📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মাদয়ানের পানি

📄 মাদয়ানের পানি


হযরত মুসা আ. মাদয়ানের মাটিতে পদার্পণ করলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, কূপের সামনে পানি পান করানোর জায়গার ওপর অসম্ভব ভিড় লেগে রয়েছে। লোকেরা তাদের গৃহপালিত পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছে। কিন্তু এই ভিড়ের একটু দূরে দুটি বালিকা দাঁড়িয়ে আছে এবং তাদের পশুগুলোকে পানির দিকে যেতে বারণ করছে।
হযরত মুসা আ. বুঝে ফেললেন যে, এখানেও সেসব কর্মকাণ্ডই হচ্ছে যা দুনিয়ার জালিম শক্তিগুলো করে যাচ্ছে। তারা আল্লাহ তাআলার উত্তম বিধানকে লঙ্ঘন করে সম্প্রদায়গুলোর যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও শৃঙ্খলাকেও জুলুমের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। মনে হয়, বালিকা দুটি কোনো দুর্বল পরিবারের সদস্য। সে-কারণেই তাদেরকে এভাবে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শক্তিশালী লোক ও জালিমেরা তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে তৃপ্ত করিয়ে নেয়ার পর এবং যত লোক এখানে পানি পান করাতে এসেছে তাদের সবাই পানির কাছ থেকে চলে যাওয়ার পর অবশিষ্ট পানি যা-কিছু থাকবে তা সেসব দুর্বলের পশুগুলোর অংশ হবে। দুর্বলের জন্য প্রত্যেক শক্তিমান এই বিধানই সাব্যস্ত করে রেখেছে যে, প্রতিটি স্বার্থ ও লাভের বেলায় অগ্রাধিকার থাকবে শক্তিমানদের এবং দুর্বলদের পালা আসবে পরে। আর সবলদের খাওয়ার পালা আসবে সবার আগে। যেমন: আরবের বিখ্যাত কবি আমর বিন কুলসুম বলেন—
ونشرب إن وردنا الماء صفوا ويشرب غيرنا كدرا وطينا
'আমরা যখন কোনো পানির কাছে যাই তখন উত্তম ও পরিষ্কার পানি পান করি। আর আমরা ছাড়া অন্যরা (যারা আমাদের চেয়ে দুর্বল) পান করে ঘোলা পানি ও মাটি।'²¹
এই কবিতাটি প্রকৃতপক্ষে আমর বিন কুলসুম ও তাঁর গোত্রের অবস্থারই প্রতীক নয়; বরং তা হুবহু আয়নার মতো গোটা দুনিয়ার অত্যাচারী শাসনের চিত্র।
যাইহোক। হযরত মুসা আ. এই অবস্থা বরদাশত করতে পারলেন না। তিনি একটু এগিয়ে গিয়ে বালিকা দুটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা তোমাদের পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছো না কেনো? তারা দুজনই জবাব দিলো, আমরা দুর্বল ও অক্ষম। পশুগুলোকে নিয়ে অগ্রসর হলে এই শক্তিমানেরা পেছন থেকে আমাদের হটিয়ে দেয়। আর আমাদের পিতা একজন বৃদ্ধ ও দুর্বল। তাঁর এখন এই শক্তি নেই যে, তিনি শক্তিমানদের এই ভিড় সরিয়ে সামনে অগ্রসর হন। কাজেই যখন এরা পানি পান করিয়ে চলে যাবে, তখন অবশিষ্ট পানি যা কিছু থাকবে তা-ই আমরা আমাদের পশুদেরকে পান করিয়ে বাড়ি ফিরবো। এটাই আমাদের প্রাত্যহিক নিয়ম।
এসব কথা শুনে মুসা আ. উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এবং ভেড়ার গোটা পালসহ ভিড় সরিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে কূপের কাছে পৌঁছলেন। তিনি কূপের বড় বালতিটি নিয়ে কূপে ফেললেন এবং পানি ভর্তি করে একাই টেনে তুললেন। এভাবে তিনি বালিকা দুটির পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে দিলেন। হযরত মুসা আ. যখন মানুষের ভিড় ঠেলে নির্ভীকতার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করতে লাগলেন, তখন যদিও তা উপস্থিত লোকদের মনে অসন্তোষ ও বিরক্তির ভাব উদ্রেক করেছিলো, কিন্তু তার গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারা ও দৈহিক শক্তি দেখে সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। এরপর মুসা আ.-কে পানির বড় বালতিটি একাকী টেনে তুলতে দেখে সে-শক্তির সামনেই পরাভব স্বীকার করে, যে-শক্তির মদে মত্ত থেকে দুর্বল ও অক্ষমদেরকে পেছনে হটিয়ে দিতো এবং তাদের প্রয়োজনকে পদদলিত করে ছাড়তো।
কোনো কোনো মুফাস্সির মনে করেন, হযরত মুসা আ. দেখলেন কূপের মুখে একটি বিরাটকায় পাথর ঢাকা দিয়ে রয়েছে। একদল লোক একসঙ্গে শক্তি প্রয়োগ করলে পাথরটিকে তার জায়গা থেকে সরানো যেতে পারে। কিন্তু তিনিই অগ্রসর হলেন এবং একাকীই পাথরটিকে সরিয়ে বালিকা দুটির পশুগুলোর জন্য পানি পূর্ণ করে দিলেন।
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, এই উক্তিটি কুরআন মাজিদের বর্ণনার বিরোধী। কারণ, কুরআন মাজিদ বলে- وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ يَسْقُونَ (سورة القصص) 'যখন সে (মুসা) মাদয়ানের কূপের কাছে পৌঁছলো, দেখলো, একদল লোক তাদের পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছে।' [সুরা কাসাস: আয়াত ২৩]
তবে এ-কথা কেমন করে শুদ্ধ হতে পারে যে, কূপের মুখ পাথর দিয়ে ঢাকা ছিলো। এই উক্তি যেমন শুদ্ধ ও সঠিক নয় তেমনি এ-ব্যাখ্যাও ঠিক নয় যে, ওখানে দুটি কূপ ছিলো। একটি থেকে মাদয়ানের লোকেরা তাদের পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছিলো আর অপর কূপটির মুখ পাথর দিয়ে ঢাকা ছিলো। আর এই বর্তমান যুগে ওখানে দুটি কূপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
ওখানে দুটি কূপ থাকার ব্যাখ্যাটি শুদ্ধ ও সঠিক না হওয়ার কারণ এই যে, প্রথমত, কুরআন মাজিদ আর-একটি কূপের কথা আদৌ উল্লেখ করে নি এবং যা-কিছু বর্ণনা করেছে এই কূপের সম্পর্কেই বর্ণনা করেছে। দ্বিতীয়ত, পরবর্তীকালে ওই জায়গায় দুটি কূপ বিদ্যমান থাকার দ্বারা এটা অবধারিত হয় না যে, তৎকালেও ওখানে এমনই দুটিই কূপ ছিলো। সম্ভবত দীর্ঘকাল পরে বা ইসলামি যুগে প্রয়োজনের কারণে ওখানে দ্বিতীয় কূপটি খনন করে নেয়া হয়েছে। সুতরাং কুরআন মাজিদের পরিষ্কার ও সাদাসিধে বর্ণনাকে শুধু একটি নির্ভর-অযোগ্য রেয়ায়েতের খাতিরে জটিল বানিয়ে নেয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অসঙ্গত।
মোটকথা, তখন সেই বালিকা দুটির ভেড়ার পাল পানি পান করলো এবং তারা বাড়ির দিকে চলে গেলো। প্রতিদিনের অভ্যাসের বিপরীত তাড়াতাড়ি ফিরে আসার কারণে বালিকা দুটির পিতা অত্যন্ত আশ্চর্য হলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা পুরো ঘটনা খুলে বললো। কেমন করে জনৈক মিসরীয় লোক তাদেরকে সাহায্য করেছে। পিতা বালিকা দুজনের একজনকে বললেন, শিগগিরই যাও, তাকে এখনই আমার কাছে নিয়ে এসো।
এদিকে পিতা ও কন্যাদের মধ্যে এ-ধরনের কথাবার্তা হচ্ছিলো আর ওদিকে হযরত মুসা আ. পানি পান করানোর পর কাছেই একটি গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একে তো সফরের ক্লান্তি, তার ওপর ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্বালা। হযরত মুসা আ. প্রার্থনা করলেন, 'হে আমার প্রতিপালক, এ-সময়ে উত্তম সরঞ্জাম তা-ই যা আপনি নিজ কুদরতে আমার জন্য নাযিল করবেন, আমি তার কাঙাল।'
বালিকা ওখানে পৌছে দেখলো কূপের কাছেই তিনি বসে আছেন। লজ্জায় দৃষ্টি অবনত করে বালিকা বললো, আপনি আমাদের বাড়িতে চলুন। আমাদের পিতা আপনাকে ডাকছেন। তিনি আমাদের প্রতি আপনার অনুগ্রহের বিনিময় প্রদান করবেন। হযরত মুসা আ. ভাবলেন, হয়তো এই সুযোগে কোনো উপায়ের দেখা পাওয়া যেতে পারে। এখন যাওয়াই উচিত, তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করা সঙ্গত নয়। আল্লাহপাক যে আমার দোয়া কবুল করেছে এটা তারই সূচনা। হযরত মুসা আ. উঠে দাঁড়ালেন এবং বালিকাকে বললেন, তুমি আমার চলো না; বরং আমার পেছনে চলো এবং ইশারা-ইঙ্গিতে আমাকে পথ দেখিয়ে দাও।
মুসা আ. সম্মানিত ব্যক্তির বাড়ির দিকে যাত্রা তো কললেন, কিন্তু তিনি স্বভাবগত মর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মানের প্রতি লক্ষ করে বার বার বালিকাটির এ-কথা মনে করে দুঃখ পাচ্ছিলেন যে, আমার পিতা আপনার এই পরিশ্রমের বিনিময় দিতে চান। কিন্তু সফর ও তাঁর অবস্থার সঙ্কটময়তা শেষ পর্যন্ত তাঁকে এই পরামর্শই দিলো যে, এখন এই অপছন্দনীয় কাজটাকেই সহ্য করে নাও। তাতে এই নিঃসঙ্গতার সময়ে একজন সহানুভূতিশীল সান্ত্বনাদাতা বন্ধুর স্বতন্ত্র সমবেদনা লাভ করা যেতে পারে।
হযরত মুসা আ. চলতে চলতে গন্তব্যস্থানে এসে পৌঁছলেন। তিনি গঠন ও স্বভাব-চরিত্রে বুযুর্গ ব্যক্তি ও বালিকা দুজনের পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করলেন। বুযুর্গ ব্যক্তি প্রথমে তাঁকে খাবার খাওয়ালেন। তারপর নিশ্চিন্ত মনে বসিয়ে তাঁর যাবতীয় অবস্থা শুনলেন। হযরত মুসা আ. পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তাঁর নিজের জীবনবৃত্তান্ত এবং বনি ইসরাইলের ওপর ফেরআউনের নানাবিধ অত্যাচার ও নিপীড়নের বর্ণনা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনা বিস্তারিত শুনালেন। সবকিছু শোনার পর বুযুর্গ ব্যক্তি মুসা আ.-কে সান্ত্বনা দিলেন এবং আল্লাহ তাআলার শোকর, এখন তুমি জালিমদের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেছো, কোনো ভয়ের কারণ নেই।
এখানে অত্যাচারীদের অত্যাচার ও জালিমদের জুলুম বলতে বনি ইসরাইলের শিশুদেরকে হত্যা, বনি ইসরাইলকে দাস বানিয়ে রাখা, তাদের নানা ধরনের দুর্দশা ও যন্ত্রণার মধ্যে আবদ্ধ রাখার ঘটনাবলিই উদ্দেশ্য হতে পারে। তা ছাড়া তাদের কুফর এবং ভূপৃষ্ঠে ফেতনা-ফাসাদ ও অনর্থ বিস্তার করাও উদ্দেশ্য হতে পারে। অন্যথায় কিবতি লোকটিকে হত্যা করে ফেলার ব্যাপারে মুসা আ. নিজের কাজে জন্য অনুতপ্ত ছিলেন এবং নিজেকে দোষী মনে করতেন।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে- وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدْيَنَ قَالَ عَسَى رَبِّي أَنْ يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ () وَلَمَّا وَرَدَ مَاءً مدينَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَذُودَانِ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّى يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ () فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظَّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ () فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاء قَالَتْ إِنْ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا فَلَمَّا جَاءَهُ وقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ (سورة القصص)
'যখন মুসা মাদয়ান অভিমুখে যাত্রা করলো তখন বললো, আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন। যখন সে মাদয়ানের কূপের কাছে পৌছলো, দেখলো, একদল লোক তাদের (গৃহপালিত) পশুগুলোকে পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের পেছনে দুইজন নারী তাদের পশুগুলোকে আগলাচ্ছে (পানির কাছে যেতে বারণ করছে)। মুসা বললো, "তোমাদের কী ব্যাপার?" তারা বললো, "আমরা আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ রাখালেরা তাদের জানোয়ারগুলোকে নিয়ে সরে যায়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ।” মুসা তখন তাদের পক্ষে পশুগুলোকে পানি পান করালো। তারপর সে ছায়ার নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে বললো, “হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমার প্রতি যে-অনুগ্রহ করবে আমি তার কাঙাল।" তখন নারী দুজনের একজন লজ্জা-জড়িত চরণে তার কাছে এলো এবং বললো, 'আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ করছেন, আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করানোর পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য।" তখন মুসা তার কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলো। সে বললো, "ভয় করো না, তুমি জালিম সম্প্রদায়ের কবল থেকে বেঁচে গেছো।"' [সুরা কাসাস আয়াত ২২-২৫]
তাওরাতে এখানেও দুটি জায়গায় মতভিন্নতা রয়েছে:
ক. তাওরাত বালিকাদের সংখ্যা দুইয়ের জায়গায় সাত বলেছে। খ. তাওরাত বলে, বালিকারা পানি উঠিয়ে হাউজ পূর্ণ নিয়েছিলো। কিন্তু অন্য লোকেরা বল প্রয়োগ করে বালিকাদের হটিয়ে দিয়ে নিজেদের পশুগুলোকে পান পান করাতে শুরু করে দিলো। এই কাণ্ড দেখে হযরত মুসা আ. ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন।
এখানেও আমাদের কুরআন মাজিদের বর্ণনাকেই নির্ভরযোগ্য মনে করা কর্তব্য। প্রথমত এইজন যে, পূর্ববর্তী মতভিন্নতার জায়গাগুলোতে কুরআনের বর্ণনাকেই যুক্তিযুক্ত এবং স্বাভাবিকতার অনুরূপ দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত এইজন্য যে, এখানেও সংখ্যার ব্যাপারটি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও তাওরাতের অন্যান্য বিষয় এ-কারণে সঠিক নয় যে, বালিকাদের মাদয়ান গোত্রের এবং সেই বসতিরই বাসিন্দা বলে মনে হয়। কূপের জায়গায় এ-ধরনের ঘটনা দৈনিকই তাদের সঙ্গে ঘটতো। সুতরাং তাদের জানা ছিলো যে, এই শক্তিবানের দল কোনোক্রমেই তাদেরকে অগ্রসর হতে দেবে না। আর আরব দেশের কবিদের কথা থেকেও এটাই প্রকাশ পায় যে, পানির ব্যাপারে তাদের দেশে দুর্বলদের ওপর শক্তিশালীদের অগ্রাধিকার ছিলো। শুধু আরব কেনো, গোটা দুনিয়ার প্রতিটি অংশে এই অবস্থাই বিরাজমান ছিলো। সুতরাং, বালিকারা পানি পান করানোর জায়গায় অগ্রসর হওয়ার সাহস কী করে করতে পারতো। সঠিক কথা এটাই যে, তারা দুর্বল পরিবারের লোক ছিলো। তা ছাড়া মেয়েলোক হওয়ার কারণে এতটুকুতেই তৃপ্ত থাকতো যে, সবাই পানি পান করিয়ে চলে গেলে উদ্বৃত্ত পানিতে নিজেদের কাজ চালিয়ে নিতো।
বাকি থাকলো বালিকাদের সংখ্যার বিষয়টি। বালিকাদের সংখ্যার ব্যাপারে ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. দুটি বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে লিখেছেন, সম্ভবত মাদয়ানের সেই সম্মানিত ব্যক্তি সাতটি কন্যাই ছিলো। যেমন তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মাদয়ানের পানির কাছে যে-ঘটনা ঘটেছিলো ওখানে দুটি কন্যাই উপস্থিত ছিলো। যেমন, কুরআন মাজিদের বর্ণনায় স্পষ্ট রয়েছে।

টিকাঃ
²¹ পঙ্ক্তি দুটি কবির الا هي بصحنك فاصبحنا নামক মুআল্লাকার অন্তর্গত।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বৃদ্ধ ব্যক্তি সঙ্গে শ্বশুর-জামাতা সম্পর্ক

📄 বৃদ্ধ ব্যক্তি সঙ্গে শ্বশুর-জামাতা সম্পর্ক


হযরত মুসা আ. এবং মাদয়ান গোত্রের বুযুর্গ মেজবানের মধ্যে এ-ধরনের কথাবার্তা চলছিলো। এ-সময় বৃদ্ধের কন্যা, যে মুসা আ.-কে ডেকে আনতে গিয়েছিলো, তাঁর পিতাকে বললো, আব্বা, আপনি এই মেহমানকে আপনার গৃহপালিত পশুগুলোকে চরানোর জন্য এবং তাদের পানি সংগ্রহ করার জন্য মজদুর নিযুক্ত করুন। মজদুর হিসেবে এমন ব্যক্তিই ভালো যিনি শক্তিশালীও এবং আমানতদারও হয়।
মুফাস্সিরগণ বলেন, কন্যার এই উক্তি পিতার কাছে একটু বিস্ময়কর মনে হলো। তিনি কন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই মেহমানের শক্তি ও আমানতদারি কীভাবে জানতে পারলে? কন্যা জবাব দিলো, আমি মেহমানের দৈহিক শক্তি তো এ থেকেই অনুমান করেছি যে, তিনি কূপের বড় বালতিটি পানি ভর্তি করে একাই টেনে তুললেন। আর আমানতদারির পরীক্ষা তো এ থেকে করলাম, যখন আমি তাকে ডাকতে গেলাম তখন তিনি আমাকে দেখামাত্র দৃষ্টি অবনত করে নিলেন এবং কথাবার্তা বলার সময় তিনি একবারও আমার দিকে মাথা উঠিয়ে তাকান নি। আর যখন বাড়ির দিকে আসতে শুরু করলাম, তখন তিনি আমাকে তাঁর পেছনে চলতে বললেন এবং শুধু ইশারা- ইঙ্গিতে আমি তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এলাম।²²
বৃদ্ধ পিতা কন্যার এসব কথা শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি মুসা আ.-কে বললেন, “যদি তুমি আট বছর আমার কাছে থেকে আমার বকরি-ভেড়া চরাও, তবে আমি আমার এই কন্যাটিকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। আর যদি তুমি এই মেয়াদকে আরো দুই বছর বাড়িয়ে দশ বছর পূর্ণ করো, তবে আরো উত্তম হবে। এটাই হবে এই কন্যার মোহর।” হযরত মুসা আ. এই শর্ত কবুল করে নিলেন এবং বললেন, “আমার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিন, আমি উল্লিখিত মেয়াদের যেটি ইচ্ছা হয় পূর্ণ করবো। আপনার পক্ষ থেকে এ-বিষয়ে কোনো বাধ্য-বাধকতা থাকবে না।” উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির পর মাদায়েনের বৃদ্ধ ব্যক্তি উল্লিখিত মেয়াদকে মোহর সাব্যস্ত করে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে তাঁর সেই কন্যাটিকে বিয়ে দিয়ে দিলেন।
কোনো কোনো তাফসীরকারের মতে এই যে, শ্রমের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিবাহবন্ধন সম্পন্ন হয়েছিল এবং আপন সম্পদ হওয়ার পরক্ষণেই মুসা আ. তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মাদায়েন ত্যাগ করেছিলেন। মুফাসসিরগণ মুসা আ.-এর স্ত্রীর নাম সাফুরা বলেছেন।
ঘটনার এই অংশটুকু কুরআন মাজিদ বর্ণিত হয়েছে এভাবে—
قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ ( قَالَ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُنْكِحَكَ إِحْدَى ابْنَتَيَّ هَاتَيْنِ عَلَى أَنْ تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَمْرًا فَمِنْ عِنْدِكَ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَشُقَّ عَلَيْكَ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ ) قَالَ ذَلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ أَيَّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلا عُدْوَانَ عَلَيَّ وَاللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلُ (سورة القصص)
তাদের (কন্যা দুজনের) একজন বললো, হে পিতা, তুমি একে (এই মেহমানকে) মজুর নিযুক্ত করো, কারণ তোমার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত।” সে ( কন্যার পিতা) মুসাকে বললো, "আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাই, এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করবে, যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ করো, সে তোমার ইচ্ছা (তাহলে তা উত্তম হয়)। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তুমি আমাকে সদাচারী পাবে।" মুসা বললো, "আমার ও আপনার মধ্যে এই চুক্তিই থাকলো। এই দুটি মেয়াদের কোনো একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকবে না (আমার প্রতি কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করা হবে না)। আমরা যে-বিষয়ে কথা বলছি আল্লাহ তার সাক্ষী।" (সুরা কাসাস: ২৬-২৮)
فَلَبِثْتَ سِنِينَ فِي أَهْلِ مَدْيَنَ ثُمَّ جِئْتَ عَلَى قَدَرٍ يَا مُوسَى () وَاصْطَنَعْتُكَ لِنَفْسِي (আল্লাহপাক বলেন,) "তারপর তুমি কয়েক বছর মাদয়ানবাসীদের মধ্যে ছিলে, হে মুসা, এরপর তুমি নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলে। এবং আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য প্রস্তুত করে নিয়েছি।" (সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৪০-৪১)

টিকাঃ
²² জামে’ আল-বায়ান আন তা’বীল আয়িল কুরআন, আবু জাফর মুহাম্মাদ বিন জারির আত-তাবারি, সূরা কাসাস।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 মুসা আ.-এর শ্বশুর কে?

📄 মুসা আ.-এর শ্বশুর কে?


কুরআন মাজিদ হযরত মুসা আ. এবং মাদয়ানের বুযুর্গ বৃদ্ধ ব্যক্তি সম্পর্কে যেসব ঘটনা বর্ণনা করেছে, তার মধ্যে কোনো এক স্থানের বৃদ্ধের নাম উল্লেখ করা হয় নি। এ-কারণে ঐতিহাসিক বিবেচনায় মাদয়ানের বৃদ্ধের নাম সম্পর্কে ইতিহাসবেত্তা ও মুফাস্স্সিরগণের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের বক্তব্য পাওয়া যায়। নিম্নে সেগুলো আলোচিত হলো:
১। মুফাস্সিরগণ, জীবনচরিত লেখকগণ, আরবের সাহিত্যিকগণের বিরাট একটি অংশ ধারণা করেন যে, ইনি হযরত শুআইব আ.। এই মতটি খুবই প্রসিদ্ধ এবং ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
বিখ্যাত মুফাস্সির ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি রহ. হাসান বসরি রহ. থেকে এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, "লোকে বলে, মুসা আ.-এর শ্বশুর হযরত শুআইব আ."²³
হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেন, হাসান বসরি রহ.-এর ঝোঁক এ-দিকেই যে, মাদয়ানের বুযুর্গ বৃদ্ধ ছিলেন হযরত শুআইব আ.। ইবনে কাসির আরও বলেন, ইবনে আবি হাতিম পূর্ণ সনদ উল্লেখ করার সঙ্গে মালিক বিন আনাস রহ. থেকে রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, তাঁর কাছে এ-বিষয়টি পৌছেছে, "হযরত মুসা আ.-এর শ্বশুর ছিলেন হযরত শুআইব আ.। "²⁴
২। উলামাগণের এক অংশ বলেন, কুরআনে উল্লিখিত বৃদ্ধের নাম 'ইয়াসরুন' এবং ইনি ছিলেন হযরত শুআইব আ.-এর ভাতিজা। ইমাম আবু জাফর আত-তাবারি সনদের সঙ্গে একটি রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জারাহ রা. বলতেন, যে-বৃদ্ধ হযরত মুসা আ.-কে শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলেন তিনি ছিলেন হযরত শুআইব আ.-এর ভাতিজা 'ইয়াসরুন'। ²⁵
৩। আবার কেউ কেউ বলেন, হযরত মুসা আ.-এর শ্বশুরের নাম ছিলো ইয়াসরি। ইমাম তাবারি রহ. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে সনদসহ রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, মুসা আ.-কে শ্রমিক নিযুক্তকারী মাদয়ানের বুযুর্গ বৃদ্ধের নাম ছিলো ইয়াসরি। আর এই রেওয়াতেরই অন্য শব্দগুলো এই, "স্ত্রীলোকটির পিতার নাম ছিলো ইয়াসরি।" কিন্তু 'ইয়াসরি'-যুক্ত রেওয়ায়েতটিতে এ-কথা বলা হয় নি যে তিনি হযরত শুআইব আ.-এর ভাতিজা ছিলেন। ²⁶ আর তাওরাতে এ-রেওয়ায়েতে বর্ণিত নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম, 'ইয়াসরু' বলা হয়েছে।'
৪। কেউ কেউ বলেন, এই বৃদ্ধ হযরত শুআইব আ.-এরই কওমের একজন মুমিন ব্যক্তি ছিলেন। ²⁷
৫। উলামাগণের আর একটি জামাত ধারণা করেন যে, এই বৃদ্ধ হযরত শুআইব আ.-ও হতে পারেন না এবং তাঁর ভাতিজাও হতে পারেন না। কেননা, কুরআন মাজিদ থেকে জানা যায় যে, হযরত শুআইব আ.-এর যুগ হযরত মুসা আ.-এর বহু পূর্বের যুগ। উভয় যুগের মধ্যে কয়েকশো বছর ব্যবধান। কুরআন মাজিদ বলে, হযরত শুআইব আ. তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বলেছিলেন—
وَمَا قَوْمُ لُوطٍ مِنْكُمْ بَعِيدٍ (سورة هود) 'আর লুতের সম্প্রদায় (-এর ঘটনা) তোমাদের থেকে দূরে নয়।' (সুরা হুদ : আয়াত ৮৯]
এটা স্পষ্ট বিষয় যে, হযরত লুত আ.-এর সম্প্রদায়ের ধ্বংস হযরত ইবরাহিম আ.-এর যুগে হয়েছিলো। আর হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত মুসা আ.-এর মধ্যবর্তী সময়সীমা ছিলো চারশো বছরেরও বেশি। আর যাঁরা এই সময়সীমাকে নিকটতম করে দেয়ার জন্য বলেছেন যে, হযরত শুআইব আ.-এর বয়স অসাধারণ রকম দীর্ঘ হয়েছিলো, তাঁদের এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। ²⁸
এই বক্তব্যের সমর্থনের জন্য এটিও একটি শক্তিশালী দলিল যে, হযরত মুসা আ.-এর শ্বশুর যদি হযরত শুআইব আ.-ই হতেন তাহলে অবশ্যই কুরআন তাঁর না উল্লেখ করতো। এভাবে অস্পষ্ট রেখে দিতো না। ²⁹
এই বিভিন্ন ধরনের পাঁচটি বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর আমাদের মতে প্রবল ও বিশুদ্ধ অভিমত এটাই মনে হয় যা ইবনে জারির আত-তাবারি ও ইবনে কাসির রহ.-এর মতো উচ্চ মর্যাদাশীল মুহাদ্দিসগণ ও মুফাস্সিরগণ অবলম্বন করেছেন। তাঁরা বলেন, নাম স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার ব্যাপারে কোনো সহিহ রেওয়ায়েত পাওয়া যায় নি। আর যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করা হয়েছে সেগুলো দলিররূপে পেশ করার যোগ্য নয়। সুতরাং নাম স্পষ্ট না করে যেভাবে কুরআন মাজিদ সেই বৃদ্ধের কথা আলোচনা করেছে, তদ্রূপ আমরাও তার নাম স্পষ্ট উল্লেখ করাকে আল্লাহ তাআলার ইলমের ওপর সোপর্দ করে দিলাম।
তাফসিরে ইবনে কাসির-এর ইবারত নিম্নরূপ—
قال ابو جعفر الطبرى و هذا مما لا يدرك علمه إلا بخير، ولا خبر بذلك تجب حجته، فلا قول في ذلك أولى بالصواب مما قاله الله جل ثناؤه
'আবু জাফর আত-তাবারি বলেছেন, নাম স্পষ্টরূপে উল্লেখ করার বিষয়টি খবর ও সংবাদ পাওয়া ব্যতীত মীমাংসিত হতে পারে না। এ- ব্যাপারে এমন কোনো খবর বা রেওয়ায়েত পাওয়া যায় নি যা তা দলিল হতে পারে। সুতরাং সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো তা-ই যা কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন।¹³⁰ (অর্থাৎ নাম সম্পর্কে নীরব থেকেছেন।) ইবনে জারির আত-তাবারি ইঙ্গিত করেছেন কুরআনের এই বাক্যটির প্রতি-
وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ 'আর আমাদের পিতা একজন অতিশয় বৃদ্ধ।' [সুরা কাসাস: আয়াত ২৩]
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, 'আমার সঙ্গে একজন মর্যাদাবান আলেম এ-বিষয়ে আলোচনা করেছেন যে, হযরত মুসা আ. অতি উচ্চ শ্রেণির নবী ছিলেন। সুতরাং কোনো সাধারণ লোক তাঁকে শ্রমিক নিযুক্ত করার সাহস করতে পারে না। আর মুসা আ. তা মঞ্জুরও করতেন না। তাঁকে শ্রমিক নিযুক্তকারী কেবল নবী ও পয়গাম্বরই হতে পারেন। সুতরাং মাদয়ানের বুযুর্গ দুর্বল বৃদ্ধ হযরত শুআইব আ.-ই হতে পারেন।' আমি তাঁকে আরজ করলাম, 'আপনার এই বক্তব্য যৌক্তিক প্রমাণের মর্যাদা রাখে না এবং কিতাবি প্রমাণের মর্যাদারও অধিকারী নয়। খুব বেশি হলে কেয়াস বা অনুমানের স্তরে স্থান দেয়া যেতে পারে। ত ছাড়া, মুসা আ. তখন নবী ছিলেন না। নবুওতের মর্যাদা তিনি পরে লাভ করেছিলেন। ¹³¹
যাইহোক। এটা একটা মীমাংসিত বিষয় যে, বুযুর্গ বৃদ্ধের নাম স্পষ্ট করে উল্লেখ করার ব্যাপারে প্রমাণের উপযুক্ত কোনে রেওয়ায়েত নেই। ইবনে জারির আত-তাবারি এবং ইবনে কাসির রহ. 'শ্রমের মেয়াদ পূর্ণ করা' প্রসঙ্গে যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন, তার মধ্যে বায্যার ও ইবনে আবি হাতিম রহ.-এর দীর্ঘ রেওয়ায়েতগুলো ব্যতীত কোনো রেওয়ায়েতেই নাম উল্লেখ করা হয় নি। আর এ-দুটি রেওয়ায়েতের অতিরিক্ত শব্দগুলো সম্পর্কে ইবনে কাসির বলেন-
مدار هذا الحديث على عبد الله بن لهيعة المصري وفي حفظه سوء وأخشى أن يكون رفعه خطأ، والله أعلم.
'এই (নামের স্পষ্ট বর্ণনা-সম্পর্কিত) হাদিসটির সত্যতা আবদুল্লাহ বিন লুহাইয়া আল-মিসরির ওপর নির্ভরশীল। তাঁর স্মরণশক্তি ছিলো দুর্বল। আমি তো আশঙ্কা করি যে, এই হাদিসটিকে 'মারফু' বলা ভুল।'³²
আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি বলেন-
ثم قد روي أيضاً نحوه من حديث عتبة بن النذر بزيادة غريبة جداً
'তা ছাড়া উতবা বিন নযরের হাদিস থেকেও অত্যন্ত অপরিচিত (ও নিশ্চিত দুর্বল) অতিরিক্ত শব্দাবলির সঙ্গে অনুরূপ বর্ণনা করা হয়েছে।' (সেই অতিরিক্ত কথাটি হলো নামের স্পষ্টরূপে উল্লেখ-সম্পর্কি।)

টিকাঃ
²³ প্রাগুক্ত, সুরা কাসাস।
²⁴ তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮, সুরা কাসাস।
²⁵ جامع البيان عن تأويل أي القرآن, আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি, সুরা কাসাস।
²⁶ তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮, সুরা কাসাস।
²⁷ উদ্ধৃত বক্তব্যগুলো থেকে এটাও জানা গেলো যে, সাইয়িদ সুলাইমান সাহেবের এই কথা বলা সঠিক নয় যে, মুসলমান মুফাস্সিরগণ সাধারণভাবে ইয়াসরু, হুবাব এবং শুআইব আ.-কে একই ব্যক্তি মনে করেন।
²⁸ তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮, সুরা কাসাস।
²⁹ প্রাগুক্ত।
¹³⁰ جامع البيان عن تأويل أي القرآن, আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি, সুরা কাসাস।
¹³¹ 'কাসাসুল আম্বিয়া, সাইয়িদ আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ২০৪।
³² তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭, সুরা কাসাস।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 প্রতিশ্রুত মেয়াদ পূর্ণ করা

📄 প্রতিশ্রুত মেয়াদ পূর্ণ করা


মোটকথা, হযরত মুসা আ. তাঁর শ্বশুরালয়ে শ্রমের মেয়াদ পূর্ণ করার অর্থাৎ বকরি-ভেড়া চরানোর জন্য অবস্থান করলেন। মুফাস্স্সিরগণ নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতগুলোর প্রতি লক্ষ করে বলেন, মুসা আ. পূর্ণ মেয়াদ দশ বছরেই সম্পন্ন করেছিলেন।
কুরআন মাজিদে এ-কথার উল্লেখ নেই যে, মেয়াদ শেষ করার পর কতদিন মুসা আ. শ্বশুরালয়ে অবস্থান করেছিলেন। অবশ্য মুফাস্সিরগণ এটা বলেন যে, মেয়াদ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই মুসা আ. মিসরের দিকে রওয়ানা করেছিলেন। আর তিনি মিসরে চলে যাওয়ার বছর বকরি ও ভেড়াগুলো যে-পরিমাণ বাচ্চা প্রসব করেছিলো, তাঁর শ্বশুর বাচ্চাই মুসা আ.-এর হাতে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও বকরির পাল নিয়ে মিসরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। ³³ মুফাস্সিরগণ সম্ভবত নিম্নলিখিত আয়াতের প্রতি লক্ষ করেই মেয়াদ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই যাত্রা করার কথা বলেছেন।
فَلَمَّا قَضَى مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ آنَسَ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ نَارًا 'মুসা যখন তার মেয়াদ পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করলো, তখন সে তুর পর্বতের দিকে আগুন দেখতে পেলো।' (সুরা কাসাস: আয়াত ৩০]
এই মনীষীগণ কুরআনে মেয়াদ পূর্ণ করা এবং যাত্রা করার বর্ণনার নৈকট্যের প্রতি লক্ষ করেই অনুমান করে নিয়েছেন যে, মেয়াদ শেষ করার পরেই মুসা আ. মিসরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন। অথত কোনো ইঙ্গিত বা সংকেত পাওয়ার আগ পর্যন্ত واو সংযোজক অব্যয়টি 'পরের' অর্থও বোঝায় না এবং 'পর্যায়ক্রম'-এর অর্থও বোঝায় না।
معالم التريل কিতাবে রয়েছে, হযরত মুসা আ. শ্রমের মেয়াদ পূর্ণ করার পর আরো দশ বছর তাঁর শ্বশুরালয়ে অবস্থান করেছিলেন। ³⁴ তাওরাতও এ-কথারই সমর্থন করছে যে, মুসা আ. মেয়াদ পূর্ণ করার পরপরই মিসরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে যান নি। বরং একবার তিনি গবাদিপশু চরাতে চরাতে পথ ভুলে গিয়ে পবিত্র ওয়াদিতে (উপত্যকায়) পৌঁছলেন এবং আল্লাহ তাআলার আদেশপ্রাপ্ত হলেন যে, বনি ইসরাইলকে ফেরআউনের দাসত্ব থেকে স্বাধীন করো এবং মিসরে গিয়ে তাদেরকে ফেরআউনের উৎপীড়ন থেকে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করো, তখন তিনি মিসরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। তাওরাতের বাক্যগুলো নিম্নরূপ:
"আর মুসা আ. তাঁর শ্বশুর মাদয়ানের জ্যোতিষী ইয়াসরুর বকরির পাল চরাতেন। তিনি বকরির পালকে চারণভূমির দিকে তাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর পাহাড় হুরাবের কাছে এলেন। তখন আল্লাহ তাআলার ফেরেশতা একটি ঝোপ থেকে আগুনের শিখার ভেতর থেকে তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করলেন। তিনি তাকিয়ে দেখলেন, বৃক্ষের একটি ঝাড় বা ঝোপ আলোয় আলোকিত হয়ে রয়েছে; কিন্তু পুড়ে যাচ্ছে না।... এখন দেখো, বনি ইসরাইলের আর্তনাদ তোমার কাছে এসে পৌঁছেছে। আর বনি ইসরাইলের ওপর মিসরীয়রা যে-নিপীড়ন চালাচ্ছে তা আমি দেখেছি। সুতরাং তুমি যাও, আমি তোমাকে ফেরআউনের কাছে পাঠাচ্ছি। আমার মানুষ বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে আনো।"³⁶ তখন মুসা আ. ওখান থেকে ফিরে এসে তাঁর শ্বশুরের কাছে গেলেন। শ্বশুরকে বললেন, আমি আপনার কাছে মিনতি করছি, আমাকে বিদায় দিন, মিসরে আমার ভাইদের কাছে চলে যাই।"³⁷
উত্তম এই যে, প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ তাআলা ইলমের প্রতিই সোপর্দ করা হোক। একমাত্র আল্লাহই প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে অবগত আছেন। তারপরও কুরআন মাজিদে বর্ণনাশৈলী এদিকে ইঙ্গিত করছে যে, সাধারণ তাফসিরের কিতাবসমূহে সুরা তোয়া-হা ও সুরা কাসাসে উল্লেখ করা হয়েছে-
فَلَمَّا قَضَى مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ 'মুসা যখন তার (শ্বশুরের সঙ্গে প্রতিশ্রুত) মেয়াদ পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করলো।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৩০।
আয়াতটির তাফসিরে বলা হয়েছে যে, মুসা আ.-এর এই যাত্রা করা মিসরের উদ্দেশে ছিলো। খুব সম্ভব এই বক্তব্য সঠিক নয়। কেননা, মুসা আ. মিসরে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছায় রওয়ানা হয়ে থাকতেন তাহলে ওয়াদিয়ে মুকাদ্দাসে (পবিত্র উপত্যকায়) পৌছার পর যখন তাঁকে বলা হলো, "জালিম ফেরআউনের কাছে এবং তাকে বোঝাও" তখন মুসা আ. জবাবে এ-কথা বলতেন না-
قَالَ رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونَ (سورة القصص) 'মুসা বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমি তো তাদের (ফেরআউনের সম্প্রদায়ের) একজনকে হত্যা করেছি। ফলে আমি আশঙ্কা করছি (আমি মিসরে গেলে) তারা আমাকে হত্যা করে ফেলবে।"" [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৩]
وَلَهُمْ عَلَيَّ ذَنْبٌ فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونَ (سورة الشعراء)
"আমার বিরুদ্ধে তো তাদের (মিসরীয়দের) এক অভিযোগ আছে (যে, আমি তাদের একজনকে হত্যা করেছি), আমি আশঙ্কা তারা আমাকে হত্যা করবে।" [সুরা শুআরা: আয়াত ১৪]
হযরত মুসা আ.-এর এই জবাবটি নিজেই বলছে যে, এই কথোপকথনের সময় হত্যার ঘটনাটির কারণে মুসা আ.-এর মিসরে যাওয়ার সাহস ছিলো না। অবশ্য যখন আল্লাহর অনুগ্রহ ও দান তাঁকে নবুওত ও রিসালাতের সম্মানে ভূষিত করলো, তখনে মিসরে ফিরে যাওয়ার আদেশপ্রাপ্ত হয়ে মুসা আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর অন্তরকে নিশ্চিত করে নিয়ে ওখান থেকেই মিসরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলেন। আল্লাহপাকের আদেশের সামনে শ্বশুরের কাছে গিয়ে অনুমতি গ্রহণেরও পরোয়া করলেন না।
যাইহোক। হযরত মুসা আ. মাদয়ানে এক দীর্ঘকাল অবস্থান করলেন। এই পুরো সময়ে তিনি তাঁর শ্বশুরের পশুপাল চরালেন। তাওরাতে বর্ণিত আছে যে, শ্বশুরালয়ে অবস্থানের সময় হযরত মুসা আ.-এর একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলো। তিনি এর নাম রেখেছিলেন 'জিরাসুন'। মাদয়ানি ইবরানি ভাষায় এই শব্দের অর্থ 'ভ্রমণ ও সফর'। মুসা আ. যেনো পুত্রের নামের মধ্যে তাঁর সফরকে স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ প্রতিষ্ঠিত করে দিলেন। যাতে তাঁর বংশধরদের এ-কথা মনে থাকে যে, ছেলেটির জন্ম হয়েছিলো ভিনদেশে ও সফরের অবস্থায়। তাওরাতের ইবারত নিম্নরূপ:
"আর মুসাকে নিজ কন্যা সাফুরাকে দান করলেন। সাফুরা এক পুত্রসন্তান প্রসব করলেন। তিনি তার নাম রাখলেন জিরাসুন। কারণ, তিনি বললেন, আমি বিদেশে মুসাফির অবস্থায় রয়েছি।"³⁷

টিকাঃ
³³ معالم التريل, আবু মুহাম্মদ হুসাইন বিন মাসউদ আল-বাগাবি রহ., পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৩।
³⁴ প্রাগুক্ত।
³⁶ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩, আয়াত ১-১০।
³⁷ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪, আয়াত ১৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00