📄 বনি ইসরাইল মিসরে
কুরআন মাজিদ হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনায় বনি ইসরাইলের আলোচনা শুধু এতটুকু করেছে যে, হযরত ইয়াকুব আ. ও তাঁর পরিবার পরিজন হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য মিসরে এসেছেন। কিন্তু তার কয়েকশো বছর পর সংঘটিত হযরত মুসা আ.-এর ঘটনায় কুরআন মাজিদ পুনরায় বনি ইসরাইলের ঘটনাবলি বিস্তারিত বর্ণনা করছে। তা থেকে বুঝা যায়, বনি ইসরাইল হযরত ইউসুফ আ.-এর যুগে মিসরেই বসতি স্থাপন করেছিলো। অতীতের এই কয়েকশো বছরে তাদের ইতিহাস মিসরের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিলো। তাওরাতের নিম্নলিখিত বিবরণগুলো এই বক্তব্যেরই সমর্থন করছে:
"ফেরআউন ইউসুফ আ.-কে বললেন, তোমার পিতা ও ভাইয়েরা তোমার কাছে এসেছে। মিসরের ভূমি তোমার সামনে। তোমার পিতা ও ভাইদেরকে এই দেশের কোনো এক স্থানে, যা সবচেয়ে উত্তম হয়, বসতি স্থাপন করতে দাও। আরামদায়ক ভূমিতে তাদেরকে থাকতে দাও। আর যদি তুমি তাদের মধ্য থেকে কাউকেও যোগ্য মনে করো, তবে তাকে তোমার গবাদিপশুগুলোর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করো।"¹
"আর ইউসুফ তার পিতা ও ভাইদেরকে মিসরের এক উত্তম ভূখণ্ডে, যা ছিলো রা'আমসীস নামে পরিচিত, ফেরআউনের নির্দেশ অনুসারে বসতি স্থাপন করতে দিলেন এবং তাদেরকে ওই ভূমির মালিক বানিয়ে দিলেন। আর হযরত ইউসুফ আ. তাঁর পিতা ও ভাইদেরকে এবং পিতার গোটা খান্দানকে নিজের সন্তানদের মতো খাদ্য সরবরাহ করলেন এবং তাদের প্রতিপালন করলেন।"²
"আর ইসরাইল [ইয়াকুব আ.] মিসর দেশে আরামদায়ক অঞ্চলে বসবাস করেছেন। মিসরে তিনি প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। সময়ে তা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিলো। তিনি মিসরে সত্তর বছর জীবিত ছিলেন। সুতরাং হযরত ইয়াকুব আ.-এর পূর্ণ বয়স হয়েছিলো ১৪৭ বছর।"³
তাওরাতে এ-বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইউসুফ আ. তাঁর পিতা ও ভাইদের জন্য 'জাশান' ভূখণ্ডটি চাইলে ফেরআউন আনন্দের সঙ্গে তা তাঁকে দান করেছিলেন।
মিসরের মানচিত্রে এই এলাকাটি বিলবিসের উত্তর দিকে অবস্থিত। বর্তমান কালে এই অঞ্চলে অবস্থিত শহরের নাম ফালুসাহ (সিফতুল হান্নাহ)।
হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনায় আমরা বলে এসেছি যে, হযরত ইউসুফ আ. তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য শহুরে বসতি থেকে দূরে এই স্থানটি মনোনীত করেছিলেন খুব সম্ভব এই উদ্দেশ্যে যে, এখানে বসবাস করে তাঁর বংশের গ্রামীণ আগের মতোই অটুট থাকবে। আর এ-কারণে মিসরের মূর্তিপূজকেরা তাদের সংশ্রবে যেতে পারবে না এবং তাদের শিরকি রীতিনীতি এবং মন্দ স্বভাবসমূহ বনি ইসরাইলের মধ্যে প্রবেশ করাতে পারবে না। কেননা, মিসরবাসীরা রাখাল, কৃষক এবং গ্রামীণ শ্রেণির লোকদেরকে নীচু স্তরের ও অচ্ছুৎ বলে মনে করতো। এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশা করাটাকেও দূষণীয় ও নিন্দাই মনে করতো।
তাওরাতে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইয়াকুব আ.-এর ইন্তে কালের সময় নিকটবর্তী হলে তিনি হযরত ইউসুফকে ডেকে ওসিয়ত করলেন, আমাকে যেনো মিসরের মাটিতে দাফন করা না হয়; বরং পূর্বপুরুষদের দেশে ফিলিস্তিনে যেনো দাফন করা হয়। হযরত ইউসুফ আ. পিতাকে এ-ব্যাপারে পূর্ণ আশ্বস্ত করলেন। ইয়াকুব আ.-এর ইন্তে কালের পর তাঁর পবিত্র দেহ মমি করে রাখলেন এবং ফিলিস্তিনে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করলেন।⁴
হযরত ইয়াকুব আ. তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে সমস্ত সন্তানকে একত্র করলেন এবং ইউসুফ আ.-এর সন্তান আফরাইম ও মুন্নাসিকেও ডাকলেন। তারপর প্রথমে সবার জন্য বরকতের দোয়া করলেন এবং ভালোবাসা ও স্নেহের সঙ্গে তাদেরকে পরিতুষ্ট করলেন। এরপর তিনি তাদেরকে উপদেশ দিলেন, “দেখো, আমার মৃত্যুর পরে তোমাদের ঈমান ও আকিদাকে কখনো খারাপ করো না। আর আল্লাহ তাআলার যে-পবিত্র সম্পর্ক আমি, আমার পিতা এবং আমার পিতামহ সর্বদা সুদৃঢ় ও শক্তিশালী রেখেছি, শিরকি প্রথা ও কুসংস্কার এবং রীতিনীতির মিশ্রণে সেটাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেলো না।
কুরআন মাজিদেও হযরত ইয়াকুব আ.-এর এই পবিত্র ওসিয়ত নিম্নলিখিত অলৌকিক বাক্যে প্রকাশ করা হয়েছে-
أَمْ كُنتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبُ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهَا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مسلمون (سورة البقرة)
'(হে মুহাম্মদ,) ইয়াকুবের কাছে যখন মৃত্যু এসেছিলো তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে? সে যখন পুত্রদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলো, "আমার পরে তোমরা কীসের ইবাদত করবে?" (অর্থাৎ তোমরা কোন্ ধর্ম অবলম্বন করবে?) তারা তখন বলেছিলো, "আমরা আপনার ইলাহ-এর এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহ-এরই ইবাদত করবো। তিনি একমাত্র ইলাহ এবং আমরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণকারী।' [সুরা বাকারা: আয়াত ১৩৩]
তাওরাতে হযরত ইউসুফ আ.-এর ওফাতের অবস্থাবলির ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর বয়স ও বংশ সম্পর্কেও নিম্নলিখিত আয়াতগুলোয় আলোচনা করা হয়েছে।
"আর ইউসুফ আ. ও তাঁর পিতার পরিবারের সমস্ত লোক মিসরে বসবাস করেছেন। হযরত ইউসুফ আ. একশো দশ বছর জীবিত ছিলেন। আর ইউসুফ আ. তাঁর পুত্র আফরাইমের সন্তানদেরকে দেখেছেন, যারা ছিলো তৃতীয় পুরুষ (প্রজন্ম)। আর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মুন্নাসির পুত্র মাকিরের পুত্রও (নাতির ছেলে পুতি) ইউসুফ আ.-এর কোলেপিঠে প্রতিপালিত হয়েছে। অর্থাৎ ইউসুফ আ. তাঁর প্রপৌত্রকেও দেখেছেন। ইউসুফ আ. তাঁর ভাইদেরকে বললেন, আমার মৃত্যু অতি নিকটে। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদেরকে স্মরণ করবেন এবং তোমাদেরকে এই দেশ থেকে বের করে সেই দেশে নিয়ে যাবেন যার ব্যাপারে তিনি হযরত ইবরাহিম আ., হযরত ইসহাক আ. এবং হযরত ইয়াকুব আ.-কে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন।"⁵ আর ইউসুফ আ. বনি ইসরাইল থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করে বললেন, “আল্লাহ নিশ্চয় তোমাদেরকে স্মরণ করবেন। তোমরা আমার হাড়গুলোকে এখান থেকে নিয়ে যেয়ো।” এরপর হযরত ইউসুফ আ. একশো দশ বছরের বৃদ্ধ হয়ে ইন্তেকাল করলেন। বনি ইসরাইল মিসরে তাঁর মৃতদেহের মধ্যে সুগন্ধিদ্রব্য পূর্ণ করে তাকে একটি সিন্দুকের ভেতর রেখে দিলো।"⁶
"মুসা আ. বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিসর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ইউসুফ আ.-এর হাড়গুলোকে সঙ্গে নিয়ে নিলেন। কেননা, ইউসুফ আ. বনি ইসরাইলকে দৃঢ়তার সঙ্গে কসম কাটিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাদের খবর নেবেন। তোমরা আমার হাড়গুলোকে তোমাদের সঙ্গে নিয়ে যেয়ো।"⁷
হযরত ইউসুফ আ.-এর ওসিয়ত অনুযায়ী তাঁর সন্তানেরা তাঁর পবিত্র দেহকেও মমি করলো এবং সিন্দুকে সংরক্ষিত করে রাখলো। হযরত মুসা আ.-এর যুগে বনি ইসরাইল মিসর থেকে প্রত্যাগমনের সময় হযরত ইউসুফ আ.-এর ওসিয়ত পালন করার জন্য তার দেহ যে-সিন্দুকে সংরক্ষিত ছিলো সেই সিন্দুকটিও নিয়ে গেলো এবং নবীদের দেশে নিয়ে দাফন করলো।—এই স্থানটি কোথায়? এ-ব্যাপারে জাবরুনবাসীরা বলে, তাঁকে জাবরুনে সমাহিত করা হয়েছে। তারা হারমে খলিলিতে মাকফিলার কাছে একটি সংরক্ষিত সিন্দুক সম্পর্কে এই দাবি করে যে, এই তাবুত (কফিন, শবাধার) হযরত ইউসুফ আ.-এর। কিন্তু আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার মিসরি বলেন, এটা নিছক কল্পনা। তিনি বলেন, ফাযেল মুহাম্মদ নামির হাসান নাবলুসি এবং নাবলুসের বিখ্যাত আলেম ফাযেল আমিন বেগ আবদুল হাদি আমাকে বলেছেন যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর মাজার মুবারক নাবলুসে রয়েছে এবং এটাই সঠিক তথ্য। কেননা, তাওরাত বলে, হযরত ইউসুফ আ.-এর তাবুত ফারাইম নামক স্থানেই সমাহিত করা হয়েছে। আর ফারাইম নামক ভূখণ্ড নাবলুসের একটি বিখ্যাত শহর। প্রাচীনকালে একে শাকিম বলা হতো।⁸
যাইহোক। এসব বিবরণ থেকে এ-বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, বনি ইসরাইল হযরত ইউসুফ আ. ও হযরত মুসা আ.-এর মধ্যবর্তী সময়ে মিসরেই বসবাস করতো।
টিকাঃ
১ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪৭, আয়াত ৫-৬।
২ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪৭, আয়াত ১১-১২।
৩ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪৭, আয়াত ২৭-২৮।
⁴ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪৭, আয়াত ৩০-৩১।
⁵ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪৭, আয়াত ৩০, ৩৬।
⁶ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৫, আয়াত ২২-২৬।
⁷ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৩, আয়াত ১৯।
⁸ কাসাসুল কুরআন, আল্লামা আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ১৮৭।
📄 কুরআন মাজিদে হযরত মুসা ও হারুন আ.-এর আলোচনা
কুরআন মাজিদের বহু জায়গায় হযরত মুসা আ.-এর আলোচনা করা হয়েছে। কেননা, তাঁর অধিকাংশ অবস্থা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র অবস্থাবলির সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্য রাখে। আর এসব ঘটনাবলির মধ্যে স্বাধীনতা ও দাসত্বের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং সত্য ও মিথ্যার প্রতিযোগিতার অনুপম কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। তা ছাড়া এসব ঘটনাবলির মধ্যে জ্ঞান ও উপদেশমালার দুর্লভ ভাণ্ডার সঞ্চিত রয়েছে। এই কারণে কুরআন মাজিদ প্রয়োজন অনুসারে এবং স্থান ও পাত্র অনুযায়ী জায়গায় জায়গায় মুসা আ.-এর ঘটনার বিভিন্ন অংশকে সংক্ষিপ্ত আকারে ও বিস্তারিতরূপে বর্ণনা করেছে।
নিম্নবর্ণিত নকশার মাধ্যমে সংখ্যা গণনার সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনার গুরুত্বের যথার্থ অনুমান করা যাবে এবং সেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবীর মাহাত্ম্য ও অনুধাবন করা যাবে।
এই নকশাটির দুটির অংশ। প্রথম নকশা থেকে প্রকাশ পাচ্ছে যে, হযরত মুসা ও হযরত হারুন আলাইহিমুস সালাম অথবা বনি ইসরাইল ও ফেরআউনের ঘটনা কোন্ কোন্ সুরায় ও কী সংখ্যক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশ প্রকাশ করছে যে, কুরআন মাজিদে হযরত মুসা আ. ও হযরত হারুন আ.-এর মুবারক নাম কত জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের মোট সংখ্যা কত।
প্রথম নকশা
সুরার নাম আয়াত-সংখ্যক
সুরা আল-বাকারা ৪৭-৬১, ৬৩-৭৫, ৮৪-৮৭, ৯২, ৯৩, ১০৮, ১৩৬, ২৪৩, ২৫১
সুরা আন-নিসা ১৫৩-১৫৬, ১৬৪
সুরা মায়িদা ১২, ১৩, ২০-২৫, ৩২, ৪৫, ৭০, ৭১, ৭৮, ৭৯
সুরা আল-আন'আম ৮৪-৯০, ১৪৬, ১৫৪, ১৫৯
সুরা আল-আ'রাফ ১০৩-১৫৭, ১৫৯-১৭১
সুরা আল-আনফাল ৫৪
সুরা ইউনুস ৭৪-৯৩
সুরা হুদ ৯৬-৯৯, ১১০
সুরা ইবরাহিম ৫, ৬, ৮
সুরা আন-নাহল ১২৪
সুরা বনি ইসরাইল ২-৭, ১০১-১০৪
সুরা আল-কাহফ ৬০-৮২
সুরা মারইয়াম ৫১-৫৩
সুরা তোয়া-হা ৯০-৯৮
সুরা আল-আম্বিয়া ৪৮, ৪৯
সুরা আল-মুমিনুন ৪৫-৪৯
সুরা আল-ফুরকান ৩৫, ৩৬
সুরা শুআরা ১০-৬৬
সুরা নামল ৭-১৪
সুরা কাসাস ৩-৪৮
সুরা আনকাবুত ৩৯, ৪০
সুরা আস-সাজদা ২৩, ২৪
সুরা আল-আহযাব ৬৯
সুরা আস-সাফফাত ১১৪-১২২
সুরা মুমিন ২৩-৪৫
সুরা আয-যুখরুফ ৩৬-৫৬
৪৪ সুরা দুখান ১৭-৩৩
৪৫ সুরা জাসিয়া ১৬, ১৭
৫১ সুরা যারিয়াত ৩৮-৪০
৫৪ সুরা কামার ৪১-৫৫
৬১ সুরা সাফফ ৫
৬২ সুরা জুমআ ৫, ৬
৬৬ সুরা আত-তাহরিম ১১
৬৯ সুরা আল-হাক্কাহ ৯, ১০
৭৩ সুরা মুয্যাম্মিল ১৫, ১৬
৭৯ সুরা নাযিআত ১৫-২৫
৮৯ সুরা ফাজর ۱۰-১৩
দ্বিতীয় নকশা
মুসা আ.-এর নাম হারুন আ.-এর নাম
সুরা সুরার নাম আয়াত আয়াত
২ সুরা আল-বাকারা ১২ ১
৪ সুরা আন-নিসা ২ ১
৫ সুরা মায়িদা ২ ০
৬ সুরা আল-আন'আম ২ ১
৭ সুরা আল-আ'রাফ ১৬ ১
১০ সুরা ইউনুস ৮ ১
১১ সুরা হুদ ২ ১
১৪ সুরা ইবরাহিম ৩ ০
১৭ সুরা বনি ইসরাইল ৩ ০
১৮ সুরা আল-কাহফ ২ ০
১৯ সুরা মারইয়াম ১ ০
২০ সুরা তোয়া-হা ১৪ ৩
২১ সুরা আল-আম্বিয়া ১ ১
২৩ সুরা আল-মুমিনুন ২ ১
২৫ সুরা আল-ফুরকান ১ ১
২৬ সুরা শুআরা ৮ ২
২৭ সুরা নামল ২ ০
২৮ সুরা কাসাস ১৪ ১
৩২ সুরা আস-সাজদা ১ ০
৩৩ সুরা আল-আহযাব ১ ০
৩৭ সুরা আস-সাফফাত ২ ০
৪০ সুরা মুমিন ৪ ০
৪৩ সুরা আয-যুখরুফ ১ ০
৫১ সুরা যারিয়াত ১ ০
৬১ সুরা সাফফ ১ ০
৭৯ সুরা নাযিআত ১ ০
১০৭ ১৪
📄 বংশপরিচয় ও জন্ম
হযরত মুসা আ.-এর বংশপরম্পরা কয়েক পুরুষের মাধ্যমে হযরত ইয়াকুব আ. পর্যন্ত পৌছে। মুসা আ.-এর পিতার নাম ছিলো ইমরান এবং মাতার ইউকাবাদ। পিতার বংশপরম্পরা এরূপ—ইমরান বিন কামাত বিন লাওয়া বিন ইয়াকুব আ.। হযরত হারুন আ. হযরত মুসা আ.-এর সহোদর ও বড়ভাই ছিলেন। ইমরানের ঘরে হযরত মুসা আ.-এর জন্ম এমন সময়ে হয়েছিলো যখন ফেরআউন বনি ইসরাইলের সদ্যপ্রসূত বালক শিশুদেরকে হত্যা করে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেছিলো।
এ-কারণে মুসা আ.-এর মা ও পরিবারের লোকেরা তাঁর জন্মের পর অত্যন্ত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলো যে কীভাবে এই শিশুটিকে হত্যাকারীদের দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা যায়। এভাবে-সেভাবে-যেভাবেই হোক, তিন মাস পর্যন্ত তাঁকে সবার দৃষ্টি থেকে গোপনে রাখা হলো। তাঁর জন্মগ্রহণের সংবাদও কাউকে জানতে দেয়া হলো না। কিন্তু গুপ্তচরদের অনুসন্ধান এবং পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার কারণে বেশিদিন এই ঘটনা গোপনীয় রাখার ভরসা পাওয়া গেলো না। ফলে তাঁর মায়ের উদ্বেগ ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। এই কঠিন ও করুণ পরিস্থিতিতে অবশেষে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করলেন এবং মুসা আ.- এর মায়ের অন্তরে এমন কৌশলের উদ্ভব ঘটিয়ে দিলেন যে, একটি সিন্দুক নির্মাণ করো। সিন্দুকে আলকাতরা ও তেলের পালিশ লাগাও। পানি যেনো ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। শিশুটিকে সিন্দুকে ভরো এবং তারপর তা নীলনদের স্রোতে ভাসিয়ে দাও।
📄 ফেরআউনের গৃহে প্রতিপালন
হযরত মুসা আ.-এর সহোদরা বোন নদের তীর ধরে ভাসমান সিন্দুকটির ওপর দৃষ্টি রেখে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন, সিন্দুকটি ভেসে ভেসে রাজপ্রাসাদের কাছে এসে থামলো। ফেরআউনের পরবিারের একজন রমণী তাঁর চাকরদের দিয়ে নদ থেকে সিন্দুকটি উঠিয়ে নিলেন এবং রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন। হযরত মুসা আ.-এর বোন তা দেখে খুবই আনন্দিত হলেন। প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে জানার জন্য তিনি রাজমহলের চাকরানিদের সঙ্গে মিশে গেলেন।
কুরআন মাজিদ রাজবংশের এই স্ত্রীলোকটিকে ফেরআউনের স্ত্রী বলেছে। আর তাওরাতের 'আত্মপ্রকাশ' অধ্যায়ে বলা হয়েছে, এই নারী ছিলেন ফেরআউনের কন্যা। কিন্তু ইতিহাসবেত্তাগণ এই মতানৈক্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন নি। তাঁরা বলেন, সম্ভবত পানিতে ভাসমান সিন্দুকটিকে ফেরআউনের কন্যাই উঠিয়ে নিয়েছিলো। তারপর সিন্দুকের শিশুটিকে পুত্র বানিয়ে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা, শিশুটিকে হত্যা না করে নিজেরাই লালন-পালন করার আগ্রহ প্রকাশ এবং ফেরআউনের কাছে সুপারিশ করেছিলেন ফেরআউনের স্ত্রী আসিয়া।
কুরআন মাজিদের বর্ণনাপদ্ধতি থেকেও এ-কথাই প্রকাশ পায়। কারণ, হযরত মূসা আ.-কে নদীর বুক থেকে উত্তোলনকারী প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদ বলেছে—
فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ
‘তখন ফিরআউনের (পরিবারের) লোকজন তাকে (শিশু মূসাকে) উঠিয়ে নিলো।’ [সূরা কাসাস : আয়াত ৬]
আর পুত্ররূপে গ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষা এবং হত্যা না করে প্রতিপালন করার জন্য সুপারিশকারী সম্পর্কে কুরআন বলছে—
وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِّي وَلَكَ ۖ لَّا تَقْتُلُوهُ عَسَىٰ أَن يَنفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا
‘ফিরআউনের স্ত্রী বললো, “এই শিশু আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। একে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।” [সূরা কাসাস: আয়াত ৯]
‘ফিরআউনের স্ত্রী বললো’-এর হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস র.হ. থেকে এমন বক্তবই বর্ণিত হয়েছে।¹⁰
যাইহোক, ফিরআউনের লোকেরা সিন্ধুকটি খুলে দেখতে পেলো, একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান শিশু সিন্ধুকটির ভেতরে আরামে শুয়ে আছে এবং বুড়ো আঙুল চুষছে। ফিরআউনের কন্যা তৎক্ষণাৎ তাকে রাজমহলে নিয়ে গেলো। ফিরআউনের স্ত্রী শিশুটিকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। অত্যন্ত মায়া-মমতার সঙ্গে শিশুটিকে আদর করলেন। রাজমহলের অভ্যন্তরীণ চাকরদের মধ্যে কেউ বলে উঠলো, ‘এই শিশুটিকে তো বনি ইসরাইলের ছেলে মনে হচ্ছে। এ তো আমাদের বংশের শত্রু। এতো হত্যা করে ফেলা জরুরি। পাছে এমন না, এই শিশুই আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।’ এ-ধরনের কথা শুনে ফিরআউনের এমনটাই ইচ্ছে হলো। ফিরআউনের স্ত্রী ফিরআউনের হাবভাব দেখে বলতে লাগলেন, এমন সুন্দর ও আদরনীয় শিশুটিকে হত্যা করো না। বিচিত্র কি যে, এই শিশু তোমার ও আমার চোখের প্রীতিদায় হবে। অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেবো এবং তার জীবন ও অস্তিত্ব আমাদের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ এই শিশু যদি সেই ইসরাইলি শিশুই সাব্যস্ত হয়, যে হবে তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যার উদ্দেশ্য, তবে আমাদের ভালোবাসা ও প্রতিপালনের কোল হয়তো তাকে ক্ষতিকর হওয়ার পরিবর্তে কল্যাণকর করে দেবে।
কিন্তু ফেরআউন ও তার বংশের লোকেরা কি জানতো যে, আল্লাহপাকের অদৃষ্টলিপি তাদের প্রতি হাসাহাসি করছে। রাব্বুল আলামিনের অপার মহিমা লক্ষ করুন, ফেরআউনকে সম্পূর্ণ ও অজ্ঞ ও অনবহিত রেখে তাকে তার শত্রুর রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে দিলেন।
মোটকথা, তখন এই প্রয়োজন দেখা দিলো যে, শিশুটির জন্য দুগ্ধ দানকারিণী ধাত্রী নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মায়ের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করার জন্য শিশুর স্বভাব এমন করে দিলেন যে, সে কোনো রমণীর স্তনে মুখই লাগায় না। রাজমহলের ধাত্রী চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বসে গেলো; কিন্তু মুসা আ. কোনো স্তন থেকেই দুধ পান করলেন না। মুসা আ.-এর বোন মারইয়াম সব অবস্থা দেখছিলেন। তিনি বললেন, অনুমতি পেলে আমি একজন ধাত্রীর সন্ধান দিতে পারি। তিনি অত্যন্ত সৎ স্বভাবশালিনী এবং এই কাজের জন্য খুবই উপযোগী। নির্দেশ পেলে বরং এখনই তাঁকে আমি আমার সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারি। ফেরআউনের স্ত্রী ধাত্রীকে আনার জন্য নির্দেশ দিলেন। আর মুসা আ.-এর বোন মাকে নিয়ে আসার জন্য আনন্দচিত্তে বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
হযরত শাহ আবদুল কাদির দেহলবি রহ. তাঁর তাফসিরগ্রন্থ 'মুযিহুল কুরআন'-এ লিখেছেন, ফেরআউনের স্ত্রী (আসিয়া) ছিলেন বনি ইসরাইল বংশোদ্ভূত এবং তিনি মুসা আ.-এর চাচাতো বোন ছিলেন। তিনি মুসা আ.-এর বোনের ধাত্রী আনার কথায় বুঝে ফেলেছিলেন যে, শিশুটি বনি ইসরাইলেরই সন্তান। ১৪
এদিকে এ-ধরনের কথাবার্তা হচ্ছিলো আর ওদিকে মুসা আ.-এর মায়ের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিলো। একটি ইলহামি চিন্তা-ভাবনায় শিশুপুত্রকে তো নদীর বুকে ভাসিয়ে দিয়ে এলেন; কিন্তু এখন মাতৃস্নেহ ও মমতা বড়ই তীব্র হয়ে উঠলো। তিনি অস্থির হয়ে নিজের এই গুপ্তরহস্যকে প্রকাশ করে দিতে উদ্যত হলেন। এই অস্থিরতা ও অশান্ত অবস্থার মধ্যেই আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মায়ের প্রতি তাঁর দয়া ও করুণা বর্ষণ করলেন। তাঁর হৃদয়ে স্থিরতা ও প্রশান্তি নাযিল করলেন। এখন তিনি অদৃশ্যের দয়া ও অনুগ্রহের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকলেন। এমন সময়ে তাঁর কন্যা এসে সম্পূর্ণ ঘটনা শোনালেন। তিনি বললেন, যখন মুসা কোনো ধাত্রীরই দুধ পান করলো না, তখন আমি বললাম, ইসরাইলি বংশে একজন অত্যন্ত ভদ্র ও সৎস্বভাবা নারী আছেন। তিনি এই শিশুকে আপন সন্তানের মতো লালন-পালন করতে পারবেন। ফেরআউনের স্ত্রী এ-কথা শুনে আমাকে নির্দেশ দিলেন, আমি যেনো এখনই আপনাকে নিয়ে গিয়ে ওখানে উপস্থিত করি। এ তো আমাদের প্রতি আল্লাহপাকের বড়ই অনুগ্রহ ও দয়া। এখন আপনি গিয়ে আপনার পুত্রকে বুকে তুলে নিয়ে প্রাণ জোড়ান এবং চোখ শীতল করুন। আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করুন। কেননা, তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন।
এই ঘটনা কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ )) فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنَا إِنَّ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ () وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِي وَلَكَ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ () وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ () وَقَالَتْ لِأُخْتِه قُصِّيهِ فَبَصُرَتْ بِهِ عَنْ جُنُبِ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ () وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نَاصِحُونَ )) فَرَدَدْنَاهُ إِلَى أُمِّهِ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (سورة القصص)
“মুসার মায়ের অন্তরে আমি ইলহাম (ইলহামায়ে) নির্দেশ করলাম, “শিশুটিকে স্তন্য দান করতে থাকো। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোনো আশঙ্কা করবে তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুলদের একজন বানাবো। তখন ফেরাউনের (পরিবারের) লোকজন তাকে (শিশু মুসাকে নদী থেকে) উঠিয়ে নিলো। এর পরিণাম তো এই ছিলো যে, সে (ভবিষ্যতে) তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়। ফেরাউন, হামান ও কারুন ও তাদের বাহিনী ছিলো অপরাধী। ফেরাউনের স্ত্রী বললো, “এই শিশু আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। একে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।” প্রকৃতপক্ষে তারা এর পরিণাম বুঝতে পারে নি (এই শিশু এবং তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের কোনো খবরই ছিলো না)। মুসার মায়ের হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিলো। যাতে সে অধীর না হয় তার জন্য আমি তার হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিলে সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করেই দিতো। সে (মুসা আ.-এর মা) মুসার বোনকে বললো, “এর (সিন্দুকটির) পেছনে পেছনে যাও।” সে তাদের অজ্ঞাতে (অপরিচিতের মতো) দূর থেকে তাকে (মুসাকে) দেখছিলো। (ফেরাউনের পরিবার এ ব্যাপারে কিছু জানতেও পারলো না।) পূর্ব থেকে আমি তাকে ধাত্রী-স্তন্যপানে বিরত রেখেছিলাম। এরপর মুসার বোন বললো, 'তোমাদেরকে কি আমি এমন এক পরিবারের সন্ধান দেবো যে-পরিবার তোমাদের হয়ে একে লালন-পালন করবে এবং এর কল্যাণকামী হবে? তখন আমি তাকে ফিরিয়ে দিলাম তার মায়ের কাছে, যাতে তার চোখ জুড়ায়, সে দুঃখ না করে এবং বুঝতে পারে যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [সুরা কাসাস : আয়াত ৭-১৩]
وَلَقَدْ مَنَنَّا عَلَيْكَ مَرَّةً أُخْرَى () إِذْ أَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّكَ مَا يُوحَى () أَنِ اقْذِفِيهِ فِي التَّابُوتِ فَاقْذِفِيهِ فِي الْيَمِّ فَلْيُلْقِهِ الْيَمُّ بِالسَّاحِلِ يَأْخُذْهُ عَدُوٌّ لِّي وَعَدُوٌّ لَّهُ وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي () إِذْ تَمْشِي أُخْتُكَ فَتَقُولُ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى مَن يَكْفُلُهُ فَرَجَعْنَاكَ إِلَى أُمِّكَ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنُ (سورة ত্বা-হা)
'(হে মুসা,) এবং (তুমি জানো যে,) আমি তো তোমার প্রতি আরও একবার অনুগ্রহ করেছিলাম; যখন আমি তোমার মাতাকে জানিয়েছিলাম যা ছিলো জানাবার (আমি তাকে বুঝিয়ে দিলেছিলাম)-যে, "তুমি তাকে (মুসাকে) সিন্দুকের মধ্যে রাখো, এরপর তাকে দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, যাতে দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দেয়। তাকে আমার (মুসলিম সম্প্রদায়ের) শত্রু এবং তার (এই শিশুর) শত্রু নিয়ে যাবে।" (হে মুসা,) আমি আমার কাছ থেকে তোমার ওপর ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, (যাতে অপরিচিত মানুষও তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করে এবং আমার ইচ্ছা ছিলো) যাতে তুমি আমার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হও। যখন তোমার বোন এসে (ফেরআউনের স্ত্রীকে) বললো, "আমি কি তোমাদেরকে বলে দেবো কে এই শিশুর ভার নেবে?” তখন আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম যাতে তার চোখ জোড়ায় এবং (শিশুর বিচ্ছেদে সে দুঃখ না পায়।' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ৩৭-৪০]
তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসা আ.-এর মা যখন মুসা আ.-এর দুধ ছাড়ালেন তখন তিনি তাকে ফেরআউনের কন্যার কাছে দিয়ে দিলেন। এরপর মুসা আ. এক দীর্ঘকাল রাজপ্রাসাদে প্রতিপালিত হতে থাকেন এবং ওখানেই তাঁর ক্রমোন্নতি ঘটতে থাকে। কিন্তু তাওরাতের এই উক্তি বাস্তবের সম্পূর্ণ বিপরীত যে, মুসা আ. ফেরআউনের কন্যার পুত্র হয়েছিলেন। "যখন শিশু একটু বড় হলো, তখন মুসার মাতা তাকে ফেরআউনের কন্যার কাছে নিয়ে এলেন এবং সে ফেরআউনের কন্যার পুত্র নির্ধারিত হলো। সে তার নাম রাখলো মুসা এবং বললো, তার এই নাম রাখলাম এই কারণে যে, আমি তাকে পানি থেকে উদ্ধার করেছি।"¹⁷
টিকাঃ
¹⁰ রুহুল মাআনি ফি তাফসিরিল কুরআнил আজিম ওয়াস সাবয়িল মাছানি, আলুস সানা শিহাবুদ্দিন মাহমুদ আল-আলুসি, বিশেষ খণ্ড, সূরা কাসাস।
¹⁴ মুফাস্স্সিসরগণ ফেরআউনের এই স্ত্রীর নাম আসিয়া বলেছেন। কুরআন মাজিদ ফেরআউনের স্ত্রীকে মুমিন সাব্যস্ত করেছে। তা সত্ত্বেও তাঁকে ইসরাইলি বংশোদ্ভূত ও মুসা আ.-এর চাচাতো বোন বলা একটি দুর্বল মত। বিশুদ্ধ মত এই যে, তিনি ফেরআউনের বংশেরই নারী ছিলেন। (তাফসিরে রুহুল মাআনি, বিংশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১।।
¹⁷ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১, আয়াত ১০।