📄 কুরআন মাজিদে হযরত মুসা ও হারুন আ.-এর আলোচনা
কুরআন মাজিদের বহু জায়গায় হযরত মুসা আ.-এর আলোচনা করা হয়েছে। কেননা, তাঁর অধিকাংশ অবস্থা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র অবস্থাবলির সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্য রাখে। আর এসব ঘটনাবলির মধ্যে স্বাধীনতা ও দাসত্বের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং সত্য ও মিথ্যার প্রতিযোগিতার অনুপম কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। তা ছাড়া এসব ঘটনাবলির মধ্যে জ্ঞান ও উপদেশমালার দুর্লভ ভাণ্ডার সঞ্চিত রয়েছে। এই কারণে কুরআন মাজিদ প্রয়োজন অনুসারে এবং স্থান ও পাত্র অনুযায়ী জায়গায় জায়গায় মুসা আ.-এর ঘটনার বিভিন্ন অংশকে সংক্ষিপ্ত আকারে ও বিস্তারিতরূপে বর্ণনা করেছে।
নিম্নবর্ণিত নকশার মাধ্যমে সংখ্যা গণনার সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনার গুরুত্বের যথার্থ অনুমান করা যাবে এবং সেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবীর মাহাত্ম্য ও অনুধাবন করা যাবে।
এই নকশাটির দুটির অংশ। প্রথম নকশা থেকে প্রকাশ পাচ্ছে যে, হযরত মুসা ও হযরত হারুন আলাইহিমুস সালাম অথবা বনি ইসরাইল ও ফেরআউনের ঘটনা কোন্ কোন্ সুরায় ও কী সংখ্যক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশ প্রকাশ করছে যে, কুরআন মাজিদে হযরত মুসা আ. ও হযরত হারুন আ.-এর মুবারক নাম কত জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের মোট সংখ্যা কত।
প্রথম নকশা
সুরার নাম আয়াত-সংখ্যক
সুরা আল-বাকারা ৪৭-৬১, ৬৩-৭৫, ৮৪-৮৭, ৯২, ৯৩, ১০৮, ১৩৬, ২৪৩, ২৫১
সুরা আন-নিসা ১৫৩-১৫৬, ১৬৪
সুরা মায়িদা ১২, ১৩, ২০-২৫, ৩২, ৪৫, ৭০, ৭১, ৭৮, ৭৯
সুরা আল-আন'আম ৮৪-৯০, ১৪৬, ১৫৪, ১৫৯
সুরা আল-আ'রাফ ১০৩-১৫৭, ১৫৯-১৭১
সুরা আল-আনফাল ৫৪
সুরা ইউনুস ৭৪-৯৩
সুরা হুদ ৯৬-৯৯, ১১০
সুরা ইবরাহিম ৫, ৬, ৮
সুরা আন-নাহল ১২৪
সুরা বনি ইসরাইল ২-৭, ১০১-১০৪
সুরা আল-কাহফ ৬০-৮২
সুরা মারইয়াম ৫১-৫৩
সুরা তোয়া-হা ৯০-৯৮
সুরা আল-আম্বিয়া ৪৮, ৪৯
সুরা আল-মুমিনুন ৪৫-৪৯
সুরা আল-ফুরকান ৩৫, ৩৬
সুরা শুআরা ১০-৬৬
সুরা নামল ৭-১৪
সুরা কাসাস ৩-৪৮
সুরা আনকাবুত ৩৯, ৪০
সুরা আস-সাজদা ২৩, ২৪
সুরা আল-আহযাব ৬৯
সুরা আস-সাফফাত ১১৪-১২২
সুরা মুমিন ২৩-৪৫
সুরা আয-যুখরুফ ৩৬-৫৬
৪৪ সুরা দুখান ১৭-৩৩
৪৫ সুরা জাসিয়া ১৬, ১৭
৫১ সুরা যারিয়াত ৩৮-৪০
৫৪ সুরা কামার ৪১-৫৫
৬১ সুরা সাফফ ৫
৬২ সুরা জুমআ ৫, ৬
৬৬ সুরা আত-তাহরিম ১১
৬৯ সুরা আল-হাক্কাহ ৯, ১০
৭৩ সুরা মুয্যাম্মিল ১৫, ১৬
৭৯ সুরা নাযিআত ১৫-২৫
৮৯ সুরা ফাজর ۱۰-১৩
দ্বিতীয় নকশা
মুসা আ.-এর নাম হারুন আ.-এর নাম
সুরা সুরার নাম আয়াত আয়াত
২ সুরা আল-বাকারা ১২ ১
৪ সুরা আন-নিসা ২ ১
৫ সুরা মায়িদা ২ ০
৬ সুরা আল-আন'আম ২ ১
৭ সুরা আল-আ'রাফ ১৬ ১
১০ সুরা ইউনুস ৮ ১
১১ সুরা হুদ ২ ১
১৪ সুরা ইবরাহিম ৩ ০
১৭ সুরা বনি ইসরাইল ৩ ০
১৮ সুরা আল-কাহফ ২ ০
১৯ সুরা মারইয়াম ১ ০
২০ সুরা তোয়া-হা ১৪ ৩
২১ সুরা আল-আম্বিয়া ১ ১
২৩ সুরা আল-মুমিনুন ২ ১
২৫ সুরা আল-ফুরকান ১ ১
২৬ সুরা শুআরা ৮ ২
২৭ সুরা নামল ২ ০
২৮ সুরা কাসাস ১৪ ১
৩২ সুরা আস-সাজদা ১ ০
৩৩ সুরা আল-আহযাব ১ ০
৩৭ সুরা আস-সাফফাত ২ ০
৪০ সুরা মুমিন ৪ ০
৪৩ সুরা আয-যুখরুফ ১ ০
৫১ সুরা যারিয়াত ১ ০
৬১ সুরা সাফফ ১ ০
৭৯ সুরা নাযিআত ১ ০
১০৭ ১৪
📄 বংশপরিচয় ও জন্ম
হযরত মুসা আ.-এর বংশপরম্পরা কয়েক পুরুষের মাধ্যমে হযরত ইয়াকুব আ. পর্যন্ত পৌছে। মুসা আ.-এর পিতার নাম ছিলো ইমরান এবং মাতার ইউকাবাদ। পিতার বংশপরম্পরা এরূপ—ইমরান বিন কামাত বিন লাওয়া বিন ইয়াকুব আ.। হযরত হারুন আ. হযরত মুসা আ.-এর সহোদর ও বড়ভাই ছিলেন। ইমরানের ঘরে হযরত মুসা আ.-এর জন্ম এমন সময়ে হয়েছিলো যখন ফেরআউন বনি ইসরাইলের সদ্যপ্রসূত বালক শিশুদেরকে হত্যা করে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেছিলো।
এ-কারণে মুসা আ.-এর মা ও পরিবারের লোকেরা তাঁর জন্মের পর অত্যন্ত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলো যে কীভাবে এই শিশুটিকে হত্যাকারীদের দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা যায়। এভাবে-সেভাবে-যেভাবেই হোক, তিন মাস পর্যন্ত তাঁকে সবার দৃষ্টি থেকে গোপনে রাখা হলো। তাঁর জন্মগ্রহণের সংবাদও কাউকে জানতে দেয়া হলো না। কিন্তু গুপ্তচরদের অনুসন্ধান এবং পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার কারণে বেশিদিন এই ঘটনা গোপনীয় রাখার ভরসা পাওয়া গেলো না। ফলে তাঁর মায়ের উদ্বেগ ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। এই কঠিন ও করুণ পরিস্থিতিতে অবশেষে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করলেন এবং মুসা আ.- এর মায়ের অন্তরে এমন কৌশলের উদ্ভব ঘটিয়ে দিলেন যে, একটি সিন্দুক নির্মাণ করো। সিন্দুকে আলকাতরা ও তেলের পালিশ লাগাও। পানি যেনো ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। শিশুটিকে সিন্দুকে ভরো এবং তারপর তা নীলনদের স্রোতে ভাসিয়ে দাও।
📄 ফেরআউনের গৃহে প্রতিপালন
হযরত মুসা আ.-এর সহোদরা বোন নদের তীর ধরে ভাসমান সিন্দুকটির ওপর দৃষ্টি রেখে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন, সিন্দুকটি ভেসে ভেসে রাজপ্রাসাদের কাছে এসে থামলো। ফেরআউনের পরবিারের একজন রমণী তাঁর চাকরদের দিয়ে নদ থেকে সিন্দুকটি উঠিয়ে নিলেন এবং রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন। হযরত মুসা আ.-এর বোন তা দেখে খুবই আনন্দিত হলেন। প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে জানার জন্য তিনি রাজমহলের চাকরানিদের সঙ্গে মিশে গেলেন।
কুরআন মাজিদ রাজবংশের এই স্ত্রীলোকটিকে ফেরআউনের স্ত্রী বলেছে। আর তাওরাতের 'আত্মপ্রকাশ' অধ্যায়ে বলা হয়েছে, এই নারী ছিলেন ফেরআউনের কন্যা। কিন্তু ইতিহাসবেত্তাগণ এই মতানৈক্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন নি। তাঁরা বলেন, সম্ভবত পানিতে ভাসমান সিন্দুকটিকে ফেরআউনের কন্যাই উঠিয়ে নিয়েছিলো। তারপর সিন্দুকের শিশুটিকে পুত্র বানিয়ে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা, শিশুটিকে হত্যা না করে নিজেরাই লালন-পালন করার আগ্রহ প্রকাশ এবং ফেরআউনের কাছে সুপারিশ করেছিলেন ফেরআউনের স্ত্রী আসিয়া।
কুরআন মাজিদের বর্ণনাপদ্ধতি থেকেও এ-কথাই প্রকাশ পায়। কারণ, হযরত মূসা আ.-কে নদীর বুক থেকে উত্তোলনকারী প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদ বলেছে—
فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ
‘তখন ফিরআউনের (পরিবারের) লোকজন তাকে (শিশু মূসাকে) উঠিয়ে নিলো।’ [সূরা কাসাস : আয়াত ৬]
আর পুত্ররূপে গ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষা এবং হত্যা না করে প্রতিপালন করার জন্য সুপারিশকারী সম্পর্কে কুরআন বলছে—
وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِّي وَلَكَ ۖ لَّا تَقْتُلُوهُ عَسَىٰ أَن يَنفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا
‘ফিরআউনের স্ত্রী বললো, “এই শিশু আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। একে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।” [সূরা কাসাস: আয়াত ৯]
‘ফিরআউনের স্ত্রী বললো’-এর হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস র.হ. থেকে এমন বক্তবই বর্ণিত হয়েছে।¹⁰
যাইহোক, ফিরআউনের লোকেরা সিন্ধুকটি খুলে দেখতে পেলো, একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান শিশু সিন্ধুকটির ভেতরে আরামে শুয়ে আছে এবং বুড়ো আঙুল চুষছে। ফিরআউনের কন্যা তৎক্ষণাৎ তাকে রাজমহলে নিয়ে গেলো। ফিরআউনের স্ত্রী শিশুটিকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। অত্যন্ত মায়া-মমতার সঙ্গে শিশুটিকে আদর করলেন। রাজমহলের অভ্যন্তরীণ চাকরদের মধ্যে কেউ বলে উঠলো, ‘এই শিশুটিকে তো বনি ইসরাইলের ছেলে মনে হচ্ছে। এ তো আমাদের বংশের শত্রু। এতো হত্যা করে ফেলা জরুরি। পাছে এমন না, এই শিশুই আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।’ এ-ধরনের কথা শুনে ফিরআউনের এমনটাই ইচ্ছে হলো। ফিরআউনের স্ত্রী ফিরআউনের হাবভাব দেখে বলতে লাগলেন, এমন সুন্দর ও আদরনীয় শিশুটিকে হত্যা করো না। বিচিত্র কি যে, এই শিশু তোমার ও আমার চোখের প্রীতিদায় হবে। অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেবো এবং তার জীবন ও অস্তিত্ব আমাদের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ এই শিশু যদি সেই ইসরাইলি শিশুই সাব্যস্ত হয়, যে হবে তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যার উদ্দেশ্য, তবে আমাদের ভালোবাসা ও প্রতিপালনের কোল হয়তো তাকে ক্ষতিকর হওয়ার পরিবর্তে কল্যাণকর করে দেবে।
কিন্তু ফেরআউন ও তার বংশের লোকেরা কি জানতো যে, আল্লাহপাকের অদৃষ্টলিপি তাদের প্রতি হাসাহাসি করছে। রাব্বুল আলামিনের অপার মহিমা লক্ষ করুন, ফেরআউনকে সম্পূর্ণ ও অজ্ঞ ও অনবহিত রেখে তাকে তার শত্রুর রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে দিলেন।
মোটকথা, তখন এই প্রয়োজন দেখা দিলো যে, শিশুটির জন্য দুগ্ধ দানকারিণী ধাত্রী নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মায়ের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করার জন্য শিশুর স্বভাব এমন করে দিলেন যে, সে কোনো রমণীর স্তনে মুখই লাগায় না। রাজমহলের ধাত্রী চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বসে গেলো; কিন্তু মুসা আ. কোনো স্তন থেকেই দুধ পান করলেন না। মুসা আ.-এর বোন মারইয়াম সব অবস্থা দেখছিলেন। তিনি বললেন, অনুমতি পেলে আমি একজন ধাত্রীর সন্ধান দিতে পারি। তিনি অত্যন্ত সৎ স্বভাবশালিনী এবং এই কাজের জন্য খুবই উপযোগী। নির্দেশ পেলে বরং এখনই তাঁকে আমি আমার সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারি। ফেরআউনের স্ত্রী ধাত্রীকে আনার জন্য নির্দেশ দিলেন। আর মুসা আ.-এর বোন মাকে নিয়ে আসার জন্য আনন্দচিত্তে বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
হযরত শাহ আবদুল কাদির দেহলবি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ 'মুযিহুল কুরআন'-এ লিখেছেন, ফেরআউনের স্ত্রী (আসিয়া) ছিলেন বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত এবং তিনি মুসা আ.-এর চাচাতো বোন ছিলেন। তিনি মুসা আ.-এর বোনের ধাত্রী আনার কথায় বুঝে ফেলেছিলেন যে, শিশুটি বনি ইসরাইলেরই সন্তান। ১৪
এদিকে এ-ধরনের কথাবার্তা হচ্ছিলো আর ওদিকে মুসা আ.-এর মায়ের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিলো। একটি ইলহামি চিন্তা-ভাবনায় শিশুপুত্রকে তো নদীর বুকে ভাসিয়ে দিয়ে এলেন; কিন্তু এখন মাতৃস্নেহ ও মমতা বড়ই তীব্র হয়ে উঠলো। তিনি অস্থির হয়ে নিজের এই গুপ্তরহস্যকে প্রকাশ করে দিতে উদ্যত হলেন। এই অস্থিরতা ও অশান্ত অবস্থার মধ্যেই আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মায়ের প্রতি তাঁর দয়া ও করুণা বর্ষণ করলেন। তাঁর হৃদয়ে স্থিরতা ও প্রশান্তি নাযিল করলেন। এখন তিনি অদৃশ্যের দয়া ও অনুগ্রহের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকলেন। এমন সময়ে তাঁর কন্যা এসে সম্পূর্ণ ঘটনা শোনালেন। তিনি বললেন, যখন মুসা কোনো ধাত্রীরই দুধ পান করলো না, তখন আমি বললাম, ইসরাইলি বংশে একজন অত্যন্ত ভদ্র ও সৎস্বভাবা নারী আছেন। তিনি এই শিশুকে আপন সন্তানের মতো লালন-পালন করতে পারবেন। ফেরআউনের স্ত্রী এ-কথা শুনে আমাকে নির্দেশ দিলেন, আমি যেনো এখনই আপনাকে নিয়ে গিয়ে ওখানে উপস্থিত করি। এ তো আমাদের প্রতি আল্লাহপাকের বড়ই অনুগ্রহ ও দয়া। এখন আপনি গিয়ে আপনার পুত্রকে বুকে তুলে নিয়ে প্রাণ জোড়ান এবং চোখ শীতল করুন। আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করুন। কেননা, তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ )) فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنَا إِنَّ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ () وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِي وَلَكَ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ () وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ () وَقَالَتْ لِأُخْتِه قُصِّيهِ فَبَصُرَتْ بِهِ عَنْ جُنُبِ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ () وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نَاصِحُونَ )) فَرَدَدْنَاهُ إِلَى أُمِّهِ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (سورة القصص)
“মুসার মায়ের অন্তরে আমি ইলহাম (ইলহামায়ে) নির্দেশ করলাম, “শিশুটিকে স্তন্য দান করতে থাকো। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোনো আশঙ্কা করবে তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুলদের একজন বানাবো। তখন ফেরাউনের (পরিবারের) লোকজন তাকে (শিশু মুসাকে নদী থেকে) উঠিয়ে নিলো। এর পরিণাম তো এই ছিলো যে, সে (ভবিষ্যতে) তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়। ফেরাউন, হামান ও কারুন ও তাদের বাহিনী ছিলো অপরাধী। ফেরাউনের স্ত্রী বললো, “এই শিশু আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। একে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।” প্রকৃতপক্ষে তারা এর পরিণাম বুঝতে পারে নি (এই শিশু এবং তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের কোনো খবরই ছিলো না)। মুসার মায়ের হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিলো। যাতে সে অধীর না হয় তার জন্য আমি তার হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিলে সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করেই দিতো। সে (মুসা আ.-এর মা) মুসার বোনকে বললো, “এর (সিন্দুকটির) পেছনে পেছনে যাও।” সে তাদের অজ্ঞাতে (অপরিচিতের মতো) দূর থেকে তাকে (মুসাকে) দেখছিলো। (ফেরাউনের পরিবার এ ব্যাপারে কিছু জানতেও পারলো না।) পূর্ব থেকে আমি তাকে ধাত্রী-স্তন্যপানে বিরত রেখেছিলাম। এরপর মুসার বোন বললো, 'তোমাদেরকে কি আমি এমন এক পরিবারের সন্ধান দেবো যে-পরিবার তোমাদের হয়ে একে লালন-পালন করবে এবং এর কল্যাণকামী হবে? তখন আমি তাকে ফিরিয়ে দিলাম তার মায়ের কাছে, যাতে তার চোখ জুড়ায়, সে দুঃখ না করে এবং বুঝতে পারে যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [সুরা কাসাস : আয়াত ৭-১৩]
وَلَقَدْ مَنَنَّا عَلَيْكَ مَرَّةً أُخْرَى () إِذْ أَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّكَ مَا يُوحَى () أَنِ اقْذِفِيهِ فِي التَّابُوتِ فَاقْذِفِيهِ فِي الْيَمِّ فَلْيُلْقِهِ الْيَمُّ بِالسَّاحِلِ يَأْخُذْهُ عَدُوٌّ لِّي وَعَدُوٌّ لَّهُ وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي () إِذْ تَمْشِي أُخْتُكَ فَتَقُولُ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى مَن يَكْفُلُهُ فَرَجَعْنَاكَ إِلَى أُمِّكَ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنُ (سورة ত্বা-হা)
'(হে মুসা,) এবং (তুমি জানো যে,) আমি তো তোমার প্রতি আরও একবার অনুগ্রহ করেছিলাম; যখন আমি তোমার মাতাকে জানিয়েছিলাম যা ছিলো জানাবার (আমি তাকে বুঝিয়ে দিলেছিলাম)-যে, "তুমি তাকে (মুসাকে) সিন্দুকের মধ্যে রাখো, এরপর তাকে দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, যাতে দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দেয়। তাকে আমার (মুসলিম সম্প্রদায়ের) শত্রু এবং তার (এই শিশুর) শত্রু নিয়ে যাবে।" (হে মুসা,) আমি আমার কাছ থেকে তোমার ওপর ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, (যাতে অপরিচিত মানুষও তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করে এবং আমার ইচ্ছা ছিলো) যাতে তুমি আমার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হও। যখন তোমার বোন এসে (ফেরআউনের স্ত্রীকে) বললো, "আমি কি তোমাদেরকে বলে দেবো কে এই শিশুর ভার নেবে?” তখন আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম যাতে তার চোখ জোড়ায় এবং (শিশুর বিচ্ছেদে সে দুঃখ না পায়।' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৩৭-৪০]
তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসা আ.-এর মা যখন মুসা আ.-এর দুধ ছাড়ালেন তখন তিনি তাকে ফেরআউনের কন্যার কাছে দিয়ে দিলেন। এরপর মুসা আ. এক দীর্ঘকাল রাজপ্রাসাদে প্রতিপালিত হতে থাকেন এবং ওখানেই তাঁর ক্রমোন্নতি ঘটতে থাকে। কিন্তু তাওরাতের এই উক্তি বাস্তবের সম্পূর্ণ বিপরীত যে, মুসা আ. ফেরআউনের কন্যার পুত্র হয়েছিলেন। "যখন শিশু একটু বড় হলো, তখন মুসার মাতা তাকে ফেরআউনের কন্যার কাছে নিয়ে এলেন এবং সে ফেরআউনের কন্যার পুত্র নির্ধারিত হলো। সে তার নাম রাখলো মুসা এবং বললো, তার এই নাম রাখলাম এই কারণে যে, আমি তাকে পানি থেকে উদ্ধার করেছি।"¹⁷
টিকাঃ
¹⁰ রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআнил আজিম ওয়াস সাবয়িল মাছানি, আলুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি, বিশেষ খণ্ড, সূরা কাসাস।
¹⁴ মুফাস্স্সিসরগণ ফেরআউনের এই স্ত্রীর নাম আসিয়া বলেছেন। কুরআন মাজিদ ফেরআউনের স্ত্রীকে মুমিন সাব্যস্ত করেছে। তা সত্ত্বেও তাঁকে ইসরাইলি বংশোদ্ভূত ও মুসা আ.-এর চাচাতো বোন বলা একটি দুর্বল মত। বিশুদ্ধ মত এই যে, তিনি ফেরআউনের বংশেরই নারী ছিলেন। (তাফসিরে রুহুল মাআনি, বিংশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১।।
¹⁷ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১, আয়াত ১০।
📄 হযরত মুসা আ.-এর মিসর থেকে বহির্গমন
হযরত মুসা আ. এক দীর্ঘ সময় রাজপ্রাসাদে রাজকীয় আদর-যত্নে প্রতিপালিত হলেন। ধীরে ধীরে তিনি যৌবনে পদার্পণ করলেন। তখন দেখা গেলো তিনি এক সুঠামদেহ সাহসী যুবক। তাঁর মুখমণ্ডল থেকে গাম্ভীর্য ফুটে বের হচ্ছে। কথাবার্তা থেকে বিশেষ ধরনের দৃঢ়তা ও মহত্বের শান প্রকাশ পাচ্ছে। যৌবনে পদার্পণ করার পর তিনি এটাও জানতে পেরেছিলেন যে, তিনি ইসরাইলি বংশোদ্ভূত। মিসরীয় বংশের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি এটাও দেখলেন যে, বনি ইসরাইলকে জুলুম ও নিপীড়ন করা হচ্ছে এবং তারা মিসরে অত্যন্ত লাঞ্ছনা ও দাসত্বের জীবনযাপন করছে। এই অবস্থা দেখে ক্রোধে তাঁর রক্ত টগবগ করতে লাগলো। তিনি সুযোগ পেলেই বনি ইসরাইলের সাহায্য-সহযোগিতা ও তাদের রক্ষায় এগিয়ে যেতেন।
আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি রহ. তাঁর তারিখ الامم والملوك (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক) গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত মুসা আ. যখন যৌবনে পদাপর্ণ করেন এবং একজন শক্তিমান যুবকরূপে আবির্ভূত হলেন, তখন বনি ইসরাইলের ব্যাপারে তাঁর সাহায্য ও সুরক্ষার প্রতিক্রিয়া এই হলো যে, বনি ইসরাইলের ওপর মিসরীয় কর্মচারীদের অত্যাচার হ্রাস পেতে শুরু করলো।
আর এতে সন্দেহ নেই যে, বনি ইসরাইলের লাঞ্ছনা ও দাসত্বের জন্য মুসা আ.-এর ক্রুদ্ধ ও চিন্তিত হওয়া এবং তাদের সাহায্য-সহযোগিতা ও মুক্তির জন্য তাঁর হৃদয়ে গভীর আগ্রহ ও দৃঢ় স্পৃহা একটি আল্লাহ-প্রদত্ত স্বভাবজাত আবেগ ছিলো।
এখন আল্লাহপাকের দানের হাত আরো অগ্রসর হলো এবং তিনি মুসা আ.-কে দৈহিক শক্তির সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অলঙ্কারেও ভূষিত করলেন। এখন পরিপক্ব বয়সে পৌছে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি, সূক্ষ্মজ্ঞান ও চিন্তাশক্তিও উচ্চস্তরে উপনীত হলো। তিনি দৈহিক ও আধ্যত্মিক শক্তিতে পূর্ণতা লাভ করলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (سورة القصص)
'যখন মুসা পূর্ণ যৌবনে উপনীত হলো ও পরিণত বয়স্ক হলো তখন আমি তাকে হেকমত (সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি) ও জ্ঞান দান করলাম; এইভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কার প্রদান করে থাকি।' (সুরা কাসাস: আয়াত ১৪]
মোটকথা, মুসা আ. শহরে ভ্রমণকালে এসব অবস্থা দেখতেন এবং কোনো কোনো বনি ইসরাইলকে সাহায্য করতেন।
একদিন তিনি শহরের লোকালয় ছেড়ে শহরের এক প্রান্তের দিকে যাওয়ার সময় দেখলেন যে, একজন মিসরীয় লোক এক ইসরাইলি ব্যক্তিকে কামলা খাটানোর জন্য টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি ব্যক্তি মুসা আ.-কে দেখে সাহায্য প্রার্থনা করলো। মিসরীয় ব্যক্তির এ- ধরনের জুলুম দেখে হযরত মুসা আ. ক্রোধান্বিত হয়ে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মিসরীয় লোকটা তাঁর কথা কানেই তুললো না। মুসা আ. ক্রোধের সঙ্গে সজোরে এক চড় কষালেন। মিসরীয় লোকটা চড়ের আঘাত সহ্য করতে না পেরে সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলো। এই ঘটনায় মুসা আ. অনুতপ্ত হলেন। কেননা, লোকটাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্য তাঁর আদৌ ছিলো না। তিনি অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে মনে মনে বললেন, এটা নিশ্চয় শয়তানের কাজ, সে-ই মানুষকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করে।
তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকলেন-হে আল্লাহ, যা-কিছু ঘটেছে অনিচ্ছাকৃতভাবে এবং অজ্ঞতার কারণে ঘটেছে। আমি আপনার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ফলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন এবং ক্ষমার সুসংবাদও প্রদান করলেন। এদিকে শহরে মিসরীয় ব্যক্তির হত্যার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। কিন্ত হত্যাকারীর কোনো সন্ধান পাওয়া গেলো না। অবশেষে মিসরীয়রা ফেরআউনের কাছে ফরিয়াদ জানালো যে, এই হত্যাকাণ্ড নিশ্চয় কোনো ইসরাইলি ব্যক্তি ঘটিয়েছে। সুতরাং আপনি এর বিচার করুন। ফেরআউন বললো, এভাবে সমগ্র গুষ্ঠি থেকে তো প্রতিশোধ নেয়া যাবে না, তোমরা এক কাজ করো, হত্যাকারীর সন্ধান করো। আমি অবশ্যই কর্মের পরিণতি পর্যন্ত পৌছে দেবো।
ঘটনাক্রমে পরের দিনও মুসা আ. শহরের শেষ প্রান্তে ভ্রমণ করছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন গতকালের সেই ইসরাইলি ব্যক্তি জনৈক কিবতির (মিসরীয়) সঙ্গে ঝগড়া করছে এবং মিসরীয় ব্যক্তিকেই প্রবল মনে হচ্ছে। মুসা আ.-কে ইসরাইলি ব্যক্তি গতকালের মতো আজো তাঁর কাছে সাহায্য চাইলো এবং বিচার পার্থনা পার্থনা করলো।
এই ঘটনা দেখে মুসা আ. দ্বিগুণ অসন্তোষ অনুভব করলেন। একদিকে মিসরীয় ব্যক্তির জুলুম, অপরদিকে ইসরাইলি ব্যক্তি চিৎকার-চোঁচামেচি এবং গতকালের ঘটনার স্মরণ-এসব বিরক্তির মধ্যে তিনি মিসরীয় ব্যক্তিকে নিবৃত্ত করার জন্য হাত বাড়ালেন। আর সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি ব্যক্তিকেও ধমক দিয়ে বললেন, إِنَّكَ لَغَوِيٌّ مُبِينٌ 'তুই তো স্পষ্টই একজন বিভ্রান্ত লোক। ¹⁸ অর্থাৎ অযথা ঝগড়া বাধিয়ে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করতে থাকিস!
ইসরাইলি ব্যক্তি হযরত মুসা আ.-কে তার দিকে হাত বাড়াতে দেখে এবং তার সম্পর্কে অসন্তুষ্টিমূলক কঠিন কথা শুনে মনে করলো যে, ইনি এখন তাকে প্রহার করার জন্যই হাত বাড়িয়েছেন এবং তাকে ধরতে চাচ্ছেন। তখন সে উদ্বেগের সঙ্গে বলে উঠলো- أَتُرِيدُ أَنْ تَقْتُلَنِي كَمَا قَتَلْتَ نَفْسًا بِالْأَمْسِ إِنْ تُرِيدُ إِلَّا أَنْ تَكُونَ جَبَّارًا فِي الْأَرْضِ وَمَا تُرِيدُ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْمُصْلِحِينَ (سورة القصص) 'গতকাল তুমি এক ব্যক্তিকে যেভাবে হত্যা করেছো, সেভাবে কি আমাকেও হত্যা করতে চাচ্ছো? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চাচ্ছো, শান্তি স্থাপনকারী হতে চাচ্ছো না।' [সুরা কাসাস: আয়াত ১৯]
মিসরীয় লোকটি এসব কথা শুনে তৎক্ষণাৎ ফেরআউনের পারিষদবর্গের কাছে গিয়ে সমস্ত ঘটনা শুনালো। তারা ফেরআউনের কাছে গিয়ে জানালো যে, মুসা গতকালের মিসরীয় ব্যক্তির হত্যকারী। ফেরআউন এ-কথা শুনেই জল্লাদকে নির্দেশ দিলো, এখনই গিয়ে মুসাকে গ্রেপ্তার করে আমার সামনে উপস্থিত করো।
মিসরীয়দের এই দরবারে এমন একজন সম্মানিত ও পদস্থ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন যিনি মুসা আ.-কে মনে-প্রাণে ভালোবাসতেন এবং ইসরাইলি ধর্মকে সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি ফেরআউনের বংশেরই একজন ব্যক্তি ছিলেন এবং দরবারের সভাষদও ছিলেন। তিনি ফেরআউনের এই আদেশ শুনে জল্লাদের পূর্বেই দরবারে থেকে বের হয়ে গেলেন এবং দৌড়ে গিয়ে মুসা আ.-এর খেদমতে হাজির হলেন। তিনি সব ঘটনা মুসা আ.-কে জানালেন এবং পরামর্শ দিলেন যে, এখন এটাই আপনার জন্য কল্যাণকর হবে যে আপনি মিসরীয়দের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করুন এবং এমন কোনো স্থানের দিকে হিজরত করুন যেখানে ফেরআউনের ক্ষমতা অচল। হযরত মুসা আ. তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং চুপচাপ মাদয়ানের দিকে হিজরত করে চলে গেলেন।
এখানে একটি কথা চিন্তা-ভাবনা করার যোগ্য যে, কুরআন মাজিদ এই লোকটি সম্পর্কে শুধু এতটুকু বলেছে—
وَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَى قَالَ يَا مُوسَى إِنَّ الْمَلَأُ يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ 'নগরীর দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ছুটে এলো ও বললো, "হে মুসা, (ফেরআউনের) পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে।"' [সুরা কাসাস: আয়াত ১৯]
আর আমরা তাঁর সঙ্গে 'সম্মানিত' ও 'পদস্থ' বিশেষণ দুটি যোগ করে দিলাম। এই কারণ আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি কথায় এই যে, ১. লোকটি শহরের শেষ প্রান্ত থেকে এসেছিলেন। আর আরব দেশে এই প্রবাদ প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, الاطراف سكنى الأشراف 'শহরের প্রান্তভাগ সম্মানিত লোকদের বাসস্থান'। আর তিনি মুসা আ.-কে বলেছিলেন, إِنَّ الْمَلَأُ يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ 'রাজদরবারের লোকেরা তোমাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে।' বলা বাহুল্য, এরূপ কথা এমন ব্যক্তিই জানতে পারেন যিনি ফেরআউন ও তার সভাষদগণের মধ্যে বিশেষ পদ-মর্যাদার অধিকারী।
কুরআন মাজিদ এই ঘটনা বর্ণনা করছে এভাবে—
وَدَخَلَ الْمَدِينَةَ عَلَى حِينِ غَفْلَةٍ مِنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتِلَانِ هَذَا مِنْ شِيعَتِهِ وَهَذَا مِنْ عَدُوِّهِ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسَى فَقَضَى عَلَيْهِ قَالَ هَذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُضِلَّ مُبِينٌ () قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ () قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ () فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِينَةِ خَائِفًا يَتَرَقْبُ فَإِذَا الَّذِي اسْتَنْصَرَهُ بِالْأَمْسِ يَسْتَصْرِحُهُ قَالَ لَهُ مُوسَى إِنَّكَ لَغَوِيٌّ مُبِينٌ () فَلَمَّا أَنْ أَرَادَ أَنْ يَبْطِشَ بِالَّذِي هُوَ عَدُوٌّ لَهُمَا قَالَ يَا مُوسَى أَتُرِيدُ أَنْ تَقْتُلَنِي كَمَا قَتَلْتَ نَفْسًا بِالْأَمْسِ إِنْ تُرِيدُ إِلَّا أَنْ تَكُونَ جَبَّارًا فِي الْأَرْضِ وَمَا تُرِيدُ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْمُصْلِحِينَ () وَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَى قَالَ يَا مُوسَى إِنَّ الْمَلَأَ يأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ فَاخْرُجْ إِنِّي لَكَ مِنَ النَّاصِحِينَ () فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقُبُ قَالَ رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ (سورة القصص)
'সে নগরীতে প্রবেশ করলো, যখন এর অধিবাসীরা ছিলো অসতর্ক। ওখানে সে দুটি লোককে সংঘর্ষে লিপ্ত দেখলো, একজন তার নিজের দলের এবং অপরজন তার শত্রু দলের। মুসার দলের লোকটি তার শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করলো। তখন মুসা তাকে (শত্রুদলের লোকটাকে) মুষ্ট্যাঘাত করলো। এইভাবে সে তাকে হত্যা করে বসলো। মুসা বললো, এ তো শয়তানের কাণ্ড, সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী।" সে (মুসা) বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমি তো আমার নিজের প্রতি জুলুম করেছি; সুতরাং আমাকে ক্ষমা করো। তখন তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সে আরো বললো, "হে আমার প্রতিপালক, তুমি যেহেতু আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছো, আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না। এরপর ভীত সতর্ক অবস্থায় সেই নগরীতে তার সকাল হলো। হঠাৎ সে শুনতে পেলো, আগের দিন যে-ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিলো, সে তার সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে। মুসা তাকে বললো, "তুমি তো স্পষ্টই একজন বিভ্রান্ত ব্যক্তি।" এরপর মুসা যখন উভয়ের শত্রুকে (মুসা আ. ও ইসরাইলি ব্যক্তিটির শত্রু এক কিবতিকে) ধরতে উদ্যত হলো তখন সে-ব্যক্তি বলে উঠলো, "গতকাল তুমি এক ব্যক্তিকে যেভাবে হত্যা করেছো, সেভাবে কি আমাকেও হত্যা করতে চাচ্ছো? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চাচ্ছো, শান্তি স্থাপনকারী হতে চাচ্ছো না।" নগরীর দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ছুটে এলো ও বললো, “হে মুসা, (ফেরআউনের) পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে। সুতরাং তুমি (মিসর থেকে) বাইরে চলে যাও। আমি তো তোমার কল্যাণকামী।" ভীত সতর্ক অবস্থায় সে ওখান থেকে বের হয়ে পড়লো এবং বললো, "হে আমার প্রতিপালক, তুমি জালিম সম্প্রদায় থেকে আমাকে রক্ষা করো।"" [সুরা কাসাস : আয়াত ১৫-২১।
وَقَتَلْتَ نَفْسًا فَنَجَّيْنَاكَ مِنَ الْغَمِّ وَفَتَنَّاكَ فُتُونًا “এবং (হে মুসা,) তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে; তখন আমি তোমাকে মনঃপীড়া থেকে মুক্তি দিই, আমি তোমাকে বহু পরীক্ষা করেছি।” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৪০]
এ-জায়গায় কুরআন ও তাওরাতের বর্ণনায় কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। ক. কুরআন মাজিদ দ্বিতীয় দিনের ঝগড়াকারীদের একজনকে বনি ইসরাইলের এবং দ্বিতীয়জনকে মিসরীয় (ফেরআউনি) বলেছে। আর তাওরাত বলেছে, দুজনই বনি ইসরাইলের ছিলো। খ. তাওরাতে সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয় নি, যিনি মুসা আ.-কে ফেরআউন ও তার পারিষদবর্গের পরামর্শ সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছিলো। কিন্তু এ-দুটি বিষয় সম্পর্কে (নিরপেক্ষ চিন্তায়) জ্ঞান ও প্রকৃতি এদিকেই পথ প্রদর্শন করে যে, কুরআন মাজিদের বিবরণই সত্য এবং তার ওপরই বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। কেননা, ফেরআউনের সম্প্রদায়ের কাছে বনি ইসরাইলের প্রাণের কোনো মূল্যই ছিলো না যে, হযরত মুসা আ.-এর মতো রাজপ্রাসাদে অবস্থানকারী ব্যক্তি বিরুদ্ধে খুনের বদলার দাবিদার হতো। আর দ্বিতীয় কথা হলো, তাওরাতের বর্ণনার সঙ্গে এটি একটি স্বাভাবিক সংযোগ, যা বিশ্বাস ও জ্ঞানের সঙ্গে করা হয়েছে।
টিকাঃ
¹⁸ সুরা কাসাস: আয়াত ১৮।