচনা বুঝতে পারলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেলো যে, এই ব্যক্তি আসল উদ্দেশ্যকে এলোমেলো করে দিতে চাচ্ছে। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন-
قَالَ عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي فِي كِتَابِ لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنْسَى
'সে বললো, "এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের কাছে কিতাবে আছে। আমার প্রতিপালক ভ্রান্ত হন না এবং বিস্মৃতও হন না।"' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৫২]
অর্থাৎ, এই বিতর্কে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের জন্য যা উচিত তাই হবে। আর এ-বিষয়ের পূর্ণ জ্ঞান আমার প্রতিপালকের কাছে রয়েছে। তাঁর জ্ঞান ত্রুটি ও ভুলের ঊর্ধ্বে। এরপর হযরত মুসা আ. ফেরআউনকে রাব্বুল আলামিনের পরিচয় দান করার উদ্দেশ্যে আলোচনাকে সামনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, এটা কি তোমার সামনে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন নয় যে, তিনি জমিনকে মানুষের জন্য বিছানাস্বরূপ করে দিয়েছেন, তিনি তার মধ্যে নদ-নদী প্রবাহিত করে দিয়েছেন, জমিন থেকে সবুজ বৃক্ষ উৎপন্ন করেছেন এবং সেই বৃক্ষ দ্বারা মানুষ এবং গবাদিপশু সবারই প্রয়োজন পূর্ণ করে দিয়েছেন। তারপর তিনি আরো বলেন, হে ফেরআউন, আল্লাহ তাআলার এসব কাজ যদি তোমার সামনে বিদ্যমান থাকে, তবে এই একই আল্লাহ তাআলাই আমাদের সবার প্রতিপালক ও উপাস্য।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বিবৃত হয়েছে এভাবে-
فَمَنْ رَبُّكُمَا يَا مُوسَى () قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى () قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى () قَالَ عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي فِي كِتَابٍ لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنْسَى () الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْ نَبَاتٍ شَتَّى () كُلُوا وَارْعَوْا أَنْعَامَكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِأُولِي النُّهَى () مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى (سورة طه)
'ফেরআউন বললো, "হে মুসা, তবে তোমাদের প্রতিপালক কে?" মুসা বললো, "আমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, তারপর পথনির্দেশ করেছেন।" ফেরআউন বললো, "তবে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী?" মুসা বললো, "এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের কাছে কিতাবে আছে। আমার প্রতিপালক ভ্রান্ত হন না এবং বিস্মৃতও হন না। যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে করেছেন বিছানা এবং তাতে করে দিয়েছেন তোমাদের চলার পথ এবং আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন এবং তার দ্বারা আমি বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি। তোমরা আহার করো ও তোমাদের গবাদি পশু চরাও; অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে বিবেকসম্পন্নদের জন্য। আমি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেবো এবং তা থেকে তোমাদেরকে পুনরায় বের করবো।' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৪৯-৫৫]
হিন্দুস্তানের একজন সমসাময়িক বিখ্যাত আলেম সুরা তোয়া-হার أَعْطَى كُلِّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন, তারপর (জীবন ও কর্মের) পথনির্দেশ করেছেন' আয়াতে হেদায়েত শব্দের অর্থ 'ইন্দ্রিয়সমূহ ও জ্ঞান-বুদ্ধিকে পথ প্রদর্শন করা' অর্থ মেনে নিয়ে মুফাস্সিরগণকে অনর্থক তিরস্কারের পাত্র বানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, মুফাস্সিরগণ কুরআন মাজিদের আলোচ্য আয়াতের প্রাণবস্তুর সন্ধান না পেয়ে এখানেও হেদায়েত-এর অর্থ গ্রহণ করেছেন দীন ও মাযহাবের হেদায়েত। আর যেনো শুধু তিনিই প্রথম এই প্রাণবস্তুটিকে চিনতে পেরেছেন এবং তার মূলতত্ত্ব জানতে পেরেছেন। অথচ কয়েকজন মুফাস্সির ছাড়া অতীত ও বর্তমানের অধিকাংশ মুফাস্সির ও তত্ত্বজ্ঞানী এ-ক্ষেত্রে সে-অর্থই বর্ণনা করেছেন যাকে পরিষ্কার ও স্বভাবজাত বলা হয়েছে। ⁵⁵
মুফাস্সির উলামায়ের কেরাম বলেন, ফেরআউন ও মুসা আ.-এর মধ্যে এসব কথোপকথনে হযরত হারুন আ. দোভাষী হিসেবে থাকতেন। আর মুসা আ.-এর প্রমাণগুলোকে অত্যন্ত মার্জিত ও বিশুদ্ধ ভাষায় পেশ করতেন।
যাইহোক। বিভিন্ন মজলিসে হযরত মুসা আ. ও ফেরআউনের মধ্যে বিতর্কের এই ধারা অব্যাহত থাকলো। ফেরআউন হযরত মুসা ও হারুন আ.-এর উজ্জ্বল প্রমাণ ও প্রকৃত দলিলসমূহ শুনে হতভম্ব হয়ে যেতো এবং ভেতরে ভেতরে খুব রেগে উঠতো, কিন্তু নিরুত্তর হয়ে পড়ার কারণে হযরত মুসা আ. থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় স্থির করতে পারতো না। সে জানতো যে, তার খোদা হওয়ার ভিত্তি এতো দুর্বল যে তা মুসা আ.-এর প্রমাণসমূহের সামনে মাকড়সার জালের মতো ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সভাসদরা এসব বিষয় ভালোভাবে বুঝতো। তাই ফেরআউনের পক্ষে তা অত্যন্ত অসহনীয় ছিলো। বিশেষত, যে-রাজ্যের মধ্যে রাজকীয় প্রতাপ ও রাজত্বের আড়ম্বরের সঙ্গে সঙ্গে খোদা হওয়ার সম্মান ও মর্যাদাও প্রদান করা হয়, সেখানে মুসা ও হারুন আ.-এর সত্য প্রচারের এই দুঃসাহস ফেরআউনে ভেতরে ভেতরে খুব ভীত ও ব্যাকুল করে তুলেছিলো। তাই সে তখন বিতর্কের ধারা সমাপ্ত করার জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলো। এসব পন্থার মধ্যে ছিলো নিজের শক্তি ও ক্রোধের প্রকাশ, মিসরীয় সম্প্রদায়কে মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলা, রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করে এই বিতর্ক ও আলোচনার অবসান ঘটিয়ে দেয়া ইত্যাদি। সে তার সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললো-
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرِي
'এবং ফেরআউন (তার সভাসদবৃন্দের উদ্দেশে) বললো, “হে পারিষদবর্গ, আমি ব্যতীত তোমাদের অন্যকোনো ইলাহ আছে বলে জানি না।” [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৮।
তারপর তার মন্ত্রী হামানকে নির্দেশ দিলো-
فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ
"হে হামান, তুমি আমার ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রসাদ নির্মাণ করো; হয়তো আমি তাতে উঠে মুসার ইলাহকে দেখতে পারি। তবে আমি অবশ্য মনে করি সে মিথ্যাবাদী।"' [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৮]

টিকাঃ
⁵⁵ ثم هدى إلى طريق الانتفاع والارتفاق بما اعطاه وعرفه كيف يتوصل إلى بقائه وكماله أما اختيارا كما في الحيوانات أو طبعا كما في الجمادات والقوى الطبيعية النباتية والحيوانية أروح المعاني في تفسير القرآن العظيم والسبع المثاني، أبو الثناء شهاب الدين الألوسي : [দুবয়ন]

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হামান

📄 হামান


وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ () أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا وَكَذَلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوءُ عَمَلِهِ وَصُدٌ عَنِ السَّبِيلِ وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ إِلَّا فِي تَبَابٍ (سورة مؤمن)
"ফেরআউন বললো, "হে হামান, তুমি আমার জন্য নির্মাণ করো এক সুউচ্চ প্রাসাদ, যাতে আমি পাই অবলম্বন-অবলম্বন আসমানে আরোহণের, যেনো আমি দেখতে পাই মুসার ইলাহকে; তবে আমি তো তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি।" এভাবে ফেরআউনের কাছে শোভনীয় করা হয়েছিলো তার মন্দকাজকে এবং তাকে (খারাপ কাজের ওপর হঠকারিতা করার কারণে) নিবৃত্ত করা হয়েছিলো সরল পথ থেকে এবং ফেরআউনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছিলো সম্পূর্ণরূপে।' [সুরা মুমিন: আয়াত ৩৬- ৩৭]
হযরত শাহ আবদুল কাদির রহ. তাঁর মুযিহুল কুরআন-এ বলেন, ফেরআউনের مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرِي 'আমি ব্যতীত তোমাদের অন্যকোনো ইলাহ আছে বলে জানি না' থেকে বুঝা যায় ফেরআউন নাস্তিক ছিলো। তাফসির ও ইতিহাসের কিতাবে প্রাচীন মিসরের যেসব ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ উদ্ধৃত করা হয়েছে, তা থেকেও এই সন্ধানই পাওয়া যায় যে, মিসরবাসীরা দেব-দেবীর পূজক ছিলো। তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা ছিলো 'আমিনরা' অর্থাৎ সূর্যদেবতা। তারা কোনো অর্থেই এক খোদা বা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিলো না; তারা বরং গোটা বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্ম ও তাদের সব ধরনের চাল-চলন ও কার্যাবলির সম্পর্ক গ্রহ ও নক্ষত্ররাশি এবং সেই দেবতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করতো। খুব সম্ভব ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ভারতের জৈন মতাদর্শের কাছাকাছি ছিলো। কেননা, জৈনরা খোদা বিশ্বাস করে না; কিন্তু দেব- দেবীর পূজা করে।
হামান সম্পর্কে কুরআন মাজিদ পরিষ্কার কোনো বর্ণনা দেয় নি যে, এটা কি কোনো ব্যক্তির নাম না পদের নাম। আর হামান ব্যক্তিবিশেষের নাম হয়ে থাকলে ফেরআউনের দরবারে তার কী পদ ছিলো। কুরআন এ- বিষয়েও আলোকপাত করে নি যে, ফেরআউনের নির্দেশ অনুসারে হামান উচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলো কি-না আর ফেরআউন তার ওপর আরোহণ করে কী করেছিলো। কেননা, এ-বিষয়গুলো পবিত্র কুরআনের মৌলিক উদ্দেশ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ছিলো না। তাওরাতও এ-বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত দেয় নি, এমনকি তাওরাতে ফেরআউনের প্রাসাদ নির্মাণের আদেশেরও উল্লেখ করা হয় নি। অবশ্য মুফাস্সিরগণ এই কাহিনি উদ্ধৃত করেছেন যে, হামান অতি উচ্চ এক মিনারা নির্মাণ করে (ফরআউনকে জানালো। ফেরআউন তীর-ধনুক নিয়ে মিনারায় আরোহণ করলো এবং আকাশের দিকে লক্ষ করে তীর ছুড়লো। আল্লাহ তাআলার কুদরতের ফয়সালা অনুযায়ী সেই তীরটির অগ্রভাগ রক্তমাখা হয়ে এলো। ফেরআউন তা দেখে গর্ব ও অহঙ্কারের সঙ্গে মিসরবাসীকে বললো, নাও, এখন আমি মুসার খোদারও কর্ম খতম করে দিয়েছি। এই কাহিনির সত্যতা আল্লাহপাকই ভালো জানেন।
ফেরআউন তার পারিষদবর্গ, সাধারণ কিবতি সম্প্রদায় এবং হামানের কাছে হযরত মুসা আ.-এর মোকাবিলায় নিজের পরাজয় ঢেকে রাখার জন্য যদিও উপরিউক্ত পন্থা অবলম্বন করেছিলো, কিন্তু সে নিজেও বুঝতো যে তা প্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। এতে সাধারণ মানুষের অন্তরে সান্ত্বনা আসতে পারে না। খুব সম্ভব বহু সংখ্যক মিসরীয় এসব ব্যাপার বুঝতো। তারপরও সভাসদবৃন্দ, বিশিষ্ট ও সাধারণ মানুষের এমন একজন বিবেচনাবোধসম্পন্ন লোকও ছিলো না যে সাহসও সত্যকে গ্রহণের সঙ্গে এই সত্যের ঘোষণা করে দেয় এবং হেদায়েত ও নসিহত কবুলের দ্বার উন্মোচিত করে দেয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00